📄 তাঁর দয়া ও দানের শেষ নেই
আল্লাহ মহান। তাঁর দয়া অফুরান। তাঁর দয়া ও দানের কোনো সীম শেষ নেই; ক্ষমা ও মাগফিরাতের কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। তিনি তাওবা কবুলকারী। বান্দার তাওবা কবুল করেন। অনুতপ্ত বান্দাকে সামনে বরণ করেন। তিনি দয়াময়, মেহেরবান। তাঁর রহমত সর্বব্যাপী; সবকিছুকে আচ্ছন্নকারী। তাঁর দয়া ও দুয়ার নেককার-বদকার সকলের জন্য উন্মুক্ত।
বান্দা গুনাহ করে ফেলল।এর পর ফিরে এলে, তাওবা করলে আল্লাহ খুশি হন। মানুষ মাত্রই ভুলভ্রান্তি হতে পারে, বান্দা গুনাহ করতেই পারে; তবে সমস্যা হচ্ছে গুনাহকে অভ্যাসে পরিণত করে নেওয়া। অতঃপর গুনাহ করতেই থাকা। তাওবা না করা।
- আল্লাহ রহমান, রহীম।
- বান্দার প্রতি অত্যন্ত দয়ালু।
- তাঁর দয়া তাঁর ক্রোধের চেয়ে অগ্রগামী।
- তাঁর ক্ষমা তাঁর শাস্তির তুলনায় দ্রুতগামী।
- তিনি তাঁর বান্দাদের প্রতি তাদের পিতামাতার চেয়ে দয়ালু।
সহীহাইনেন বর্ণনায় এসেছে— নবীজী একবার এক যুদ্ধবন্দী নারীকে দেখিয়ে সাহাবায়ে কেরামকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা কি মনে কর এ স্ত্রীলোকটি তার সন্তানকে আগুনেন ফেলে দিতে পারবে? সাহাবায়ে কেরাম বললেন, ফেরার ক্ষমতা থাকলেও সে কখনোই ফেলবে না। নবীজী ইরশাদ করলেন—
أَ اللهُ أَرْحَمُ بِعِبَادِهِ مِنْ هَذِهِ بِوَلَدِهَا.
আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি তার চেয়েও বেশি দয়ালু। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫৯৯৪, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৭৯৯৪]
হ্যাঁ, প্রিয় পাঠক!
আমাদের আল্লাহ আমাদের প্রতি আমাদের পিতামাতার চাইতেও বেশি দয়ালু। তাঁর দয়া, অনুগ্রহ ও ক্ষমার বিশালতা লক্ষ করুন। তিনি সকলের জন্যই তাওবার দরজা খোলা রেখেছেন। কারও জন্যই বন্ধ নয়। এমনকি কাফের-মুশরিকদের জন্যও তাঁর দরজা বন্ধ নয়। যত বড় গুনাহগার ও পাপীই হোক না কেন, তাওবার দরজা তার জন্যও খোলা।
দেখুন সেই বৃদ্ধকে, যার বয়স অনেক হয়ে গেছে, বার্ধক্যে পিঠ বাঁকা হয়ে গেছে, হাড়গোড় দুর্বল হয়ে গেছে। তিনি এসেছেন নবীজীর দরবারে। নবীজী তখন সাহাবায়ে কেরামের মাঝে বসা ছিলেন। বৃদ্ধ অতি কষ্টে, পা টেনে টেনে, লাঠির উপর ভর করে এলেন। বয়সের ভারে তার ভ্রুযুগল চোখের উপর ঝুলে পড়েছিল। এগিয়ে এসে দাঁড়ালেন নবীজীর সামনে। অতঃপর বললেন –কথা বলতে তার কষ্ট হচ্ছিল— ইয়া রাসূলাল্লাহ! ওই ব্যক্তির ব্যাপারে আপনি কী বলেন, যে সব ধরনের গুনাহই করেছে! কোনো গুনাহই বাদ রাখেনি। ছোট-বড় এমন কোনো গুনাহ নেই, যা সে করেনি। তার গুনাহগুলো যদি সমস্ত জমিনবাসীর মাঝে বণ্টন করে দেওয়া হয়, তা হলে তা সকলকেই বরবাদ করে দিবে। ইয়া রাসূলাল্লাহ! এমন ব্যক্তির জন্য কি তাওবার কোনো সুযোগ আছে?
আশ্চর্যের কথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ তার দিকে চোখ তুলে তাকালনে। দেখলেন, অতিশয় বৃদ্ধ এক লোক। বয়সের ভারে পিঠ বাঁকা হয়ে গেছে। জীবনের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে।
রাসূলুল্লাহ্ তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি ইসলাম গ্রহণ করেছ?
লোকটি জবাব দিলেন, আমি এ কথার সাক্ষ্য দেই যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং আপনি আল্লাহর রাসূল।
রাসূলুল্লাহ্ বললেন, তা হলে তুমি নেক ও কল্যাণের কাজ করে যাও, গুনাহ পরিত্যাগ কর, আল্লাহ তোমার সবককে নেকী দ্বারা পরিবর্তন করে দিবেন।
বৃদ্ধ বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার যত ধোঁকাবাজি, অন্যায়-অবিচার ও পাপাচার সবই?!
নবীজী বললেন, হ্যাঁ।
এ কথা শুনে বৃদ্ধ চিৎকার করে উঠলেন— আল্লাহু আকবার... আল্লাহু আকবার... আল্লাহু আকবার...! এভাবে চিৎকার করতে করতে আড়ালে হয়ে গেলেন। [তবরাণী, মুসনাদে বাযযার]
📄 খাঁটি তাওবা আল্লাহ কবুল করেন
আইসালাম ইবনে ক্বুদামা বর্ণনা করেছেন। বনী ইসরাঈলে একবার ভীষণ দুর্ভিক্ষ ও অনাবৃষ্টি দেখা দিয়েছিল। লোকজন সকলে মিলে হযরত মূসা -র দরবারে এসে উপস্থিত হল। নিবেদন করল, হে কালীমুল্লাহ! হে আল্লাহর নবী! আমাদের জন্য আপনার রবের নিকট দুয়া করুন, তিনি যেন আমাদের দুষ্টি দান করেন- রহমতের বৃষ্টি।
মূসা তাদের সঙ্গে উঠলেন। সকলে মিলে একটি খোলা প্রান্তরে গিয়ে উপস্থিত হলেন। তাদের সংখ্যা ছিল সত্তর হাজার কিংবা তারও বেশি। মূসা আল্লাহর দরবারে দোয়া করলেন— হে আল্লাহ! আপনি আমাদের বৃষ্টি দান করুন। আমাদের উপর আপনার রহমত নাযিল করুন। আমাদের দুঃখ-কষ্টে পিঁপড়ার উপর দয়া করুন। ভূপৃষ্ঠের প্রাণীদের উপর করুণা করুন। আমাদের মধ্যে যারা বয়সের ভারে ন্যুব্জ ও কুঁজো হয়ে গেছে, তাদের উপর দয়া করুন। এমনিভাবে মূসা আল্লাহ্ -র দরবারে দোয়া করছিলেন। কিন্তু আকাশ থেকে বৃষ্টি তো বর্ষিত হচ্ছিলই না, উল্টো যতটুকু মেঘ আকাশে দেখা যাচ্ছিল তা-ও দূরে সরে যাচ্ছিল। সূর্যের উত্তাপ ও প্রখরতা আরও বৃদ্ধি পাচ্ছিল।
মূসা তেমনি দোয়া করে যাচ্ছিলেন— হে আমাদের রব! হে আমাদের প্রভু! আপনি আমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করুন। আমাদের উপর আপনার রহমত নাযিল করুন।
আল্লাহ্ মূসা -র দোয়ার জবাবে ওহী পাঠালেন, হে মূসা! কীভাবে আমি তোমাদের বৃষ্টি দান করব, অথচ তোমাদের মাঝে এমন এক লোক রয়েছে, যে বিগত চল্লিশ বৎসর যাবত নানা অন্যায় ও পাপাচার করে করে আমার না-ফরমানি করে যাচ্ছে! যেন আমার অবাধ্যতা আর বিরুদ্ধাচরণই তার কাজ?! সুতরাং, আমি কীভাবে তোমাদের বৃষ্টি দান করব? বরং তুমি সকলের মাঝে ঘোষণা করে দাও সে যেন তোমাদের মাঝ থেকে বের হয়ে যায়। তার কারণেই আমি তোমাদের বৃষ্টি বন্ধ রেখেছি।
মূসা উঁচু আওয়াজে সমবেত মানুষের মাঝে ঘোষণা করলেন— যে গুনাহগার ও পাপী বান্দা চল্লিশ বৎসর যাবত আল্লাহ্ -র অবাধ্যতা ও না-ফরমানি করে আসছ, তুমি আমাদের মধ্য থেকে বের হয়ে যাও। তোমার কারণেই আল্লাহ্ আমাদের বৃষ্টি বন্ধ করে রেখেছেন।
ঘোষণা শুনে গুনাহগার লোকটি এদিক-সেদিক তাকাল। ডানে-বামে দেখল। কিন্তু কাউকেই সে বেরিয়ে যেতে দেখল না। সে নিশ্চিত বুঝে নিল সে-ই উদ্দিষ্ট ব্যক্তি। তাকেই বেরিয়ে যেতে বলা হচ্ছে।
সে ভাবতে লাগল, আজ যদি আমি এখান থেকে বের হই, তা হলে পুরা বনী ইসরাঈলের মাঝে আমার অন্যায় ও অপরাধ প্রকাশ হয়ে পড়বে। আর যদি আমি এখানে তাদের সঙ্গে থেকে যাই, তা হলে আমার কারণেই তাদেরকে বৃষ্টি থেকে বঞ্চিত করা হবে। এমতাবস্থায় সে ভিতরে ভিতরে অনুতপ্ত হল। আক্ষেপ ও অনুশোচনায় দগ্ধ হল। চোখ থেকে অঝোর ধারায় অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। এক পর্যায়ে সে লজ্জায় ও অনুশোচনায় কাপড়ের নীচে মাথা লুকাল। মনে মনে আল্লাহর দরবারে ফয়সালাপ্রার্থনা করে বলল, হে আমার রব! হে আমার মাওলা! দীর্ঘ চল্লিশ বৎসর যাবত আমি আপনার অবাধ্যতা ও না- ফরমানি করে আসছি। এ দীর্ঘ সময় আপনি আমাকে অবকাশ দিয়েছেন। কখনও আমার অপরাধ মানুষের সামনে প্রকাশ করেননি। হে আল্লাহ! আমি আমার সারা জীবনের সমস্ত গুনাহ থেকে তাওবা করছি। আজ আমি পূর্ণ অনুতপ্ত হয়ে আপনার দরবারে হাজির হয়েছি। দয়া করে আপনি আমাকে ক্ষমা করুন। আমাকে কবুল করুন। আমাকে ফিরিয়ে দিবেন না। এভাবে সে আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করতে থাকল।
এদিকে তার কথা তখনও পূর্ণ হয়নি, এরই মধ্যে আকাশে মেঘের আনাগোনা দেখা গেল এবং ঝুরঝুর বৃষ্টি বর্ষিত হতে শুরু করল। এমনকি বৃষ্টির ফোঁটা মশকের মুখের মতো হয়ে পড়তে লাগল।
এ দেখে মূসা যারপরনাই বিস্মিত হলেন। আল্লাহ্ -র দরবারে নিবেদন করলেন, ইয়া আল্লাহ্! আপনি আমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করতে শুরু করেছেন, অথচ এখনও তো আমাদের মধ্য থেকে কেউ বের হল না!
আল্লাহ্ বললেন, মূসা! আমি যার কারণে তোমাদের উপর বৃষ্টি বন্ধ রেখেছিলাম, এখন তার কারণেই তোমাদের বৃষ্টি দিচ্ছি।
এ কথা শুনে মূসা আরও আরয করলেন, হে আল্লাহ্! আমি আপনার সেই বান্দাকে দেখতে চাই।
আল্লাহ বলেছেন, মূসা! যখন সে আমার না-ফরমানি ও অবাধ্যতা করত তখনই আমি তাকে প্রকাশ করিনি, আর আজ যখন সে আমার অনুতপ্ত হয়ে গেছে, তখন কি আমি তাকে প্রকাশ করে দিব?!!
হ্যাঁ, প্রিয় পাঠক! আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। আর কেনই বা তিনি ক্ষমা করবেন না? তিনি তো বান্দার প্রতি যারপরনাই দয়ালু ও ক্ষমাসীল। তিনি বান্দাকে ক্ষমা করতে ভালোবাসেন। বান্দার ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকেন। পবিত্র কুরআনে তিনি ইরশাদ করেছেন—
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ ﴿٥٣﴾ وَأَنِيبُوا إِلَى رَبِّكُمْ وَأَسْلِمُوا لَهُ مِنْ قَبْلِ أَنْ يَأْتِيَكُمُ الْعَذَابُ ثُمَّ لَا تُنْصَرُونَ ﴿٥٤﴾ وَاتَّبِعُوا أَحْسَنَ مَا أُنْزِلَ إِلَيْكُمْ مِنْ رَبِّكُمْ مِنْ قَبْلِ أَنْ يَأْتِيَكُمُ الْعَذَابُ بَغْتَةً وَأَنْتُمْ لَا تَشْعُرُونَ ﴿٥٥﴾ أَنْ تَقُولَ نَفْسٌ يَا حَسْرَتَا عَلَى مَا فَرَّطْتُ فِي جَنْبِ اللَّهِ وَإِنْ كُنْتُ لَمِنَ السَّاخِرِينَ ﴿٥٦﴾ أَوْ تَقُولَ لَوْ أَنَّ اللَّهَ هَدَانِي لَكُنْتُ مِنَ الْمُتَّقِينَ ﴿٥٧﴾ أَوْ تَقُولَ حِينَ تَرَى الْعَذَابَ لَوْ أَنَّ لِي كَرَّةً فَأَكُونَ مِنَ الْمُحْسِنِينَ ﴿٥٨﴾ بَلَى قَدْ جَاءَتْكَ آيَاتِي فَكَذَّبْتَ بِهَا وَاسْتَكْبَرْتَ وَكُنْتَ مِنَ الْكَافِرِينَ ﴿٥٩﴾ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ تَرَى الَّذِينَ كَذَبُوا عَلَى اللَّهِ وُجُوهُهُمْ مُسْوَدَّةٌ أَلَيْسَ فِي جَهَنَّمَ مَثْوًى لِلْمُتَكَبِّرِينَ ﴿٦٠﴾ وَيُنَجِّي اللَّهُ الَّذِينَ اتَّقَوْا بِمَفَازَتِهِمْ وَلَا يَمَسُّهُمُ السُّوءُ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ ﴿٦١﴾
বলুন, হে আমার বান্দাগণ, যারা নিজেদের উপর জুলুম করেছ তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের গুনাহ মাফ করেন। তিনি ক্ষমাসীল, পরম দয়ালু। তোমরা তোমাদের পালনকর্তার অভিমুখী হও এবং তার আজ্ঞাবহ হও, তোমাদের কাছে আযাব আসার পূর্বে। এরপর তোমরা সাহায্যপ্রাপ্ত হবে না; তোমাদের প্রতি অবতীর্ণ উত্তম বিষয়ের অনুসরণ কর, তোমাদের কাছে অতর্কিতে ও অজ্ঞাতসারে আযাব আসার পূর্বে; যাতে কেউ না বলে, হায়! হায়! আল্লাহর প্রতি আমার কর্তব্যে আমি যে অবহেলা করেছি, তার জন্য আফসোস; আর আমি তো ঠাট্টা-বিদ্রূপকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম। অথবা না বলে, আল্লাহ যদি আমাকে পথপ্রদর্শন করতেন, তবে অবশ্যই আমি পরহেযগারদের একজন হতাম। অথবা আযাব প্রত্যক্ষ করার সময় না বলে, যদি কোনোরূপে একবার ফিরে যেতে পারি, তবে আমি সৎকর্মপরায়ণ হয়ে যাব। হ্যাঁ, তোমার কাছে আমার নির্দেশ এসেছিল; অতঃপর তুমি তাকে মিথ্যা বলেছিলে, অহঙ্কার করেছিলে এবং কাফেরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গিয়েছিলে। যারা আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করে, কেয়ামতের দিন আপনি তাদের মুখ কালো দেখবেন। অহঙ্কারীদের আবাসস্থল কি জাহান্নাম নয়? আর যারা শিরক থেকে বেঁচে থাকত, আল্লাহ তাদেরেক সাফল্যের সাথে মুক্তি দিবেন, তাদেরকে অনিষ্ট স্পর্শ করবে না এবং তারা চিন্তিতও হবে না। [সূরা যুমার: ৩৬-৬১]
এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, নবীজী বলেছেন, আল্লাহ ইরশাদ করেছেন—
إِنَّ ابْنَ آدَمَ إِنَّكَ مَا دَعَوْتَنِي وَرَجَوْتَنِي غَفَرْتُ لَكَ عَلَى مَا كَانَ فِيكَ وَلَا أُبَالِي يَا ابْنَ آدَمَ لَوْ بَلَغَتْ ذُنُوبُكَ عَنَانَ السَّمَاءِ ثُمَّ اسْتَغْفَرْتَنِي غَفَرْتُ لَكَ وَلَا أُبَالِي يَا ابْنَ آدَمَ إِنَّكَ لَوْ أَتَيْتَنِي بِقِرَابِ الأَرْضِ خَطَايَا ثُمَّ لَقِيتَنِي لَا تُشْرِكُ بِي شَيْئًا لَأَتَيْتُكَ بِقِرَابِهَا مَغْفِرَةً
হে আদম সন্তান! যতক্ষণ তুমি আমাকে ডাকতে থাকবে এবং আমার কাছে ক্ষমা পাওয়ার] আশা করতে থাকবে, তোমার গুনাহ যত অধিক হোক আমি তোমাকে ক্ষমা করব। এতে আমি কোনো পরোয়া করব না। হে আদম সন্তান! তোমার গুনাহ যদি আসমানের কিনারা পর্যন্তও পৌঁছে যায়, তারপর তুমি আমার কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা কর, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিব। এতে আমি কোনো পরোয়া করব না। হে আদম সন্তান! তুমি যদি পুরো পৃথিবী পরিমাণ গুনাহ নিয়েও আমার কাছে আস এবং আমার সঙ্গে কাউকে শরিক না কর আমার সাথে সাক্ষাৎ কর, তা হলে আমিও তোমার কাছে পুরো পৃথিবী-পরিমাণ ক্ষমা নিয়ে হাজির হব। [সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ৩৫৫০]
হাঁ, আল্লাহ পৃথিবী-পরিমাণ ক্ষমা নিয়ে হাজির হবেন। আল্লাহ -র রহমতের শান দেখুন। তিনি বান্দাকে গুনাহে লিপ্ত দেখেন, অবাধ্যতা ও না-ফরমানি করতে দেখেন, কিন্তু এর প্রতিকার আযাব ও পাকড়াও দিয়ে করেন না। বরং বান্দাকে কিছু রোগ-শোক, বিপদ-আপদ, বালা-মসিবত ইত্যাদি দিয়ে পরীক্ষায় ফেলেন। যেন বান্দা ফিরে আসে; না-ফরমানি ছেড়ে আনুগত্য করে; আসমানের দুয়ারে কড়া নাড়ে; আল্লাহমুখী হয়ে দোয়া-মুনাজাত ও বিপদমুক্তির প্রার্থনা করে। হাঁ, বান্দা যখন আল্লাহ-র দরবারে ফিরে আসে, আল্লাহ-কে ভয় করে, পরিপূর্ণরূপে আল্লাহমুখী হয়, আল্লাহর রহমত তখন বান্দার নিকটবর্তী হয়, বান্দার উপর অফুরন্ত করুণা বর্ষিত হয়। বান্দার দোয়া আল্লাহ কবুল করেন; তার বিপদ-আপদ ও বালা-মসিবত দূর করে দেন। এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, নবী কারীম ইরশাদ করেছেন—
مَنْ سَرَّهُ أَنْ يَسْتَجِيبَ اللَّهُ لَهُ عِنْدَ الشَّدَائِدِ وَالْكُرَبِ فَلْيُكْثِرِ الدُّعَاءَ فِي الرَّخَاءِ.
যে ব্যক্তি বিপদাপদ ও সংকটের সময় আল্লাহর তা'আলার অনুগ্রহ লাভ করতে চায়, সে যেন সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের সময় বেশি পরিমাণে দোয়া করে। [সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ৩৫৮২]
📄 এক যুবকের ঘটনা
তার সাথে আমার পরিচয় ইউনিভার্সিটি-তে। আমি তার কথা কখনও ভুলতে পারব না। সে ছিল একজন এক যুবক। আমার দেখা মানুষের মধ্যে সুঠাম চেহারার অধিকারী, সুঠام সুশ্রী ও অসাধারণ এক যুবক। তার যৌবন ও স্ফূর্ততা যেন দেহ ফেটে বাইরে পড়ত।
তবে ইউনিভার্সিটি থেকে বের হওয়ার পর সে-ও অন্যান্যের মতো হারিয়ে গিয়েছিলো। দু'জনের মাঝে আর কোনো সম্পর্ক বা যোগাযোগ ছিল না। হঠাৎ একদিন সে আমাকে ফোন করে তাকে দেখতে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করল। বলল, ইচ্ছা সত্ত্বেও আমি গিয়ে আপনার সঙ্গে দেখা করতে পারছি না। কেন পারছি না তা জিজ্ঞাসা করবেন না। তবে আমাদের বাসায় এলেই বুঝতে পারবেন আমার অপারগতা কোথায়। কথাগুলো সে বলছিল অত্যন্ত বিষণ্ণ কণ্ঠে। অতঃপর সে আমাকে তাদের বাসার ঠিকানা ও যাওয়ার পথ বলে দিল।
একদিন আমি তাদের বাসায় গেলাম। দরজায় নক করলাম। তার এক ছোট ভাই দরজা খুললে আমাকে তার কামরায় নিয়ে গেল। তার কামরায় গিয়ে আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলাম না। সে একটি সাদা খাটের উপর শুয়ে আছে। পাশেই রয়েছে তার চলাচলে সাহায্যকারী বিভিন্ন সরঞ্জামাদি ও নানা ধরনের ঔষধপত্র। তার শরীরটা একেবারে তজ্বর অবস্থায় খাটের উপর পড়ে আছে। আমাকে দেখে সে সালাম করার জন্য উঠতে চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। আমি তার মাথার পাশে গিয়ে বসলাম। কিছুতেই অশ্রু সংবরণ করতে পারছিলাম না। বললাম, আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। আমাকে ক্ষমা করো। ইতিপূর্বে আমি তোমার অসুস্থতা সম্পর্কে জানতাম না। কিন্তু তোমার এ অবস্থা হল কীভাবে? কী হয়েছে তোমার? তুমি তো আমাদের সাথে একই সময়ে ভার্সিটি থেকে বের হয়েছ। তুমি না আমাকে বলতে- অচিরেই তুমি বিয়ে করবে, বাড়ি বানাবে, গাড়ি কিনবে।
সে বলল, হ্যাঁ ভাই! তবে হঠাৎ আমার জীবনে এমন ঘটনা ঘটে গেল, যা আমার কল্পনাতেও কোনোদিন আসেনি। এই তো কিছুদিন পূর্বে ভার্সিটি থেকে ডিগ্রি নিয়ে বের হলাম। কিছুদিনের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত একটি চাকরিও পেয়ে গেলাম। দিনগুলো বেশ ভালোই কাটছিল। সুখের সেই দিনগুলোতে আমার কোনো কষ্টই ছিল না। শুধু মাঝে মধ্যে একটু মাথা ব্যথা করত। প্রথম প্রথম ব্যথাটা হালকা ছিল। বেশি ভোগাতো না। ধীরে ধীরে তা বাড়তে লাগল। কিছুদিন পর মুক্ত হল দুশ্চিন্তার দুর্বলতা। হঠাৎ একদিন মাথা ব্যথা প্রচণ্ড আকার ধারণ করল। অনন্যোপায় হয়ে হাসপাতালে গেলাম। ডাক্তার দেখে বেশ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে দিলেন। মাথার সুস্থ এক্স-রে করালেন। এক্স-রে রিপোর্ট বের হওয়ার পর ডাক্তার তা বারবার উল্টোপাল্টে দেখতে লাগলেন। বিড়বিড় করে বলতে থাকলেন- না হালকাও নয় তা চূড়ান্ততা ইলাহ বিলাস! কিছুক্ষণ পর তিনি টেলিফোনের রিসিভার উঠিয়ে কারও সঙ্গে কথা বললেন এবং বড় বড় ডাক্তারদের একটি বোর্ড আহ্বান করলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে ডাক্তারগণ এসে উপস্থিত হলেন। বোর্ডের সকল ডাক্তার মিলে আমার রিপোর্টগুলো বিশ্লেষণ করতে লাগলেন। তারা সবাই তখন ইংরেজিতে কথা বলছিলেন। ফাঁকে ফাঁকে আড়চোখে আমার দিকে তাকাচ্ছিলেন। এভাবে প্রায় এক ঘণ্টা কেটে গেল। এ দীর্ঘ সময়ে আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না। মনে মনে ভাবছিলাম, সমস্যা হয়তো তেমন বড় কিছু নয়। দু'-এক ডোজ ঔষধে মাথা ব্যথা আর দু'-এক ফোঁটা ঔষধে চোখের সমস্যা ভালো হয়ে যাবে। এরপর সবকিছু ঠিকঠাক ও আগের মতো হয়ে যাবে। আমি যখন এমন ভাবছিলাম, ঠিক তখন একজন ডাক্তার হঠাৎ আমার দিকে তাকালেন এবং আমাকে স্তম্ভিত করে দিয়ে বলে যেতে লাগলেন— 'শোনো হে অমুক! তোমার ডাক্তারি পরীক্ষা-নিরীক্ষা বলছে তোমার মাথায় টিউমার হয়েছে। যা আকার ও আয়তন একটু বেড়ে চলেছে এবং তা বিপজ্জনক অবস্থায় পৌঁছে গেছে। ছোট ভিতর থেকে তোমার চোখের রগের উপর চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে তোমার দৃষ্টিতে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। টিউমারের স্ফীতি যেকোনো সময় আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। ফলে তোমার চোখের রগগুলো ফেটে যাবে এবং তুমি অন্য হয়ে যাবে। অতঃপর তোমার মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে রক্তক্ষরণ দেখা দিবে এবং তুমি মারা যাবে।'
ডাক্তারের কথাগুলো বজ্রের ন্যায় আমার কানে বাজল। আমি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। আমি বিকট আওয়াজে চিৎকার করে উঠলাম।
ডাক্তার বললেন, এটাই সত্য। তোমার রিপোর্টগুলো ডা-ই বলছে। তোমার মাথায় টিউমার হয়েছে এবং খুব দ্রুতই তার চিকিৎসা করতে হবে। অন্যথায় যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। রাতেরই আমরা তোমাকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দিয়ে চাই। অতঃপর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আগামীকাল তোমার মাথায় এক্সরেপচার করতে চাই। তোমার মাথার খুলি খুলে সেখান থেকে টিউমার অপসারণ করতে হবে। এক্সরেপচার সম্পন্ন হওয়ার পর পুনরায় মাথার খুলি যথাস্থানে প্রতিস্থাপন করে দেওয়া হবে। এ বলে ডাক্তার আমার সামনে একটি কাগজ [অপারেশনের সম্মতিপত্র] বাড়িয়ে দিলেন এবং তাতে স্বাক্ষর করতে বললেন।
সংবাদের আকস্মিকতায় আমি একেবারেই হতবুদ্ধি ছিলাম। স্থির করতে পারছিলাম না এখন আমার কী করণীয়। কিছুক্ষণ ভেবে আমি স্বাক্ষর না করে সেখান থেকে বেরিয়ে এলাম। কোনোভাবে অসুস্থ সবরণ করতে পারছিলাম না। ভাবতে লাগলাম, এখন আমার করণীয় কী! আমি কি বাসায় চলে যাব না অনকোনো হাসপাতালে যাব! দ্রুত ভাবনা-চিন্তা শেষ করে সিদ্ধান্ত নিলাম অন্য হাসপাতালে যাব।
সেখানেও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ডাক্তার সে সংবাদই দিলেন, যা দিয়েছিলেন আগের ডাক্তারগণ। এ ডাক্তারও দ্রুত অপারেশন করে ফেলার পরামর্শ দিলেন।
ততক্ষণে আমার মন কিছুটা শক্ত হয়ে এসেছে। ফোনে আবার সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। সংবাদ পেয়ে তৎক্ষণাৎ তিনি হাসপাতালে চলে এলেন। আমার পিতা একজন বুধ মানুষ। বয়স সত্তুর ছাড়িয়ে গেছে। হাসপাতালে এসে তিনি আমার নির্বাক ও ফ্যাকাশে চেহারার দেখে যাবড়ে গেলেন। আমি কিছুটা শক্ত হয়ে বললাম, আব্বাজান! আপনি তো জানেন, ইতিপূর্বে আমি প্রায়ই আমার মাথা ব্যাথার অভিযোগ করতাম। এখন আমার ডাক্তারি পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও রিপোর্ট বলছে— আমার মাথায় টিউমার হয়েছে এবং খুব দ্রুতই তা অপারেশন করে অপসারণ করতে হবে।
আমার কথা শুনে তিনি চিৎকার করে উঠলেন— লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ! এর পরই তিনি মাটিতে বসে পড়লেন। বারবার বলতে লাগলেন— ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
কিছুক্ষণ পর শান্ত হয়ে তিনি বললেন, বাবা! তুমি ঘাবড়িও না। আমি তোমাকে ও আমেরিকাতে তোমার ভাইকে কাছে পাঠিয়ে দিব। সেখানে তুমি চিকিৎসা নিবে এবং এক সময় সুস্থ হয়ে উঠবে ইনশাআল্লাহ।
কথাগুলো তিনি বলছিলেন আর হয়তো আমার বড় ভাইকে নিয়ে যে কষ্ট-ক্লেশ ভোগ করছেন তা স্মরণ করছিলেন। আমার বড় ভাই দীর্ঘ এক বছর যাবৎ আমেরিকাতে ক্যান্সারের চিকিৎসা নিচ্ছেন। আমি আমার পিতাকে কতদিন দেখিছি ভাইয়ের সাথে কোনো কথা বলছেন আর কাঁদছেন। কতদিন দেখেছি শেষ রাতে মুসল্লাতে বসে ভাইয়ের জন্য দোয়া করছেন।
আমি আমার পিতার দিকে তাকালাম। বুকের কষ্টগুলো অশ্রু হয়ে দু' গাল বেয়ে বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। তিনি দেখছেন— তার সন্তানরা একে একে তার চোখের সামনেই মারা যাচ্ছে। আমার ভাই খালেদ, গত দু' বছর আগে গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা গেছে। বড় ভাই ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে আমেরিকাতে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন। আর আমি এমন এক পথে রওয়ানা হয়েছি, যার শেষ গন্তব্য কোথায় জানা নেই।
এক সময় আমাকেও আমেরিকাতে পাঠানো হলো। আমি আমেরিকা গেলাম। উভয় এক হাসপাতালে ভর্তি হলাম। তারা দ্রুততম সময়ে আমার যাবতীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করলেন এবং পরদিন সকালেই অপারেশনে থিয়েটারে নিয়ে গেলেন। আমার মাথার সমস্ত চুল কামিয়ে ফেললেন। দেহ অবশ্য করা হলো। অতঃপর চারও দিক থেকে বৃত্তাকারে কেটে মাথার খুলির উপরের অংশ সম্পূর্ণ আলাদা করে ফেললেন। তারপর যথানিয়মে এক্সরেপচার করে সেখান থেকে টিউমার অপসারণ করলেন।
এভাবে প্রায় তিন ঘন্টা কেটে গেল। এ দীর্ঘ সময় যাবত অপারেশন চলছিল এবং তা ভালোভাবেই চলছিল। হঠাৎ আমার মস্তিষ্কের শিরায় রক্তও বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে এবং এক পর্যায়ে তা বিভিন্ন শিরা-উপশিরায় আটকে যায়। ফলে মস্তিষ্কে প্রচন্ড রক্তচাপ সৃষ্টি হয়। এতে ডাক্তারগণ কিছুটা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। এর সমাধান করতে গিয়ে দ্রুতবশত মস্তিষ্কের কিছু অংশে নাড়া লেগে যায়। এতে করে আমার শরীরের একাংশ অবশ হয়ে যায়।
ডাক্তারগণ বিষয়টি বুঝাতে পেরে দ্রুত অপারেশনের বাকি কাজগুলো সম্পন্ন করেন। মাথার খুলি আপন স্থানে বসিয়ে তার উপর চামড়া দিয়ে ঢেকে দেন। অতঃপর সেল্লাই করে অপারেশন থিয়েটার থেকে বের করে আমাকে নিয়ে যান নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে।
অপারেশন সম্পন্ন হওয়ার পর পূর্ণ পাঁচ ঘণ্টা আমি অচেতন অবস্থায় ছিলাম। এরপর হঠাৎ আমার বাম পার্শে খিঁচুনি দেখা দেয়। ডাক্তারগণ আবার আমাকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যান এবং এক্সরেপচারের মাধ্যমে তার সমাধান করেন। অতঃপর আবার আমাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে নিয়ে আসেন।
এরপর প্রায় চার ঘণ্টা আমার অবস্থা স্থিতিশীল থাকে। তারপর দেখা দেয় আরেক বিপদ— শ্বাসপ্রশ্বাসে রক্তক্ষরণ। ডাক্তারগণ আবারও আমাকে দ্রুত অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যান এবং আমার বক্ষ বিদীর্ণ করে রক্তক্ষরণের সমাধান করেন। অতঃপর আবার আমাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে নিয়ে আসেন।
আমার চিকিৎসার ব্যাপারে ডাক্তারগণ হতবুদ্ধি হয়ে যান। একের পর এক রোগের আক্রমণ। ক্ষণে ক্ষণে অবস্থার পরিবর্তন। হঠাৎ এমন সমস্যার সূত্রপাত, যার সমাধান খুবই কষ্টকর। এ যেন রোগের শেষ নেই, বিপদের সমাপ্তি নেই।
এরপর প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা আমার অবস্থা স্থিতিশীল থাকে। ডাক্তারগণ আমার মধ্যে কিছুটা সুস্থতা ও স্ফূর্তি অনুভব করেন। এরই মধ্যে হঠাৎ শরীরের তাপমাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যেতে লাগল। ডাক্তারগণ দ্রুত প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করালেন। রিপোর্ট এল— খুলির যে অংশের নীচ থেকে টিউমার অপসারণ করা হয়েছে, তাতে প্রচন্ড ব্যাথা হচ্ছে। অপরধাণ অবনতি দেখে ডাক্তার আবার অপারেশনে টিম আহ্বান করলেন। তারা সকলে মিলে আমাকে জানাযার মতো বহন করে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে গেলেন। তখন আমার ইশ ছিল।
আমি উপরের দিকে দুটি তুলে তাকালাম, কাঁদলাম এবং কায়মনোবাক্যে অনুনয়-বিনয় করে বারবার বলতে লাগলাম— হে আল্লাহ! হে আমার রব! হে আমার মেহেরবান মাওলা! আমি অক্ষম, অসহায়। আমি বিপদগ্রস্ত। আপনি সকল দয়াময়ের শ্রেষ্ঠ দয়াময়। হে আল্লাহ! এ যদি আমার উপর আপনার পক্ষ থেকে শাস্তি হয়ে থাকে, তা হলে আমি আপনার দয়া ও ক্ষমা প্রার্থনা করছি! আর যদি এ আমার জন্য আপনার পক্ষ থেকে পরীক্ষা হয়ে থাকে, তা হলে আমি আপনার সাহায্য প্রার্থনা করছি! আপনি আমাকে ধৈর্য ধারণ করার তাওফিক দান করুন; এর বিনিময়ে আমার পুণ্য ও প্রতিদান বহুগুণ বৃদ্ধি করে দিন।
এরপর আমি মৃত্যুর কথা স্মরণ করলাম। আল্লাহর কসম!—
— আমার বিষাদ সীমা ছাড়িয়ে গেছে।
— আমার সমস্ত শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেছে।
— হয়তো আগামীকালই মাটি আমার বিছানা হবে।
— আমার নিঃশ্বাস ফুরিয়ে এসেছে।
— আমার দেহ পোকা-মাকড়াও খাওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে।
— সেদিন আমার কী অবস্থা হবে—
— যেদিন পা পিছলে যাবে।
— মানুষ কান্নাকাটি করবে। আফসোস অনুশোচনা ও অনুতাপ দীর্ঘায়িত হবে।
— সেদিন আমার কী অবস্থা হবে—
— যেদিন সেই সভার সামনে দাঁড়াব, যিনি আমি ছোট-বড় সব কিছুর পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব নিবেন।
— যেদিন অপরাধীদের পা পিছলে যাবে।
— যেদিন আহাজারি ও হা-হুতাশ সীমা ছাড়িয়ে যাবে।
— যেদিন দুনিয়ার যাবতীয় আরাম-আয়েশ, সুখ-শান্তি ও স্বাদ-উপভোগ সুরের মতো শেষ হয়ে যাবে।
— সেদিন আমার কী অবস্থা হবে!
এরপর আমি কাঁদলাম। অনেক কাঁদলাম এবং খুব করে বেঁচে থাকার কামনা করলাম। তবে দুনিয়ার ভোগ-বিলাস ও আরাম-আয়েশের জন্য নয়। বরং আমার মাওলার সঙ্গে আমার সম্পর্ক সংশোধন ও স্থায়ী করার জন্য।
হঠাৎ ডাক্তার এলেন এবং আমাকে সম্পূর্ণরূপে অবশ করার আদেশ দিলেন। অবশ করার পর চামড়া খুলে পুরো খুলিটা আলাদা করে ফেললেন। অতঃপর খুলি ছাড়াই চামড়া দিয়ে মাথা ঢেকে সেলাই করে দিলেন।
যখন আমি জ্ঞান ফিরে পেলাম, লক্ষ করলাম আমার মাথা নরম। তা হলে এর ঘ্রাণ কোথায়। আমি ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করলাম, আমার মাথার বাকি অংশ কোথায়।
ডাক্তার ধীর ও শান্ত গলায় বললেন, তোমার মাথার খুলি আমাদের কাছে রেখে দিইছি– জীবাণুমুক্ত করার জন্য। ছয় মাস পর পুনরায় তুমি আমাদের কাছে এসো। তোমার মাথার খুলি যথাস্থানে লাগিয়ে দিব।
– যে দিন পা পিছলে যাবে।
– মানুষ কান্নাকাটি করবে। আফসোস অনুশোচনা ও অনুতাপ দীর্ঘায়িত হবে।
– যে দিন আমার কী অবস্থা হবে–
– যে দিন সেই সওয়াবের সামনে দাঁড়াব, যিনি আমার ছোট-বড় সব কিছুর পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব নিবেন।
– যে দিন অপরাধীদের পা পিছলে যাবে।
– যে দিন আত্মজার্তি ও সু-সুযোগ সীমা ছাড়িয়ে যাবে।
– যে দিন দুনিয়ার যাবতীয় আরাম-আয়েশ, সুখ-শান্তি ও সাদ-উপভোগ সুদূরে মতো শেষ হয়ে যাবে।
– সে দিন আমার কী অবস্থা হবে!
এরপর আমি কাঁদলাম। অনেক কাঁদলাম এবং খুব করে বেঁচে থাকার কামনা করলাম। তবে দুনিয়ার ভোগ-বিলাস ও আরাম-আয়েশের জন্য নয়। বরং আমার মাওলার সঙ্গে আমার সম্পর্ক সংশোধন ও স্থায়ী করার জন্য।
হঠাৎ ডাক্তার এলেন এবং আমাকে সম্পূর্ণরূপে অবশ্য করার আদেশ দিলেন। অবশ্য করার পর চামড়া খুলে পুরো শরীরটা আলাদা করে ফেললেন। অতঃপর খুলি ছাড়াই চামড়া দিয়ে মাথা ঢেকে সেলাই করে দিলেন।
যখন আমি জ্ঞান ফিরে পেলাম, লক্ষ্য করলাম আমার মাথা নরম। তা হলে এর হাড় কোথায়। আমি ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করলাম, আমার মাথার বাকি অংশ কোথায়।
ডাক্তার খুব ধীর ও শান্ত গলায় বললেন, তোমার মাথার খুলি আমাদের কাছে রেখে দিয়েছি- জীবাণুমুক্ত করার জন্য। ছয় মাস পর পুনরায় তুমি আমাদের কাছে এসো। তোমার মাথার খুলি যথাস্থানে লাগিয়ে দিব।
এরপর আমেরিকাতে আমি এক মাস ছিলাম। তারপর রিয়াদে চলে এসেছি। এখন ছয় মাসের বাকি সময়টুকু শেষ হওয়ার অপেক্ষা করছি।
– আমি আমার জীবনের স্থুল মাফসাদ্ থেকে উদাসীন ছিলাম।
– গাফলতের ঘুমে বিভোর ছিলাম।
– দুনিয়ার আরাম-আয়েশ ও ভোগ-বিলাসিতায় মগ্ন ছিলাম।
– বিপদ-আপদ, পরীক্ষা ও মৃত্যুর কথা ভুলে গিয়েছিলাম।
– দুনিয়াবী জীবন নিয়েই সন্তুষ্ট ছিলাম।
– দুনিয়াবী জীবন নিয়েই পড়ে ছিলাম।
– এখন আমি নতুনভাবে জন্মগ্রহণ করলাম।
প্রিয় পাঠক!
এরপর বেশ কিছুদিন অতিবাহিত হয়ে গেছে। ওই যুবক পক্ষাবলম্বনমুক্ত থেকে মুক্তি লাভ করেছে। এখন সে নিজে নিজে চলাফেরা করতে পারে।
– সাত মাস পর... আমি আমার তাকে দেখতে গেলাম। তখন দেখলাম, তার চেহারা হাস্যোজ্জ্বল, প্রফুল্ল ও প্রাণবন্ত। হাসিমাখা মুখে সে আমার দিকে একটি কার্ড বাড়িয়ে দিল। হাতে নিয়ে দেখি বিয়ের কার্ড। আমাকে তার বিয়ের দাওয়াত দিচ্ছে!
আমি যতটুকু জানি–
– এখন সে কল্যাণের কাজে অন্যদের চেয়ে অনেক অগ্রগামী।
– অত্যন্ত আগ্রহী ও উদ্যমী।
– অন্যকে নেক ও কল্যাণের কাজে উৎসাহ দানকারী।
এখন সে–
– মানুষকে আল্লাহ্ -এর দিকে ডাকে।
– দ্বীনের পথে আহবান করে।
– বিভিন্ন কিতাবাদি রচনা ও তা মানুষের মাঝে বিতরণ করে।
– অক্ষম-অসহায় ও অনাথ-দুঃখীদের সাহায্য-সহযোগিতা করে।
– অসহায়-দরিদ্রদের পাশে থাকে। সাহায্য-সহযোগিতা করে।
– ইত্যাকার আরও বহু কল্যাণকর ও নেক কাজে সর্বদা লিপ্ত থাকে।
প্রিয় পাঠক!
মনে রাখবেন, জীবনের মোড়ে মোড়ে, নানা দুঃখ-দুর্দশা ও কষ্টের বাঁকে বাঁকে বহু দান-অনুদান ও উপহার লুকায়িত থাকে。
তার সাথে আমার পরিচয় ইউনিভার্সিটি-তে। আমি তার কথা কখনও ভুলতে পারব না। সে ছিল একজন এক যুবক। আমার দেখা মানুষের মধ্যে সুঠাম চেহারার অধিকারী, সুঠام সুশ্রী ও অসাধারণ এক যুবক। তার যৌবন ও স্ফূর্ততা যেন দেহ ফেটে বাইরে পড়ত।
তবে ইউনিভার্সিটি থেকে বের হওয়ার পর সে-ও অন্যান্যের মতো হারিয়ে গিয়েছিলো। দু'জনের মাঝে আর কোনো সম্পর্ক বা যোগাযোগ ছিল না। হঠাৎ একদিন সে আমাকে ফোন করে তাকে দেখতে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করল। বলল, ইচ্ছা সত্ত্বেও আমি গিয়ে আপনার সঙ্গে দেখা করতে পারছি না। কেন পারছি না তা জিজ্ঞাসা করবেন না। তবে আমাদের বাসায় এলেই বুঝতে পারবেন আমার অপারগতা কোথায়। কথাগুলো সে বলছিল অত্যন্ত বিষণ্ণ কণ্ঠে। অতঃপর সে আমাকে তাদের বাসার ঠিকানা ও যাওয়ার পথ বলে দিল।
একদিন আমি তাদের বাসায় গেলাম। দরজায় নক করলাম। তার এক ছোট ভাই দরজা খুললে আমাকে তার কামরায় নিয়ে গেল। তার কামরায় গিয়ে আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলাম না। সে একটি সাদা খাটের উপর শুয়ে আছে। পাশেই রয়েছে তার চলাচলে সাহায্যকারী বিভিন্ন সরঞ্জামাদি ও নানা ধরনের ঔষধপত্র। তার শরীরটা একেবারে তজ্বর অবস্থায় খাটের উপর পড়ে আছে। আমাকে দেখে সে সালাম করার জন্য উঠতে চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। আমি তার মাথার পাশে গিয়ে বসলাম। কিছুতেই অশ্রু সংবরণ করতে পারছিলাম না। বললাম, আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। আমাকে ক্ষমা করো। ইতিপূর্বে আমি তোমার অসুস্থতা সম্পর্কে জানতাম না। কিন্তু তোমার এ অবস্থা হল কীভাবে? কী হয়েছে তোমার? তুমি তো আমাদের সাথে একই সময়ে ভার্সিটি থেকে বের হয়েছ। তুমি না আমাকে বলতে- অচিরেই তুমি বিয়ে করবে, বাড়ি বানাবে, গাড়ি কিনবে।
সে বলল, হ্যাঁ ভাই! তবে হঠাৎ আমার জীবনে এমন ঘটনা ঘটে গেল, যা আমার কল্পনাতেও কোনোদিন আসেনি। এই তো কিছুদিন পূর্বে ভার্সিটি থেকে ডিগ্রি নিয়ে বের হলাম। কিছুদিনের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত একটি চাকরিও পেয়ে গেলাম। দিনগুলো বেশ ভালোই কাটছিল। সুখের সেই দিনগুলোতে আমার কোনো কষ্টই ছিল না। শুধু মাঝে মধ্যে একটু মাথা ব্যথা করত। প্রথম প্রথম ব্যথাটা হালকা ছিল। বেশি ভোগাতো না। ধীরে ধীরে তা বাড়তে লাগল। কিছুদিন পর মুক্ত হল দুশ্চিন্তার দুর্বলতা। হঠাৎ একদিন মাথা ব্যথা প্রচণ্ড আকার ধারণ করল। অনন্যোপায় হয়ে হাসপাতালে গেলাম। ডাক্তার দেখে বেশ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে দিলেন। মাথার সুস্থ এক্স-রে করালেন। এক্স-রে রিপোর্ট বের হওয়ার পর ডাক্তার তা বারবার উল্টোপাল্টে দেখতে লাগলেন। বিড়বিড় করে বলতে থাকলেন- না হালকাও নয় তা চূড়ান্ততা ইলাহ বিলাস! কিছুক্ষণ পর তিনি টেলিফোনের রিসিভার উঠিয়ে কারও সঙ্গে কথা বললেন এবং বড় বড় ডাক্তারদের একটি বোর্ড আহ্বান করলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে ডাক্তারগণ এসে উপস্থিত হলেন। বোর্ডের সকল ডাক্তার মিলে আমার রিপোর্টগুলো বিশ্লেষণ করতে লাগলেন। তারা সবাই তখন ইংরেজিতে কথা বলছিলেন। ফাঁকে ফাঁকে আড়চোখে আমার দিকে তাকাচ্ছিলেন। এভাবে প্রায় এক ঘণ্টা কেটে গেল। এ দীর্ঘ সময়ে আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না। মনে মনে ভাবছিলাম, সমস্যা হয়তো তেমন বড় কিছু নয়। দু'-এক ডোজ ঔষধে মাথা ব্যথা আর দু'-এক ফোঁটা ঔষধে চোখের সমস্যা ভালো হয়ে যাবে। এরপর সবকিছু ঠিকঠাক ও আগের মতো হয়ে যাবে। আমি যখন এমন ভাবছিলাম, ঠিক তখন একজন ডাক্তার হঠাৎ আমার দিকে তাকালেন এবং আমাকে স্তম্ভিত করে দিয়ে বলে যেতে লাগলেন— 'শোনো হে অমুক! তোমার ডাক্তারি পরীক্ষা-নিরীক্ষা বলছে তোমার মাথায় টিউমার হয়েছে। যা আকার ও আয়তন একটু বেড়ে চলেছে এবং তা বিপজ্জনক অবস্থায় পৌঁছে গেছে। ছোট ভিতর থেকে তোমার চোখের রগের উপর চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে তোমার দৃষ্টিতে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। টিউমারের স্ফীতি যেকোনো সময় আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। ফলে তোমার চোখের রগগুলো ফেটে যাবে এবং তুমি অন্য হয়ে যাবে। অতঃপর তোমার মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে রক্তক্ষরণ দেখা দিবে এবং তুমি মারা যাবে।'
ডাক্তারের কথাগুলো বজ্রের ন্যায় আমার কানে বাজল। আমি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। আমি বিকট আওয়াজে চিৎকার করে উঠলাম।
ডাক্তার বললেন, এটাই সত্য। তোমার রিপোর্টগুলো ডা-ই বলছে। তোমার মাথায় টিউমার হয়েছে এবং খুব দ্রুতই তার চিকিৎসা করতে হবে। অন্যথায় যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। রাতেরই আমরা তোমাকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দিয়ে চাই। অতঃপর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আগামীকাল তোমার মাথায় এক্সরেপচার করতে চাই। তোমার মাথার খুলি খুলে সেখান থেকে টিউমার অপসারণ করতে হবে। এক্সরেপচার সম্পন্ন হওয়ার পর পুনরায় মাথার খুলি যথাস্থানে প্রতিস্থাপন করে দেওয়া হবে। এ বলে ডাক্তার আমার সামনে একটি কাগজ [অপারেশনের সম্মতিপত্র] বাড়িয়ে দিলেন এবং তাতে স্বাক্ষর করতে বললেন।
সংবাদের আকস্মিকতায় আমি একেবারেই হতবুদ্ধি ছিলাম। স্থির করতে পারছিলাম না এখন আমার কী করণীয়। কিছুক্ষণ ভেবে আমি স্বাক্ষর না করে সেখান থেকে বেরিয়ে এলাম। কোনোভাবে অসুস্থ সবরণ করতে পারছিলাম না। ভাবতে লাগলাম, এখন আমার করণীয় কী! আমি কি বাসায় চলে যাব না অনকোনো হাসপাতালে যাব! দ্রুত ভাবনা-চিন্তা শেষ করে সিদ্ধান্ত নিলাম অন্য হাসপাতালে যাব।
সেখানেও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ডাক্তার সে সংবাদই দিলেন, যা দিয়েছিলেন আগের ডাক্তারগণ। এ ডাক্তারও দ্রুত অপারেশন করে ফেলার পরামর্শ দিলেন।
ততক্ষণে আমার মন কিছুটা শক্ত হয়ে এসেছে। ফোনে আবার সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। সংবাদ পেয়ে তৎক্ষণাৎ তিনি হাসপাতালে চলে এলেন। আমার পিতা একজন বুধ মানুষ। বয়স সত্তুর ছাড়িয়ে গেছে। হাসপাতালে এসে তিনি আমার নির্বাক ও ফ্যাকাশে চেহারার দেখে যাবড়ে গেলেন। আমি কিছুটা শক্ত হয়ে বললাম, আব্বাজান! আপনি তো জানেন, ইতিপূর্বে আমি প্রায়ই আমার মাথা ব্যাথার অভিযোগ করতাম। এখন আমার ডাক্তারি পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও রিপোর্ট বলছে— আমার মাথায় টিউমার হয়েছে এবং খুব দ্রুতই তা অপারেশন করে অপসারণ করতে হবে।
আমার কথা শুনে তিনি চিৎকার করে উঠলেন— লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ! এর পরই তিনি মাটিতে বসে পড়লেন। বারবার বলতে লাগলেন— ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
কিছুক্ষণ পর শান্ত হয়ে তিনি বললেন, বাবা! তুমি ঘাবড়িও না। আমি তোমাকে ও আমেরিকাতে তোমার ভাইকে কাছে পাঠিয়ে দিব। সেখানে তুমি চিকিৎসা নিবে এবং এক সময় সুস্থ হয়ে উঠবে ইনশাআল্লাহ।
কথাগুলো তিনি বলছিলেন আর হয়তো আমার বড় ভাইকে নিয়ে যে কষ্ট-ক্লেশ ভোগ করছেন তা স্মরণ করছিলেন। আমার বড় ভাই দীর্ঘ এক বছর যাবৎ আমেরিকাতে ক্যান্সারের চিকিৎসা নিচ্ছেন। আমি আমার পিতাকে কতদিন দেখিছি ভাইয়ের সাথে কোনো কথা বলছেন আর কাঁদছেন। কতদিন দেখেছি শেষ রাতে মুসল্লাতে বসে ভাইয়ের জন্য দোয়া করছেন।
আমি আমার পিতার দিকে তাকালাম। বুকের কষ্টগুলো অশ্রু হয়ে দু' গাল বেয়ে বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। তিনি দেখছেন— তার সন্তানরা একে একে তার চোখের সামনেই মারা যাচ্ছে। আমার ভাই খালেদ, গত দু' বছর আগে গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা গেছে। বড় ভাই ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে আমেরিকাতে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন। আর আমি এমন এক পথে রওয়ানা হয়েছি, যার শেষ গন্তব্য কোথায় জানা নেই।
এক সময় আমাকেও আমেরিকাতে পাঠানো হলো। আমি আমেরিকা গেলাম। উভয় এক হাসপাতালে ভর্তি হলাম। তারা দ্রুততম সময়ে আমার যাবতীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করলেন এবং পরদিন সকালেই অপারেশনে থিয়েটারে নিয়ে গেলেন। আমার মাথার সমস্ত চুল কামিয়ে ফেললেন। দেহ অবশ্য করা হলো। অতঃপর চারও দিক থেকে বৃত্তাকারে কেটে মাথার খুলির উপরের অংশ সম্পূর্ণ আলাদা করে ফেললেন। তারপর যথানিয়মে এক্সরেপচার করে সেখান থেকে টিউমার অপসারণ করলেন।
এভাবে প্রায় তিন ঘন্টা কেটে গেল। এ দীর্ঘ সময় যাবত অপারেশন চলছিল এবং তা ভালোভাবেই চলছিল। হঠাৎ আমার মস্তিষ্কের শিরায় রক্তও বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে এবং এক পর্যায়ে তা বিভিন্ন শিরা-উপশিরায় আটকে যায়। ফলে মস্তিষ্কে প্রচন্ড রক্তচাপ সৃষ্টি হয়। এতে ডাক্তারগণ কিছুটা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। এর সমাধান করতে গিয়ে দ্রুতবশত মস্তিষ্কের কিছু অংশে নাড়া লেগে যায়। এতে করে আমার শরীরের একাংশ অবশ হয়ে যায়।
ডাক্তারগণ বিষয়টি বুঝাতে পেরে দ্রুত অপারেশনের বাকি কাজগুলো সম্পন্ন করেন। মাথার খুলি আপন স্থানে বসিয়ে তার উপর চামড়া দিয়ে ঢেকে দেন। অতঃপর সেল্লাই করে অপারেশন থিয়েটার থেকে বের করে আমাকে নিয়ে যান নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে।
অপারেশন সম্পন্ন হওয়ার পর পূর্ণ পাঁচ ঘণ্টা আমি অচেতন অবস্থায় ছিলাম। এরপর হঠাৎ আমার বাম পার্শে খিঁচুনি দেখা দেয়। ডাক্তারগণ আবার আমাকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যান এবং এক্সরেপচারের মাধ্যমে তার সমাধান করেন। অতঃপর আবার আমাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে নিয়ে আসেন।
এরপর প্রায় চার ঘণ্টা আমার অবস্থা স্থিতিশীল থাকে। তারপর দেখা দেয় আরেক বিপদ— শ্বাসপ্রশ্বাসে রক্তক্ষরণ। ডাক্তারগণ আবারও আমাকে দ্রুত অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যান এবং আমার বক্ষ বিদীর্ণ করে রক্তক্ষরণের সমাধান করেন। অতঃপর আবার আমাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে নিয়ে আসেন।
আমার চিকিৎসার ব্যাপারে ডাক্তারগণ হতবুদ্ধি হয়ে যান। একের পর এক রোগের আক্রমণ। ক্ষণে ক্ষণে অবস্থার পরিবর্তন। হঠাৎ এমন সমস্যার সূত্রপাত, যার সমাধান খুবই কষ্টকর। এ যেন রোগের শেষ নেই, বিপদের সমাপ্তি নেই।
এরপর প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা আমার অবস্থা স্থিতিশীল থাকে। ডাক্তারগণ আমার মধ্যে কিছুটা সুস্থতা ও স্ফূর্তি অনুভব করেন। এরই মধ্যে হঠাৎ শরীরের তাপমাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যেতে লাগল। ডাক্তারগণ দ্রুত প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করালেন। রিপোর্ট এল— খুলির যে অংশের নীচ থেকে টিউমার অপসারণ করা হয়েছে, তাতে প্রচন্ড ব্যাথা হচ্ছে। অপরধাণ অবনতি দেখে ডাক্তার আবার অপারেশনে টিম আহ্বান করলেন। তারা সকলে মিলে আমাকে জানাযার মতো বহন করে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে গেলেন। তখন আমার ইশ ছিল।
আমি উপরের দিকে দুটি তুলে তাকালাম, কাঁদলাম এবং কায়মনোবাক্যে অনুনয়-বিনয় করে বারবার বলতে লাগলাম— হে আল্লাহ! হে আমার রব! হে আমার মেহেরবান মাওলা! আমি অক্ষম, অসহায়। আমি বিপদগ্রস্ত। আপনি সকল দয়াময়ের শ্রেষ্ঠ দয়াময়। হে আল্লাহ! এ যদি আমার উপর আপনার পক্ষ থেকে শাস্তি হয়ে থাকে, তা হলে আমি আপনার দয়া ও ক্ষমা প্রার্থনা করছি! আর যদি এ আমার জন্য আপনার পক্ষ থেকে পরীক্ষা হয়ে থাকে, তা হলে আমি আপনার সাহায্য প্রার্থনা করছি! আপনি আমাকে ধৈর্য ধারণ করার তাওফিক দান করুন; এর বিনিময়ে আমার পুণ্য ও প্রতিদান বহুগুণ বৃদ্ধি করে দিন।
এরপর আমি মৃত্যুর কথা স্মরণ করলাম। আল্লাহর কসম!—
— আমার বিষাদ সীমা ছাড়িয়ে গেছে।
— আমার সমস্ত শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেছে।
— হয়তো আগামীকালই মাটি আমার বিছানা হবে।
— আমার নিঃশ্বাস ফুরিয়ে এসেছে।
— আমার দেহ পোকা-মাকড়াও খাওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে।
— সেদিন আমার কী অবস্থা হবে—
— যেদিন পা পিছলে যাবে।
— মানুষ কান্নাকাটি করবে। আফসোস অনুশোচনা ও অনুতাপ দীর্ঘায়িত হবে।
— সেদিন আমার কী অবস্থা হবে—
— যেদিন সেই সভার সামনে দাঁড়াব, যিনি আমি ছোট-বড় সব কিছুর পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব নিবেন।
— যেদিন অপরাধীদের পা পিছলে যাবে।
— যেদিন আহাজারি ও হা-হুতাশ সীমা ছাড়িয়ে যাবে।
— যেদিন দুনিয়ার যাবতীয় আরাম-আয়েশ, সুখ-শান্তি ও স্বাদ-উপভোগ সুরের মতো শেষ হয়ে যাবে।
— সেদিন আমার কী অবস্থা হবে!
এরপর আমি কাঁদলাম। অনেক কাঁদলাম এবং খুব করে বেঁচে থাকার কামনা করলাম। তবে দুনিয়ার ভোগ-বিলাস ও আরাম-আয়েশের জন্য নয়। বরং আমার মাওলার সঙ্গে আমার সম্পর্ক সংশোধন ও স্থায়ী করার জন্য।
হঠাৎ ডাক্তার এলেন এবং আমাকে সম্পূর্ণরূপে অবশ করার আদেশ দিলেন। অবশ করার পর চামড়া খুলে পুরো খুলিটা আলাদা করে ফেললেন। অতঃপর খুলি ছাড়াই চামড়া দিয়ে মাথা ঢেকে সেলাই করে দিলেন।
যখন আমি জ্ঞান ফিরে পেলাম, লক্ষ করলাম আমার মাথা নরম। তা হলে এর ঘ্রাণ কোথায়। আমি ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করলাম, আমার মাথার বাকি অংশ কোথায়।
ডাক্তার ধীর ও শান্ত গলায় বললেন, তোমার মাথার খুলি আমাদের কাছে রেখে দিইছি– জীবাণুমুক্ত করার জন্য। ছয় মাস পর পুনরায় তুমি আমাদের কাছে এসো। তোমার মাথার খুলি যথাস্থানে লাগিয়ে দিব।
– যে দিন পা পিছলে যাবে।
– মানুষ কান্নাকাটি করবে। আফসোস অনুশোচনা ও অনুতাপ দীর্ঘায়িত হবে।
– যে দিন আমার কী অবস্থা হবে–
– যে দিন সেই সওয়াবের সামনে দাঁড়াব, যিনি আমার ছোট-বড় সব কিছুর পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব নিবেন।
– যে দিন অপরাধীদের পা পিছলে যাবে।
– যে দিন আত্মজার্তি ও সু-সুযোগ সীমা ছাড়িয়ে যাবে।
– যে দিন দুনিয়ার যাবতীয় আরাম-আয়েশ, সুখ-শান্তি ও সাদ-উপভোগ সুদূরে মতো শেষ হয়ে যাবে।
– সে দিন আমার কী অবস্থা হবে!
এরপর আমি কাঁদলাম। অনেক কাঁদলাম এবং খুব করে বেঁচে থাকার কামনা করলাম। তবে দুনিয়ার ভোগ-বিলাস ও আরাম-আয়েশের জন্য নয়। বরং আমার মাওলার সঙ্গে আমার সম্পর্ক সংশোধন ও স্থায়ী করার জন্য।
হঠাৎ ডাক্তার এলেন এবং আমাকে সম্পূর্ণরূপে অবশ্য করার আদেশ দিলেন। অবশ্য করার পর চামড়া খুলে পুরো শরীরটা আলাদা করে ফেললেন। অতঃপর খুলি ছাড়াই চামড়া দিয়ে মাথা ঢেকে সেলাই করে দিলেন।
যখন আমি জ্ঞান ফিরে পেলাম, লক্ষ্য করলাম আমার মাথা নরম। তা হলে এর হাড় কোথায়। আমি ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করলাম, আমার মাথার বাকি অংশ কোথায়।
ডাক্তার খুব ধীর ও শান্ত গলায় বললেন, তোমার মাথার খুলি আমাদের কাছে রেখে দিয়েছি- জীবাণুমুক্ত করার জন্য। ছয় মাস পর পুনরায় তুমি আমাদের কাছে এসো। তোমার মাথার খুলি যথাস্থানে লাগিয়ে দিব।
এরপর আমেরিকাতে আমি এক মাস ছিলাম। তারপর রিয়াদে চলে এসেছি। এখন ছয় মাসের বাকি সময়টুকু শেষ হওয়ার অপেক্ষা করছি।
– আমি আমার জীবনের স্থুল মাফসাদ্ থেকে উদাসীন ছিলাম।
– গাফলতের ঘুমে বিভোর ছিলাম।
– দুনিয়ার আরাম-আয়েশ ও ভোগ-বিলাসিতায় মগ্ন ছিলাম।
– বিপদ-আপদ, পরীক্ষা ও মৃত্যুর কথা ভুলে গিয়েছিলাম।
– দুনিয়াবী জীবন নিয়েই সন্তুষ্ট ছিলাম।
– দুনিয়াবী জীবন নিয়েই পড়ে ছিলাম।
– এখন আমি নতুনভাবে জন্মগ্রহণ করলাম।
প্রিয় পাঠক!
এরপর বেশ কিছুদিন অতিবাহিত হয়ে গেছে। ওই যুবক পক্ষাবলম্বনমুক্ত থেকে মুক্তি লাভ করেছে। এখন সে নিজে নিজে চলাফেরা করতে পারে।
– সাত মাস পর... আমি আমার তাকে দেখতে গেলাম। তখন দেখলাম, তার চেহারা হাস্যোজ্জ্বল, প্রফুল্ল ও প্রাণবন্ত। হাসিমাখা মুখে সে আমার দিকে একটি কার্ড বাড়িয়ে দিল। হাতে নিয়ে দেখি বিয়ের কার্ড। আমাকে তার বিয়ের দাওয়াত দিচ্ছে!
আমি যতটুকু জানি–
– এখন সে কল্যাণের কাজে অন্যদের চেয়ে অনেক অগ্রগামী।
– অত্যন্ত আগ্রহী ও উদ্যমী।
– অন্যকে নেক ও কল্যাণের কাজে উৎসাহ দানকারী।
এখন সে–
– মানুষকে আল্লাহ্ -এর দিকে ডাকে।
– দ্বীনের পথে আহবান করে।
– বিভিন্ন কিতাবাদি রচনা ও তা মানুষের মাঝে বিতরণ করে।
– অক্ষম-অসহায় ও অনাথ-দুঃখীদের সাহায্য-সহযোগিতা করে।
– অসহায়-দরিদ্রদের পাশে থাকে। সাহায্য-সহযোগিতা করে।
– ইত্যাকার আরও বহু কল্যাণকর ও নেক কাজে সর্বদা লিপ্ত থাকে।
প্রিয় পাঠক!
মনে রাখবেন, জীবনের মোড়ে মোড়ে, নানা দুঃখ-দুর্দশা ও কষ্টের বাঁকে বাঁকে বহু দান-অনুদান ও উপহার লুকায়িত থাকে。
📄 তাওবাকারী আল্লাহর প্রিয়
তাওবাকারীরা আল্লাহ্ এর প্রিয়পাত্র। আল্লাহ্ আমাদের সংবাদ দিয়েছেন, তিনি তাওবাকারীদের ভালোবাসেন। এ ঘোষণা তিনি তাঁর পবিত্র কিতাবের স্থানে স্থানে বর্ণনা করেছেন। যেমন, ইরশাদ হয়েছে–
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ
নিশ্চয় আল্লাহ্ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং যারা পবিত্র থাকে, তাদেরও ভালোবাসেন। [সূরা বাকারা : ২২২]
অপর এক আয়াতে তিনি ইরশাদ করেছেন–
أَلَمْ يَعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ هُوَ يَقْبَلُ التَّوْبَةَ عَنْ عِبَادِهِ وَيَأْخُذُ الصَّدَقَاتِ وَأَنَّ اللَّهَ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
তার কি জানে না যে, আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদের তাওবা কবুল করেন এবং সদকা কবুল করেন? বস্তুত আল্লাহ্ই তো তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু। [সূরা তাওবা : ১০৪]
অন্য এক আয়াতে ইরশাদ করেছেন–
أَلَمْ يَعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ هُوَ يَقْبَلُ التَّوْبَةَ عَنْ عِبَادِهِ وَيَأْخُذُ الصَّدَقَاتِ وَأَنَّ اللَّهَ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
তিনি [আল্লাহ্] তাঁর বান্দাদের তাওবা কবুল করেন, পাপসমূহ মার্জনা করেন এবং তোমাদের কৃত বিষয় সম্পর্কে অবগত রয়েছেন। [সূরা শূরা : ২৬]
আল্লাহ্ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন। তবে তিনি পাপাচারী, সীমালঙ্ঘনকারী ও অত্যাচারীদের পছন্দ করেন না। কত গুনাহগার ও পাপী সকাল-সন্ধ্যা হাসি-তামাশায় লিপ্ত থাকে, অথচ–
– তাদের রব উপর থেকে তাদের উপর লানত করতে থাকেন।
– ফেরেশতারা ক্রোধার্বিত হতে থাকেন।
– নেককার বান্দারা তাদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করতে থাকেন।
– জাহান্নামের আগুন তাদের জন্য উত্তপ্ত হতে থাকে। তাদের জন্য উদ্দীপ্ত হয়ে থাকে।
আল্লাহ্ তাদের চোখ-কান সম্পূর্ণ রূপে রেখেছেন। তাদের বিবেক-বুদ্ধি ও মস্তিষ্ক পরিপূর্ণ সুখ ও কর্মক্ষম রেখেছেন, অথচ তারা–
– না-ফরমানি ও অবাধ্যতার মাধ্যমে আল্লাহ্ তাআলার প্রতিহিংসায় লিপ্ত হয়।
– শয়তানের সহযোগিতা ও তার অনুসরণ করে।
– বিরামহীন অন্যায়-অনাচার ও পাপাচারে লিপ্ত থাকে।
– তাওবা তো করেই না, উল্টো শাহওাতে নাফসানীর ও শয়তানের ফাঁদে পড়ে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতা করতে থাকে।
আশ্চর্য! আল্লাহ্ নেয়ামত দান করেন আর সেই নেয়ামতের মাধ্যমেই তারা নেয়ামতদাতার অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়। আরে, তুমি একবার ভেবে দেখছ কি, তোমার কী অবস্থা হত, যদি তুমি–
– পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে বিছানায় পড়ে থাকতে?
– কিংবা আরও ভয়ংকর কোনো রোগে আক্রান্ত হতে?
– তোমার দৃষ্টিশক্তি ছিনিয়ে নেওয়া হত?
– কিংবা তোমাকে বধির বানিয়ে দেওয়া হত?
– তা হলে তুমি কী করতে?
– তোমার কী করার থাকত?
– একবারও কি ভেবেছ? ভেবে দেখেছ?!!
যেকোনো সময়, মুহূর্তের মধ্যে আল্লাহ্ তোমার সুস্থতার নেয়ামত ছিনিয়ে নিতে পারেন। একেবারে বিছানায় শুইয়ে দিতে পারেন। তখন তোমার কী করার থাকবে?
একটি ঘটনা মনে পড়ে গেল। একবার সেনাবাহিনীর এক মেজর তার এক অসুস্থ সহকর্মীকে দেখার জন্য হাসপাতালে গেলেন। হাসপাতালে গিয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন, তার খোঁজ-খবর নিলেন। বেশ কিছুক্ষণ সময় তার কাছে কাটালেন। দেখা-সাক্ষাৎ শেষে ফিরে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালেন। দাঁড়িয়ে সালাম দিলেন; তার জন্য সুস্থতা ও কল্যাণের দোয়া করলেন। অতপর যখনই রুম থেকে বের হওয়ার জন্য মুখে দাঁড়ালেন, অমনিই পা পিছলে ফ্লোরে পড়ে গেলেন। পড়ার সময় রোগীর বেডের পাশে রাখা ছোট টেবিলের সঙ্গে মাথা আঘাত পেলেন। এতে করে তিনিও অসুস্থ হয়ে পড়লেন। আল্লাহ্ কি মজী! এ থেকেই এক সময় তার চার হাত-পা অবশ হয়ে গেল। আমি যতটুকু জানি, এখনও তিনি হাসপাতালেই আছেন। সেই ঘটনার পর আজ প্রায় দশ বছর কেটে গেছে!
তাওবাকারীরা আল্লাহ্ এর প্রিয়পাত্র। আল্লাহ্ আমাদের সংবাদ দিয়েছেন, তিনি তাওবাকারীদের ভালোবাসেন। এ ঘোষণা তিনি তাঁর পবিত্র কিতাবের স্থানে স্থানে বর্ণনা করেছেন। যেমন, ইরশাদ হয়েছে–
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ
নিশ্চয় আল্লাহ্ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং যারা পবিত্র থাকে, তাদেরও ভালোবাসেন। [সূরা বাকারা : ২২২]
অপর এক আয়াতে তিনি ইরশাদ করেছেন–
أَلَمْ يَعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ هُوَ يَقْبَلُ التَّوْبَةَ عَنْ عِبَادِهِ وَيَأْخُذُ الصَّدَقَاتِ وَأَنَّ اللَّهَ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
তার কি জানে না যে, আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদের তাওবা কবুল করেন এবং সদকা কবুল করেন? বস্তুত আল্লাহ্ই তো তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু। [সূরা তাওবা : ১০৪]
অন্য এক আয়াতে ইরশাদ করেছেন–
أَلَمْ يَعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ هُوَ يَقْبَلُ التَّوْبَةَ عَنْ عِبَادِهِ وَيَأْخُذُ الصَّدَقَاتِ وَأَنَّ اللَّهَ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
তিনি [আল্লাহ্] তাঁর বান্দাদের তাওবা কবুল করেন, পাপসমূহ মার্জনা করেন এবং তোমাদের কৃত বিষয় সম্পর্কে অবগত রয়েছেন। [সূরা শূরা : ২৬]
আল্লাহ্ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন। তবে তিনি পাপাচারী, সীমালঙ্ঘনকারী ও অত্যাচারীদের পছন্দ করেন না। কত গুনাহগার ও পাপী সকাল-সন্ধ্যা হাসি-তামাশায় লিপ্ত থাকে, অথচ–
– তাদের রব উপর থেকে তাদের উপর লানত করতে থাকেন।
– ফেরেশতারা ক্রোধার্বিত হতে থাকেন।
– নেককার বান্দারা তাদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করতে থাকেন।
– জাহান্নামের আগুন তাদের জন্য উত্তপ্ত হতে থাকে। তাদের জন্য উদ্দীপ্ত হয়ে থাকে।
আল্লাহ্ তাদের চোখ-কান সম্পূর্ণ রূপে রেখেছেন। তাদের বিবেক-বুদ্ধি ও মস্তিষ্ক পরিপূর্ণ সুখ ও কর্মক্ষম রেখেছেন, অথচ তারা–
– না-ফরমানি ও অবাধ্যতার মাধ্যমে আল্লাহ্ তাআলার প্রতিহিংসায় লিপ্ত হয়।
– শয়তানের সহযোগিতা ও তার অনুসরণ করে।
– বিরামহীন অন্যায়-অনাচার ও পাপাচারে লিপ্ত থাকে।
– তাওবা তো করেই না, উল্টো শাহওাতে নাফসানীর ও শয়তানের ফাঁদে পড়ে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতা করতে থাকে।
আশ্চর্য! আল্লাহ্ নেয়ামত দান করেন আর সেই নেয়ামতের মাধ্যমেই তারা নেয়ামতদাতার অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়। আরে, তুমি একবার ভেবে দেখছ কি, তোমার কী অবস্থা হত, যদি তুমি–
– পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে বিছানায় পড়ে থাকতে?
– কিংবা আরও ভয়ংকর কোনো রোগে আক্রান্ত হতে?
– তোমার দৃষ্টিশক্তি ছিনিয়ে নেওয়া হত?
– কিংবা তোমাকে বধির বানিয়ে দেওয়া হত?
– তা হলে তুমি কী করতে?
– তোমার কী করার থাকত?
– একবারও কি ভেবেছ? ভেবে দেখেছ?!!
যেকোনো সময়, মুহূর্তের মধ্যে আল্লাহ্ তোমার সুস্থতার নেয়ামত ছিনিয়ে নিতে পারেন। একেবারে বিছানায় শুইয়ে দিতে পারেন। তখন তোমার কী করার থাকবে?
একটি ঘটনা মনে পড়ে গেল। একবার সেনাবাহিনীর এক মেজর তার এক অসুস্থ সহকর্মীকে দেখার জন্য হাসপাতালে গেলেন। হাসপাতালে গিয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন, তার খোঁজ-খবর নিলেন। বেশ কিছুক্ষণ সময় তার কাছে কাটালেন। দেখা-সাক্ষাৎ শেষে ফিরে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালেন। দাঁড়িয়ে সালাম দিলেন; তার জন্য সুস্থতা ও কল্যাণের দোয়া করলেন। অতপর যখনই রুম থেকে বের হওয়ার জন্য মুখে দাঁড়ালেন, অমনিই পা পিছলে ফ্লোরে পড়ে গেলেন। পড়ার সময় রোগীর বেডের পাশে রাখা ছোট টেবিলের সঙ্গে মাথা আঘাত পেলেন। এতে করে তিনিও অসুস্থ হয়ে পড়লেন। আল্লাহ্ কি মজী! এ থেকেই এক সময় তার চার হাত-পা অবশ হয়ে গেল। আমি যতটুকু জানি, এখনও তিনি হাসপাতালেই আছেন। সেই ঘটনার পর আজ প্রায় দশ বছর কেটে গেছে!