📘 তাওবাতান নাসূহা খাঁটি তাওবা > 📄 দ্বীনের সৈনিক

📄 দ্বীনের সৈনিক


জিরতের পর রাসূলুল্লাহ্ যখন মদিনাতে দীনি দাওয়াত ও একটি ইসলামী সমাজব্যবস্থা কায়েম করতে সক্ষম হন, তখন তিনি অন্যান্য দেশ ও অঞ্চলের দিকেও মনোনিবেশ করেন। একত্ববাদের দাওয়াত দিয়ে বিভিন্ন শহর ও ভূখন্ডে লোক পাঠাতে শুরু করেন। একেকজন সাহাবীকে একেক অঞ্চল ও শহরে প্রেরণ করেন। কাউকে মিসরে, কাউকে শামে। কাউকে ইয়ামানে, আবার কাউকে ইরাকে।
সাহাবীগণ সেখানে গিয়ে মানুষকে দীনের দাওয়াত দিতেন; দ্বীনি শিক্ষা দিতেন। মানুষকে একত্ববাদ ও এক আল্লাহ্ র-এর ইবাদতের দিকে আহ্বান করতেন।
তেমনি একজন সাহাবীকে প্রেরণ করেছেন ‘ওয়াদীয়ে নোমান’-এ। ‘ওয়াদীয়ে নোমান’ মক্কা ও তায়েফের মধ্যবর্তী একটি উপত্যকার নাম। নবীজী র এ সাহাবীকে প্রেরণের পূর্বে বলে দিলেন, তুমি সেখানে গিয়ে কিছু বেদুইন ও কাফেরকে পাবে, যারা লাত ও উজ্জার ইবাদত করে; বিভিন্ন মূর্তির পূজা করে। তুমি তাদেরকে একত্ববাদের দাওয়াত দিবে; এক আল্লাহ্ র-এর পথে আহ্বান জানাবে। সাহাবী রওয়ানা হয়ে গেলেন। ওয়াদীয়ে নোমান-এ পৌঁছে বেদুইনদের দেখতে পেলেন; ভেড়া-বকরি আর উট-দু’সাই ছিল যাদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য; চিন্তা ও চেতনার প্রাণকেন্দ্র। এ ছাড়া আর তেমন কিছুই জানত না তারা।
সাহাবী নবীজীর উপদেশ ও দিকনির্দেশনা মোতাবেক তাদেরকে দীনের পথে, ইসলামের পথে আহ্বান জানানো শুরু করলেন; একত্ববাদের দাওয়াত দিতে লাগলেন; পাথরের মূর্তি ও দেব-দেবীর পূজা ছেড়ে এক আল্লাহ্ র-এর ইবাদতে নিমগ্ন হতে বললেন।
কিন্তু দুঃখের বিষয়, তারা কেউই ঈমান গ্রহণ করল না। বরং সবাই অস্বীকার করল এবং বলল, একজন অজানা-অচেনা আগন্তুকের কথায় আমরা কীভাবে আমাদের সেসব পূর্বপুরুষের ইবাদত পরিত্যাগ করব, বহু বছর যাবত আমাদের বাপ-দাদা ও পূর্বপুরুষগণ যাদের ইবাদত করে আসছে? এটা কখনোই হতে পারে না; কিছুতেই হতে পারে না! এ বলে তারা সবাই দীনের দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করল এবং অস্বীকৃতি জানাল– শুধু একজন ছাড়া...
সেই একজন, তখনই নিজের উট সওয়ার হয়ে বসল এবং চলতে শুরু করল। উদ্দেশ্য মদিনা। এক সময় পৌঁছে গেল।
তায়েফ থেকে মদিনা- প্রায় পঁচিশ কিলোমিটারেরও বেশি পথ। মদিনায় পৌঁছে লোকটি বুঝতে পারছে না কোথায় যাবে, কোন দিকে যাবে। এক সময় মদিনার লোকদের জিজ্ঞেস করল- তোমাদের সেই লোকটি কোথায়, যিনি নিজেকে নবী বলে দাবি করেন?
লোকেরা জানাল, তিনি মসজিদে আছেন। তুমি সেখানে যাও।
লোকটি আবার চলতে শুরু করল। যেতে যেতে এক সময় মসজিদে গিয়ে উপস্থিত হল। দরজার কাছে নিজের উটটি বেঁধে মসজিদে প্রবেশ করল। প্রবেশ করার পর ডানে-বামে তাকাতে লাগল। বুঝাতে পারছে না কী বলবে, কী বলবে। ক্ষণকাল পর উচ্চ আওয়াজে জিজ্ঞাসা করল– তোমাদের সেই লোকটি কোথায়, যিনি নিজেকে নবী বলে দাবি করেন? কোথায় মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ্?
সাহাবায়ে কেরাম তাকে বললেন, তুমি কি হেলান দিয়ে বসে থাকা শখ-সুন্দর মানুষটিকে দেখতে পাচ্ছ?
আগতুক বলল, হাঁ, দেখতে পাচ্ছি।
সাধারণজন বললেন, তিনিই মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ ﷺ।
আগন্তুক আবার জিজ্ঞাসা করল, ইনিই কি নিজেকে নবী বলে মনে করেন?
সাধারণজন উত্তর দিলেন, হাঁ; ইনিই।
আগন্তুক কাভারের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। যেতে যেতে নবীজীর কাছাকছি চলে গেল।
এক সাহাবী বর্ণনা করেন, আমরা লোকটির আওয়াজ শুনছিলাম কিন্তু বুঝতে পারছিলাম না সে কী বলছে। আমরা তার দিকে ভালোভাবে তাকালাম। দেখলাম লোকটি একজন বেদুইন। তার মাথায় চুলের দু’টি ঝুঁটি রয়েছে। চুলগুলো লম্বা লম্বা। সে আরও এগিয়ে গেল এবং নবীজীর একেবারে কাছাকছি গিয়ে বসল। তারপর নবীজী ﷺ ও আশপাশে উপস্থিত সাহাবাদের কেরামের দিকে তাকাতে লাগল। অতঃপর জিজ্ঞাসা করল, তোমাদের মধ্যে মুহাম্মাদ কে?
নবীজী ﷺ বললেন, এই যে আমি মুহাম্মাদ। বেদুইন জিজ্ঞাসা করল, আপনিই কি সেই ব্যক্তি, যিনি নিজেকে নবী বলে বিশ্বাস করেন?
নবীজী বললেন, হ্যাঁ।
আগন্তুক বলল, আমি আপনাকে কিছু প্রশ্ন করব এবং বেশ কিছু বিষয়ে খুঁটিনাটি জিজ্ঞাসা করব। আপনি কিছু মনে করবেন না।
বেদুইন লোকটির কথার অর্থ হচ্ছে– আমি একজন বেদুইন। কথা বলার রীতি-নীতি আমার জানা নেই। কোনো বিষয় সাজিয়ে-গুছিয়ে সুন্দর করে উপস্থাপন করার যোগ্যতাও আমার নেই। আমি এসব শিখিনি। আমি আপনার সঙ্গে কথা বলব সেভাবেই, যেভাবে আমি কথা বলি আমার কওমের বেদুইনদের সাথে।
নবীজী কোমলভাবে বললেন, তুমি যা জানতে চাও জিজ্ঞাসা কর।
আগন্তুক এবার তার প্রশ্ন শুরু করল। প্রথমেই জিজ্ঞাসা করল, হে মুহাম্মাদ! কে আকাশকে ঊর্ধ্বে স্থাপন করেছেন?
নবীজী ﷺ বললেন, আল্লাহ।
বেদুইন জিজ্ঞাসা করল, কে জমিনকে বিসৃত করেছেন?
নবীজী ﷺ বললেন, আল্লাহ।
আগন্তুক আবারও জিজ্ঞাসা করল, কে পাহাড়সমূহ স্থাপন করেছেন?
নবীজী ﷺ বললেন, আল্লাহ।
বেদুইন লোকটি এবার বলল, আমি আপনাকে সেই সত্তার কসম দিয়ে বলছি, যিনি আকাশসমূহ ঊর্ধ্বে স্থাপন করেছেন, জমিনকে বিসৃত করেছেন এবং পাহাড়সমূহ স্থাপন করেছেন, আল্লাহই কি আপনাকে রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছেন?
নবীজী ﷺ বললেন, হ্যাঁ।
বেদুইন লোকটি বলল, আমি আপনাকে সেই সত্তার কসম দিয়ে জিজ্ঞাসা করছি যিনি আপনাকে রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছেন, আল্লাহই কি আপনাকে আদেশ দিয়েছেন আমাদেরকে মূর্তি পূজা ও সেসব শিরকের ইবাদত থেকে নিষেধ করতে, যাদের ইবাদত করত আমাদের বাপ-দাদা ও পূর্বপুরুষগণ? তিনিই কি আপনাকে এ আদেশ দিয়েছেন, যেন আমরা দেব-দেবী ও অন্যান্য মাবুদের পূজা-অর্চনা না করে একমাত্র আল্লাহরই ইবাদত করি?
নবীজী ﷺ বললেন, হ্যাঁ।
বেদুইন লোকটি বলল, আমি আপনাকে সেই সত্তার কসম দিয়ে বলছি, যিনি আপনাকে প্রেরণ করেছেন, আল্লাহই ﷺ-ই কি আপনাকে নির্দেশ দিয়েছেন, যেন আপনি আমাদেরকে প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায়ের আদেশ করেন?
নবীজী ﷺ বললেন, হ্যাঁ।
বেদুইন লোকটি বলল, আমি আপনাকে সেই সত্তার কসম দিয়ে বলছি, যিনি আপনাকে প্রেরণ করেছেন, আল্লাহই ﷺ-ই কি আপনাকে নির্দেশ দিয়েছেন, যেন আপনি আমাদেরকে রমযানের রোযা রাখতে ও আমাদের সম্পদে পবিত্র করতে [অর্থাৎ যাকাত আদায় করতে] আদেশ করেন?...
এভাবে আগন্তুক বেদুইন লোকটি নবীজী ﷺ-র সামনে ইসলামের মৌলিক বিষয়াবলি ও শরীয়তের গুরুত্বপূর্ণ বিধানাবলির উল্লেখ করছিল আর নবীজী ﷺ ‘হাঁ’ ‘হাঁ’ বলে উত্তর দিয়ে যাচ্ছিলেন।
এক সময় তার কথা শেষ হল। অতঃপর বলল, আমি যিমাম ইবনে সা‘লাবা। বনু সা’দ ইবনে বকর গোত্রের একজন। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই এবং আপনি আল্লাহর রাসূল। কসম সেই সত্তার, যিনি আপনাকে সত্য দিয়ে প্রেরণ করেছেন! আপনি আমাকে যা যা বললেন, আমি তাতে বৃথ্ব্য ও করব না, তা থেকে কমও করব না।
এ কথা শুনে নবীজী ﷺ তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, তুমি সফলকাম।
এরপর লোকটি উঠে দাঁড়াল। ঘুরে নিজের উটের দিকে রওয়ানা হল। নবীজী ﷺ তাঁর দিকে ইশারা করে বললেন– ‘দুই খুঁটিওয়ালা সফলকাম, যদি সে সত্য বলে থাকে।’ [সহীহ বুখারী, কিতাবুল ঈমান, হাদীস নং ৪৮, সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ঈমান, হাদীস নং ৯৯, ১০২, সুনানে আবূ দাউদ, হাদীস নং ৩১২, ৩৫২, সুনানে নাসায়ী, হাদীস নং ৪৫৭, ২০৪৮, ৫০৩৪]
বেদুইন লোকটি চলে গেলেন। তিনি নবীজী ﷺ-র দরবারে খুব বেশি সময় ছিলেন না। কেবল প্রশ্নোত্তর ও কথাবার্তার সময় ও সময়টুকুই নবীজী ﷺ-র দরবারে অবস্থান করেছিলেন। কিন্তু... প্রিয় পাঠক! লক্ষ করুন, নবীজীর মুখ থেকে শোনা এ কয়েকটি কথার প্রভাব ও ফলাফল কী হয়েছিল! তিনি দরবার থেকে উঠে উটের কাছে গেলেন। উটের রশি খুলে সওয়ার হয়ে সোজা চলে গেলেন ওয়া গিয়ে নোমান-এ- নিজ সম্প্রদায়ের। টানা দশ দিন সফর করে তিনি মদীনায় এসে পৌঁছেছিলেন। পুনরায় দশ দিন সফর করে নিজ উপত্যকায় গিয়ে পৌঁছেলেন।
আপন গৃহে প্রবেশ করার পর স্ত্রী তাঁকে দেখে খুশি হলেন। স্বাগত জানাতে এগিয়ে এলেন। কিন্তু তিনি স্ত্রীকে সম্বোধন করে বললেন, তুমি আমার কাছে এসো না। আমার থেকে দূরে থাক। ধ্বংস হোক লাত! ধ্বংস হোক উজ্জা!
স্বামীর কথায় স্ত্রী হোঁচট খেলেন, আতঙ্কিত হলেন। সবিনয়ে বললেন, যিমাম! লাত-উজ্জার ব্যাপারে তুমি এসব কী বলছ? তুমি কুইষ্ঠ রোগে আক্রান্ত? তুমি পাগল হয়ে যাচ্ছোকে ভয় কর!
উল্লেখ্য, তারা অজ্ঞতা ও মূর্খতাবশত এ বিশ্বাস পোষণ করত যে, যে কেউ লাত-উজ্জাকে গালি দিবে, সে এসবফল রোগে আক্রান্ত হবে।
যিমাম ﷺ বললেন, আল্লাহর কসম! লাত-উজ্জার কোনো কিছুই করার ক্ষমতা নেই। না তারা কারো কোনো ক্ষতি করতে পারে, না কারো কোনো উপকার সাধন করতে পারে। এ ক্ষমতা তাদের নেই।
কথাবার্তা ও আলোচনা চলছিল। এরই মাঝে যিমাম ﷺ তাঁর স্ত্রীকে বোঝাচ্ছিলেন। একত্ববাদ ও ইসলামের দাওয়াতও দিচ্ছিলেন। এক পর্যায়ে তার স্ত্রী ইসলাম গ্রহণ করে ফেললেন।
তারপর তিনি গেলেন পিতার কাছে। পিতা ও ছেলেকে দেখে আনন্দিত হলেন। এগিয়ে এলেন সন্তান জানতে। কিন্তু তিনি তেমনি বললেন– ধ্বংস হোক লাত! ধ্বংস হোক উজ্জা!
একথা শুনে পিতাও আঁতকে উঠলেন। বললেন, হে যিমাম! তুমি কুইষ্ঠ রোগে আক্রান্ত? তুমি পাগল হয়ে যাচ্ছোকে ভয় কর! লাত-উজ্জা তোমার প্রভু। তোমার বাপ-দাদা ও পূর্বপুরুষদের প্রভু।
যিমام ﷺ বললেন, হে আমার পিতা! লাত-উজ্জা কারও কোনো ক্ষতি কিংবা উপকার করার কোনো ক্ষমতা রাখে না। সে ক্ষমতা তাদের নেই। বরং তাদের নিজেদেরই ভালো-মন্দের ক্ষমতা তাদের নেই।
এভাবে তিনি তাঁর পিতাকে বোঝাতে লাগলেন। একত্ববাদ ও ঈমানের দাওয়াতও দিতে লাগলেন। এক সময় তার পিতাও ইসলাম কবুল করে নিলেন।
একইভাবে তিনি তার সম্প্রদায়ের প্রতিটি ঘরে গিয়ে পূজা সকলে দ্বীনের দাওয়াতও দিতে লাগলেন। সবাকে মূর্তিপূজার অসারতা ও অন্তঃসারশূন্যতা বোঝাতে লাগলেন। বাতিল মাবুদদের নিষ্ফল পূজা পরিহার করে এক আল্লাহ ﷺ-র ইবাদতে নিমগ্ন হতে বললেন।
অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, সেদিন সূর্যাস্তের সময় তার সম্প্রদায়ে একজন কাফেরও অবশিষ্ট ছিল না। সকলেই ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করে নিয়েছিল।
প্রিয় পাঠক! যামানায যামানায পাওয়া যাবে কি কোনো তাওবাকারীর মাঝে এমন উৎসাহ ও উদ্দীপনা! দ্বীনের প্রচার-প্রসার ও ঈমানদারদের কল্যাণে এমন জযবা ও উদ্যমশীলত!
বহু তাওবাকারী তাওবার পূর্বে অপরাধ জগতে ছিল সর্দার, কিন্তু তাওবার পরে হয়ে গেছে নিরীক্ষার। আগে ছিল ঘোড়সওয়ার এখন হয়ে গেছে পায়ে হাঁটা পথিকরা!
আশ্চর্য! জাহেলিয়াতে ছিল বীর এখন হয়ে গেছে ভীরু। ছিল তেজস্বী, হয়ে গেছে নিস্তেজ। ইসলাম ও মুসলমানদেনর কোনো উপকারই সে করতে পারে না।
– না দাওয়াতের ক্ষেত্রে।
– না ইসলাহ ও আত্মশুদ্ধিতে।
– না মূর্তকে শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে।
– না গায়েলফকে নসিহত করার ব্যাপারে।
প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ ﷺ-র আযমত ও বড়ত্বকে যে অন্তরে বসাতে পেরেছে, সে কড়াতাবে নিজের নফসের হিসাব নিতে পারে। নিজেকে কঠোরভাবে যাচাই করতে পারে।
উপমা : ১
খলীফাতুল রাসূল আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহু-র একটি গোলাম ছিল। গোলাম প্রতিদিন কাজের সন্ধানে বের হত। দিন শেষে গোলাম কিছু না কিছু মাল বা খাবার মনিবের জন্য নিয়ে আসত। সে কোনোদিন বাজারে গিয়ে কুলির কাজ করত; কোনোদিন মানুষের মজুর খাটত; কোনোদিন নির্মাণকাজ করত। এভাবে একেকদিন একেক কাজ বের হত। প্রতিদিনই সে দিন শেষে কিছু না কিছু মনিবের জন্য নিয়ে আসত।
গোলাম প্রতিদিন যা-ই নিয়ে আসত, আবূ বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু প্রথমেই তাকে জিজ্ঞাসা করতেন, আজ কী কাজ করেছ? গোলাম কোনোদিন উত্তর দিত– আজ কুলির কাজ করেছি; কোনোদিন উত্তর দিত– আজ নির্মাণ কাজ করেছি। ইত্যাদি... গোলামের জবাব শুনে আবূ বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু হাসতেন। অতঃপর সেই খাবার খেতেন বা মাল গ্রহণ করতেন।
কিন্তু একদিন গোলাম কোথাও থেকে তার জন্য কিছু খাবার নিয়ে এলে যাচাই করার ছাড়াই তিনি বিসমিল্লাহ বলে এক লোকমা মুখে তুলে নিলেন। কারণ, তিনি সেদিন খুবই ক্ষুধার্থ ছিলেন।
এ দেখে গোলাম বলল, আবূ বকর! আপনি তো প্রতিদিন খাবার নিয়ে এলে জিজ্ঞাসা করেন– এ খাবার আমি কোত্থেকে এনেছি। কিন্তু আজকে তো তেমন কিছুই জিজ্ঞাসা করলেন না?
আবূ বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ঠিকই তো! প্রচণ্ড ক্ষুধা আমাকে বে-খেয়াল করে দিয়েছে। তুমি এ খাবার কোত্থেকে এনেছ?
গোলাম বলল, জাহেলী যামানায় একবার আমি এক কম্বলের জন্য গণকের কাজ করেছিলাম। তবে আমি তা ভালো পারতাম না।¹ কিন্তু সেদিন তারা আমাকে কোনো পারিশ্রমিক দেয়নি। আজ আমি আবার তাদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। দেখলাম, তাদের ওখানে ওলীমার অনুষ্ঠান হচ্ছে। আমি তাদের কাছে গিয়ে বললাম– আমি তোমাদের কাছে আমার পারিশ্রমিক চাইতে এসেছি।
আমার দাবি শুনে তারা বলল, ঠিক আছে আমাদের খাবার থেকে তোমার পারিশ্রমিক নিয়ে যাও। আবূ বকর! আপনার সামনের এই খাবার তাদের দেওয়া সেই খাবার।
আবূ বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন– নাউযুবিল্লাহ! আমি আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করছি। তুমি আমাকে গণনার পারিশ্রমিকের খাবার খাওয়াচ্ছ?! তুমি আমাকে মন্ত্র-তন্ত্র ও ভোজবাজির খাবার খাওয়াচ্ছ?! আমি আল্লাহর আশ্রয় চাই। আমি আল্লাহর পানাহ চাই।
তারপর তিনি গলার ভিতর আঙ্গুল ঢুকিয়ে বমি করে পেটের ভিতর থেকে সেই খাবার বের করে দিতে চেষ্টা করতে লাগলেন।
লোকেরা বলল, খলীফাতুল মুসলিমীন! এক লোকমা খাবার আর তেমন কী? এর জন্য আপনি এত কষ্ট করছেন কেন?
তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! এই লোকমা পেট থেকে বের করার আগ পর্যন্ত আমি দাঁড়াব না, বসব না, ঘুমাব না।
লোকেরা বলল, এই এক লোকমা খাবার আপনি এত সহজে বের করতে পারবেন না। তবে যদি অধিক পরিমাণে পানি পান করেন, তা হলে হয়তো পারবেন।
আবূ বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, তোমরা আমার জন্য পানি নিয়ে এসো। লোকেরা তা-ই করল। তাঁর জন্য গরম পানি নিয়ে এল। অতঃপর তিনি তা পান করতে শুরু করলেন এবং বমি করতে চেষ্টা করতে লাগলেন। যতক্ষণ না বমি করে পেট থেকে সবকিছু বের করতে সক্ষম হলেন, ততক্ষণ পর্যন্ত এ প্রক্রিয়া চালিয়ে গেলেন।
তারপর লোকেরা জিজ্ঞাসা করল, খলীফাতুল মুসলিমীন! এই একটি লোকমার জন্য কেন আপনি এত কষ্ট করলেন?
তিনি বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, তিনি ইরশাদ করেছেন–
لَا تَمُتْ مِنْ سُخْتِ فَكَارٍ أَوْلَى
যে শরীর হারাম খাদ্য থেকে পুষ্ট, তার জন্য জাহান্নামই অধিকতর উপযুক্ত। [হিলয়াতুল আউলিয়া- ৫/৩৫]
শরীরের যে গোশত হারাম খাদ্য থেকে উৎপন্ন হবে, তা জান্নাতে যাওয়ার উপযুক্ত নয়। বরং তার জন্য জাহান্নামই অধিকতর উপযুক্ত। তাই আমি ভয় করছি, আমি যে লোকমাটি খেয়ে ফেলেছি, তা থেকে না আবার আমার শরীরে কোনো অংশ উৎপন্ন হয়ে যায়!
আশ্চর্য : আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহু! খলীফাতুল মুসলিমীন; নবীজীর পর উম্মতের সবচেয়ে বড় মুত্তাকী ও পরহেজগার ব্যক্তি, তিনিই যদি এক লোকমা খাবারের জন্য এত কষ্ট করেন, তা হলে সেসব লোকের ব্যাপারে মূল্যায়ন ও মন্তব্য কী হতে পারে, যারা নিয়মিত ইচ্ছাকৃতভাবে–
- হারাম ভক্ষণ করে!
- মদ পান করে!
- অন্যান্য নেশাদ্রব্য গ্রহণ করে?!
আরও লক্ষ করুন, খলীফাতুল মুসলিমীন উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু কতটা সূক্ষ্ম ও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে স্বীয় নফসের হিসাব নিতেন।
উপমা : ২
শাম অঞ্চলে নিযুক্ত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-র গভর্নর তাঁর কাছে মশক পাটিয়েছিলেন, যেন সেগুলো বিক্রি করে বিক্রয়লব্ধ অর্থ ‘বাইতুল মাল’-এ জমা করে দেওয়া হয়। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু সে তেল মেপে মেপে মানুষের পাতে দিতে শুরু করলেন। যখন এক মশক শেষ হয়ে যেত, তখন তিনি সেটিকে উল্টিয়ে সম্পূর্ণরূপে নিংড়ে সেটিকে রেখে দিতেন।
পাশেই ছিল তাঁর এক ছোট ছেলে। যখনই তিনি কোনো খালি মশক পাতে রাখতেন, তখন তাঁর ছোট ছেলে ওই মশকটি নিজের মাথার উপর উঠে ধরত। মশক থেকে এক/দুই ফোঁটা তেল তার মাথায় পড়ত। এভাবে সে চার/পাঁচ মশক থেকে নিংড়ে কয়েক ফোঁটা তেল মাথায় মাখল।
বিষয়টি ততক্ষণ উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-র নজরে পড়েনি। তিনি হঠাৎ ছেলের দিকে তাকিয়ে দেখেন তার মাথার চুল সুন্দর দেখাচ্ছে! তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি মাথায় তেল মেখেছ?
ছেলে জবাব দিল, হ্যাঁ।
উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞাসা করলেন, কোত্থেকে?
ছেলে জবাব দিল, এই মশকগুলো থেকে এক/দুই ফোঁটা করে নিংড়ে নিংড়ে।
জবাব শুনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, তোমার চুল মুসলিম জনগণের তেল দ্বারা সজ্জিত হয়েছে, পুষ্ট হয়েছে, কোনো বিনিময় ছাড়াই। আল্লাহর কসম! নিসন্দেহে এ ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। এ বলে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু ছেলেকে ধরে নাপিতের কাছে নিয়ে গেলেন এবং মাথার সমস্ত চুল কামিয়ে দিলেন, মুসলিম জনসাধারণের এক/দুই ফোঁটা তেলের অবস্থা।
এই হল আল্লাহওয়ালা ও মুত্তাকীদের অবস্থা। পক্ষান্তরে যাদের অন্তরে আল্লাহর ভয় নেই, কেবল প্রবৃত্তিপূজা ই যাদের একমাত্র লক্ষ্য ও কর্ম, দুনিয়া-আখেরাতে তারা ক্ষতিগ্রস্ত। দুনিয়ার জীবন হয়তো কোনোভাবে কেটে যাবে, কিন্তু মৃত্যুর সময় যারপরনাই লজ্জিত ও অনুতপ্ত হতে হবে, কিন্তু গুনাহ্কারী সেই লজ্জা ও অনুতাপ কোনোই কাজে আসবে না। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন–
وَلَوْ تَرَى إِذِ الظَّالِمُونَ فِي غَمَرَاتِ الْمَوْتِ وَالْمَلَائِكَةُ بَاسِطُوا أَيْدِيهِمْ أَخْرِجُوا أَنْفُسَكُمُ الْيَوْمَ تُجْزَوْنَ عَذَابَ الْهُونِ
যদি আপনি দেখেন, যখন জালিমরা মৃত্যুমুখে থাকে এবং ফেরেশতারা স্বীয় হস্ত প্রসারিত করে বলে, বের কর স্বীয় আত্মা! আজ তোমাদেরকে অপমানজনক শাস্তি প্রদান করা হবে। [সূরা আনআম: ৯৩]

টিকাঃ
১. অর্থাৎ জাহেলী যামানায় আমি একবার এক কম্বলের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। কম্বলের লোকেরা আমাকে বলল, আমাদের ভাগ্য গণনা করে দাও। তাদের কথায় আমি মাটিতে কিছু দাগ কাটতে থাকলাম এবং আকাশের দিকে তাকাতে লাগলাম। অতঃপর বললাম, তোমাদের এমন হবে, তেমন হবে...। ইত্যাদি আমি মিথ্যা বলেছিলাম। কিন্তু তারা আমাকে বলতে পারছিল না যে, তুমি মিথ্যা বলছ! কারণ, বিষয়গুলো ছিল সবই অনুমানের ব্যাপার। তা ছাড়া আমার কথা সত্য-মিথ্যা নির্ণয় করার মতো মাপকাঠিও তাদের ছিল না।

জিরতের পর রাসূলুল্লাহ্ যখন মদিনাতে দীনি দাওয়াত ও একটি ইসলামী সমাজব্যবস্থা কায়েম করতে সক্ষম হন, তখন তিনি অন্যান্য দেশ ও অঞ্চলের দিকেও মনোনিবেশ করেন। একত্ববাদের দাওয়াত দিয়ে বিভিন্ন শহর ও ভূখন্ডে লোক পাঠাতে শুরু করেন। একেকজন সাহাবীকে একেক অঞ্চল ও শহরে প্রেরণ করেন। কাউকে মিসরে, কাউকে শামে। কাউকে ইয়ামানে, আবার কাউকে ইরাকে।
সাহাবীগণ সেখানে গিয়ে মানুষকে দীনের দাওয়াত দিতেন; দ্বীনি শিক্ষা দিতেন। মানুষকে একত্ববাদ ও এক আল্লাহ্ র-এর ইবাদতের দিকে আহ্বান করতেন।
তেমনি একজন সাহাবীকে প্রেরণ করেছেন ‘ওয়াদীয়ে নোমান’-এ। ‘ওয়াদীয়ে নোমান’ মক্কা ও তায়েফের মধ্যবর্তী একটি উপত্যকার নাম। নবীজী র এ সাহাবীকে প্রেরণের পূর্বে বলে দিলেন, তুমি সেখানে গিয়ে কিছু বেদুইন ও কাফেরকে পাবে, যারা লাত ও উজ্জার ইবাদত করে; বিভিন্ন মূর্তির পূজা করে। তুমি তাদেরকে একত্ববাদের দাওয়াত দিবে; এক আল্লাহ্ র-এর পথে আহ্বান জানাবে। সাহাবী রওয়ানা হয়ে গেলেন। ওয়াদীয়ে নোমান-এ পৌঁছে বেদুইনদের দেখতে পেলেন; ভেড়া-বকরি আর উট-দু’সাই ছিল যাদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য; চিন্তা ও চেতনার প্রাণকেন্দ্র। এ ছাড়া আর তেমন কিছুই জানত না তারা।
সাহাবী নবীজীর উপদেশ ও দিকনির্দেশনা মোতাবেক তাদেরকে দীনের পথে, ইসলামের পথে আহ্বান জানানো শুরু করলেন; একত্ববাদের দাওয়াত দিতে লাগলেন; পাথরের মূর্তি ও দেব-দেবীর পূজা ছেড়ে এক আল্লাহ্ র-এর ইবাদতে নিমগ্ন হতে বললেন।
কিন্তু দুঃখের বিষয়, তারা কেউই ঈমান গ্রহণ করল না। বরং সবাই অস্বীকার করল এবং বলল, একজন অজানা-অচেনা আগন্তুকের কথায় আমরা কীভাবে আমাদের সেসব পূর্বপুরুষের ইবাদত পরিত্যাগ করব, বহু বছর যাবত আমাদের বাপ-দাদা ও পূর্বপুরুষগণ যাদের ইবাদত করে আসছে? এটা কখনোই হতে পারে না; কিছুতেই হতে পারে না! এ বলে তারা সবাই দীনের দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করল এবং অস্বীকৃতি জানাল– শুধু একজন ছাড়া...
সেই একজন, তখনই নিজের উট সওয়ার হয়ে বসল এবং চলতে শুরু করল। উদ্দেশ্য মদিনা। এক সময় পৌঁছে গেল।
তায়েফ থেকে মদিনা- প্রায় পঁচিশ কিলোমিটারেরও বেশি পথ। মদিনায় পৌঁছে লোকটি বুঝতে পারছে না কোথায় যাবে, কোন দিকে যাবে। এক সময় মদিনার লোকদের জিজ্ঞেস করল- তোমাদের সেই লোকটি কোথায়, যিনি নিজেকে নবী বলে দাবি করেন?
লোকেরা জানাল, তিনি মসজিদে আছেন। তুমি সেখানে যাও।
লোকটি আবার চলতে শুরু করল। যেতে যেতে এক সময় মসজিদে গিয়ে উপস্থিত হল। দরজার কাছে নিজের উটটি বেঁধে মসজিদে প্রবেশ করল। প্রবেশ করার পর ডানে-বামে তাকাতে লাগল। বুঝাতে পারছে না কী বলবে, কী বলবে। ক্ষণকাল পর উচ্চ আওয়াজে জিজ্ঞাসা করল– তোমাদের সেই লোকটি কোথায়, যিনি নিজেকে নবী বলে দাবি করেন? কোথায় মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ্?
সাহাবায়ে কেরাম তাকে বললেন, তুমি কি হেলান দিয়ে বসে থাকা শখ-সুন্দর মানুষটিকে দেখতে পাচ্ছ?
আগতুক বলল, হাঁ, দেখতে পাচ্ছি।
সাধারণজন বললেন, তিনিই মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ ﷺ।
আগন্তুক আবার জিজ্ঞাসা করল, ইনিই কি নিজেকে নবী বলে মনে করেন?
সাধারণজন উত্তর দিলেন, হাঁ; ইনিই।
আগন্তুক কাভারের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। যেতে যেতে নবীজীর কাছাকছি চলে গেল।
এক সাহাবী বর্ণনা করেন, আমরা লোকটির আওয়াজ শুনছিলাম কিন্তু বুঝতে পারছিলাম না সে কী বলছে। আমরা তার দিকে ভালোভাবে তাকালাম। দেখলাম লোকটি একজন বেদুইন। তার মাথায় চুলের দু’টি ঝুঁটি রয়েছে। চুলগুলো লম্বা লম্বা। সে আরও এগিয়ে গেল এবং নবীজীর একেবারে কাছাকছি গিয়ে বসল। তারপর নবীজী ﷺ ও আশপাশে উপস্থিত সাহাবাদের কেরামের দিকে তাকাতে লাগল। অতঃপর জিজ্ঞাসা করল, তোমাদের মধ্যে মুহাম্মাদ কে?
নবীজী ﷺ বললেন, এই যে আমি মুহাম্মাদ। বেদুইন জিজ্ঞাসা করল, আপনিই কি সেই ব্যক্তি, যিনি নিজেকে নবী বলে বিশ্বাস করেন?
নবীজী বললেন, হ্যাঁ।
আগন্তুক বলল, আমি আপনাকে কিছু প্রশ্ন করব এবং বেশ কিছু বিষয়ে খুঁটিনাটি জিজ্ঞাসা করব। আপনি কিছু মনে করবেন না।
বেদুইন লোকটির কথার অর্থ হচ্ছে– আমি একজন বেদুইন। কথা বলার রীতি-নীতি আমার জানা নেই। কোনো বিষয় সাজিয়ে-গুছিয়ে সুন্দর করে উপস্থাপন করার যোগ্যতাও আমার নেই। আমি এসব শিখিনি। আমি আপনার সঙ্গে কথা বলব সেভাবেই, যেভাবে আমি কথা বলি আমার কওমের বেদুইনদের সাথে।
নবীজী কোমলভাবে বললেন, তুমি যা জানতে চাও জিজ্ঞাসা কর।
আগন্তুক এবার তার প্রশ্ন শুরু করল। প্রথমেই জিজ্ঞাসা করল, হে মুহাম্মাদ! কে আকাশকে ঊর্ধ্বে স্থাপন করেছেন?
নবীজী ﷺ বললেন, আল্লাহ।
বেদুইন জিজ্ঞাসা করল, কে জমিনকে বিসৃত করেছেন?
নবীজী ﷺ বললেন, আল্লাহ।
আগন্তুক আবারও জিজ্ঞাসা করল, কে পাহাড়সমূহ স্থাপন করেছেন?
নবীজী ﷺ বললেন, আল্লাহ।
বেদুইন লোকটি এবার বলল, আমি আপনাকে সেই সত্তার কসম দিয়ে বলছি, যিনি আকাশসমূহ ঊর্ধ্বে স্থাপন করেছেন, জমিনকে বিসৃত করেছেন এবং পাহাড়সমূহ স্থাপন করেছেন, আল্লাহই কি আপনাকে রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছেন?
নবীজী ﷺ বললেন, হ্যাঁ।
বেদুইন লোকটি বলল, আমি আপনাকে সেই সত্তার কসম দিয়ে জিজ্ঞাসা করছি যিনি আপনাকে রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছেন, আল্লাহই কি আপনাকে আদেশ দিয়েছেন আমাদেরকে মূর্তি পূজা ও সেসব শিরকের ইবাদত থেকে নিষেধ করতে, যাদের ইবাদত করত আমাদের বাপ-দাদা ও পূর্বপুরুষগণ? তিনিই কি আপনাকে এ আদেশ দিয়েছেন, যেন আমরা দেব-দেবী ও অন্যান্য মাবুদের পূজা-অর্চনা না করে একমাত্র আল্লাহরই ইবাদত করি?
নবীজী ﷺ বললেন, হ্যাঁ।
বেদুইন লোকটি বলল, আমি আপনাকে সেই সত্তার কসম দিয়ে বলছি, যিনি আপনাকে প্রেরণ করেছেন, আল্লাহই ﷺ-ই কি আপনাকে নির্দেশ দিয়েছেন, যেন আপনি আমাদেরকে প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায়ের আদেশ করেন?
নবীজী ﷺ বললেন, হ্যাঁ।
বেদুইন লোকটি বলল, আমি আপনাকে সেই সত্তার কসম দিয়ে বলছি, যিনি আপনাকে প্রেরণ করেছেন, আল্লাহই ﷺ-ই কি আপনাকে নির্দেশ দিয়েছেন, যেন আপনি আমাদেরকে রমযানের রোযা রাখতে ও আমাদের সম্পদে পবিত্র করতে [অর্থাৎ যাকাত আদায় করতে] আদেশ করেন?...
এভাবে আগন্তুক বেদুইন লোকটি নবীজী ﷺ-র সামনে ইসলামের মৌলিক বিষয়াবলি ও শরীয়তের গুরুত্বপূর্ণ বিধানাবলির উল্লেখ করছিল আর নবীজী ﷺ ‘হাঁ’ ‘হাঁ’ বলে উত্তর দিয়ে যাচ্ছিলেন।
এক সময় তার কথা শেষ হল। অতঃপর বলল, আমি যিমাম ইবনে সা‘লাবা। বনু সা’দ ইবনে বকর গোত্রের একজন। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই এবং আপনি আল্লাহর রাসূল। কসম সেই সত্তার, যিনি আপনাকে সত্য দিয়ে প্রেরণ করেছেন! আপনি আমাকে যা যা বললেন, আমি তাতে বৃথ্ব্য ও করব না, তা থেকে কমও করব না।
এ কথা শুনে নবীজী ﷺ তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, তুমি সফলকাম।
এরপর লোকটি উঠে দাঁড়াল। ঘুরে নিজের উটের দিকে রওয়ানা হল। নবীজী ﷺ তাঁর দিকে ইশারা করে বললেন– ‘দুই খুঁটিওয়ালা সফলকাম, যদি সে সত্য বলে থাকে।’ [সহীহ বুখারী, কিতাবুল ঈমান, হাদীস নং ৪৮, সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ঈমান, হাদীস নং ৯৯, ১০২, সুনানে আবূ দাউদ, হাদীস নং ৩১২, ৩৫২, সুনানে নাসায়ী, হাদীস নং ৪৫৭, ২০৪৮, ৫০৩৪]
বেদুইন লোকটি চলে গেলেন। তিনি নবীজী ﷺ-র দরবারে খুব বেশি সময় ছিলেন না। কেবল প্রশ্নোত্তর ও কথাবার্তার সময় ও সময়টুকুই নবীজী ﷺ-র দরবারে অবস্থান করেছিলেন। কিন্তু... প্রিয় পাঠক! লক্ষ করুন, নবীজীর মুখ থেকে শোনা এ কয়েকটি কথার প্রভাব ও ফলাফল কী হয়েছিল! তিনি দরবার থেকে উঠে উটের কাছে গেলেন। উটের রশি খুলে সওয়ার হয়ে সোজা চলে গেলেন ওয়া গিয়ে নোমান-এ- নিজ সম্প্রদায়ের। টানা দশ দিন সফর করে তিনি মদীনায় এসে পৌঁছেছিলেন। পুনরায় দশ দিন সফর করে নিজ উপত্যকায় গিয়ে পৌঁছেলেন।
আপন গৃহে প্রবেশ করার পর স্ত্রী তাঁকে দেখে খুশি হলেন। স্বাগত জানাতে এগিয়ে এলেন। কিন্তু তিনি স্ত্রীকে সম্বোধন করে বললেন, তুমি আমার কাছে এসো না। আমার থেকে দূরে থাক। ধ্বংস হোক লাত! ধ্বংস হোক উজ্জা!
স্বামীর কথায় স্ত্রী হোঁচট খেলেন, আতঙ্কিত হলেন। সবিনয়ে বললেন, যিমাম! লাত-উজ্জার ব্যাপারে তুমি এসব কী বলছ? তুমি কুইষ্ঠ রোগে আক্রান্ত? তুমি পাগল হয়ে যাচ্ছোকে ভয় কর!
উল্লেখ্য, তারা অজ্ঞতা ও মূর্খতাবশত এ বিশ্বাস পোষণ করত যে, যে কেউ লাত-উজ্জাকে গালি দিবে, সে এসবফল রোগে আক্রান্ত হবে।
যিমাম ﷺ বললেন, আল্লাহর কসম! লাত-উজ্জার কোনো কিছুই করার ক্ষমতা নেই। না তারা কারো কোনো ক্ষতি করতে পারে, না কারো কোনো উপকার সাধন করতে পারে। এ ক্ষমতা তাদের নেই।
কথাবার্তা ও আলোচনা চলছিল। এরই মাঝে যিমাম ﷺ তাঁর স্ত্রীকে বোঝাচ্ছিলেন। একত্ববাদ ও ইসলামের দাওয়াতও দিচ্ছিলেন। এক পর্যায়ে তার স্ত্রী ইসলাম গ্রহণ করে ফেললেন।
তারপর তিনি গেলেন পিতার কাছে। পিতা ও ছেলেকে দেখে আনন্দিত হলেন। এগিয়ে এলেন সন্তান জানতে। কিন্তু তিনি তেমনি বললেন– ধ্বংস হোক লাত! ধ্বংস হোক উজ্জা!
একথা শুনে পিতাও আঁতকে উঠলেন। বললেন, হে যিমাম! তুমি কুইষ্ঠ রোগে আক্রান্ত? তুমি পাগল হয়ে যাচ্ছোকে ভয় কর! লাত-উজ্জা তোমার প্রভু। তোমার বাপ-দাদা ও পূর্বপুরুষদের প্রভু।
যিমام ﷺ বললেন, হে আমার পিতা! লাত-উজ্জা কারও কোনো ক্ষতি কিংবা উপকার করার কোনো ক্ষমতা রাখে না। সে ক্ষমতা তাদের নেই। বরং তাদের নিজেদেরই ভালো-মন্দের ক্ষমতা তাদের নেই।
এভাবে তিনি তাঁর পিতাকে বোঝাতে লাগলেন। একত্ববাদ ও ঈমানের দাওয়াতও দিতে লাগলেন। এক সময় তার পিতাও ইসলাম কবুল করে নিলেন।
একইভাবে তিনি তার সম্প্রদায়ের প্রতিটি ঘরে গিয়ে পূজা সকলে দ্বীনের দাওয়াতও দিতে লাগলেন। সবাকে মূর্তিপূজার অসারতা ও অন্তঃসারশূন্যতা বোঝাতে লাগলেন। বাতিল মাবুদদের নিষ্ফল পূজা পরিহার করে এক আল্লাহ ﷺ-র ইবাদতে নিমগ্ন হতে বললেন।
অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, সেদিন সূর্যাস্তের সময় তার সম্প্রদায়ে একজন কাফেরও অবশিষ্ট ছিল না। সকলেই ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করে নিয়েছিল।
প্রিয় পাঠক! যামানায যামানায পাওয়া যাবে কি কোনো তাওবাকারীর মাঝে এমন উৎসাহ ও উদ্দীপনা! দ্বীনের প্রচার-প্রসার ও ঈমানদারদের কল্যাণে এমন জযবা ও উদ্যমশীলত!
বহু তাওবাকারী তাওবার পূর্বে অপরাধ জগতে ছিল সর্দার, কিন্তু তাওবার পরে হয়ে গেছে নিরীক্ষার। আগে ছিল ঘোড়সওয়ার এখন হয়ে গেছে পায়ে হাঁটা পথিকরা!
আশ্চর্য! জাহেলিয়াতে ছিল বীর এখন হয়ে গেছে ভীরু। ছিল তেজস্বী, হয়ে গেছে নিস্তেজ। ইসলাম ও মুসলমানদেনর কোনো উপকারই সে করতে পারে না।
– না দাওয়াতের ক্ষেত্রে।
– না ইসলাহ ও আত্মশুদ্ধিতে।
– না মূর্তকে শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে।
– না গায়েলফকে নসিহত করার ব্যাপারে।
প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ ﷺ-র আযমত ও বড়ত্বকে যে অন্তরে বসাতে পেরেছে, সে কড়াতাবে নিজের নফসের হিসাব নিতে পারে। নিজেকে কঠোরভাবে যাচাই করতে পারে।
উপমা : ১
খলীফাতুল রাসূল আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহু-র একটি গোলাম ছিল। গোলাম প্রতিদিন কাজের সন্ধানে বের হত। দিন শেষে গোলাম কিছু না কিছু মাল বা খাবার মনিবের জন্য নিয়ে আসত। সে কোনোদিন বাজারে গিয়ে কুলির কাজ করত; কোনোদিন মানুষের মজুর খাটত; কোনোদিন নির্মাণকাজ করত। এভাবে একেকদিন একেক কাজ বের হত। প্রতিদিনই সে দিন শেষে কিছু না কিছু মনিবের জন্য নিয়ে আসত।
গোলাম প্রতিদিন যা-ই নিয়ে আসত, আবূ বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু প্রথমেই তাকে জিজ্ঞাসা করতেন, আজ কী কাজ করেছ? গোলাম কোনোদিন উত্তর দিত– আজ কুলির কাজ করেছি; কোনোদিন উত্তর দিত– আজ নির্মাণ কাজ করেছি। ইত্যাদি... গোলামের জবাব শুনে আবূ বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু হাসতেন। অতঃপর সেই খাবার খেতেন বা মাল গ্রহণ করতেন।
কিন্তু একদিন গোলাম কোথাও থেকে তার জন্য কিছু খাবার নিয়ে এলে যাচাই করার ছাড়াই তিনি বিসমিল্লাহ বলে এক লোকমা মুখে তুলে নিলেন। কারণ, তিনি সেদিন খুবই ক্ষুধার্থ ছিলেন।
এ দেখে গোলাম বলল, আবূ বকর! আপনি তো প্রতিদিন খাবার নিয়ে এলে জিজ্ঞাসা করেন– এ খাবার আমি কোত্থেকে এনেছি। কিন্তু আজকে তো তেমন কিছুই জিজ্ঞাসা করলেন না?
আবূ বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ঠিকই তো! প্রচণ্ড ক্ষুধা আমাকে বে-খেয়াল করে দিয়েছে। তুমি এ খাবার কোত্থেকে এনেছ?
গোলাম বলল, জাহেলী যামানায় একবার আমি এক কম্বলের জন্য গণকের কাজ করেছিলাম। তবে আমি তা ভালো পারতাম না।¹ কিন্তু সেদিন তারা আমাকে কোনো পারিশ্রমিক দেয়নি। আজ আমি আবার তাদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। দেখলাম, তাদের ওখানে ওলীমার অনুষ্ঠান হচ্ছে। আমি তাদের কাছে গিয়ে বললাম– আমি তোমাদের কাছে আমার পারিশ্রমিক চাইতে এসেছি।
আমার দাবি শুনে তারা বলল, ঠিক আছে আমাদের খাবার থেকে তোমার পারিশ্রমিক নিয়ে যাও। আবূ বকর! আপনার সামনের এই খাবার তাদের দেওয়া সেই খাবার।
আবূ বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন– নাউযুবিল্লাহ! আমি আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করছি। তুমি আমাকে গণনার পারিশ্রমিকের খাবার খাওয়াচ্ছ?! তুমি আমাকে মন্ত্র-তন্ত্র ও ভোজবাজির খাবার খাওয়াচ্ছ?! আমি আল্লাহর আশ্রয় চাই। আমি আল্লাহর পানাহ চাই।
তারপর তিনি গলার ভিতর আঙ্গুল ঢুকিয়ে বমি করে পেটের ভিতর থেকে সেই খাবার বের করে দিতে চেষ্টা করতে লাগলেন।
লোকেরা বলল, খলীফাতুল মুসলিমীন! এক লোকমা খাবার আর তেমন কী? এর জন্য আপনি এত কষ্ট করছেন কেন?
তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! এই লোকমা পেট থেকে বের করার আগ পর্যন্ত আমি দাঁড়াব না, বসব না, ঘুমাব না।
লোকেরা বলল, এই এক লোকমা খাবার আপনি এত সহজে বের করতে পারবেন না। তবে যদি অধিক পরিমাণে পানি পান করেন, তা হলে হয়তো পারবেন।
আবূ বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, তোমরা আমার জন্য পানি নিয়ে এসো। লোকেরা তা-ই করল। তাঁর জন্য গরম পানি নিয়ে এল। অতঃপর তিনি তা পান করতে শুরু করলেন এবং বমি করতে চেষ্টা করতে লাগলেন। যতক্ষণ না বমি করে পেট থেকে সবকিছু বের করতে সক্ষম হলেন, ততক্ষণ পর্যন্ত এ প্রক্রিয়া চালিয়ে গেলেন।
তারপর লোকেরা জিজ্ঞাসা করল, খলীফাতুল মুসলিমীন! এই একটি লোকমার জন্য কেন আপনি এত কষ্ট করলেন?
তিনি বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, তিনি ইরশাদ করেছেন–
لَا تَمُتْ مِنْ سُخْتِ فَكَارٍ أَوْلَى
যে শরীর হারাম খাদ্য থেকে পুষ্ট, তার জন্য জাহান্নামই অধিকতর উপযুক্ত। [হিলয়াতুল আউলিয়া- ৫/৩৫]
শরীরের যে গোশত হারাম খাদ্য থেকে উৎপন্ন হবে, তা জান্নাতে যাওয়ার উপযুক্ত নয়। বরং তার জন্য জাহান্নামই অধিকতর উপযুক্ত। তাই আমি ভয় করছি, আমি যে লোকমাটি খেয়ে ফেলেছি, তা থেকে না আবার আমার শরীরে কোনো অংশ উৎপন্ন হয়ে যায়!
আশ্চর্য : আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহু! খলীফাতুল মুসলিমীন; নবীজীর পর উম্মতের সবচেয়ে বড় মুত্তাকী ও পরহেজগার ব্যক্তি, তিনিই যদি এক লোকমা খাবারের জন্য এত কষ্ট করেন, তা হলে সেসব লোকের ব্যাপারে মূল্যায়ন ও মন্তব্য কী হতে পারে, যারা নিয়মিত ইচ্ছাকৃতভাবে–
- হারাম ভক্ষণ করে!
- মদ পান করে!
- অন্যান্য নেশাদ্রব্য গ্রহণ করে?!
আরও লক্ষ করুন, খলীফাতুল মুসলিমীন উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু কতটা সূক্ষ্ম ও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে স্বীয় নফসের হিসাব নিতেন।
উপমা : ২
শাম অঞ্চলে নিযুক্ত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-র গভর্নর তাঁর কাছে মশক পাটিয়েছিলেন, যেন সেগুলো বিক্রি করে বিক্রয়লব্ধ অর্থ ‘বাইতুল মাল’-এ জমা করে দেওয়া হয়। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু সে তেল মেপে মেপে মানুষের পাতে দিতে শুরু করলেন। যখন এক মশক শেষ হয়ে যেত, তখন তিনি সেটিকে উল্টিয়ে সম্পূর্ণরূপে নিংড়ে সেটিকে রেখে দিতেন।
পাশেই ছিল তাঁর এক ছোট ছেলে। যখনই তিনি কোনো খালি মশক পাতে রাখতেন, তখন তাঁর ছোট ছেলে ওই মশকটি নিজের মাথার উপর উঠে ধরত। মশক থেকে এক/দুই ফোঁটা তেল তার মাথায় পড়ত। এভাবে সে চার/পাঁচ মশক থেকে নিংড়ে কয়েক ফোঁটা তেল মাথায় মাখল।
বিষয়টি ততক্ষণ উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-র নজরে পড়েনি। তিনি হঠাৎ ছেলের দিকে তাকিয়ে দেখেন তার মাথার চুল সুন্দর দেখাচ্ছে! তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি মাথায় তেল মেখেছ?
ছেলে জবাব দিল, হ্যাঁ।
উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞাসা করলেন, কোত্থেকে?
ছেলে জবাব দিল, এই মশকগুলো থেকে এক/দুই ফোঁটা করে নিংড়ে নিংড়ে।
জবাব শুনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, তোমার চুল মুসলিম জনগণের তেল দ্বারা সজ্জিত হয়েছে, পুষ্ট হয়েছে, কোনো বিনিময় ছাড়াই। আল্লাহর কসম! নিসন্দেহে এ ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। এ বলে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু ছেলেকে ধরে নাপিতের কাছে নিয়ে গেলেন এবং মাথার সমস্ত চুল কামিয়ে দিলেন, মুসলিম জনসাধারণের এক/দুই ফোঁটা তেলের অবস্থা।
এই হল আল্লাহওয়ালা ও মুত্তাকীদের অবস্থা। পক্ষান্তরে যাদের অন্তরে আল্লাহর ভয় নেই, কেবল প্রবৃত্তিপূজা ই যাদের একমাত্র লক্ষ্য ও কর্ম, দুনিয়া-আখেরাতে তারা ক্ষতিগ্রস্ত। দুনিয়ার জীবন হয়তো কোনোভাবে কেটে যাবে, কিন্তু মৃত্যুর সময় যারপরনাই লজ্জিত ও অনুতপ্ত হতে হবে, কিন্তু গুনাহ্কারী সেই লজ্জা ও অনুতাপ কোনোই কাজে আসবে না। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন–
وَلَوْ تَرَى إِذِ الظَّالِمُونَ فِي غَمَرَاتِ الْمَوْتِ وَالْمَلَائِكَةُ بَاسِطُوا أَيْدِيهِمْ أَخْرِجُوا أَنْفُسَكُمُ الْيَوْمَ تُجْزَوْنَ عَذَابَ الْهُونِ
যদি আপনি দেখেন, যখন জালিমরা মৃত্যুমুখে থাকে এবং ফেরেশতারা স্বীয় হস্ত প্রসারিত করে বলে, বের কর স্বীয় আত্মা! আজ তোমাদেরকে অপমানজনক শাস্তি প্রদান করা হবে। [সূরা আনআম: ৯৩]

টিকাঃ
১. অর্থাৎ জাহেলী যামানায় আমি একবার এক কম্বলের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। কম্বলের লোকেরা আমাকে বলল, আমাদের ভাগ্য গণনা করে দাও। তাদের কথায় আমি মাটিতে কিছু দাগ কাটতে থাকলাম এবং আকাশের দিকে তাকাতে লাগলাম। অতঃপর বললাম, তোমাদের এমন হবে, তেমন হবে...। ইত্যাদি আমি মিথ্যা বলেছিলাম। কিন্তু তারা আমাকে বলতে পারছিল না যে, তুমি মিথ্যা বলছ! কারণ, বিষয়গুলো ছিল সবই অনুমানের ব্যাপার। তা ছাড়া আমার কথা সত্য-মিথ্যা নির্ণয় করার মতো মাপকাঠিও তাদের ছিল না।

📘 তাওবাতান নাসূহা খাঁটি তাওবা > 📄 সময় থাকতে তাওবা করে নিন

📄 সময় থাকতে তাওবা করে নিন


এক ডাক্তার আমাকে ঘটনা শুনিয়েছেন। তিনি বলেন, একবার হাসপাতালের আই.সি.ইউ-র রুমে প্রবেশ করেই আমার মনোযোগ আকৃষ্ট হয় পঁচিশ বছরের এক যুবকের দিকে। যুবক মরণব্যাধি এইডস-এ আক্রান্ত। তার অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়।
আমি কাছে গিয়ে তার সঙ্গে কথা বললাম। সে অস্পষ্ট আওয়াজে কিছু বলল কিন্তু কিছুই বোঝা গেল না। আমি ফোনে তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। কিছুক্ষণ পর তার মা হাসপাতালে আসেন।
তার মা এলে আমি তাঁর সম্পর্কে জানতে চাইলাম।
মা জবাবে বললেন, ‘ওই মেয়েটির সঙ্গে তার পরিচয় হওয়ার আগ পর্যন্ত সে ভালোই ছিল।’
আমি সেদিকে না গিয়ে মাকে জিজ্ঞাসা করলাম, সে কি সালাত পড়ত?
মা বললেন, না; তবে সে ইচ্ছা করেছিল জীবনের শেষ দিকে যাবতীয় গুনাহ থেকে তাওবা করে নেবে এবং হজ্ব করবে।
যা হোক, আমি আবার যুবকের কাছে গেলাম। স্বাভাবিক ভঙ্গিতে দেখলাম, সে তার জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো পার করছে। তার মৃত্যুযন্ত্রণা প্রায় শুরু হয়ে গেছে। আমি তার আরও কাছে গেলাম। কানের কাছে মুখ নিয়ে কোমল সুরে বললাম, বলো- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।
আমার কণ্ঠ শুনে সে কিছুটা চেতনা ফিরে পেলো। যন্ত্রণাময় দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাতে লাগল। সে তার সমস্ত শক্তি দিয়ে কিছু বলতে চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না। চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। ধীরে ধীরে তার চেহারা কালো হয়ে যেতে লাগল। আমি বারবারই বলে যাচ্ছিলাম, বলো- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।
এবার সে অস্ফুট কণ্ঠে ভাঙা ভাঙা শব্দে বলতে লাগলো, আহ ব্যথা! ব্যথা! প্রচণ্ড ব্যথা! ব্যথা কমার ওষুধ দিন! আহ! আহ!
যুবকের অবস্থা দেখে আমার কান্না এসে গেলো। আমি অশ্রু সংবরণ করার চেষ্টা করছি আর বলে যাচ্ছি, বলো- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।
সে অনেক কষ্টে আবার তার ঠোঁট দু’টো নাড়াতে শুরু করল। আমি খুশি হলাম। ভাবলাম, এখনই হয়তো সে কালিমা পাঠ করবে। কিন্তু না; সে বলতে লাগলো- না; আমি পারছি না; আমি বলতে পারছি না; আমি আমার রাব্বীকে চাই; আমি বলতে পারছি না।
যুবকের মা অসহায়ভাবে তার দিকে তাকিয়ে আছেন। তিনি কাঁদছেন। চোখ থেকে অশ্রু ঝরছে, অবিরত ধারায়।
এদিকে যুবকের হৃদস্পন্দন কমতে শুরু করেছে। ধীরে ধীরে সে মৃত্যুর কাছাকাছি চলে যাচ্ছে। এ সময় আমি আর আমাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলাম না। আমি শব্দ করে কেঁদে ফেললাম।
আবারও আমি তার হাত ধরে চেষ্টা করতে লাগলাম। বলতে লাগলাম, বলো- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ! বলো! কিন্তু সে আগের মতোই বলতে লাগল- আমি পারছি না; আমি বলতে পারছি না। এর পর পরই সে ছটফটি দিতে শুরু করল। কিছুক্ষণপর মধ্যেই তার হৃদস্পন্দন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেলো এবং তার চেহারা কালো হয়ে গেলো। যুবক মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল।
যুবকের মা কান্নায় ভেঙে পড়লেন। তার বুকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। অঝোরে কাঁদতে লাগলেন। কিন্তু-
মায়ের এ কান্না তার কী উপকার করবে?
এ বিলাপ ও আহাজারি তার কী-ই বা কল্যাণ সাধন করবে?
হ্যাঁ, প্রিয় পাঠক!
যুবক তার রবের কাছে চলে গেছে।
তার শাহওয়াত ও প্রবৃত্তি তার কোনো উপকারে আসেনি।
দুনিয়ার স্বাদ-আহ্লাদ, সুখ-উপভোগ তার কোনো কাজে আসেনি।
কারণ-
সে তার যৌবনের ধোঁকায় পড়ে ছিল।
গাড়ি-বাড়ি ও পোশাক-পরিচ্ছদের সৌন্দর্যে প্রতারিত হয়েছিল।
সে তার রবকে ভুলে গিয়েছিল।
আখেরাত ও হিসাব-নিকাশের কথা বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিল।
আজ কবরে তাকে তার আমলের হিসাব দিতে হবে। তার যাবতীয় কৃতকর্ম তাকে ঘিরে রাখবে।
অতঃপর, তারা যা উপার্জন করত, وَفَقَا عَلَىٰ عَلِمَ مَا كَانُوا يَكْسِبُونَ তা তাদের কাজে এল না। [সুরা হিজর : ৮৪]

এক ডাক্তার আমাকে ঘটনা শুনিয়েছেন। তিনি বলেন, একবার হাসপাতালের আই.সি.ইউ-র রুমে প্রবেশ করেই আমার মনোযোগ আকৃষ্ট হয় পঁচিশ বছরের এক যুবকের দিকে। যুবক মরণব্যাধি এইডস-এ আক্রান্ত। তার অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়।
আমি কাছে গিয়ে তার সঙ্গে কথা বললাম। সে অস্পষ্ট আওয়াজে কিছু বলল কিন্তু কিছুই বোঝা গেল না। আমি ফোনে তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। কিছুক্ষণ পর তার মা হাসপাতালে আসেন।
তার মা এলে আমি তাঁর সম্পর্কে জানতে চাইলাম।
মা জবাবে বললেন, ‘ওই মেয়েটির সঙ্গে তার পরিচয় হওয়ার আগ পর্যন্ত সে ভালোই ছিল।’
আমি সেদিকে না গিয়ে মাকে জিজ্ঞাসা করলাম, সে কি সালাত পড়ত?
মা বললেন, না; তবে সে ইচ্ছা করেছিল জীবনের শেষ দিকে যাবতীয় গুনাহ থেকে তাওবা করে নেবে এবং হজ্ব করবে।
যা হোক, আমি আবার যুবকের কাছে গেলাম। স্বাভাবিক ভঙ্গিতে দেখলাম, সে তার জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো পার করছে। তার মৃত্যুযন্ত্রণা প্রায় শুরু হয়ে গেছে। আমি তার আরও কাছে গেলাম। কানের কাছে মুখ নিয়ে কোমল সুরে বললাম, বলো- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।
আমার কণ্ঠ শুনে সে কিছুটা চেতনা ফিরে পেলো। যন্ত্রণাময় দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাতে লাগল। সে তার সমস্ত শক্তি দিয়ে কিছু বলতে চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না। চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। ধীরে ধীরে তার চেহারা কালো হয়ে যেতে লাগল। আমি বারবারই বলে যাচ্ছিলাম, বলো- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।
এবার সে অস্ফুট কণ্ঠে ভাঙা ভাঙা শব্দে বলতে লাগলো, আহ ব্যথা! ব্যথা! প্রচণ্ড ব্যথা! ব্যথা কমার ওষুধ দিন! আহ! আহ!
যুবকের অবস্থা দেখে আমার কান্না এসে গেলো। আমি অশ্রু সংবরণ করার চেষ্টা করছি আর বলে যাচ্ছি, বলো- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।
সে অনেক কষ্টে আবার তার ঠোঁট দু’টো নাড়াতে শুরু করল। আমি খুশি হলাম। ভাবলাম, এখনই হয়তো সে কালিমা পাঠ করবে। কিন্তু না; সে বলতে লাগলো- না; আমি পারছি না; আমি বলতে পারছি না; আমি আমার রাব্বীকে চাই; আমি বলতে পারছি না।
যুবকের মা অসহায়ভাবে তার দিকে তাকিয়ে আছেন। তিনি কাঁদছেন। চোখ থেকে অশ্রু ঝরছে, অবিরত ধারায়।
এদিকে যুবকের হৃদস্পন্দন কমতে শুরু করেছে। ধীরে ধীরে সে মৃত্যুর কাছাকাছি চলে যাচ্ছে। এ সময় আমি আর আমাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলাম না। আমি শব্দ করে কেঁদে ফেললাম।
আবারও আমি তার হাত ধরে চেষ্টা করতে লাগলাম। বলতে লাগলাম, বলো- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ! বলো! কিন্তু সে আগের মতোই বলতে লাগল- আমি পারছি না; আমি বলতে পারছি না। এর পর পরই সে ছটফটি দিতে শুরু করল। কিছুক্ষণপর মধ্যেই তার হৃদস্পন্দন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেলো এবং তার চেহারা কালো হয়ে গেলো। যুবক মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল।
যুবকের মা কান্নায় ভেঙে পড়লেন। তার বুকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। অঝোরে কাঁদতে লাগলেন। কিন্তু-
মায়ের এ কান্না তার কী উপকার করবে?
এ বিলাপ ও আহাজারি তার কী-ই বা কল্যাণ সাধন করবে?
হ্যাঁ, প্রিয় পাঠক!
যুবক তার রবের কাছে চলে গেছে।
তার শাহওয়াত ও প্রবৃত্তি তার কোনো উপকারে আসেনি।
দুনিয়ার স্বাদ-আহ্লাদ, সুখ-উপভোগ তার কোনো কাজে আসেনি।
কারণ-
সে তার যৌবনের ধোঁকায় পড়ে ছিল।
গাড়ি-বাড়ি ও পোশাক-পরিচ্ছদের সৌন্দর্যে প্রতারিত হয়েছিল।
সে তার রবকে ভুলে গিয়েছিল।
আখেরাত ও হিসাব-নিকাশের কথা বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিল।
আজ কবরে তাকে তার আমলের হিসাব দিতে হবে। তার যাবতীয় কৃতকর্ম তাকে ঘিরে রাখবে।
অতঃপর, তারা যা উপার্জন করত, وَفَقَا عَلَىٰ عَلِمَ مَا كَانُوا يَكْسِبُونَ তা তাদের কাজে এল না। [সুরা হিজর : ৮৪]

📘 তাওবাতান নাসূহা খাঁটি তাওবা > 📄 অন্যরকম একটি মৃত্যু

📄 অন্যরকম একটি মৃত্যু


প্রিয় পাঠক!
এই যুবকের অবস্থা সেই যুবকের সাথে তুলনা করে দেখুন, যার বয়স হয়েছিল ষোল বছর। সে মসজিদে বসে কুরআন তেলাওয়াত করছিল আর ফজর সালাতের ইকামতের অপেক্ষা করছিল।
সময়মতো ফজরের ইকামত হল। যুবক উঠে হাতের কুরআন শরীফটি যথাস্থানে রাখল। জামাতে শরিক হওয়ার জন্য অগ্রসর হল। ঠিক তখন সে মাথা ঘুরিয়ে জমিনে পড়ে গেলো এবং তৎক্ষণাৎ বেহুঁশ হয়ে গেলো। মসজিদের কয়েকজন মুসল্লী তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেল।
তাকে চিকিৎসাপ্রদানকারী ডাক্তার পরবর্তীতে বলেছেন, এ যুবককে আমাদের কাছে আনা হয়েছিল জানাজার মতো বহন করে। আমি তার মূত্রগ্রন্থি পরীক্ষা করে দেখলাম সে হার্টঅ্যাটাক করেছে। আরও গভীরভাবে লক্ষ করে দেখলাম, সে তার জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো অতিক্রম করছে। আমরা দ্রুত তার চিকিৎসায় রত হলাম। আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলাম তার হার্টের উন্নতির জন্য।
পাশের রুম থেকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আনার জন্য আমি আমার এক সহকর্মীকে তার পাশে রেখে গেলাম। আমি দ্রুতই ফিরে এলাম। ফিরে এসে দরজায় দাঁড়িয়ে দেখি যুবক আমার সহকর্মী ডাক্তারের হাত ধরে রেখেছেন। ডাক্তার তার কান যুবকের মুখের কাছে নিয়ে রেখেছেন। যুবক কানে কানে তাকে কিছু বলছে। এ অবস্থা দেখে আমি ভিতরে প্রবেশ করলাম না। দরজায় দাঁড়িয়ে তাদের দেখতে লাগলাম।
হঠাৎ যুবক ডাক্তারের হাত ছেড়ে দিল। এখন সে সর্বশক্তি দিয়ে ডান কানে ঘোরানোর চেষ্টা করছে। অতঃপর ভারী কণ্ঠে উচ্চারণ করল- 'আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু'। এ কালিমাটি সে বারবার পড়ছিল। ধীরে ধীরে তার হৃদস্পন্দন কমে যেতে লাগল। আমরা সর্বশক্তি দিয়ে তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু আল্লাহ ﷺ-র ফায়সালা আমাদের চেষ্টার উপর কার্যকর হল। যুবক তার রবের কাছে চলে গেল।
সঙ্গে সঙ্গে আমার সহকর্মী ডাক্তারটি কান্নায় ভেঙে পড়লেন। তিনি এত বেশি কাঁদতে লাগলেন যে, পায়ের উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না। বসে পড়লেন।
এ ঘটনা দেখে আমরা আশ্চর্যান্বিত হলাম এবং তাকে বললাম, হে অমুক! আপনার কী হয়েছে? আপনি কাঁদছেন কেন? মৃত্যুর ঘটনা তো আপনি জীবনে এই প্রথম দেখেন না! কত মানুষের মৃত্যুই তো হল আপনার চোখের সামনে।
তিনি আমাদের কথা কানে নিলেন কি না জানি না। তিনি তেমনই কেঁদে যেতে লাগলেন।
অনেকক্ষণ পর...
তার কান্নার বেগ কিছুটা কমে এলে আমরা তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনার কী হয়েছে? যুবক আপনাকে কী বলেছিল?
তিনি বললেন, ডাক্তার! যুবক যখন দেখল আপনি ব্যাস্তসমস্ত হয়ে একবার রুম থেকে বের হচ্ছেন আবার প্রবেশ করছেন, চিকিৎসার বিভিন্ন সরঞ্জাম জোগাড় করছেন, তখন সে বুঝতে পারল, আপনিই তার জন্য নিয়োজিত ডাক্তার। তাই সে আমাকে বলল- ডাক্তার! আপনি আপনার সহকর্মীকে বলুন, তিনি যেন আমার জন্য শুধু শুধু কষ্ট না করেন। আমি কিছুক্ষণের মধ্যেই মারা যাব। আল্লাহর কসম! আমি জান্নাতে আমার স্থান দেখতে পাচ্ছি।
- আল্লাহু আকবার!
إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا تَتَنَزَّلُ عَلَيْهِمُ الْمَلَائِكَةُ أَلَّا تَخَافُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَبْشِرُوا بِالْجَنَّةِ الَّتِي كُنتُمْ تُوعَدُونَ. نَحْنُ أَوْلِيَاؤُكُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ ۖ وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَشْتَهِي أَنفُسُكُمْ وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَدَّعُونَ ۚ نُزُلًا مِّنْ غَفُورٍ رَّحِيمٍ
নিশ্চয় যারা বলে, আমাদের পালনকর্তা আল্লাহ, অতঃপর তাতেই অবিচল থাকে, তাদের কাছে ফেরেশতা অবতীর্ণ হয় এবং বলে, তোমরা ভয় করো না, চিন্তা করো না এবং তোমাদের প্রতিশ্রুত জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ করো। ইহকালে ও পরকালে আমরা তোমাদের বন্ধু। সেখানে তোমাদের জন্য আছে যা তোমাদের মন চায় এবং সেখানে তোমাদের জন্য আছে যা তোমরা দাবি কর। এটা ক্ষমাশীল করুনাময়ের পক্ষ থেকে সাদর আপ্যায়ন। [সুরা হা-মীম সেজদাহ : ৩০-৩২]
আল্লাহ ﷺ-র দরবারে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের সকলকে পুণ্যময় মৃত্যু দান করেন।
হ্যাঁ, প্রিয় পাঠক! এই হচ্ছে অনুতপ্ত ও অবাধ্য বান্দার পার্থক্য। প্রকৃত পার্থক্য তো ফুটে উঠবে সেদিন-
يَوْمَ يَفِرُّ الْمَرْءُ مِنْ أَخِيهِ ❁ وَأُمِّهِ وَأَبِيهِ ❁ وَصَاحِبَتِهِ وَبَنِيهِ ❁ لِكُلِّ امْرِئٍ مِّنْهُمْ يَوْمَئِذٍ شَأْنٌ يُغْنِيهِ ❁ وُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ مُّسْفِرَةٌ ❁ ضَاحِكَةٌ مُّسْتَبْشِرَةٌ ❁ وَوُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ عَلَيْهَا غَبَرَةٌ ❁ تَرْهَقُهَا قَتَرَةٌ ❁ أُولَئِكَ هُمُ الْكَفَرَةُ الْفَجَرَةُ
যেদিন পলায়ন করবে মানুষ তার ভাইয়ের কাছ থেকে, তার মা, তার পিতা, তার পত্নী ও তার সন্তানদের কাছ থেকে। সেদিন তাদের প্রত্যেকেরই এমন গুরুতর অবস্থা হবে, যা তাকে ব্যস্তভর করে রাখবে। অনেক মুখমন্ডল সেদিন হবে উজ্জ্বল, সহাস্য ও প্রফুল্ল; এবং অনেক মুখমন্ডল সেদিন হবে ধূলি ধূসরিত। সেগুলোকে কালিমা আচ্ছন্ন করে রাখবে। তারাই কাফের পাপিষ্ঠের দল। [সুরা আবাসা : ৩৫-৪২]
তবে যারা ধৈর্য ধারণ করেছে এবং নিজেকে শাহওয়াত ও প্রবৃত্তিপূজা থেকে বিরত রেখেছে, আল্লাহ ﷺ ও তাঁর রাসূল ﷺ কর্তৃক হারামমুক্ত যাবতীয় বিষয়াদি থেকে নিজেদের দূরে রেখেছে, তাদের জন্য তাদের প্রতিপালক অঙ্গীকার করেছেন এমন জান্নাতের, যার তলদেশ থেকে প্রবাহিত নহরসমূহ।
সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে, নবীজী ﷺ ইরশাদ করেছেন, 'দুনিয়ার সর্বাধিক সচ্ছল ও ধন-সম্পদের অধিকারী এক জাহান্নামীকে কেয়ামতের দিন উপস্থিত করা হবে। এরপর তাকে জাহান্নামের আগুনে একবার অবগাহন করিয়ে বলা হবে, হে আদম সন্তান! দুনিয়াতে তুমি কখনও আরাম-আয়েশ ভোগ করেছ কি? কখনও তুমি স্বচ্ছল অবস্থায় দিন অতিবাহিত করেছ কি?
সে বলবে, আল্লাহর কসম! হে আমার রব! না; কক্ষনো না।'
হ্যাঁ, যে ব্যক্তি দুনিয়ায় যাবতীয় আরাম-আয়েশে ডুবে ছিল, সব ধরনের নেয়ামত ভোগ করেছিল, জাহান্নামের আগুনে একটি মাত্র ডুব তাকে সে সবকিছু ভুলিয়ে দিবে। তা হলে তখন তার অবস্থা কী হবে, যখন তাকে-
- সেখানে অনন্তকাল থাকতে হবে!
- প্রতিনিয়ত শাস্তি ও আযাব অসহ্য যন্ত্রণা দিতে থাকবে!
- যাখুম খেতে হবে!
- ফুটন্ত পানি ও রক্ত-পূঁজ পান করতে হবে!
- কী অবস্থা হবে তখন তার, যখন তার সাহায্যপ্রার্থনার জবাবে বলা হবে-
﴿اِخْسَئُوْا فِيْهَا وَلَا تُكَلِّمُوْنِ﴾
তোমরা হীন অবস্থায় এখানেই পড়ে থাক এবং আমার সাথে কোনো কথা বলো না। [সূরা মুমিনুন : ১০৮]
আল্লাহর কসম! তার কি তখন মনে হবে-
- সেই অশ্লীলতার কথা, যাতে সে লিপ্ত হয়েছিল?
- সেই গানবাজনার কথা, যা সে শুনেছিল?
- সেই মদ ও নেশার কথা, যা সে পান করেছিল?
- সেই ধন-দৌলত ও সম্পদের কথা, যা সে উপার্জন করেছিল?
তখন তাকে বলা হবে-
﴿اِخْسَئُوْا فِيْهَا وَلَا تُكَلِّمُوْنِ﴾
এতে [জাহান্নামে] প্রবেশ কর। অতঃপর তোমরা চেঁচামেচি কর অথবা না কর, উভয়ই তোমাদের জন্য সমান। [সূরা তুর : ১৬]
অতঃপর নবীজী ﷺ বলেছেন- 'এরপর দুনিয়ার সর্বাধিক দুঃখকষ্টসম্পন্ন এক জান্নাতীকে উপস্থিত করা হবে। তারপর তাকে একবার জান্নাতে অবগাহন করিয়ে জিজ্ঞাসা করা হবে, হে আদম সন্তান! দুনিয়াতে তুমি কখনও কোনো কষ্ট দিনাতিপাত করেছ কি? কোনো হৃদয়বিদারক ও ভয়াবহ অবস্থার সম্মুখীন হয়েছ কি?
সে বলবে, আল্লাহর কসম! হে আমার রব! আমি কখনোই কোনো কষ্ট দিনাতিপাত করিনি। দুঃখ কী জিনিস, আমি কখনও তা দেখিনি।'
হ্যাঁ, জান্নাতে ক্ষণিকের অবস্থান তাকে তার দুনিয়াবী জীবনের যাবতীয় দুঃখ-বেদনা ও কষ্ট-ক্লেশ ভুলিয়ে দিবে। তা হলে তখন তার অবস্থা কেমন হবে, যখন সে-
- জান্নাতের নহর থেকে দুধ পান করবে!
- সুরম্য বালুশয্যায় অবস্থান থাকবে!
- জান্নাতের আলিফাগান বালাখানায় বসবাস করবে!
- নবী-রাসূলগণের মজলিসে আসা-যাওয়া করবে!
বরং তখন তার অবস্থা কেমন হবে, যখন তার রব তাদের দিকে রহমতের দৃষ্টিতে তাকাবেন এবং বলবেন- 'হে জান্নাতবাসীগণ! তোমরা কি সন্তুষ্ট হয়েছ? অতঃপর তারাও তাদের মহামহিয়ান রবের চেহারার দিকে তাকাবে?
আল্লাহর কসম! তখন কি তার মনে হবে-
- সেই দুঃখ-কষ্টের কথা, যা সে দুনিয়াতে ভোগ করেছিল!
- সেই সচ্ছলতার কথা, যা তাকে ভোগ-উপভোগ ও বিলাসিতা থেকে বিরত রেখেছিল!
না; কক্ষনোই না! বরং সে থাকবে চিরস্থায়ী আরাম-আয়েশে। যেখানে যৌবন কখনও ফুরাবে না; কোনো জিনিসের স্বাদ ও আনন্দে কখনও কোনো ঘাটতি আসবে না। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন-
﴿وَلَدَيْنَا مَزِيْدٌ﴾
তারা তথায় যা চাইবে, তা-ই পাবে এবং আমার কাছে রয়েছে আরও অধিক। [সূরা ক্ব-ফ : ৩৫]
হ্যাঁ, আল্লাহর কাছে রয়েছে আরও অধিক, আরও বেশি। এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, নবীজী ﷺ ইরশাদ করেছেন-
﴿إِنَّ أَدْنَى أَهْلِ الْجَنَّةِ مَنْزِلَةً لَمَنْ يَنْظُرُ إِلَى جَنَانِهِ وَأَزْوَاجِهِ وَنَعِيمِهِ وَخَدَمِهِ وَسُرُورِهِ مَسِيرَةُ أَلْفِ سَنَةٍ﴾
একজন সাধারণ মর্যাদাসম্পন্ন জান্নাতীর বাগান, স্ত্রী, আমোদ-প্রমোদের সামগ্রী, খাদেম এবং খাট-পালঙ্ক ও আসনসমূহ কেউ দেখতে চাইলে তা তার জন্য হাজার বছরের পথ। [সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৮৫০]
আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের সকলকে খাঁটি দিলে খাঁটি তাওবা করার এবং সব বিষয়ে সর্বদা তাঁর অভিমুখী হওয়ার তাওফীক দান করেন। আমীন।

প্রিয় পাঠক!
এই যুবকের অবস্থা সেই যুবকের সাথে তুলনা করে দেখুন, যার বয়স হয়েছিল ষোল বছর। সে মসজিদে বসে কুরআন তেলাওয়াত করছিল আর ফজর সালাতের ইকামতের অপেক্ষা করছিল।
সময়মতো ফজরের ইকামত হল। যুবক উঠে হাতের কুরআন শরীফটি যথাস্থানে রাখল। জামাতে শরিক হওয়ার জন্য অগ্রসর হল। ঠিক তখন সে মাথা ঘুরিয়ে জমিনে পড়ে গেলো এবং তৎক্ষণাৎ বেহুঁশ হয়ে গেলো। মসজিদের কয়েকজন মুসল্লী তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেল।
তাকে চিকিৎসাপ্রদানকারী ডাক্তার পরবর্তীতে বলেছেন, এ যুবককে আমাদের কাছে আনা হয়েছিল জানাজার মতো বহন করে। আমি তার মূত্রগ্রন্থি পরীক্ষা করে দেখলাম সে হার্টঅ্যাটাক করেছে। আরও গভীরভাবে লক্ষ করে দেখলাম, সে তার জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো অতিক্রম করছে। আমরা দ্রুত তার চিকিৎসায় রত হলাম। আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলাম তার হার্টের উন্নতির জন্য।
পাশের রুম থেকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আনার জন্য আমি আমার এক সহকর্মীকে তার পাশে রেখে গেলাম। আমি দ্রুতই ফিরে এলাম। ফিরে এসে দরজায় দাঁড়িয়ে দেখি যুবক আমার সহকর্মী ডাক্তারের হাত ধরে রেখেছেন। ডাক্তার তার কান যুবকের মুখের কাছে নিয়ে রেখেছেন। যুবক কানে কানে তাকে কিছু বলছে। এ অবস্থা দেখে আমি ভিতরে প্রবেশ করলাম না। দরজায় দাঁড়িয়ে তাদের দেখতে লাগলাম।
হঠাৎ যুবক ডাক্তারের হাত ছেড়ে দিল। এখন সে সর্বশক্তি দিয়ে ডান কানে ঘোরানোর চেষ্টা করছে। অতঃপর ভারী কণ্ঠে উচ্চারণ করল- 'আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু'। এ কালিমাটি সে বারবার পড়ছিল। ধীরে ধীরে তার হৃদস্পন্দন কমে যেতে লাগল। আমরা সর্বশক্তি দিয়ে তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু আল্লাহ ﷺ-র ফায়সালা আমাদের চেষ্টার উপর কার্যকর হল। যুবক তার রবের কাছে চলে গেল।
সঙ্গে সঙ্গে আমার সহকর্মী ডাক্তারটি কান্নায় ভেঙে পড়লেন। তিনি এত বেশি কাঁদতে লাগলেন যে, পায়ের উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না। বসে পড়লেন।
এ ঘটনা দেখে আমরা আশ্চর্যান্বিত হলাম এবং তাকে বললাম, হে অমুক! আপনার কী হয়েছে? আপনি কাঁদছেন কেন? মৃত্যুর ঘটনা তো আপনি জীবনে এই প্রথম দেখেন না! কত মানুষের মৃত্যুই তো হল আপনার চোখের সামনে।
তিনি আমাদের কথা কানে নিলেন কি না জানি না। তিনি তেমনই কেঁদে যেতে লাগলেন।
অনেকক্ষণ পর...
তার কান্নার বেগ কিছুটা কমে এলে আমরা তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনার কী হয়েছে? যুবক আপনাকে কী বলেছিল?
তিনি বললেন, ডাক্তার! যুবক যখন দেখল আপনি ব্যাস্তসমস্ত হয়ে একবার রুম থেকে বের হচ্ছেন আবার প্রবেশ করছেন, চিকিৎসার বিভিন্ন সরঞ্জাম জোগাড় করছেন, তখন সে বুঝতে পারল, আপনিই তার জন্য নিয়োজিত ডাক্তার। তাই সে আমাকে বলল- ডাক্তার! আপনি আপনার সহকর্মীকে বলুন, তিনি যেন আমার জন্য শুধু শুধু কষ্ট না করেন। আমি কিছুক্ষণের মধ্যেই মারা যাব। আল্লাহর কসম! আমি জান্নাতে আমার স্থান দেখতে পাচ্ছি।
- আল্লাহু আকবার!
إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا تَتَنَزَّلُ عَلَيْهِمُ الْمَلَائِكَةُ أَلَّا تَخَافُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَبْشِرُوا بِالْجَنَّةِ الَّتِي كُنتُمْ تُوعَدُونَ. نَحْنُ أَوْلِيَاؤُكُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ ۖ وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَشْتَهِي أَنفُسُكُمْ وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَدَّعُونَ ۚ نُزُلًا مِّنْ غَفُورٍ رَّحِيمٍ
নিশ্চয় যারা বলে, আমাদের পালনকর্তা আল্লাহ, অতঃপর তাতেই অবিচল থাকে, তাদের কাছে ফেরেশতা অবতীর্ণ হয় এবং বলে, তোমরা ভয় করো না, চিন্তা করো না এবং তোমাদের প্রতিশ্রুত জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ করো। ইহকালে ও পরকালে আমরা তোমাদের বন্ধু। সেখানে তোমাদের জন্য আছে যা তোমাদের মন চায় এবং সেখানে তোমাদের জন্য আছে যা তোমরা দাবি কর। এটা ক্ষমাশীল করুনাময়ের পক্ষ থেকে সাদর আপ্যায়ন। [সুরা হা-মীম সেজদাহ : ৩০-৩২]
আল্লাহ ﷺ-র দরবারে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের সকলকে পুণ্যময় মৃত্যু দান করেন।
হ্যাঁ, প্রিয় পাঠক! এই হচ্ছে অনুতপ্ত ও অবাধ্য বান্দার পার্থক্য। প্রকৃত পার্থক্য তো ফুটে উঠবে সেদিন-
يَوْمَ يَفِرُّ الْمَرْءُ مِنْ أَخِيهِ ❁ وَأُمِّهِ وَأَبِيهِ ❁ وَصَاحِبَتِهِ وَبَنِيهِ ❁ لِكُلِّ امْرِئٍ مِّنْهُمْ يَوْمَئِذٍ شَأْنٌ يُغْنِيهِ ❁ وُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ مُّسْفِرَةٌ ❁ ضَاحِكَةٌ مُّسْتَبْشِرَةٌ ❁ وَوُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ عَلَيْهَا غَبَرَةٌ ❁ تَرْهَقُهَا قَتَرَةٌ ❁ أُولَئِكَ هُمُ الْكَفَرَةُ الْفَجَرَةُ
যেদিন পলায়ন করবে মানুষ তার ভাইয়ের কাছ থেকে, তার মা, তার পিতা, তার পত্নী ও তার সন্তানদের কাছ থেকে। সেদিন তাদের প্রত্যেকেরই এমন গুরুতর অবস্থা হবে, যা তাকে ব্যস্তভর করে রাখবে। অনেক মুখমন্ডল সেদিন হবে উজ্জ্বল, সহাস্য ও প্রফুল্ল; এবং অনেক মুখমন্ডল সেদিন হবে ধূলি ধূসরিত। সেগুলোকে কালিমা আচ্ছন্ন করে রাখবে। তারাই কাফের পাপিষ্ঠের দল। [সুরা আবাসা : ৩৫-৪২]
তবে যারা ধৈর্য ধারণ করেছে এবং নিজেকে শাহওয়াত ও প্রবৃত্তিপূজা থেকে বিরত রেখেছে, আল্লাহ ﷺ ও তাঁর রাসূল ﷺ কর্তৃক হারামমুক্ত যাবতীয় বিষয়াদি থেকে নিজেদের দূরে রেখেছে, তাদের জন্য তাদের প্রতিপালক অঙ্গীকার করেছেন এমন জান্নাতের, যার তলদেশ থেকে প্রবাহিত নহরসমূহ।
সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে, নবীজী ﷺ ইরশাদ করেছেন, 'দুনিয়ার সর্বাধিক সচ্ছল ও ধন-সম্পদের অধিকারী এক জাহান্নামীকে কেয়ামতের দিন উপস্থিত করা হবে। এরপর তাকে জাহান্নামের আগুনে একবার অবগাহন করিয়ে বলা হবে, হে আদম সন্তান! দুনিয়াতে তুমি কখনও আরাম-আয়েশ ভোগ করেছ কি? কখনও তুমি স্বচ্ছল অবস্থায় দিন অতিবাহিত করেছ কি?
সে বলবে, আল্লাহর কসম! হে আমার রব! না; কক্ষনো না।'
হ্যাঁ, যে ব্যক্তি দুনিয়ায় যাবতীয় আরাম-আয়েশে ডুবে ছিল, সব ধরনের নেয়ামত ভোগ করেছিল, জাহান্নামের আগুনে একটি মাত্র ডুব তাকে সে সবকিছু ভুলিয়ে দিবে। তা হলে তখন তার অবস্থা কী হবে, যখন তাকে-
- সেখানে অনন্তকাল থাকতে হবে!
- প্রতিনিয়ত শাস্তি ও আযাব অসহ্য যন্ত্রণা দিতে থাকবে!
- যাখুম খেতে হবে!
- ফুটন্ত পানি ও রক্ত-পূঁজ পান করতে হবে!
- কী অবস্থা হবে তখন তার, যখন তার সাহায্যপ্রার্থনার জবাবে বলা হবে-
﴿اِخْسَئُوْا فِيْهَا وَلَا تُكَلِّمُوْنِ﴾
তোমরা হীন অবস্থায় এখানেই পড়ে থাক এবং আমার সাথে কোনো কথা বলো না। [সূরা মুমিনুন : ১০৮]
আল্লাহর কসম! তার কি তখন মনে হবে-
- সেই অশ্লীলতার কথা, যাতে সে লিপ্ত হয়েছিল?
- সেই গানবাজনার কথা, যা সে শুনেছিল?
- সেই মদ ও নেশার কথা, যা সে পান করেছিল?
- সেই ধন-দৌলত ও সম্পদের কথা, যা সে উপার্জন করেছিল?
তখন তাকে বলা হবে-
﴿اِخْسَئُوْا فِيْهَا وَلَا تُكَلِّمُوْنِ﴾
এতে [জাহান্নামে] প্রবেশ কর। অতঃপর তোমরা চেঁচামেচি কর অথবা না কর, উভয়ই তোমাদের জন্য সমান। [সূরা তুর : ১৬]
অতঃপর নবীজী ﷺ বলেছেন- 'এরপর দুনিয়ার সর্বাধিক দুঃখকষ্টসম্পন্ন এক জান্নাতীকে উপস্থিত করা হবে। তারপর তাকে একবার জান্নাতে অবগাহন করিয়ে জিজ্ঞাসা করা হবে, হে আদম সন্তান! দুনিয়াতে তুমি কখনও কোনো কষ্ট দিনাতিপাত করেছ কি? কোনো হৃদয়বিদারক ও ভয়াবহ অবস্থার সম্মুখীন হয়েছ কি?
সে বলবে, আল্লাহর কসম! হে আমার রব! আমি কখনোই কোনো কষ্ট দিনাতিপাত করিনি। দুঃখ কী জিনিস, আমি কখনও তা দেখিনি।'
হ্যাঁ, জান্নাতে ক্ষণিকের অবস্থান তাকে তার দুনিয়াবী জীবনের যাবতীয় দুঃখ-বেদনা ও কষ্ট-ক্লেশ ভুলিয়ে দিবে। তা হলে তখন তার অবস্থা কেমন হবে, যখন সে-
- জান্নাতের নহর থেকে দুধ পান করবে!
- সুরম্য বালুশয্যায় অবস্থান থাকবে!
- জান্নাতের আলিফাগান বালাখানায় বসবাস করবে!
- নবী-রাসূলগণের মজলিসে আসা-যাওয়া করবে!
বরং তখন তার অবস্থা কেমন হবে, যখন তার রব তাদের দিকে রহমতের দৃষ্টিতে তাকাবেন এবং বলবেন- 'হে জান্নাতবাসীগণ! তোমরা কি সন্তুষ্ট হয়েছ? অতঃপর তারাও তাদের মহামহিয়ান রবের চেহারার দিকে তাকাবে?
আল্লাহর কসম! তখন কি তার মনে হবে-
- সেই দুঃখ-কষ্টের কথা, যা সে দুনিয়াতে ভোগ করেছিল!
- সেই সচ্ছলতার কথা, যা তাকে ভোগ-উপভোগ ও বিলাসিতা থেকে বিরত রেখেছিল!
না; কক্ষনোই না! বরং সে থাকবে চিরস্থায়ী আরাম-আয়েশে। যেখানে যৌবন কখনও ফুরাবে না; কোনো জিনিসের স্বাদ ও আনন্দে কখনও কোনো ঘাটতি আসবে না। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন-
﴿وَلَدَيْنَا مَزِيْدٌ﴾
তারা তথায় যা চাইবে, তা-ই পাবে এবং আমার কাছে রয়েছে আরও অধিক। [সূরা ক্ব-ফ : ৩৫]
হ্যাঁ, আল্লাহর কাছে রয়েছে আরও অধিক, আরও বেশি। এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, নবীজী ﷺ ইরশাদ করেছেন-
﴿إِنَّ أَدْنَى أَهْلِ الْجَنَّةِ مَنْزِلَةً لَمَنْ يَنْظُرُ إِلَى جَنَانِهِ وَأَزْوَاجِهِ وَنَعِيمِهِ وَخَدَمِهِ وَسُرُورِهِ مَسِيرَةُ أَلْفِ سَنَةٍ﴾
একজন সাধারণ মর্যাদাসম্পন্ন জান্নাতীর বাগান, স্ত্রী, আমোদ-প্রমোদের সামগ্রী, খাদেম এবং খাট-পালঙ্ক ও আসনসমূহ কেউ দেখতে চাইলে তা তার জন্য হাজার বছরের পথ। [সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৮৫০]
আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের সকলকে খাঁটি দিলে খাঁটি তাওবা করার এবং সব বিষয়ে সর্বদা তাঁর অভিমুখী হওয়ার তাওফীক দান করেন। আমীন।

📘 তাওবাতান নাসূহা খাঁটি তাওবা > 📄 দ্বিতীয় বিষয়

📄 দ্বিতীয় বিষয়


কোনো কোনো মানুষ যখন কোনো গুনাহ থেকে তাওবা করতে চায়, তখন শয়তান তাকে ধোঁকা দেয়। উদাহরণস্বরূপ, কেউ যখন গানবাদ্য শোনা থেকে তাওবা করতে চায়, তখন শয়তান তাকে এ বলে ধোঁকা দেয়- ‘যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি সিগারেট খাবে, সালাতে অলসতা করবে ইত্যাদি গুনাহে লিপ্ত থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত গানবাদ্য শোনা থেকে তোমার তাওবা কবুল হবে না। হয়তো তুমি এই সব গুনাহ থেকে একসঙ্গে তাওবা করবে, নয়তো তোমার কোনো তাওবাই কবুল হবে না। অতএব, শুধু শুধু তোমার নফসকে কষ্ট দিও না।’
'এটা ভুল কথা। কেননা, প্রত্যেক গুনাহের তাওবা আলাদা। এটা খুবই সম্ভব যে, কেউ অন্য কোনো গুনাহে লিপ্ত থাকা সত্ত্বেও তার যিনা-ব্যভিচারের তাওবা আল্লাহ কবুল করবেন। তবে এটা ঠিক যে, বান্দার উচিত সমস্ত গুনাহ থেকেই তাওবা করে নেওয়া।
একটি ঘটনা মনে পড়ে গেল। একবার আমরা একটি মসজিদ নির্মাণের জন্য লোকজনকে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছিলাম। লোকজন যে যার সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য করেছিল। তারই ধারাবাহিকতায় এক যুবক আমাদের কাছে এল। সে সিগারেট খেত; আরও বিভিন্ন গুনাহের কাজে লিপ্ত হত।
যুবক আমাদের কাছে এসে মুখবন্ধ একটি পাত্র আমার দিকে বাড়িয়ে দিল। খুলে দেখলাম তাতে পাঁচ হাজার রিয়াল আছে। আমি কিছুটা কৌতূহলী হয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি এগুলো কোত্থেকে এনেছ? সে উত্তর দিল, আমি আমার মা, ভাই ও কিছু নিকটাত্মীয়ের কাছ থেকে দিয়েছিলাম। তাদের কাছ থেকেই এগুলো সংগ্রহ করেছি। শায়খ! আপনি এগুলো রাখুন; মসজিদের কাজে ব্যয় করবেন।
প্রিয় পাঠক! একটি ভাবুন! ওই মসজিদে যত মুসল্লী সালাত আদায় করবেন, যত তাসবীহ পাঠকারী তাসবীহ পাঠ করবেন, যত যিকিরকারী যিকির করবেন, যত তেলাওয়াতকারী তেলাওয়াত করবেন, তার সমপরিমাণ সাওয়াব কি ওই যুবকের আমলনামায় লেখা হবে না?
— হবে। অবশ্যই হবে। কারণ, নবীজী ইরশাদ করেছেন-
مَنْ سَنَّ فِي الْإِسْلَامِ سُنَّةً حَسَنَةً فَلَهُ أَجْرُهَا وَأَجْرُ مَنْ عَمِلَ بِهَا إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ، مِنْ غَيْرِ أَنْ يَنْقُصَ مِنْ أُجُورِهِمْ شَيْءٌ
যে ব্যক্তি কোনো নেক কাজের প্রতি আহ্বান করবে, তার আমলনামায় সেসকল লোকের সমপরিমাণ সাওয়াব লেখা হবে, যারা তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমল করবে; আমলকারীদের সাওয়ায়ে বিদুম্মাত ও কমাতি করা ছাদাই। সিহাহ মুসলিম, হাদীস নং ২৬৭৮, মুয়াত্তা ইমাম মালেক, হাদীস নং ৫০৭, সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৬৭৪, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ২০৬, সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৮০৯]
কেন নয়?! অবশ্যই!
যেহেতু আমাদের আলোচিত যুবক তার সম্পদ এই মসজিদে দান করেছে, যেহেতু কেয়ামতের আগ পর্যন্ত সে তার সাওয়াব পেতে থাকবে– যদি তার নিয়ত ভালো থাকে।
প্রিয় পাঠক! আমি যে কথা বলতে চাচ্ছি, তা হচ্ছে– ওই যুবক মসজিদের জন্য টাকা সংগ্রহ করার সময় যদি শয়তান তাকে ধোঁকা দিয়ে বলত– ‘আরে তুমি মসজিদের জন্য টাকা সংগ্রহ করছো! অথচ তুমি একজন গুনাহগার; তুমি সিগারেট খাও; গান শোনো; দাড়ি মুণ্ডন কর’, আর ওই যুবকও যদি ধোঁকা খেয়ে বলত– ‘হাঁ, তাই তো! আমি তো গান শুনি; দাড়ি মুণ্ডন করি; আরও বিভিন্ন গুনাহের কাজ করি, এমতাবস্থায় আমি কী করে মসজিদ নির্মাণ করি? কিংবা মসজিদ নির্মাণের কাজে সাহায্য করি?! না, এটা করা যায় না। যখন আমি সিগারেট খাওয়া থেকে তাওবা করব; অমুক অমুক গুনাহ থেকে তাওবা করব, তখন আমি মসজিদ নির্মাণের জন্য সাহায্য করব’, তা হলে সুনিশ্চিত শয়তান তার উপর বিজয়ী হয়ে যেত এবং সে সমস্ত বড় কল্যাণ ও সাওয়াব থেকে সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত হয়ে যেত। কিন্তু ওই যুবক ভাগ্যবান। সে তার নফসের উপর বিজয় লাভ করতে পেরেছে।
তা ছাড়া আরও একটি বিষয় জেনে রাখুন, কোনো গুনাহ থেকে তাওবা করার পর পুনরায় সেই গুনাহে লিপ্ত হওয়ার অর্থ এই নয় যে, পূর্বের তাওবা বাতিল হয়ে গেছে, ফলে বান্দা নিরাশ হয়ে যাবে এবং পুনরায় গুনাহের রাজ্যে নিমগ্ন হয়ে যাবে। না; বরং আবারও এবং দৃঢ়ত তাওবা করে নেবে। আল্লাহ পাকুর কুরআনে ইরশাদ করেছেন–
إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ
এবং যারা কখনও কোনো অশ্লীল কাজ করে ফেললে কিংবা কোনো মন্দ কাজে জড়িত হয়ে নিজের উপর জুলুম করে ফেললে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আল্লাহ ছাড়া আর কে পাপ ক্ষমা করবেন? তারা নিজের কৃতকর্মের জন্য হঠকারিতা প্রদর্শন করে না এবং জেনে-শুনে তা-ই করতে থাকে না। [সুরা আলে ইমরান : ১০৭]

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00