📘 তাওবাতান নাসূহা খাঁটি তাওবা > 📄 অন্যরকম একটি মৃত্যু

📄 অন্যরকম একটি মৃত্যু


প্রিয় পাঠক!
এই যুবকের অবস্থা সেই যুবকের সাথে তুলনা করে দেখুন, যার বয়স হয়েছিল ষোল বছর। সে মসজিদে বসে কুরআন তেলাওয়াত করছিল আর ফজর সালাতের ইকামতের অপেক্ষা করছিল।
সময়মতো ফজরের ইকামত হল। যুবক উঠে হাতের কুরআন শরীফটি যথাস্থানে রাখল। জামাতে শরিক হওয়ার জন্য অগ্রসর হল। ঠিক তখন সে মাথা ঘুরিয়ে জমিনে পড়ে গেলো এবং তৎক্ষণাৎ বেহুঁশ হয়ে গেলো। মসজিদের কয়েকজন মুসল্লী তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেল।
তাকে চিকিৎসাপ্রদানকারী ডাক্তার পরবর্তীতে বলেছেন, এ যুবককে আমাদের কাছে আনা হয়েছিল জানাজার মতো বহন করে। আমি তার মূত্রগ্রন্থি পরীক্ষা করে দেখলাম সে হার্টঅ্যাটাক করেছে। আরও গভীরভাবে লক্ষ করে দেখলাম, সে তার জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো অতিক্রম করছে। আমরা দ্রুত তার চিকিৎসায় রত হলাম। আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলাম তার হার্টের উন্নতির জন্য।
পাশের রুম থেকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আনার জন্য আমি আমার এক সহকর্মীকে তার পাশে রেখে গেলাম। আমি দ্রুতই ফিরে এলাম। ফিরে এসে দরজায় দাঁড়িয়ে দেখি যুবক আমার সহকর্মী ডাক্তারের হাত ধরে রেখেছেন। ডাক্তার তার কান যুবকের মুখের কাছে নিয়ে রেখেছেন। যুবক কানে কানে তাকে কিছু বলছে। এ অবস্থা দেখে আমি ভিতরে প্রবেশ করলাম না। দরজায় দাঁড়িয়ে তাদের দেখতে লাগলাম।
হঠাৎ যুবক ডাক্তারের হাত ছেড়ে দিল। এখন সে সর্বশক্তি দিয়ে ডান কানে ঘোরানোর চেষ্টা করছে। অতঃপর ভারী কণ্ঠে উচ্চারণ করল- 'আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু'। এ কালিমাটি সে বারবার পড়ছিল। ধীরে ধীরে তার হৃদস্পন্দন কমে যেতে লাগল। আমরা সর্বশক্তি দিয়ে তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু আল্লাহ ﷺ-র ফায়সালা আমাদের চেষ্টার উপর কার্যকর হল। যুবক তার রবের কাছে চলে গেল।
সঙ্গে সঙ্গে আমার সহকর্মী ডাক্তারটি কান্নায় ভেঙে পড়লেন। তিনি এত বেশি কাঁদতে লাগলেন যে, পায়ের উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না। বসে পড়লেন।
এ ঘটনা দেখে আমরা আশ্চর্যান্বিত হলাম এবং তাকে বললাম, হে অমুক! আপনার কী হয়েছে? আপনি কাঁদছেন কেন? মৃত্যুর ঘটনা তো আপনি জীবনে এই প্রথম দেখেন না! কত মানুষের মৃত্যুই তো হল আপনার চোখের সামনে।
তিনি আমাদের কথা কানে নিলেন কি না জানি না। তিনি তেমনই কেঁদে যেতে লাগলেন।
অনেকক্ষণ পর...
তার কান্নার বেগ কিছুটা কমে এলে আমরা তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনার কী হয়েছে? যুবক আপনাকে কী বলেছিল?
তিনি বললেন, ডাক্তার! যুবক যখন দেখল আপনি ব্যাস্তসমস্ত হয়ে একবার রুম থেকে বের হচ্ছেন আবার প্রবেশ করছেন, চিকিৎসার বিভিন্ন সরঞ্জাম জোগাড় করছেন, তখন সে বুঝতে পারল, আপনিই তার জন্য নিয়োজিত ডাক্তার। তাই সে আমাকে বলল- ডাক্তার! আপনি আপনার সহকর্মীকে বলুন, তিনি যেন আমার জন্য শুধু শুধু কষ্ট না করেন। আমি কিছুক্ষণের মধ্যেই মারা যাব। আল্লাহর কসম! আমি জান্নাতে আমার স্থান দেখতে পাচ্ছি।
- আল্লাহু আকবার!
إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا تَتَنَزَّلُ عَلَيْهِمُ الْمَلَائِكَةُ أَلَّا تَخَافُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَبْشِرُوا بِالْجَنَّةِ الَّتِي كُنتُمْ تُوعَدُونَ. نَحْنُ أَوْلِيَاؤُكُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ ۖ وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَشْتَهِي أَنفُسُكُمْ وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَدَّعُونَ ۚ نُزُلًا مِّنْ غَفُورٍ رَّحِيمٍ
নিশ্চয় যারা বলে, আমাদের পালনকর্তা আল্লাহ, অতঃপর তাতেই অবিচল থাকে, তাদের কাছে ফেরেশতা অবতীর্ণ হয় এবং বলে, তোমরা ভয় করো না, চিন্তা করো না এবং তোমাদের প্রতিশ্রুত জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ করো। ইহকালে ও পরকালে আমরা তোমাদের বন্ধু। সেখানে তোমাদের জন্য আছে যা তোমাদের মন চায় এবং সেখানে তোমাদের জন্য আছে যা তোমরা দাবি কর। এটা ক্ষমাশীল করুনাময়ের পক্ষ থেকে সাদর আপ্যায়ন। [সুরা হা-মীম সেজদাহ : ৩০-৩২]
আল্লাহ ﷺ-র দরবারে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের সকলকে পুণ্যময় মৃত্যু দান করেন।
হ্যাঁ, প্রিয় পাঠক! এই হচ্ছে অনুতপ্ত ও অবাধ্য বান্দার পার্থক্য। প্রকৃত পার্থক্য তো ফুটে উঠবে সেদিন-
يَوْمَ يَفِرُّ الْمَرْءُ مِنْ أَخِيهِ ❁ وَأُمِّهِ وَأَبِيهِ ❁ وَصَاحِبَتِهِ وَبَنِيهِ ❁ لِكُلِّ امْرِئٍ مِّنْهُمْ يَوْمَئِذٍ شَأْنٌ يُغْنِيهِ ❁ وُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ مُّسْفِرَةٌ ❁ ضَاحِكَةٌ مُّسْتَبْشِرَةٌ ❁ وَوُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ عَلَيْهَا غَبَرَةٌ ❁ تَرْهَقُهَا قَتَرَةٌ ❁ أُولَئِكَ هُمُ الْكَفَرَةُ الْفَجَرَةُ
যেদিন পলায়ন করবে মানুষ তার ভাইয়ের কাছ থেকে, তার মা, তার পিতা, তার পত্নী ও তার সন্তানদের কাছ থেকে। সেদিন তাদের প্রত্যেকেরই এমন গুরুতর অবস্থা হবে, যা তাকে ব্যস্তভর করে রাখবে। অনেক মুখমন্ডল সেদিন হবে উজ্জ্বল, সহাস্য ও প্রফুল্ল; এবং অনেক মুখমন্ডল সেদিন হবে ধূলি ধূসরিত। সেগুলোকে কালিমা আচ্ছন্ন করে রাখবে। তারাই কাফের পাপিষ্ঠের দল। [সুরা আবাসা : ৩৫-৪২]
তবে যারা ধৈর্য ধারণ করেছে এবং নিজেকে শাহওয়াত ও প্রবৃত্তিপূজা থেকে বিরত রেখেছে, আল্লাহ ﷺ ও তাঁর রাসূল ﷺ কর্তৃক হারামমুক্ত যাবতীয় বিষয়াদি থেকে নিজেদের দূরে রেখেছে, তাদের জন্য তাদের প্রতিপালক অঙ্গীকার করেছেন এমন জান্নাতের, যার তলদেশ থেকে প্রবাহিত নহরসমূহ।
সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে, নবীজী ﷺ ইরশাদ করেছেন, 'দুনিয়ার সর্বাধিক সচ্ছল ও ধন-সম্পদের অধিকারী এক জাহান্নামীকে কেয়ামতের দিন উপস্থিত করা হবে। এরপর তাকে জাহান্নামের আগুনে একবার অবগাহন করিয়ে বলা হবে, হে আদম সন্তান! দুনিয়াতে তুমি কখনও আরাম-আয়েশ ভোগ করেছ কি? কখনও তুমি স্বচ্ছল অবস্থায় দিন অতিবাহিত করেছ কি?
সে বলবে, আল্লাহর কসম! হে আমার রব! না; কক্ষনো না।'
হ্যাঁ, যে ব্যক্তি দুনিয়ায় যাবতীয় আরাম-আয়েশে ডুবে ছিল, সব ধরনের নেয়ামত ভোগ করেছিল, জাহান্নামের আগুনে একটি মাত্র ডুব তাকে সে সবকিছু ভুলিয়ে দিবে। তা হলে তখন তার অবস্থা কী হবে, যখন তাকে-
- সেখানে অনন্তকাল থাকতে হবে!
- প্রতিনিয়ত শাস্তি ও আযাব অসহ্য যন্ত্রণা দিতে থাকবে!
- যাখুম খেতে হবে!
- ফুটন্ত পানি ও রক্ত-পূঁজ পান করতে হবে!
- কী অবস্থা হবে তখন তার, যখন তার সাহায্যপ্রার্থনার জবাবে বলা হবে-
﴿اِخْسَئُوْا فِيْهَا وَلَا تُكَلِّمُوْنِ﴾
তোমরা হীন অবস্থায় এখানেই পড়ে থাক এবং আমার সাথে কোনো কথা বলো না। [সূরা মুমিনুন : ১০৮]
আল্লাহর কসম! তার কি তখন মনে হবে-
- সেই অশ্লীলতার কথা, যাতে সে লিপ্ত হয়েছিল?
- সেই গানবাজনার কথা, যা সে শুনেছিল?
- সেই মদ ও নেশার কথা, যা সে পান করেছিল?
- সেই ধন-দৌলত ও সম্পদের কথা, যা সে উপার্জন করেছিল?
তখন তাকে বলা হবে-
﴿اِخْسَئُوْا فِيْهَا وَلَا تُكَلِّمُوْنِ﴾
এতে [জাহান্নামে] প্রবেশ কর। অতঃপর তোমরা চেঁচামেচি কর অথবা না কর, উভয়ই তোমাদের জন্য সমান। [সূরা তুর : ১৬]
অতঃপর নবীজী ﷺ বলেছেন- 'এরপর দুনিয়ার সর্বাধিক দুঃখকষ্টসম্পন্ন এক জান্নাতীকে উপস্থিত করা হবে। তারপর তাকে একবার জান্নাতে অবগাহন করিয়ে জিজ্ঞাসা করা হবে, হে আদম সন্তান! দুনিয়াতে তুমি কখনও কোনো কষ্ট দিনাতিপাত করেছ কি? কোনো হৃদয়বিদারক ও ভয়াবহ অবস্থার সম্মুখীন হয়েছ কি?
সে বলবে, আল্লাহর কসম! হে আমার রব! আমি কখনোই কোনো কষ্ট দিনাতিপাত করিনি। দুঃখ কী জিনিস, আমি কখনও তা দেখিনি।'
হ্যাঁ, জান্নাতে ক্ষণিকের অবস্থান তাকে তার দুনিয়াবী জীবনের যাবতীয় দুঃখ-বেদনা ও কষ্ট-ক্লেশ ভুলিয়ে দিবে। তা হলে তখন তার অবস্থা কেমন হবে, যখন সে-
- জান্নাতের নহর থেকে দুধ পান করবে!
- সুরম্য বালুশয্যায় অবস্থান থাকবে!
- জান্নাতের আলিফাগান বালাখানায় বসবাস করবে!
- নবী-রাসূলগণের মজলিসে আসা-যাওয়া করবে!
বরং তখন তার অবস্থা কেমন হবে, যখন তার রব তাদের দিকে রহমতের দৃষ্টিতে তাকাবেন এবং বলবেন- 'হে জান্নাতবাসীগণ! তোমরা কি সন্তুষ্ট হয়েছ? অতঃপর তারাও তাদের মহামহিয়ান রবের চেহারার দিকে তাকাবে?
আল্লাহর কসম! তখন কি তার মনে হবে-
- সেই দুঃখ-কষ্টের কথা, যা সে দুনিয়াতে ভোগ করেছিল!
- সেই সচ্ছলতার কথা, যা তাকে ভোগ-উপভোগ ও বিলাসিতা থেকে বিরত রেখেছিল!
না; কক্ষনোই না! বরং সে থাকবে চিরস্থায়ী আরাম-আয়েশে। যেখানে যৌবন কখনও ফুরাবে না; কোনো জিনিসের স্বাদ ও আনন্দে কখনও কোনো ঘাটতি আসবে না। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন-
﴿وَلَدَيْنَا مَزِيْدٌ﴾
তারা তথায় যা চাইবে, তা-ই পাবে এবং আমার কাছে রয়েছে আরও অধিক। [সূরা ক্ব-ফ : ৩৫]
হ্যাঁ, আল্লাহর কাছে রয়েছে আরও অধিক, আরও বেশি। এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, নবীজী ﷺ ইরশাদ করেছেন-
﴿إِنَّ أَدْنَى أَهْلِ الْجَنَّةِ مَنْزِلَةً لَمَنْ يَنْظُرُ إِلَى جَنَانِهِ وَأَزْوَاجِهِ وَنَعِيمِهِ وَخَدَمِهِ وَسُرُورِهِ مَسِيرَةُ أَلْفِ سَنَةٍ﴾
একজন সাধারণ মর্যাদাসম্পন্ন জান্নাতীর বাগান, স্ত্রী, আমোদ-প্রমোদের সামগ্রী, খাদেম এবং খাট-পালঙ্ক ও আসনসমূহ কেউ দেখতে চাইলে তা তার জন্য হাজার বছরের পথ। [সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৮৫০]
আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের সকলকে খাঁটি দিলে খাঁটি তাওবা করার এবং সব বিষয়ে সর্বদা তাঁর অভিমুখী হওয়ার তাওফীক দান করেন। আমীন।

প্রিয় পাঠক!
এই যুবকের অবস্থা সেই যুবকের সাথে তুলনা করে দেখুন, যার বয়স হয়েছিল ষোল বছর। সে মসজিদে বসে কুরআন তেলাওয়াত করছিল আর ফজর সালাতের ইকামতের অপেক্ষা করছিল।
সময়মতো ফজরের ইকামত হল। যুবক উঠে হাতের কুরআন শরীফটি যথাস্থানে রাখল। জামাতে শরিক হওয়ার জন্য অগ্রসর হল। ঠিক তখন সে মাথা ঘুরিয়ে জমিনে পড়ে গেলো এবং তৎক্ষণাৎ বেহুঁশ হয়ে গেলো। মসজিদের কয়েকজন মুসল্লী তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেল।
তাকে চিকিৎসাপ্রদানকারী ডাক্তার পরবর্তীতে বলেছেন, এ যুবককে আমাদের কাছে আনা হয়েছিল জানাজার মতো বহন করে। আমি তার মূত্রগ্রন্থি পরীক্ষা করে দেখলাম সে হার্টঅ্যাটাক করেছে। আরও গভীরভাবে লক্ষ করে দেখলাম, সে তার জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো অতিক্রম করছে। আমরা দ্রুত তার চিকিৎসায় রত হলাম। আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলাম তার হার্টের উন্নতির জন্য।
পাশের রুম থেকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আনার জন্য আমি আমার এক সহকর্মীকে তার পাশে রেখে গেলাম। আমি দ্রুতই ফিরে এলাম। ফিরে এসে দরজায় দাঁড়িয়ে দেখি যুবক আমার সহকর্মী ডাক্তারের হাত ধরে রেখেছেন। ডাক্তার তার কান যুবকের মুখের কাছে নিয়ে রেখেছেন। যুবক কানে কানে তাকে কিছু বলছে। এ অবস্থা দেখে আমি ভিতরে প্রবেশ করলাম না। দরজায় দাঁড়িয়ে তাদের দেখতে লাগলাম।
হঠাৎ যুবক ডাক্তারের হাত ছেড়ে দিল। এখন সে সর্বশক্তি দিয়ে ডান কানে ঘোরানোর চেষ্টা করছে। অতঃপর ভারী কণ্ঠে উচ্চারণ করল- 'আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু'। এ কালিমাটি সে বারবার পড়ছিল। ধীরে ধীরে তার হৃদস্পন্দন কমে যেতে লাগল। আমরা সর্বশক্তি দিয়ে তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু আল্লাহ ﷺ-র ফায়সালা আমাদের চেষ্টার উপর কার্যকর হল। যুবক তার রবের কাছে চলে গেল।
সঙ্গে সঙ্গে আমার সহকর্মী ডাক্তারটি কান্নায় ভেঙে পড়লেন। তিনি এত বেশি কাঁদতে লাগলেন যে, পায়ের উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না। বসে পড়লেন।
এ ঘটনা দেখে আমরা আশ্চর্যান্বিত হলাম এবং তাকে বললাম, হে অমুক! আপনার কী হয়েছে? আপনি কাঁদছেন কেন? মৃত্যুর ঘটনা তো আপনি জীবনে এই প্রথম দেখেন না! কত মানুষের মৃত্যুই তো হল আপনার চোখের সামনে।
তিনি আমাদের কথা কানে নিলেন কি না জানি না। তিনি তেমনই কেঁদে যেতে লাগলেন।
অনেকক্ষণ পর...
তার কান্নার বেগ কিছুটা কমে এলে আমরা তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনার কী হয়েছে? যুবক আপনাকে কী বলেছিল?
তিনি বললেন, ডাক্তার! যুবক যখন দেখল আপনি ব্যাস্তসমস্ত হয়ে একবার রুম থেকে বের হচ্ছেন আবার প্রবেশ করছেন, চিকিৎসার বিভিন্ন সরঞ্জাম জোগাড় করছেন, তখন সে বুঝতে পারল, আপনিই তার জন্য নিয়োজিত ডাক্তার। তাই সে আমাকে বলল- ডাক্তার! আপনি আপনার সহকর্মীকে বলুন, তিনি যেন আমার জন্য শুধু শুধু কষ্ট না করেন। আমি কিছুক্ষণের মধ্যেই মারা যাব। আল্লাহর কসম! আমি জান্নাতে আমার স্থান দেখতে পাচ্ছি।
- আল্লাহু আকবার!
إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا تَتَنَزَّلُ عَلَيْهِمُ الْمَلَائِكَةُ أَلَّا تَخَافُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَبْشِرُوا بِالْجَنَّةِ الَّتِي كُنتُمْ تُوعَدُونَ. نَحْنُ أَوْلِيَاؤُكُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ ۖ وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَشْتَهِي أَنفُسُكُمْ وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَدَّعُونَ ۚ نُزُلًا مِّنْ غَفُورٍ رَّحِيمٍ
নিশ্চয় যারা বলে, আমাদের পালনকর্তা আল্লাহ, অতঃপর তাতেই অবিচল থাকে, তাদের কাছে ফেরেশতা অবতীর্ণ হয় এবং বলে, তোমরা ভয় করো না, চিন্তা করো না এবং তোমাদের প্রতিশ্রুত জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ করো। ইহকালে ও পরকালে আমরা তোমাদের বন্ধু। সেখানে তোমাদের জন্য আছে যা তোমাদের মন চায় এবং সেখানে তোমাদের জন্য আছে যা তোমরা দাবি কর। এটা ক্ষমাশীল করুনাময়ের পক্ষ থেকে সাদর আপ্যায়ন। [সুরা হা-মীম সেজদাহ : ৩০-৩২]
আল্লাহ ﷺ-র দরবারে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের সকলকে পুণ্যময় মৃত্যু দান করেন।
হ্যাঁ, প্রিয় পাঠক! এই হচ্ছে অনুতপ্ত ও অবাধ্য বান্দার পার্থক্য। প্রকৃত পার্থক্য তো ফুটে উঠবে সেদিন-
يَوْمَ يَفِرُّ الْمَرْءُ مِنْ أَخِيهِ ❁ وَأُمِّهِ وَأَبِيهِ ❁ وَصَاحِبَتِهِ وَبَنِيهِ ❁ لِكُلِّ امْرِئٍ مِّنْهُمْ يَوْمَئِذٍ شَأْنٌ يُغْنِيهِ ❁ وُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ مُّسْفِرَةٌ ❁ ضَاحِكَةٌ مُّسْتَبْشِرَةٌ ❁ وَوُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ عَلَيْهَا غَبَرَةٌ ❁ تَرْهَقُهَا قَتَرَةٌ ❁ أُولَئِكَ هُمُ الْكَفَرَةُ الْفَجَرَةُ
যেদিন পলায়ন করবে মানুষ তার ভাইয়ের কাছ থেকে, তার মা, তার পিতা, তার পত্নী ও তার সন্তানদের কাছ থেকে। সেদিন তাদের প্রত্যেকেরই এমন গুরুতর অবস্থা হবে, যা তাকে ব্যস্তভর করে রাখবে। অনেক মুখমন্ডল সেদিন হবে উজ্জ্বল, সহাস্য ও প্রফুল্ল; এবং অনেক মুখমন্ডল সেদিন হবে ধূলি ধূসরিত। সেগুলোকে কালিমা আচ্ছন্ন করে রাখবে। তারাই কাফের পাপিষ্ঠের দল। [সুরা আবাসা : ৩৫-৪২]
তবে যারা ধৈর্য ধারণ করেছে এবং নিজেকে শাহওয়াত ও প্রবৃত্তিপূজা থেকে বিরত রেখেছে, আল্লাহ ﷺ ও তাঁর রাসূল ﷺ কর্তৃক হারামমুক্ত যাবতীয় বিষয়াদি থেকে নিজেদের দূরে রেখেছে, তাদের জন্য তাদের প্রতিপালক অঙ্গীকার করেছেন এমন জান্নাতের, যার তলদেশ থেকে প্রবাহিত নহরসমূহ।
সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে, নবীজী ﷺ ইরশাদ করেছেন, 'দুনিয়ার সর্বাধিক সচ্ছল ও ধন-সম্পদের অধিকারী এক জাহান্নামীকে কেয়ামতের দিন উপস্থিত করা হবে। এরপর তাকে জাহান্নামের আগুনে একবার অবগাহন করিয়ে বলা হবে, হে আদম সন্তান! দুনিয়াতে তুমি কখনও আরাম-আয়েশ ভোগ করেছ কি? কখনও তুমি স্বচ্ছল অবস্থায় দিন অতিবাহিত করেছ কি?
সে বলবে, আল্লাহর কসম! হে আমার রব! না; কক্ষনো না।'
হ্যাঁ, যে ব্যক্তি দুনিয়ায় যাবতীয় আরাম-আয়েশে ডুবে ছিল, সব ধরনের নেয়ামত ভোগ করেছিল, জাহান্নামের আগুনে একটি মাত্র ডুব তাকে সে সবকিছু ভুলিয়ে দিবে। তা হলে তখন তার অবস্থা কী হবে, যখন তাকে-
- সেখানে অনন্তকাল থাকতে হবে!
- প্রতিনিয়ত শাস্তি ও আযাব অসহ্য যন্ত্রণা দিতে থাকবে!
- যাখুম খেতে হবে!
- ফুটন্ত পানি ও রক্ত-পূঁজ পান করতে হবে!
- কী অবস্থা হবে তখন তার, যখন তার সাহায্যপ্রার্থনার জবাবে বলা হবে-
﴿اِخْسَئُوْا فِيْهَا وَلَا تُكَلِّمُوْنِ﴾
তোমরা হীন অবস্থায় এখানেই পড়ে থাক এবং আমার সাথে কোনো কথা বলো না। [সূরা মুমিনুন : ১০৮]
আল্লাহর কসম! তার কি তখন মনে হবে-
- সেই অশ্লীলতার কথা, যাতে সে লিপ্ত হয়েছিল?
- সেই গানবাজনার কথা, যা সে শুনেছিল?
- সেই মদ ও নেশার কথা, যা সে পান করেছিল?
- সেই ধন-দৌলত ও সম্পদের কথা, যা সে উপার্জন করেছিল?
তখন তাকে বলা হবে-
﴿اِخْسَئُوْا فِيْهَا وَلَا تُكَلِّمُوْنِ﴾
এতে [জাহান্নামে] প্রবেশ কর। অতঃপর তোমরা চেঁচামেচি কর অথবা না কর, উভয়ই তোমাদের জন্য সমান। [সূরা তুর : ১৬]
অতঃপর নবীজী ﷺ বলেছেন- 'এরপর দুনিয়ার সর্বাধিক দুঃখকষ্টসম্পন্ন এক জান্নাতীকে উপস্থিত করা হবে। তারপর তাকে একবার জান্নাতে অবগাহন করিয়ে জিজ্ঞাসা করা হবে, হে আদম সন্তান! দুনিয়াতে তুমি কখনও কোনো কষ্ট দিনাতিপাত করেছ কি? কোনো হৃদয়বিদারক ও ভয়াবহ অবস্থার সম্মুখীন হয়েছ কি?
সে বলবে, আল্লাহর কসম! হে আমার রব! আমি কখনোই কোনো কষ্ট দিনাতিপাত করিনি। দুঃখ কী জিনিস, আমি কখনও তা দেখিনি।'
হ্যাঁ, জান্নাতে ক্ষণিকের অবস্থান তাকে তার দুনিয়াবী জীবনের যাবতীয় দুঃখ-বেদনা ও কষ্ট-ক্লেশ ভুলিয়ে দিবে। তা হলে তখন তার অবস্থা কেমন হবে, যখন সে-
- জান্নাতের নহর থেকে দুধ পান করবে!
- সুরম্য বালুশয্যায় অবস্থান থাকবে!
- জান্নাতের আলিফাগান বালাখানায় বসবাস করবে!
- নবী-রাসূলগণের মজলিসে আসা-যাওয়া করবে!
বরং তখন তার অবস্থা কেমন হবে, যখন তার রব তাদের দিকে রহমতের দৃষ্টিতে তাকাবেন এবং বলবেন- 'হে জান্নাতবাসীগণ! তোমরা কি সন্তুষ্ট হয়েছ? অতঃপর তারাও তাদের মহামহিয়ান রবের চেহারার দিকে তাকাবে?
আল্লাহর কসম! তখন কি তার মনে হবে-
- সেই দুঃখ-কষ্টের কথা, যা সে দুনিয়াতে ভোগ করেছিল!
- সেই সচ্ছলতার কথা, যা তাকে ভোগ-উপভোগ ও বিলাসিতা থেকে বিরত রেখেছিল!
না; কক্ষনোই না! বরং সে থাকবে চিরস্থায়ী আরাম-আয়েশে। যেখানে যৌবন কখনও ফুরাবে না; কোনো জিনিসের স্বাদ ও আনন্দে কখনও কোনো ঘাটতি আসবে না। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন-
﴿وَلَدَيْنَا مَزِيْدٌ﴾
তারা তথায় যা চাইবে, তা-ই পাবে এবং আমার কাছে রয়েছে আরও অধিক। [সূরা ক্ব-ফ : ৩৫]
হ্যাঁ, আল্লাহর কাছে রয়েছে আরও অধিক, আরও বেশি। এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, নবীজী ﷺ ইরশাদ করেছেন-
﴿إِنَّ أَدْنَى أَهْلِ الْجَنَّةِ مَنْزِلَةً لَمَنْ يَنْظُرُ إِلَى جَنَانِهِ وَأَزْوَاجِهِ وَنَعِيمِهِ وَخَدَمِهِ وَسُرُورِهِ مَسِيرَةُ أَلْفِ سَنَةٍ﴾
একজন সাধারণ মর্যাদাসম্পন্ন জান্নাতীর বাগান, স্ত্রী, আমোদ-প্রমোদের সামগ্রী, খাদেম এবং খাট-পালঙ্ক ও আসনসমূহ কেউ দেখতে চাইলে তা তার জন্য হাজার বছরের পথ। [সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৮৫০]
আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের সকলকে খাঁটি দিলে খাঁটি তাওবা করার এবং সব বিষয়ে সর্বদা তাঁর অভিমুখী হওয়ার তাওফীক দান করেন। আমীন।

📘 তাওবাতান নাসূহা খাঁটি তাওবা > 📄 দ্বিতীয় বিষয়

📄 দ্বিতীয় বিষয়


কোনো কোনো মানুষ যখন কোনো গুনাহ থেকে তাওবা করতে চায়, তখন শয়তান তাকে ধোঁকা দেয়। উদাহরণস্বরূপ, কেউ যখন গানবাদ্য শোনা থেকে তাওবা করতে চায়, তখন শয়তান তাকে এ বলে ধোঁকা দেয়- ‘যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি সিগারেট খাবে, সালাতে অলসতা করবে ইত্যাদি গুনাহে লিপ্ত থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত গানবাদ্য শোনা থেকে তোমার তাওবা কবুল হবে না। হয়তো তুমি এই সব গুনাহ থেকে একসঙ্গে তাওবা করবে, নয়তো তোমার কোনো তাওবাই কবুল হবে না। অতএব, শুধু শুধু তোমার নফসকে কষ্ট দিও না।’
'এটা ভুল কথা। কেননা, প্রত্যেক গুনাহের তাওবা আলাদা। এটা খুবই সম্ভব যে, কেউ অন্য কোনো গুনাহে লিপ্ত থাকা সত্ত্বেও তার যিনা-ব্যভিচারের তাওবা আল্লাহ কবুল করবেন। তবে এটা ঠিক যে, বান্দার উচিত সমস্ত গুনাহ থেকেই তাওবা করে নেওয়া।
একটি ঘটনা মনে পড়ে গেল। একবার আমরা একটি মসজিদ নির্মাণের জন্য লোকজনকে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছিলাম। লোকজন যে যার সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য করেছিল। তারই ধারাবাহিকতায় এক যুবক আমাদের কাছে এল। সে সিগারেট খেত; আরও বিভিন্ন গুনাহের কাজে লিপ্ত হত।
যুবক আমাদের কাছে এসে মুখবন্ধ একটি পাত্র আমার দিকে বাড়িয়ে দিল। খুলে দেখলাম তাতে পাঁচ হাজার রিয়াল আছে। আমি কিছুটা কৌতূহলী হয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি এগুলো কোত্থেকে এনেছ? সে উত্তর দিল, আমি আমার মা, ভাই ও কিছু নিকটাত্মীয়ের কাছ থেকে দিয়েছিলাম। তাদের কাছ থেকেই এগুলো সংগ্রহ করেছি। শায়খ! আপনি এগুলো রাখুন; মসজিদের কাজে ব্যয় করবেন।
প্রিয় পাঠক! একটি ভাবুন! ওই মসজিদে যত মুসল্লী সালাত আদায় করবেন, যত তাসবীহ পাঠকারী তাসবীহ পাঠ করবেন, যত যিকিরকারী যিকির করবেন, যত তেলাওয়াতকারী তেলাওয়াত করবেন, তার সমপরিমাণ সাওয়াব কি ওই যুবকের আমলনামায় লেখা হবে না?
— হবে। অবশ্যই হবে। কারণ, নবীজী ইরশাদ করেছেন-
مَنْ سَنَّ فِي الْإِسْلَامِ سُنَّةً حَسَنَةً فَلَهُ أَجْرُهَا وَأَجْرُ مَنْ عَمِلَ بِهَا إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ، مِنْ غَيْرِ أَنْ يَنْقُصَ مِنْ أُجُورِهِمْ شَيْءٌ
যে ব্যক্তি কোনো নেক কাজের প্রতি আহ্বান করবে, তার আমলনামায় সেসকল লোকের সমপরিমাণ সাওয়াব লেখা হবে, যারা তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমল করবে; আমলকারীদের সাওয়ায়ে বিদুম্মাত ও কমাতি করা ছাদাই। সিহাহ মুসলিম, হাদীস নং ২৬৭৮, মুয়াত্তা ইমাম মালেক, হাদীস নং ৫০৭, সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৬৭৪, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ২০৬, সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৮০৯]
কেন নয়?! অবশ্যই!
যেহেতু আমাদের আলোচিত যুবক তার সম্পদ এই মসজিদে দান করেছে, যেহেতু কেয়ামতের আগ পর্যন্ত সে তার সাওয়াব পেতে থাকবে– যদি তার নিয়ত ভালো থাকে।
প্রিয় পাঠক! আমি যে কথা বলতে চাচ্ছি, তা হচ্ছে– ওই যুবক মসজিদের জন্য টাকা সংগ্রহ করার সময় যদি শয়তান তাকে ধোঁকা দিয়ে বলত– ‘আরে তুমি মসজিদের জন্য টাকা সংগ্রহ করছো! অথচ তুমি একজন গুনাহগার; তুমি সিগারেট খাও; গান শোনো; দাড়ি মুণ্ডন কর’, আর ওই যুবকও যদি ধোঁকা খেয়ে বলত– ‘হাঁ, তাই তো! আমি তো গান শুনি; দাড়ি মুণ্ডন করি; আরও বিভিন্ন গুনাহের কাজ করি, এমতাবস্থায় আমি কী করে মসজিদ নির্মাণ করি? কিংবা মসজিদ নির্মাণের কাজে সাহায্য করি?! না, এটা করা যায় না। যখন আমি সিগারেট খাওয়া থেকে তাওবা করব; অমুক অমুক গুনাহ থেকে তাওবা করব, তখন আমি মসজিদ নির্মাণের জন্য সাহায্য করব’, তা হলে সুনিশ্চিত শয়তান তার উপর বিজয়ী হয়ে যেত এবং সে সমস্ত বড় কল্যাণ ও সাওয়াব থেকে সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত হয়ে যেত। কিন্তু ওই যুবক ভাগ্যবান। সে তার নফসের উপর বিজয় লাভ করতে পেরেছে।
তা ছাড়া আরও একটি বিষয় জেনে রাখুন, কোনো গুনাহ থেকে তাওবা করার পর পুনরায় সেই গুনাহে লিপ্ত হওয়ার অর্থ এই নয় যে, পূর্বের তাওবা বাতিল হয়ে গেছে, ফলে বান্দা নিরাশ হয়ে যাবে এবং পুনরায় গুনাহের রাজ্যে নিমগ্ন হয়ে যাবে। না; বরং আবারও এবং দৃঢ়ত তাওবা করে নেবে। আল্লাহ পাকুর কুরআনে ইরশাদ করেছেন–
إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ
এবং যারা কখনও কোনো অশ্লীল কাজ করে ফেললে কিংবা কোনো মন্দ কাজে জড়িত হয়ে নিজের উপর জুলুম করে ফেললে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আল্লাহ ছাড়া আর কে পাপ ক্ষমা করবেন? তারা নিজের কৃতকর্মের জন্য হঠকারিতা প্রদর্শন করে না এবং জেনে-শুনে তা-ই করতে থাকে না। [সুরা আলে ইমরান : ১০৭]

📘 তাওবাতান নাসূহা খাঁটি তাওবা > 📄 তৃতীয় বিষয়

📄 তৃতীয় বিষয়


তাওবার মোট শর্ত পাঁচটি। যথা-
১. কৃত গুনাহ থেকে তৎক্ষণাৎ বিরত হয়ে যাওয়া।
২. কৃতকর্মের উপর লজ্জিত ও অনুতপ্ত হওয়া।
৩. ভবিষ্যতে এ গুনাহ আর কখনও না করার ব্যাপারে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হওয়া।
৪. কারও কোনো হক নষ্ট করে থাকলে কিংবা কারও উপর জুলুম করে থাকলে সে হক ফিরিয়ে দেওয়া অথবা তাদের কাছ থেকে ক্ষমা নিয়ে নেওয়া।
৫. তাওবার সময় বাকি থাকতে তাওবা করা। অতএব, মৃত্যুর যন্ত্রণা শুরু হয়ে গেলে কিংবা কেয়ামতের পূর্বে পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হয়ে যাওয়ার পর তাওবা করলে সে তাওবা গ্রহণযোগ‍্য হবে না।

📘 তাওবাতান নাসূহা খাঁটি তাওবা > 📄 শেষ বিষয়

📄 শেষ বিষয়


কৃত তাওবার উপর অটল-অবিচল থাকার উপায় ও মাধ্যমসমূহের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর একটি মাধ্যম হচ্ছে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার স্থান পরিত্যাগ করা। এমনকি সেই সব সাথি-সঙ্গীদের থেকেও দূরে থাকা, যারা পুনরায় গুনাহের দিকে আহ্বান করবে কিংবা উক্ত গুনাহের কথা স্মরণ করিয়ে দিবে। নিম্নবর্ণিত ঘটনাটি থেকে আমরা এ শিক্ষা নিতে পারি।
বিগত যুগে এক খুনী অভিবাহিত হয়েছে। সে সাধারণ কোনো খুনী ছিল না। একজন, দুইজন বা দশজনকে খুন করেনি। সে খুন করেছে নিরানব্বই জনকে। হাঁ, নিরানব্বই জন মানুষকে সে খুন করেছে।
আমি জানি না, সে মানুষের প্রতিশোধস্পৃহা থেকে কীভাবে রেহাই পেয়েছিল। হতে পারে সে একজন ভয়ঙ্কর খুনী ছিল; যার কারণে কেউ তার প্রতিবাদ করতে সাহস করত না। অথবা অনাকাঙ্ক্ষিত কারণ থাকবে হয়তো। তবে কারণ যাই হোক, বড় কথা হচ্ছে সে নিরানব্বই জনকে হত্যা করেছিল।
নিরানব্বই জনকে হত্যা করার পর এক সময় তার ভিতরে অনুশোচনা সৃষ্টি হল। সে তাওবা করার দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিল। তাই সে তৎকালীন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আলেম সম্পর্কে অনুসন্ধান করতে লাগল। লোকজন তাকে এক ব্যক্তির কথা বলল, যিনি সারাখন গির্জায় বসে উপাসনায় মগ্ন থাকেন। লোকজনও ঘৃণার্হ ছেড়ে অন্যত্র গমন করেন না এবং যার সময় অতিবাহিত হয় কামাকটি ও দোয়া-মুনাজাতের মধ্য দিয়ে। ওই ইবাদতকারী লোকটি ছিলেন নম্র মেজাজের; তবে তার ভিতর কিছুটা আবেগও কাজ করত।
খুনী সেই আবেদের কাছে গিয়ে উপস্থিত হল। নিজের আগমনের কারণ বর্ণনা করে বলল, আমি নিরানব্বই জনকে হত্যা করেছি। এখন আমি অনুতপ্ত। আমার কি এখন তাওবা করার কোনো সুযোগ আছে?
আমার ধারণা, কেউ কোনো পিঁপড়া মারলেও হয়তো ওই আবেদ সারা দিন শেষে-দুঃখে কানায় কানায় বুক ভাসিয়ে দিতেন। তা হলে যে ব্যক্তি নিরানব্বই জনকে খুন করেছে, তার ব্যাপারে তার জওয়াব কী হতে পারে?
কেঁপে ওঠলেন আবেদ। তার কল্পনায় ভেসে উঠল নিহত নিরানব্বই জনের দেহ। তিনি চিৎকার দিয়ে বললেন, না, না! তোমার মতো পাষণ্ড ও পাপীর জন্য তাওবার কোনো সুযোগ নেই। তোমার তাওবার কোনো উপায় নেই।
অন্য বিচারক সাধক থেকে এমন জবাব আশ্বর্য কিছু নয়। এমন সাধকরা আবেগপ্রবণ হয়েই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকেন।
ওই খুনী লোকটি ছিল একজন পাষণ্ড। আবেদের মুখে এই জওয়াব শুনে সে রাগে-ক্রোধায় ফুসে ওঠল। চোখ দু'টো তার লাল টকটকে হয়ে গেলো সে ক্ষণকাল দুর্বল। তারপর খঞ্জর বের করে সাধকের দেহ এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিয়ে গির্জা থেকে বের হয়ে গেলো।
এরপর আরও কিছুক্ষণ অতিবাহিত হলো। আবার অনুশোচনা জাগল খুনীর অন্তরে। আবারও সে অনুসন্ধান করতে লাগল দুনিয়ার সবচেয়ে বড় আলেমের। লোকজন তাকে একজন আলেমের সন্ধান দিল। খুনী সেই আলেমের কাছে পৌঁছল এবং তার কামরায় প্রবেশ করল। আলেমকে প্রকৃতপক্ষে একজন সচেতন মানুষ বলে মনে হল তার কাছে। বিদ্যার প্রভাব ও জ্যোতি স্পষ্ট ছিল তার চেহারায়।
খুনী সেই আলেমের সামনে দাঁড়িয়ে একেবারেই স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল, আমি একশ’ জন মানুষ খুন করেছি। এখন আমি তাওবা করতে চাইলে আমার জন্য কি তার কোনো রাস্তা আছে?
আলেম তার কথা শুনে জবাব দিলেন, তোমার মাঝে আর তোমার তাওবার মাঝে কি বাধা হতে পারে?
চমৎকার জওয়াব। আসলে তো, কে তার মাঝে আর তার তাওবার মাঝে অন্তরায় হতে পারে? দুনিয়ার কোনো শক্তিই তো তার মাঝে আর তাওবার মাঝে প্রতিবন্ধক হতে পারে না।
এই আলেম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন বিদ্যা ও শরীয়তের নিরিখে। তিনি আবেগ ও অনুরাগের বশবর্তী হয়ে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন না। তবে তিনি এতটুকু বললেন– কিন্তু তুমি থাক অসত্য অঞ্চলে।
আশ্চর্য্য ব্যাপার! তিনি কীভাবে বুঝতে পারলেন যে, খুনী অসত্য অঞ্চলে বসবাস করে?
তিনি বুঝতে পেরেছিলেন অপরাধের পরিমাণ ও প্রতিবাদের অভাব দেখা। তিনি আরও বুঝতে পেরেছিলেন, খুনীর বসবাসের এলাকায় হত্যা, জুবন ও জুলুম চলে অবাধে; কেউ মজলুমকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে না। তাই তিনি এই মন্তব্য করেছেন।
যা হোক, এই খুনীকে লক্ষ করে আলেম বললেন, তুমি তোমার এলাকা পরিত্যাগ করে অমুক অঞ্চলে চলে যাও। সেখানকার লোকজন আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন থাকেন। তুমি গিয়ে তাদের সাথে ইবাদতে মগ্ন হয়ে যাও।
তাওবা করার মূর্ত আশায় খুনী ছুটল সেই দিকে। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছার আগেই তার ইন্তেকাল হয়ে গেল। অতঃপর রহমত ও আযাবের ফেরেশতারা নেমে এলেন [তার রূহ নিয়ে যাওয়ার জন্য]। রহমতের ফেরেশতারা বললেন, লোকটি তাওবা করে নেক জীবন যাপন করার জন্য রওয়ানা দিয়েছে। অতএব, একে আমরা নিব। অপরদিকে আযাবের ফেরেশতারা বললেন, না, তার আমলনামায় একটি নেকীও নেই। অতএব, তাকে আমরাই নিব।
তখন আল্লাহ মানুষের আকৃতিতে একজন ফেরেশতা পাঠিয়ে দিলেন তাদের মাঝে ফায়সালা করে দেওয়ার জন্য। অবশেষে ফায়সালা এই হল যে, নেকী ও বদীর দুই শহরের দূরত্ব মাপা হবে। যে শহরের দিকে তার অবস্থান নিকটবর্তী হবে, সে এখানকার বাসিন্দা বলে সাব্যস্ত হবে। এর মধ্যে আল্লাহ নেকীর শহরকে হুকুম দিলেন এগিয়ে আসতে; আর বদীর শহরকে হুকুম দিলেন দূরে সরে যেতে। মাপার পর দেখা গেল, খুনী নেকীর শহরের নিকটবর্তী। ফলে রহমতের ফেরেশতারা তার রূহ নিয়ে গেলেন।
প্রিয় পাঠক! এ ঘটনা বলা আমার যে কথাটি বোঝানো উদ্দেশ্য, তা হচ্ছে- লক্ষ করুন, আলেম খুনী লোকটিকে কী বলেছেন! ‘তুমি তোমার এলাকা পরিত্যাগ করে অমুক অঞ্চলে চলে যাও। সেখানকার লোকজন আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন থাকেন। তুমি গিয়ে তাদের সাথে ইবাদতে মগ্ন হয়ে যাও।’
ঠিক তদ্রুপ, যিনি মিনা-ব্যভিচার থেকে তাওবা করতে চাইবেন, তার কর্তব্য হচ্ছে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার স্থান পরিত্যাগ করা অন্য কোথাও চলে যাওয়া। এমনিভাবে যিনি সালাত না পড়া, গানবাদ্য শোনা, সুদ-ঘুষ খাওয়া‍সহ শিরক-বিদআত‍ও অন্য যেকোনো গুনাহ থেকে তাওবা করতে চাইবেন, তাদের সকলের উচিতও এমন স্থান ও সংকল্প পরিত্যাগ করা, যা তাকে পুনরায় গুণাহে লিপ্ত হতে প্ররোচিত করবে।
পরিশেষে মহান আল্লাহ ﷺ-র দরবারে প্রার্থনা- তিনি যেন আমাদের প্রত্যেককে তাঁর যথাযথ তাকওয়া ও ভয় দান করেন, যা আমাদের মাঝে এবং আমাদের গুণাসমূহের মাঝে প্রতিবন্ধক হবে; আমাদের যেন যথাযথভাবে তাঁর আনুগত্য করার তাওফীক দান করেন, যা আমাদের জান্নাত লাভের উসিলা হবে; তিনি যেন আমাদের যাবতীয় গুণাহ-খাতা ক্ষমা করে দেন, হালালের মাধ্যমে হারাম থেকে এবং তাঁর দয়া ও অনুগ্রহে তিনি ছাড়া অন্য সবকিছু থেকে আমাদের অমুখাপেক্ষী করে দেন; আমাদের তাওবা কবুল করেন, আমাদের যাবতীয় অন্যায়-অপরাধকে ধুয়ে-মুছে পাক-সাফ করে দেন। তিনি সর্বশ্রোতা, আহ্বানকারীর আহ্বান শ্রবণকারী।
وَصَلَّى اللَّهُ عَلَى النَّبِيِّ الأُمِّيِّ مُحَمَّدٍ وَآلِهِ وَصَحْبِهِ أَجْمَعِينَ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ。
সমাপ্ত

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00