📘 তাওবাতান নাসূহা খাঁটি তাওবা > 📄 এক যুবকের ঘটনা

📄 এক যুবকের ঘটনা


তার সাথে আমার পরিচয় ইউনিভার্সিটি-তে। আমি তার কথা কখনও ভুলতে পারব না। সে ছিল একজন এক যুবক। আমার দেখা মানুষের মধ্যে সুঠাম চেহারার অধিকারী, সুঠام সুশ্রী ও অসাধারণ এক যুবক। তার যৌবন ও স্ফূর্ততা যেন দেহ ফেটে বাইরে পড়ত।
তবে ইউনিভার্সিটি থেকে বের হওয়ার পর সে-ও অন্যান্যের মতো হারিয়ে গিয়েছিলো। দু'জনের মাঝে আর কোনো সম্পর্ক বা যোগাযোগ ছিল না। হঠাৎ একদিন সে আমাকে ফোন করে তাকে দেখতে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করল। বলল, ইচ্ছা সত্ত্বেও আমি গিয়ে আপনার সঙ্গে দেখা করতে পারছি না। কেন পারছি না তা জিজ্ঞাসা করবেন না। তবে আমাদের বাসায় এলেই বুঝতে পারবেন আমার অপারগতা কোথায়। কথাগুলো সে বলছিল অত্যন্ত বিষণ্ণ কণ্ঠে। অতঃপর সে আমাকে তাদের বাসার ঠিকানা ও যাওয়ার পথ বলে দিল।
একদিন আমি তাদের বাসায় গেলাম। দরজায় নক করলাম। তার এক ছোট ভাই দরজা খুললে আমাকে তার কামরায় নিয়ে গেল। তার কামরায় গিয়ে আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলাম না। সে একটি সাদা খাটের উপর শুয়ে আছে। পাশেই রয়েছে তার চলাচলে সাহায্যকারী বিভিন্ন সরঞ্জামাদি ও নানা ধরনের ঔষধপত্র। তার শরীরটা একেবারে তজ্বর অবস্থায় খাটের উপর পড়ে আছে। আমাকে দেখে সে সালাম করার জন্য উঠতে চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। আমি তার মাথার পাশে গিয়ে বসলাম। কিছুতেই অশ্রু সংবরণ করতে পারছিলাম না। বললাম, আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। আমাকে ক্ষমা করো। ইতিপূর্বে আমি তোমার অসুস্থতা সম্পর্কে জানতাম না। কিন্তু তোমার এ অবস্থা হল কীভাবে? কী হয়েছে তোমার? তুমি তো আমাদের সাথে একই সময়ে ভার্সিটি থেকে বের হয়েছ। তুমি না আমাকে বলতে- অচিরেই তুমি বিয়ে করবে, বাড়ি বানাবে, গাড়ি কিনবে।
সে বলল, হ্যাঁ ভাই! তবে হঠাৎ আমার জীবনে এমন ঘটনা ঘটে গেল, যা আমার কল্পনাতেও কোনোদিন আসেনি। এই তো কিছুদিন পূর্বে ভার্সিটি থেকে ডিগ্রি নিয়ে বের হলাম। কিছুদিনের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত একটি চাকরিও পেয়ে গেলাম। দিনগুলো বেশ ভালোই কাটছিল। সুখের সেই দিনগুলোতে আমার কোনো কষ্টই ছিল না। শুধু মাঝে মধ্যে একটু মাথা ব্যথা করত। প্রথম প্রথম ব্যথাটা হালকা ছিল। বেশি ভোগাতো না। ধীরে ধীরে তা বাড়তে লাগল। কিছুদিন পর মুক্ত হল দুশ্চিন্তার দুর্বলতা। হঠাৎ একদিন মাথা ব্যথা প্রচণ্ড আকার ধারণ করল। অনন্যোপায় হয়ে হাসপাতালে গেলাম। ডাক্তার দেখে বেশ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে দিলেন। মাথার সুস্থ এক্স-রে করালেন। এক্স-রে রিপোর্ট বের হওয়ার পর ডাক্তার তা বারবার উল্টোপাল্টে দেখতে লাগলেন। বিড়বিড় করে বলতে থাকলেন- না হালকাও নয় তা চূড়ান্ততা ইলাহ বিলাস! কিছুক্ষণ পর তিনি টেলিফোনের রিসিভার উঠিয়ে কারও সঙ্গে কথা বললেন এবং বড় বড় ডাক্তারদের একটি বোর্ড আহ্বান করলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে ডাক্তারগণ এসে উপস্থিত হলেন। বোর্ডের সকল ডাক্তার মিলে আমার রিপোর্টগুলো বিশ্লেষণ করতে লাগলেন। তারা সবাই তখন ইংরেজিতে কথা বলছিলেন। ফাঁকে ফাঁকে আড়চোখে আমার দিকে তাকাচ্ছিলেন। এভাবে প্রায় এক ঘণ্টা কেটে গেল। এ দীর্ঘ সময়ে আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না। মনে মনে ভাবছিলাম, সমস্যা হয়তো তেমন বড় কিছু নয়। দু'-এক ডোজ ঔষধে মাথা ব্যথা আর দু'-এক ফোঁটা ঔষধে চোখের সমস্যা ভালো হয়ে যাবে। এরপর সবকিছু ঠিকঠাক ও আগের মতো হয়ে যাবে। আমি যখন এমন ভাবছিলাম, ঠিক তখন একজন ডাক্তার হঠাৎ আমার দিকে তাকালেন এবং আমাকে স্তম্ভিত করে দিয়ে বলে যেতে লাগলেন— 'শোনো হে অমুক! তোমার ডাক্তারি পরীক্ষা-নিরীক্ষা বলছে তোমার মাথায় টিউমার হয়েছে। যা আকার ও আয়তন একটু বেড়ে চলেছে এবং তা বিপজ্জনক অবস্থায় পৌঁছে গেছে। ছোট ভিতর থেকে তোমার চোখের রগের উপর চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে তোমার দৃষ্টিতে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। টিউমারের স্ফীতি যেকোনো সময় আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। ফলে তোমার চোখের রগগুলো ফেটে যাবে এবং তুমি অন্য হয়ে যাবে। অতঃপর তোমার মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে রক্তক্ষরণ দেখা দিবে এবং তুমি মারা যাবে।'
ডাক্তারের কথাগুলো বজ্রের ন্যায় আমার কানে বাজল। আমি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। আমি বিকট আওয়াজে চিৎকার করে উঠলাম।
ডাক্তার বললেন, এটাই সত্য। তোমার রিপোর্টগুলো ডা-ই বলছে। তোমার মাথায় টিউমার হয়েছে এবং খুব দ্রুতই তার চিকিৎসা করতে হবে। অন্যথায় যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। রাতেরই আমরা তোমাকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দিয়ে চাই। অতঃপর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আগামীকাল তোমার মাথায় এক্সরেপচার করতে চাই। তোমার মাথার খুলি খুলে সেখান থেকে টিউমার অপসারণ করতে হবে। এক্সরেপচার সম্পন্ন হওয়ার পর পুনরায় মাথার খুলি যথাস্থানে প্রতিস্থাপন করে দেওয়া হবে। এ বলে ডাক্তার আমার সামনে একটি কাগজ [অপারেশনের সম্মতিপত্র] বাড়িয়ে দিলেন এবং তাতে স্বাক্ষর করতে বললেন।
সংবাদের আকস্মিকতায় আমি একেবারেই হতবুদ্ধি ছিলাম। স্থির করতে পারছিলাম না এখন আমার কী করণীয়। কিছুক্ষণ ভেবে আমি স্বাক্ষর না করে সেখান থেকে বেরিয়ে এলাম। কোনোভাবে অসুস্থ সবরণ করতে পারছিলাম না। ভাবতে লাগলাম, এখন আমার করণীয় কী! আমি কি বাসায় চলে যাব না অনকোনো হাসপাতালে যাব! দ্রুত ভাবনা-চিন্তা শেষ করে সিদ্ধান্ত নিলাম অন্য হাসপাতালে যাব।
সেখানেও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ডাক্তার সে সংবাদই দিলেন, যা দিয়েছিলেন আগের ডাক্তারগণ। এ ডাক্তারও দ্রুত অপারেশন করে ফেলার পরামর্শ দিলেন।
ততক্ষণে আমার মন কিছুটা শক্ত হয়ে এসেছে। ফোনে আবার সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। সংবাদ পেয়ে তৎক্ষণাৎ তিনি হাসপাতালে চলে এলেন। আমার পিতা একজন বুধ মানুষ। বয়স সত্তুর ছাড়িয়ে গেছে। হাসপাতালে এসে তিনি আমার নির্বাক ও ফ্যাকাশে চেহারার দেখে যাবড়ে গেলেন। আমি কিছুটা শক্ত হয়ে বললাম, আব্বাজান! আপনি তো জানেন, ইতিপূর্বে আমি প্রায়ই আমার মাথা ব্যাথার অভিযোগ করতাম। এখন আমার ডাক্তারি পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও রিপোর্ট বলছে— আমার মাথায় টিউমার হয়েছে এবং খুব দ্রুতই তা অপারেশন করে অপসারণ করতে হবে।
আমার কথা শুনে তিনি চিৎকার করে উঠলেন— লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ! এর পরই তিনি মাটিতে বসে পড়লেন। বারবার বলতে লাগলেন— ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
কিছুক্ষণ পর শান্ত হয়ে তিনি বললেন, বাবা! তুমি ঘাবড়িও না। আমি তোমাকে ও আমেরিকাতে তোমার ভাইকে কাছে পাঠিয়ে দিব। সেখানে তুমি চিকিৎসা নিবে এবং এক সময় সুস্থ হয়ে উঠবে ইনশাআল্লাহ।
কথাগুলো তিনি বলছিলেন আর হয়তো আমার বড় ভাইকে নিয়ে যে কষ্ট-ক্লেশ ভোগ করছেন তা স্মরণ করছিলেন। আমার বড় ভাই দীর্ঘ এক বছর যাবৎ আমেরিকাতে ক্যান্সারের চিকিৎসা নিচ্ছেন। আমি আমার পিতাকে কতদিন দেখিছি ভাইয়ের সাথে কোনো কথা বলছেন আর কাঁদছেন। কতদিন দেখেছি শেষ রাতে মুসল্লাতে বসে ভাইয়ের জন্য দোয়া করছেন।
আমি আমার পিতার দিকে তাকালাম। বুকের কষ্টগুলো অশ্রু হয়ে দু' গাল বেয়ে বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। তিনি দেখছেন— তার সন্তানরা একে একে তার চোখের সামনেই মারা যাচ্ছে। আমার ভাই খালেদ, গত দু' বছর আগে গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা গেছে। বড় ভাই ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে আমেরিকাতে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন। আর আমি এমন এক পথে রওয়ানা হয়েছি, যার শেষ গন্তব্য কোথায় জানা নেই।
এক সময় আমাকেও আমেরিকাতে পাঠানো হলো। আমি আমেরিকা গেলাম। উভয় এক হাসপাতালে ভর্তি হলাম। তারা দ্রুততম সময়ে আমার যাবতীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করলেন এবং পরদিন সকালেই অপারেশনে থিয়েটারে নিয়ে গেলেন। আমার মাথার সমস্ত চুল কামিয়ে ফেললেন। দেহ অবশ্য করা হলো। অতঃপর চারও দিক থেকে বৃত্তাকারে কেটে মাথার খুলির উপরের অংশ সম্পূর্ণ আলাদা করে ফেললেন। তারপর যথানিয়মে এক্সরেপচার করে সেখান থেকে টিউমার অপসারণ করলেন।
এভাবে প্রায় তিন ঘন্টা কেটে গেল। এ দীর্ঘ সময় যাবত অপারেশন চলছিল এবং তা ভালোভাবেই চলছিল। হঠাৎ আমার মস্তিষ্কের শিরায় রক্তও বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে এবং এক পর্যায়ে তা বিভিন্ন শিরা-উপশিরায় আটকে যায়। ফলে মস্তিষ্কে প্রচন্ড রক্তচাপ সৃষ্টি হয়। এতে ডাক্তারগণ কিছুটা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। এর সমাধান করতে গিয়ে দ্রুতবশত মস্তিষ্কের কিছু অংশে নাড়া লেগে যায়। এতে করে আমার শরীরের একাংশ অবশ হয়ে যায়।
ডাক্তারগণ বিষয়টি বুঝাতে পেরে দ্রুত অপারেশনের বাকি কাজগুলো সম্পন্ন করেন। মাথার খুলি আপন স্থানে বসিয়ে তার উপর চামড়া দিয়ে ঢেকে দেন। অতঃপর সেল্লাই করে অপারেশন থিয়েটার থেকে বের করে আমাকে নিয়ে যান নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে।
অপারেশন সম্পন্ন হওয়ার পর পূর্ণ পাঁচ ঘণ্টা আমি অচেতন অবস্থায় ছিলাম। এরপর হঠাৎ আমার বাম পার্শে খিঁচুনি দেখা দেয়। ডাক্তারগণ আবার আমাকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যান এবং এক্সরেপচারের মাধ্যমে তার সমাধান করেন। অতঃপর আবার আমাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে নিয়ে আসেন।
এরপর প্রায় চার ঘণ্টা আমার অবস্থা স্থিতিশীল থাকে। তারপর দেখা দেয় আরেক বিপদ— শ্বাসপ্রশ্বাসে রক্তক্ষরণ। ডাক্তারগণ আবারও আমাকে দ্রুত অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যান এবং আমার বক্ষ বিদীর্ণ করে রক্তক্ষরণের সমাধান করেন। অতঃপর আবার আমাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে নিয়ে আসেন।
আমার চিকিৎসার ব্যাপারে ডাক্তারগণ হতবুদ্ধি হয়ে যান। একের পর এক রোগের আক্রমণ। ক্ষণে ক্ষণে অবস্থার পরিবর্তন। হঠাৎ এমন সমস্যার সূত্রপাত, যার সমাধান খুবই কষ্টকর। এ যেন রোগের শেষ নেই, বিপদের সমাপ্তি নেই।
এরপর প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা আমার অবস্থা স্থিতিশীল থাকে। ডাক্তারগণ আমার মধ্যে কিছুটা সুস্থতা ও স্ফূর্তি অনুভব করেন। এরই মধ্যে হঠাৎ শরীরের তাপমাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যেতে লাগল। ডাক্তারগণ দ্রুত প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করালেন। রিপোর্ট এল— খুলির যে অংশের নীচ থেকে টিউমার অপসারণ করা হয়েছে, তাতে প্রচন্ড ব্যাথা হচ্ছে। অপরধাণ অবনতি দেখে ডাক্তার আবার অপারেশনে টিম আহ্বান করলেন। তারা সকলে মিলে আমাকে জানাযার মতো বহন করে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে গেলেন। তখন আমার ইশ ছিল।
আমি উপরের দিকে দুটি তুলে তাকালাম, কাঁদলাম এবং কায়মনোবাক্যে অনুনয়-বিনয় করে বারবার বলতে লাগলাম— হে আল্লাহ! হে আমার রব! হে আমার মেহেরবান মাওলা! আমি অক্ষম, অসহায়। আমি বিপদগ্রস্ত। আপনি সকল দয়াময়ের শ্রেষ্ঠ দয়াময়। হে আল্লাহ! এ যদি আমার উপর আপনার পক্ষ থেকে শাস্তি হয়ে থাকে, তা হলে আমি আপনার দয়া ও ক্ষমা প্রার্থনা করছি! আর যদি এ আমার জন্য আপনার পক্ষ থেকে পরীক্ষা হয়ে থাকে, তা হলে আমি আপনার সাহায্য প্রার্থনা করছি! আপনি আমাকে ধৈর্য ধারণ করার তাওফিক দান করুন; এর বিনিময়ে আমার পুণ্য ও প্রতিদান বহুগুণ বৃদ্ধি করে দিন।
এরপর আমি মৃত্যুর কথা স্মরণ করলাম। আল্লাহর কসম!—
— আমার বিষাদ সীমা ছাড়িয়ে গেছে।
— আমার সমস্ত শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেছে।
— হয়তো আগামীকালই মাটি আমার বিছানা হবে।
— আমার নিঃশ্বাস ফুরিয়ে এসেছে।
— আমার দেহ পোকা-মাকড়াও খাওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে।
— সেদিন আমার কী অবস্থা হবে—
— যেদিন পা পিছলে যাবে।
— মানুষ কান্নাকাটি করবে। আফসোস অনুশোচনা ও অনুতাপ দীর্ঘায়িত হবে।
— সেদিন আমার কী অবস্থা হবে—
— যেদিন সেই সভার সামনে দাঁড়াব, যিনি আমি ছোট-বড় সব কিছুর পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব নিবেন।
— যেদিন অপরাধীদের পা পিছলে যাবে।
— যেদিন আহাজারি ও হা-হুতাশ সীমা ছাড়িয়ে যাবে।
— যেদিন দুনিয়ার যাবতীয় আরাম-আয়েশ, সুখ-শান্তি ও স্বাদ-উপভোগ সুরের মতো শেষ হয়ে যাবে।
— সেদিন আমার কী অবস্থা হবে!
এরপর আমি কাঁদলাম। অনেক কাঁদলাম এবং খুব করে বেঁচে থাকার কামনা করলাম। তবে দুনিয়ার ভোগ-বিলাস ও আরাম-আয়েশের জন্য নয়। বরং আমার মাওলার সঙ্গে আমার সম্পর্ক সংশোধন ও স্থায়ী করার জন্য।
হঠাৎ ডাক্তার এলেন এবং আমাকে সম্পূর্ণরূপে অবশ করার আদেশ দিলেন। অবশ করার পর চামড়া খুলে পুরো খুলিটা আলাদা করে ফেললেন। অতঃপর খুলি ছাড়াই চামড়া দিয়ে মাথা ঢেকে সেলাই করে দিলেন।
যখন আমি জ্ঞান ফিরে পেলাম, লক্ষ করলাম আমার মাথা নরম। তা হলে এর ঘ্রাণ কোথায়। আমি ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করলাম, আমার মাথার বাকি অংশ কোথায়।
ডাক্তার ধীর ও শান্ত গলায় বললেন, তোমার মাথার খুলি আমাদের কাছে রেখে দিইছি– জীবাণুমুক্ত করার জন্য। ছয় মাস পর পুনরায় তুমি আমাদের কাছে এসো। তোমার মাথার খুলি যথাস্থানে লাগিয়ে দিব।
– যে দিন পা পিছলে যাবে।
– মানুষ কান্নাকাটি করবে। আফসোস অনুশোচনা ও অনুতাপ দীর্ঘায়িত হবে।
– যে দিন আমার কী অবস্থা হবে–
– যে দিন সেই সওয়াবের সামনে দাঁড়াব, যিনি আমার ছোট-বড় সব কিছুর পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব নিবেন।
– যে দিন অপরাধীদের পা পিছলে যাবে।
– যে দিন আত্মজার্তি ও সু-সুযোগ সীমা ছাড়িয়ে যাবে।
– যে দিন দুনিয়ার যাবতীয় আরাম-আয়েশ, সুখ-শান্তি ও সাদ-উপভোগ সুদূরে মতো শেষ হয়ে যাবে।
– সে দিন আমার কী অবস্থা হবে!
এরপর আমি কাঁদলাম। অনেক কাঁদলাম এবং খুব করে বেঁচে থাকার কামনা করলাম। তবে দুনিয়ার ভোগ-বিলাস ও আরাম-আয়েশের জন্য নয়। বরং আমার মাওলার সঙ্গে আমার সম্পর্ক সংশোধন ও স্থায়ী করার জন্য।
হঠাৎ ডাক্তার এলেন এবং আমাকে সম্পূর্ণরূপে অবশ্য করার আদেশ দিলেন। অবশ্য করার পর চামড়া খুলে পুরো শরীরটা আলাদা করে ফেললেন। অতঃপর খুলি ছাড়াই চামড়া দিয়ে মাথা ঢেকে সেলাই করে দিলেন।
যখন আমি জ্ঞান ফিরে পেলাম, লক্ষ্য করলাম আমার মাথা নরম। তা হলে এর হাড় কোথায়। আমি ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করলাম, আমার মাথার বাকি অংশ কোথায়।
ডাক্তার খুব ধীর ও শান্ত গলায় বললেন, তোমার মাথার খুলি আমাদের কাছে রেখে দিয়েছি- জীবাণুমুক্ত করার জন্য। ছয় মাস পর পুনরায় তুমি আমাদের কাছে এসো। তোমার মাথার খুলি যথাস্থানে লাগিয়ে দিব।
এরপর আমেরিকাতে আমি এক মাস ছিলাম। তারপর রিয়াদে চলে এসেছি। এখন ছয় মাসের বাকি সময়টুকু শেষ হওয়ার অপেক্ষা করছি।
– আমি আমার জীবনের স্থুল মাফসাদ্‌ থেকে উদাসীন ছিলাম।
– গাফলতের ঘুমে বিভোর ছিলাম।
– দুনিয়ার আরাম-আয়েশ ও ভোগ-বিলাসিতায় মগ্ন ছিলাম।
– বিপদ-আপদ, পরীক্ষা ও মৃত্যুর কথা ভুলে গিয়েছিলাম।
– দুনিয়াবী জীবন নিয়েই সন্তুষ্ট ছিলাম।
– দুনিয়াবী জীবন নিয়েই পড়ে ছিলাম।
– এখন আমি নতুনভাবে জন্মগ্রহণ করলাম।
প্রিয় পাঠক!
এরপর বেশ কিছুদিন অতিবাহিত হয়ে গেছে। ওই যুবক পক্ষাবলম্বনমুক্ত থেকে মুক্তি লাভ করেছে। এখন সে নিজে নিজে চলাফেরা করতে পারে।
– সাত মাস পর... আমি আমার তাকে দেখতে গেলাম। তখন দেখলাম, তার চেহারা হাস্যোজ্জ্বল, প্রফুল্ল ও প্রাণবন্ত। হাসিমাখা মুখে সে আমার দিকে একটি কার্ড বাড়িয়ে দিল। হাতে নিয়ে দেখি বিয়ের কার্ড। আমাকে তার বিয়ের দাওয়াত দিচ্ছে!
আমি যতটুকু জানি–
– এখন সে কল্যাণের কাজে অন্যদের চেয়ে অনেক অগ্রগামী।
– অত্যন্ত আগ্রহী ও উদ্যমী।
– অন্যকে নেক ও কল্যাণের কাজে উৎসাহ দানকারী।
এখন সে–
– মানুষকে আল্লাহ্ -এর দিকে ডাকে।
– দ্বীনের পথে আহবান করে।
– বিভিন্ন কিতাবাদি রচনা ও তা মানুষের মাঝে বিতরণ করে।
– অক্ষম-অসহায় ও অনাথ-দুঃখীদের সাহায্য-সহযোগিতা করে।
– অসহায়-দরিদ্রদের পাশে থাকে। সাহায্য-সহযোগিতা করে।
– ইত্যাকার আরও বহু কল্যাণকর ও নেক কাজে সর্বদা লিপ্ত থাকে।
প্রিয় পাঠক!
মনে রাখবেন, জীবনের মোড়ে মোড়ে, নানা দুঃখ-দুর্দশা ও কষ্টের বাঁকে বাঁকে বহু দান-অনুদান ও উপহার লুকায়িত থাকে。

তার সাথে আমার পরিচয় ইউনিভার্সিটি-তে। আমি তার কথা কখনও ভুলতে পারব না। সে ছিল একজন এক যুবক। আমার দেখা মানুষের মধ্যে সুঠাম চেহারার অধিকারী, সুঠام সুশ্রী ও অসাধারণ এক যুবক। তার যৌবন ও স্ফূর্ততা যেন দেহ ফেটে বাইরে পড়ত।
তবে ইউনিভার্সিটি থেকে বের হওয়ার পর সে-ও অন্যান্যের মতো হারিয়ে গিয়েছিলো। দু'জনের মাঝে আর কোনো সম্পর্ক বা যোগাযোগ ছিল না। হঠাৎ একদিন সে আমাকে ফোন করে তাকে দেখতে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করল। বলল, ইচ্ছা সত্ত্বেও আমি গিয়ে আপনার সঙ্গে দেখা করতে পারছি না। কেন পারছি না তা জিজ্ঞাসা করবেন না। তবে আমাদের বাসায় এলেই বুঝতে পারবেন আমার অপারগতা কোথায়। কথাগুলো সে বলছিল অত্যন্ত বিষণ্ণ কণ্ঠে। অতঃপর সে আমাকে তাদের বাসার ঠিকানা ও যাওয়ার পথ বলে দিল।
একদিন আমি তাদের বাসায় গেলাম। দরজায় নক করলাম। তার এক ছোট ভাই দরজা খুললে আমাকে তার কামরায় নিয়ে গেল। তার কামরায় গিয়ে আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলাম না। সে একটি সাদা খাটের উপর শুয়ে আছে। পাশেই রয়েছে তার চলাচলে সাহায্যকারী বিভিন্ন সরঞ্জামাদি ও নানা ধরনের ঔষধপত্র। তার শরীরটা একেবারে তজ্বর অবস্থায় খাটের উপর পড়ে আছে। আমাকে দেখে সে সালাম করার জন্য উঠতে চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। আমি তার মাথার পাশে গিয়ে বসলাম। কিছুতেই অশ্রু সংবরণ করতে পারছিলাম না। বললাম, আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। আমাকে ক্ষমা করো। ইতিপূর্বে আমি তোমার অসুস্থতা সম্পর্কে জানতাম না। কিন্তু তোমার এ অবস্থা হল কীভাবে? কী হয়েছে তোমার? তুমি তো আমাদের সাথে একই সময়ে ভার্সিটি থেকে বের হয়েছ। তুমি না আমাকে বলতে- অচিরেই তুমি বিয়ে করবে, বাড়ি বানাবে, গাড়ি কিনবে।
সে বলল, হ্যাঁ ভাই! তবে হঠাৎ আমার জীবনে এমন ঘটনা ঘটে গেল, যা আমার কল্পনাতেও কোনোদিন আসেনি। এই তো কিছুদিন পূর্বে ভার্সিটি থেকে ডিগ্রি নিয়ে বের হলাম। কিছুদিনের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত একটি চাকরিও পেয়ে গেলাম। দিনগুলো বেশ ভালোই কাটছিল। সুখের সেই দিনগুলোতে আমার কোনো কষ্টই ছিল না। শুধু মাঝে মধ্যে একটু মাথা ব্যথা করত। প্রথম প্রথম ব্যথাটা হালকা ছিল। বেশি ভোগাতো না। ধীরে ধীরে তা বাড়তে লাগল। কিছুদিন পর মুক্ত হল দুশ্চিন্তার দুর্বলতা। হঠাৎ একদিন মাথা ব্যথা প্রচণ্ড আকার ধারণ করল। অনন্যোপায় হয়ে হাসপাতালে গেলাম। ডাক্তার দেখে বেশ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে দিলেন। মাথার সুস্থ এক্স-রে করালেন। এক্স-রে রিপোর্ট বের হওয়ার পর ডাক্তার তা বারবার উল্টোপাল্টে দেখতে লাগলেন। বিড়বিড় করে বলতে থাকলেন- না হালকাও নয় তা চূড়ান্ততা ইলাহ বিলাস! কিছুক্ষণ পর তিনি টেলিফোনের রিসিভার উঠিয়ে কারও সঙ্গে কথা বললেন এবং বড় বড় ডাক্তারদের একটি বোর্ড আহ্বান করলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে ডাক্তারগণ এসে উপস্থিত হলেন। বোর্ডের সকল ডাক্তার মিলে আমার রিপোর্টগুলো বিশ্লেষণ করতে লাগলেন। তারা সবাই তখন ইংরেজিতে কথা বলছিলেন। ফাঁকে ফাঁকে আড়চোখে আমার দিকে তাকাচ্ছিলেন। এভাবে প্রায় এক ঘণ্টা কেটে গেল। এ দীর্ঘ সময়ে আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না। মনে মনে ভাবছিলাম, সমস্যা হয়তো তেমন বড় কিছু নয়। দু'-এক ডোজ ঔষধে মাথা ব্যথা আর দু'-এক ফোঁটা ঔষধে চোখের সমস্যা ভালো হয়ে যাবে। এরপর সবকিছু ঠিকঠাক ও আগের মতো হয়ে যাবে। আমি যখন এমন ভাবছিলাম, ঠিক তখন একজন ডাক্তার হঠাৎ আমার দিকে তাকালেন এবং আমাকে স্তম্ভিত করে দিয়ে বলে যেতে লাগলেন— 'শোনো হে অমুক! তোমার ডাক্তারি পরীক্ষা-নিরীক্ষা বলছে তোমার মাথায় টিউমার হয়েছে। যা আকার ও আয়তন একটু বেড়ে চলেছে এবং তা বিপজ্জনক অবস্থায় পৌঁছে গেছে। ছোট ভিতর থেকে তোমার চোখের রগের উপর চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে তোমার দৃষ্টিতে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। টিউমারের স্ফীতি যেকোনো সময় আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। ফলে তোমার চোখের রগগুলো ফেটে যাবে এবং তুমি অন্য হয়ে যাবে। অতঃপর তোমার মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে রক্তক্ষরণ দেখা দিবে এবং তুমি মারা যাবে।'
ডাক্তারের কথাগুলো বজ্রের ন্যায় আমার কানে বাজল। আমি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। আমি বিকট আওয়াজে চিৎকার করে উঠলাম।
ডাক্তার বললেন, এটাই সত্য। তোমার রিপোর্টগুলো ডা-ই বলছে। তোমার মাথায় টিউমার হয়েছে এবং খুব দ্রুতই তার চিকিৎসা করতে হবে। অন্যথায় যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। রাতেরই আমরা তোমাকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দিয়ে চাই। অতঃপর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আগামীকাল তোমার মাথায় এক্সরেপচার করতে চাই। তোমার মাথার খুলি খুলে সেখান থেকে টিউমার অপসারণ করতে হবে। এক্সরেপচার সম্পন্ন হওয়ার পর পুনরায় মাথার খুলি যথাস্থানে প্রতিস্থাপন করে দেওয়া হবে। এ বলে ডাক্তার আমার সামনে একটি কাগজ [অপারেশনের সম্মতিপত্র] বাড়িয়ে দিলেন এবং তাতে স্বাক্ষর করতে বললেন।
সংবাদের আকস্মিকতায় আমি একেবারেই হতবুদ্ধি ছিলাম। স্থির করতে পারছিলাম না এখন আমার কী করণীয়। কিছুক্ষণ ভেবে আমি স্বাক্ষর না করে সেখান থেকে বেরিয়ে এলাম। কোনোভাবে অসুস্থ সবরণ করতে পারছিলাম না। ভাবতে লাগলাম, এখন আমার করণীয় কী! আমি কি বাসায় চলে যাব না অনকোনো হাসপাতালে যাব! দ্রুত ভাবনা-চিন্তা শেষ করে সিদ্ধান্ত নিলাম অন্য হাসপাতালে যাব।
সেখানেও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ডাক্তার সে সংবাদই দিলেন, যা দিয়েছিলেন আগের ডাক্তারগণ। এ ডাক্তারও দ্রুত অপারেশন করে ফেলার পরামর্শ দিলেন।
ততক্ষণে আমার মন কিছুটা শক্ত হয়ে এসেছে। ফোনে আবার সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। সংবাদ পেয়ে তৎক্ষণাৎ তিনি হাসপাতালে চলে এলেন। আমার পিতা একজন বুধ মানুষ। বয়স সত্তুর ছাড়িয়ে গেছে। হাসপাতালে এসে তিনি আমার নির্বাক ও ফ্যাকাশে চেহারার দেখে যাবড়ে গেলেন। আমি কিছুটা শক্ত হয়ে বললাম, আব্বাজান! আপনি তো জানেন, ইতিপূর্বে আমি প্রায়ই আমার মাথা ব্যাথার অভিযোগ করতাম। এখন আমার ডাক্তারি পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও রিপোর্ট বলছে— আমার মাথায় টিউমার হয়েছে এবং খুব দ্রুতই তা অপারেশন করে অপসারণ করতে হবে।
আমার কথা শুনে তিনি চিৎকার করে উঠলেন— লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ! এর পরই তিনি মাটিতে বসে পড়লেন। বারবার বলতে লাগলেন— ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
কিছুক্ষণ পর শান্ত হয়ে তিনি বললেন, বাবা! তুমি ঘাবড়িও না। আমি তোমাকে ও আমেরিকাতে তোমার ভাইকে কাছে পাঠিয়ে দিব। সেখানে তুমি চিকিৎসা নিবে এবং এক সময় সুস্থ হয়ে উঠবে ইনশাআল্লাহ।
কথাগুলো তিনি বলছিলেন আর হয়তো আমার বড় ভাইকে নিয়ে যে কষ্ট-ক্লেশ ভোগ করছেন তা স্মরণ করছিলেন। আমার বড় ভাই দীর্ঘ এক বছর যাবৎ আমেরিকাতে ক্যান্সারের চিকিৎসা নিচ্ছেন। আমি আমার পিতাকে কতদিন দেখিছি ভাইয়ের সাথে কোনো কথা বলছেন আর কাঁদছেন। কতদিন দেখেছি শেষ রাতে মুসল্লাতে বসে ভাইয়ের জন্য দোয়া করছেন।
আমি আমার পিতার দিকে তাকালাম। বুকের কষ্টগুলো অশ্রু হয়ে দু' গাল বেয়ে বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। তিনি দেখছেন— তার সন্তানরা একে একে তার চোখের সামনেই মারা যাচ্ছে। আমার ভাই খালেদ, গত দু' বছর আগে গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা গেছে। বড় ভাই ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে আমেরিকাতে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন। আর আমি এমন এক পথে রওয়ানা হয়েছি, যার শেষ গন্তব্য কোথায় জানা নেই।
এক সময় আমাকেও আমেরিকাতে পাঠানো হলো। আমি আমেরিকা গেলাম। উভয় এক হাসপাতালে ভর্তি হলাম। তারা দ্রুততম সময়ে আমার যাবতীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করলেন এবং পরদিন সকালেই অপারেশনে থিয়েটারে নিয়ে গেলেন। আমার মাথার সমস্ত চুল কামিয়ে ফেললেন। দেহ অবশ্য করা হলো। অতঃপর চারও দিক থেকে বৃত্তাকারে কেটে মাথার খুলির উপরের অংশ সম্পূর্ণ আলাদা করে ফেললেন। তারপর যথানিয়মে এক্সরেপচার করে সেখান থেকে টিউমার অপসারণ করলেন।
এভাবে প্রায় তিন ঘন্টা কেটে গেল। এ দীর্ঘ সময় যাবত অপারেশন চলছিল এবং তা ভালোভাবেই চলছিল। হঠাৎ আমার মস্তিষ্কের শিরায় রক্তও বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে এবং এক পর্যায়ে তা বিভিন্ন শিরা-উপশিরায় আটকে যায়। ফলে মস্তিষ্কে প্রচন্ড রক্তচাপ সৃষ্টি হয়। এতে ডাক্তারগণ কিছুটা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। এর সমাধান করতে গিয়ে দ্রুতবশত মস্তিষ্কের কিছু অংশে নাড়া লেগে যায়। এতে করে আমার শরীরের একাংশ অবশ হয়ে যায়।
ডাক্তারগণ বিষয়টি বুঝাতে পেরে দ্রুত অপারেশনের বাকি কাজগুলো সম্পন্ন করেন। মাথার খুলি আপন স্থানে বসিয়ে তার উপর চামড়া দিয়ে ঢেকে দেন। অতঃপর সেল্লাই করে অপারেশন থিয়েটার থেকে বের করে আমাকে নিয়ে যান নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে।
অপারেশন সম্পন্ন হওয়ার পর পূর্ণ পাঁচ ঘণ্টা আমি অচেতন অবস্থায় ছিলাম। এরপর হঠাৎ আমার বাম পার্শে খিঁচুনি দেখা দেয়। ডাক্তারগণ আবার আমাকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যান এবং এক্সরেপচারের মাধ্যমে তার সমাধান করেন। অতঃপর আবার আমাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে নিয়ে আসেন।
এরপর প্রায় চার ঘণ্টা আমার অবস্থা স্থিতিশীল থাকে। তারপর দেখা দেয় আরেক বিপদ— শ্বাসপ্রশ্বাসে রক্তক্ষরণ। ডাক্তারগণ আবারও আমাকে দ্রুত অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যান এবং আমার বক্ষ বিদীর্ণ করে রক্তক্ষরণের সমাধান করেন। অতঃপর আবার আমাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে নিয়ে আসেন।
আমার চিকিৎসার ব্যাপারে ডাক্তারগণ হতবুদ্ধি হয়ে যান। একের পর এক রোগের আক্রমণ। ক্ষণে ক্ষণে অবস্থার পরিবর্তন। হঠাৎ এমন সমস্যার সূত্রপাত, যার সমাধান খুবই কষ্টকর। এ যেন রোগের শেষ নেই, বিপদের সমাপ্তি নেই।
এরপর প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা আমার অবস্থা স্থিতিশীল থাকে। ডাক্তারগণ আমার মধ্যে কিছুটা সুস্থতা ও স্ফূর্তি অনুভব করেন। এরই মধ্যে হঠাৎ শরীরের তাপমাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যেতে লাগল। ডাক্তারগণ দ্রুত প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করালেন। রিপোর্ট এল— খুলির যে অংশের নীচ থেকে টিউমার অপসারণ করা হয়েছে, তাতে প্রচন্ড ব্যাথা হচ্ছে। অপরধাণ অবনতি দেখে ডাক্তার আবার অপারেশনে টিম আহ্বান করলেন। তারা সকলে মিলে আমাকে জানাযার মতো বহন করে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে গেলেন। তখন আমার ইশ ছিল।
আমি উপরের দিকে দুটি তুলে তাকালাম, কাঁদলাম এবং কায়মনোবাক্যে অনুনয়-বিনয় করে বারবার বলতে লাগলাম— হে আল্লাহ! হে আমার রব! হে আমার মেহেরবান মাওলা! আমি অক্ষম, অসহায়। আমি বিপদগ্রস্ত। আপনি সকল দয়াময়ের শ্রেষ্ঠ দয়াময়। হে আল্লাহ! এ যদি আমার উপর আপনার পক্ষ থেকে শাস্তি হয়ে থাকে, তা হলে আমি আপনার দয়া ও ক্ষমা প্রার্থনা করছি! আর যদি এ আমার জন্য আপনার পক্ষ থেকে পরীক্ষা হয়ে থাকে, তা হলে আমি আপনার সাহায্য প্রার্থনা করছি! আপনি আমাকে ধৈর্য ধারণ করার তাওফিক দান করুন; এর বিনিময়ে আমার পুণ্য ও প্রতিদান বহুগুণ বৃদ্ধি করে দিন।
এরপর আমি মৃত্যুর কথা স্মরণ করলাম। আল্লাহর কসম!—
— আমার বিষাদ সীমা ছাড়িয়ে গেছে।
— আমার সমস্ত শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেছে।
— হয়তো আগামীকালই মাটি আমার বিছানা হবে।
— আমার নিঃশ্বাস ফুরিয়ে এসেছে।
— আমার দেহ পোকা-মাকড়াও খাওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে।
— সেদিন আমার কী অবস্থা হবে—
— যেদিন পা পিছলে যাবে।
— মানুষ কান্নাকাটি করবে। আফসোস অনুশোচনা ও অনুতাপ দীর্ঘায়িত হবে।
— সেদিন আমার কী অবস্থা হবে—
— যেদিন সেই সভার সামনে দাঁড়াব, যিনি আমি ছোট-বড় সব কিছুর পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব নিবেন।
— যেদিন অপরাধীদের পা পিছলে যাবে।
— যেদিন আহাজারি ও হা-হুতাশ সীমা ছাড়িয়ে যাবে।
— যেদিন দুনিয়ার যাবতীয় আরাম-আয়েশ, সুখ-শান্তি ও স্বাদ-উপভোগ সুরের মতো শেষ হয়ে যাবে।
— সেদিন আমার কী অবস্থা হবে!
এরপর আমি কাঁদলাম। অনেক কাঁদলাম এবং খুব করে বেঁচে থাকার কামনা করলাম। তবে দুনিয়ার ভোগ-বিলাস ও আরাম-আয়েশের জন্য নয়। বরং আমার মাওলার সঙ্গে আমার সম্পর্ক সংশোধন ও স্থায়ী করার জন্য।
হঠাৎ ডাক্তার এলেন এবং আমাকে সম্পূর্ণরূপে অবশ করার আদেশ দিলেন। অবশ করার পর চামড়া খুলে পুরো খুলিটা আলাদা করে ফেললেন। অতঃপর খুলি ছাড়াই চামড়া দিয়ে মাথা ঢেকে সেলাই করে দিলেন।
যখন আমি জ্ঞান ফিরে পেলাম, লক্ষ করলাম আমার মাথা নরম। তা হলে এর ঘ্রাণ কোথায়। আমি ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করলাম, আমার মাথার বাকি অংশ কোথায়।
ডাক্তার ধীর ও শান্ত গলায় বললেন, তোমার মাথার খুলি আমাদের কাছে রেখে দিইছি– জীবাণুমুক্ত করার জন্য। ছয় মাস পর পুনরায় তুমি আমাদের কাছে এসো। তোমার মাথার খুলি যথাস্থানে লাগিয়ে দিব।
– যে দিন পা পিছলে যাবে।
– মানুষ কান্নাকাটি করবে। আফসোস অনুশোচনা ও অনুতাপ দীর্ঘায়িত হবে।
– যে দিন আমার কী অবস্থা হবে–
– যে দিন সেই সওয়াবের সামনে দাঁড়াব, যিনি আমার ছোট-বড় সব কিছুর পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব নিবেন।
– যে দিন অপরাধীদের পা পিছলে যাবে।
– যে দিন আত্মজার্তি ও সু-সুযোগ সীমা ছাড়িয়ে যাবে।
– যে দিন দুনিয়ার যাবতীয় আরাম-আয়েশ, সুখ-শান্তি ও সাদ-উপভোগ সুদূরে মতো শেষ হয়ে যাবে।
– সে দিন আমার কী অবস্থা হবে!
এরপর আমি কাঁদলাম। অনেক কাঁদলাম এবং খুব করে বেঁচে থাকার কামনা করলাম। তবে দুনিয়ার ভোগ-বিলাস ও আরাম-আয়েশের জন্য নয়। বরং আমার মাওলার সঙ্গে আমার সম্পর্ক সংশোধন ও স্থায়ী করার জন্য।
হঠাৎ ডাক্তার এলেন এবং আমাকে সম্পূর্ণরূপে অবশ্য করার আদেশ দিলেন। অবশ্য করার পর চামড়া খুলে পুরো শরীরটা আলাদা করে ফেললেন। অতঃপর খুলি ছাড়াই চামড়া দিয়ে মাথা ঢেকে সেলাই করে দিলেন।
যখন আমি জ্ঞান ফিরে পেলাম, লক্ষ্য করলাম আমার মাথা নরম। তা হলে এর হাড় কোথায়। আমি ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করলাম, আমার মাথার বাকি অংশ কোথায়।
ডাক্তার খুব ধীর ও শান্ত গলায় বললেন, তোমার মাথার খুলি আমাদের কাছে রেখে দিয়েছি- জীবাণুমুক্ত করার জন্য। ছয় মাস পর পুনরায় তুমি আমাদের কাছে এসো। তোমার মাথার খুলি যথাস্থানে লাগিয়ে দিব।
এরপর আমেরিকাতে আমি এক মাস ছিলাম। তারপর রিয়াদে চলে এসেছি। এখন ছয় মাসের বাকি সময়টুকু শেষ হওয়ার অপেক্ষা করছি।
– আমি আমার জীবনের স্থুল মাফসাদ্‌ থেকে উদাসীন ছিলাম।
– গাফলতের ঘুমে বিভোর ছিলাম।
– দুনিয়ার আরাম-আয়েশ ও ভোগ-বিলাসিতায় মগ্ন ছিলাম।
– বিপদ-আপদ, পরীক্ষা ও মৃত্যুর কথা ভুলে গিয়েছিলাম।
– দুনিয়াবী জীবন নিয়েই সন্তুষ্ট ছিলাম।
– দুনিয়াবী জীবন নিয়েই পড়ে ছিলাম।
– এখন আমি নতুনভাবে জন্মগ্রহণ করলাম।
প্রিয় পাঠক!
এরপর বেশ কিছুদিন অতিবাহিত হয়ে গেছে। ওই যুবক পক্ষাবলম্বনমুক্ত থেকে মুক্তি লাভ করেছে। এখন সে নিজে নিজে চলাফেরা করতে পারে।
– সাত মাস পর... আমি আমার তাকে দেখতে গেলাম। তখন দেখলাম, তার চেহারা হাস্যোজ্জ্বল, প্রফুল্ল ও প্রাণবন্ত। হাসিমাখা মুখে সে আমার দিকে একটি কার্ড বাড়িয়ে দিল। হাতে নিয়ে দেখি বিয়ের কার্ড। আমাকে তার বিয়ের দাওয়াত দিচ্ছে!
আমি যতটুকু জানি–
– এখন সে কল্যাণের কাজে অন্যদের চেয়ে অনেক অগ্রগামী।
– অত্যন্ত আগ্রহী ও উদ্যমী।
– অন্যকে নেক ও কল্যাণের কাজে উৎসাহ দানকারী।
এখন সে–
– মানুষকে আল্লাহ্ -এর দিকে ডাকে।
– দ্বীনের পথে আহবান করে।
– বিভিন্ন কিতাবাদি রচনা ও তা মানুষের মাঝে বিতরণ করে।
– অক্ষম-অসহায় ও অনাথ-দুঃখীদের সাহায্য-সহযোগিতা করে।
– অসহায়-দরিদ্রদের পাশে থাকে। সাহায্য-সহযোগিতা করে।
– ইত্যাকার আরও বহু কল্যাণকর ও নেক কাজে সর্বদা লিপ্ত থাকে।
প্রিয় পাঠক!
মনে রাখবেন, জীবনের মোড়ে মোড়ে, নানা দুঃখ-দুর্দশা ও কষ্টের বাঁকে বাঁকে বহু দান-অনুদান ও উপহার লুকায়িত থাকে。

📘 তাওবাতান নাসূহা খাঁটি তাওবা > 📄 তাওবাকারী আল্লাহর প্রিয়

📄 তাওবাকারী আল্লাহর প্রিয়


তাওবাকারীরা আল্লাহ্ এর প্রিয়পাত্র। আল্লাহ্ আমাদের সংবাদ দিয়েছেন, তিনি তাওবাকারীদের ভালোবাসেন। এ ঘোষণা তিনি তাঁর পবিত্র কিতাবের স্থানে স্থানে বর্ণনা করেছেন। যেমন, ইরশাদ হয়েছে–
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ
নিশ্চয় আল্লাহ্ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং যারা পবিত্র থাকে, তাদেরও ভালোবাসেন। [সূরা বাকারা : ২২২]
অপর এক আয়াতে তিনি ইরশাদ করেছেন–
أَلَمْ يَعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ هُوَ يَقْبَلُ التَّوْبَةَ عَنْ عِبَادِهِ وَيَأْخُذُ الصَّدَقَاتِ وَأَنَّ اللَّهَ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
তার কি জানে না যে, আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদের তাওবা কবুল করেন এবং সদকা কবুল করেন? বস্তুত আল্লাহ্ই তো তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু। [সূরা তাওবা : ১০৪]
অন্য এক আয়াতে ইরশাদ করেছেন–
أَلَمْ يَعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ هُوَ يَقْبَلُ التَّوْبَةَ عَنْ عِبَادِهِ وَيَأْخُذُ الصَّدَقَاتِ وَأَنَّ اللَّهَ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
তিনি [আল্লাহ্] তাঁর বান্দাদের তাওবা কবুল করেন, পাপসমূহ মার্জনা করেন এবং তোমাদের কৃত বিষয় সম্পর্কে অবগত রয়েছেন। [সূরা শূরা : ২৬]
আল্লাহ্ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন। তবে তিনি পাপাচারী, সীমালঙ্ঘনকারী ও অত্যাচারীদের পছন্দ করেন না। কত গুনাহগার ও পাপী সকাল-সন্ধ্যা হাসি-তামাশায় লিপ্ত থাকে, অথচ–
– তাদের রব উপর থেকে তাদের উপর লানত করতে থাকেন।
– ফেরেশতারা ক্রোধার্বিত হতে থাকেন।
– নেককার বান্দারা তাদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করতে থাকেন।
– জাহান্নামের আগুন তাদের জন্য উত্তপ্ত হতে থাকে। তাদের জন্য উদ্দীপ্ত হয়ে থাকে।
আল্লাহ্ তাদের চোখ-কান সম্পূর্ণ রূপে রেখেছেন। তাদের বিবেক-বুদ্ধি ও মস্তিষ্ক পরিপূর্ণ সুখ ও কর্মক্ষম রেখেছেন, অথচ তারা–
– না-ফরমানি ও অবাধ্যতার মাধ্যমে আল্লাহ্ তাআলার প্রতিহিংসায় লিপ্ত হয়।
– শয়তানের সহযোগিতা ও তার অনুসরণ করে।
– বিরামহীন অন্যায়-অনাচার ও পাপাচারে লিপ্ত থাকে।
– তাওবা তো করেই না, উল্টো শাহওাতে নাফসানীর ও শয়তানের ফাঁদে পড়ে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতা করতে থাকে।
আশ্চর্য! আল্লাহ্ নেয়ামত দান করেন আর সেই নেয়ামতের মাধ্যমেই তারা নেয়ামতদাতার অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়। আরে, তুমি একবার ভেবে দেখছ কি, তোমার কী অবস্থা হত, যদি তুমি–
– পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে বিছানায় পড়ে থাকতে?
– কিংবা আরও ভয়ংকর কোনো রোগে আক্রান্ত হতে?
– তোমার দৃষ্টিশক্তি ছিনিয়ে নেওয়া হত?
– কিংবা তোমাকে বধির বানিয়ে দেওয়া হত?
– তা হলে তুমি কী করতে?
– তোমার কী করার থাকত?
– একবারও কি ভেবেছ? ভেবে দেখেছ?!!
যেকোনো সময়, মুহূর্তের মধ্যে আল্লাহ্ তোমার সুস্থতার নেয়ামত ছিনিয়ে নিতে পারেন। একেবারে বিছানায় শুইয়ে দিতে পারেন। তখন তোমার কী করার থাকবে?
একটি ঘটনা মনে পড়ে গেল। একবার সেনাবাহিনীর এক মেজর তার এক অসুস্থ সহকর্মীকে দেখার জন্য হাসপাতালে গেলেন। হাসপাতালে গিয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন, তার খোঁজ-খবর নিলেন। বেশ কিছুক্ষণ সময় তার কাছে কাটালেন। দেখা-সাক্ষাৎ শেষে ফিরে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালেন। দাঁড়িয়ে সালাম দিলেন; তার জন্য সুস্থতা ও কল্যাণের দোয়া করলেন। অতপর যখনই রুম থেকে বের হওয়ার জন্য মুখে দাঁড়ালেন, অমনিই পা পিছলে ফ্লোরে পড়ে গেলেন। পড়ার সময় রোগীর বেডের পাশে রাখা ছোট টেবিলের সঙ্গে মাথা আঘাত পেলেন। এতে করে তিনিও অসুস্থ হয়ে পড়লেন। আল্লাহ্ কি মজী! এ থেকেই এক সময় তার চার হাত-পা অবশ হয়ে গেল। আমি যতটুকু জানি, এখনও তিনি হাসপাতালেই আছেন। সেই ঘটনার পর আজ প্রায় দশ বছর কেটে গেছে!

তাওবাকারীরা আল্লাহ্ এর প্রিয়পাত্র। আল্লাহ্ আমাদের সংবাদ দিয়েছেন, তিনি তাওবাকারীদের ভালোবাসেন। এ ঘোষণা তিনি তাঁর পবিত্র কিতাবের স্থানে স্থানে বর্ণনা করেছেন। যেমন, ইরশাদ হয়েছে–
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ
নিশ্চয় আল্লাহ্ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং যারা পবিত্র থাকে, তাদেরও ভালোবাসেন। [সূরা বাকারা : ২২২]
অপর এক আয়াতে তিনি ইরশাদ করেছেন–
أَلَمْ يَعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ هُوَ يَقْبَلُ التَّوْبَةَ عَنْ عِبَادِهِ وَيَأْخُذُ الصَّدَقَاتِ وَأَنَّ اللَّهَ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
তার কি জানে না যে, আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদের তাওবা কবুল করেন এবং সদকা কবুল করেন? বস্তুত আল্লাহ্ই তো তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু। [সূরা তাওবা : ১০৪]
অন্য এক আয়াতে ইরশাদ করেছেন–
أَلَمْ يَعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ هُوَ يَقْبَلُ التَّوْبَةَ عَنْ عِبَادِهِ وَيَأْخُذُ الصَّدَقَاتِ وَأَنَّ اللَّهَ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
তিনি [আল্লাহ্] তাঁর বান্দাদের তাওবা কবুল করেন, পাপসমূহ মার্জনা করেন এবং তোমাদের কৃত বিষয় সম্পর্কে অবগত রয়েছেন। [সূরা শূরা : ২৬]
আল্লাহ্ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন। তবে তিনি পাপাচারী, সীমালঙ্ঘনকারী ও অত্যাচারীদের পছন্দ করেন না। কত গুনাহগার ও পাপী সকাল-সন্ধ্যা হাসি-তামাশায় লিপ্ত থাকে, অথচ–
– তাদের রব উপর থেকে তাদের উপর লানত করতে থাকেন।
– ফেরেশতারা ক্রোধার্বিত হতে থাকেন।
– নেককার বান্দারা তাদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করতে থাকেন।
– জাহান্নামের আগুন তাদের জন্য উত্তপ্ত হতে থাকে। তাদের জন্য উদ্দীপ্ত হয়ে থাকে।
আল্লাহ্ তাদের চোখ-কান সম্পূর্ণ রূপে রেখেছেন। তাদের বিবেক-বুদ্ধি ও মস্তিষ্ক পরিপূর্ণ সুখ ও কর্মক্ষম রেখেছেন, অথচ তারা–
– না-ফরমানি ও অবাধ্যতার মাধ্যমে আল্লাহ্ তাআলার প্রতিহিংসায় লিপ্ত হয়।
– শয়তানের সহযোগিতা ও তার অনুসরণ করে।
– বিরামহীন অন্যায়-অনাচার ও পাপাচারে লিপ্ত থাকে।
– তাওবা তো করেই না, উল্টো শাহওাতে নাফসানীর ও শয়তানের ফাঁদে পড়ে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতা করতে থাকে।
আশ্চর্য! আল্লাহ্ নেয়ামত দান করেন আর সেই নেয়ামতের মাধ্যমেই তারা নেয়ামতদাতার অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়। আরে, তুমি একবার ভেবে দেখছ কি, তোমার কী অবস্থা হত, যদি তুমি–
– পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে বিছানায় পড়ে থাকতে?
– কিংবা আরও ভয়ংকর কোনো রোগে আক্রান্ত হতে?
– তোমার দৃষ্টিশক্তি ছিনিয়ে নেওয়া হত?
– কিংবা তোমাকে বধির বানিয়ে দেওয়া হত?
– তা হলে তুমি কী করতে?
– তোমার কী করার থাকত?
– একবারও কি ভেবেছ? ভেবে দেখেছ?!!
যেকোনো সময়, মুহূর্তের মধ্যে আল্লাহ্ তোমার সুস্থতার নেয়ামত ছিনিয়ে নিতে পারেন। একেবারে বিছানায় শুইয়ে দিতে পারেন। তখন তোমার কী করার থাকবে?
একটি ঘটনা মনে পড়ে গেল। একবার সেনাবাহিনীর এক মেজর তার এক অসুস্থ সহকর্মীকে দেখার জন্য হাসপাতালে গেলেন। হাসপাতালে গিয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন, তার খোঁজ-খবর নিলেন। বেশ কিছুক্ষণ সময় তার কাছে কাটালেন। দেখা-সাক্ষাৎ শেষে ফিরে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালেন। দাঁড়িয়ে সালাম দিলেন; তার জন্য সুস্থতা ও কল্যাণের দোয়া করলেন। অতপর যখনই রুম থেকে বের হওয়ার জন্য মুখে দাঁড়ালেন, অমনিই পা পিছলে ফ্লোরে পড়ে গেলেন। পড়ার সময় রোগীর বেডের পাশে রাখা ছোট টেবিলের সঙ্গে মাথা আঘাত পেলেন। এতে করে তিনিও অসুস্থ হয়ে পড়লেন। আল্লাহ্ কি মজী! এ থেকেই এক সময় তার চার হাত-পা অবশ হয়ে গেল। আমি যতটুকু জানি, এখনও তিনি হাসপাতালেই আছেন। সেই ঘটনার পর আজ প্রায় দশ বছর কেটে গেছে!

📘 তাওবাতান নাসূহা খাঁটি তাওবা > 📄 কিছুক্ষণ... রোগী ও অসুস্থদের সাথে!

📄 কিছুক্ষণ... রোগী ও অসুস্থদের সাথে!


আমি এক যুবককে চিনি। সে গাড়ি দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিল। ভয়াবহ দুর্ঘটনা। আল্লাহ রব্বুল আলামিনের অনুগ্রহে সে প্রাণে রক্ষা পেয়েছিল ঠিকই, কিন্তু দুর্ঘটনায় তার হাত-পা সবই হারাতে হয়েছে। তার উভয় হাত ও উভয় পা-ই কেটে ফেলতে হয়েছে।
একবার আমি এক রোগী দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিলাম। হাসপাতালের ভিতর যখন করিডোর দিয়ে হাঁটছিলাম, হঠাৎ এক রুম থেকে টেলিফোনের রিং বাজার শব্দ শুনতে পেলাম। তাকিয়ে দেখি রুমের ভিতর একজন রোগী। রোগীটি আমাকে দেখেই ডাকতে লাগল- শায়খ! শায়খ!! আমি ভিতরে প্রবেশ করলাম। দেখলাম, তিনি একজন পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগী। হাত-পা কিছুই নাড়াতে পারেন না। তার পাশেই টেলিফোনটা বাজছে। তিনি আমাকে বললেন, শায়খ! দয়া করে রিসিভারটা একটু উঠিয়ে দিন! আমার সঙ্গে এক যুবক ছিল। আমি রিসিভার তুলে দেওয়ার আগেই সে তাড়াতাড়ি রিসিভারটি তুলে রোগীর কানের কাছে নিয়ে গেল। তারপর তিনি কথা বললেন। আমি লক্ষ্য করলাম, তিনি একমাত্র তার মাথাটি ছাড়া আর কিছুই নাড়াতে পারেন না। তার সমস্ত শরীর অবশ- নড়াচড়াহীন। কথা বলা শেষ হলে তিনি যুবককে রিসিভারটা স্বপ্থানে রেখে দিতে অনুরোধ করলেন। যুবক তা-ই করল। এরপর আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনার বয়স কত? তিনি বললেন, আটাত্তর বছর।
জিজ্ঞাসা করলাম, কত বছর যাবত আপনি এ অবস্থায় আছেন? প্রিয় পাঠক! তাকে দেখে আমার বড় মায়া লাগল। আল্লাহ রব্বুল আলামিনের কাছে দোয়া করি, আল্লাহ রব্বুল আলামিন তাকে সুস্থ করে দিন। বেচারার অবস্থা এমন যে, যদি একটি মাছিও এসে তার নাকে বসে, তা হলে সেওডিঙ তাড়ানোর ক্ষমতা তার নেই! খুবই করুণ অবস্থা তার। যাহোক, আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কত বছর যাবত আপনি এ অবস্থায় আছেন? তিনি বললেন, আঠারো বছর যাবত! অর্থাৎ তার বয়স যখন বিশ বছর ছিল, তখন থেকে তিনি এ অবস্থায় আছেন।
প্রিয় পাঠক! একটু ভাবুন তো! একজন মানুষ সুদীর্ঘ আঠারো বছর যাবত এ অবস্থায় আছেন!! শুধু কি তাই! আমাদের মাঝে কত জনের জীবনেই তো কত রকম আকস্মিক দুর্ঘটনা ঘটে যায়। কেউ নিজ হাতে জামা গায়ে দেন। কিন্তু আল্লাহ রব্বুল আলামিন চান যে, তার জামাটি অন্যকেউ খুলে দিক! হ্যাঁ, যিনি নিজ হাতে জামা গায়ে দিয়েছেন, জামার বোতাম লাগিয়েছেন, হঠাৎ তিনি এমন অসুস্থ হয়ে পড়েন যে, জামার বোতামগুলো অন্য কেউ খুলে দিতে হয়। তিনি আর নিজ হাতে বোতামগুলো খুলতে পারেন না; জামাটা শরীর থেকে খুলতে পারেন না।
আরেকবার এক হাসপাতালের করিডোর দিয়ে হাঁটছিলাম। দেখলাম, পাশেই একটি দরজা-বন্ধ কামরা। কামরার দরজায় এক-দুই বিঘত পরিমাণ একটি ছিদ্র রয়েছে। পুরো কামরার দেওয়াল ও মেঝেতে প্যাড লাগানো। তার ভিতর একজন রোগী আছেন। আমি বললাম, ডাক্তার সাহেব! তার এ অবস্থা কেন? কেন আপনারা তাকে এখানে বন্দি করে রেখেছেন? তিনি বললেন, লোকটি একজন পাগল। তার সমস্যা হচ্ছে- তিনি সামনে কোনো দেওয়াল দেখতে পেলেই তাতে মাথা দিয়ে আঘাত করাতে থাকেন। তাই তাকে এভাবে বন্দি করে রাখা ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নেই। আমরা তার ঘরের দেওয়াল ও মেঝে সবখানে স্পঞ্জ লাগিয়ে দিয়েছি।
আমি জিজ্ঞাসা করলাম, তার এ অবস্থা কত দিন যাবত? ডাক্তার সাহেব বললেন, বিশ কি পঁচিশ বছর। এ দীর্ঘ সময় যাবত তিনি এই একই কামরায় বন্দি। এখানেই তিনি খাওয়া-দাওয়া করেন! এই একটি কামরার ভিতরই তার জীবনের পরিধি সীমাবদ্ধ।
তারপর আমরা আরেকটি কামরার পাশ দিয়ে অতিক্রম করলাম। দেখলাম, সেখানে তিনজন লোককে চেয়ারের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ডাক্তার সাহেব! এদেরকে এভাবে বেঁধে রাখা হয়েছে কেন? ডাক্তার সাহেব বললেন, কারণ- যদি তাদের বাঁধন খুলে দিই, তা হলে তারা গিয়ে মানুষকে আক্রমণ করতে শুরু করবে। তাই তাদেরকে বেঁধে রাখা ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নেই। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে এভাবে তাদেরকে বেঁধে রাখা হয়। হাসপাতালের নার্স ও সেবকরা এসে সমন্বয়তো তাদের খাবার দিয়ে যায়। তারা নিজেদের খাবার-পানি ইত্যাদি নিজ থেকে চাইতেও সক্ষম নন। এভাবে সারাদিন তারা বাঁধা অবস্থায় থাকেন। রাত এগারোটা-বারোটার দিকে যখন ঘুমের প্রভাবে তাদের মাথা ঢুলতে থাকে, তখন তাদের বাঁধন খুলে দিয়ে খাটের উপর শুইয়ে দেওয়া হয়। তারা ঘুমিয়ে যান।
জিজ্ঞাসা করলাম, তাদের এ অবস্থা কত দিন যাবত? ডাক্তার সাহেব বললেন, একজনের তেরো বছর, আরেকজনের আট বছর, তৃতীয়জনের দশ বছর।
তারপর আমরা গেলাম আরেকটি কামরার সামনে। সেখানে দেখলাম, একজন লোককে বন্দি করে রাখা হয়েছে। তাদের একজনের বয়স পঁচিশ ছাড়িয়ে গেছে। তার সমস্ত চুল পেকে সাদা হয়ে গেছে। দেখলাম এ লোকটি সম্পূর্ণ উলঙ্গ; গায়ে একটি সুতাও নেই।
আমি যারপরনাই আশ্চর্য হলাম। সবিনয়ে বললাম, ডাক্তার সাহেব! আল্লাহ রব্বুল আলামিন-কে ভয় করুন! যদিও লোকটি পাগল, কিন্তু তাকে এভাবে বিবস্ত্র অবস্থায় রাখা আপনাদের জন্য উচিত হয়নি।
ডাক্তার সাহেব বললেন, শায়খ! আমরা যদি তাকে কোনো কাপড় পরাইও, সে তা গায়ে রাখে না। দাঁত দিয়ে কামড়াতে শুরু করে। টুকরো টুকরো করে ফেলে। অতঃপর তা দিয়ে নিজের ও অন্যদের শ্বাসরোধ করতে উদ্যত হয়। কখনও বা কাপড়ের টুকরোগুলো খেতে শুরু করে। তারপর বমি করতে থাকে। তাই তাকে এভাবে রাখা ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নেই।
আমার এক বন্ধু আমাকে বলেছিলেন। তিনি হাসপাতালের এক কামরার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ কামরা থেকে বিকট আওয়াজ ও চিৎকার শুনতে পেলেন। একজন রোগী এত জোরে চিৎকার করছে যে, কলজে ফেটে যাওয়ার উপক্রম। আমি, আমি কামরায় প্রবেশ করলাম। প্রবেশ করে দেখি, সম্পূর্ণ পক্ষাঘাতগ্রস্ত একজন রোগী বেডের উপর চিৎকার করছেন। রোগীর পাশেই ছিল হাসপাতালের সেবক। আমি তাকে রোগীর চিৎকারের কারণ জিজ্ঞাসা করলাম। সেবক বললেন, ইনি সম্পূর্ণ পক্ষাঘাতগ্রস্ত। তার শরীরের একটি অঙ্গও তিনি নাড়াতে সক্ষম নন। তার পরিপাকযন্ত্রেও সমস্যা। খাবার হজম করতে কষ্ট হয়। যেকোনো খাবার খাওয়ানোর পর তার এ অবস্থা হয়। পাকস্থলী ও হজমের কষ্টে তিনি চিৎকার করেন। বন্ধু বলেন, আমি সেবককে বললাম, আপনারা তাকে শক্ত খাবার খাওয়ানো থেকে বিরত থাকুন। গোশত, ভাত, রুটি ইত্যাদি শক্ত খাবার খাওয়াবেন না। সেবক বলল, আপনি জানেন আমরা তাকে কী খাবার খাওয়াই? আল্লাহ্র কসম! আমরা তার পেটে একমাত্র কয়েক ফোঁটা দুধ ছাড়া আর কিছুই প্রবেশ করাতে পারি না। তা-ও পাইপের সাহায্যেরে নাকের ভিতর দিয়ে। সে সামান্য দুধটুকু হজম করতেই তার এই কষ্ট!
আরেকজন ঘটনা শুনিয়েছেন। তিনি হাসপাতালে প্যারালাইসিসে আক্রান্ত এক রোগীর কামরার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। রোগী তাকে দেখে চিৎকার করে ডাকতে লাগল। তার আওয়াজ নাকে বাজছিল। সে কোনো কিছুই নিজে থেকে করতে পারত না। ঘটনার বর্ণনাকারী বলেন, আমি তার ডাক শুনে কামরায় প্রবেশ করলাম। দেখি, তার সামনে ছোট একটি কাঠের টুল। তার উপর একটি কুরআন খোলা। রোগী যতক্ষণ যাবত কুরআনের দু'টি পৃষ্ঠাই বারবার তেলাওয়াত করছিলেন। যখন এ দু'টি পৃষ্ঠা শেষ হয়ে যেত, তখন আবার শুরু থেকে পড়া শুরু করতেন। এভাবেই তেলাওয়াত করছিলেন। কারণ, কুরআনের পাতা উল্টানোর মতো শক্তিও তার ছিল না। পাশে এমন কেউও ছিল না, যে তাকে সাহায্য করবে। বর্ণনাকারী বলেন, যখন আমি তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম, তিনি আমাকে অনুরোধ করে বললেন, যদি দয়া করে পৃষ্ঠাটা একটু উলটিয়ে দিতেন! আমি পৃষ্ঠা উলটিয়ে দিলাম। সঙ্গে সঙ্গে তার চেহারা আনন্দে ঝলমল করে উঠল। সাথে সাথেই তিনি কুরআনের দিকে মনোযোগ দিলেন এবং তেলাওয়াত করতে শুরু করলেন।
বর্ণনাকারী বলেন, আমি তার সামনে দাঁড়িয়ে কেঁদে ফেললাম, কুরআন তেলাওয়াতের প্রতি তার আগ্রহ ও আমাদের উদাসীনতা দেখে; তার অক্ষমতা ভয়াবহতা ও আমাদের সুস্থতার কথা ভেবে!
এ হল অসুস্থ ও রোগীদের কিছু দৃষ্টান্ত। অতএব, হে সুস্থ সবল ও নীরোগ! ওহে বিপদশূন্য ও বালা-মসিবত থেকে নিরাপদ! তুমি আরাম-আয়েশ ও ভোগ-বিলাসিতায় ডুবে আছ; আল্লাহ রব্বুল আলামিনের আযাব, শাস্তি ও পাকড়াও থেকে গাফেল হয়ে আছ! আল্লাহ রব্বুল আলামিন তোমাকে কত নেয়ামত দিয়েছেন, তোমার সঙ্গে কত সুন্দর আচরণ করেছেন, কিন্তু তুমি তার বদলা দিচ্ছ তার অবাধ্যতা ও না-ফরমানির মাধ্যমে!
আরে- তোমার উপর তার নেয়ামত কি অজ্ঞ-অগণিত নয়? তার দয়া ও অনুগ্রহ কি অফুরন্ত নয়?
- তুমি কি এ ভয় কর না যে, আগামীকালে তোমাকে তার সামনে দাঁড়াতে হবে?
- অতঃপর তোমাকে বলবেন, হে আমার বান্দা!
- আমি কি তোমাকে পরিপূর্ণ সুস্থতা দান করিনি?
- আমি কি তোমার দেহকে সুঠাম, সুশ্রী ও সবল করিনি?
- আমি কি তোমার রিযিক প্রশস্ত করে দেইনি?
- আমি কি তোমার শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তি অক্ষুণ্ণ রাখিনি?
তখন তুমি বলবে, বলতে বাধ্য হবে, হ্যাঁ; অবশ্যই। তোমার এ জওয়াবের পর আল্লাহ আবার তোমাকে প্রশ্ন করবেন-
- তা হলে কেন আমার নেয়ামতের না-শোকরি করেছ?
- কেন আমার নেয়ামতরাজি ভোগ করে আমারই অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়েছ?
- কেন তুমি নিজেই নিজেকে আমার শাস্তি ও ক্রোধের জন্য প্রস্তুত করেছ?
সেদিন তুমি কী জওয়াব দিবে? সেদিন তোমার যাবতীয় দোষত্রুটি সকলের সামনে প্রকাশিত হয়ে পড়বে। তোমার সকল অন্যায়, অনাচার ও পাপাচার আবরণমুক্ত হয়ে যাবে। অতএব-
- আফসোস! তোমার জন্য।
- আফসোস! তোমার গুনাহের জন্য।
- তুমি কতই না হতভাগ্য!
- তুমি কতই না কপালপোড়া!
তোমার জীবনের সমীকরণ-
- সুরটীয় আরাম-আয়েশ ও আনন্দ-আহ্লাদ।
- মাঝখানে বিপদ-আপদ ও বালা-মুসিবত।
- শেষটায় অন্তহীন ধ্বংস ও লয়-নিপাত।
আরে-
- গুনাহ ছাড়া আর কীসে নূহ আ.-এর সম্প্রদায়কে পানিতে ডুবিয়েছ?
- গুনাহ ছাড়া আর কীসে কওমে আদ ও ছামুদকে ধ্বংস করেছ?
- গুনাহ ছাড়া আর কীসে লূত আ.-এর সম্প্রদায়কে পাথরবৃষ্টি ডেকে এনেছ? গুনাহ ছাড়া আর কোন জিনিসটা তাদের বাষিষ্ণু উঠোনের কারণ হয়েছে?
- গুনাহ ছাড়া আর কীসে শুআইব আ.-এর সম্প্রদায়কে তরাবিত করেছে?
- গুনাহ ছাড়া আর কোন জিনিসে আবরাহা বাদশাহ ও তার বাহিনীর উপর কংকরবৃষ্টি ডেকে এনেছে?
- গুনাহ ছাড়া আর কীসে ফিরআউন ও তার সম্প্রদায়কে দরিয়ায় ডুবিয়ে মেরেছ?
আল্লাহ ইরশাদ করেছেন-
قُلْ سِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَانظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الَّذِينَ مِن قَبْلُ كَانَ أَكْثَرُهُم مُّشْرِكِينَ
আমি প্রত্যেককে তার অপরাধের কারণে পাকড়াও করেছি। তাদের কারও প্রতি প্রেরণ করেছি প্রস্তরময় প্রচণ্ড বাতাস, কাউকে পেয়েছে বজ্রপাত, কাউকে আমি বিলীন করেছি ভূগর্ভে এবং কাউকে করেছি নিমজ্জিত। আল্লাহ তাদের প্রতি কোনো জুলুম করেননি; কিন্তু তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি জুলুম করেছে। [সূরা আনকাবুত : ৮০]
অতএব, তুমি আশ্চর্য হয়ো না, যদি তুমি-
- তোমার গুনাহের কারণে দুনিয়াতে কোনো শাস্তিতে নিপতিত হও।
- শারীরিক কোনো অসুস্থতা বা সন্তানাদিকে নিয়ে কোনো পরীক্ষার মুখোমুখি হও।
- ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত হও কিংবা রিযিকের সংকীর্ণতায় পর্যুদস্ত হও।
- কিন্তু যদি তোমার দোয়া কবুল না হয়।
- একপর এক বিপদ-আপদ ও বালা-মুসিবত, বিভিন্ন জটিলতা ও সংকট যদি তোমাকে ঘিরে নেয়।
আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন-
قُلْ سِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَانظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الَّذِينَ مِن قَبْلُ كَانَ أَكْثَرُهُم مُّشْرِكِينَ
তারা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করে না, তা হলে দেখতে পেত তাদের পূর্বসুরীদের কী পরিণাম হয়েছে? তাদের শাস্তি ও কীর্তি পৃথিবীতে এদের অপেক্ষা অধিকতর ছিল। অতঃপর আল্লাহ তাদেরকে তাদের গুনাহের কারণে পাকড়াও করেছিলেন এবং আল্লাহর শাস্তি থেকে তাদেরকে রক্ষা করার কেউ ছিল না। [সূরা মুমিন : ২১]
অতএব, দ্রুত তুমি তোমার যাবতীয় গুনাহ থেকে তাওবার দিকে ধাবিত হও। অনুতপ্ত হও সেইসব দিনের ব্যাপারে, যে দিনগুলোতে গুনাহের কালিমায় অন্ধকার করেছ আল্লাহর সাদা-সাদা পাণ্ডুলোককে। ডুবে ছিলে অন্যায়-অনাচার আর পাপাচারে। ভারী করছে পাপের বোঝা গভীর রাতের আঁধারে। কতই না দুঃসাহস দেখিয়েছ তুমি আসমান-জমিনের মালিকের বিরুদ্ধে! অতএব, আর দেরি না করে এখনই জেনে টেনো নাও অনুতাপ-অনুশোচনার চড়াছাড় ও পদস্খলনের পূর্বেই। ক্ষমা নিয়ে নাও যাবতীয় গুনাহ থেকে- সময় ফুরিয়ে যাবাবার আগেই।

আমি এক যুবককে চিনি। সে গাড়ি দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিল। ভয়াবহ দুর্ঘটনা। আল্লাহ রব্বুল আলামিনের অনুগ্রহে সে প্রাণে রক্ষা পেয়েছিল ঠিকই, কিন্তু দুর্ঘটনায় তার হাত-পা সবই হারাতে হয়েছে। তার উভয় হাত ও উভয় পা-ই কেটে ফেলতে হয়েছে।
একবার আমি এক রোগী দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিলাম। হাসপাতালের ভিতর যখন করিডোর দিয়ে হাঁটছিলাম, হঠাৎ এক রুম থেকে টেলিফোনের রিং বাজার শব্দ শুনতে পেলাম। তাকিয়ে দেখি রুমের ভিতর একজন রোগী। রোগীটি আমাকে দেখেই ডাকতে লাগল- শায়খ! শায়খ!! আমি ভিতরে প্রবেশ করলাম। দেখলাম, তিনি একজন পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগী। হাত-পা কিছুই নাড়াতে পারেন না। তার পাশেই টেলিফোনটা বাজছে। তিনি আমাকে বললেন, শায়খ! দয়া করে রিসিভারটা একটু উঠিয়ে দিন! আমার সঙ্গে এক যুবক ছিল। আমি রিসিভার তুলে দেওয়ার আগেই সে তাড়াতাড়ি রিসিভারটি তুলে রোগীর কানের কাছে নিয়ে গেল। তারপর তিনি কথা বললেন। আমি লক্ষ্য করলাম, তিনি একমাত্র তার মাথাটি ছাড়া আর কিছুই নাড়াতে পারেন না। তার সমস্ত শরীর অবশ- নড়াচড়াহীন। কথা বলা শেষ হলে তিনি যুবককে রিসিভারটা স্বপ্থানে রেখে দিতে অনুরোধ করলেন। যুবক তা-ই করল। এরপর আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনার বয়স কত? তিনি বললেন, আটাত্তর বছর।
জিজ্ঞাসা করলাম, কত বছর যাবত আপনি এ অবস্থায় আছেন? প্রিয় পাঠক! তাকে দেখে আমার বড় মায়া লাগল। আল্লাহ রব্বুল আলামিনের কাছে দোয়া করি, আল্লাহ রব্বুল আলামিন তাকে সুস্থ করে দিন। বেচারার অবস্থা এমন যে, যদি একটি মাছিও এসে তার নাকে বসে, তা হলে সেওডিঙ তাড়ানোর ক্ষমতা তার নেই! খুবই করুণ অবস্থা তার। যাহোক, আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কত বছর যাবত আপনি এ অবস্থায় আছেন? তিনি বললেন, আঠারো বছর যাবত! অর্থাৎ তার বয়স যখন বিশ বছর ছিল, তখন থেকে তিনি এ অবস্থায় আছেন।
প্রিয় পাঠক! একটু ভাবুন তো! একজন মানুষ সুদীর্ঘ আঠারো বছর যাবত এ অবস্থায় আছেন!! শুধু কি তাই! আমাদের মাঝে কত জনের জীবনেই তো কত রকম আকস্মিক দুর্ঘটনা ঘটে যায়। কেউ নিজ হাতে জামা গায়ে দেন। কিন্তু আল্লাহ রব্বুল আলামিন চান যে, তার জামাটি অন্যকেউ খুলে দিক! হ্যাঁ, যিনি নিজ হাতে জামা গায়ে দিয়েছেন, জামার বোতাম লাগিয়েছেন, হঠাৎ তিনি এমন অসুস্থ হয়ে পড়েন যে, জামার বোতামগুলো অন্য কেউ খুলে দিতে হয়। তিনি আর নিজ হাতে বোতামগুলো খুলতে পারেন না; জামাটা শরীর থেকে খুলতে পারেন না।
আরেকবার এক হাসপাতালের করিডোর দিয়ে হাঁটছিলাম। দেখলাম, পাশেই একটি দরজা-বন্ধ কামরা। কামরার দরজায় এক-দুই বিঘত পরিমাণ একটি ছিদ্র রয়েছে। পুরো কামরার দেওয়াল ও মেঝেতে প্যাড লাগানো। তার ভিতর একজন রোগী আছেন। আমি বললাম, ডাক্তার সাহেব! তার এ অবস্থা কেন? কেন আপনারা তাকে এখানে বন্দি করে রেখেছেন? তিনি বললেন, লোকটি একজন পাগল। তার সমস্যা হচ্ছে- তিনি সামনে কোনো দেওয়াল দেখতে পেলেই তাতে মাথা দিয়ে আঘাত করাতে থাকেন। তাই তাকে এভাবে বন্দি করে রাখা ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নেই। আমরা তার ঘরের দেওয়াল ও মেঝে সবখানে স্পঞ্জ লাগিয়ে দিয়েছি।
আমি জিজ্ঞাসা করলাম, তার এ অবস্থা কত দিন যাবত? ডাক্তার সাহেব বললেন, বিশ কি পঁচিশ বছর। এ দীর্ঘ সময় যাবত তিনি এই একই কামরায় বন্দি। এখানেই তিনি খাওয়া-দাওয়া করেন! এই একটি কামরার ভিতরই তার জীবনের পরিধি সীমাবদ্ধ।
তারপর আমরা আরেকটি কামরার পাশ দিয়ে অতিক্রম করলাম। দেখলাম, সেখানে তিনজন লোককে চেয়ারের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ডাক্তার সাহেব! এদেরকে এভাবে বেঁধে রাখা হয়েছে কেন? ডাক্তার সাহেব বললেন, কারণ- যদি তাদের বাঁধন খুলে দিই, তা হলে তারা গিয়ে মানুষকে আক্রমণ করতে শুরু করবে। তাই তাদেরকে বেঁধে রাখা ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নেই। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে এভাবে তাদেরকে বেঁধে রাখা হয়। হাসপাতালের নার্স ও সেবকরা এসে সমন্বয়তো তাদের খাবার দিয়ে যায়। তারা নিজেদের খাবার-পানি ইত্যাদি নিজ থেকে চাইতেও সক্ষম নন। এভাবে সারাদিন তারা বাঁধা অবস্থায় থাকেন। রাত এগারোটা-বারোটার দিকে যখন ঘুমের প্রভাবে তাদের মাথা ঢুলতে থাকে, তখন তাদের বাঁধন খুলে দিয়ে খাটের উপর শুইয়ে দেওয়া হয়। তারা ঘুমিয়ে যান।
জিজ্ঞাসা করলাম, তাদের এ অবস্থা কত দিন যাবত? ডাক্তার সাহেব বললেন, একজনের তেরো বছর, আরেকজনের আট বছর, তৃতীয়জনের দশ বছর।
তারপর আমরা গেলাম আরেকটি কামরার সামনে। সেখানে দেখলাম, একজন লোককে বন্দি করে রাখা হয়েছে। তাদের একজনের বয়স পঁচিশ ছাড়িয়ে গেছে। তার সমস্ত চুল পেকে সাদা হয়ে গেছে। দেখলাম এ লোকটি সম্পূর্ণ উলঙ্গ; গায়ে একটি সুতাও নেই।
আমি যারপরনাই আশ্চর্য হলাম। সবিনয়ে বললাম, ডাক্তার সাহেব! আল্লাহ রব্বুল আলামিন-কে ভয় করুন! যদিও লোকটি পাগল, কিন্তু তাকে এভাবে বিবস্ত্র অবস্থায় রাখা আপনাদের জন্য উচিত হয়নি।
ডাক্তার সাহেব বললেন, শায়খ! আমরা যদি তাকে কোনো কাপড় পরাইও, সে তা গায়ে রাখে না। দাঁত দিয়ে কামড়াতে শুরু করে। টুকরো টুকরো করে ফেলে। অতঃপর তা দিয়ে নিজের ও অন্যদের শ্বাসরোধ করতে উদ্যত হয়। কখনও বা কাপড়ের টুকরোগুলো খেতে শুরু করে। তারপর বমি করতে থাকে। তাই তাকে এভাবে রাখা ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নেই।
আমার এক বন্ধু আমাকে বলেছিলেন। তিনি হাসপাতালের এক কামরার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ কামরা থেকে বিকট আওয়াজ ও চিৎকার শুনতে পেলেন। একজন রোগী এত জোরে চিৎকার করছে যে, কলজে ফেটে যাওয়ার উপক্রম। আমি, আমি কামরায় প্রবেশ করলাম। প্রবেশ করে দেখি, সম্পূর্ণ পক্ষাঘাতগ্রস্ত একজন রোগী বেডের উপর চিৎকার করছেন। রোগীর পাশেই ছিল হাসপাতালের সেবক। আমি তাকে রোগীর চিৎকারের কারণ জিজ্ঞাসা করলাম। সেবক বললেন, ইনি সম্পূর্ণ পক্ষাঘাতগ্রস্ত। তার শরীরের একটি অঙ্গও তিনি নাড়াতে সক্ষম নন। তার পরিপাকযন্ত্রেও সমস্যা। খাবার হজম করতে কষ্ট হয়। যেকোনো খাবার খাওয়ানোর পর তার এ অবস্থা হয়। পাকস্থলী ও হজমের কষ্টে তিনি চিৎকার করেন। বন্ধু বলেন, আমি সেবককে বললাম, আপনারা তাকে শক্ত খাবার খাওয়ানো থেকে বিরত থাকুন। গোশত, ভাত, রুটি ইত্যাদি শক্ত খাবার খাওয়াবেন না। সেবক বলল, আপনি জানেন আমরা তাকে কী খাবার খাওয়াই? আল্লাহ্র কসম! আমরা তার পেটে একমাত্র কয়েক ফোঁটা দুধ ছাড়া আর কিছুই প্রবেশ করাতে পারি না। তা-ও পাইপের সাহায্যেরে নাকের ভিতর দিয়ে। সে সামান্য দুধটুকু হজম করতেই তার এই কষ্ট!
আরেকজন ঘটনা শুনিয়েছেন। তিনি হাসপাতালে প্যারালাইসিসে আক্রান্ত এক রোগীর কামরার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। রোগী তাকে দেখে চিৎকার করে ডাকতে লাগল। তার আওয়াজ নাকে বাজছিল। সে কোনো কিছুই নিজে থেকে করতে পারত না। ঘটনার বর্ণনাকারী বলেন, আমি তার ডাক শুনে কামরায় প্রবেশ করলাম। দেখি, তার সামনে ছোট একটি কাঠের টুল। তার উপর একটি কুরআন খোলা। রোগী যতক্ষণ যাবত কুরআনের দু'টি পৃষ্ঠাই বারবার তেলাওয়াত করছিলেন। যখন এ দু'টি পৃষ্ঠা শেষ হয়ে যেত, তখন আবার শুরু থেকে পড়া শুরু করতেন। এভাবেই তেলাওয়াত করছিলেন। কারণ, কুরআনের পাতা উল্টানোর মতো শক্তিও তার ছিল না। পাশে এমন কেউও ছিল না, যে তাকে সাহায্য করবে। বর্ণনাকারী বলেন, যখন আমি তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম, তিনি আমাকে অনুরোধ করে বললেন, যদি দয়া করে পৃষ্ঠাটা একটু উলটিয়ে দিতেন! আমি পৃষ্ঠা উলটিয়ে দিলাম। সঙ্গে সঙ্গে তার চেহারা আনন্দে ঝলমল করে উঠল। সাথে সাথেই তিনি কুরআনের দিকে মনোযোগ দিলেন এবং তেলাওয়াত করতে শুরু করলেন।
বর্ণনাকারী বলেন, আমি তার সামনে দাঁড়িয়ে কেঁদে ফেললাম, কুরআন তেলাওয়াতের প্রতি তার আগ্রহ ও আমাদের উদাসীনতা দেখে; তার অক্ষমতা ভয়াবহতা ও আমাদের সুস্থতার কথা ভেবে!
এ হল অসুস্থ ও রোগীদের কিছু দৃষ্টান্ত। অতএব, হে সুস্থ সবল ও নীরোগ! ওহে বিপদশূন্য ও বালা-মসিবত থেকে নিরাপদ! তুমি আরাম-আয়েশ ও ভোগ-বিলাসিতায় ডুবে আছ; আল্লাহ রব্বুল আলামিনের আযাব, শাস্তি ও পাকড়াও থেকে গাফেল হয়ে আছ! আল্লাহ রব্বুল আলামিন তোমাকে কত নেয়ামত দিয়েছেন, তোমার সঙ্গে কত সুন্দর আচরণ করেছেন, কিন্তু তুমি তার বদলা দিচ্ছ তার অবাধ্যতা ও না-ফরমানির মাধ্যমে!
আরে- তোমার উপর তার নেয়ামত কি অজ্ঞ-অগণিত নয়? তার দয়া ও অনুগ্রহ কি অফুরন্ত নয়?
- তুমি কি এ ভয় কর না যে, আগামীকালে তোমাকে তার সামনে দাঁড়াতে হবে?
- অতঃপর তোমাকে বলবেন, হে আমার বান্দা!
- আমি কি তোমাকে পরিপূর্ণ সুস্থতা দান করিনি?
- আমি কি তোমার দেহকে সুঠাম, সুশ্রী ও সবল করিনি?
- আমি কি তোমার রিযিক প্রশস্ত করে দেইনি?
- আমি কি তোমার শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তি অক্ষুণ্ণ রাখিনি?
তখন তুমি বলবে, বলতে বাধ্য হবে, হ্যাঁ; অবশ্যই। তোমার এ জওয়াবের পর আল্লাহ আবার তোমাকে প্রশ্ন করবেন-
- তা হলে কেন আমার নেয়ামতের না-শোকরি করেছ?
- কেন আমার নেয়ামতরাজি ভোগ করে আমারই অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়েছ?
- কেন তুমি নিজেই নিজেকে আমার শাস্তি ও ক্রোধের জন্য প্রস্তুত করেছ?
সেদিন তুমি কী জওয়াব দিবে? সেদিন তোমার যাবতীয় দোষত্রুটি সকলের সামনে প্রকাশিত হয়ে পড়বে। তোমার সকল অন্যায়, অনাচার ও পাপাচার আবরণমুক্ত হয়ে যাবে। অতএব-
- আফসোস! তোমার জন্য।
- আফসোস! তোমার গুনাহের জন্য।
- তুমি কতই না হতভাগ্য!
- তুমি কতই না কপালপোড়া!
তোমার জীবনের সমীকরণ-
- সুরটীয় আরাম-আয়েশ ও আনন্দ-আহ্লাদ।
- মাঝখানে বিপদ-আপদ ও বালা-মুসিবত।
- শেষটায় অন্তহীন ধ্বংস ও লয়-নিপাত।
আরে-
- গুনাহ ছাড়া আর কীসে নূহ আ.-এর সম্প্রদায়কে পানিতে ডুবিয়েছ?
- গুনাহ ছাড়া আর কীসে কওমে আদ ও ছামুদকে ধ্বংস করেছ?
- গুনাহ ছাড়া আর কীসে লূত আ.-এর সম্প্রদায়কে পাথরবৃষ্টি ডেকে এনেছ? গুনাহ ছাড়া আর কোন জিনিসটা তাদের বাষিষ্ণু উঠোনের কারণ হয়েছে?
- গুনাহ ছাড়া আর কীসে শুআইব আ.-এর সম্প্রদায়কে তরাবিত করেছে?
- গুনাহ ছাড়া আর কোন জিনিসে আবরাহা বাদশাহ ও তার বাহিনীর উপর কংকরবৃষ্টি ডেকে এনেছে?
- গুনাহ ছাড়া আর কীসে ফিরআউন ও তার সম্প্রদায়কে দরিয়ায় ডুবিয়ে মেরেছ?
আল্লাহ ইরশাদ করেছেন-
قُلْ سِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَانظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الَّذِينَ مِن قَبْلُ كَانَ أَكْثَرُهُم مُّشْرِكِينَ
আমি প্রত্যেককে তার অপরাধের কারণে পাকড়াও করেছি। তাদের কারও প্রতি প্রেরণ করেছি প্রস্তরময় প্রচণ্ড বাতাস, কাউকে পেয়েছে বজ্রপাত, কাউকে আমি বিলীন করেছি ভূগর্ভে এবং কাউকে করেছি নিমজ্জিত। আল্লাহ তাদের প্রতি কোনো জুলুম করেননি; কিন্তু তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি জুলুম করেছে। [সূরা আনকাবুত : ৮০]
অতএব, তুমি আশ্চর্য হয়ো না, যদি তুমি-
- তোমার গুনাহের কারণে দুনিয়াতে কোনো শাস্তিতে নিপতিত হও।
- শারীরিক কোনো অসুস্থতা বা সন্তানাদিকে নিয়ে কোনো পরীক্ষার মুখোমুখি হও।
- ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত হও কিংবা রিযিকের সংকীর্ণতায় পর্যুদস্ত হও।
- কিন্তু যদি তোমার দোয়া কবুল না হয়।
- একপর এক বিপদ-আপদ ও বালা-মুসিবত, বিভিন্ন জটিলতা ও সংকট যদি তোমাকে ঘিরে নেয়।
আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন-
قُلْ سِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَانظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الَّذِينَ مِن قَبْلُ كَانَ أَكْثَرُهُم مُّشْرِكِينَ
তারা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করে না, তা হলে দেখতে পেত তাদের পূর্বসুরীদের কী পরিণাম হয়েছে? তাদের শাস্তি ও কীর্তি পৃথিবীতে এদের অপেক্ষা অধিকতর ছিল। অতঃপর আল্লাহ তাদেরকে তাদের গুনাহের কারণে পাকড়াও করেছিলেন এবং আল্লাহর শাস্তি থেকে তাদেরকে রক্ষা করার কেউ ছিল না। [সূরা মুমিন : ২১]
অতএব, দ্রুত তুমি তোমার যাবতীয় গুনাহ থেকে তাওবার দিকে ধাবিত হও। অনুতপ্ত হও সেইসব দিনের ব্যাপারে, যে দিনগুলোতে গুনাহের কালিমায় অন্ধকার করেছ আল্লাহর সাদা-সাদা পাণ্ডুলোককে। ডুবে ছিলে অন্যায়-অনাচার আর পাপাচারে। ভারী করছে পাপের বোঝা গভীর রাতের আঁধারে। কতই না দুঃসাহস দেখিয়েছ তুমি আসমান-জমিনের মালিকের বিরুদ্ধে! অতএব, আর দেরি না করে এখনই জেনে টেনো নাও অনুতাপ-অনুশোচনার চড়াছাড় ও পদস্খলনের পূর্বেই। ক্ষমা নিয়ে নাও যাবতীয় গুনাহ থেকে- সময় ফুরিয়ে যাবাবার আগেই।

📘 তাওবাতান নাসূহা খাঁটি তাওবা > 📄 তাওবাকারীর কর্তব্য

📄 তাওবাকারীর কর্তব্য


তাওবাকারীর কর্তব্য, তাওবা করার পর বিপদ-আপদ, বালা- মসিবত, সমস্যা-সংকট, হাসি-তামাশা, ঠাট্টা-বিদ্রূপ- যা-ই আসুক, তাতে ধৈর্যধারণ করা; আল্লাহ ر-এর জন্য সবকিছু মেনে নেওয়া; সহ্য করে যাওয়া। কারণ, মানুষের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হন নবীগণ। তারপর প্রত্যেকের মর্যাদা অনুপাতে। যার মর্যাদা যত বেশি তার পরীক্ষা তত বেশি। অতএব, বান্দার উপর একবার পর এক বিপদাপদ আসতে থাকবে। অবশেষে তা তাকে এমন অবস্থায় ছেড়ে দেয় যে, সে জমিনে চলাফেরা করে অথচ তার কোনো গুনাহই থাকে না। তখন-
– সে গুনাহগারদের সংখ্যামিকে প্রতারিত হয় না।
– শাহেওয়াতপূজারীদের রঙ-তামাশা তাকে আকৃষ্ট করতে পারে না।
– সে তাদের অন্তর্ভুক্ত হয় না, শয়তান যাদেরকে পথভ্রষ্ট করে দিয়েছে।
আল্লাহ্ প পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন-
وَاِن تُطِعْ أَكْثَرَ مَن فِي الْأَرْضِ يُضِلُّوكَ عَن سَبِيلِ اللَّهِ
আর যদি আপনি পৃথিবীর অধিকাংশ লোকের কথামতো চলেন, তবে তারা আপনাকে আল্লাহ্র পথ থেকে বিপথগামী করে দেবে। [সূরা আন‘আম : ১১৬]

তাওবাকারীর কর্তব্য, তাওবা করার পর বিপদ-আপদ, বালা- মসিবত, সমস্যা-সংকট, হাসি-তামাশা, ঠাট্টা-বিদ্রূপ- যা-ই আসুক, তাতে ধৈর্যধারণ করা; আল্লাহ ر-এর জন্য সবকিছু মেনে নেওয়া; সহ্য করে যাওয়া। কারণ, মানুষের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হন নবীগণ। তারপর প্রত্যেকের মর্যাদা অনুপাতে। যার মর্যাদা যত বেশি তার পরীক্ষা তত বেশি। অতএব, বান্দার উপর একবার পর এক বিপদাপদ আসতে থাকবে। অবশেষে তা তাকে এমন অবস্থায় ছেড়ে দেয় যে, সে জমিনে চলাফেরা করে অথচ তার কোনো গুনাহই থাকে না। তখন-
– সে গুনাহগারদের সংখ্যামিকে প্রতারিত হয় না।
– শাহেওয়াতপূজারীদের রঙ-তামাশা তাকে আকৃষ্ট করতে পারে না।
– সে তাদের অন্তর্ভুক্ত হয় না, শয়তান যাদেরকে পথভ্রষ্ট করে দিয়েছে।
আল্লাহ্ প পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন-
وَاِن تُطِعْ أَكْثَرَ مَن فِي الْأَرْضِ يُضِلُّوكَ عَن سَبِيلِ اللَّهِ
আর যদি আপনি পৃথিবীর অধিকাংশ লোকের কথামতো চলেন, তবে তারা আপনাকে আল্লাহ্র পথ থেকে বিপথগামী করে দেবে। [সূরা আন‘আম : ১১৬]

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00