📄 তৃতীয় বিষয়
তাওবার মোট শর্ত পাঁচটি। যথা-
১. কৃত গুনাহ থেকে তৎক্ষণাৎ বিরত হয়ে যাওয়া।
২. কৃতকর্মের উপর লজ্জিত ও অনুতপ্ত হওয়া।
৩. ভবিষ্যতে এ গুনাহ আর কখনও না করার ব্যাপারে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হওয়া।
৪. কারও কোনো হক নষ্ট করে থাকলে কিংবা কারও উপর জুলুম করে থাকলে সে হক ফিরিয়ে দেওয়া অথবা তাদের কাছ থেকে ক্ষমা নিয়ে নেওয়া।
৫. তাওবার সময় বাকি থাকতে তাওবা করা। অতএব, মৃত্যুর যন্ত্রণা শুরু হয়ে গেলে কিংবা কেয়ামতের পূর্বে পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হয়ে যাওয়ার পর তাওবা করলে সে তাওবা গ্রহণযোগ্য হবে না।
📄 শেষ বিষয়
কৃত তাওবার উপর অটল-অবিচল থাকার উপায় ও মাধ্যমসমূহের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর একটি মাধ্যম হচ্ছে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার স্থান পরিত্যাগ করা। এমনকি সেই সব সাথি-সঙ্গীদের থেকেও দূরে থাকা, যারা পুনরায় গুনাহের দিকে আহ্বান করবে কিংবা উক্ত গুনাহের কথা স্মরণ করিয়ে দিবে। নিম্নবর্ণিত ঘটনাটি থেকে আমরা এ শিক্ষা নিতে পারি।
বিগত যুগে এক খুনী অভিবাহিত হয়েছে। সে সাধারণ কোনো খুনী ছিল না। একজন, দুইজন বা দশজনকে খুন করেনি। সে খুন করেছে নিরানব্বই জনকে। হাঁ, নিরানব্বই জন মানুষকে সে খুন করেছে।
আমি জানি না, সে মানুষের প্রতিশোধস্পৃহা থেকে কীভাবে রেহাই পেয়েছিল। হতে পারে সে একজন ভয়ঙ্কর খুনী ছিল; যার কারণে কেউ তার প্রতিবাদ করতে সাহস করত না। অথবা অনাকাঙ্ক্ষিত কারণ থাকবে হয়তো। তবে কারণ যাই হোক, বড় কথা হচ্ছে সে নিরানব্বই জনকে হত্যা করেছিল।
নিরানব্বই জনকে হত্যা করার পর এক সময় তার ভিতরে অনুশোচনা সৃষ্টি হল। সে তাওবা করার দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিল। তাই সে তৎকালীন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আলেম সম্পর্কে অনুসন্ধান করতে লাগল। লোকজন তাকে এক ব্যক্তির কথা বলল, যিনি সারাখন গির্জায় বসে উপাসনায় মগ্ন থাকেন। লোকজনও ঘৃণার্হ ছেড়ে অন্যত্র গমন করেন না এবং যার সময় অতিবাহিত হয় কামাকটি ও দোয়া-মুনাজাতের মধ্য দিয়ে। ওই ইবাদতকারী লোকটি ছিলেন নম্র মেজাজের; তবে তার ভিতর কিছুটা আবেগও কাজ করত।
খুনী সেই আবেদের কাছে গিয়ে উপস্থিত হল। নিজের আগমনের কারণ বর্ণনা করে বলল, আমি নিরানব্বই জনকে হত্যা করেছি। এখন আমি অনুতপ্ত। আমার কি এখন তাওবা করার কোনো সুযোগ আছে?
আমার ধারণা, কেউ কোনো পিঁপড়া মারলেও হয়তো ওই আবেদ সারা দিন শেষে-দুঃখে কানায় কানায় বুক ভাসিয়ে দিতেন। তা হলে যে ব্যক্তি নিরানব্বই জনকে খুন করেছে, তার ব্যাপারে তার জওয়াব কী হতে পারে?
কেঁপে ওঠলেন আবেদ। তার কল্পনায় ভেসে উঠল নিহত নিরানব্বই জনের দেহ। তিনি চিৎকার দিয়ে বললেন, না, না! তোমার মতো পাষণ্ড ও পাপীর জন্য তাওবার কোনো সুযোগ নেই। তোমার তাওবার কোনো উপায় নেই।
অন্য বিচারক সাধক থেকে এমন জবাব আশ্বর্য কিছু নয়। এমন সাধকরা আবেগপ্রবণ হয়েই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকেন।
ওই খুনী লোকটি ছিল একজন পাষণ্ড। আবেদের মুখে এই জওয়াব শুনে সে রাগে-ক্রোধায় ফুসে ওঠল। চোখ দু'টো তার লাল টকটকে হয়ে গেলো সে ক্ষণকাল দুর্বল। তারপর খঞ্জর বের করে সাধকের দেহ এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিয়ে গির্জা থেকে বের হয়ে গেলো।
এরপর আরও কিছুক্ষণ অতিবাহিত হলো। আবার অনুশোচনা জাগল খুনীর অন্তরে। আবারও সে অনুসন্ধান করতে লাগল দুনিয়ার সবচেয়ে বড় আলেমের। লোকজন তাকে একজন আলেমের সন্ধান দিল। খুনী সেই আলেমের কাছে পৌঁছল এবং তার কামরায় প্রবেশ করল। আলেমকে প্রকৃতপক্ষে একজন সচেতন মানুষ বলে মনে হল তার কাছে। বিদ্যার প্রভাব ও জ্যোতি স্পষ্ট ছিল তার চেহারায়।
খুনী সেই আলেমের সামনে দাঁড়িয়ে একেবারেই স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল, আমি একশ’ জন মানুষ খুন করেছি। এখন আমি তাওবা করতে চাইলে আমার জন্য কি তার কোনো রাস্তা আছে?
আলেম তার কথা শুনে জবাব দিলেন, তোমার মাঝে আর তোমার তাওবার মাঝে কি বাধা হতে পারে?
চমৎকার জওয়াব। আসলে তো, কে তার মাঝে আর তার তাওবার মাঝে অন্তরায় হতে পারে? দুনিয়ার কোনো শক্তিই তো তার মাঝে আর তাওবার মাঝে প্রতিবন্ধক হতে পারে না।
এই আলেম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন বিদ্যা ও শরীয়তের নিরিখে। তিনি আবেগ ও অনুরাগের বশবর্তী হয়ে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন না। তবে তিনি এতটুকু বললেন– কিন্তু তুমি থাক অসত্য অঞ্চলে।
আশ্চর্য্য ব্যাপার! তিনি কীভাবে বুঝতে পারলেন যে, খুনী অসত্য অঞ্চলে বসবাস করে?
তিনি বুঝতে পেরেছিলেন অপরাধের পরিমাণ ও প্রতিবাদের অভাব দেখা। তিনি আরও বুঝতে পেরেছিলেন, খুনীর বসবাসের এলাকায় হত্যা, জুবন ও জুলুম চলে অবাধে; কেউ মজলুমকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে না। তাই তিনি এই মন্তব্য করেছেন।
যা হোক, এই খুনীকে লক্ষ করে আলেম বললেন, তুমি তোমার এলাকা পরিত্যাগ করে অমুক অঞ্চলে চলে যাও। সেখানকার লোকজন আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন থাকেন। তুমি গিয়ে তাদের সাথে ইবাদতে মগ্ন হয়ে যাও।
তাওবা করার মূর্ত আশায় খুনী ছুটল সেই দিকে। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছার আগেই তার ইন্তেকাল হয়ে গেল। অতঃপর রহমত ও আযাবের ফেরেশতারা নেমে এলেন [তার রূহ নিয়ে যাওয়ার জন্য]। রহমতের ফেরেশতারা বললেন, লোকটি তাওবা করে নেক জীবন যাপন করার জন্য রওয়ানা দিয়েছে। অতএব, একে আমরা নিব। অপরদিকে আযাবের ফেরেশতারা বললেন, না, তার আমলনামায় একটি নেকীও নেই। অতএব, তাকে আমরাই নিব।
তখন আল্লাহ মানুষের আকৃতিতে একজন ফেরেশতা পাঠিয়ে দিলেন তাদের মাঝে ফায়সালা করে দেওয়ার জন্য। অবশেষে ফায়সালা এই হল যে, নেকী ও বদীর দুই শহরের দূরত্ব মাপা হবে। যে শহরের দিকে তার অবস্থান নিকটবর্তী হবে, সে এখানকার বাসিন্দা বলে সাব্যস্ত হবে। এর মধ্যে আল্লাহ নেকীর শহরকে হুকুম দিলেন এগিয়ে আসতে; আর বদীর শহরকে হুকুম দিলেন দূরে সরে যেতে। মাপার পর দেখা গেল, খুনী নেকীর শহরের নিকটবর্তী। ফলে রহমতের ফেরেশতারা তার রূহ নিয়ে গেলেন।
প্রিয় পাঠক! এ ঘটনা বলা আমার যে কথাটি বোঝানো উদ্দেশ্য, তা হচ্ছে- লক্ষ করুন, আলেম খুনী লোকটিকে কী বলেছেন! ‘তুমি তোমার এলাকা পরিত্যাগ করে অমুক অঞ্চলে চলে যাও। সেখানকার লোকজন আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন থাকেন। তুমি গিয়ে তাদের সাথে ইবাদতে মগ্ন হয়ে যাও।’
ঠিক তদ্রুপ, যিনি মিনা-ব্যভিচার থেকে তাওবা করতে চাইবেন, তার কর্তব্য হচ্ছে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার স্থান পরিত্যাগ করা অন্য কোথাও চলে যাওয়া। এমনিভাবে যিনি সালাত না পড়া, গানবাদ্য শোনা, সুদ-ঘুষ খাওয়াসহ শিরক-বিদআতও অন্য যেকোনো গুনাহ থেকে তাওবা করতে চাইবেন, তাদের সকলের উচিতও এমন স্থান ও সংকল্প পরিত্যাগ করা, যা তাকে পুনরায় গুণাহে লিপ্ত হতে প্ররোচিত করবে।
পরিশেষে মহান আল্লাহ ﷺ-র দরবারে প্রার্থনা- তিনি যেন আমাদের প্রত্যেককে তাঁর যথাযথ তাকওয়া ও ভয় দান করেন, যা আমাদের মাঝে এবং আমাদের গুণাসমূহের মাঝে প্রতিবন্ধক হবে; আমাদের যেন যথাযথভাবে তাঁর আনুগত্য করার তাওফীক দান করেন, যা আমাদের জান্নাত লাভের উসিলা হবে; তিনি যেন আমাদের যাবতীয় গুণাহ-খাতা ক্ষমা করে দেন, হালালের মাধ্যমে হারাম থেকে এবং তাঁর দয়া ও অনুগ্রহে তিনি ছাড়া অন্য সবকিছু থেকে আমাদের অমুখাপেক্ষী করে দেন; আমাদের তাওবা কবুল করেন, আমাদের যাবতীয় অন্যায়-অপরাধকে ধুয়ে-মুছে পাক-সাফ করে দেন। তিনি সর্বশ্রোতা, আহ্বানকারীর আহ্বান শ্রবণকারী।
وَصَلَّى اللَّهُ عَلَى النَّبِيِّ الأُمِّيِّ مُحَمَّدٍ وَآلِهِ وَصَحْبِهِ أَجْمَعِينَ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ。
সমাপ্ত