📘 তাওহীদ ও আকাইদ 📄 ব্যাখ্যাকারকের সংক্ষিপ্ত জীবনী

📄 ব্যাখ্যাকারকের সংক্ষিপ্ত জীবনী


তাওহীদের সংজ্ঞা তওহিদ: আল্লাহ তাআলা মানুষের জন্য এক ও একক সর্বাধিপতি প্রতিপালক। তিনি রাজত্ব, সৃষ্টি, ধন-সম্পদ ও কর্তৃত্বের অধিপতি। এতে কোন অংশীদার নেই। এককভাবে তিনিই প্রভু। এবাদত, আনুগত্য, আশা-ভরসা, সাহায্য ও ফরিয়াদের ক্ষেত্রে অন্য কাউকে তার সাথে অংশীদার করা জায়েজ নেই। তিনি সুন্দর নামসমূহ ও মহান গুণাবলির অধিকারী, তাঁর সদৃশ কোন জিনিস নেই। তিনি সর্ব-শ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা।

তাওহীদের মর্যাদা ও আলামত ১. তওহিদ আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভ ও তাঁর আনুগত্যের সর্বোত্তম ও সর্ব শ্রেষ্ঠ পদ্ধতি। এ তাওহীদের বার্তা দিয়েই তিনি রাসূলদের প্রেরণ করেছেন এবং এর ব্যাখ্যার জন্য কিতাব অবতীর্ণ করেছেন। এরশাদ হচ্ছে- 'এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাজিল করেছি-যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন।' অর্থাৎ শিরকের অন্ধকার হতে তাওহীদের আলোতে।

২. তিনি তাওহীদের পরীক্ষা নেয়ার লক্ষ্যে জিন জাতি, মানবজাতি, ইহকাল- পরকাল, জান্নাত-জাহান্নাম সৃষ্টি করেছেন। যে এ তাওহীদ গ্রহণ করবে সে সৌভাগ্যবান, চিরসুখী। আর যে তাওহীদ প্রত্যাখ্যান করবে সে হতভাগা, চির দুঃখী।

৩. তাওহীদ বিহীন আমল যত বড় কিংবা যত ভালই হোক-অগ্রাহ্য, পরিত্যক্ত ও মূল্যহীন। এরশাদ হচ্ছে- 'যদি তারা শিরক করত, তবে তাদের কাজকর্ম তাদের জন্যে ব্যর্থ হয়ে যেত।'

৪. নবী-রাসূলগণ তাওহীদের অনুশীলন, বাস্তবায়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে কষ্ট সহ্য করেছেন, তাদের অনুসারীগণ পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন। কেউ নিজের প্রাণ উৎসর্গ করেছেন। কেউ ত্যাগ করেছেন নিজের ধন-সম্পদ ও ইজ্জত ও মান-সম্ভ্রম। কেউ তার প্রয়োজনীয় আহার হতে বঞ্চিত হয়েছেন। কেউ বিসর্জন দিয়েছেন আল্লাহ তাআলার রাস্তায় নিজের আত্মমর্যাদা পর্যন্ত। কেউ স্বীয় দেশ ত্যাগে বাধ্য হয়েছেন... ইত্যাদি।

তাওহীদের নিদর্শন বা আলামত যেহেতু অনন্য সাধারণ বৈশিষ্ট্য মণ্ডিত তাওহিদ-কল্যাণকর, হিতকর ও সুউচ্চ স্থানের অধিকারী সেহেতু তার আল্লাহ প্রদত্ত বিস্তৃত কল্যাণ, প্রচুর সুফল ও অনেক উপকার দুনিয়া-আখেরাত তথা উভয় জগতে মোহনীয়, আকর্ষণীয় ও লোভনীয়। নিম্নে প্রধান প্রধান কতিপয় সুফলের নমুনা তুলে ধরা হল:-

প্রথমত: দুনিয়াবী সুফল : তাওহীদের বদৌলতে আমরা বিস্তর-বেহিসাব, সুফল-কল্যাণ অর্জন করে থাকি। তার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ নিম্নরূপ:

১. তাওহিদ মানে সত্য ও সততাকে আঁকড়ে ধরে ন্যায় ও ইনসাফের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা। সঠিক ও সরল পথে পরিচালিত হওয়া। মূর্খতা, কুসংস্কার, ধারণাব্রতীতা ও ভ্রান্তির উর্ধ্বে থাকা। এরশাদ হচ্ছে- 'এ দ্বারাই প্রমাণ যে, আল্লাহ তাআলাই সত্য এবং আল্লাহ তাআলা ব্যতীত তারা যাদের পূজা করে সব মিথ্যা।'

২. তাওহিদ মানে জান-মালের পূর্ণ নিরাপত্তা অর্জন করা। অবৈধভাবে কারো উপর অত্যাচার বা সীমা-লঙ্ঘন করা হতে সম্পূর্ণ রূপে বিরত থাকা। রাসূল সা. বলেন- 'আমি মানুষের সাথে জেহাদ করার জন্য আদিষ্ট হয়েছি-যতক্ষণ পর্যন্ত তারা لا إله إلا الله না বলবে। যখন তারা لا إله إلا الله বলবে, আমার থেকে তাদের জান- মাল নিরাপদ করে নিবে। তবে শরিয়তের বিধি মোতাবেক— শাস্তির উপযুক্ত হলে ভিন্ন কথা।'

৩. তাওহিদ মানে উৎকৃষ্ট জীবন ও প্রভূত কল্যাণ অর্জন করা। এরশাদ হচ্ছে— 'যে সৎকর্ম সম্পাদন করে সে ঈমানদের পুরুষ হোক বা নারী আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করব।' পক্ষান্তরে তাওহিদ প্রত্যাখ্যান করে যে নিমজ্জিত থাকে শিরকের অন্ধকারের অতল গহবরে—সে খুবই ভাগ্যহত, আল্লাহ তাআলার রহমত হতে বিতাড়িত এবং সংকীর্ণতার দুর্বিষহ জীবন যাপনে বাধ্য। এরশাদ হচ্ছে— 'এবং যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে, তার জীবিকা সংকীর্ণ হবে এবং আমি তাকে কেয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করব।'

৪. তাওহিদ মানে সাম্য-মৈত্রী ও ন্যায়-ইনসাফের বাস্তব অনুশীলন। কারণ তাওহিদ অনুসারীদের সামনে থাকে এক পরম ও অভীষ্ট লক্ষ, মহৎ উদ্দেশ্য—যার জন্য সে দুর্গম পথ অতিক্রম করছে। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ও তায়ালার অপার সান্নিধ্য। তদুপরি তার থাকে সঠিক ও নির্ভুল দিক নির্দেশনা যার উপর দিয়ে সে নির্বিঘ্নে পথ চলে; অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার কিতাব, রাসূল সা. এর সুন্নত। সে উভয়ের মাঝে সামঞ্জস্য বিধান করে পারংগমতার সাথে স্বীয় ব্রত পালন করে। এরশাদ হচ্ছে— 'নিশ্চয় আল্লাহ তাআলার নিকট সে-ই সর্বাধিক সম্ভ্রান্ত যে সর্বাধিক পরহেজগার।' রাসূল সা. বলেন— 'আল্লাহ তাআলা তোমাদের চেহারা ও শরীর পর্যবেক্ষণ করেন না। তিনি পর্যবেক্ষণ করেন তোমাদের অন্তর ও আমল সমূহ।'

৫. তাওহিদ মানে মানুষকে মানুষের দাসত্ব হতে মুক্ত ও স্বাধীন করা। কারণ তাওহিদ বা একত্ববাদ-এর অর্থ একমাত্র আল্লাহ তাআলার বশ্যতা, অধীনতা ও দীনতা স্বীকার করা। তার সৃষ্টি জীবের আনুগত্য ও পূজ্যতা পরিহার করা। তদুপরি তাওহিদ মানুষের বিবেক-বুদ্ধি ও বোধশক্তিকে বিশ্বজগৎ ও এর ভিতর সৃষ্ট যাবতীয় বস্তু-জীব-উদ্ভিদ সম্পর্কে মুশরিক বা পৌত্তলিকদের আবিষ্কৃত-অনুসৃত কুসংস্কার ও বানোয়াট কল্প-কাহিনী হতে মুক্ত ও পরিশুদ্ধ করে। মানুষের চিত্ত ও চেতনাকে পরাক্রমশালী আল্লাহ ব্যতীত সকলের সামনে হীনতা নীচতা ও আত্মসমর্পণ হতে বিরত রাখে। সর্বোপরি মানুষের জীবন চক্রকে সীমা-লঙ্ঘনে অভ্যস্ত, প্রভুত্বের দাবিদার ও নববী আহবানের সাথে যুদ্ধ ঘোষণাকারীদের আধিপত্য হতে মুক্ত করে।

৬. তাওহিদ মানে ভারসাম্যপূর্ণ পরিশীলিত, পরিমার্জিত ব্যক্তিত্ব গঠন করা। কারণ তাওহিদ সৃষ্টি কুলের সামনে এমন এক লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও গন্তব্য নির্দিষ্ট করে দিয়েছে-যা আল্লাহমুখী ও তার সন্তুষ্টির জিম্মাদার। তাওহিদে বিশ্বাসী ব্যক্তি মন-মস্তিষ্ক ও সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে এ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে-যা তার অন্তরে প্রশান্তি, হৃদয়ে অবিচলতা ও আত্মায় অনাবিল সুখ সযত্নে নিয়ে আসে। পক্ষান্তরে মূর্তিপূজকদের উপাস্য-হাজারো প্রভু তাদের অন্তরসমূহকে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন বহুধা বিভক্ত করে রাখে। তারা সর্বদাই নানান পদ্ধতিতে তাদের উপাস্য-প্রভুদের সন্তুষ্ট করার নিমিত্তে কিংকর্তব্যবিমূঢ় থাকে। আল্লাহ তাআলা ইউসুফ আ.-এর উপদেশ উল্লেখ করেন- 'হে কারাগারের সঙ্গীরা! পৃথক পৃথক অনেক উপাস্য ভাল, না পরাক্রমশালী এক আল্লাহ?” অন্যত্র বলেন- 'আল্লাহ তাআলা এক দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন: এক লোকের উপর বিরোধী ক'জন মালিক রয়েছে, আরেক ব্যক্তির প্রভু মাত্র একজন—তাদের উভয়ের অবস্থা কি সমান? সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার। কিন্তু তাদের অধিকাংশই জানে না।'

৭. তাওহিদ আস্থাশীল দৃঢ় অন্তকরণ তৈরি করে। কারণ, তাওহিদ কানায় কানায় পূর্ণ করে দেয় মানুষের অন্তকরণকে আল্লাহ তাআলার আস্থা ও তার উপর নির্ভরতা দ্বারা। সে তার নিঃসঙ্গতা ও গোপনীয়তায় একমাত্র আল্লাহ তাআলা ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করে না। যেহেতু সে জানে আল্লাহ তাআলা ছাড়া এ বিশ্ব পরিমণ্ডলে কেউ হস্তক্ষেপের অধিকার রাখে না। কিংবা উপকার বা অপকার কিছুই করতে পারে না। আল্লাহ তাআলা ছাড়া মানবজাতি যাদের এবাদত-উপাসনা করে তারা স্বয়ং নিজেদের লাভ ক্ষতির যোগ্যতা রাখে না। অন্যদের কল্যাণ-অকল্যাণ করার কোন প্রশ্নই আসে না। আল্লাহ তাআলার ওলীগণ নির্বিঘ্ন অন্তর ও আস্থাশীলতার অধিকারী হয়ে থাকেন, যার বাস্তব নমুনা আল্লাহ তাআলার নবী নূহ আ.। তিনি তার সম্প্রদায়কে বলেছেন— 'হে আমার সম্প্রদায়, যদি তোমাদের মাঝে আমার অবস্থান এবং আল্লাহ তাআলার আয়াতসমূহের মাধ্যমে নসিহত করা ভারী বলে মনে হয়ে থাকে, তবে আমি আল্লাহ তাআলার উপর ভরসা করছি। এখন তোমরা সবাই মিলে নিজেদের কর্ম সাব্যস্ত কর এবং এতে তোমাদের শরিকদেরকে সমবেত করে নাও। যাতে তোমাদের মাঝে নিজেদের কাজের ব্যাপারে কোন সন্দেহ-সংশয় না থাকে। অতঃপর আমার সম্পর্কে যা কিছু করার করে ফেল এবং আমাকে অবকাশ দিয়ো না।'

এর উত্তম নমুনা আল্লাহ তাআলার নবী ইব্রাহীম আ.। যখন তার সম্প্রদায় মূর্তি নিয়ে সংঘটিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাকে শাসাচ্ছিল ও ভীতি প্রদর্শন করছিল। তখন তিনি বলেছেন— 'তোমরা যাদেরকে শরিক কর, আমি তাদেরকে ভয় করি না—তবে আমার পালনকর্তাই যদি ভিন্ন কিছু ইচ্ছা করেন (তবে ভিন্ন কথা)। আমার পালনকর্তাই প্রত্যেক বস্তুকে স্বীয় জ্ঞান দ্বারা বেষ্টন করে আছেন। তোমরা কি চিন্তা কর না? যাদেরকে তোমরা আল্লার তাআলার সাথে শরিক করে রেখেছ, তাদেরকে কীরূপে ভয় করব, অথচ তোমরা ভয় করোনা যে তোমরা আল্লাহ তাআলার সাথে এমন বস্তুকে শরিক করছ, যাদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা তোমাদের জন্য কোন প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি। অতএব, উভয় সম্প্রদায়ের মাঝে শান্তি লাভের অধিক যোগ্য কে, যদি তোমরা জ্ঞানী হয়ে থাক? যারা ঈমান আনে এবং স্বীয় বিশ্বাসকে শেরেকীর সাথে মিশ্রিত করে না, তাদের জন্যই শান্তি এবং তারাই সুপথগামী।' আরো নমুনা নবী হুদ আ.। যখন তাকে বলা হয়েছিল— 'বরং আমরা তো বলি যে আমাদের কোন দেবতা তোমার উপরে শোচনীয় ভূত চাপিয়ে দিয়েছে।' তিনি এর উত্তরে বলেনে— 'হুদ বললেন- আমি আল্লাহ তাআলাকে সাক্ষী করেছি আর তোমরাও সাক্ষী থাক যে, আমার কোন সম্পর্ক নাই তাদের সাথে যাদেরকে তোমরা শরিক করছ: তাকে ছাড়া, তোমরা সবাই মিলে আমার অনিষ্ট করার প্রয়াস চালাও, অতঃপর আমাকে কোন অবকাশ দিয়ো না। আমি আল্লাহ তাআলার উপর নিশ্চিত ভরসা করেছি যিনি আমার এবং তোমাদের পরওয়ারদেগার। পৃথিবীর বুকে বিচরণকারী এমন কোন প্রাণী নেই যা তার পূর্ণ আয়ত্তাধীণ নয়। আমার পালনকর্তার সরল পথে সন্দেহ নেই।

দ্বিতীয়ত: পরকালীন সুফল: যার প্রধান প্রধান কতিপয় শুভ পরিণাম নিম্নে তুলে ধরা হল:

১. তওহিদ মানে জান্নাতে প্রবেশাধিকার ও জাহান্নাম হতে মুক্তির নিশ্চয়তা: যে তাওহীদের উপর মৃত্যু বরণ করবে এবং যার নেকির পাল্লা গুনাহের পাল্লা হতে ভারী হবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। এরশাদ হচ্ছে- 'আর সে দিন যথার্থই ওজন করা হবে। অতঃপর যাদের পাল্লা ভারী হবে তারাই সফলকাম হবে।'

তাওহীদের উপর মারা যাওয়ার পরেও যে ব্যক্তির গুনাহের পাল্লা ভারী হবে, সে আল্লাহ তাআলার ইচ্ছাধীন। চাইলে নিরেট মেহেরবাণী দ্বারা তাকে মাফ করে দিতে পারেন। অথবা তারই অনুমতিতে কোন সন্তুষ্ট ভাজনের সুপারিশের মাধ্যমে জান্নাতে প্রবেশ করাতে পারেন। আর চাইলে তাকে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত করতে পারেন, যাতে সে গুনাহ থেকে পাক-সাফ হতে পারে। অতঃপর সে জাহান্নাম হতে বেরিয়ে আসবে। সেখানে স্থায়ীভাবে অবস্থান করবে না। বরং জান্নাতে প্রবেশ করবে। অনুরূপ ভাষ্যই শাফায়াতের হাদিসে পাওয়া যায়। রাসূল সা. বলেন- فأقول : يارب ائذن لي في من قال لا إله إلا الله، قال: ليس ذلك لك، أو قال: ليس ذاক إليك ولكن وعزتي وكبريائي وعظمتي لأخرجن من قال لا إله إلا الله. "আমি বলব, হে আমার রব, যারা لا إله إلا الله বলেছে তাদের ব্যাপারে আমাকে সুপারিশ করার অনুমতি দিন। আল্লাহ তাআলা বলবেন, এ কাজ তোমার নয় বা তাদের ব্যাপার নিয়ে তোমার চিন্তা করতে হবে না। তবে আমার ইজ্জত, অহমিকা ও বড়ত্বের শপথ, যারা لا إله إلا الله বলেছে তাদেরকে অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করাব।

তাওহীদের বিপরীত হচ্ছে শিরক: শিরক মুশরিক কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জান্নাতে প্রবেশ করার পথ রুদ্ধ করে দেয়। সে স্থায়ীভাবে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। সে যত আমল সম্পাদন করুক তার কোনো কাজে আসবে না। এরশাদ হচ্ছে- 'নিশ্চয় যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার সাথে অংশীদার স্থির করে, আল্লাহ তাআলা তার জন্যে জান্নাত হারাম করে দেন এবং তার বাসস্থান হয় জাহান্নাম। অত্যাচারীদের কোন সাহায্যকারী নেই।' আয়েশা রা. এর হাদিসে এসেছে, তিনি বলেন- 'আমি বলেছি হে আল্লাহর রাসূল সা. ইবনে জাদআন ইসলাম পূর্বযুগে- জাহিলিয়াতে- আত্মীয়তার বন্ধন প্রতিষ্ঠিত করতো, অভাব গ্রস্তদের খাদ্য প্রদান করতো, এর দ্বারা কি সে উপকৃত হবে? তিনি উত্তর দিলেন: এ আমলগুলো তাকে কোন উপকৃত করতে পারবে না। যেহেতু সে কোন দিন বলেনি, رب اغفر لي خطইئتي يوم الدين )হে আমার রব! কেয়ামতের দিন আমার গুনাহ মাফ কর।(

২. তাওহীদের বদৌলতে নেক কাজের মূল্যায়ন ও গ্রহণযোগ্যতা মিলে : তাওহিদ দ্বীন বা ধর্মের মূল ভিত্তি এবং ঐ মূল স্তম্ভ যার উপর মিল্লাত বা ধর্মের গোড়াপত্তন হয়েছে। যে ব্যক্তি কেয়ামতের দিন তাওহিদ নিয়ে আসবে তার অন্যান্য আমলের মূল্যায়ন করা হবে। আর যে তাওহিদসহ আসতে পারবে না, তার সমস্ত আমল বিনষ্ট হবে এবং তা অস্তিত্বহীন গণ্য করা হবে। এরশাদ হচ্ছে- 'যদি তারা শিরক করে, তবে তাদের কাজকর্ম তাদের জন্যে ব্যর্থ হয়ে যাবে।'

৩. তাওহীদের ফলে গুনাহ মাফ ও অপরাধ মোচন হয়: যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের নিকট নির্ভেজাল তাওহিদ ও শিরকের দূরতম সম্পর্ক মুক্ত খাটি আমল নিয়ে আসবে- তার সমস্ত পাপ মোচন করা হবে। তার সকল অপরাধ মাফ করা হবে। আল্লাহ তাআলা হাদিসে কুদসীতে বলেন- 'হে আদম সন্তান তুমি যদি দুনিয়ার সমতুল্য পাত্রপূর্ণ অপরাধ নিয়ে আমার কাছে আস, অতঃপর আমার সঙ্গে কোন জিনিসকে শরীক করা থেকে মুক্ত হয়ে আমার সাথে সাক্ষাৎ কর, আমি দুনিয়ার সমতুল্য পাত্রপূর্ণ ক্ষমা নিয়ে তোমার নিকট উপস্থিত হব।' তদ্রুপ সুসংবাদ এসেছে আমলনামা সংক্রান্ত হাদিসে, যে টিকেটে لا إله إلا الله অর্থাৎ কালেমায়ে তাওহিদ থাকবে সে টিকেটটি ওজনের পাল্লাতে গুনাহের নিরানব্বইটি নথিপত্রের উপর ভারী হবে। প্রত্যেকটি নথিপত্রের দৈর্ঘ্য হবে দৃষ্টি সীমা পর্যন্ত।

তাওহীদের প্রকার: ওলামায়ে কেরাম তওহিদকে দু'ভাগে ভাগ করেছেন :

প্রথমত: আল্লাহ তাআলার সত্তা, তার কার্যাবলী, তার বিশেষ্য ও বিশেষণ সমূহকে প্রতিষ্ঠিত করণ ও প্রতিপন্নকরণ। এ প্রকার তওহিদকে ওলামায়ে কেরাম নামকরণ করেছেন - توحيد المعرفة والإثبات হিসেবে। (অর্থ: আল্লাহ তাআলার পরিচয় লাভ করা। তার প্রতিনিধি হিসেবে তদীয় সমস্ত বিধানাবলী মননে ও শরীরে, নিজের ভিতর ও অন্যের ভিতর সফল রূপায়ণ ও যথার্থ বাস্তবায়ন করা।)

কতেক ওলামায়ে কেরাম এ প্রকার তওহিদকে আবার দু'ভাগে ভাগ করেছেন:
১. (توحيد الربوبية) অর্থাৎ তওহিদুর রুবুবিয়্যাত বা প্রভুত্ব ও প্রতিপালন সম্পর্কিত একত্ববাদ। অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার অস্তিত্বের স্বীকারোক্তি প্রদান। তার প্রত্যক্ষ ও স্বনিয়ন্ত্রিত কর্মসমূহে একমাত্র তাকেই সম্পাদনকারী জ্ঞান করা। যেমন-রাজত্ব, পরিকল্পনা, সৃষ্টি, কল্যাণ-অকল্যাণ, রিজিক প্রদান, জীবিত করণ ও মৃত্যুদান ইত্যাদি কর্মসমূহ আল্লাহ তাআলা পরিকল্পনা করেন এবং প্রত্যক্ষ ও সক্রিয় ভাবে একক সিদ্ধান্তে সম্পাদন করেন।

আরেকটু পরিষ্কার করে বলা যায়: توحيد الربوبية দুইটি বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে। যথা:
(এক) আসমান-জমিন, জিন-ইনসান, পাহাড়-পর্বত, সাগর-মহাসাগর, আলো-বাতাস, চন্দ্র-সূর্যসহ যাবতীয় সৃষ্টি জীব একমাত্র আল্লাহ তাআলার পরিকল্পনা, তত্ত্বাবধান ও প্রত্যক্ষ নির্দেশ (کن) এর মাধ্যমে সৃজিত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কারো থেকে সামান্যতম সাহায্য গ্রহণ করা হয়নি। সৃষ্টির অণুপরিমাণ বস্তুর সৃষ্টির ভিতর কারো অংশীদারিত্বও নেই।
(দুই) যাবতীয় সৃষ্টিজগত পরিচালনা করার দায়িত্ব ও ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ তাআলা সংরক্ষণ করেন। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক আইন-কানুন প্রণয়ন, মুসলমান-মুসলমান, মুসলমান-অমুসলমান, অমুসলমান-অমুসলমান এর ভিতর সম্পর্ক-উন্নয়ন, সম্পর্ক-ছিন্নকরণ, লেন-দেন, উদারনীতি-কঠোরনীতি নির্নয় করণ, এবং এ সমস্ত জিনিসের প্রকৃতি ও ধরন ব্যাখ্যা করণ, এককমাত্র আল্লাহ তাআলার অধিকার। এর বিরুদ্ধাচারন করে কেউ যদি নিজেকে আংশিক বা সামগ্রিক অধিকার সংরক্ষণকারী মনে করে- সে বাস্তবে রুবুবিয়‍্যাতের দাবীদার। কাফের। যেমন ফেরআউন, নমরূদ। আবার কেউ যদি এর সামগ্রিক বা আংশিক অধিকারের অন্য কাউকে অংশীদার মনে করে, সে মুশরিক বা পৌত্তলিক। যেমন- মক্কার আবু জাহেল, আবু লাহাব ও বর্তমান যুগের পৌত্তলিক সম্প্রদায়। হোক না সে অংশিদারকৃত বস্তু সামাজিক সংঘঠন, রাষ্ট্রিয় পার্লামেন্ট কিংবা আন্ত 'জাতিক কোন সংস্থা।

সুতরাং একজন মুসলমানকে রব হিসেবে একমাত্র আল্লাহ তাআলাকে মেনে নিতে হবে। তাকে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে ঘোষণা করতে হবে: আল্লাহ তাআলাকে আমি রব হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছি। ইসলামকে আমি ধর্ম বা জীবন বিধান হিসেবে গ্রহণ করেছি। মুহাম্মদ সা.কে আমি নবী হিসেবে মেনে নিয়েছি। তাকে দৃঢ়চিত্তে আরো ঘোষণা দিতে হবে: আমার নামায, আমার কুরবানী, আমার জীবন, আমার মরণ একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্য, যিনি উভয় জাহানের পালনকর্তা।

এর পরেই সে প্রবেশ করবে শান্তির শামিয়ানায়। আরোহন করবে মুক্তির তরীতে। তাওহিদ তথা ইসলামের কিস্তিতে। অতঃপর বিশ্বাসের এ তরীকে অবিশ্বাসের প্রলয়ংকারী ঝড়, উত্তাল তরঙ্গ ও সমূহ প্রতিকুলতা হতে হেফাজত করার জন্য জীবন মরণ শপথ গ্রহণ করতে হবে। প্রশান্তচিত্ত, পূর্ণ বিশ্বাস, আর দৃঢ় আস্থা নিয়ে তাওহিদ তথা ইসলামের তরী বর্হিভূত সকল মানবজাতি: যারা শিরক-কুফর আর পথভ্রষ্টতার মহা সমুদ্রে হাবুডুবু খাচ্ছে, যারা নাজাতের এ তরীকে বিপদ সঙ্কুল, দূর্ভেদ্য দেয়ালঘেরা শাস্তি কুন্ড, মানুষের স্বাধীনতা হরণকারী ভাসমান জেলখানা, আধুনিকতা বিবর্জিত সেকেলে সভ্যতার বাহক সমুদ্র পিষ্ঠে এক প্রাচীন দীপ মনে করে আছে, তাদেরকে এ তরীতে উঠার উদাত্ত আহবান জানাতে হবে। তবেই পরিগণিত হবে সে আল্লাহর সমীপে আত্মসমর্পনকারী পরিপূর্ণ মুসলমান। পরকালে বিশ্বাসী খাঁটি মুমিন।

২. তাওহিদ আল আসমা ওয়াস সিফাত (توحيد الأسماء والصفات) (অর্থঃ আল্লাহ তাআলা যে সব সত্তাগত বা গুণগত (বিশেষ্য ও বিশেষণ মূলক) নামসমূহ নিজের জন্য নির্বাচন করেছেন, অথবা রাসূল সা. যে সব সত্তাগত বা গুণগত (বিশেষ্য ও বিশেষণ মূলক) নামসমূহ আল্লাহর জন্য বলে উল্লেখ করেছেন, সেগুলোকে কোন ধরনের রূপদান বা সামঞ্জস্য বিধান, অপব্যাখ্যা বা বিকৃতি সাধন, কর্মহীনকরণ বা নিরর্থকরণ, দৃষ্টান্ত প্রদান বা সাদৃশ্য বর্ণনা ব্যতিরেকে বাস্তব সম্মত ও যথার্থভাবে একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্য উপযুক্ত মনে করা এবং সে হিসেবে মনে প্রাণে বিশ্বাস করা।

দ্বিতীয়ত: কথা, কাজ এবং নিয়্যত ও ইচ্ছার সমন্বিত এবাদত একমাত্র আল্লাহ তাআলাকে উৎসর্গ করা। যেমন- মহব্বত, ভয়, আশা, মান্নত, কুরবানী, তওবা, নামায বা সালাত, রোজা বা সিয়াম সাধনা, যাকাত, হজ্ব... ইত্যাদি। এবাদত গুলো একমাত্র আল্লাহ তাআলার প্রাপ্য জ্ঞান করা। এটাই কালেমায়ে তাওহিদ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর অর্থ ও আবেদন। এ প্রকার তাওহিদকে ওলামায়ে কেরাম নামকরণ করেছেন (তাওহিদ আল কাসদ ওয়াত তালব)توحيد القصد والطلب বলে। (অর্থ: একমাত্র আল্লাহ তাআলাকে চাওয়া এবং এবাদতের মাধ্যমে শুধু তাকে পাওয়ার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা করা।)

আল্লাহ তাআলা এ প্রকার তাওহিদসহ রাসূলদের প্রেরণ করেছেন এবং এর জন্য আসমান হতে কিতাব নাজিল করেছেন। তবে রাসূলগন এবং তাদের দাওয়াতী সম্প্রদায়ের মাঝে তাওহীদের প্রথম প্রকার নিয়ে কোন বিবাদ, সংঘাত বা দ্বন্ধ ছিল না। কারণ এ প্রকার তাওহিদ তারা স্বীকার করতো, অস্বীকার করতো না। উদাহরণত ঐ সমস্ত মুশরেকগণ যাদের নিকট দাওয়াতের জন্য রাসূল সা.কে প্রেরণ করা হয়েছিল তারা বিশ্বাস করতো- আল্লাহ তাআলা সৃষ্টিকর্তা, রিযিক দাতা, জীবন দানকারী, মৃত্যু প্রদানকারী, সার্বিক ও সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। যেমন- পবিত্র কুরআনে তাদের ব্যাপারে বলা হয়েছে:
১. এরশাদ হচ্ছে- 'আপনি যদি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করেন কে তাদেরকে সৃষ্টি করেছে? তবে অবশ্যই তারা বলবে, আল্লাহ।'
২. আরো এরশাদ হচ্ছে- 'যদি আপনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, কে আকাশ থেকে বারি বর্ষণ করে, অতঃপর তা দ্বারা মৃত্তিকাকে উহার মৃত হওয়ার পর সঞ্জীবিত করে? তবে তারা অবশ্যই বলবে আল্লাহ!'
৩. আরো এরশাদ হচ্ছে- 'তুমি জিজ্ঞেস কর, কে রুযীদান করে তোমাদেরকে আসমান থেকে ও যমীন থেকে, কিংবা কে তোমাদের কান ও চোখের মালিক? তা ছাড়া কে জীবিতকে মৃতের ভেতর থেকে বের করেন? এবং কে মৃতকে জীবিতের মধ্য হতে থেকে বের করেন? কে করেন কর্মসম্পাদনের ব্যবস্থাপনা? তখন তারা বলে উঠবে, আল্লাহ! তখন তুমি বলো তারপরেও ভয় করছ না?'

হ্যাঁ, ঝগড়ার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল : توحيد القصد والطلب )অর্থ: একমাত্র আল্লাহ তাআলাকে চাওয়া এবং এবাদতের মাধ্যমে শুধু তাকে পাওয়ার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা করা।) অর্থাৎ এক উপাস্য নির্ধারণ করার ব্যাপারে, শুধু আল্লাহর জন্য এবাদত সীমিত করনের ভিতর এবং لا إله إلا الله এর সাক্ষ্যকে বাস্তবায়ন করা নিয়েই মূল ঝগড়া। আল্লাহ তাআলা আরবের কাফেরদের কথা উল্লেখ করেছেন। তারা বলেছে: 'সে কি বহু উপাস্যের পরির্বতে এক উপাস্যের উপাসনা সাব্যস্ত করে দিয়েছে। নিশ্চয় এটা এক বিস্ময়কর ব্যাপার। কতিপয় বিশিষ্ট ব্যক্তি একথা বলে প্রস্থান করে যে, তোমরা চলে যাও এবং তোমাদের উপাস্যদের পুজায় দৃঢ় থাক। নিশ্চয় এ বক্তব্য কোন বিশেষ উদ্দেশ্যে প্রণোদিত। আমরা সাবেক ধর্মে এ ধরনের কথা শুনিনি। এটা মনগড়া ব্যাপার বৈ নয়।' আরো এরশাদ হচ্ছে- 'তাদের যখন বলা হত আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই, তখন তারা ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করত এবং বলত, আমরা কি এক উন্মাদ কবির কথায় আমাদের উপাস্যদেরকে পরিত্যাগ করব?' 'তারা বলেছে: তোমরা তোমদের উপাস্যদেরকে ত্যাগ করো না এবং ত্যাগ করো না ওয়াদ, সুয়া, ইয়াগুস, ইয়াউক ও নসরকে।'

বরং কুরআনের ভাষানুযায়ী বুঝা যায় যে, আল্লাহ তাআলা শুধুমাত্র এ প্রকার তাওহীদের প্রতি দাওয়াত দেয়ার জন্য রাসূলদের স্ব স্ব সম্প্রদায় ও কওমের নিকট প্রেরণ করেছেন। এরশাদ হচ্ছে- 'আমি প্রত্যেক জাতির মধ্যেই রাসূল প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে, তোমরা আল্লাহর এবাদত কর এবং তাগুত থেকে নিরাপদ থাক।' 'আপনার পূর্বে আমি যে রসূলই প্রেরণ করেছি, তাকে এ আদেশেই প্রেরণ করেছি যে আমি ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নেই। সুতরাং আমারই এবাদত কর।'

তবে অবশ্যই পরকালের নাজাতের জন্য উভয় তাওহীদের বাস্তবায়ন করতে ও মানতে হবে। যে ব্যক্তি শুধুমাত্র প্রথম প্রকার তাওহিদ (توحيد المعرفة والإثبات) নিয়ে আসবে। দ্বিতীয় প্রকার তাওহিদ (توحيد القصد والطلب) পরিত্যাগ করবে-যা অধিকাংশ মুশরিকদের অবস্থা- সে কোনো ভাবেই উপকৃত হবে না। এ তাওহিদ তাকে মুক্তি দিতে পারবে না। পবিত্র কুরআন তাদের কাফের ঘোষণা করেছে এবং শিরকের দ্বারা বিশেষায়িত করেছে। এরশাদ হচ্ছে- 'অনেক মানুষ আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, কিন্তু সাথে সাথে শিরক করে।

অত্র আয়াতে ঈমান গ্রহণের অর্থ- আল্লাহ তাআলার অস্তিত্ব, তিনি সৃষ্টিকর্তা, রিযিক দাতা, জীবন দানকারী, মৃত্যুদান কারী, বিশ্বজাহানের মালিক ও পরিকল্পনাকারীর উপর ঈমান আনা বা বিশ্বাস স্থাপন করা। শিরক করার অর্থ: এবাদতের ভিতর আল্লাহ তাআলার অংশীদার সাব্যস্ত করা। একটি উদাহরণ- মক্কার মুশরিকগণ কা'বা ঘরের তওয়াফ করার সময় তালবিয়ার ভিতর বলতো: 'হে আল্লাহ! আমি উপস্থিত। তোমার কোনো অংশীদার নেই। তবে যে সমস্ত অংশিদারগণ একমাত্র তোমারই জন্য- তারা ছাড়া। যাদের মালিক তুমি এবং তাদের মালিকাধীন জিনিসের মালিক ও তুমি।'

তাওহীদের উপর একটি পর্যালোচনা
১. তওহিদ তাওক্বীফী বা ওহীর উপর নির্ভরশীল : বান্দা হিসেবে আমরা যখনই তওহিদ নিয়ে পর্যালোচনা করবো, আল্লাহ তাআলা ও তার রসূলের বর্ণনাকৃত নির্ধারিত সীমা রেখার ভিতর সীমাবদ্ধ থাকবো। কারণ এখানে বাড়ানো-কমানো, বিকৃতকরণ ও পরিবর্তনের কোন সুযোগ নেই। শুধুমাত্র কুরআনুল কারীম ও নির্ভরযোগ্য সনদে প্রাপ্ত হাদীস হতেই তাওহিদ গ্রহণ করতে হবে। রাসূল সা. তাওহীদের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে গেছেন। সুতরাং যে কোন ব্যক্তির তাওহিদ নিয়ে যে কোনো মন্তব্য করার অধিকার নেই। তদুপরি কুরআন বা হাদীস বুঝার জন্য কুরআনের অপর আয়াত বা অপর আরেকটি হাদীসের যেখানে আলোচিত আয়াত বা হাদীসের ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়েছে- শরাণাপন্ন হতে হবে। সাথে সাথে সাহাবায়ে কেরাম ও আদর্শ পূর্বসুরীগণের ইলম ও ব্যাখ্যার দিকে প্রত্যাগমন করতে হবে। যেহেতু তাওহিদ ওহী নির্ভর, যেখানে যুক্তি, অনুমান বা কল্পনার বিন্ধুমাত্র দখল নেই। সেহেতু তাওহীদের শিক্ষা গ্রহণ করার গুরুত্ব ও শিক্ষা দেয়ার অপরিহার্যতা সহজেই অনুমেয় ও বোধগম্য। এও সুষ্পষ্ট যে বিশুদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য ওহী ব্যতীত তাওহীদের জ্ঞান অর্জন করার বিকল্প নেই। কারণ মানুষ যদি না জানে তাওহীদের দ্বারা কি উদ্দেশ্য? তাহলে সে কিভাবে তাওহিদবাদী বা একত্ববাদী হবে?

২. তাওহীদের শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞানই যথেষ্ট নয়: অধিকাংশ মানুষের নিকট তাওহীদের তাত্ত্বিক জ্ঞান এখন আর অসম্পূর্ণ বা অস্পষ্ট নয়। শরয়ি দৃষ্টিকোণ থেকে ইহা জরুরীও বটে। কিন্তু এতটুকু তাত্ত্বিক জ্ঞান যথেষ্ট নয়। বরং সে তাত্ত্বিক জ্ঞানানুযায়ী অনুপ্রাণিত হওয়া, তার কাছে আত্মসম্পর্ণ করা এবং সে অনুযায়ী আমল করা कर्तव्य।

যেমন আল্লাহ তাআলা রিযিক দাতা, সুসংহত সুদৃঢ় ক্ষমতার অধিকার- শুধু এতটুকু যথেষ্ট নয়। বরং এর সাথে আভ্যন্তরীন সক্রিয়া অনুভূতির প্রয়োজন আছে। অর্থাৎ তাকদীরের উপর বিশ্বাস করত হাতছাড়া হয়ে যাওয়া জিনিসের জন্য বিষন্ন না হওয়া। নাজায়েয বা অবৈধ পন্থায় সম্পদ অর্জনের প্রচেষ্টা না করা। ধর্মীয় দায় দায়িত্ব ও অবশ্য কর্তব্যকে জলাঞ্জলী দিয়ে অর্থ উপার্জনের জন্যে আপাদ-মস্তক আত্মনিয়োগ না করা। হালাল ও বৈধ সম্পদ উপার্জনের জন্যে আল্লাহ কর্তৃক প্রদত্ত পন্থা ও পদ্ধতিকে অবহেলা কিংবা পরিত্যাগ না করা।

টিকাঃ
১ সূরা ইবরাহিম: ১
১ সূরা আনআম: ৮৮
২ সূরা লোকমান: ৩০
১ সূরা আন নাহল: ৯৭
২ সূরা ত্বাহা: ১২৪
৩ সূরা আল হুজুরাত: ১৩
১. সূরা আয ঘুমার: ২৯
২. সূরা ইউনুস: ৭১
১. সূরা আল আনআম: ৮০-৮২
২. সূরা হুদ: ৫৪
১ সূরা- হল: ৫৪-৫৬
২ সূরা আল আরাফ: ৮
১ সূরা: আল মায়েদা ৭২
২ সূরা আল আন আম: ৮৮
১ সূরা যুখরুফ: ৮৭।
২ সূরা: আল আনকাবুত- ৬৩
৩ সূরা: ইউনুস-৩১
১ সূরা: সাদ- ৫-৭
২ সূরা সাফফাত: ৩৫-৩৬
৩ সূরা নূহ: ২৩।
১ সূরা: আম্বিয়া- ২৫
২ সূরা: ইউসুফ-১০৬
১ সূরা: বাক্বারা-৮৫

📘 তাওহীদ ও আকাইদ 📄 আকিদা লামিয়্যার মূলপাঠ

📄 আকিদা লামিয়্যার মূলপাঠ


আল্লাহ তাআলা স্বীয় বান্দাদের জলে-স্থলে, শরীরে ও দিগন্ত জুড়ে প্রকাশ্য- অপ্রকাশ্য নেয়ামতরাজি দ্বারা আবৃত করে রেখেছেন। তিনি এরশাদ করেন— أَلَمْ تَرَوْا أَنَّ اللَّهَ سَخَّرَ لَكُمْ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ وَأَسْبَغَ عَلَيْكُمْ نِعَمَهُ ظَاهِرَةٌ وَبَاطِنَة : ﴿ سورة لقমান : ২০ ﴾ 'তোমরা কি দেখ না আল্লাহ তাআলা নভোমন্ডল ও ভূ-মণ্ডলে যা কিছু আছে, সবই তোমাদের কাজে নিয়োজিত করে দিয়েছেন এবং তোমাদের প্রতি তার প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য নেয়ামতসমূহ পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন?' অন্যত্র বলেন— وَأَتَاكُمْ مِنْ كُلِّ مَا سَأَلْتُمُوهُ وَإِنْ تَعُدُّوا نِعْمَةَ اللَّهِ لَا تُحْصُوهَا إِنَّ الْإِنْسَانَ لَظَلُومٌ كَفَّارٌ. ﴿ سورة إبراهيم : ৩৪)
'যে সকল বস্তু তোমরা চেয়েছ, তার প্রত্যেকটি-ই তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন। যদি আল্লাহর নেয়ামত গণনা কর, তবে গুণে শেষ করতে পারবে না। আফসোস! মানুষ সীমাহীন অন্যায় পরায়ন, অকৃতজ্ঞ।'২ وَإِنْ تَعُদُّوا نِعْمَةَ اللَّهِ لَا تُحْصُوهَا إِنَّ اللَّهَ لَغَفُورٌ رَحِيمٌ ﴿ سورة النحل : ১৮) 'যদি আল্লাহর নেয়ামত গণনা কর, তবে গুণে শেষ করতে পারবে না। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু।'৩
তবে বান্দার উপর সবচেয়ে বড় নেয়ামত : রাসূল সা.-কে প্রেরণ করা, কিতাব অবতীর্ণ করা ও ইসলামের হেদায়াত দান করা। এ জন্য বান্দা হিসেবে আমাদের উপর ওয়াজিব আল্লাহ তাআলার প্রাপ্য অধিকার বা হকসমূহ জানা। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আবশ্যকীয় ও বাধ্যতামূলক হকসমূহ আদায়ের প্রতি যত্নবান থাকা। নিম্নে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি হক তথা অধিকারের বিবরণ তুলে ধরা হলো:—
প্রথম অধিকার: আল্লাহ তাআলার উপর ঈমান আনা
আল্লাহ তাআলার উপর ঈমান চারটি জিনিস অন্তর্ভুক্ত করে:—
এক: আল্লাহ তাআলার অস্তিত্বের ঈমান বা বিশ্বাস। দলিল-প্রমাণাদির ভিত্তিতে বিশ্বাস স্থাপন করা, অবোধ কিংবা অন্ধ ভাবে নয়; যেমন—আল্লাহ তাআলার মাখলুকাত তথা সৃষ্টি জগত দেখে তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা। যেহেতু স্রষ্টা ছাড়া কোন সৃষ্টি নিজেকে নিজে সৃষ্টি করতে কিংবা অস্তিত্বে আনতে পারে না—কারণ প্রত্যেক জিনিসই তার অস্তিত্বের পূর্বে বিলুপ্ত, অবিদ্যমান ও অস্তিত্বহীন থাকে—বিধায় সৃষ্টি করার প্রশ্নই আসে না। আবার কোন জিনিস হঠাৎ বা আকস্মিকভাবে অস্তিত্বে বা দৃশ্যপটে চলে আসবে তাও সম্ভব নয়। কারণ প্রতিটি ঘটমান বস্তু বা সম্পাদিত কাজের নেপথ্যে সংঘটক বা সম্পাদনকারী থাকা জরুরি।
অতএব, যখন আমরা জানতে পারলাম এ বিশ্বজগত নিজে-নিজেই দৃশ্যপটে চলে আসেনি, আবার অকস্মাৎ তৈরি হয়েও যায়নি, তাই আমাদের কাছে সুনির্দিষ্টভাবে পরিষ্কার হয়ে গেল, এর একজন স্রষ্টা রয়েছেন। আর তিনি হলেন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন।
দুই: রুবুবিয়‍্যাতের ঈমান: আল্লাহ তাআলার রুবুবিয়‍্যাতের উপর ঈমান রাখা—অর্থাৎ সৃষ্টি তার, মালিকানা তার, পরিচালনার দায়িত্ব তার, তিনি ছাড়া কেউ মালিক নয়, কেউ পরিচালনাকারী নয়। এরশাদ হচ্ছে— ﴿أَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَالْأَمْرُ. سورة الأعراف : ৫৪ 'শুনে রেখ, তারই কাজ সৃষ্টি করা এবং আদেশ করা।'
আরো বলেন— ﴿ذَلِكُمُ اللهُ رَبُّكُمْ لَهُ الْمُلْكُ وَالَّذِينَ تَدْعُونَ مِنْ دُونِهِ مَا يَمْلِكُونَ مِنْ قِطْمِيرٍ سورة فاطر : ১৩ 'তিনিই আল্লাহ! তোমাদের পালনকর্তা, সাম্রাজ্য তারই। তার পরিবর্তে তোমরা যাদেরকে ডাক, তারা তুচ্ছ খেজুর আটিরও অধিকারী নয়।'
দুনিয়ার ইতিহাসে এমন কাউকে পাওয়া যায়নি যে, অন্তরের সাক্ষ্য, প্রাকৃতিক বাস্তবতার প্রতি দৃষ্টিপাত করে আল্লাহ তাআলার রুবুবিয়‍্যাতকে অস্বীকার করেছে। তবে এমন অনেকেই আছে, যারা জেদ ধরে অহংকার বশত, নিজের কথায় আস্থা না থাকা সত্ত্বেও আল্লাহ তাআলার রুবুবিয়্যাত অস্বীকার করেছে। যেমন— ফেরআউন তার সম্প্রদায়কে বলেছিল— ﴿أَنَا رَبُّكُمُ الْأَعْلَى.﴾ سورة النازعات: ২৪। 'আমিই তোমাদের সেরা পালনকর্তা।' অন্য জায়গায় বলেন— ﴿يَا أَيُّهَا الْمَلَأُ مَا عَلِمْتُ لَكُمْ مِنْ إِلَهِ غَيْرِي.﴾ سورة القصص: ৩৮। 'হে পরিষদবর্গ, আমি জানি না যে আমি ব্যতীত তোমাদের কোন উপাস্য আছে কি-না।' ফেরআউন নিজের উপর আস্থা কিংবা বিশ্বাস রেখে একথা বলেনি, কারণ আল্লাহ তাআলা অন্যত্র বলেন— ﴿وَوجَحَدُوا بِهَا وَاسْتَيْقَنَتْهَا أَنْفُسُهُمْ ظُلْمًا وَعُلُوًّا.﴾ سورة النمل: ১৪। 'তারা অহংকার করে নিদর্শনাবলী প্রত্যাখ্যান করল, যদিও তাদের অন্তর এগুলোকে সত্য বলে বিশ্বাস করেছিল।' মূসা আ. ফেরআউনকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন— ﴿لَقَدْ عَلِمْتَ مَا أَنْزَلَ هَؤُلَاءِ إِلَّا رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ বَصَائِرَ وَإِنِّي لَأَظُنُّكَ يَا فِرْعَوْنُ مثْبُورًا.﴾ سورة بني اسرائيل: ১০২। 'তুমি জান, যে আসমান ও জমিনের পালনকর্তাই এসব নিদর্শনাবলী প্রত্যক্ষ প্রমাণ স্বরূপ নাজিল করেছেন। হে ফেরআউন, আমার ধারণা তুমি ধ্বংস হতে চলেছ।'৪
এর দ্বারা প্রমাণিত হলো যে মুশরিকরা আল্লাহ তাআলার الألوهية 'উলুহিয়‍্যাতে' শরিক করেও الربوبية 'রুবুবিয়‍্যাতে'-কে স্বীকার করতো। আল্লাহ তাআলা বলেন— ﴿قُلْ مَنِ الْأَرْضُ وَمَنْ فِيهَا إِنْ كُنتُمْ تَعْلَمُونَ ﴿৮৪﴾ سَيَقُولُونَ اللَّهِ قُلْ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ ﴿৮৫) قُلْ مَنْ رَبُّ السَّمَاوَاتِ السَّبْعِ وَرَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ ﴿৮৬﴾ سَيَقُولُونَ اللَّهِ قُلْ أَفَلَا تَتَّقُونَ﴾ ﴿৮৭﴾ قُلْ مَنْ بِيَدِهِ مَلَكُوتُ كُلِّ شَيْءٍ وَهُوَ يُجِيرُ وَلَا يُجَارُ عَلَيْهِ إِنْ كُنتُمْ تَعْلَمُونَ ﴿৮৮﴾ سَيَقُولُونَ اللَّهُ قُلْ فَأَنَّى تُسْحَرُونَ. ﴿সورة المؤمنون: ৮৪-৮৯﴾
'বলুন, পৃথিবী এবং পৃথিবীতে যারা আছে, তারা কারা? যদি তোমরা জান, তবে বল। এখন তারা বলবে : সবই আল্লাহর। বলুন, তবুও কি তোমরা চিন্তা করো না? বলুন : সপ্ত আকাশ ও মহা-আরশের মালিক কে? এখন তারা বলবে : আল্লাহ। বলুন, তবুও কি তোমরা ভয় করবে না? বলুন : তোমাদের জানা থাকলে বল, কার হাতে সব বস্তুর কর্তৃত্ব, যিনি রক্ষা করেন এবং যার কবল থেকে কেউ রক্ষা করতে পারে না। এখন তারা বলবে আল্লাহ। বলুন : তাহলে কোথা থেকে তোমাদেরকে জাদু করা হচ্ছে?' অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে— وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ مَنْ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ لَيَقُولُنَّ خَلَقَهُنَّ الْعَزِيزُ الْعَلِيمُ ﴿সورة الزخرف : ৯﴾ 'আপনি যদি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করেন কে নভোমন্ডল ও ভূ-মণ্ডল সৃষ্টি করেছে ? তারা অবশ্যই বলবে, এগুলো সৃষ্টি করেছেন পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞ আল্লাহ।' আরো এরশাদ হচ্ছে— وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ مَنْ خَلَقَهُمْ لَيَقُولُنَّ اللَّهُ فَأَنَّى يُؤْفَكُونَ ﴿সورة الزخرف : ৮৭﴾ 'আপনি যদি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করেন, কে তাদেরকে সৃষ্টি করেছে? তবে অবশ্যই তারা বলবে আল্লাহ।'
তিন: আল্লাহ তাআলার উলুহিয়্যাতের ঈমান :— অর্থাৎ 'আল্লাহ সুবহানাহু ও তাআলাই একমাত্র উপাস্য' এ কথার উপর ঈমান রাখা। যথা তিনি সত্যিকারার্থে প্রভু। বিনয় ও মহব্বত সম্বলিত এবাদতের উপযুক্ত। তিনি ছাড়া কেউ এবাদতের উপযুক্ত নয়। এরশাদ হচ্ছে— وَإِلَهُكُمْ إِلَهُ وَاحِدٌ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الرَّحْمَنُ الرَّحِيمُ ﴿সورة البقرة : ১৬৩﴾ 'আর তোমাদের উপাস্য একমাত্র তিনিই। তিনি ছাড়া মহান করুণাময় দয়ালু কেউ নেই।' আরো এরশাদ হচ্ছে— ا أَرْبَابٌ مُتَفَرِّقُونَ خَيْرٌ أَمِ اللهُ الْوَاحِدُ الْقَهَّارُ ﴿৩৯﴾ مَا تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِهِ إِلَّا أَسْمَاءَ سَمَّيْتُمُوهَا أَنْتُمْ وَأَبَاؤُكُمْ مَا أَنْزَلَ اللهُ بِهَا مِنْ سُلْطَانٍ. سورة يوسف: ৩৯-৪০)
'পৃথক পৃথক অনেক উপাস্য ভাল, না পরাক্রমশালী এক আল্লাহ? তোমরা আল্লাহকে ছেড়ে নিছক কতগুলো নামের এবাদত কর, সেগুলো তোমরা এবং তোমাদের باپ-দাদারা সাব্যস্ত করে নিয়েছ। আল্লাহ এদের ব্যাপারে কোন প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি।'২
আল্লাহ তাআলা উল্লেখিত জিনিসগুলোর প্রভুত্ব কিছু যুক্তির মাধ্যমে খণ্ডন করেছেন:—
১. মুশরিকরা যে সমস্ত বস্তুকে প্রভু বানিয়েছিল, তাদের ভিতর প্রভুত্বের কোন গুণ বিদ্যমান নেই। এগুলো সৃষ্টি করতে পারে না, কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না এবং তাদেরকে অনিষ্ট হতে রক্ষা করতে পারে না। এরা তাদের জীবন-মৃত্যুর মালিক নয়। আসমান-জমিনের মাঝে কোন জিনিসের মালিক নয় এবং এতে তাদের অংশীদারিত্বও নেই। এরশাদ হচ্ছে— وَاتَّخَذُوا مِنْ دُونِهِ أَهْةٌ لَا يَخْلُقُونَ شَيْئًا وَهُمْ يُخْلَقُونَ وَلَا يَمْلِكُونَ لِأَنْفُسِهِمْ ضَرًّا وَلَا نَفْعًا وَلَا يَمْلِكُونَ مَوْتًا وَلَا حَيَاةً وَلَا نُشُورًا. (سورة الفرقان : ৩) 'তারা তার পরিবর্তে কত উপাস্য গ্রহণ করেছে, যারা কিছুই সৃষ্টি করে না এবং তারা নিজেরাই সৃষ্ট, নিজেদের ভালও করতে পারে না, মন্দও করতে পারে না। জীবন, মরণ এবং পুনরুজ্জীবনেরও মালিক নয় তারা।'৩ আরো এরশাদ হচ্ছে— أَيُشْرِكُونَ مَا لَا يَخْلُقُ شَيْئًا وَهُمْ يُخْلَقُونَ ﴿১৯১﴾ وَلَا يَسْتَطِيعُونَ لَهُمْ نَصْرًا وَلَا أَنْفُسَهُمْ يَنْصُرُونَ (سورة الأعراف : ১৯১-১৯২)
'তারা কি এমন কাউকে শরিক সাব্যস্ত করে যে একটি বস্তুও সৃষ্টি করেনি বরং তাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে? আর তারা না তাদের সাহায্য করতে পারে, না নিজের সাহায্য করতে পারে!'৪ তাদের বানানো প্রভুদের এমন অসহায়ত্ব ও দুরবস্থা প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ তাআলাকে বাদ দিয়ে এগুলোকে প্রভু বানানো নিরেট বোকামি, চরম বাতুলতা।
২. মুশরিকরা বিশ্বাস করতো—আল্লাহ তাআলাই প্রতিপালক, সৃষ্টিকর্তা, তার হাতেই সমস্ত জিনিসের মালিকানা, তিনি রক্ষা করেন, তার কবল হতে কেউ রক্ষা করতে পারে না। এরশাদ হচ্ছে— وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ مَنْ خَلَقَهُمْ لَيَقُولُنَّ اللهُ فَأَنَّى يُؤْفَكُونَ ﴿ سورة الزخرف : ৮৭﴾ ‘আপনি যদি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করেন কে তাদেরকে সৃষ্টি করেছে? তাহলে অবশ্যই তারা বলবে, আল্লাহ।’ আরো এরশাদ হচ্ছে— قُلْ مَنْ يَرْزُقُكُمْ مِنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ أَمَّنْ يَمْلِكُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ وَمَنْ يُخْرِجُ الْحَيَّ مِنَ الْمَيِّتِ وَيُخْرِجُ الْمَيِّتَ مِنَ الْحَيِّ وَمَنْ يُدَبِّرُ الْأَمْرَ فَسَيَقُولُونَ اللهُ فَقُلْ أَفَلَا تَتَّقُونَ. (سورة يونس: ৩১)
‘তুমি জিজ্ঞেস কর, কে রুজি দান করে তোমাদেরকে আসমান থেকে ও জমিন থেকে, কিংবা কে তোমাদের কান ও চোখের মালিক? তাছাড়া কে জীবিতকে মৃতের ভেতর থেকে বের করেন? এবং কেইবা মৃতকে জীবিতের মধ্য থেকে বের করেন? কে করেন কর্ম-সম্পাদনের ব্যবস্থাপনা? তখন তারা বলে উঠবে, আল্লাহ! তুমি বল, তারপরেও ভয় করছ না?’২
তারা যখন নিজেরাই এর সাক্ষ্য প্রদান করল, যুক্তির ভিত্তিতে এখন তাদের অবশ্য কর্তব্য একমাত্র প্রভু, একমাত্র প্রতিপালক আল্লাহ তাআলার এবাদত করা। ধারণা প্রস্তুত ঐ সমস্ত প্রভুদের নয়—যারা নিজেদের কোন উপকার করতে পারে না। নিজেদের থেকে কোন বিপদ হটাতে জানে না।
চার: আল্লাহ তাআলার নাম ও সিফাতের ঈমান :—
বান্দা হিসেবে আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমান আনবে। যে সমস্ত নাম ও সিফাত (বিশেষ্য ও বিশেষণ) আল্লাহ তাআলা স্বীয় কিতাব অথবা রাসূল সা. স্বীয় হাদিসে উল্লেখ করেছেন, সেগুলোকে আল্লাহ তাআলার নাম ও সিফাত হিসেবে আল্লাহ তাআলার অবস্থান মোতাবেক বিশ্বাস করবে, একমাত্র তার জন্য প্রযোজ্য বলে জ্ঞান করবে। কোন ধরনের অপব্যাখ্যা, নিষ্কর্ম করণ, আকৃতি প্রদান ও সামঞ্জস্য বিধান করবে না। এরশাদ হচ্ছে— وَاللهُ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى فَادْعُوهُ بِهَا وَذَرُوا الَّذِينَ يُلْحِدُونَ فِي أَسْمَائِهِ سَيُجْزَوْنَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ. (سورة الأعراف: ১৮০) 'আর আল্লাহর রয়েছে উত্তম নাম সমূহ, কাজেই সে নাম ধরেই তাকে আহ্বান কর। আর তাদেরকে বর্জন কর, যারা তার নামের ব্যাপারে বাঁকা পথে চলে। তারা নিজেদের কৃতকর্মের ফল শীঘ্রই পাবে।'১ অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে— لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ. (سورة الشورى : ১১) ‘কোন কিছুই তার অনুরূপ নয়। তিনি সব শুনেন, দেখেন।’২
দ্বিতীয় অধিকার : পূর্ণ এখলাস ও আন্তরিকতাসহ একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্য এবাদত উৎসর্গ করা : যার পদ্ধতি হলো—বান্দা তার আমলের মাধ্যমে একমাত্র তাআলার সন্তুষ্টি কামনা করবে। যেমন আল্লাহ তাআলা এর প্রতি নির্দেশ দিয়ে বলেছেন— إِنَّا أَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الْকিতাবَ بِالْحَقِّ فَاعْبُدِ اللَّهَ مُخْلِصًا لَهُ الدِّينَ. (سورة الزمر : ২) ‘আমি আপনার উপর এ কিতাব যথার্থ-ই নাজিল করেছি। অতএব আপনি নিষ্ঠার সাথে আল্লাহ তাআলার এবাদত করুন।’৩ আরো বলেন— قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَاتِي لله رَبِّ الْعَالَمِينَ ﴿১৬২﴾ لَا شَرِيكَ لَهُ وَبِذَلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ. (سورة الأنعام: ১৬১-১৬২) ‘আপনি বলুন : আমার নামাজ, আমার কুরবানি এবং আমার জীবন-মরণ বিশ্ব প্রতিপালকের জন্য। তার কোন অংশীদার নেই। আমি তাই আদিষ্ট হয়েছি এবং আমি প্রথম আনুগত্য পোষণকারী।’৪ সহিহ হাদিসে কুদসীতে আছে, আল্লাহ তাআলা বলেন— أنا أغنى الشركاء عن الشرك، من عمل عملا أشرك فيه غيري فهو للذي أشرك به وأনা منه بريء. 'আমি সমস্ত অংশীদারদের ভিতর বেশি অমুখাপেক্ষী, যে এমন আমল করল, যার ভিতর সে আমার সাথে অন্য কাউকে অংশীদার করেছে, সে আমল ঐ অংশীদারের জন্য, আমি তার থেকে মুক্ত।'
মুআয ইবনে জাবাল রা. বলেন, আমি একটি গাধার পিঠে রাসূলের সঙ্গী ছিলাম। যে উটকে 'উফাইর' বলা হয়। রাসূল সা. জিজ্ঞেস করলেন— يا معاذ هل تدري حق الله على عباده، وما حق العباد على الله ؟ قلت: الله ورسوله أعلم، قال: (فإن حق الله على العباد أن يعبدوه ولا يشركوا به شيئا، وحق العباد على الله أن لا يعذب من لا يشرك به شيئا) فقلت: يا رسول الله، أفلا أبشر الناس ؟ قال لا تبشرهم فيتكلوا. (رواه البخاري ومسلم)
'হে মুআয, তুমি কি জান বান্দার উপর আল্লাহ তাআলার কি কি হক রয়েছে? এবং আল্লাহ তাআলার উপর বান্দার কি কি হক রয়েছে? আমি উত্তর দিলাম— আল্লাহ এবং তার রাসূল সা. ভাল জানেন। তিনি বললেন, বান্দার উপর আল্লাহ তাআলার হক হচ্ছে : তারা তাঁর এবাদত করবে, তাঁর সাথে অন্য কাউকে শরিক করবে না। আল্লাহ তাআলার উপর বান্দার হক হচ্ছে, যে তার সাথে কাউকে শরিক করবে না, তাকে তিনি শান্তি দেবেন না। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল সা. আমি কি সকলকে এর সুসংবাদ দেব না? তিনি বললেন তাদের সুসংবাদ দিওনা, তাহলে তারা কর্মহীন হয়ে যাবে।'১ রাসূল সা. আরো বলেন— إن الله لا ينظر إلى أجسامكم، ولا إلى صوركم، ولكن ينظر إلى قلوبكم وأعمالكم، وقال: إذا جمع الله الناس يوم القيامة ليوم لا ريب فيه، نادى مناد من كان أشرك في عمله الله أحدا فليطلب ثوابه من عند غير الله، فإن الله أغنى الشركاء عن الشرك). (رواه الترمذي وقال حسن غريب)
'আল্লাহ তাআলা তোমাদের শরীর ও চেহারার দিকে তাকান না। তবে তিনি তোমাদের অন্তর ও আমলের দিকে তাকান। রাসূল সা. আরো বলেছেন— কিয়ামতের দিবসে—যে দিবসের ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই—যখন আল্লাহ তাআলা সকল মানুষকে জমা করবেন, একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা দেবে, যে ব্যক্তি তার আমলের ভিতর অন্য কাউকে শরিক করেছে, সে যেন তার সওয়াব আল্লাহ তাআলা ছাড়া যাকে শরিক করেছে তার কাছ থেকে চেয়ে নেয়। কারণ, আল্লাহ তাআলা সমস্ত শরিকদের থেকে অমুখাপেক্ষী।'১
একজন বান্দা হিসেবে সকলের জন্য জরুরি—এবাদত বিষয়ে আন্তরিকতার প্রতি গুরুত্বারোপ করা এবং সেভাবে আল্লাহ তাআলার প্রাপ্য আদায় করা, এর বিপরীত অর্থাৎ শিরক হতে বিরত থাকা।
তৃতীয় অধিকার: আল্লাহ তাআলার আদেশসমূহ পালন করা ও নিষোধাবলী পরিহার করা :—
বান্দার উপর আল্লাহ তাআলার সবচেয়ে বড় হক হল, তার আদেশ বাস্তবায়ন ও নিষেধ পরিহার করার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার অর্থবহ আনুগত্য করা। আল্লাহ তাআলা বলেন— يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَلَا تُبْطِلُوا أَعْمَالَكُمْ ﴿سورة محمد : ৩৩﴾ 'হে মোমিনগণ! তোমরা আল্লাহ তাআলার আনুগত্য কর, রাসূলের আনুগত্য কর এবং নিজেদের কর্ম বিনষ্ট কর না।' আরো বলেন— وَاتَّقُوا النَّارَ الَّتِي أُعِدَّتْ لِلْكَافِرِينَ ﴿১৩১﴾ وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ. (سورة آل عمران : ১৩১-১৩২) 'এবং তোমরা সে আগুন থেকে বেঁচে থাক, যা কাফেরদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। আর তোমরা আল্লাহ তাআলা ও তার রাসূল সা.-এর আনুগত্য কর, যাতে তোমাদের উপর রহমত নাজিল করা হয়।'২ আরো এরশাদ হচ্ছে— قُلْ أَطِيعُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ فَإِنْ تَوَلَّوْا فَإِنَّ اللهَ لَا يُحِبُّ الْكَافِرِينَ. (سورة آل عمران: ৩২) ‘বলুন, আল্লাহ তাআলা ও রাসূলের আনুগত্য কর। বস্তুত যদি তারা বিমুখতা অবলম্বন করে, তাহলে আল্লাহ তাআলা কাফেরদেরকে ভালোবাসেন না।’১ আরো বলেন— وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَاحْذَرُوا فَإِنْ تَوَلَّيْتُمْ فَاعْلَمُوا أَنَّمَا عَلَى رَسُولِنَا الْبَلَاغُ الْمُبِينُ. (سورة المائدة : ৯২) ‘তোমরা আল্লাহ তাআলার অনুগত হও এবং রাসূল সা.-এর অনুগত হও এবং আত্মরক্ষা কর। কিন্তু যদি তোমরা বিমুখ হও তবে জেনে রাখ, আমার রাসূলের দায়িত্ব প্রকাশ্য প্রচার বৈ নয়।’২ আরো বলেন— وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ يُدْخِلْهُ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ وَمَنْ يَتَوَلَّ يُعَذِّبُهُ عَذَابًا أَلِيمًا. (سورة الفتح: ১৭) ‘যে আল্লাহ তাআলা ও তার রাসূলের আনুগত্য করবে তাকে তিনি জান্নাতে দাখিল করবেন, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত হয়। পক্ষান্তরে যে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করবে তাকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দেবেন।’৩ আরো বলেন— وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُبِينًا. (سورة الأحزاب : ৩৬) ‘আল্লাহ তাআলা ও তার রাসূল কোন কাজের আদেশ করলে কোন ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারীর সে বিষয়ে ভিন্ন ক্ষমতা নেই। যে আল্লাহ তাআলা ও তার রাসূলের আদেশ অমান্য করে সে প্রকাশ্য পথভ্রষ্টতায় পতিত হয়।’৪
হে মুসলিম সম্প্রদায়, আমাদের সকলের জন্য একান্ত জরুরি আগ্রহভরে ও যত্নসহকারে আল্লাহ তাআলার এ সমস্ত হক আদায় করা। যাতে আমাদের ভিতর প্রকৃত মোমিনের গুনাবলী বদ্ধমূল হয়। যাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন— وَقَالُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا غُفْرَانَكَ رَبَّنَا وَإِكَلَيْكَ الْمَصِيرُ. (سورة البقرة : ২৮৫) 'তারা বলে, আমরা শুনেছি এবং কবুল করেছি। আমরা তোমার ক্ষমা চাই, হে আমাদের পালনকর্তা। তোমারই দিকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে।'১
চতুর্থ অধিকার: আল্লাহ তাআলাকে সম্মান প্রদর্শন ও তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা:—
বান্দার পক্ষ হতে আল্লাহ তাআলার অন্যতম প্রাপ্য অধিকার সম্মান, শ্রদ্ধা ও মর্যাদা। যা কয়েক ভাবে প্রদান করা যায়।
১. আল্লাহ তাআলাকে দোষ-ত্রুটিমুক্ত বলে বিশ্বাস করা। মর্যাদাপূর্ণ ও পরিপূর্ণ গুণে গুণান্বিত মনে করা। যেভাবে তিনি নিজেকে কুরআনে গুণান্বিত করেছেন অথবা যেভাবে তার রাসূল সা. হাদিসে সম্বোধন করেছেন।
২. তার আদেশ ও নিষেধাবলীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা। তার বর্ণিত সীমারেখার ভিতর স্বীয় জীবন পরিচালনা করা। আল্লাহ তাআলা বলেন— وَمَنْ يُعَظِّمْ حُرُمَاتِ اللَّهِ فَهُوَ خَيْرٌ لَهُ عِنْدَ رَبِّهِ. (سورة الحج : ৩০) 'আর কেউ আল্লাহ তাআলার সম্মানযোগ্য বিধানাবলীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করল, পালনকর্তার নিকট তা তার জন্যে উত্তম।'২ আরো বলেন— وَمَنْ يُعَظِّمْ شَعَائِرَ اللَّهَ فَإِنَّهَا مِنْ تَقْوَى الْقُلُوبِ. (سورة الحج : ৩২) 'আর যে আল্লাহ তাআলার নামযুক্ত বস্তুসমূহের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করল, তা তো তার হৃদয়ের আল্লাহ ভীতি প্রসূত।'৩
আল্লাহ তাআলাকে সম্মান প্রদর্শন করা, তার নিদর্শনাবলীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা এবং তার বর্ণিত সীমারেখার ভিতর জীবন পরিচালনা করাই অনুসরণীয় অগ্র-পথিক সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন, তাবে তাবেঈন এবং তাদের পরবর্তী নেককার লোকদের আদর্শ ছিল।
পঞ্চম অধিকার: আল্লাহ তাআলাকে মহব্বত করা, তার নিকট আশা করা এবং তাকে ভয় করা
আল্লাহ তাআলা তার বান্দাদের এবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন। এরশাদ হচ্ছে— وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ ﴿৫৬﴾ مَا أُرِيدُ مِنْهُمْ مِنْ رِزْقٍ وَمَا أُرِيدُ أَنْ يُطْعِمُونِ ﴿৫৭﴾ إِنَّ اللَّهَ هُوَ الرَّزَّاقُ ذُو الْقُوَّةِ الْمَتِينُ. (سورة الذاريات: ৫৬-৫৮) 'আমি তাদের কাছে জীবিকা চাই না এবং এও চাই না যে তারা আমাকে আহার্য জোগাবে। আল্লাহ তাআলাই তো জীবিকা শক্তির আধার, পরাক্রান্ত।'১ বর্ণিত তিনটি মূল ভিত্তির উপর আল্লাহ তাআলার এবাদত নির্ভরশীল। অর্থাৎ ১. মহব্বত। ২. আশা। ৩. ভয়।
ষষ্ঠ অধিকার: নেয়ামতের মোকাবিলায় তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা :— আল্লাহ তাআলার অগণিত ও অসংখ্য নেয়ামত নিরবচ্ছিন্নভাবে তার বান্দার উপর বর্ষিত হচ্ছে, যেমন-সৃষ্টির নেয়ামত, ধন-সম্পদের নেয়ামত, ইসলামের নেয়ামত, পানির নেয়ামত, বাতাসের নেয়ামত, বিবেক, শরীর, স্ত্রী ও সন্তানদের সুস্থতার নেয়ামত। তাই বান্দাদের উচিত এ নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা। যা তিনটি পদ্ধতি অনুসরণ করলে সুচারুরূপে আদায় করা যায়।
১. নেয়ামতের স্বীকারোক্তি প্রদানমূলক কৃতজ্ঞতাসহ তা গ্রহণ করা। অর্থাৎ বান্দা একনিষ্ঠ ও আন্তরিক ভাবে স্বীকার করবে যে আল্লাহ তাআলা স্বীয় দয়া ও মেহেরবাণীতে এ নেয়ামত দান করেছেন। এরশাদ হচ্ছে— وَمَا بِكُمْ مِنْ نِعْمَةٍ فَمِنَ اللَّهِ ثُمَّ إِذَا مَسَّكُمُ الضُّرُّ فَإِلَيْهِ تَجْأَرُونَ. (سورة النحل : ৫৩) 'তোমাদের কাছে যে সমস্ত নেয়ামত আছে তা আল্লাহরই পক্ষ থেকে।'২ সুতরাং স্বীয় প্রয়োজন, চাহিদা ও অভাববোধসহ আগ্রহভরে আল্লাহর নেয়ামত গ্রহণ করা এবং এর থেকে উপকৃত হওয়া।
২. দান-সদকা পোশাক-আশাক ও বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার নেয়ামতের বহি:প্রকাশ করা এবং তার প্রশংসা। অর্থাৎ বান্দা আল্লাহ তাআলার নিয়ামতের আলোচনা করবে। তার দয়ার প্রতিফলন এ নেয়ামতরাজি-সর্বদা মনে করবে। এরশাদ হচ্ছে— وَأَمَّا بِنِعْمَةِ رَبِّكَ فَحَدَّثْ. (سورة الضحى: ১১) 'আর আপনার পালনকর্তার নেয়ামতের কথা প্রকাশ করুন।'১ আরো মনে প্রাণে বিশ্বাস রাখবে আল্লাহ তাআলা দানশীল, অনুগ্রহকারী, রহমশীল ও দয়ালু।
৩. আল্লাহ তাআলার পছন্দনীয় জায়গায় নেয়ামত ব্যবহার করবে। অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার নির্দেশিত জায়গায় নেয়ামতের ব্যবহার সুবর্ণ সুযোগ মনে করবে। শরিয়ত-নিষিদ্ধ জায়গায় অপচয় করা হতে বিরত থাকবে। কারণ, এটা নাফরমানি, অকৃতজ্ঞা। যা শরিয়ত কিংবা বিবেক দ্বারা কোনভাবেই সমর্থন যোগ্য নয়।
সপ্তম অধিকার: তাকদীর মেনে নেয়া এবং তার উপর সন্তুষ্ট থাকা:— আল্লাহ তাআলা কতিপয় বান্দাদের মুসিবতের মাধ্যমে অথবা নেয়ামতের মাধ্যমে কিংবা উভয়ের মাধ্যমে পরীক্ষা করেন—এরশাদ হচ্ছে— وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ حَتَّى نَعْلَمَ المُجَاهِدِينَ مِنْكُمْ وَالصَّابِرِينَ وَنَبْلُوَ أَخْبَارَكُمْ. (سورة محمد : ৩১) 'আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব যে পর্যন্ত না ফুটিয়ে তুলি তোমাদের জেহাদকারীদের এবং সবরকারীদের এবং যতক্ষণ না আমি তোমাদের অবস্থানসমূহ যাচাই করি।'২ এরশাদ হচ্ছে— وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنْفُسِ وَالثَّمَرَاتِ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ. (سورة البقرة : ১৫৫) 'এবং আমি অবশ্যই তোমাদিগকে পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, মাল ও জানের ক্ষতি ও ফল-ফসলের বিনষ্টের মাধ্যমে। তবে সুসংবাদ দাও ধৈর্য্য অবলম্বনকারীদের।'৩
পরীক্ষামূলক এ সমস্ত মুসিবতের মোকাবিলায় বান্দার উচিত ধৈর্যধারণ করা ও তাকদীরকে মেনে নেয়া। যেহেতু আল্লাহ তাআলা এ নির্দেশ-ই প্রদান করেছেন। এরশাদ হচ্ছে— يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اصْبِرُوا وَصَابِرُوا وَرَابِطُوا . ( سورة آل عمران: ২০০) 'হে ইমানদারগণ! ধৈর্যধারণ কর এবং মোকাবিলায় দৃঢ়তা অবলম্বন কর।'৪

টিকাঃ
১ সূরা লোকমান: ২০।
২ সূরা ইবরাহিম: ৩৪।
৩ সূরা নাহাল: ১৮।
৪ সূরা বনী ইসরাইল: ১০২
১ সূরা আন নাযিআত: ২৪
২ সূরা আল কাসাস: ৩৮
৩ সূরা আন নামল: ১৪
৪ সূরা বনী ইসরাইল: ১০২
১ সূরা আল বাক্বারা: ১৬৩
২ সূরা ইউসুফ: ৩৯-৪০
৩ সূরা আল ফুরকান-৩
৪ সূরা আল আরাফ: ১৯১-১৯২
১ সূরা আয যুখরুফ: ৮৭
২ সূরা ইউনুস: ৩১
১. সূরা আল আরাফ-১৮০
২. সূরা আশ শুরা: ১১
৩. সূরা আয যুমার: ২।
৪. সূরা আল আনআম-১৬১-১৬২।
১ বোখারি ও মুসলিম
১ হাদিসটি ইমাম তিরমিজি রহ. বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন হাসান গরিব
১ সূরা আলে ইমরান-৩২
২ সূরা আল মায়েদা: ৯২
৩ সূরা আল ফাতাহ: ১৭
৪ সূরা আল আহযাব: ৩৬
১ সূরা আল বাক্বারা: ২৮৫
২ সূরা হজ: ৩০
৩ সূরা আল হাজ্জ: ৩২
১ সূরা আয যারিয়াতঃ ৫৬-৫৮
২ সূরা আন নাহল-৫৩
১ সূরা দোহা: ১১
২ সূরা মোহাম্মদ: ৩১
৩ সূরা আল বাক্বারা: ১৫৫
৪ সূরা আলে ইমরান-২০০

📘 তাওহীদ ও আকাইদ 📄 ব্যাখ্যাকারকের ভূমিকা

📄 ব্যাখ্যাকারকের ভূমিকা


তাওহীদের সংজ্ঞা তওহিদ: আল্লাহ তাআলা মানুষের জন্য এক ও একক সর্বাধিপতি প্রতিপালক। তিনি রাজত্ব, সৃষ্টি, ধন-সম্পদ ও কর্তৃত্বের অধিপতি। এতে কোন অংশীদার নেই। এককভাবে তিনিই প্রভু। এবাদত, আনুগত্য, আশা-ভরসা, সাহায্য ও ফরিয়াদের ক্ষেত্রে অন্য কাউকে তার সাথে অংশীদার করা জায়েজ নেই। তিনি সুন্দর নামসমূহ ও মহান গুণাবলির অধিকারী, তাঁর সদৃশ কোন জিনিস নেই। তিনি সর্ব-শ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা।
তাওহীদের মর্যাদা ও আলামত ১. তওহিদ আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভ ও তাঁর আনুগত্যের সর্বোত্তম ও সর্ব শ্রেষ্ঠ পদ্ধতি। এ তাওহীদের বার্তা দিয়েই তিনি রাসূলদের প্রেরণ করেছেন এবং এর ব্যাখ্যার জন্য কিতাব অবতীর্ণ করেছেন। এরশাদ হচ্ছে— كِتَابٌ أَنْزَلْنَاهُ إِلَيْكَ لِتُخْرِجَ النَّاسَ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ. (سورة إبراهيم: ১) 'এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাজিল করেছি—যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন।'১ অর্থাৎ শিরকের অন্ধকার হতে তাওহীদের আলোতে।
২. তিনি তাওহীদের পরীক্ষা নেয়ার লক্ষ্যে জিন জাতি, মানবজাতি, ইহকাল- পরকাল, জান্নাত-জাহান্নাম সৃষ্টি করেছেন। যে এ তাওহীদ গ্রহণ করবে সে সৌভাগ্যবান, চিরসুখী। আর যে তাওহীদ প্রত্যাখ্যান করবে সে হতভাগা, চির দুঃখী।
৩. তাওহীদ বিহীন আমল যত বড় কিংবা যত ভালই হোক—অগ্রাহ্য, পরিত্যক্ত ও মূল্যহীন। এরশাদ হচ্ছে— وَلَوْ أَشْرَكُوا لَحَبِطَ عَنْهُمْ مَا কَانُوا يَعْمَلُونَ. (سورة الأنعام: ৮৮) 'যদি তারা শিরক করত, তবে তাদের কাজকর্ম তাদের জন্যে ব্যর্থ হয়ে যেত।'১
৪. নবী-রাসূলগণ তাওহীদের অনুশীলন, বাস্তবায়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে কষ্ট সহ্য করেছেন, তাদের অনুসারীগণ পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন। কেউ নিজের প্রাণ উৎসর্গ করেছেন। কেউ ত্যাগ করেছেন নিজের ধন-সম্পদ ও ইজ্জত ও মান-সম্ভ্রম। কেউ তার প্রয়োজনীয় আহার হতে বঞ্চিত হয়েছেন। কেউ বিসর্জন দিয়েছেন আল্লাহ তাআলার রাস্তায় নিজের আত্মমর্যাদা পর্যন্ত। কেউ স্বীয় দেশ ত্যাগে বাধ্য হয়েছেন... ইত্যাদি।
তাওহীদের নিদর্শন বা আলামত যেহেতু অনন্য সাধারণ বৈশিষ্ট্য মণ্ডিত তাওহিদ—কল্যাণকর, হিতকর ও সুউচ্চ স্থানের অধিকারী সেহেতু তার আল্লাহ প্রদত্ত বিস্তৃত কল্যাণ, প্রচুর সুফল ও অনেক উপকার দুনিয়া-আখেরাত তথা উভয় জগতে মোহনীয়, আকর্ষণীয় ও লোভনীয়। নিম্নে প্রধান প্রধান কতিপয় সুফলের নমুনা তুলে ধরা হল:—
প্রথমত: দুনিয়াবী সুফল : তাওহীদের বদৌলতে আমরা বিস্তর-বেহিসাব, সুফল-কল্যাণ অর্জন করে থাকি। তার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ নিম্নরূপ:
১. তাওহিদ মানে সত্য ও সততাকে আঁকড়ে ধরে ন্যায় ও ইনসাফের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা। সঠিক ও সরল পথে পরিচালিত হওয়া। মূর্খতা, কুসংস্কার, ধারণাব্রতীতা ও ভ্রান্তির উর্ধ্বে থাকা। এরশাদ হচ্ছে— ذَلِكَ بِأَنَّ اللَّهَ هُوَ الْحَقُّ وَأَنَّ مَا يَدْعُونَ مِنْ دُونِهِ الْبَاطِلُ. (سورة لقمان: ৩০) 'এ দ্বারাাই প্রমাণ যে, আল্লাহ তাআলাই সত্য এবং আল্লাহ তাআলা ব্যতীত তারা যাদের পূজা করে সব মিথ্যা।'২
২. তাওহিদ মানে জান-মালের পূর্ণ নিরাপত্তা অর্জন করা। অবৈধভাবে কারো উপর অত্যাচার বা সীমা-লঙ্ঘন করা হতে সম্পূর্ণ রূপে বিরত থাকা। রাসূল সা. বলেন— أمرت أن أقاتل الناس حتى يقولوا لا إله إلا الله، فإذا قالوها عصموا مني دماءهم وأموالهم إلا بحقها. 'আমি মানুষের সাথে জেহাদ করার জন্য আদিষ্ট হয়েছি—যতক্ষণ পর্যন্ত তারা لا إله إلا الله না বলবে। যখন তারা لا إله إلا الله বলবে, আমার থেকে তাদের জান- মাল নিরাপদ করে নিবে। তবে শরিয়তের বিধি মোতাবেক— শাস্তির উপযুক্ত হলে ভিন্ন কথা।'
৩. তাওহিদ মানে উৎকৃষ্ট জীবন ও প্রভূত কল্যাণ অর্জন করা। এরশাদ হচ্ছে— مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً. (سورة النحل : ৯৭) 'যে সৎকর্ম সম্পাদন করে সে ঈমানদের পুরুষ হোক বা নারী আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করব।'১
পক্ষান্তরে তাওহিদ প্রত্যাখ্যান করে যে নিমজ্জিত থাকে শিরকের অন্ধকারের অতল গহবরে—সে খুবই ভাগ্যহত, আল্লাহ তাআলার রহমত হতে বিতাড়িত এবং সংকীর্ণতার দুর্বিষহ জীবন যাপনে বাধ্য। এরশাদ হচ্ছে— وَمَنْ أَعْرَضَ عَنْ ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنْكًا وَنَحْشُرُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَعْمَى . (سورة طه : ১২৪) 'এবং যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে, তার জীবিকা সংকীর্ণ হবে এবং আমি তাকে কেয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করব।'২
৪. তাওহিদ মানে সাম্য-মৈত্রী ও ন্যায়-ইনসাফের বাস্তব অনুশীলন। কারণ তাওহিদ অনুসারীদের সামনে থাকে এক পরম ও অভীষ্ট লক্ষ, মহৎ উদ্দেশ্য—যার জন্য সে দুর্গম পথ অতিক্রম করছে। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ও তায়ালার অপার সান্নিধ্য। তদুপরি তার থাকে সঠিক ও নির্ভুল দিক নির্দেশনা যার উপর দিয়ে সে নির্বিঘ্নে পথ চলে; অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার কিতাব, রাসূল সা. এর সুন্নত। সে উভয়ের মাঝে সামঞ্জস্য বিধান করে পারংগমতার সাথে স্বীয় ব্রত পালন করে। এরশাদ হচ্ছে— إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللهِ أَتْقَاكُمْ. (الحجرات : ১৩) 'নিশ্চয় আল্লাহ তাআলার নিকট সে-ই সর্বাধিক সম্ভ্রান্ত যে সর্বাধিক পরহেজগার।'৩ রাসূল সা. বলেন— إِنَّ اللَّهَ لَا يَنْظُرُ إِلَى صُوَرِكُمْ وَأَجْسَامِكُمْ، وَلَكِنْ يَنْظُرُ إِلَى قُلُوبِكُمْ وَأَعْمَالَكُمْ. 'আল্লাহ তাআলা তোমাদের চেহারা ও শরীর পর্যবেক্ষণ করেন না। তিনি পর্যবেক্ষণ করেন তোমাদের অন্তর ও আমল সমূহ।'
৫. তাওহিদ মানে মানুষকে মানুষের দাসত্ব হতে মুক্ত ও স্বাধীন করা। কারণ তাওহিদ বা একত্ববাদ-এর অর্থ একমাত্র আল্লাহ তাআলার বশ্যতা, অধীনতা ও দীনতা স্বীকার করা। তার সৃষ্টি জীবের আনুগত্য ও পূজ্যতা পরিহার করা। তদুপরি তাওহিদ মানুষের বিবেক-বুদ্ধি ও বোধশক্তিকে বিশ্বজগৎ ও এর ভিতর সৃষ্ট যাবতীয় বস্তু-জীব-উদ্ভিদ সম্পর্কে মুশরিক বা পৌত্তলিকদের আবিষ্কৃত-অনুসৃত কুসংস্কার ও বানোয়াট কল্প-কাহিনী হতে মুক্ত ও পরিশুদ্ধ করে। মানুষের চিত্ত ও চেতনাকে পরাক্রমশালী আল্লাহ ব্যতীত সকলের সামনে হীনতা নীচতা ও আত্মসমর্পণ হতে বিরত রাখে। সর্বোপরি মানুষের জীবন চক্রকে সীমা-লঙ্ঘনে অভ্যস্ত, প্রভুত্বের দাবিদার ও নববী আহবানের সাথে যুদ্ধ ঘোষণাকারীদের আধিপত্য হতে মুক্ত করে।
৬. তাওহিদ মানে ভারসাম্যপূর্ণ পরিশীলিত, পরিমার্জিত ব্যক্তিত্ব গঠন করা। কারণ তাওহিদ সৃষ্টি কুলের সামনে এমন এক লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও গন্তব্য নির্দিষ্ট করে দিয়েছে-যা আল্লাহমুখী ও তার সন্তুষ্টির জিম্মাদার। তাওহিদে বিশ্বাসী ব্যক্তি মন-মস্তিষ্ক ও সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে এ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে-যা তার অন্তরে প্রশান্তি, হৃদয়ে অবিচলতা ও আত্মায় অনাবিল সুখ সযত্নে নিয়ে আসে। পক্ষান্তরে মূর্তিপূজকদের উপাস্য-হাজারো প্রভু তাদের অন্তরসমূহকে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন বহুধা বিভক্ত করে রাখে। তারা সর্বদাই নানান পদ্ধতিতে তাদের উপাস্য-প্রভুদের সন্তুষ্ট করার নিমিত্তে কিংকর্তব্যবিমূঢ় থাকে। আল্লাহ তাআলা ইউসুফ আ.-এর উপদেশ উল্লেখ করেন— يَا صَاحِبَي السِّجْنِ أَأَرْبَابٌ مُتَفَرِّقُونَ خَيْرٌ أَمِ اللهُ الْوَاحِدُ الْقَهَّارُ. (سورة يوسف: ৩৯) 'হে কারাগারের সঙ্গীরা! পৃথক পৃথক অনেক উপাস্য ভাল, না পরাক্রমশালী এক আল্লাহ?” অন্যত্র বলেন— ضَرَبَ اللَّهُ مَثَلًا رَجُلًا فِيهِ شُرَكَاءُ مُتَشَاكِسُونَ وَرَجُلًا سَلَمَا لِرَجُلٍ هَلْ يَسْتَوِيَانِ مَثَلًا الْحَمْدُ اللَّهُ بَلْ أَكْثَرُهُمْ لَا يَعْلَمُونَ. (سورة الزمر : ২৯) 'আল্লাহ তাআলা এক দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন: এক লোকের উপর বিরোধী ক'জন মালিক রয়েছে, আরেক ব্যক্তির প্রভু মাত্র একজন—তাদের উভয়ের অবস্থা কি সমান? সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার। কিন্তু তাদের অধিকাংশই জানে না।'১
৭. তাওহিদ আস্থাশীল দৃঢ় অন্তকরণ তৈরি করে। কারণ, তাওহিদ কানায় কানায় পূর্ণ করে দেয় মানুষের অন্তকরণকে আল্লাহ তাআলার আস্থা ও তার উপর নির্ভরতা দ্বারা। সে তার নিঃসঙ্গতা ও গোপনীয়তায় একমাত্র আল্লাহ তাআলা ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করে না। যেহেতু সে জানে আল্লাহ তাআলা ছাড়া এ বিশ্ব পরিমণ্ডলে কেউ হস্তক্ষেপের অধিকার রাখে না। কিংবা উপকার বা অপকার কিছুই করতে পারে না। আল্লাহ তাআলা ছাড়া মানবজাতি যাদের এবাদত-উপাসনা করে তারা স্বয়ং নিজেদের লাভ ক্ষতির যোগ্যতা রাখে না। অন্যদের কল্যাণ-অকল্যাণ করার কোন প্রশ্নই আসে না। আল্লাহ তাআলার ওলীগণ নির্বিঘ্ন অন্তর ও আস্থাশীলতার অধিকারী হয়ে থাকেন, যার বাস্তব নমুনা আল্লাহ তাআলার নবী নূহ আ.। তিনি তার সম্প্রদায়কে বলেছেন— يَا قَوْمِ إِنْ كَانَ كَبُرَ عَلَيْكُمْ مَقَامِي وَتَذْكِيرِي بِآيَاتِ اللهَ فَعَلَى আল্লাহ তাআলারর উপর ভরসা করছি। এখন তোমরা সবাই মিলে নিজেদের কর্ম সাব্যস্ত কর এবং এতে তোমাদের শরিকদেরকে সমবেত করে নাও। যাতে তোমাদের মাঝে নিজেদের কাজের ব্যাপারে কোন সন্দেহ-সংশয় না থাকে। অতঃপর আমার সম্পর্কে যা কিছু করার করে ফেল এবং আমাকে অবকাশ দিয়ো না।'২
এর উত্তম নমুনা আল্লাহ তাআলার নবী ইব্রাহীম আ.। যখন তার সম্প্রদায় মূর্তি নিয়ে সংঘটিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাকে শাসাচ্ছিল ও ভীতি প্রদর্শন করছিল। তখন তিনি বলেছেন— وَلَا أَخَافُ مَا تُشْرِكُونَ بِهِ إِلَّا أَنْ يَشَاءَ رَبِّي شَيْئًا وَسِعَ رَبِّي كُلَّ شَيْءٍ عِلْمًا أَفَلَا تَتذَكَّرُونَ ﴿৮০﴾ وَكَيْفَ أَخَافُ مَا أَشْرَكْتُمْ وَلَا تَخَافُونَ أَنَّكُمْ أَشْرَكْتُمْ بِاللَّهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِهِ عَلَيْكُمْ سُلْطَانًا فَأَيُّ الْفَرِيقَيْنِ أَحَقُّ بِالْأَمْنِ إِنْ كُنتُمْ تَعْلَمُونَ ﴿৮১﴾ الَّذِينَ آمَنُوا وَلَمْ يَلْبِسُوا إِيمَانَهُمْ بِظُلْمٍ أُولَئِكَ هُمُ الْأَمْنُ وَهُمْ مُهْتَدُونَ. (سورة الأنعام: ৮০-৮২) 'তোমরা যাদেরকে শরিক কর, আমি তাদেরকে ভয় করি না—তবে আমার পালনকর্তাই যদি ভিন্ন কিছু ইচ্ছা করেন (তবে ভিন্ন কথা)। আমার পালনকর্তাই প্রত্যেক বস্তুকে স্বীয় জ্ঞান দ্বারা বেষ্টন করে আছেন। তোমরা কি চিন্তা কর না? যাদেরকে তোমরা আল্লার তাআলার সাথে শরিক করে রেখেছ, তাদেরকে কীরূপে ভয় করব, অথচ তোমরা ভয় করোনা যে তোমরা আল্লাহ তাআলার সাথে এমন বস্তুকে শরিক করছ, যাদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা তোমাদের জন্য কোন প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি। অতএব, উভয় সম্প্রদায়ের মাঝে শান্তি লাভের অধিক যোগ্য কে, যদি তোমরা জ্ঞানী হয়ে থাক? যারা ঈমান আনে এবং স্বীয় বিশ্বাসকে শেরেকীর সাথে মিশ্রিত করে না, তাদের জন্যই শান্তি এবং তারাই সুপথগামী।'১ আরো নমুনা নবী হুদ আ.। যখন তাকে বলা হয়েছিল— إِنْ نَقُولُ إِلَّا اعْتَرَاكَ بَعْضُ آلِهَتِنَا بِسُوءٍ. (سورة هود: ৫৪) 'বরং আমরা তো বলি যে আমাদের কোন দেবতা তোমার উপরে শোচনীয় ভূত চাপিয়ে দিয়েছে।'২ তিনি এর উত্তরে বলেন— إِنِّي أُشْهِدُ اللهَ وَاشْهَدُوا أَنِّي بَرِيءٌ مِمَّا تُشْرِكُونَ ﴿৫৪﴾ مِنْ دُونِهِ فَكِيدُونِي جَمِيعًا ثُمَّ لَا تُنْظِرُونِ ﴿৫৫﴾ إِنِّي تَوَكَّلْتُ عَلَى اللهِ رَبِّي وَرَبِّكُمْ مَا مِنْ دَابَّةٍ إِلَّا هُوَ آخِذٌ بِنَاصِيَتِهَا إِنَّ رَبِّي عَلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ ﴿سورة هود: ৫৪-৫৬﴾ 'হুদ বললেন— আমি আল্লাহ তাআলাকে সাক্ষী করেছি আর তোমরাও সাক্ষী থাক যে, আমার কোন সম্পর্ক নাই তাদের সাথে যাদেরকে তোমরা শরিক করছ: তাকে ছাড়া, তোমরা সবাই মিলে আমার অনিষ্ট করার প্রয়াস চালাও, অতঃপর আমাকে কোন অবকাশ দিয়ো না। আমি আল্লাহ তাআলার উপর নিশ্চিত ভরসা করেছি যিনি আমার এবং তোমাদের পরওয়ারদেগার। পৃথিবীর বুকে বিচরণকারী এমন কোন প্রাণী নেই যা তার পূর্ণ আয়ত্তাধীণ নয়। আমার পালনকর্তার সরল পথে সন্দেহ নেই।
দ্বিতীয়ত: পরকালীন সুফল: যার প্রধান প্রধান কতিপয় শুভ পরিণাম নিম্নে তুলে ধরা হল:
১. তওহিদ মানে জান্নাতে প্রবেশাধিকার ও জাহান্নাম হতে মুক্তির নিশ্চয়তা: যে তাওহীদের উপর মৃত্যু বরণ করবে এবং যার নেকির পাল্লা গুনাহের পাল্লা হতে ভারী হবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। এরশাদ হচ্ছে— وَالْوَزْنُ يَوْمَئِذٍ الْحَقُّ فَمَنْ ثَقُلَتْ مَوَازِينُهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ (سورة الأعراف: ৮) 'আর সে দিন যথার্থই ওজন করা হবে। অতঃপর যাদের পাল্লা ভারী হবে তারাই সফলকাম হবে।'২
তাওহীদের উপর মারা যাওয়ার পরেও যে ব্যক্তির গুনাহের পাল্লা ভারী হবে, সে আল্লাহ তাআলার ইচ্ছাধীন। চাইলে নিরেট মেহেরবাণী দ্বারা তাকে মাফ করে দিতে পারেন। অথবা তারই অনুমতিতে কোন সন্তুষ্ট ভাজনের সুপারিশের মাধ্যমে জান্নাতে প্রবেশ করাতে পারেন। আর চাইলে তাকে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত করতে পারেন, যাতে সে গুনাহ থেকে পাক-সাফ হতে পারে। অতঃপর সে জাহান্নাম হতে বেরিয়ে আসবে। সেখানে স্থায়ীভাবে অবস্থান করবে না। বরং জান্নাতে প্রবেশ করবে। অনুরূপ ভাষ্যই শাফায়াতের হাদিসে পাওয়া যায়। রাসূল সা. বলেন— فأقول : يارب ائذن لي في من قال لا إله إلا الله، قال: ليس ذلك لك، أو قال: ليس ذاك إليك ولكن وعزتي وكبريائي وعظمتي لأخرجن من قال لا إله إلا الله. "আমি বলব, হে আমার রব, যারা لا إله إلا الله বলেছে তাদের ব্যাপারে আমাকে সুপারিশ করার অনুমতি দিন। আল্লাহ তাআলা বলবেন, এ কাজ তোমার নয় বা তাদের ব্যাপার নিয়ে তোমার চিন্তা করতে হবে না। তবে আমার ইজ্জত, অহমিকা ও বড়ত্বের শপথ, যারা لا إله إلا الله বলেছে তাদেরকে অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করাব।
তাওহীদের বিপরীত হচ্ছে শিরক: শিরক মুশরিক কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জান্নাতে প্রবেশ করার পথ রুদ্ধ করে দেয়। সে স্থায়ীভাবে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। সে যত আমল সম্পাদন করুক তার কোনো কাজে আসবে না। এরশাদ হচ্ছে— إِنَّهُ مَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنْصَارٍ. (سورة المائدة : ৭২) 'নিশ্চয় যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার সাথে অংশীদার স্থির করে, আল্লাহ তাআলা তার জন্যে জান্নাত হারাম করে দেন এবং তার বাসস্থান হয় জাহান্নাম। অত্যাচারীদের কোন সাহায্যকারী নেই।'১ আয়েশা রা. এর হাদিসে এসেছে, তিনি বলেন— قلت يا رسول الله! ابن جدعان كان في الجاهلية يصل الرحم ويطعم المسكين فهل ذلك نافعه؟ قال: (لا ينفعه، إنه لم يقل يوما : رب اغفر لي خطيئتي يوم الدين.)
'আমি বলেছি হে আল্লাহর রাসূল সা. ইবনে জাদআন ইসলাম পূর্বযুগে— জাহিলিয়াতে— আত্মীয়তার বন্ধন প্রতিষ্ঠিত করতো, অভাব গ্রস্তদের খাদ্য প্রদান করতো, এর দ্বারা কি সে উপকৃত হবে? তিনি উত্তর দিলেন: এ আমলগুলো তাকে কোন উপকৃত করতে পারবে না। যেহেতু সে কোন দিন বলেনি, رب اغفر لي خطيئتي يوم الدين )হে আমার রব! কেয়ামতের দিন আমার গুনাহ মাফ কর।(
২. তাওহীদের বদৌলতে নেক কাজের মূল্যায়ন ও গ্রহণযোগ্যতা মিলে : তাওহিদ দ্বীন বা ধর্মের মূল ভিত্তি এবং ঐ মূল স্তম্ভ যার উপর মিল্লাত বা ধর্মের গোড়াপত্তন হয়েছে। যে ব্যক্তি কেয়ামতের দিন তাওহিদ নিয়ে আসবে তার অন্যান্য আমলের মূল্যায়ন করা হবে। আর যে তাওহিদসহ আসতে পারবে না, তার সমস্ত আমল বিনষ্ট হবে এবং তা অস্তিত্বহীন গণ্য করা হবে। এরশাদ হচ্ছে— وَلَوْ أَشْرَكُوا لَحَبِطَ عَنْهُمْ مَا কَانُوا يَعْمَلُونَ. (سورة الأنعাম: ৮৮) 'যদি তারা শিরক করে, তবে তাদের কাজকর্ম তাদের জন্যে ব্যর্থ হয়ে যাবে।'২
৩. তাওহীদের ফলে গুনাহ মাফ ও অপরাধ মোচন হয়: যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের নিকট নির্ভেজাল তাওহিদ ও শিরকের দূরতম সম্পর্ক মুক্ত খাটি আমল নিয়ে আসবে— তার সমস্ত পাপ মোচন করা হবে। তার সকল অপরাধ মাফ করা হবে। আল্লাহ তাআলা হাদিসে কুদসীতে বলেন— يا ابن آدم لو أتيتني بقراب الأرض خطايا، ثم لقيتني لا تشرك بي شيئا لأتيك بقرابها مغفرة. 'হে আদম সন্তান তুমি যদি দুনিয়ার সমতুল্য পাত্রপূর্ণ অপরাধ নিয়ে আমার কাছে আস, অতঃপর আমার সঙ্গে কোন জিনিসকে শরীক করা থেকে মুক্ত হয়ে আমার সাথে সাক্ষাৎ কর, আমি দুনিয়ার সমতুল্য পাত্রপূর্ণ ক্ষমা নিয়ে তোমার নিকট উপস্থিত হব।'
তদ্রুপ সুসংবাদ এসেছে আমলনামা সংক্রান্ত হাদিসে, যে টিকেটে لا إله إلا الله অর্থাৎ কালেমায়ে তাওহিদ থাকবে সে টিকেটটি ওজনের পাল্লাতে গুনাহের নিরানব্বইটি নথিপত্রের উপর ভারী হবে। প্রত্যেকটি নথিপত্রের দৈর্ঘ্য হবে দৃষ্টি সীমা পর্যন্ত।
তাওহীদের প্রকার: ওলামায়ে কেরাম তওহিদকে দু'ভাগে ভাগ করেছেন :
প্রথমত: আল্লাহ তাআলার সত্তা, তার কার্যাবলী, তার বিশেষ্য ও বিশেষণ সমূহকে প্রতিষ্ঠিত করণ ও প্রতিপন্নকরণ। এ প্রকার তওহিদকে ওলামায়ে কেরাম নামকরণ করেছেন — توحيد المعرفة والإثبات হিসেবে। (অর্থ: আল্লাহ তাআলার পরিচয় লাভ করা। তার প্রতিনিধি হিসেবে তদীয় সমস্ত বিধানাবলী মননে ও শরীরে, নিজের ভিতর ও অন্যের ভিতর সফল রূপায়ণ ও যথার্থ বাস্তবায়ন করা।)
কতেক ওলামায়ে কেরাম এ প্রকার তওহিদকে আবার দু'ভাগে ভাগ করেছেন: ১. (توحيد الربوبية) অর্থাৎ তওহিদুর রুবুবিয়্যাত বা প্রভুত্ব ও প্রতিপালন সম্পর্কিত একত্ববাদ। অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার অস্তিত্বের স্বীকারোক্তি প্রদান। তার প্রত্যক্ষ ও স্বনিয়ন্ত্রিত কর্মসমূহে একমাত্র তাকেই সম্পাদনকারী জ্ঞান করা। যেমন-রাজত্ব, পরিকল্পনা, সৃষ্টি, কল্যাণ-অকল্যাণ, রিজিক প্রদান, জীবিত করণ ও মৃত্যুদান ইত্যাদি কর্মসমূহ আল্লাহ তাআলা পরিকল্পনা করেন এবং প্রত্যক্ষ ও সক্রিয় ভাবে একক সিদ্ধান্তে সম্পাদন করেন।
আরেকটু পরিষ্কার করে বলা যায়: توحيد الربوبية দুইটি বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে। যথা:
(এক) আসমান-জমিন, জিন-ইনসান, পাহাড়-পর্বত, সাগর-মহাসাগর, আলো-বাতাস, চন্দ্র-সূর্যসহ যাবতীয় সৃষ্টি জীব একমাত্র আল্লাহ তাআলার পরিকল্পনা, তত্ত্বাবধান ও প্রত্যক্ষ নির্দেশ (کن) এর মাধ্যমে সৃজিত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কারো থেকে সামান্যতম সাহায্য গ্রহণ করা হয়নি। সৃষ্টির অণুপরিমাণ বস্তুর সৃষ্টির ভিতর কারো অংশীদারিত্বও নেই।
(দুই) যাবতীয় সৃষ্টিজগত পরিচালনা করার দায়িত্ব ও ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ তাআলা সংরক্ষণ করেন। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক আইন-কানুন প্রণয়ন, মুসলমান-মুসলমান, মুসলমান-অমুসলমান, অমুসলমান-অমুসলমান এর ভিতর সম্পর্ক-উন্নয়ন, সম্পর্ক-ছিন্নকরণ, লেন-দেন, উদারনীতি-কঠোরনীতি নির্নয় করণ, এবং এ সমস্ত জিনিসের প্রকৃতি ও ধরন ব্যাখ্যা করণ, এককমাত্র আল্লাহ তাআলার অধিকার। এর বিরুদ্ধাচারন করে কেউ যদি নিজেকে আংশিক বা সামগ্রিক অধিকার সংরক্ষণকারী মনে করে— সে বাস্তবে রুবুবিয়‍্যাতের দাবীদার। কাফের। যেমন ফেরআউন, নমরূদ। আবার কেউ যদি এর সামগ্রিক বা আংশিক অধিকারের অন্য কাউকে অংশীদার মনে করে, সে মুশরিক বা পৌত্তলিক। যেমন— মক্কার আবু জাহেল, আবু লাহাব ও বর্তমান যুগের পৌত্তলিক সম্প্রদায়। হোক না সে অংশিদারকৃত বস্তু সামাজিক সংঘঠন, রাষ্ট্রিয় পার্লামেন্ট কিংবা আন্ত 'জাতিক কোন সংস্থা।
সুতরাং একজন মুসলমানকে রব হিসেবে একমাত্র আল্লাহ তাআলাকে মেনে নিতে হবে। তাকে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে ঘোষণা করতে হবে: আল্লাহ তাআলাকে আমি রব হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছি। ইসলামকে আমি ধর্ম বা জীবন বিধান হিসেবে গ্রহণ করেছি। মুহাম্মদ সা.কে আমি নবী হিসেবে মেনে নিয়েছি। তাকে দৃঢ়চিত্তে আরো ঘোষণা দিতে হবে: আমার নামায, আমার কুরবানী, আমার জীবন, আমার মরণ একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্য, যিনি উভয় জাহানের পালনকর্তা।
এর পরেই সে প্রবেশ করবে শান্তির শামিয়ানায়। আরোহন করবে মুক্তির তরীতে। তাওহিদ তথা ইসলামের কিস্তিতে। অতঃপর বিশ্বাসের এ তরীকে অবিশ্বাসের প্রলয়ংকারী ঝড়, উত্তাল তরঙ্গ ও সমূহ প্রতিকুলতা হতে হেফাজত করার জন্য জীবন মরণ শপথ গ্রহণ করতে হবে। প্রশান্তচিত্ত, পূর্ণ বিশ্বাস, আর দৃঢ় আস্থা নিয়ে তাওহিদ তথা ইসলামের তরী বর্হিভূত সকল মানবজাতি: যারা শিরক-কুফর আর পথভ্রষ্টতার মহা সমুদ্রে হাবুডুবু খাচ্ছে, যারা নাজাতের এ তরীকে বিপদ সঙ্কুল, দূর্ভেদ্য দেয়ালঘেরা শাস্তি কুন্ড, মানুষের স্বাধীনতা হরণকারী ভাসমান জেলখানা, আধুনিকতা বিবর্জিত সেকেলে সভ্যতার বাহক সমুদ্র পিষ্ঠে এক প্রাচীন দীপ মনে করে আছে, তাদেরকে এ তরীতে উঠার উদাত্ত আহবান জানাতে হবে। তবেই পরিগণিত হবে সে আল্লাহর সমীপে আত্মসমর্পনকারী পরিপূর্ণ মুসলমান। পরকালে বিশ্বাসী খাঁটি মুমিন।
২. তাওহিদ আল আসমা ওয়াস সিফাত (توحيد الأسماء والصفات) (অর্থঃ আল্লাহ তাআলা যে সব সত্তাগত বা গুণগত (বিশেষ্য ও বিশেষণ মূলক) নামসমূহ নিজের জন্য নির্বাচন করেছেন, অথবা রাসূল সা. যে সব সত্তাগত বা গুণগত (বিশেষ্য ও বিশেষণ মূলক) নামসমূহ আল্লাহর জন্য বলে উল্লেখ করেছেন, সেগুলোকে কোন ধরনের রূপদান বা সামঞ্জস্য বিধান, অপব্যাখ্যা বা বিকৃতি সাধন, কর্মহীনকরণ বা নিরর্থকরণ, দৃষ্টান্ত প্রদান বা সাদৃশ্য বর্ণনা ব্যতিরেকে বাস্তব সম্মত ও যথার্থভাবে একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্য উপযুক্ত মনে করা এবং সে হিসেবে মনে প্রাণে বিশ্বাস করা।
দ্বিতীয়ত: কথা, কাজ এবং নিয়্যত ও ইচ্ছার সমন্বিত এবাদত একমাত্র আল্লাহ তাআলাকে উৎসর্গ করা। যেমন— মহব্বত, ভয়, আশা, মান্নত, কুরবানী, তওবা, নামায বা সালাত, রোজা বা সিয়াম সাধনা, যাকাত, হজ্ব... ইত্যাদি। এবাদত গুলো একমাত্র আল্লাহ তাআলার প্রাপ্য জ্ঞান করা। এটাই কালেমায়ে তাওহিদ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর অর্থ ও আবেদন। এ প্রকার তাওহিদকে ওলামায়ে কেরাম নামকরণ করেছেন (তাওহিদ আল কাসদ ওয়াত তালব)توحيد القصد والطلب বলে। (অর্থ: একমাত্র আল্লাহ তাআলাকে চাওয়া এবং এবাদতের মাধ্যমে শুধু তাকে পাওয়ার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা করা।)
আল্লাহ তাআলা এ প্রকার তাওহিদসহ রাসূলদের প্রেরণ করেছেন এবং এর জন্য আসমান হতে কিতাব নাজিল করেছেন। তবে রাসূলগন এবং তাদের দাওয়াতী সম্প্রদায়ের মাঝে তাওহীদের প্রথম প্রকার নিয়ে কোন বিবাদ, সংঘাত বা দ্বন্ধ ছিল না। কারণ এ প্রকার তাওহিদ তারা স্বীকার করতো, অস্বীকার করতো না। উদাহরণত ঐ সমস্ত মুশরেকগণ যাদের নিকট দাওয়াতের জন্য রাসূল সা.কে প্রেরণ করা হয়েছিল তারা বিশ্বাস করতো— আল্লাহ তাআলা সৃষ্টিকর্তা, রিযিক দাতা, জীবন দানকারী, মৃত্যু প্রদানকারী, সার্বিক ও সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। যেমন— পবিত্র কুরআনে তাদের ব্যাপারে বলা হয়েছে:
১. এরশাদ হচ্ছে— وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ مَنْ خَلَقَهُمْ لَيَقُولُنَّ اللَّهُ فَأَنَّى يُؤْفَكُونَ ﴿সورة الزخرف : ৮৭﴾ 'আপনি যদি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করেন কে তাদেরকে সৃষ্টি করেছে? তবে অবশ্যই তারা বলবে, আল্লাহ।'১
২. আরো এরশাদ হচ্ছে— وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ مَنْ نَزَّلَ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَأَحْيَا بِهِ الْأَرْضَ مِنْ بَعْدِ مَوْتِهَا لَيَقُولُنَّ اللَّهُ. (سورة العنكبوت: ৬৩) 'যদি আপনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, কে আকাশ থেকে বারি বর্ষণ করে, অতঃপর তা দ্বারা মৃত্তিকাকে উহার মৃত হওয়ার পর সঞ্জীবিত করে? তবে তারা অবশ্যই বলবে আল্লাহ!'২
৩. আরো এরশাদ হচ্ছে— قُلْ مَنْ يَرْزُقُكُمْ مِنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ أَمَّنْ يَمْلِكُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ وَمَنْ يُخْرِجُ الْحَيَّ مِنَ الميتِ وَيُخْرِجُ المَيِّتَ مِنَ الْحَيَّ وَمَنْ يُدَبِّرُ الْأَمْرَ فَسَيَقُولُونَ اللَّهُ فَقُلْ أَفَلَا تَتَّقُونَ. (سورة يونس: ৩১) 'তুমি জিজ্ঞেস কর, কে রুযীদান করে তোমাদেরকে আসমান থেকে ও যমীন থেকে, কিংবা কে তোমাদের কান ও চোখের মালিক? তা ছাড়া কে জীবিতকে মৃতের ভেতর থেকে বের করেন? এবং কে মৃতকে জীবিতের মধ্য হতে থেকে বের করেন? কে করেন কর্মসম্পাদনের ব্যবস্থাপনা? তখন তারা বলে উঠবে, আল্লাহ! তখন তুমি বলো তারপরেও ভয় করছ না?'৩
হ্যাঁ, ঝগড়ার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল : توحيد القصد والطلب )অর্থ: একমাত্র আল্লাহ তাআলাকে চাওয়া এবং এবাদতের মাধ্যমে শুধু তাকে পাওয়ার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা করা।) অর্থাৎ এক উপাস্য নির্ধারণ করার ব্যাপারে, শুধু আল্লাহর জন্য এবাদত সীমিত করনের ভিতর এবং لا إله إلا الله এর সাক্ষ্যকে বাস্তবায়ন করা নিয়েই মূল ঝগড়া। আল্লাহ তাআলা আরবের কাফেরদের কথা উল্লেখ করেছেন। তারা বলেছে: أَجَعَلَ الْآلِهَةَ إِلَهًا وَاحِدًا إِنَّ هَذَا لَشَيْءٌ عُجَابٌ ﴿৫﴾ وَانْطَلَقَ الْمَلَأُ مِنْهُمْ أَنِ امْشُوا وَاصْبِرُوا عَلَى آلِهَتِكُمْ إِنَّ هَذَا لَشَيْءٌ يُرَادُ ﴿৬﴾ مَا سَمِعْنَا بِهَذَا فِي الْمِلَّةِ الْآخِرَةِ إِنْ هَذَا إِلَّا اخْتِلَاقُ ﴿سورة ص : ৫-৭﴾
'সে কি বহু উপাস্যের পরির্বতে এক উপাস্যের উপাসনা সাব্যস্ত করে দিয়েছে। নিশ্চয় এটা এক বিস্ময়কর ব্যাপার। কতিপয় বিশিষ্ট ব্যক্তি একথা বলে প্রস্থান করে যে, তোমরা চলে যাও এবং তোমাদের উপাস্যদের পুজায় দৃঢ় থাক। নিশ্চয় এ বক্তব্য কোন বিশেষ উদ্দেশ্যে প্রণোদিত। আমরা সাবেক ধর্মে এ ধরনের কথা শুনিনি। এটা মনগড়া ব্যাপার বৈ নয়।'১ আরো এরশাদ হচ্ছে— إِنَّهُمْ كَانُوا إِذَا قِيلَ لَهُمْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ يَسْتَكْبِرُونَ ﴿৩৫﴾ وَيَقُولُونَ أَئِنَّا لَتَارِكُوا آلِهَتِنَا لِشَاعِرٍ مَجْنُونٍ ﴿৩৬﴾ بَلْ جَاءَ بِالْحَقِّ وَصَدَّقَ الْمُرْسَلِينَ ﴿سورة الصفت : ৩৫-৩৬﴾
'তাদের যখন বলা হত আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই, তখন তারা ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করত এবং বলত, আমরা কি এক উন্মাদ কবির কথায় আমাদের উপাস্যদেরকে পরিত্যাগ করব?'২ وَقَالُوا لَا تَذَرُنَّ آلِهَتكُمْ وَلَا تَذَرُنَّ وَدًّا وَلَا سُوَاعًا وَلَا يَغُوثَ وَيَعُوقَ وَنَسْرًا ﴿سورة نوح : ২৩﴾
'তারা বলেছে: তোমরা তোমদের উপাস্যদেরকে ত্যাগ করো না এবং ত্যাগ করো না ওয়াদ, সুয়া, ইয়াগুস, ইয়াউক ও নসরকে।'৩
বরং কুরআনের ভাষানুযায়ী বুঝা যায় যে, আল্লাহ তাআলা শুধুমাত্র এ প্রকার তাওহীদের প্রতি দাওয়াত দেয়ার জন্য রাসূলদের স্ব স্ব সম্প্রদায় ও কওমের নিকট প্রেরণ করেছেন। এরশাদ হচ্ছে— وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللهَ وَاجْنِبُوا الطَّاغُوتَ. ﴿سورة النحل : ৩৬﴾ 'আমি প্রত্যেক জাতির মধ্যেই রাসূল প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে, তোমরা আল্লাহর এবাদত কর এবং তাগুত থেকে নিরাপদ থাক।'
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَسُولٍ إِلَّا نُوحِي إِلَيْهِ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُونِ (الأنبياء : ২৫)
'আপনার পূর্বে আমি যে রসূলই প্রেরণ করেছি, তাকে এ আদেশেই প্রেরণ করেছি যে আমি ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নেই। সুতরাং আমারই এবাদত কর।'১
তবে অবশ্যই পরকালের নাজাতের জন্য উভয় তাওহীদের বাস্তবায়ন করতে ও মানতে হবে। যে ব্যক্তি শুধুমাত্র প্রথম প্রকার তাওহিদ (توحيد المعرفة والإثبات) নিয়ে আসবে। দ্বিতীয় প্রকার তাওহিদ (توحيد القصد والطلب) পরিত্যাগ করবে—যা অধিকাংশ মুশরিকদের অবস্থা— সে কোনো ভাবেই উপকৃত হবে না। এ তাওহিদ তাকে মুক্তি দিতে পারবে না। পবিত্র কুরআন তাদের কাফের ঘোষণা করেছে এবং শিরকের দ্বারা বিশেষায়িত করেছে। এরশাদ হচ্ছে— وَمَا يُؤْمِنُ أَكْثَرُهُمْ بِاللَّهِ إِلَّا وَهُمْ مُشْرِكُونَ ﴿১০৬﴾. (سورة يوسف: ১০৬) 'অনেক মানুষ আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, কিন্তু সাথে সাথে শিরক করে।'২
অত্র আয়াতে ঈমান গ্রহণের অর্থ— আল্লাহ তাআলার অস্তিত্ব, তিনি সৃষ্টিকর্তা, রিযিক দাতা, জীবন দানকারী, মৃত্যুদান কারী, বিশ্বজাহানের মালিক ও পরিকল্পনাকারীর উপর ঈমান আনা বা বিশ্বাস স্থাপন করা। শিরক করার অর্থ: এবাদতের ভিতর আল্লাহ তাআলার অংশীদার সাব্যস্ত করা। একটি উদাহরণ— মক্কার মুশরিকগণ কা'বা ঘরের তওয়াফ করার সময় তালবিয়ার ভিতর বলতো: لبيك لا شريك لك، إلا شريكا هو لك تملكه وما ملك. 'হে আল্লাহ! আমি উপস্থিত। তোমার কোনো অংশীদার নেই। তবে যে সমস্ত অংশিদারগণ একমাত্র তোমারই জন্য— তারা ছাড়া। যাদের মালিক তুমি এবং তাদের মালিকাধীন জিনিসের মালিক ও তুমি।'
তাওহীদের উপর একটি পর্যালোচনা
১. তওহিদ তাওক্বীফী বা ওহীর উপর নির্ভরশীল : বান্দা হিসেবে আমরা যখনই তওহিদ নিয়ে পর্যালোচনা করবো, আল্লাহ তাআলা ও তার রসূলের বর্ণনাকৃত নির্ধারিত সীমা রেখার ভিতর সীমাবদ্ধ থাকবো। কারণ এখানে বাড়ানো-কমানো, বিকৃতকরণ ও পরিবর্তনের কোন সুযোগ নেই। শুধুমাত্র কুরআনুল কারীম ও নির্ভরযোগ্য সনদে প্রাপ্ত হাদীস হতেই তাওহিদ গ্রহণ করতে হবে। রাসূল সা. তাওহীদের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে গেছেন। সুতরাং যে কোন ব্যক্তির তাওহিদ নিয়ে যে কোনো মন্তব্য করার অধিকার নেই। তদুপরি কুরআন বা হাদীস বুঝার জন্য কুরআনের অপর আয়াত বা অপর আরেকটি হাদীসের যেখানে আলোচিত আয়াত বা হাদীসের ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়েছে— শরাণাপন্ন হতে হবে। সাথে সাথে সাহাবায়ে কেরাম ও আদর্শ পূর্বসুরীগণের ইলম ও ব্যাখ্যার দিকে প্রত্যাগমন করতে হবে।
যেহেতু তাওহিদ ওহী নির্ভর, যেখানে যুক্তি, অনুমান বা কল্পনার বিন্ধুমাত্র দখল নেই। সেহেতু তাওহীদের শিক্ষা গ্রহণ করার গুরুত্ব ও শিক্ষা দেয়ার অপরিহার্যতা সহজেই অনুমেয় ও বোধগম্য। এও সুষ্পষ্ট যে বিশুদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য ওহী ব্যতীত তাওহীদের জ্ঞান অর্জন করার বিকল্প নেই। কারণ মানুষ যদি না জানে তাওহীদের দ্বারা কি উদ্দেশ্য? তাহলে সে কিভাবে তাওহিদবাদী বা একত্ববাদী হবে?
২. তাওহীদকে তার সার্বজননীতা ও ব্যাপকতা সহকারে গ্রহণ করতে হবে: রাসূল সা. দের উভয় প্রকার তাওহিদ অর্থাৎ توحيد المعرفة والإثبات এবং توحيد القصد والطلب সহকারে প্রেরণ করা হয়েছে। উভয় প্রকার গ্রহণ করা ছাড়া কোন বান্দার ভিতর তাওহিদ পূর্ণতা পাবে না। কিন্তু বাস্তব ময়দানে আমরা যখন আলেমদের ও দ্বীনের পথে আহবান কারীদের প্রতি দৃষ্টি দেই, সুস্পষ্ট ত্রুটি ও ফাটল দেখতে পাই। কেউ কেউ তাওহীদের কোনো এক প্রকারে গুরুত্বারোপ করে অপর প্রকারকে গুরুত্বহীন রেখে দিয়েছে।
কতিপয় লোকের অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তাওহীদের কিয়দাংশ তাওহিদ থেকে বের করে দিয়ে তাওহীদের অঙ্গহানী করেছে। বরং যে অন্যদের পরিত্যাগকৃত তাওহীদের অংশকে শিক্ষা দেয় তাকে তারা বেদ'আতের অভিযোগে অভিযুক্ত করে। কারণ তারা বিশ্বাস করে নিয়েছে পরিত্যাগকৃত অংশ তাওহীদের অর্ন্তভূক্ত নয়।
উদাহরণ স্বরূপ: কেউ কেউ মনে করে আছেন— নিয়ত ও এবাদতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলাকে কামনা করাই হল মূল তাওহিদ। যেমন— আল্লাহ তাআলা জন্য কুরবানী করা, শুধু তার নামেই শপথ করা, তার জন্য মান্নত করা এবং তার কাছে দোয়া করা। তারা তাওহীদের বাকি অংশকে হিসেবে আনে না, কখনো আনলে তেমন গুরুত্ব দেয় না। যেমন— ফয়সালার জন্য একমাত্র আল্লাহর নিকট তথা কুরআনের শরনাপন্ন হওয়া। তাগুতের মীমাংসার সমাধান কামনা না করা।
কেউ কেউ আল্লাহ তাআলার সার্বভৌমত্বের তাওহিদ এবং মীমাংসার জন্য একমাত্র তার শরণাপন্ন হওয়ার তাওহিদে গুরুত্ব প্রদান করেন। তাওহীদের অন্যান্য প্রকারকে গুরুত্ব প্রদান করেন না। যেমন— একমাত্র আল্লাহ তাআলার নিকট দোয়া করা, মান্নত করলে তাঁর জন্য করা, তার নামে শপথ করা, পূর্ণ অর্থবোথক, সুন্দর সুন্দর বিশেষ্য ও বিশেষণ মূলক নামসমূহকে একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্য নির্দিষ্ট করা।
উল্লেখিত সকল গ্রুপেই তাওহিদ বুঝার ক্ষেত্রে ভুল আছে। কারণ তারা তাওহিদকে যে ভাবে বুঝেছে তাওহিদ তার চেয়ে ব্যাপক ও ব্যাপকতর। যে তাওহীদের কোনো এক প্রকারে ভুল করল সে মূল বিষয়ে ভুল করল। এরশাদ হচ্ছে— أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ فَمَا جَزَاءُ مَنْ يَفْعَلُ ذَلِكَ مِنْكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَى أَشَدَّ الْعَذَابِ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ ﴿৮৫﴾ . (سورة البقرة : ৮৫) 'তবে কি তোমরা গ্রন্থের কিয়দাংশ বিশ্বাস কর এবং কিয়দাংশ অবিশ্বাস কর! যারা এরূপ করে, পার্থিব জীবনে দুর্গতি ছাড়া তাদের আর কোনই পথ নেই। কিয়ামতের দিন তাদের কঠোরতম শাস্তির দিকে পৌছে দেয়া হবে। আল্লাহ তাআলা তোমাদের কাজ-কর্ম সম্পর্ক বেখবর নন।'১
উল্লিখিত বক্তব্যের মাধ্যমে বিশেষ দল, কোন আলেম অথবা দ্বীনের প্রতি আহবানকারীদের প্রত্যাখ্যান বা অস্বীকার করা হচ্ছেনা। বরং অভিযোগ হল তাদের বিরুদ্ধে যাদের মধ্যে রয়েছে গুরুত্ব প্রদানকৃত অংশে তাওহিদকে সীমাবদ্ধ করন এবং তাওহীদের অপর অংশের ক্ষেত্রে তাদের অবহেলা প্রদর্শন এবং যারা অপর অংশের প্রতি গুরুত্ব দেয় তাদেরকে গোমরাহ, পথভ্রষ্ট ও বিকৃত অভিযোগে অভিযুক্ত করা।
৩. তাওহীদের শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞানই যথেষ্ট নয়: অধিকাংশ মানুষের নিকট তাওহীদের তাত্ত্বিক জ্ঞান এখন আর অসম্পূর্ণ বা অস্পষ্ট নয়। শরয়ি দৃষ্টিকোণ থেকে ইহা জরুরীও বটে। কিন্তু এতটুকু তাত্ত্বিক জ্ঞান যথেষ্ট নয়। বরং সে তাত্ত্বিক জ্ঞানানুযায়ী অনুপ্রাণিত হওয়া, তার কাছে আত্মসম্পর্ণ করা এবং সে অনুযায়ী আমল করা কর্তব্য।
যেমন আল্লাহ তাআলা রিযিক দাতা, সুসংহত সুদৃঢ় ক্ষমতার অধিকার— শুধু এতটুকু যথেষ্ট নয়। বরং এর সাথে আভ্যন্তরীন সক্রিয়া অনুভূতির প্রয়োজন আছে। অর্থাৎ তাকদীরের উপর বিশ্বাস করত হাতছাড়া হয়ে যাওয়া জিনিসের জন্য বিষন্ন না হওয়া। নাজায়েয বা অবৈধ পন্থায় সম্পদ অর্জনের প্রচেষ্টা না করা। ধর্মীয় দায় দায়িত্ব ও অবশ্য কর্তব্যকে জলাঞ্জলী দিয়ে অর্থ উপার্জনের জন্যে আপাদ-মস্তক আত্মনিয়োগ না করা। হালাল ও বৈধ সম্পদ উপার্জনের জন্যে আল্লাহ কর্তৃক প্রদত্ত পন্থা ও পদ্ধতিকে অবহেলা কিংবা পরিত্যাগ না করা।

টিকাঃ
১ সূরা ইবরাহিম: ১
১ সূরা আনআম: ৮৮
২ সূরা লোকমান: ৩০
১ সূরা আন নাহল: ৯৭
২ সূরা ত্বাহা: ১২৪
৩ সূরা আল হুজুরাত: ১৩
১. সূরা আয ঘুমার: ২৯
২. সূরা ইউনুস: ৭১
১. সূরা আল আনআম: ৮০-৮২
২. সূরা হুদ: ৫৪
২ সূরা আল আরাফ: ৮
১ সূরা: আল মায়েদা ৭২
২ সূরা আল আন আম: ৮৮
১ সূরা যুখরুফ: ৮৭।
২ সূরা: আল আনকাবুত- ৬৩
৩ সূরা: ইউনুস-৩১
১ সূরা: সাদ- ৫-৭
২ সূরা সাফফাত: ৩৫-৩৬
৩ সূরা নূহ: ২৩।
১ সূরা: আম্বিয়া- ২৫
২ সূরা: ইউসুফ-১০৬
১ সূরা: বাক্বারা-৮৫

📘 তাওহীদ ও আকাইদ 📄 হেদায়েত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা

📄 হেদায়েত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা


ইসলামের গোড়া পত্তন হয়েছে শিরকের কলঙ্ক ও পৌত্তলিকতার নোংড়ামী মুক্ত খাঁটি, নিভের্জাল তাওহিদ তথা একত্ববাদের উপর। যার রূপকার لا إله إلا الله محمد رسول الله এর শাহাদাত বা সাক্ষ্য প্রদান।
لا إله إلا الله এর শাহাদাতের উদ্দেশ্য: বিনয়-নম্র ভাবে নিজেকে আল্লাহর সমীপে সপে দেয়া, তার বশ্যতা মেনে নেয়া। তিনি এক তার কোন শরীক নেই, এটা ঘোষণা দেয়া।
محمد رسول الله এর শাহদাতের উদ্দেশ্য: নিজেকে সপে দেয়ার পদ্ধতি ও এবাদতের বিশদ বর্ণনা মুহাম্মদ সা. এর নিকট হতে গ্রহণ করা। উভয় শাহাদাতের মৌখিক উচ্চারণ ইসলাম গ্রহণ ও ইসলামকে আলিঙ্গন করার বহিঃপ্রকাশ।
ক্বিয়ামতের দিন দুইটি প্রশ্নের উত্তর না দেয়া পর্যন্ত কোন আদম সন্তান স্বীয় অবস্থান ত্যাগ করতে পারবে না। প্রথম প্রশ্ন: তোমরা কার এবাদত করতে? দ্বিতীয় প্রশ্ন: রসূল সা.কে কি জাওয়াব দিয়েছ? প্রথম প্রশ্নের উত্তর: ইলম তথা আল্লাহর পরিচয় লাভ, মৌখিক স্বীকৃতি প্রদান এবং আমলের মাধ্যমে لا إله إلا الله এর বাস্তবায়ন।
দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর: ইলম তথা রসূল সা. এর পরিচয় লাভ, মৌখিক স্বীকৃতি প্রদান এবং আনুগত্যের মাধ্যমে محمد رسول الله এর বাস্তবায়ন।
لا إله إلا الله এর সাক্ষ্য প্রদানের তাৎপর্য: সংবেদনশীল, তাৎপর্যপূর্ণ এ সাক্ষ্য প্রদানের অর্থ হল: 'সত্যিকারার্থে আল্লাহ ছাড়া কেউ এবাদতের উপযুক্ত নয়। যেহেতু একমাত্র আল্লাহ তাআলা সৃষ্টিকর্তা, অধিপতি, রিযিকদাতা, কল্যাণ সাধনকারী, ক্ষতিসাধনকারী ও পরিচালনাকারী, সেহেতু আল্লাহ তাআলার প্রাপ্য বান্দা স্বীয় নিবেদন, আশা, ভয়, মহব্বত, মীমাংসা, ভরসা এবং সমস্ত কর্মকান্ডের ব্যাপারে একমাত্র তার শরণাপন্ন হবে, অন্য কারো নয়।
শাহাদাতের মূল ভিত্তি: শাহাদাত বা لا إله إلا الله এর সাক্ষ্য মূল দুইটি ভিত্তির উপর নির্ভরশীল— ১. প্রত্যাখ্যান। ২. স্বীকৃতি প্রদান।
لا إله: প্রত্যাখ্যান। অর্থাৎ এবাদতের উপযুক্ত যে কোনো উপাস্যের অস্তিত্বকে প্রত্যাখ্যান করা, একমাত্র আল্লাহ তাআলা ব্যতীত। إلا الله: স্বীকৃতি প্রদান। একমাত্র আল্লাহ তাআলাই এবাদতের উপযুক্ত অন্য কেউ নয়, এর স্বীকৃতি প্রদান করা।
لا إله إلا الله এর শর্ত সমূহ: আলোচিত কালেমায়ে তাওহিদ জান্নাতে প্রবেশের চাবি স্বরূপ, জাহান্নাম তাতে মুক্তির ঢাল স্বরূপ। এরশাদ হচ্ছে— من مات وهو يعلم أن لا إله إلا الله دخل الجنة. “যে لا إله إلا الله (অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই) এর অর্থ, তাৎপর্যের জ্ঞান নিয়ে মৃত্যু বরণ করল সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” রসূল সা. আরো বলেন— إن الله حرم على النار من قال لا إله إلا الله يبتغي بذلك وجه الله. “অবশ্যই আল্লাহ তাআলা ঐ ব্যক্তির উপর জাহান্নাম হারাম করে দিয়েছেন, যে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যে لا إله إلا الله কালিমাটি পাঠ করেছে।” আফসোস! অনেক মানুষ কালেমায়ে শাহাদাত শুধু মুখে উচ্চারণ করে পরমানন্দে নিশ্চিন্ত বসে আছে, অথচ এর শর্ত, এর দাবী বাস্তবায়ন যে কত অপরিহার্য তা একেবারে বেমালুম ভুলে আছে। ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ রহ.কে প্রশ্ন কর হয়েছিল, أليس لا إله إلا الله مفتاح الجنة؟ قال: بلى، ولكن ما من مفتاح إلا وله أسنان، فإن جئت بمفتاح له أسنان فتح لك، وإلا لن يفتح لك. لا إله إلا الله কি জান্নাতের চাবি নয়? তিনি উত্তর দিলেন— অবশ্যই। তবে প্রতিটি চাবির কিন্তু দাঁত থাকে। যদি তুমি দাঁত আছে এমন চাবি নিয়ে আস, তোমাকে দরজা খুলে দেয়া হবে। অন্যথায় দরজা খুলে দেয়া হবে না।
কতেক প্রজ্ঞাময় ওলামায়ে কেরাম নিম্নের পংক্তির মাধ্যমে لا إله إلا الله এর শর্তগুলো একত্রিত করে বর্ণনা করে দিয়েছেন।
علم يقين وإخلاص وصدقك محبة وانقياد والقبول لها.
وزيد ثامنها الكفران منك بما سوى الإله من الأوثان قد ألها.
১. ইলম। ২. দৃঢ় বিশ্বাস। ৩. ইখলাছ। ৪. সততা আন্তরিকতা। ৫. ভালবাসা। ৬. আত্মসমর্পণ। ৭. لا إله إلا الله কে মনে প্রাণে গ্রহণ করা। ৮. আল্লাহর বিপরীতে উপাস্য সকল মূর্তি পত্যাখ্যান করা।
আটটি মূল ভিত্তির উপর সামান্য আলোকপাত : ১. এই কালেমার অর্থ, আবেদন ও দাবী সর্ম্পকে জ্ঞান অর্জন করা, অজ্ঞতা পরিহার করা:
বান্দাকে অবশ্যই জানতে হবে لا إله إلا الله (প্রত্যাখ্যান ও গ্রহণ) অস্বীকৃতি ও স্বীকৃতি দুইটি বিষয়ের সমন্বয়। এই কালিমার দাবি হচ্ছে— আল্লাহ ছাড়া যে কোন জিনিসের এবাদতের উপযুক্ততা প্রত্যাখ্যান করা এবং একমাত্র আল্লাহ তায়ালার জন্য স্বীকৃতি প্রদান করা। এরশাদ হচ্ছে— فَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَاسْتَغْفِرْ لِذَنْبِكَ. (سورة محمد : ১৯) 'জেনে রাখুন, আল্লাহ তাআলা ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। ক্ষমা প্রার্থনা করুন আপনার ত্রুটির জন্যে।'১ রসূল সা. বলেছেন— مَن مَّاتَ وَهُوَ يَعْلَمُ أَن لَّا إِلَٰهَ إِلَّا اللَّهُ دَخَلَ الْجَنَّةَ. 'যে ব্যক্তি لا إله إلا الله এর তাৎপর্য ও অর্থ জানাবস্থায় মারা গেল, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।'
২. এই কালেমার উপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখা, সংশয়-সন্দেহ পরিত্যাগ করা: لا إله إلا الله এর অর্থ ও তাৎপর্যকে দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করার মানে, এর ব্যাপারে কোনো ধরনের সংশয়, সন্দেহ বা কিংকর্তব্য বিমূঢ়তার বিন্দুমাত্র শংমিশ্রন থাকতে পারবে না। এরশাদ হচ্ছে— إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ ثُمَّ لَمْ يَرْتَابُوا وَجَاهَدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أُولَئِكَ هُمُ الصَّادِقُونَ ﴿১৫﴾ . (سورة الحجرات: ১৫) 'তারাই মুমিন, যারা আল্লাহ ও তার রসূলের প্রতি ঈমান আনার পর সন্দেহ পোষণ করে না এবং আল্লাহর রাস্তায় ধন-সম্পদ ও জীবন দ্বারা জেহাদ করে। তারাই সত্যনিষ্ঠ।'১ রসূল সা. আবু হুরায়াকে বলেন, يا أبا هريرة اذهب بنعلي هاتين - وأعطاه نعليه - فمن لقيت من وراء এই দেয়ালের ওপাশে অন্তরের অন্তস্থল হতে দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে لا إله إلا الله এর সাক্ষ্য প্রদানকারী যার সাথেই তুমি সাক্ষাত করবে তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দাও।'
৩. এই কালেমার আবেদন ও দাবী স্বতঃস্ফূর্ত গ্রহণ করা, প্রত্যাখ্যান না করা: অন্তর ও অঙ্গ-প্রতঙ্গের মাধ্যমে এই কালেমার আবেদন সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করা। যে ব্যক্তি এই কালেমার আবেদনকে প্রত্যাখ্যান করবে, আন্তরিক ভাবে মেনে না নিবে সে কাফের। সাধারণত প্রত্যাখ্যান করা হয়ে থাকে অহংকার, বিরোধিতা, হিংসা, বাপ-দাদার অন্ধানুকরণ ইত্যাদি কারণে। যেমন পবিত্র কুরআনের ভাষায় অহংকার বশত لا إله إلا الله এর অর্থ ও তাৎপর্যকে প্রত্যাখ্যানকারী কাফেরদের ঔদ্ধত্য প্রকাশ সম্পর্কে হয়েছে। এরশাদ হচ্ছে— إِنَّهُمْ كَانُوا إِذَا قِيلَ لَهُمْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ يَسْتَكْبِرُونَ ﴿৩৫﴾ وَيَقُولُونَ أَئِنَّا لَتَارِكُوا أَهْتِنَا لِشَاعِرٍ مجنون ﴿سورة الصافات: ৩৫-৩৬﴾ "তাদের যখন বলা হত আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই, তখন তারা ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করত এবং বলত, আমরা কি এক উন্মাদ কবির কথায় আমাদের উপাস্যদের পরিত্যাগ করব?"১
অতীত উম্মতের ভিতর যারা এই কালেমার আহবান প্রত্যাখ্যান করেছে, আন্ত রিক ভাবে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, তাদের থেকে নেয়া প্রতিশোধ চিত্র পবিত্র কুরআনে তুলে ধরা হয়েছে। এরশাদ হচ্ছে— وَكَذَلِكَ مَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ فِي قَرْيَةٍ مِنْ نَذِيرٍ إِلَّا قَالَ مُتْرَفُوهَا إِنَّا وَجَدْنَا أَبَاءَنَا عَلَى أُمَّةٍ وَإِنَّا عَلَى آثَارِهِمْ مُقْتَدُونَ ﴿২৩﴾ قَالَ أَوَلَوْ جِئْتُكُمْ بِأَهْدَى مِمَّا وَجَدْتُمْ عَلَيْهِ أَبَاءَكُمْ قَالُوا إِنَّا بِمَا أُرْسِلْتُمْ بِهِ كَافِرُونَ ﴿২৪﴾ فَانْتَقَمْنَا مِنْهُمْ فَانْظُرْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُكَذِّبِينَ ﴿২৫﴾. (سورة الزخرف : ২৩-২৫) 'এমনি ভাবে আপনার পূর্বে আমি যখন কোন জনপদে কোন সতর্ককারী প্রেরণ করেছি, তখন তাদেরই বিত্তশালীরা বলেছে, আমরা আমাদের বাপ-দাদাদের পেয়েছি এক পথের পথিক এবং আমরা তাদেরই পদাংক অনুসরণ করে চলি। সে বলত, তোমরা তোমাদের পূর্বপুরুষদেরকে যে বিষয়ের উপর পেয়েছ, আমি যদি তদপেক্ষা উত্তম বিষয় নিয়ে তোমাদের কাছে এসে থাকি, তবুও কি তোমরা তাই বলবে, তারা বলত তোমরা যে বিষয়সহ প্রেরিত হয়েছে, তা আমরা মানব না। ফলে আমি তাদের থেকে প্রতিশোধ নিয়েছি। অতঃপর দেখুন, মিথ্যারোপকারীদের পরিণাম কিরূপ হয়েছে।'২
৪. এই কালেমার প্রতি সম্পূর্ণ আনুগত্য প্রকাশ করা, পরিত্যক্ত করে না রাখা: বাহ্যিক অঙ্গ-প্রতঙ্গ, আভ্যন্তরিণ মননশীলতার মাধ্যমে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এই কালিমার অর্থ, আবেদন ও তাৎপর্যকে সম্পূর্ণরূপে মেনে নেয়া। যার সত্যতা প্রমাণিত হবে, আল্লাহ তাআলার আদেশ বাস্তবায়ন, তার পছন্দনীয় বস্তুগুলো গ্রহণ, অপছন্দনীয় বস্তুগুলো বর্জন এবং তার গোস্বা ও রাগান্বিত বিষয়-বস্তুগুলো পরিহার করার মাধ্যমে। এরশাদ হচ্ছে— وَمَنْ يُسْلِمْ وَجْهَهُ إِلَى اللَّهِ وَهُوَ مُحْسِنٌ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَى وَإِلَى اللَّهِ عَاقِبَةُ الْأُمُورِ ﴿২২﴾ وَمَنْ كَفَرَ فَلَا يَحْزُنْكَ كُفْرُهُ. (سورة لقمان: ২২-২৩) ‘যে ব্যক্তি সৎকর্ম পরায়ন হয়ে আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পন করে, সে দৃঢ়ভাবে ধারণ করে এক মজবুত হাতল। যাবতীয় কাজের পরিণাম আল্লাহর ইখতিয়ারে। যে ব্যক্তি কুফরী করে, তার কুফরী যেন আপনাকে ক্লিষ্ট না করে।’১ অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে— فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا ﴿৬৫﴾. (سورة النساء : ৬৫) 'অতএব তোমার পালনকর্তার শপথ! তারা কখনো ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক বলে মেনে না নেয়, তৎপর তুমি যে বিচার করবে তা দ্বিধাহীন অন্তরে গ্রহণ না করে।'২ রসূল সা. বলেছেন— لا يؤمن أحدكم حتى يكون هواه تبعا لما جئت به. 'তোমাদের কেউ মুমিন বলে গণ্য হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত আমার আনীত বিধানের প্রতি তার প্রবৃত্তি আনুগত্য প্রকাশ না করবে।'
৫. এই কালেমার ব্যাপারে নিরেট সততা প্রর্দশন করা, মিথ্যা ও কপটতা পরিহার করা: বান্দার অন্তরে সুপ্ত অভিব্যক্তির সাথে মুখের উচ্চারণের এতটুকু সমন্বয় থাকতে হবে, যার দ্বারা তার অবস্থা মুনাফিক তথা কপটদের অবস্থা হতে সম্পূর্ণ পৃথক হয়ে যায়— যারা মিথ্যা ও ধোকার আশ্রয় নিয়ে মুখে এমন সব কথা উচ্চারণ করে যা তাদের অন্তরে বিদ্যমান থাকে না। এরশাদ হচ্ছে— وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَقُولُ آمَنَّا بِاللَّهِ وَبِالْيَوْمِ الْآخِرِ وَمَا هُمْ بِمُؤْمِنِينَ ﴿৮﴾ يُخَادِعُونَ اللَّهَ وَالَّذِينَ آمَنُوا وَمَا يَخْدَعُونَ إِلَّا أَنْفُسَهُمْ وَمَا يَشْعُرُونَ ﴿৯﴾ فِي قُلُوبِهِمْ مَرَضٌ فَزَادَهُمُ اللَّهُ مَرَضًا وَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ بِمَا كَانُوا يَكْذِبُونَ ﴿১০﴾ . (سورة البقرة: ৮-১০) 'আর মানুষের মধ্যে কিছু লোক এমন রয়েছে যারা বলে, আমরা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান এনেছি অথচ তারা আদৌ ঈমানদার নয়। তারা আল্লাহ এবং ঈমানদারগণকে ধোঁকা দেয়। অথচ এর দ্বারা নিজেদেরকে ছাড়া অন্য কাউকে ধোঁকা দেয় না। অথচ তারা তা অনুভব করতে পারে না। তাদের অন্তকরণ ব্যধিগ্রস্ত আর আল্লাহ তাদের ব্যধি আরো বাড়িয়ে দিয়েছেন। বস্তুতঃ তাদের জন্য নির্ধারিত রয়েছে ভয়াবহ আযাব, তাদের মিথ্যাচারের দরুন।'১
রসূল সা. বলেছেন: ما من أحد يشهد ألا إله إلا الله صدقا من قلبه إلا حرمه الله على النار. 'যে ব্যক্তি আন্তরিক ভাবে لا إله إلا الله এর সাক্ষ্য প্রদান করবে তার উপর আল্লাহ তাআলা জাহান্নাম হারাম করে দিবেন।'
৬. এই কালেমার প্রতি খাঁটি মহব্বত প্রদর্শন করা, বিদ্বেষ পোষণ না করা: এই কালিমা ও তার আবেদনের প্রতি অগাধ ভালবাসা ও মহব্বত রাখা। অর্থাৎ এই কালেমা অনুযায়ী আমল পছন্দ করা, যারা এর উপর আমল করে এবং এর প্রতি আহবান করে তাদের মহব্বত করা। যারা এই কালেমাকে অপছন্দ করে এর সাথে প্রতারণা বা মিথ্যারোপ করে, এর থেকে পৃষ্ঠপ্রর্দশন করে ও এর প্রচার প্রসারকে বাধাগ্রস্ত করে, তাদেরকে অপছন্দ ও প্রতিহত করা। এই কালেমার প্রতি মহব্বতের প্রমাণ দেয়ার জন্য আরো প্রয়োজন— আল্লাহ তাআলার আদেশকৃত ও পছন্দনীয় জিনিসগুলো বাস্তবায়ন করা, যদিও তা প্রবৃত্তির বিপরীত হয়। অপরপক্ষে আল্লাহ তাআলার নিষেধকৃত ও অপছন্দনীয় জিনিসগুলোর প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা, তা হতে দূরে থাকা, যদিও তার প্রতি অন্তর ধাবিত হয়। আল্লাহর বান্দাদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা। আল্লাহর শত্রুদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করা। রসূলের অনুকরণ করা। তার দিক নির্দেশনার অনুসরণ করা। তার আনীত বিধানকে কবুল করা। এ ছাড়া মহব্বত শুধু একটি দাবী যার কোন বাস্তবতা নেই। এরশাদ হচ্ছে— وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَتَّخِذُ مِنْ دُونِ اللَّهَ أَنْدَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبُّ اللَّهَ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَشَدُّ حُبًّا الله. (سورة البقرة : ১৬৫) 'আর কোন লোক এমন রয়েছে যারা অন্যান্যকে আল্লাহর সমকক্ষ সাব্যস্ত করে এবং এদের প্রতি এমন ভালবাসা পোষণ করে, যেমন আল্লাহর প্রতি ভালবাসা হয়ে থাকে। কিন্তু যারা আল্লাহর প্রতি ঈমানদার তাদের ভালবাসা ওদের তুলনায় বহুগুণ বেশী।'১
অর্থাৎ কালেমায়ে তাওহিদ তাদের অন্তরে ও হৃদয়ে স্থায়ীরূপ নিয়েছে। তাদের অন্তর ও হৃদয় এ কালেমা পরিপূর্ণ করে দিয়েছে, বিধায় অন্য কোনো জিনিসের জন্য তাদের অন্তর উন্মুক্ত হয় না। তাদের অন্তরে যত মহব্বত-বিদ্বেষ দেখা যায় সব এই কালেমার অনুকরণে উৎসারিত হয়।
৭. এই কালেমার প্রতি পূর্ণ এখলাস প্রদর্শন করা, লৌকিকতা, সুখ্যাতি ও অংশিদারিত্ব পরিহার করা: সমস্ত এবাদতে একমাত্র আল্লাহর প্রতি নিবিষ্ট চিত্তে মনোনিবেশন করা। ছোট বড় সমস্ত শিরক হতে নিয়্যত পরিশুদ্ধ রাখা। এরশাদ হচ্ছে— وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ حُنَفَاءَ وَيُقِيمُوا الصَّلَاةَ وَيُؤْتُوا الزَّكَاةَ وَذَلِكَ دِينُ الْقَيِّمَةِ ﴿৫﴾ . (سورة البينة : ৫) 'তাদেরকে এ ছাড়া কোন নির্দেশ করা হয়নি যে, তারা খাঁটি মনে একনিষ্ট ভাবে আল্লাহ তাআলার এবাদত করবে, নামায কায়েম করবে এবং যাকাত দেবে। এটাই সঠিক ধর্ম।'১ রসূল সা. বলেছেন— إن الله حرم على النار من قال لا إله إلا الله يبتغي بذلك وجه الله عز وجل. 'আল্লাহ তাআলা ঐ ব্যক্তির উপর জাহান্নাম হারাম করে দিয়েছেন যে, আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য لا إله إلا الله বলেছে।' وعن أبي هريرة - رضي الله عنه - أنه قال: قلت يارسول الله من أسعد الناس لشفاعتك يوم القيامة ؟ فقال : لقد ظننت يا أبا هريرة أن لا يسألني عن هذا أحد أول منك لما رأিত من حرصك على الحديث. أسعد الناس بشفاعتي يوم القيامة من قال لا إله إلا الله خالصا من قبل نفسه. 'আবুহুরায়রা রা. হতে বর্ণিত: তিনি বলেন আমি বলেছি হে আল্লাহর রসূল সা. কিয়ামতের দিন আপনার সুপারিশের মাধ্যমে কে সবচেয়ে বেশী সৌভাগ্যবান হবে? তিনি বললেন: হে আবু হুরায়রা, আমি নিশ্চিতভাবে ধারণা করেছিলাম যে, এ ব্যাপারে তোমার আগে কেউ আমাকে জিজ্ঞাসা করবে না। যেহেতু হাদিসের প্রতি তোমার অধিক আগ্রহ লক্ষ্য করেছি। (শুন!) কিয়ামতের দিন আমার শাফাআত বা সুপারিশ দ্বারা ঐ ব্যক্তি বেশী লাভবান হবে যে অন্তরের অন্তস্থল হতে নিবিষ্ট চিত্তে لا إله إلا الله বলেছে।'
৮. আল্লাহ ব্যতীত সকল উপাস্যদের অস্বীকার করা: বান্দার উচিত আল্লাহ তাআলা ব্যতীত ধারণা প্রসূত সকল উপাস্য-মা'বুদ অস্বীকার করা। সাথে সাথে এ বিশ্বাস সুদৃঢ় করা যে, আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোন উপাস্য নেই। আল্লাহ ছাড়া যাদের এবাদত করা হচ্ছে সব অসাড়। যে কেউ এ সমস্ত কাজ করে সে আল্লাহর উপর অপবাদ আরোপ করে, হোক না সে উপাস্য (মা'বুদ) নৈকট্য প্রাপ্ত ফেরেস্তা, প্রেরিত রসূল, নেককার ওলী, পাথর, গাছ, চন্দ্র, দল, গোষ্টি-জ্ঞাতি, অথবা কোন সংবিধান... ইত্যাদি। এরশাদ হচ্ছে— فَمَنْ يَكْفُرْ بِالطَّاغُوتِ وَيُؤْمِنْ بِاللَّهِ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَى لَا انْفِصَامَ لَهَا وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ ﴿২৫৬﴾. (سورة البقرة : ২৫৬) 'যে তাগুতকে অস্বীকার করবে এবং আল্লাহতে বিশ্বাস স্থাপন করবে সে ধারণ করে সুদৃঢ় হাতল যা ভাংগবার নয়। আর আল্লাহ সবই শুনেন এবং জানেন।'১ وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللهَ وَاجْنِبُوا الطَّاغُوتَ. (سورة النحل ৩৬) 'আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যেই রসূল প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে, তোমরা আল্লাহর এবাদত কর এবং তাগুতকে বর্জন কর।'২ রসূল সা. বলেছেন— من قال لا إله إلا الله وكفر بما يعبد من دون الله حرم ماله ودمه، وحسابه على الله عز وجل. 'যে لا إله إلا الله বলেছে এবং আল্লাহ ছাড়া সকল উপাস্যকে অস্বীকার করেছে তার সম্পদ ও জীবন হারাম হয়ে গেছে এবং তার হিসাব আল্লাহর উপর ন্যস্ত।'
হে মুসলিম ভাই! তুমি ভাল করে জেনে নাও: জান্নাতের সৌভাগ্য লাভ করা, জাহান্নাম হতে মুক্তি পাওয়া এ কালেমার উপর অটল, অবিরাম অবিচল থেকে আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করা ব্যতিত সম্ভব নয়। এরশাদ হচ্ছে— يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنْتُمْ مُسْلِمُونَ ﴿১০২﴾. (سورة آل عمران: ১০২) 'হে ঈমানদারগণ, আল্লাহকে যেমন ভয় করা উচিত ঠিক তেমন ভাবে ভয় করতে থাক এবং অবশ্যই মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না।'১ রসূল সা. বলেছেন:— من مات لا يشرك بالله شيئا دخل الجنة. 'আল্লাহ তাআলার সাথে শিরক না করে যে ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করল, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।' অন্যত্র বলেন— ما من عبد قال لا إله إلا الله ثم مات على ذلك إلا دخل الجنة. 'যে ব্যক্তি لا إله إلا الله বলেছে অতঃপর এর উপর স্থির থেকে মারা গিয়েছে সে অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করবে।'
পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি এই কালেমা ভিন্ন অন্য কোন নীতির উপর স্থির থেকে আল্লাহর সমীপে উপস্থিত হবে এবং শিরক করা অবস্থায় মারা যাবে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। এরশাদ হচ্ছে— إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ. (سورة النساء : ৪৮) 'নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন না, যে লোক তার সাথে শরীক করে। তিনি ক্ষমা করেন এর নিম্ন পর্যায়ের পাপ- যার জন্য তিনি ইচ্ছা করেন।'২ অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে— إِنَّهُ مَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهُ فَقَدْ حَرَّمَ اللهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنْصَارٍ ﴿৭২﴾. (سورة المائدة: ৭২) 'নিশ্চয় যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার সাথে অংশিদার স্থির করে, আল্লাহ তাআলা তার জন্যে জান্নাত হারাম করে দেন এবং তার বাসস্থান জাহান্নাম। অত্যাচারিদের কোন সাহায্যকারী নেই।'৩ রসূল সা. বলেছেন— مَن لَقِيَ اللهَ لاَ يُشْرِكُ بِهِ شَيْئاً دَخَلَ الجَنَّةَ، وَمَن لَقِيَهُ يُشْرِكُ بِهِ شَيْئاً دَخَلَ النَّارَ. 'যে শিরক মুক্ত অবস্থায় আল্লাহ তাআলার সাথে সাক্ষাত করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে ব্যক্তি শিরকে জড়িত হয়ে আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হবে, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।'
محمد رسول الله এর সাক্ষ্য প্রদানের অর্থ: মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ দায়িত্ব প্রাপ্ত, রসূল। এরশাদ হচ্ছে— قُلْ يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعاً. (سورة الأعراف:১৫৮) 'বলে দাও, হে সকল মানব মন্ডলী! আমি তোমাদের প্রতি আল্লাহর প্রেরিত রসূল।'১ অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে— মُّحَمَّدٌ رَسُولُ الله. (سورة محمد : ২৯) 'মুহাম্মদ আল্লাহর রসূল।'২ অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে— تَبَارَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَى عَبْدِهِ لِيَكُونَ لِلْعَالَمِينَ نَذِيرًا ﴿১﴾. (سورة الفرقان: ১) 'পরম করুনাময় তিনি, যিনি তার বান্দার প্রতি ফয়সালার গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছেন। যাতে সে বিশ্বজগতের জন্যে সতর্ককারী হয়।'৩
'আল্লাহ তাআলা তাকে শিরকসহ সমস্ত অপসন্দ-পরিত্যাজ্য কার্যকলাপ হতে ভীতি প্রদর্শনকারী, নির্ভেজাল তাওহিদসহ সমস্ত পছন্দনীয়-গ্রহণীয় কার্যকলাপের দিকে আহবানকারী রূপে প্রেরণ করেছেন।' এরশাদ হচ্ছে— قُمْ فَأَنْذِرْ ﴿২﴾ وَرَبَّكَ فَكَبِّرْ (৩). (سورة المدثر : ২-৩) 'উঠুন সতর্ক করুন, আপন পালনকর্তার মহত্ব ঘোষণা করুন।'৪
অর্থাৎ তাদেরকে শিরক হতে এবং মূর্তি পূজা হতে ও আল্লাহ কর্তৃক সমস্ত অস্বীকৃতির জিনিস হতে ভীতি প্রর্দশন করুন। তাওহিদ ও আল্লাহর অনুমোদিত বিধান মতে তার বড়ত্ব বর্ণনা করুন। আল্লাহ তাআলা বলেন— إِنَّا أَرْسَلْنَاكَ بِالْحَقِّ بَشِيرًا وَنَذِيرًا. (الفاطر: ২৪) 'আমি আপনাকে সত্য ধর্মসহ পাঠিয়েছি সুসংবাদ দাতা ও সতর্ককারী রূপে।'১ অর্থাৎ আমি তাকে তওহীদ, আনুগত্য ও অধিক সওয়াবের সুসংবাদ দানকারী হিসেবে প্রেরণ করেছি সাথে সাথে শিরক, গুণাহ ও কঠিন শাস্তির ভীতি প্রদর্শকও করেছি। অধিকন্তু আল্লাহ তাআলা তাকে শুধু পৌঁছিয়ে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন এবং এখানেই যথেষ্ট করতে বলেছেন। এর পর কে মানলো আর কে মানলো না এ ব্যাপারে তাকে জিজ্ঞাবাদ করা হবে না। এরশাদ হচ্ছে— يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِّغْ مَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ مِنْ رَبِّكَ وَإِنْ لَمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَهُ . (سورة المائدة : ৬৭) 'হে রসূল, পৌঁছে দিন আপনার প্রতিপালকের পক্ষ হতে আপনার প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে। আর যদি আপনি এরূপ না করেন, তবে আপনি তার পয়গাম কিছুই পৌঁছালেন না।'২ অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে— مَا عَلَى الرَّسُولِ إِلَّا الْبَلَاغُ. (سورة المائدة: ৯৯) 'রসূলের দায়িত্ব শুধু পৌঁছিয়ে দেয়া।'৩ তিনি আমৃত্যু তার উপর প্রেরিত ওহী সংযোজন-বিয়োজন ব্যতীত হুবহু আমাদের পর্যন্ত পৌছে দিয়েছেন। যার আদিষ্ট হয়েছেন তা পঙ্খানুপুঙ্খ আদায় করেছেন। উম্মতের কল্যাণ কামনার সর্বশেষ উদাহরণটুকু পেশ করেছেন। এ জন্য আয়েশা রা. বলেছেন— من حدثك أن محمدا صلى الله عليه وسلم كتم شيئا مما أنزل الله فقد كذب. ولوكان كاتما شيئا لكتم عبس وتولى. ليس لك من الأمر شي.
'যদি কেউ তোমাকে বলে, মুহাম্মদ ওহীর কিয়দাংশ গোপন করেছেন, সে মিথ্যুক। কারণ যদি রসূল সা. কোন জিনিস গোপন করতেন, তাহলে অবশ্যই অত্র আয়াত দু'টি গোপন করতেন: عَيْسَ وَتَوَلَّى (عبس : ১) 'তিনি ভ্রু কুঞ্চিত করলেন এবং মুখ ফিরিয়ে নিলেন।'১ لَيْسَ لَكَ مِنَ الْأَمْرِ شَيْءٌ (سورة آل عمران: ১২৮) 'এ ব্যাপারে আপনার কোন করণীয় নেই।'২
রসূল সা. আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে যা পৌঁছিয়েছেন তাই সম্পূর্ণ দ্বীন। কোনো ধরনের কমতি রাখেননি, যেখানে সংযোজন প্রয়োজন হবে। কোন ধরণের জটিলতা রাখেননি, যা দূরভীত করতে হবে। আবার এমনো সংক্ষিপ্ত সাড় করেননি, যেখানে ব্যাখ্যার প্রয়োজন হবে। এরশাদ হচ্ছে— الْيَوْমَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا. (سورة المائدة: ৩) আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পূর্নাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার অবদান সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্যে দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।৩ অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে— وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَابَ تِبْيَانًا لِكُلِّ شَيْءٍ. (سورة النحل : ৮৯) 'আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি সেটি এমন যে, তা প্রত্যেক বস্তুর সুস্পষ্ট বর্ণনা।' ৪
অতএব যে কোন ব্যক্তির এতে সংযোজন বিয়োজন বা পরিবর্তনের সুযোগ নেই। এ ঘোষণা শুনার পর যদি কেউ তাতে কোন রকম পরিবর্তন করে, তবে পরিবর্তনকারীর উপর এর পাপ বর্তাবে। আল্লাহ তাকে সময় মত পাকড়াও করবেন।
محمد رسول الله এর সাক্ষ্যের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রাসঙ্গিক শর্তসমুহ:
যে কোন বান্দার মুহাম্মদ রসুলুল্লাহ এর সাক্ষ্য প্রদান করার ফলে কয়েকটি জিনিস অত্যাবশ্যকীয় হয়ে যায়। তন্মেধ্যে গুরুত্ব পূর্ণ হলো:
১. ইহকাল ও পরকালের ব্যাপারে অতীত ও ভবিষ্যত সংক্রান্ত যে সব সংবাদ রসূল সা. দিয়েছেন সে ব্যাপারে সত্যারোপ করা। এরশাদ হচ্ছে— وَما أَتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ. (الحشر: ৭) 'রসূল সা. তোমাদেরকে যা দেন তা গ্রহণ কর।'১ অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে— فَإِنْ كَذَّبُوكَ فَقُلْ رَبُّكُمْ ذُو رَحْمَةٍ وَاسِعَةٍ وَلَا يُرَدُّ بَأْسُهُ عَنِ الْقَوْمِ الْمُجْرِمِينَ ﴿ سورة الأنعام ১৪৭ ﴾: 'যদি তারা আপনাকে মিথ্যাবাদী বলে, তবে বলে দিন- তোমার প্রতিপালক সুপ্রশস্ত করুনার মালিক। তার শাস্তি অপরাধীদের উপর থেকে টলবে না।'২
২. রসূল সা. এর আদেশ পালন করে ও নিষেধ হতে বিরত থেকে যথাযথ তার অনুসরণ করার প্রমাণ দেয়া। এরশাদ হচ্ছে— مَنْ يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ وَمَنْ تَوَلَّى فَمَا أَرْসَلْنَاكَ عَلَيْهِمْ حَفِيظًا ( سورة النساء : ৮০ ﴾ 'যে লোক রসূলের হুকুম মান্য করল সে আল্লাহরই হুকুম মান্য করল। আর যে লোক বিমূখতা অবলম্বন করল, আমি তোমাকে (হে মুহাম্মদ) তাদের জন্য রক্ষক নিযুক্ত করে পাঠাইনি।'৩ অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে— وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَإِنَّ لَهُ نَارَ جَهَنَّمَ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ﴿سورة الجن : ২৩﴾ 'যে কেউ আল্লাহ ও তার রসূলের অমান্য করে, তার জন্যে রয়েছে জাহান্নামের অগ্নি। তথায় তারা চিরকাল থাকবে।'৪
৩. একমাত্র তার আনুগত্য করা অন্য কারো পথ বা পদ্ধতির অনুকরণে না চলা। এরশাদ হচ্ছে— وَمَنْ يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَنْ يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ ﴿ سورة آل عمران : ৮৫ ﴾ 'যে লোক ইসলাম ছাড়া অন্য কোন ধর্ম অন্বেষণ করে, কস্মিন কালেও তা গ্রহণ করা হবে না এবং আখেরাতে সে হবে ক্ষতিগ্রস্ত।'১ রসূল সা. বলেছেন: من عمل عملا ليس عليه أمرنا فهو رد. 'যে এমন আমল করল যার প্রতি আমাদের নির্দেশ নেই, তা পরিত্যক্ত, পরিত্যাজ্য ও প্রত্যাখ্যাত।' অন্যত্র বলেন— كل أمتي يدخلون الجنة إلا من أبى، قالوا: ومن أبى يارسول الله ؟ قال: من أطاعني دخل الجنة ومن عصاني فقد أبي. 'আমার উম্মতের প্রত্যেকেই জান্নাতে প্রবেশ করবে, তবে প্রত্যাখ্যানকারী ব্যতীত। তারা জিজ্ঞেস করল: হে আল্লাহর রসূল সা. প্রত্যাখ্যানকারী কে? তিনি বললেন, যে আনুগত্য করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে অবাধ্য হবে সেই প্রত্যাখ্যানকারী।'
৪. পরিপূর্ণ রূপে রসূল সা. এর আদর্শে আদর্শবান হওয়া। এরশাদ হচ্ছে— لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا ﴾ سورة الأحزاب : ২১﴾ 'যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্যে রসূলুল্লাহর মধ্যে উত্তম নমুনা রয়েছে।'২
৫. সমস্ত বিরোধপূর্ণ বিষয়ে রসূল সা. এর মীমাংসার শরনাপন্ন হওয়া, সে মীমাংসাতে সন্তুষ্ট থাকার সাথে সাথে ন্যায় ও ইনসাফের বিশ্বাস রাখা। এরশাদ হচ্ছে— فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيما ( سورة النساء : ৬৫﴾ 'অতএব তোমার পালনকর্তার শপথ! তারা কখনো ঈমানদার হতে পারবে না, যে পর্যন্ত তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক বলে মেনে না নেয়। তৎপর তুমি যে বিচার করবে তা দ্বিধাহীন অন্তরে গ্রহণ না করে এবং ওটা সন্তুষ্ট চিত্তে কবুল করে।'১
৬. রসূল সা. এর ব্যাপারে বাড়াবাড়িতে লিপ্ত না হওয়া এবং অবজ্ঞা ও অবাধ্যতা হতে বিরত থাকা: আল্লাহ যতটুকু সম্মান দান করেছেন, ততটুকু সম্মান তাকে প্রদান করা। ইশাদ হচ্ছে— مَا كَانُ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِنْ رِجَالِكُمْ وَلَكِنْ رَسُولَ اللهَ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ (سورة الأحزاب : ৪০) 'মুহাম্মদ তোমাদের কোন ব্যক্তির পিতা নন, বরং তিনি আল্লাহর রসূল এবং শেষ নবী।'২
সুতরাং এমন কোন ধারনা পোষণ করবে না যা আল্লাহর রুবুবিয়‍্যাতের সাথে শিরকের শামিল। যেমন— রসুল সা. এর জন্য আল্লাহর ন্যায় কিছু বৈশিষ্ট রয়েছে এমন বিশ্বাস পোষণ করা। যেমন— তিনি গায়েব জানেন, দুনিয়ার আবর্তন ও বিবর্তনের অধিকার রাখেন, উপকার ও ক্ষতি করার সামর্থ রাখেন, কিছু দিতে পারেন, বঞ্চিত করতে পারেন ইত্যাদি। অথবা এমন বিশ্বাস পোষণ করা যাবে না, যা আল্লাহর উলুহিয়‍্যাতের সাথে শিরকের শামিল, যেমন— কুরবানী, মান্নত, সাহায্যের আবেদন, সুপারিশ প্রার্থনা, ভরসা, ভয় ও আশা ইত্যাদির ব্যাপারে তার শরনাপন্ন হওয়া। উল্লিখিত যাবতীয় এবাদত একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্য। যে নবী সা. এর ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করবে সে প্রকারন্তরে তার বিরোধীতায় ও অবধ্যতায় লিপ্ত হবে। যেমন তিনি বলেছেন— لا تطروني كما أطرت النصارى ابن مريم، فإنما أنا عبد فقولوا عبد الله ورسوله. 'তোমরা আমার ব্যাাপারে বাড়াবাড়ি করো না, যেমন নাসারারা মরিয়ম তনয় ঈসার ব্যাপারে করেছে। নিঃসন্দেহে আমি আল্লাহর বান্দা। সুতরাং তোমরা আমাকে তার বান্দা এবং রসূল বলো।' যেহেতু আল্লাহ তাআলা জানতেন যে, কতিপয় লোক রসূল সা.কে নিয়ে বাড়াবাড়ি করবে। তাই তিনি উম্মতকে স্বীয় সাধ্য ও সামর্থ্যের কথা জানিয়ে দেয়ার জন্য রসূলকে নির্দেশ দিয়েছেন। এরশাদ হচ্ছে— قُلْ لَا أَقُولُ لَكُمْ عِنْدِي خَزَائِنُ اللَّهَ وَلَا أَعْلَمُ الْغَيْبَ وَلَا أَقُولُ لَكُمْ إِنِّي مَلَكٌ إِنْ أَتَّبِعُ إِلَّا مَا يُوحَى إِلَيَّ. (الأنعام: ৫০) ‘আপনি বলুন, আমি তোমাদেরকে বলি না যে আমার কাছে আল্লাহর ভান্ডার রয়েছে। তা ছাড়া আমি অদৃশ্য বিষয় অবগতও নই। আমি এমন বলি না যে, আমি ফেরেস্তা। আমি তো শুধু ঐ ওহীর অনুসরণ করি, যা আমার কাছে আসে।’১ অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে— قُلْ لَا أَمْلِكُ لِنَفْسِي نَفْعًا وَلَا ضَرًّا إِلَّا مَا شَاءَ اللهُ وَلَوْ كُنْتُ أَعْلَمُ الْغَيْبَ لَاسْتَكْثَرْتُ مِنَ الْخَيْرِ وَمَا مَسَّنِيَ السُّوءُ إِنْ أَنَا إِلَّا نَذِيرٌ وَبَشِيرٌ لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ ﴿১৮৮) . (سورة الأعراف: ১৮৮) ‘আপনি বলে দিন, আমি আমার নিজের কল্যাণ বা অকল্যাণ সাধনের মালিক নই, কিন্তু যা আল্লাহ চান, আর আমি যদি গায়েবের কথা জানতাম, তাহলে বহু মঙ্গল অর্জন করে নিতাম এবং কোন অমঙ্গল আমাকে কখনও স্পর্শ করতে পারতো না। আমি তো শুধু মাত্র ঈমানরদের জন্য একজন ভীতি প্রদর্শক ও সুসংবাদ দাতা।’২ অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে— قُلْ إِنِّي لَا أَمْلِكُ لَكُمْ ضَرًّا وَلَا رَشَدًا ﴿২১﴾ قُلْ إِنِّي لَنْ يُجِيرَنِي مِنَ اللَّهَ أَحَدٌ وَلَنْ أَجِدَ مِنْ دُونِهِ مُلْتَحَدًا ﴿২২﴾ إِلَّا بَلَاغًا مِنَ اللَّهَ وَرِسَالَاتِهِ وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَإِنَّ لَهُ نَارَ جَهَنَّمَ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ﴿سورة الجن : ২১-২৩﴾ ‘বলুন, আমি তোমাদের ক্ষতি কিংবা কল্যাণ করার ক্ষমতা রাখি না। বলুন, আল্লাহর কবল থেকে কেউ আমাকে রক্ষা করতে পারবে না। এবং তিনি ব্যতীত আমি কোন আশ্রয়স্থল পাব না। কিন্তু আল্লাহর বাণী পৌঁছানো ও তার পয়গাম প্রচার করাই আমার কাজ। যে আল্লাহ ও তার রসূলের অমান্য করবে, তার জন্যে রয়েছে জাহান্নামের অগ্নি। তথায় তারা চিরকাল থাকবে।’৩
তদ্রুপ তাকে ঐ সমস্ত বৈশিষ্টহীন মনে করা, যার দ্বারা আল্লাহ তাআলা তাকে ভূষিত করেছেন, এটাও এক ধরনের বাড়াবাড়ি। যেমন আল্লাহ তাআলা তাকে সমস্ত সৃষ্টি জীবের উপর শ্রেষ্টত্ব দান করেছেন, রেসালাতের দায়িত্ব, সুসংবাদদান ও সতর্করণের দায়িত্ব প্রদান করেছেন, অলৌকিক ঘটনাবলীর দ্বারা স্বীয় নবুয়্যতের সত্যতা প্রমান করার ক্ষমতা প্রদান করেছেন। কতিপয় অদৃশ্য জ্ঞানের ইলম এবং হাওযে কাউসার প্রভৃতি দান করেছেন। এ সকল নেয়ামত ও পুরুস্কারের প্রতি বিশ্বাস রাখা, অতিরঞ্জন ও সীমালঙ্ঘন হতে— যা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে দুনিয়া-আখেরাতে ধ্বংসের ঘাটে নিয়ে যাবে— বিরত থাকা।
এখানে আমরা আল্লাহ তাআলা কর্তৃক তার রসূল সা.কে প্রদত্ত্ব কতিপয় স্বাতন্ত্র ও বৈশিষ্ট নিয়ে আলোচনা করছি, যা পূর্বের কোনো নবীকে দেয়া হয়নি। যার ব্যাপারে রসূল সা. স্বয়ং বলেছেন, এরশাদ হচ্ছে— فضلت على الأنبياء بست : أعطيت جوامع الكلم . ونصرت بالرعب، وأحلت لي الغنائم، وجعلت لي الأرض مسجدا وطهورا، وأرسلت إلى الخلق كافة، وختم بي النبيون. 'আমাকে ছয়টি জিনিসের মাধ্যমে অন্যান্য নবীদের উপর প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। ১. পরিপূর্ণ অর্থবহ সংক্ষিপ্ত বাক্যবিন্নাশ। ২. শত্রুপক্ষের অন্তরে আতংক। ৩. আমার জন্য গণীমতের সম্পদ বৈধ। ৪. সকল যমিন আমার জন্য মসজিদ ও পত্রিতা অর্জন করার মাধ্যম। ৫. আমাকে সকল মানষের নিকট প্রেরণকরা হয়েছে। ৬. এবং আমার দ্বারা নবুয়্যতের পরিসমাপ্তি ঘটানো হয়েছে।
উম্মতের উপর রসূল সা. এর কতিপয় অধিকার: ১. রসূল সা. এর মহব্বত অবশ্য কর্তব্য, অতীব আবশ্যক। ধন-সম্পদ, নিজের জীবন, পিতা-মাতা, সন্তান, পরিবার-পরিজন ও সমস্ত মানুষের মহব্বতের উপর তার মহব্বতকে অগ্রাধিকার দেয়া। রসূল সা. বলেছেন: لا يؤمن أحدكم حتى أكون أحب إليه من أهله وماله والناس أجمعين. 'ততক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের কেউ ঈমানদার হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি তার নিকট পরিবার-পরিজন, সম্পদ ও সমস্ত মানুষ হতে অধিক প্রিয় না হবো।' ২. তার উপর দরদ ও সালাম পাঠ করা। এরশাদ হচ্ছে— إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا ﴿৫৬﴾. (الأحزاب : ৫৬) 'আল্লাহ তাআলা ও তার ফেরেস্তাগণ নবীর উপর রহমত প্রেরণ করে। হে মুমিন গণ! তোমরা নবীর জন্যে রহমতের দোয়া কর এবং তার প্রতি সালাম প্রেরণ কর।'
৩. তার কল্যাণ কামনা করা। অর্থাৎ তার সুন্নত ও শরীয়তের হেফাজত ও রক্ষণা বেক্ষণ করা যাতে এর ভিতর কোন ধরনের সংযোজন-বিয়োজন, পরিবর্তন বা পরিবর্ধন না হতে পারে। রসূল সা. বলেছেন, الدين النصيحة ثلاثا قلنا: لمن يارسول الله؟ قال: الله عز وجل، ولكتابه، و لرسوله ولأئمة المسلمين، وعامتهم. 'দ্বীন কল্যাণ কামনার নাম: তিন বার বলেছেন, আমরা পশ্ন করলাম: কার জন্য কল্যাণ কামনা হে আল্লাহর রসূল? তিনি বললেন: আল্লাহর জন্য, তার কিতাবের জন্য, তার রসূলের জন্য, মুসলমানদের প্রতিনিধিদের জন্য এবং সমস্ত মানুষের জন্য।'
৪. রসূল সা. এর আহলে বায়তের ব্যাপারে তার উপদেশ যথাযথ পালন করা। আহলে বায়ত অর্থাৎ হাশেম ও আব্দুল মুত্তালিব এর বংশধর ও রসূল সা. এর স্ত্রীগণ। মুসলমান মাত্রই তার বংশধর এর পবিত্রতা এবং রসূল এর সাথে নৈকট্যতার প্রতি বিষেশ দৃষ্টি দিবে। অর্থাৎ তাদের অভাব মোচন করবে, মহব্বত করবে, তাদের সম্মান রক্ষা করবে। যেহেতু গাদিরে খুম এর দিন রসূল সা. স্বীয় পরিবারের সদস্যদের ব্যাপারে বলেছেন— أذكركم الله في أهل بيتي. 'আমি তোমাদেরকে আমার আহলে বায়তের ব্যাপারে আল্লাহকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি।'
৫. তার সাহাবাদের মহব্বত করা এবং তাদের বিশ্বস্ততার উপর আস্থা রাখা: প্রত্যেক মুসলমানের ঈমানী দায়িত্ব রসূল সা. এর সাহাবাদের মহব্বত করা। তাদের বিশ্বস্ততার উপর আস্থা রাখা। তাদের সকলের শ্রেষ্টত্বের ঘোষণা দেয়া। তাদের মাঝে সংঘটিত হয়ে যাওয়া বিরোধ নিয়ে সামালোচনা হতে বিরত থাকা। তাদের নামের সাথে রাদিয়াল্লাহু আনহুম বলা। তাদের ব্যাপারে অন্তর পরিচ্ছন্ন রাখা। তাদের কারো প্রতি বিদ্বেষ না রাখা। তাদের অপবাদ, গালি, কুৎসা রটনা ইত্যাদি হতে নিজের মুখ নিরাপদ রাখা। রসূল সা. বলেছেন— لا تسبوا أصحابي، فوالذي نفسي بيده لو أن أحدكم أنفق مثل أحد ذهبا ما بلغ مد أحدهم ولا نصيفه. 'তোমরা আমার সাহাবাদের গালি দিও না। তোমরা আমার সাহাবাদের গালি দিও না। যার হাতে আমার জান তার শপথ করে বলছি: তোমাদের কেউ ওহুদ পাহাড় পরিমান দান করলেও তাদের এক অঞ্জলী বা তার অর্ধেকর সমানও হবে না।'
সাক্ষ্য ভঙ্গ ও ধর্মচ্যুত হয়ে যাওয়ার অনেক কারণ রয়েছে। বর্তমান যুগে যাতে মানুষ সচারাচর লিপ্ত হয়, তার মধ্য হতে গুরুত্বপূর্ণ কতিপয় কারণ নিম্নে উল্লেখ করা হল। ১. আল্লাহ তাআলার এবাদতে অন্য কাউকে শরীক করা: অর্থাৎ শিরকে আকবরের কোনো প্রকারে লিপ্ত হওয়া। যে কারণে সে দ্বীন হতে বের হয়ে যাবে। জাহান্নামে প্রবেশ করবে এবং সেখানে স্থায়ীভাবে থাকবে। যেমন— আল্লাহর জন্য এবং মূর্তির জন্য সেজদাহ করা। আল্লাহ এবং তার সাথে অন্য কাউকে শরীক করে কুরবানী করা। মান্নত করা। খানায়ে কা'বা, কবর এবং মূর্তির চার পাশে তওয়াফ করা। এরশাদ হচ্ছে— إِنَّهُ مَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنْصَارٍ ﴿المائدة: ৭২﴾ 'নিশ্চয় যে আল্লাহ তাআলার সাথে অংশিদার স্থির করে, আল্লাহ তাআলা তার জন্যে জান্নাত হারাম করে দেন এবং তার বাসস্থান হয় জাহান্নাম। অত্যাচারীদের কোন সাহায্যকারী নেই।'১
অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে— إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدِ افْتَرَى إِثْمًا عَظِيمًا (النساء : ৪৮) 'নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন না, যে লোক তার সাথে কাউকে শরীক করে। তিনি ক্ষমা করেন এর নিম্ন পর্যায়ের পাপ, যার জন্য তিনি ইচ্ছা করেন। আর যে লোক আল্লাহর সাথে অংশিদার সাব্যস্ত করল, সে মারাত্মক অপবাদ আরোপ করল।'২
২. শিরকে আকবার বা বড় ধরনের শিরক করা : যেমন— আল্লাহর অস্তিত্ব অস্বীকার করা, অথবা তার কোন কাজ অস্বীকার করা। যেমন— সৃষ্টি করণ, মালিকানা, পরিকল্পনা করা, অথবা আল্লাহ তাআলার গুণাগুণের কোন একটিকে তার মাখলুকের সাথে সম্পৃক্ত করা। কিয়ামতের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করা। শরীয়ত ও রেসালতকে মিথ্যারোপ করা। আল্লাহ ও তাঁর রসূল এর আদেশ প্রত্যাখ্যান করা ও অহমিকা প্রদর্শন করা। দ্বীনের জরুরী প্রমাণ্য বিষয়গুলো অস্বীকার করা। এরশাদ হচ্ছে— وَإِذْ قُلْنَا لِلْمَلَائِكَةِ اسْجُدُوا لِآدَمَ فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلِيسَ أَبَى وَاسْتَكْبَرَ وَكَانَ مِنَ الْكَافِرِينَ ﴿البقرة : ৩৪﴾ 'এবং যখন আমি আদমকে সেজদা করার জন্য ফেরেস্তাগণকে নির্দেশ দিলাম, তখনই ইবলিস ব্যতীত সবাই সিজদা করল। সে নির্দেশ পালন করতে অস্বীকার করল এবং অহংকার প্রদর্শন করল। ফলে সে কাফেরদের অর্ন্তভুক্ত হয়ে গেল।'১ অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে— وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ أَمِنُوا بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ قَالُوا نُؤْمِنُ بِمَا أُنزِلَ عَلَيْنَا وَيَكْفُرُونَ بِمَا وَرَاءَهُ وَهُوَ الْحَقُّ مُصَدِّقًا لِمَا مَعَهُمْ قُلْ فَلِمَ تَقْتُلُونَ أَنْبِيَاءَ اللَّهِ مِنْ قَبْلُ إِنْ كُنتُمْ مُؤْمِنِينَ ﴿البقرة : ৯১﴾ 'যখন তাদেরকে বলা হয়, আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর, তখন তারা বলে— যা আমাদের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে আমরা তাই বিশ্বাস করি, এবং তাছাড়া যা রয়েছে তা তারা অবিশ্বাস করে, অথচ তাদের কাছে যা আছে এ গ্রন্থ তার সত্যতা প্রমাণ করে। তুমি বল যদি তোমরা বিশ্বাসীই ছিলে, তবে ইতিপূর্বে আল্লাহর নবীগনকে হত্যা করেছিলে?'২ وَمَنْ يَرْتَدِدْ مِنْكُمْ عَنْ دِينِهِ فَيَمُتْ وَهُوَ كَافِرٌ فَأُولَئِكَ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَأُولَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ ﴿البقرة : ২১৭﴾ 'তোমাদের মধ্যে যে স্বধর্ম হতে ফিরে যায়, এবং কাফের অবস্থাতেই তার মৃত্যু ঘটে, দুনিয়া-আখেরাত উভয় জগতেই তাদের কর্ম ব্যর্থ। তারা জাহান্নামের অধিবাসি, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে।৩
৩. বড় ধরনের নেফাক : যেমন বাহ্যিক ভাবে ইসলাম প্রকাশ করা, অন্তরে অস্বীকৃতি ও কুফরী গোপন করা। অথবা বাহ্যিক ভাবে ইসলামের প্রতি মহব্বত প্রকাশ করা, অন্তরে ইসলামকে ঘৃণা করা, অপছন্দ করা, এর বিলুপ্তি কামনা করা। অথবা বাহ্যিক ভাবে মুসলিম মুজাহিদদের পরাজয় এবং শত্রুদের ষড়যন্ত্রের কারণে চিন্তিত হওয়া, আন্তরিক ভাবে এ জন্য খুশি হওয়া। অথবা বাহ্যিক ভাবে দ্বীনের কাজ করা। এর প্রতি আহবান জানানো, এ জন্য জেহাদ করা, ভিতরে ভিতরে এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা। মুসলমানদের বিপক্ষে গোয়েন্দাগিরী করা। মুসলমানদের সমূলে নিঃশেষ করার ষড়যন্ত্রের চেষ্টা করা। এরশাদ হচ্ছে— وَإِذْ يَقُولُ الْمُنَافِقُونَ وَالَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ مَرَضٌ مَا وَعَدَنَا اللَّهُ وَرَسُولُهُ إِلَّا غُرُورًا ﴿১২﴾. (الأحزاب: ১২) 'এবং মুনাফিরা ও যাদের অন্তরে ব্যধি ছিল তারা বলছিলঃ আল্লাহ এবং তাঁর রসূল আমাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তা প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই না।'১ অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে— إِنَّ الْمُنَافِقِينَ يُخَادِعُونَ اللَّهَ وَهُوَ خَادِعُهُمْ . (النساء : ১৪২) 'অবশ্যই মুনাফেকরা প্রতারণা করেছে আল্লাহর সাথে, অথচ তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতারিত করে।'২ অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে— إِنَّ الْمُنَافِقِينَ فِي الدَّرْكِ الْأَسْفَلِ مِنَ النَّارِ وَلنْ تَجِدَ لَهُمْ نَصِيرًا. النساء : ১৪৫﴾ 'নিঃসন্দেহে মুনাফেকরা থাকবে দোযখের সর্ব নিম্ন স্তরে। আর তুমি তাদের জন্য কোন সাহায্যকারী কখনও পাবে না।'৩
৪. আল্লাহ তাআলা এবং তার বান্দার মাঝখানে মাধ্যস্থতাকারী সাব্যস্ত করা : আল্লাহ ব্যতিত যাদেরকে তারা ডাকে তাদের কাছে শাফায়াত বা সুপারিশ প্রার্থনা করা। অথবা তাদের উপর তাওয়াক্কুল বা ভরসা করা। অথবা এমন সব জিনিসের ব্যাপারে তাদের কল্যাণের আশা রাখা, তাদের অনিষ্টকে ভয় পাওয়া— যার ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ তায়ালা রাখেন। এরশাদ হচ্ছে— وَيَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهُ مَا لَا يَضُرُّهُمْ وَلَا يَنْفَعُهُمْ وَيَقُولُونَ هَؤُلَاءِ شُفَعَاؤُنَا عِنْدَ اللَّهِ قُلْ أَتُنَبِّئُونَ اللَّهَ بِمَا لَا يَعْلَمُ فِي السَّمَاوَاتِ وَلَا فِي الْأَرْضِ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى عَمَّا يُشْرِكُونَ ﴿১৮﴾. (يونس : ১৮) 'আর তারা উপাসনা করে আল্লাহকে বাদ দিয়ে এমন বস্তুর, যা না তাদের কোন ক্ষতি সাধন করতে পারে, না লাভ, এবং বলে এরা তো আল্লাহর কাছে আমাদের সুপারিশকারী। তুমি বলে দাও : তোমরা কি আল্লাহকে এমন বিষয়ের সংবাদ দিচ্ছ যা তিনি অবগত নন, না আকাশসমূহে আর না যমীনে? তিনি পবিত্র ও তারা যা শিরক করে তা থেকে অনেক উর্ধ্বে।'১ অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে— وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنْ يَدْعُو مِنْ دُونِ اللَّهِ مَنْ لَا يَسْتَجِيبُ لَهُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَهُمْ عَنْ دُعَائِهِمْ غَافِلُونَ ﴿৫﴾ وَإِذَا حُشِرَ النَّاسُ كَانُوا فَهُمْ أَعْدَاءً وَكَانُوا بِعِبَادَتِهِمْ كَافِرِينَ ﴿৬﴾. (الأحقاف : ৫-৬) 'সে ব্যক্তি অপেক্ষা অধিক বিভ্রান্ত আর কে যে আল্লাহর পরিবর্তে এমন কিছুকে ডাকে যা কেয়ামত পর্যন্ত তার ডাকে সাড়া দিবে না? এবং এগুলো তাদের প্রার্থনা সম্বন্ধেও অবহিত নয়। যখন মানুষকে হাশরের ময়দানে একত্রিত করা হবে, তখন তারা তাদের শত্রু হয়ে দাড়াবে এবং তাদের এবাদত করা অস্বীকার করবে।'২
৫. মুশরিকদের কাফের না বলা : অথবা তাদের কুফরীর ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করা। অথবা তাদের ধর্মকে বৈধ স্বীকৃতি প্রদান করা বা তাদের ধর্মকে সম্মান করা: কারণ আল্লাহ তাআলা তাদের কুফরীর চুরান্ত সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন এবং তাদের সাথে শত্রুতা ও সম্পর্ক ছিন্ন করার নির্দেশ দিয়েছেন— যেহেতু তাদের ভিতর শিরক, কুফর ও স্পষ্ট গোমরাহী বিদ্যমান। এরশাদ হচ্ছে— لَا يَتَّخِذِ الْمُؤْمِنُونَ الْكَافِرِينَ أَوْلِيَاءَ مِنْ دُونِ الْمُؤْمِنِينَ وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ فَلَيْسَ مِنَ اللَّهَ فِي شَيْءٍ إِلَّا أَنْ تَتَّقُوا مِنْهُمْ تُقَاةٌ آل عمران: ২৮) 'মুমিনগণ যেন অন্য মুমিনকে ছেড়ে কোন কাফেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে। যারা এরূপ করবে আল্লাহর সাথে তাদের কোন সম্পর্ক থাকবে না। তবে যদি তোমরা তাদের পক্ষ থেকে কোন অনিষ্টের আশঙ্কা কর, তবে তাদের সাথে সাবধানতার সাথে থাকবে।'৩ অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে— إِنَّ الَّذِينَ يَكْفُرُونَ بِاللَّهَ وَرُسُلِهِ وَيُرِيدُونَ أَنْ يُفَرِّقُوا بَيْنَ اللَّهَ وَرُسُلِهِ وَيَقُولُونَ نُؤْمِنُ بِبَعْضٍ وَنَكْفُرُ بِبَعْضٍ وَيُرِيدُونَ أَنْ يَتَّخِذُوا بَيْنَ ذَلِكَ سَبِيلًا ﴿১৫০﴾ أُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ حَقًّا وَأَعْتَدْنَا لِلْكَافِرِينَ عَذَابًا مُهِينًا النساء : ১৫০-১৫১﴾ 'যারা আল্লাহ ও তার রসূল এর প্রতি অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করে, তদুপরি আল্লাহ ও রসূলের প্রতি বিশ্বাসে তারতম্য করতে চায়, আর বলে যে, আমরা কতেককে বিশ্বাস করি, কিন্তু কতেককে বিশ্বাস করি না এবং এরই মধ্যবর্তী কোন পথ অবলম্বন করতে চায়। প্রকৃত পক্ষে এরাই সত্য প্রত্যাখ্যানকারী। আর যারা সত্য প্রত্যাখ্যানকারী তাদের জন্য তৈরী করে রেখেছি অপমানজনক আযাব।'
৬. নিম্নোক্ত বিশ্বাস পোষণ করা: আল্লাহ তাআলার ধর্ম ও তার রসূল সা. এর শিক্ষার তুলানায় অন্যদের ধর্ম ও শিক্ষা সয়ংসম্পূর্ণ অথবা রসূল সা. এর বিচারের তুলনায় অন্যদের বিচার ইনসাফপূর্ণ। অথবা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা বর্তমানে যুগোপযোগী নয়। অথবা ইসলাম ধর্ম নির্দিষ্ট এবাদত উৎযাপনের ভিতর সীমাবদ্ধ, মানুষের পার্থিব জীবনের বিভিন্ন শাখা প্রশাখার সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। অথবা যে কোন ব্যক্তির আল্লাহর বিধানের বিরোধিতা করার নৈতিক অধিকার রয়েছে মনে করা। অথবা কুফরী ও মানব রচিত আইন-কানুনের মাধ্যমে বিচার করা। যদিও এ কাজগুলো সম্পাদনকারী ও বাস্তবায়নকারী ব্যক্তি, শরীয়তে মুহাম্মদীর উপর আমল করে, এ দ্বীন সয়ংসম্পূর্ণ এবং বাকীসব ধর্ম ও শিক্ষার উপর এর প্রাধান্য রয়েছে বলে স্বীকার করে। এরশাদ হচ্ছে— أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يَزْعُمُونَ أَنَّهُمْ آمَنُوا بِمَا أُنزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنزِلَ مِنْ قَبْلِكَ يُرِيدُونَ أَنْ يَتَحَاكَمُوا إِلَى الطَّاغُوتِ وَقَدْ أُمِرُوا أَنْ يَكْفُرُوا بِهِ وَيُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَنْ يُضِلَّهُمْ ضَلَالًا بَعِيدًا النساء : ৬০). 'আপনি কি তাদেরকে দেখেননি, যারা দাবী করে যে, যা আপনার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে, আমরা সে বিষয়ের উপর ঈমান এনেছি এবং আপনার পূর্বে যা অবতীর্ণ হয়েছে তার প্রতিও। তারা বিরোধীয় বিষয়কে শয়তানের দিকে নিয়ে যেতে চায়। অথচ তাদের প্রতি নির্দেশ হয়েছে, যেন তারা তাকে অমান্য করে। আর শয়তান তাদেরকে প্রতারিত করে পথভ্রষ্ট করে ফেলতে চায়।'২ অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে— فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا শَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا ﴿৬৫﴾ . (سورة النساء : ৬৫) 'অতএব তোমার পালনকর্তার শপথ! তারা কখনো ঈমানদার হতে পারবে না, যে পর্যন্ত তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক বলে মেনে না নেয়। তৎপর তুমি যে বিচার করবে তা দ্বিধাহীন অন্তরে গ্রহণ না করে এবং ওটা সন্তুষ্ট চিত্তে কবুল করে।'১
৭. রসূল সা. বা তার আনীত বিধানের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা: বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যক্তি উক্ত বিধান পালন করুক বা না করুক উভয় সমান অপরাধ। এরশাদ হচ্ছে: ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ كَرِهُوا مَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأَحْبَطَ أَعْمَالَهُمْ (سورة محمد : ৯) 'এটা এজন্য যে, আল্লাহ যা নাযেল করেছেন তারা তা পছন্দ করে না, অতএব আল্লাহ তাদের কর্ম ব্যর্থ করে দিবেন।'২ ঈমানের বিপরীত কুফরীই একমাত্র আমল নস্যাৎ করে। এখানে তারা আল্লাহ তাআলার বিধানকে অপছন্দ করে কুফরি করেছে, তাই তাদের আমল আল্লাহ তাআলা বাতিল করে দিয়েছেন। অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে— وَلَوْ أَشْرَكُوا لَحَبِطَ عَنْهُمْ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ ﴿سورة الأنعام: ৮৮﴾ 'যদি তারা শিরক করতো, তবে তাদের কাজকর্ম তাদের জন্য ব্যর্থ হয়ে যেত।'৩
৮. উপহাস করা: আল্লাহ, রসূল, কুরআন, শরীয়ত, শরীয়তের কোনো নিদর্শন, সওয়াব, শাস্তি অথবা দ্বীনের উপর অবিচল ও দ্বীনের প্রতি আহবান কারীদের সাথে— দ্বীনের উপর অবিচল থাকার কারণে, দ্বীনের প্রতি আহবান জানানোর কারণে— উপহাস করা। এরশাদ হচ্ছে— قُلْ أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ ﴿৬৫﴾ لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيمَانِكُمْ . (سورة التوبة : ৬৫-৬৬) 'আপনি বলুন, তোমরা কি আল্লাহর সাথে, তার হুকুম-আহকামের সাথে এবং তার রসূলের সাথে ঠাট্টা করছিলে? ছলনা করো না, ঈমান গ্রহণের পরও তোমরা কাফের হয়ে গেছ।'১
৯. বন্ধুত্ব স্থাপন করা : মুশরিকদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করা, তাদের মহব্বত করা এবং মুসলমানদের বিপরীত তাদের সাহায্য করা। এরশাদ হচ্ছে— يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى أَوْلِيَاءَ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ وَمَنْ يَتَوَفَّهُمْ مِنْكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ ﴿৫১﴾. (سورة المائدة : ৫১) 'হে মুমিনগণ, তোমরা ইহুদী ও খ্রীষ্টানদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করো না। তারা একে অপরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে যে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে সে তাদেরই অর্ন্তভুক্ত। আল্লাহ জালেমদেরকে সুপথ প্রদর্শন করেন না।'২
১০. যাদু: যার একটি শাখা কাল চক্র: অর্থাৎ যাদুর একটি আমল যার মাধ্যমে মানুষকে তার মানবপ্রকৃতি হতে ফেরানো হয়, যেমন- স্বামীকে স্ত্রীর বিপরীত অথবা স্ত্রীকে স্বামীর বিপরীত মহব্বতের পরিবর্তে শত্রুতা করা। আরেকটি শাখা সহানুভুতি: যাদুর এমন একটি দিক আছে যার মাধ্যমে মানুষকে তার অভিষ্ট জিনিসের প্রতি শিরকের পদ্ধতিতে আকষর্ণীয় করে তোলা হয়। যে এ কাজ করল বা এতে সন্তুষ্টি প্রকাশ করল সে মূলত কুফরী করল। এরশাদ হচ্ছে— وَمَا يُعَلِّمَانِ مِنْ أَحَدٍ حَتَّى يَقُولَا إِنَّمَا نَحْنُ فِتْنَةٌ فَلَا تَكْفُرْ. (سورة البقرة : ১০২) 'তারা উভয়ে একথা না বলে কাউকে বলে শিক্ষা দিত না যে, আমরা পরিক্ষার জন্য, কাজেই তুমি কাফের হয়ো না।'৩
১১. আল্লাহর শরীয়ত এবং তার দিক নির্দেশনা হতে অন্তর-কর্ণ সহ পৃষ্ঠ প্রদর্শন করা: যদিও সে শরীয়তকে সত্যারোপ কিংবা মিথ্যারোপ কোনটাই করে না। এর সাথে বন্ধুত্ব কিংবা শত্রুতাও পোষণ করে না। এবং কোনো ভাবে এর প্রতি কর্ণপাতও করে না। এরশাদ হচ্ছে— وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنْ ذُكِّرَ بِآيَاتِ رَبِّهِ ثُمَّ أَعْرَضَ عنْهَا إِنَّا مِنَ الْمُجْرِمِينَ مُنتَقِمُونَ ﴿২২﴾. (سورة السجدة : ২২) 'যে ব্যক্তিকে তার পালনকর্তার আয়াতসমূহ দ্বারা উপদেশ দান করা হয়। অতঃপর সে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তার চেয়ে বড় যালেম আর কে? আমি অপরাধীদেরকে শাস্তি দেব' অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে— وَالَّذِينَ كَفَرُوا عَمَّا أُنْذِرُوا مُعْرِضُونَ ﴿৩﴾ . (سورة الأحقاف:৩) 'আর কাফেররা যে বিষয়ে তাদেরকে সতর্ক করা হয়েছে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।'২
উল্লেখিত সমস্ত বিষয় ঈমান বিনষ্টকারী। উপহাস, ঠাট্টা, ইচ্ছা কিংবা ভয় যেভাবেই করুক সর্বাবস্থায় তা কুফরী। তবে জবরদস্তিমুলক কাউকে কুফরী করতে বাধ্য করা হলে তার বিষয়টি আলাদা। এরশাদ হচ্ছে— إِلَّا مَنْ أُكْرِهَ وَقَلْبُهُ مُطْمَئِنُّ بِالْإِيمَانِ ﴿১০৬﴾. (سورة النحل: ১০৬) 'যার উপর জবর দস্তি করা হয় এবং তার অন্তর ঈমানের উপর অটল থাকে সে ব্যতীত।'৩ চাপ প্রয়োগকৃত ব্যক্তির কুফরীকথা বা কাজের সাথে শর্ত হলো তার অন্তর ঈমানের ব্যাপারে আস্থাশীল থাকতে হবে।

টিকাঃ
১ সূরা: মুহাম্মদ-১৯
১ সূরা: আল হুজরাত-১৫
১ সাফফাত:৩৫-৩৬।
২ সূরা: আয যুখবুক- ২৩-২৫
১ সূরা: লুকমান-২২-২৩
২ সূরা নিসা- ৬৪
১ সূরা: আল বাক্বারা-৮-১০
১ সূরা: আল বাক্বারা-১৬৫
১ সূরা: আল বায়ি‍্যনাহ-৫
১ সূরা: আল বাক্বারা-২৫৬
২ সূরা আন নাহল- ৩৬
১ সূরা: আলে ইমরান-১০২
২ সূরা: নিসা-৪৮
৩ সূরা: আল মায়েদা- ৭২
১ সূরা: আরাফ-১৫৮
২ সূরা মুহাম্মদ:২৯।
৩ সূরা: আল ফুরকান-১
৪ সূরা: আল মুদ্দাসির-২-৩
১ সূরা: ফাতের-২৪
২ সূরা আল মায়েদা- ৬৭
৩ সূরা আল মায়েদা-৯৯
১ সূরা: আবাসা-১
২ সূরা: ইমরান-১২৮
৩ সূরা আল মায়েদা-৩
৪ সূরা আন নাহল-৮৯
১ সূরা: আল হাশর-৭
২ সূরা আল আন আম-১৪৭
৩ সূরা: নিসা-৮০
৪ সূরা: জিন-২৩
১. সূরা আলে ইমরান-৮৫
২. সূরা আল আহযাব-৪০
১. সূরা: আল আন আম-৫০
২. সূরা: আল আরাফ-১৮৮
৩. সূরা: জিন:২২-২৩
১ সূরা: আল মায়েদা-৭২
২ সূরা: নিসা-৪৮
১ সূরা: বাক্বারা- ৩৪
২ সূরা: আল বাক্বারা-৯১
৩ সূরা বাকারা: ২১৭।
১ সূরা: আহযাব: ১২।
২ সূরা: নিসা: ১৪২।
৩ সূরা: নিসা: ১৪৫।
১ সূরা: ইউনুস-১৮
২ সূরা আল আহক্বাফ- ৫-৬
৩ সূরা: ইমরান-২৮
১ সূরা: নিসা-১৫০-১৫১
২ সূরা নিসা-৬০
১. সূরা: আন নিসা-৬৫
২. সূরা: মুহাম্মদ-৯
৩. সূরা: আনআম-৮৮
১ সূরা: তওবাহ-৬৫-৬৬
২ সূরা মায়েদা-৫১
৩ সূরা: বাক্বারা-১০২
১ সূরা: সাজদাহ ২২
২ সূরা: আল আহক্বাফ-৩
৩ সূরা: নাহল-১০৬

ফন্ট সাইজ
15px
17px