📘 তাওবাতান নাসূহা খাঁটি তাওবা > 📄 সময় থাকতে তাওবা করে নিন

📄 সময় থাকতে তাওবা করে নিন


এক ডাক্তার আমাকে ঘটনা শুনিয়েছেন। তিনি বলেন, একবার হাসপাতালের আই.সি.ইউ-র রুমে প্রবেশ করেই আমার মনোযোগ আকৃষ্ট হয় পঁচিশ বছরের এক যুবকের দিকে। যুবক মরণব্যাধি এইডস-এ আক্রান্ত। তার অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়।
আমি কাছে গিয়ে তার সঙ্গে কথা বললাম। সে অস্পষ্ট আওয়াজে কিছু বলল কিন্তু কিছুই বোঝা গেল না। আমি ফোনে তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। কিছুক্ষণ পর তার মা হাসপাতালে আসেন।
তার মা এলে আমি তাঁর সম্পর্কে জানতে চাইলাম।
মা জবাবে বললেন, ‘ওই মেয়েটির সঙ্গে তার পরিচয় হওয়ার আগ পর্যন্ত সে ভালোই ছিল।’
আমি সেদিকে না গিয়ে মাকে জিজ্ঞাসা করলাম, সে কি সালাত পড়ত?
মা বললেন, না; তবে সে ইচ্ছা করেছিল জীবনের শেষ দিকে যাবতীয় গুনাহ থেকে তাওবা করে নেবে এবং হজ্ব করবে।
যা হোক, আমি আবার যুবকের কাছে গেলাম। স্বাভাবিক ভঙ্গিতে দেখলাম, সে তার জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো পার করছে। তার মৃত্যুযন্ত্রণা প্রায় শুরু হয়ে গেছে। আমি তার আরও কাছে গেলাম। কানের কাছে মুখ নিয়ে কোমল সুরে বললাম, বলো- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।
আমার কণ্ঠ শুনে সে কিছুটা চেতনা ফিরে পেলো। যন্ত্রণাময় দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাতে লাগল। সে তার সমস্ত শক্তি দিয়ে কিছু বলতে চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না। চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। ধীরে ধীরে তার চেহারা কালো হয়ে যেতে লাগল। আমি বারবারই বলে যাচ্ছিলাম, বলো- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।
এবার সে অস্ফুট কণ্ঠে ভাঙা ভাঙা শব্দে বলতে লাগলো, আহ ব্যথা! ব্যথা! প্রচণ্ড ব্যথা! ব্যথা কমার ওষুধ দিন! আহ! আহ!
যুবকের অবস্থা দেখে আমার কান্না এসে গেলো। আমি অশ্রু সংবরণ করার চেষ্টা করছি আর বলে যাচ্ছি, বলো- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।
সে অনেক কষ্টে আবার তার ঠোঁট দু’টো নাড়াতে শুরু করল। আমি খুশি হলাম। ভাবলাম, এখনই হয়তো সে কালিমা পাঠ করবে। কিন্তু না; সে বলতে লাগলো- না; আমি পারছি না; আমি বলতে পারছি না; আমি আমার রাব্বীকে চাই; আমি বলতে পারছি না।
যুবকের মা অসহায়ভাবে তার দিকে তাকিয়ে আছেন। তিনি কাঁদছেন। চোখ থেকে অশ্রু ঝরছে, অবিরত ধারায়।
এদিকে যুবকের হৃদস্পন্দন কমতে শুরু করেছে। ধীরে ধীরে সে মৃত্যুর কাছাকাছি চলে যাচ্ছে। এ সময় আমি আর আমাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলাম না। আমি শব্দ করে কেঁদে ফেললাম।
আবারও আমি তার হাত ধরে চেষ্টা করতে লাগলাম। বলতে লাগলাম, বলো- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ! বলো! কিন্তু সে আগের মতোই বলতে লাগল- আমি পারছি না; আমি বলতে পারছি না। এর পর পরই সে ছটফটি দিতে শুরু করল। কিছুক্ষণপর মধ্যেই তার হৃদস্পন্দন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেলো এবং তার চেহারা কালো হয়ে গেলো। যুবক মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল।
যুবকের মা কান্নায় ভেঙে পড়লেন। তার বুকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। অঝোরে কাঁদতে লাগলেন। কিন্তু-
মায়ের এ কান্না তার কী উপকার করবে?
এ বিলাপ ও আহাজারি তার কী-ই বা কল্যাণ সাধন করবে?
হ্যাঁ, প্রিয় পাঠক!
যুবক তার রবের কাছে চলে গেছে।
তার শাহওয়াত ও প্রবৃত্তি তার কোনো উপকারে আসেনি।
দুনিয়ার স্বাদ-আহ্লাদ, সুখ-উপভোগ তার কোনো কাজে আসেনি।
কারণ-
সে তার যৌবনের ধোঁকায় পড়ে ছিল।
গাড়ি-বাড়ি ও পোশাক-পরিচ্ছদের সৌন্দর্যে প্রতারিত হয়েছিল।
সে তার রবকে ভুলে গিয়েছিল।
আখেরাত ও হিসাব-নিকাশের কথা বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিল।
আজ কবরে তাকে তার আমলের হিসাব দিতে হবে। তার যাবতীয় কৃতকর্ম তাকে ঘিরে রাখবে।
অতঃপর, তারা যা উপার্জন করত, وَفَقَا عَلَىٰ عَلِمَ مَا كَانُوا يَكْسِبُونَ তা তাদের কাজে এল না। [সুরা হিজর : ৮৪]

এক ডাক্তার আমাকে ঘটনা শুনিয়েছেন। তিনি বলেন, একবার হাসপাতালের আই.সি.ইউ-র রুমে প্রবেশ করেই আমার মনোযোগ আকৃষ্ট হয় পঁচিশ বছরের এক যুবকের দিকে। যুবক মরণব্যাধি এইডস-এ আক্রান্ত। তার অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়।
আমি কাছে গিয়ে তার সঙ্গে কথা বললাম। সে অস্পষ্ট আওয়াজে কিছু বলল কিন্তু কিছুই বোঝা গেল না। আমি ফোনে তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। কিছুক্ষণ পর তার মা হাসপাতালে আসেন।
তার মা এলে আমি তাঁর সম্পর্কে জানতে চাইলাম।
মা জবাবে বললেন, ‘ওই মেয়েটির সঙ্গে তার পরিচয় হওয়ার আগ পর্যন্ত সে ভালোই ছিল।’
আমি সেদিকে না গিয়ে মাকে জিজ্ঞাসা করলাম, সে কি সালাত পড়ত?
মা বললেন, না; তবে সে ইচ্ছা করেছিল জীবনের শেষ দিকে যাবতীয় গুনাহ থেকে তাওবা করে নেবে এবং হজ্ব করবে।
যা হোক, আমি আবার যুবকের কাছে গেলাম। স্বাভাবিক ভঙ্গিতে দেখলাম, সে তার জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো পার করছে। তার মৃত্যুযন্ত্রণা প্রায় শুরু হয়ে গেছে। আমি তার আরও কাছে গেলাম। কানের কাছে মুখ নিয়ে কোমল সুরে বললাম, বলো- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।
আমার কণ্ঠ শুনে সে কিছুটা চেতনা ফিরে পেলো। যন্ত্রণাময় দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাতে লাগল। সে তার সমস্ত শক্তি দিয়ে কিছু বলতে চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না। চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। ধীরে ধীরে তার চেহারা কালো হয়ে যেতে লাগল। আমি বারবারই বলে যাচ্ছিলাম, বলো- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।
এবার সে অস্ফুট কণ্ঠে ভাঙা ভাঙা শব্দে বলতে লাগলো, আহ ব্যথা! ব্যথা! প্রচণ্ড ব্যথা! ব্যথা কমার ওষুধ দিন! আহ! আহ!
যুবকের অবস্থা দেখে আমার কান্না এসে গেলো। আমি অশ্রু সংবরণ করার চেষ্টা করছি আর বলে যাচ্ছি, বলো- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।
সে অনেক কষ্টে আবার তার ঠোঁট দু’টো নাড়াতে শুরু করল। আমি খুশি হলাম। ভাবলাম, এখনই হয়তো সে কালিমা পাঠ করবে। কিন্তু না; সে বলতে লাগলো- না; আমি পারছি না; আমি বলতে পারছি না; আমি আমার রাব্বীকে চাই; আমি বলতে পারছি না।
যুবকের মা অসহায়ভাবে তার দিকে তাকিয়ে আছেন। তিনি কাঁদছেন। চোখ থেকে অশ্রু ঝরছে, অবিরত ধারায়।
এদিকে যুবকের হৃদস্পন্দন কমতে শুরু করেছে। ধীরে ধীরে সে মৃত্যুর কাছাকাছি চলে যাচ্ছে। এ সময় আমি আর আমাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলাম না। আমি শব্দ করে কেঁদে ফেললাম।
আবারও আমি তার হাত ধরে চেষ্টা করতে লাগলাম। বলতে লাগলাম, বলো- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ! বলো! কিন্তু সে আগের মতোই বলতে লাগল- আমি পারছি না; আমি বলতে পারছি না। এর পর পরই সে ছটফটি দিতে শুরু করল। কিছুক্ষণপর মধ্যেই তার হৃদস্পন্দন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেলো এবং তার চেহারা কালো হয়ে গেলো। যুবক মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল।
যুবকের মা কান্নায় ভেঙে পড়লেন। তার বুকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। অঝোরে কাঁদতে লাগলেন। কিন্তু-
মায়ের এ কান্না তার কী উপকার করবে?
এ বিলাপ ও আহাজারি তার কী-ই বা কল্যাণ সাধন করবে?
হ্যাঁ, প্রিয় পাঠক!
যুবক তার রবের কাছে চলে গেছে।
তার শাহওয়াত ও প্রবৃত্তি তার কোনো উপকারে আসেনি।
দুনিয়ার স্বাদ-আহ্লাদ, সুখ-উপভোগ তার কোনো কাজে আসেনি।
কারণ-
সে তার যৌবনের ধোঁকায় পড়ে ছিল।
গাড়ি-বাড়ি ও পোশাক-পরিচ্ছদের সৌন্দর্যে প্রতারিত হয়েছিল।
সে তার রবকে ভুলে গিয়েছিল।
আখেরাত ও হিসাব-নিকাশের কথা বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিল।
আজ কবরে তাকে তার আমলের হিসাব দিতে হবে। তার যাবতীয় কৃতকর্ম তাকে ঘিরে রাখবে।
অতঃপর, তারা যা উপার্জন করত, وَفَقَا عَلَىٰ عَلِمَ مَا كَانُوا يَكْسِبُونَ তা তাদের কাজে এল না। [সুরা হিজর : ৮৪]

📘 তাওবাতান নাসূহা খাঁটি তাওবা > 📄 অন্যরকম একটি মৃত্যু

📄 অন্যরকম একটি মৃত্যু


প্রিয় পাঠক!
এই যুবকের অবস্থা সেই যুবকের সাথে তুলনা করে দেখুন, যার বয়স হয়েছিল ষোল বছর। সে মসজিদে বসে কুরআন তেলাওয়াত করছিল আর ফজর সালাতের ইকামতের অপেক্ষা করছিল।
সময়মতো ফজরের ইকামত হল। যুবক উঠে হাতের কুরআন শরীফটি যথাস্থানে রাখল। জামাতে শরিক হওয়ার জন্য অগ্রসর হল। ঠিক তখন সে মাথা ঘুরিয়ে জমিনে পড়ে গেলো এবং তৎক্ষণাৎ বেহুঁশ হয়ে গেলো। মসজিদের কয়েকজন মুসল্লী তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেল।
তাকে চিকিৎসাপ্রদানকারী ডাক্তার পরবর্তীতে বলেছেন, এ যুবককে আমাদের কাছে আনা হয়েছিল জানাজার মতো বহন করে। আমি তার মূত্রগ্রন্থি পরীক্ষা করে দেখলাম সে হার্টঅ্যাটাক করেছে। আরও গভীরভাবে লক্ষ করে দেখলাম, সে তার জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো অতিক্রম করছে। আমরা দ্রুত তার চিকিৎসায় রত হলাম। আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলাম তার হার্টের উন্নতির জন্য।
পাশের রুম থেকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আনার জন্য আমি আমার এক সহকর্মীকে তার পাশে রেখে গেলাম। আমি দ্রুতই ফিরে এলাম। ফিরে এসে দরজায় দাঁড়িয়ে দেখি যুবক আমার সহকর্মী ডাক্তারের হাত ধরে রেখেছেন। ডাক্তার তার কান যুবকের মুখের কাছে নিয়ে রেখেছেন। যুবক কানে কানে তাকে কিছু বলছে। এ অবস্থা দেখে আমি ভিতরে প্রবেশ করলাম না। দরজায় দাঁড়িয়ে তাদের দেখতে লাগলাম।
হঠাৎ যুবক ডাক্তারের হাত ছেড়ে দিল। এখন সে সর্বশক্তি দিয়ে ডান কানে ঘোরানোর চেষ্টা করছে। অতঃপর ভারী কণ্ঠে উচ্চারণ করল- 'আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু'। এ কালিমাটি সে বারবার পড়ছিল। ধীরে ধীরে তার হৃদস্পন্দন কমে যেতে লাগল। আমরা সর্বশক্তি দিয়ে তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু আল্লাহ ﷺ-র ফায়সালা আমাদের চেষ্টার উপর কার্যকর হল। যুবক তার রবের কাছে চলে গেল।
সঙ্গে সঙ্গে আমার সহকর্মী ডাক্তারটি কান্নায় ভেঙে পড়লেন। তিনি এত বেশি কাঁদতে লাগলেন যে, পায়ের উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না। বসে পড়লেন।
এ ঘটনা দেখে আমরা আশ্চর্যান্বিত হলাম এবং তাকে বললাম, হে অমুক! আপনার কী হয়েছে? আপনি কাঁদছেন কেন? মৃত্যুর ঘটনা তো আপনি জীবনে এই প্রথম দেখেন না! কত মানুষের মৃত্যুই তো হল আপনার চোখের সামনে।
তিনি আমাদের কথা কানে নিলেন কি না জানি না। তিনি তেমনই কেঁদে যেতে লাগলেন।
অনেকক্ষণ পর...
তার কান্নার বেগ কিছুটা কমে এলে আমরা তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনার কী হয়েছে? যুবক আপনাকে কী বলেছিল?
তিনি বললেন, ডাক্তার! যুবক যখন দেখল আপনি ব্যাস্তসমস্ত হয়ে একবার রুম থেকে বের হচ্ছেন আবার প্রবেশ করছেন, চিকিৎসার বিভিন্ন সরঞ্জাম জোগাড় করছেন, তখন সে বুঝতে পারল, আপনিই তার জন্য নিয়োজিত ডাক্তার। তাই সে আমাকে বলল- ডাক্তার! আপনি আপনার সহকর্মীকে বলুন, তিনি যেন আমার জন্য শুধু শুধু কষ্ট না করেন। আমি কিছুক্ষণের মধ্যেই মারা যাব। আল্লাহর কসম! আমি জান্নাতে আমার স্থান দেখতে পাচ্ছি।
- আল্লাহু আকবার!
إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا تَتَنَزَّلُ عَلَيْهِمُ الْمَلَائِكَةُ أَلَّا تَخَافُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَبْشِرُوا بِالْجَنَّةِ الَّتِي كُنتُمْ تُوعَدُونَ. نَحْنُ أَوْلِيَاؤُكُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ ۖ وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَشْتَهِي أَنفُسُكُمْ وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَدَّعُونَ ۚ نُزُلًا مِّنْ غَفُورٍ رَّحِيمٍ
নিশ্চয় যারা বলে, আমাদের পালনকর্তা আল্লাহ, অতঃপর তাতেই অবিচল থাকে, তাদের কাছে ফেরেশতা অবতীর্ণ হয় এবং বলে, তোমরা ভয় করো না, চিন্তা করো না এবং তোমাদের প্রতিশ্রুত জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ করো। ইহকালে ও পরকালে আমরা তোমাদের বন্ধু। সেখানে তোমাদের জন্য আছে যা তোমাদের মন চায় এবং সেখানে তোমাদের জন্য আছে যা তোমরা দাবি কর। এটা ক্ষমাশীল করুনাময়ের পক্ষ থেকে সাদর আপ্যায়ন। [সুরা হা-মীম সেজদাহ : ৩০-৩২]
আল্লাহ ﷺ-র দরবারে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের সকলকে পুণ্যময় মৃত্যু দান করেন।
হ্যাঁ, প্রিয় পাঠক! এই হচ্ছে অনুতপ্ত ও অবাধ্য বান্দার পার্থক্য। প্রকৃত পার্থক্য তো ফুটে উঠবে সেদিন-
يَوْمَ يَفِرُّ الْمَرْءُ مِنْ أَخِيهِ ❁ وَأُمِّهِ وَأَبِيهِ ❁ وَصَاحِبَتِهِ وَبَنِيهِ ❁ لِكُلِّ امْرِئٍ مِّنْهُمْ يَوْمَئِذٍ شَأْنٌ يُغْنِيهِ ❁ وُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ مُّسْفِرَةٌ ❁ ضَاحِكَةٌ مُّسْتَبْشِرَةٌ ❁ وَوُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ عَلَيْهَا غَبَرَةٌ ❁ تَرْهَقُهَا قَتَرَةٌ ❁ أُولَئِكَ هُمُ الْكَفَرَةُ الْفَجَرَةُ
যেদিন পলায়ন করবে মানুষ তার ভাইয়ের কাছ থেকে, তার মা, তার পিতা, তার পত্নী ও তার সন্তানদের কাছ থেকে। সেদিন তাদের প্রত্যেকেরই এমন গুরুতর অবস্থা হবে, যা তাকে ব্যস্তভর করে রাখবে। অনেক মুখমন্ডল সেদিন হবে উজ্জ্বল, সহাস্য ও প্রফুল্ল; এবং অনেক মুখমন্ডল সেদিন হবে ধূলি ধূসরিত। সেগুলোকে কালিমা আচ্ছন্ন করে রাখবে। তারাই কাফের পাপিষ্ঠের দল। [সুরা আবাসা : ৩৫-৪২]
তবে যারা ধৈর্য ধারণ করেছে এবং নিজেকে শাহওয়াত ও প্রবৃত্তিপূজা থেকে বিরত রেখেছে, আল্লাহ ﷺ ও তাঁর রাসূল ﷺ কর্তৃক হারামমুক্ত যাবতীয় বিষয়াদি থেকে নিজেদের দূরে রেখেছে, তাদের জন্য তাদের প্রতিপালক অঙ্গীকার করেছেন এমন জান্নাতের, যার তলদেশ থেকে প্রবাহিত নহরসমূহ।
সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে, নবীজী ﷺ ইরশাদ করেছেন, 'দুনিয়ার সর্বাধিক সচ্ছল ও ধন-সম্পদের অধিকারী এক জাহান্নামীকে কেয়ামতের দিন উপস্থিত করা হবে। এরপর তাকে জাহান্নামের আগুনে একবার অবগাহন করিয়ে বলা হবে, হে আদম সন্তান! দুনিয়াতে তুমি কখনও আরাম-আয়েশ ভোগ করেছ কি? কখনও তুমি স্বচ্ছল অবস্থায় দিন অতিবাহিত করেছ কি?
সে বলবে, আল্লাহর কসম! হে আমার রব! না; কক্ষনো না।'
হ্যাঁ, যে ব্যক্তি দুনিয়ায় যাবতীয় আরাম-আয়েশে ডুবে ছিল, সব ধরনের নেয়ামত ভোগ করেছিল, জাহান্নামের আগুনে একটি মাত্র ডুব তাকে সে সবকিছু ভুলিয়ে দিবে। তা হলে তখন তার অবস্থা কী হবে, যখন তাকে-
- সেখানে অনন্তকাল থাকতে হবে!
- প্রতিনিয়ত শাস্তি ও আযাব অসহ্য যন্ত্রণা দিতে থাকবে!
- যাখুম খেতে হবে!
- ফুটন্ত পানি ও রক্ত-পূঁজ পান করতে হবে!
- কী অবস্থা হবে তখন তার, যখন তার সাহায্যপ্রার্থনার জবাবে বলা হবে-
﴿اِخْسَئُوْا فِيْهَا وَلَا تُكَلِّمُوْنِ﴾
তোমরা হীন অবস্থায় এখানেই পড়ে থাক এবং আমার সাথে কোনো কথা বলো না। [সূরা মুমিনুন : ১০৮]
আল্লাহর কসম! তার কি তখন মনে হবে-
- সেই অশ্লীলতার কথা, যাতে সে লিপ্ত হয়েছিল?
- সেই গানবাজনার কথা, যা সে শুনেছিল?
- সেই মদ ও নেশার কথা, যা সে পান করেছিল?
- সেই ধন-দৌলত ও সম্পদের কথা, যা সে উপার্জন করেছিল?
তখন তাকে বলা হবে-
﴿اِخْسَئُوْا فِيْهَا وَلَا تُكَلِّمُوْنِ﴾
এতে [জাহান্নামে] প্রবেশ কর। অতঃপর তোমরা চেঁচামেচি কর অথবা না কর, উভয়ই তোমাদের জন্য সমান। [সূরা তুর : ১৬]
অতঃপর নবীজী ﷺ বলেছেন- 'এরপর দুনিয়ার সর্বাধিক দুঃখকষ্টসম্পন্ন এক জান্নাতীকে উপস্থিত করা হবে। তারপর তাকে একবার জান্নাতে অবগাহন করিয়ে জিজ্ঞাসা করা হবে, হে আদম সন্তান! দুনিয়াতে তুমি কখনও কোনো কষ্ট দিনাতিপাত করেছ কি? কোনো হৃদয়বিদারক ও ভয়াবহ অবস্থার সম্মুখীন হয়েছ কি?
সে বলবে, আল্লাহর কসম! হে আমার রব! আমি কখনোই কোনো কষ্ট দিনাতিপাত করিনি। দুঃখ কী জিনিস, আমি কখনও তা দেখিনি।'
হ্যাঁ, জান্নাতে ক্ষণিকের অবস্থান তাকে তার দুনিয়াবী জীবনের যাবতীয় দুঃখ-বেদনা ও কষ্ট-ক্লেশ ভুলিয়ে দিবে। তা হলে তখন তার অবস্থা কেমন হবে, যখন সে-
- জান্নাতের নহর থেকে দুধ পান করবে!
- সুরম্য বালুশয্যায় অবস্থান থাকবে!
- জান্নাতের আলিফাগান বালাখানায় বসবাস করবে!
- নবী-রাসূলগণের মজলিসে আসা-যাওয়া করবে!
বরং তখন তার অবস্থা কেমন হবে, যখন তার রব তাদের দিকে রহমতের দৃষ্টিতে তাকাবেন এবং বলবেন- 'হে জান্নাতবাসীগণ! তোমরা কি সন্তুষ্ট হয়েছ? অতঃপর তারাও তাদের মহামহিয়ান রবের চেহারার দিকে তাকাবে?
আল্লাহর কসম! তখন কি তার মনে হবে-
- সেই দুঃখ-কষ্টের কথা, যা সে দুনিয়াতে ভোগ করেছিল!
- সেই সচ্ছলতার কথা, যা তাকে ভোগ-উপভোগ ও বিলাসিতা থেকে বিরত রেখেছিল!
না; কক্ষনোই না! বরং সে থাকবে চিরস্থায়ী আরাম-আয়েশে। যেখানে যৌবন কখনও ফুরাবে না; কোনো জিনিসের স্বাদ ও আনন্দে কখনও কোনো ঘাটতি আসবে না। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন-
﴿وَلَدَيْنَا مَزِيْدٌ﴾
তারা তথায় যা চাইবে, তা-ই পাবে এবং আমার কাছে রয়েছে আরও অধিক। [সূরা ক্ব-ফ : ৩৫]
হ্যাঁ, আল্লাহর কাছে রয়েছে আরও অধিক, আরও বেশি। এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, নবীজী ﷺ ইরশাদ করেছেন-
﴿إِنَّ أَدْنَى أَهْلِ الْجَنَّةِ مَنْزِلَةً لَمَنْ يَنْظُرُ إِلَى جَنَانِهِ وَأَزْوَاجِهِ وَنَعِيمِهِ وَخَدَمِهِ وَسُرُورِهِ مَسِيرَةُ أَلْفِ سَنَةٍ﴾
একজন সাধারণ মর্যাদাসম্পন্ন জান্নাতীর বাগান, স্ত্রী, আমোদ-প্রমোদের সামগ্রী, খাদেম এবং খাট-পালঙ্ক ও আসনসমূহ কেউ দেখতে চাইলে তা তার জন্য হাজার বছরের পথ। [সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৮৫০]
আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের সকলকে খাঁটি দিলে খাঁটি তাওবা করার এবং সব বিষয়ে সর্বদা তাঁর অভিমুখী হওয়ার তাওফীক দান করেন। আমীন।

প্রিয় পাঠক!
এই যুবকের অবস্থা সেই যুবকের সাথে তুলনা করে দেখুন, যার বয়স হয়েছিল ষোল বছর। সে মসজিদে বসে কুরআন তেলাওয়াত করছিল আর ফজর সালাতের ইকামতের অপেক্ষা করছিল।
সময়মতো ফজরের ইকামত হল। যুবক উঠে হাতের কুরআন শরীফটি যথাস্থানে রাখল। জামাতে শরিক হওয়ার জন্য অগ্রসর হল। ঠিক তখন সে মাথা ঘুরিয়ে জমিনে পড়ে গেলো এবং তৎক্ষণাৎ বেহুঁশ হয়ে গেলো। মসজিদের কয়েকজন মুসল্লী তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেল।
তাকে চিকিৎসাপ্রদানকারী ডাক্তার পরবর্তীতে বলেছেন, এ যুবককে আমাদের কাছে আনা হয়েছিল জানাজার মতো বহন করে। আমি তার মূত্রগ্রন্থি পরীক্ষা করে দেখলাম সে হার্টঅ্যাটাক করেছে। আরও গভীরভাবে লক্ষ করে দেখলাম, সে তার জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো অতিক্রম করছে। আমরা দ্রুত তার চিকিৎসায় রত হলাম। আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলাম তার হার্টের উন্নতির জন্য।
পাশের রুম থেকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আনার জন্য আমি আমার এক সহকর্মীকে তার পাশে রেখে গেলাম। আমি দ্রুতই ফিরে এলাম। ফিরে এসে দরজায় দাঁড়িয়ে দেখি যুবক আমার সহকর্মী ডাক্তারের হাত ধরে রেখেছেন। ডাক্তার তার কান যুবকের মুখের কাছে নিয়ে রেখেছেন। যুবক কানে কানে তাকে কিছু বলছে। এ অবস্থা দেখে আমি ভিতরে প্রবেশ করলাম না। দরজায় দাঁড়িয়ে তাদের দেখতে লাগলাম।
হঠাৎ যুবক ডাক্তারের হাত ছেড়ে দিল। এখন সে সর্বশক্তি দিয়ে ডান কানে ঘোরানোর চেষ্টা করছে। অতঃপর ভারী কণ্ঠে উচ্চারণ করল- 'আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু'। এ কালিমাটি সে বারবার পড়ছিল। ধীরে ধীরে তার হৃদস্পন্দন কমে যেতে লাগল। আমরা সর্বশক্তি দিয়ে তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু আল্লাহ ﷺ-র ফায়সালা আমাদের চেষ্টার উপর কার্যকর হল। যুবক তার রবের কাছে চলে গেল।
সঙ্গে সঙ্গে আমার সহকর্মী ডাক্তারটি কান্নায় ভেঙে পড়লেন। তিনি এত বেশি কাঁদতে লাগলেন যে, পায়ের উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না। বসে পড়লেন।
এ ঘটনা দেখে আমরা আশ্চর্যান্বিত হলাম এবং তাকে বললাম, হে অমুক! আপনার কী হয়েছে? আপনি কাঁদছেন কেন? মৃত্যুর ঘটনা তো আপনি জীবনে এই প্রথম দেখেন না! কত মানুষের মৃত্যুই তো হল আপনার চোখের সামনে।
তিনি আমাদের কথা কানে নিলেন কি না জানি না। তিনি তেমনই কেঁদে যেতে লাগলেন।
অনেকক্ষণ পর...
তার কান্নার বেগ কিছুটা কমে এলে আমরা তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনার কী হয়েছে? যুবক আপনাকে কী বলেছিল?
তিনি বললেন, ডাক্তার! যুবক যখন দেখল আপনি ব্যাস্তসমস্ত হয়ে একবার রুম থেকে বের হচ্ছেন আবার প্রবেশ করছেন, চিকিৎসার বিভিন্ন সরঞ্জাম জোগাড় করছেন, তখন সে বুঝতে পারল, আপনিই তার জন্য নিয়োজিত ডাক্তার। তাই সে আমাকে বলল- ডাক্তার! আপনি আপনার সহকর্মীকে বলুন, তিনি যেন আমার জন্য শুধু শুধু কষ্ট না করেন। আমি কিছুক্ষণের মধ্যেই মারা যাব। আল্লাহর কসম! আমি জান্নাতে আমার স্থান দেখতে পাচ্ছি।
- আল্লাহু আকবার!
إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا تَتَنَزَّلُ عَلَيْهِمُ الْمَلَائِكَةُ أَلَّا تَخَافُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَبْشِرُوا بِالْجَنَّةِ الَّتِي كُنتُمْ تُوعَدُونَ. نَحْنُ أَوْلِيَاؤُكُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ ۖ وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَشْتَهِي أَنفُسُكُمْ وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَدَّعُونَ ۚ نُزُلًا مِّنْ غَفُورٍ رَّحِيمٍ
নিশ্চয় যারা বলে, আমাদের পালনকর্তা আল্লাহ, অতঃপর তাতেই অবিচল থাকে, তাদের কাছে ফেরেশতা অবতীর্ণ হয় এবং বলে, তোমরা ভয় করো না, চিন্তা করো না এবং তোমাদের প্রতিশ্রুত জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ করো। ইহকালে ও পরকালে আমরা তোমাদের বন্ধু। সেখানে তোমাদের জন্য আছে যা তোমাদের মন চায় এবং সেখানে তোমাদের জন্য আছে যা তোমরা দাবি কর। এটা ক্ষমাশীল করুনাময়ের পক্ষ থেকে সাদর আপ্যায়ন। [সুরা হা-মীম সেজদাহ : ৩০-৩২]
আল্লাহ ﷺ-র দরবারে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের সকলকে পুণ্যময় মৃত্যু দান করেন।
হ্যাঁ, প্রিয় পাঠক! এই হচ্ছে অনুতপ্ত ও অবাধ্য বান্দার পার্থক্য। প্রকৃত পার্থক্য তো ফুটে উঠবে সেদিন-
يَوْمَ يَفِرُّ الْمَرْءُ مِنْ أَخِيهِ ❁ وَأُمِّهِ وَأَبِيهِ ❁ وَصَاحِبَتِهِ وَبَنِيهِ ❁ لِكُلِّ امْرِئٍ مِّنْهُمْ يَوْمَئِذٍ شَأْنٌ يُغْنِيهِ ❁ وُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ مُّسْفِرَةٌ ❁ ضَاحِكَةٌ مُّسْتَبْشِرَةٌ ❁ وَوُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ عَلَيْهَا غَبَرَةٌ ❁ تَرْهَقُهَا قَتَرَةٌ ❁ أُولَئِكَ هُمُ الْكَفَرَةُ الْفَجَرَةُ
যেদিন পলায়ন করবে মানুষ তার ভাইয়ের কাছ থেকে, তার মা, তার পিতা, তার পত্নী ও তার সন্তানদের কাছ থেকে। সেদিন তাদের প্রত্যেকেরই এমন গুরুতর অবস্থা হবে, যা তাকে ব্যস্তভর করে রাখবে। অনেক মুখমন্ডল সেদিন হবে উজ্জ্বল, সহাস্য ও প্রফুল্ল; এবং অনেক মুখমন্ডল সেদিন হবে ধূলি ধূসরিত। সেগুলোকে কালিমা আচ্ছন্ন করে রাখবে। তারাই কাফের পাপিষ্ঠের দল। [সুরা আবাসা : ৩৫-৪২]
তবে যারা ধৈর্য ধারণ করেছে এবং নিজেকে শাহওয়াত ও প্রবৃত্তিপূজা থেকে বিরত রেখেছে, আল্লাহ ﷺ ও তাঁর রাসূল ﷺ কর্তৃক হারামমুক্ত যাবতীয় বিষয়াদি থেকে নিজেদের দূরে রেখেছে, তাদের জন্য তাদের প্রতিপালক অঙ্গীকার করেছেন এমন জান্নাতের, যার তলদেশ থেকে প্রবাহিত নহরসমূহ।
সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে, নবীজী ﷺ ইরশাদ করেছেন, 'দুনিয়ার সর্বাধিক সচ্ছল ও ধন-সম্পদের অধিকারী এক জাহান্নামীকে কেয়ামতের দিন উপস্থিত করা হবে। এরপর তাকে জাহান্নামের আগুনে একবার অবগাহন করিয়ে বলা হবে, হে আদম সন্তান! দুনিয়াতে তুমি কখনও আরাম-আয়েশ ভোগ করেছ কি? কখনও তুমি স্বচ্ছল অবস্থায় দিন অতিবাহিত করেছ কি?
সে বলবে, আল্লাহর কসম! হে আমার রব! না; কক্ষনো না।'
হ্যাঁ, যে ব্যক্তি দুনিয়ায় যাবতীয় আরাম-আয়েশে ডুবে ছিল, সব ধরনের নেয়ামত ভোগ করেছিল, জাহান্নামের আগুনে একটি মাত্র ডুব তাকে সে সবকিছু ভুলিয়ে দিবে। তা হলে তখন তার অবস্থা কী হবে, যখন তাকে-
- সেখানে অনন্তকাল থাকতে হবে!
- প্রতিনিয়ত শাস্তি ও আযাব অসহ্য যন্ত্রণা দিতে থাকবে!
- যাখুম খেতে হবে!
- ফুটন্ত পানি ও রক্ত-পূঁজ পান করতে হবে!
- কী অবস্থা হবে তখন তার, যখন তার সাহায্যপ্রার্থনার জবাবে বলা হবে-
﴿اِخْسَئُوْا فِيْهَا وَلَا تُكَلِّمُوْنِ﴾
তোমরা হীন অবস্থায় এখানেই পড়ে থাক এবং আমার সাথে কোনো কথা বলো না। [সূরা মুমিনুন : ১০৮]
আল্লাহর কসম! তার কি তখন মনে হবে-
- সেই অশ্লীলতার কথা, যাতে সে লিপ্ত হয়েছিল?
- সেই গানবাজনার কথা, যা সে শুনেছিল?
- সেই মদ ও নেশার কথা, যা সে পান করেছিল?
- সেই ধন-দৌলত ও সম্পদের কথা, যা সে উপার্জন করেছিল?
তখন তাকে বলা হবে-
﴿اِخْسَئُوْا فِيْهَا وَلَا تُكَلِّمُوْنِ﴾
এতে [জাহান্নামে] প্রবেশ কর। অতঃপর তোমরা চেঁচামেচি কর অথবা না কর, উভয়ই তোমাদের জন্য সমান। [সূরা তুর : ১৬]
অতঃপর নবীজী ﷺ বলেছেন- 'এরপর দুনিয়ার সর্বাধিক দুঃখকষ্টসম্পন্ন এক জান্নাতীকে উপস্থিত করা হবে। তারপর তাকে একবার জান্নাতে অবগাহন করিয়ে জিজ্ঞাসা করা হবে, হে আদম সন্তান! দুনিয়াতে তুমি কখনও কোনো কষ্ট দিনাতিপাত করেছ কি? কোনো হৃদয়বিদারক ও ভয়াবহ অবস্থার সম্মুখীন হয়েছ কি?
সে বলবে, আল্লাহর কসম! হে আমার রব! আমি কখনোই কোনো কষ্ট দিনাতিপাত করিনি। দুঃখ কী জিনিস, আমি কখনও তা দেখিনি।'
হ্যাঁ, জান্নাতে ক্ষণিকের অবস্থান তাকে তার দুনিয়াবী জীবনের যাবতীয় দুঃখ-বেদনা ও কষ্ট-ক্লেশ ভুলিয়ে দিবে। তা হলে তখন তার অবস্থা কেমন হবে, যখন সে-
- জান্নাতের নহর থেকে দুধ পান করবে!
- সুরম্য বালুশয্যায় অবস্থান থাকবে!
- জান্নাতের আলিফাগান বালাখানায় বসবাস করবে!
- নবী-রাসূলগণের মজলিসে আসা-যাওয়া করবে!
বরং তখন তার অবস্থা কেমন হবে, যখন তার রব তাদের দিকে রহমতের দৃষ্টিতে তাকাবেন এবং বলবেন- 'হে জান্নাতবাসীগণ! তোমরা কি সন্তুষ্ট হয়েছ? অতঃপর তারাও তাদের মহামহিয়ান রবের চেহারার দিকে তাকাবে?
আল্লাহর কসম! তখন কি তার মনে হবে-
- সেই দুঃখ-কষ্টের কথা, যা সে দুনিয়াতে ভোগ করেছিল!
- সেই সচ্ছলতার কথা, যা তাকে ভোগ-উপভোগ ও বিলাসিতা থেকে বিরত রেখেছিল!
না; কক্ষনোই না! বরং সে থাকবে চিরস্থায়ী আরাম-আয়েশে। যেখানে যৌবন কখনও ফুরাবে না; কোনো জিনিসের স্বাদ ও আনন্দে কখনও কোনো ঘাটতি আসবে না। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন-
﴿وَلَدَيْنَا مَزِيْدٌ﴾
তারা তথায় যা চাইবে, তা-ই পাবে এবং আমার কাছে রয়েছে আরও অধিক। [সূরা ক্ব-ফ : ৩৫]
হ্যাঁ, আল্লাহর কাছে রয়েছে আরও অধিক, আরও বেশি। এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, নবীজী ﷺ ইরশাদ করেছেন-
﴿إِنَّ أَدْنَى أَهْلِ الْجَنَّةِ مَنْزِلَةً لَمَنْ يَنْظُرُ إِلَى جَنَانِهِ وَأَزْوَاجِهِ وَنَعِيمِهِ وَخَدَمِهِ وَسُرُورِهِ مَسِيرَةُ أَلْفِ سَنَةٍ﴾
একজন সাধারণ মর্যাদাসম্পন্ন জান্নাতীর বাগান, স্ত্রী, আমোদ-প্রমোদের সামগ্রী, খাদেম এবং খাট-পালঙ্ক ও আসনসমূহ কেউ দেখতে চাইলে তা তার জন্য হাজার বছরের পথ। [সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৮৫০]
আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের সকলকে খাঁটি দিলে খাঁটি তাওবা করার এবং সব বিষয়ে সর্বদা তাঁর অভিমুখী হওয়ার তাওফীক দান করেন। আমীন।

📘 তাওবাতান নাসূহা খাঁটি তাওবা > 📄 দ্বিতীয় বিষয়

📄 দ্বিতীয় বিষয়


কোনো কোনো মানুষ যখন কোনো গুনাহ থেকে তাওবা করতে চায়, তখন শয়তান তাকে ধোঁকা দেয়। উদাহরণস্বরূপ, কেউ যখন গানবাদ্য শোনা থেকে তাওবা করতে চায়, তখন শয়তান তাকে এ বলে ধোঁকা দেয়- ‘যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি সিগারেট খাবে, সালাতে অলসতা করবে ইত্যাদি গুনাহে লিপ্ত থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত গানবাদ্য শোনা থেকে তোমার তাওবা কবুল হবে না। হয়তো তুমি এই সব গুনাহ থেকে একসঙ্গে তাওবা করবে, নয়তো তোমার কোনো তাওবাই কবুল হবে না। অতএব, শুধু শুধু তোমার নফসকে কষ্ট দিও না।’
'এটা ভুল কথা। কেননা, প্রত্যেক গুনাহের তাওবা আলাদা। এটা খুবই সম্ভব যে, কেউ অন্য কোনো গুনাহে লিপ্ত থাকা সত্ত্বেও তার যিনা-ব্যভিচারের তাওবা আল্লাহ কবুল করবেন। তবে এটা ঠিক যে, বান্দার উচিত সমস্ত গুনাহ থেকেই তাওবা করে নেওয়া।
একটি ঘটনা মনে পড়ে গেল। একবার আমরা একটি মসজিদ নির্মাণের জন্য লোকজনকে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছিলাম। লোকজন যে যার সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য করেছিল। তারই ধারাবাহিকতায় এক যুবক আমাদের কাছে এল। সে সিগারেট খেত; আরও বিভিন্ন গুনাহের কাজে লিপ্ত হত।
যুবক আমাদের কাছে এসে মুখবন্ধ একটি পাত্র আমার দিকে বাড়িয়ে দিল। খুলে দেখলাম তাতে পাঁচ হাজার রিয়াল আছে। আমি কিছুটা কৌতূহলী হয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি এগুলো কোত্থেকে এনেছ? সে উত্তর দিল, আমি আমার মা, ভাই ও কিছু নিকটাত্মীয়ের কাছ থেকে দিয়েছিলাম। তাদের কাছ থেকেই এগুলো সংগ্রহ করেছি। শায়খ! আপনি এগুলো রাখুন; মসজিদের কাজে ব্যয় করবেন।
প্রিয় পাঠক! একটি ভাবুন! ওই মসজিদে যত মুসল্লী সালাত আদায় করবেন, যত তাসবীহ পাঠকারী তাসবীহ পাঠ করবেন, যত যিকিরকারী যিকির করবেন, যত তেলাওয়াতকারী তেলাওয়াত করবেন, তার সমপরিমাণ সাওয়াব কি ওই যুবকের আমলনামায় লেখা হবে না?
— হবে। অবশ্যই হবে। কারণ, নবীজী ইরশাদ করেছেন-
مَنْ سَنَّ فِي الْإِسْلَامِ سُنَّةً حَسَنَةً فَلَهُ أَجْرُهَا وَأَجْرُ مَنْ عَمِلَ بِهَا إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ، مِنْ غَيْرِ أَنْ يَنْقُصَ مِنْ أُجُورِهِمْ شَيْءٌ
যে ব্যক্তি কোনো নেক কাজের প্রতি আহ্বান করবে, তার আমলনামায় সেসকল লোকের সমপরিমাণ সাওয়াব লেখা হবে, যারা তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমল করবে; আমলকারীদের সাওয়ায়ে বিদুম্মাত ও কমাতি করা ছাদাই। সিহাহ মুসলিম, হাদীস নং ২৬৭৮, মুয়াত্তা ইমাম মালেক, হাদীস নং ৫০৭, সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৬৭৪, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ২০৬, সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৮০৯]
কেন নয়?! অবশ্যই!
যেহেতু আমাদের আলোচিত যুবক তার সম্পদ এই মসজিদে দান করেছে, যেহেতু কেয়ামতের আগ পর্যন্ত সে তার সাওয়াব পেতে থাকবে– যদি তার নিয়ত ভালো থাকে।
প্রিয় পাঠক! আমি যে কথা বলতে চাচ্ছি, তা হচ্ছে– ওই যুবক মসজিদের জন্য টাকা সংগ্রহ করার সময় যদি শয়তান তাকে ধোঁকা দিয়ে বলত– ‘আরে তুমি মসজিদের জন্য টাকা সংগ্রহ করছো! অথচ তুমি একজন গুনাহগার; তুমি সিগারেট খাও; গান শোনো; দাড়ি মুণ্ডন কর’, আর ওই যুবকও যদি ধোঁকা খেয়ে বলত– ‘হাঁ, তাই তো! আমি তো গান শুনি; দাড়ি মুণ্ডন করি; আরও বিভিন্ন গুনাহের কাজ করি, এমতাবস্থায় আমি কী করে মসজিদ নির্মাণ করি? কিংবা মসজিদ নির্মাণের কাজে সাহায্য করি?! না, এটা করা যায় না। যখন আমি সিগারেট খাওয়া থেকে তাওবা করব; অমুক অমুক গুনাহ থেকে তাওবা করব, তখন আমি মসজিদ নির্মাণের জন্য সাহায্য করব’, তা হলে সুনিশ্চিত শয়তান তার উপর বিজয়ী হয়ে যেত এবং সে সমস্ত বড় কল্যাণ ও সাওয়াব থেকে সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত হয়ে যেত। কিন্তু ওই যুবক ভাগ্যবান। সে তার নফসের উপর বিজয় লাভ করতে পেরেছে।
তা ছাড়া আরও একটি বিষয় জেনে রাখুন, কোনো গুনাহ থেকে তাওবা করার পর পুনরায় সেই গুনাহে লিপ্ত হওয়ার অর্থ এই নয় যে, পূর্বের তাওবা বাতিল হয়ে গেছে, ফলে বান্দা নিরাশ হয়ে যাবে এবং পুনরায় গুনাহের রাজ্যে নিমগ্ন হয়ে যাবে। না; বরং আবারও এবং দৃঢ়ত তাওবা করে নেবে। আল্লাহ পাকুর কুরআনে ইরশাদ করেছেন–
إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ
এবং যারা কখনও কোনো অশ্লীল কাজ করে ফেললে কিংবা কোনো মন্দ কাজে জড়িত হয়ে নিজের উপর জুলুম করে ফেললে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আল্লাহ ছাড়া আর কে পাপ ক্ষমা করবেন? তারা নিজের কৃতকর্মের জন্য হঠকারিতা প্রদর্শন করে না এবং জেনে-শুনে তা-ই করতে থাকে না। [সুরা আলে ইমরান : ১০৭]

📘 তাওবাতান নাসূহা খাঁটি তাওবা > 📄 তৃতীয় বিষয়

📄 তৃতীয় বিষয়


তাওবার মোট শর্ত পাঁচটি। যথা-
১. কৃত গুনাহ থেকে তৎক্ষণাৎ বিরত হয়ে যাওয়া।
২. কৃতকর্মের উপর লজ্জিত ও অনুতপ্ত হওয়া।
৩. ভবিষ্যতে এ গুনাহ আর কখনও না করার ব্যাপারে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হওয়া।
৪. কারও কোনো হক নষ্ট করে থাকলে কিংবা কারও উপর জুলুম করে থাকলে সে হক ফিরিয়ে দেওয়া অথবা তাদের কাছ থেকে ক্ষমা নিয়ে নেওয়া।
৫. তাওবার সময় বাকি থাকতে তাওবা করা। অতএব, মৃত্যুর যন্ত্রণা শুরু হয়ে গেলে কিংবা কেয়ামতের পূর্বে পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হয়ে যাওয়ার পর তাওবা করলে সে তাওবা গ্রহণযোগ‍্য হবে না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00