📄 তাওবাকারীর স্মৃতিচারণ
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্ ﷺ -র জন্য, যিনি গুনাহ ক্ষমাকারী এবং তাওবা কবুলকারী; যিনি কঠোর শাস্তিপ্রদাতা ও প্রচন্ড ক্ষমতার অধিকারী। তিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ্ নেই। তিনি সকলের প্রত্যাবর্তনস্থল।
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্ ﷺ -র জন্য, যিনি কোনো কিছুর জন্য বলেন ‘হয়ে যাও’ আর তখনই তা হয়ে যায়। তাঁর অপার দয়া ও অনুগ্রহেই মূসা আঃ ও তাঁর সম্প্রদায় রক্ষা পেয়েছিলেন ফেরাউন ও তার বাহিনীর হাত থেকে।
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্ ﷺ -র জন্য, যিনি ছিলেন নূহ আঃ -র আহ্বানে সর্বোত্তম সাড়াদানকারী, যখন তিনি তাঁকে আহবান করেছিলেন। দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর ইউসুফ আঃ -কে তিনি ইয়াকুব আঃ -র কাছে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। আমি সাক্ষ্য প্রদান করি- এক আল্লাহ্ ﷺ ছাড়া আর কোনো ইলাহ্ নেই। তিনি একক, তাঁর কোনো শরীক বা সমকক্ষ নেই। আমি আরও সাক্ষ্য প্রদান করি- মুহাম্মাদ ﷺ তাঁর বান্দা ও রাসূল।
হামদ ও সালাতের পর!
- এটি একটি স্মৃতি-স্মারক।
- কাগজের বুকে অনুভব-অনুভূতির কোমল আঁচড়।
- স্মৃতির রোমন্থন।
- হ্যাঁ, এটি তাওবাকারীর সুবিচারণ।
- গুনাহগারের চোখে মাগফিরাতের আলো প্রোজ্জ্বলন।
- এটি স্মারক ও বাইজির জন্য, যে বিশ্বাস করে-
لَّذِينَ عِبَادِىَ أَنِّيَ أَنَا الْغَفُورُ الرَّحِيمُ ﴿٤٩﴾
[হে নবী!] আপনি আমার বান্দাদের জানিয়ে দিন, আমি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, দয়ালু। [সুরা হিজর : ৪৯]
যেমনভাবে বিশ্বাস করে-
وَإِنَّ عَذَابَ رَبِّكَ لَوَاقِعٌ ﴿٧﴾
আমার শাস্তি- সে অত্যন্ত মর্মন্তুদ শাস্তি। [সুরা হিজর : ৫০]
এতে বর্ণিত হয়েছে তাদের কথা, যাদের ব্যাপারে তাদের রব সংবাদ দিয়েছেন- ‘তাওবাকারীদের প্রতি তিনি খুশি হন’ অথচ তিনি তাদের থেকে মুখাপেক্ষী। পক্ষান্তরে তারা তাঁর প্রতি পুরোপুরিই মুখাপেক্ষী।
কেনই বা তিনি তাদের তাওবায় খুশি হবেন না, তিনি যে তাদের এই বলে ডেকেছেন-
يَا عِبَادِيَ إِنَّكُمْ تُخْطِئُونَ بِاللَّيْلِ وَالنَّهَارِ وَأَنَا أَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا فَاسْتَغْفِرُونِي أَغْفِرْ لَكُمْ
হে আমার বান্দাগণ! তোমরা দিন-রাত গুনাহ্ করেছ, আর আমি তোমাদের যাবতীয় গুনাহের ক্ষমাকারী। অতএব, তোমরা আমার কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা কর, আমি তোমাদের ক্ষমা করে দিব। [সহিহ মুসলিম : ৬৭০৭]
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ ﷺ ইরশাদ করেছেন-
قُلْ يٰعِبَادِيَ الَّذِيْنَ أَسْرَفُوْا عَلٰى أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوْا مِنْ رَّحْمَةِ اللّٰهِ ۚ إِنَّ اللّٰهَ يَغْفِرُ الذُّنُوْبَ جَمِيْعًا ؕ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُوْرُ الرَّحِيْمُ ﴿٥٣﴾
বলুন, হে আমার বান্দাগণ, যারা নিজেদের উপর জুলুম করেছ! তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ্ সমস্ত গুনাহ্ মাফ করেন। তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [সুরা যুমার : ৫৩]
অপর এক স্থানে তিনি ইরশাদ করেছেন-
وَمَنْ عِنْدَهُ أُمُّ الْكِتٰبِ ﴿٤٣﴾
নিশ্চয়ই তিনি মহা ক্ষমাশীল ও অসীম দয়ালু। [সুরা বাকারা : ৩৭]
তাঁদের নবী, রহমাতুল্লিল আলামীন তাঁদের ডেকে বলেছেন-
إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ يَبْسُطُ يَدَهُ بِاللَّيْلِ لِيَتُوبَ مُسِيءُ النَّهَارِ وَيَبْسُطُ يَدَهُ بِالنَّهَارِ لِيَتُوبَ مُسِيءُ اللَّيْلِ حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ مِنْ مَغْرِبِهَا.
আল্লাহ্ ﷺ রাতের বেলায় স্বীয় হাত বাড়িয়ে দেন, যেন দিনের অপরাধী তাঁর কাছে তাওবা করে। এমনিভাবে দিনের বেলায় স্বীয় হাত বাড়িয়ে দেন, যেন রাতের অপরাধী তাঁর কাছে তাওবা করে। এভাবে প্রতিদিন চলতে থাকবে, যতদিন না পশ্চিম দিগন্ত থেকে সূর্য উদিত হবে। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৭৮৬১]
বান্দার তাওবায় আল্লাহ্ ﷺ খুশি হন। তাওবা-কৃত গুনাহসমূহ মিটিয়ে দেয়।
📄 এক তাওবাকারীর ঘটনা
হিমায়রিত এক বৃদ্ধ। আমরা তাঁর মজলিসে বসছি, যখন তাঁর বয়স বেড়ে গেছে এবং হাড়গোড় দুর্বল হয়ে গেছে। চোখের জ্যোতিও কমে এসেছে। তিনি আর কেউ নন। প্রিয় নবীজী ﷺ -র বিখ্যাত সাহাবী কা’ব আঃ ইবনে মালেক আঃ । তিনি নিজেই তাঁর যৌবনের স্মৃতিচারণ করছেন। আমাদের শোনাচ্ছেন তাবুক যুদ্ধ থেকে তাঁর বাদ পড়ে যাওয়ার কথা।
তাবুক যুদ্ধ ছিল রাসূলুল্লাহ্ ﷺ -র জীবনের সর্বশেষ যুদ্ধ। নবীজী ﷺ যুদ্ধযাত্রার ঘোষণা দিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল লোকজন যুদ্ধযাত্রার প্রস্তুতি সম্পন্ন করুক। লস্কর তৈরি করার জন্য মানুষের কাছ থেকে তিনি চাঁদা ও নিলেন। দেখতে দেখতে ত্রিশ হাজার সেনার বিরাট এক বাহিনী তৈরি হয়ে গেল।
তখন ছিল গ্রীষ্মকাল। ফসল কাটার সময় ঘনিয়ে এসেছিল। সফরও ছিল অনেক দীর্ঘ। শত্রুপক্ষ শক্তিশালী ও গোঁয়ার। মুসলমানদের সংখ্যাও ছিল অনেক। তবে তাঁদের নাম কোনো নথিতেও ছিল না।
কা’ব আঃ বলেন, আমি তখন বেশ খোশহালেই ছিলাম। প্রস্তুত করেছিলাম দু’টি বাহন। জিহাদের জন্য মানসিকতাও প্রস্তুতও ছিলাম। এরপরও মৌসুমের প্রতি, ফসল পাকায় প্রতি আমার অন্তরে ঝোঁক ছিল।
এরই মধ্যে হঠাৎ একদিন সকালে রাসূলুল্লাহ্ ﷺ রওয়ানা হয়ে গেলেন। তখন মনে মনে বললাম, আমি আগামীকাল বাজারে গিয়ে জিহাদের কিছু আসবাব কিনব, তারপর গিয়ে তাঁদের সাথে মিলিত হব।
কথামততো পরদিন বাজারে গেলাম। একটি বিষয়ে জটিলতা সৃষ্টি হল এবং আমি বাড়ি ফিরে এলাম। মনে মনে বললাম, ইনশাআল্লাহ্ আগামীকাল রওনা হব এবং তাঁদের সাথে গিয়ে মিলিত হব। কিন্তু আবারও একটি বিষয়ে জটিলতা সৃষ্টি হল। আবারও মনে মনে বললাম, ইনশাআল্লাহ্ আগামীকাল রওনা হব। এভাবে চলে গেল কয়েক দিন। আমি ইসলামী লস্কর থেকে পিছনে রয়ে গেলাম। তখন আমি বাজারে হাটতাম এবং মদীনার ঘুরে বেড়াতাম। আমার নজরে পড়ত শুধু দুই ধরনের মানুষ- যাদের কপালে মুনাফিকি অবধারিত হয়ে গেছে অথবা আল্লাহ্ ﷺ যাদেরকে অপারগ সাব্যস্ত করেছেন।
কা’ব আঃ মদীনার রয়ে গেলেন। রাসূলুল্লাহ্ ﷺ ত্রিশ হাজার সঙ্গী নিয়ে চলে গেলেন। তিনি গিয়ে পৌঁছলেন তাবুকে। নজরে বুলানোর সাহাবায়ে কেরামের চেহারার দিকে। দেখলেন, বহির্জাতে আকাশারিক হওয়া একজন মানুষ তাঁদের মাঝে নেই। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন- কা’ব ইবনে মালেকের কী হয়েছে?
একজন জবাব দিলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ্! তার চাদর ও বাছুর উপর গৌরবের দুটি তাকে পেছনে ফেলে দিয়েছে।
এ কথা শুনে হযরত মুয়ায আঃ বললেন, কত খারাপ কথা আপনি বললেন। হে আল্লাহর রাসূল! আমরা যতদূর জানি, তিনি একজন ভালো মানুষ।
রাসূলুল্লাহ্ ﷺ নীরব হয়ে গেলেন।
কা’ব আঃ বলেন, যখন নবীজী ﷺ তাবুক যুদ্ধ সম্পন্ন করে মদীনা অভিমুখে রওয়ানা হলেন, তখন আমি কীভাবে তাঁর অবস্থায় থেকে রক্ষা পাব তা নিয়ে ভাবতে লাগলাম। এ বিষয়ে আমি আমার পরিবারের লোকজনের কাছ থেকে পরামর্শও নিলাম। তারপর যখন তিনি মদীনায় পৌঁছে গেলেন, তখন আমার স্থির বিশ্বাস হয়ে গেল, সত্যের আশ্রয় না নিলে আমার রক্ষা নেই।
নবীজী ﷺ মদীনায় প্রবেশ করলেন। প্রথমে মসজিদে প্রবেশ করে দুই রাকাত সালাত আদায় করলেন। তারপর উপবেশন করলেন মানুষের অজহাত শোনার জন্য। তখন পেছনে থেকে যাওয়া লোকজন আসতে লাগল এবং ওজর পেশ করে করে কসম করতে লাগল। তারা সংখ্যায় ছিল আশির কিছু বেশি। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাদের বাহ্যিক কৈফিয়ত মেনে নিয়ে তাদের জন্য দোয়া করলেন এবং তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় আল্লাহ -র হাওলায় ছেড়ে দিলেন।
এক সময় কা'ব ইবনে মালেক ﷺ এলেন নবীজীর কাছে। যখন তিনি সালাম দিলেন, তখন নবীজী তাঁর দিকে তাকিয়ে ক্রুদ্ধ ব্যক্তির মতো হাসলেন। কা'ব ﷺ এগিয়ে গেলেন তাঁর দিকে। যখন তিনি তাঁর সামনে গিয়ে বসলেন, তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, তুমি কেন পিছনে পড়েছিলে? তুমি না বাহন কিনেছিলে?
কা'ব ﷺ বললেন, হাঁ অবশ্যই।
নবীজী ﷺ বললেন, তা হলে পিছনে পড়লে কেন?
কা'ব ﷺ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি যদি দুনিয়ার অন্য কারো কাছে বসতাম, তা হলে আমি জানি আমি কোনো ওজর পেশ করার পর তার রোষ থেকে রক্ষা পেয়ে যেতাম। কারণ, আমার প্রতারণা করার ক্ষমতা আছে। কিন্তু আল্লাহর কসম, আমি জানি, আজ যদি আমি আপনাকে সন্তুষ্ট করার জন্য কোনো মিথ্যা কথা বলি, তা হলে অবশ্যই আল্লাহ ﷺ আপনাকে আমার উপর নাখোশ করে দিবেন; আর যদি আমি সত্য কথা বলি, তা হলে আপনি আমার উপর নাখোশ হবেন ঠিক, কিন্তু আমি তাতে আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রাপ্তির আশা রাখি। ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমার কোনো ওজর ছিল না। আল্লাহর কসম! এখন আমি যতটা শক্তিশালী এবং সাচ্ছদ্যপূর্ণ আছি, আগে কখনও এমন ছিলাম না।
এতদূর বলে হযরত কা'ব ﷺ থেমে গেলেন। নবীজী ﷺ সাহাবায়ে কেরামের দিকে তাকিয়ে বললেন, এই যে লোকটি– ইনি সত্য কথা বলেছেন।
বলেন। আচ্ছা তুমি যাও, তোমার ব্যাপারে আল্লাহ ﷺ ফায়সালা করবেন।
কা'ব ﷺ স্বীয় পদক্ষেপে উঠে তিনিও বিষণ্ণ অবস্থায় মসজিদে থেকে বের হলেন। তিনি জানেন না আল্লাহ ﷺ তাঁর ব্যাপারে কী ফায়সালা করবেন! তাঁর এই অবস্থা যখন তাঁর কওমের লোকজন দেখলেন, তখন কিছু লোক তাঁর পিছু নিল। তারা তিরস্কার করে বলতে লাগল, আল্লাহর কসম! এর আগে আপনি কখনও কোনো অপরাধ করেছেন বলে আমরা জানি না। আপনি একজন কবি, কিন্তু তারও পরও অগ্রগামী যেমন রাসূলুল্লাহ ﷺ-র কাছে ওজর পেশ করে ফেল। তেমন ওজর পেশ করতে আপনি ব্যর্থ হলেন। আপনি কেন এমন কোনো ওজর তুলে ধরলেন না, যাতে তিনি সন্তুষ্ট হয়ে যান। তারপর তিনি আপনার জন্য ইস্তিগফার করতেন এবং আল্লাহ ﷺ-ও আপনাকে ক্ষমা করে দিতেন।
কা'ব ﷺ বলেন, এভাবে তারা আমাকে তিরস্কার করতে থাকল। এমনকি আমার কাছে মনে হল, আমি পুনরায় গিয়ে আমার বক্তব্য প্রত্যাহার করে আসি। আমি তখন বললাম, আচ্ছা আমার মতো সমস্যায় কি আর কেউ পতিত হয়েছে?
লোকজন বলল, হ্যাঁ, আরও দু'জন আপনার মতো কথাই বলেছেন এবং তাদেরকে আপনার মতোই জওয়াব দেওয়া হয়েছে।
আমি বললাম, তারা দু'জন কারা?
লোকজন বলল, মুরারা ইবনে রবী এবং হেলাল ইবনে উমাইয়া।
তারা দু'জন নেককার লোক। বদরে অংশ নিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে আমার জন্য আদর্শ রয়েছে। এ কথা ভেবে আমি বললাম, আল্লাহর কসম! আমি কখনোই পুনরায় যাব না এবং আমার বক্তব্য প্রত্যাহার করব না।
এরপর কা'ব ﷺ-র দিনাতিপাত হতে থাকল একা। বিদীর্ণ হৃদয়ে। তিনি নিজের বাড়িতে বসে গেলেন। অল্প সময়ের মধ্যে নবীজী কা'ব ও তাঁর সঙ্গীদের সাথে লোকজনকে কথা বলতে নিষেধ করে দিলেন।
ও তাঁর সঙ্গীদের সাথে লোকজনকে কথা বলতে নিষেধ করে দিলেন।
কা'ব ﷺ বলেন, তখন লোকজন আমাদেরকে ছেড়ে দিল। তারা আমাদের জন্য হয়ে গেল অপরিচিতের মতো। আমি বাজারে যেতাম কিন্তু কেউ আমার সাথে কথা বলত না। তারা আমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। মনে হত যেন আমি তাদেরই চেনা নই। বাগানগুলো বদলে গেল। এগুলোও যেন আমাদের পরিচিত নয়। পুরো দুনিয়াই আমাদের জন্য পরিবর্তন হয়ে গেল। আমরা যেন নতুন কোনো দুনিয়াতে চলে এসেছি।
আমার সঙ্গীদ্বয় তাঁদের বাড়িতে বসে কাঁদতে শুরু করলেন। তাঁদের দিন-রাতের কাজই শুধু কান্না আর কান্না। তাঁরা কখনও মাথা উঁচু করতেন না। তাঁরা ইবাদত করতে লাগলেন গৃহাভ্যন্তরে। এই তিনজনের মধ্যে আমি ছিলাম সবচেয়ে কম বয়সের এবং সবচেয়ে চটপটা। এজন্য আমি বাড়ি থেকে বের হতাম। মুসলমানদের সাথে জামাতে সালাত পড়তাম। বাজারে ঘুরে বেড়াতাম। তবে কেউ আমার সাথে কথা বলত না। আমি এসে মসজিদে প্রবেশ করতাম। রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে সালাম দিতাম আর লক্ষ করতাম তিনি কি সালামের জওয়াব দেওয়ার জন্য ঠোঁট নেড়েছেন, না তা-ও নাড়েননি। তারপর তাঁর কাছাকাছি দাঁড়িয়ে সালাত পড়তাম আর কানচোখে তাঁর দিকে তাকাতাম। আমি যখন সালাতে মনোযোগ দিতাম, তখন তিনি আমার দিকে লক্ষ করতেন। আর যখন আমি তাঁর দিকে লক্ষ করতাম, তখন তিনি অন্যদিকে মনোযোগ দিতেন।
এভাবেই গড়িয়ে যেত কা'ব ﷺ-র দিন-রাত। বেদনা আরও বেদনা জমা দেয়। তিনি তাঁর কওমের সুনামধন্য ব্যক্তি। তিনি একজন প্রাজ্ঞ কবি। তাঁকে চিনতেন রাজা-বাদশাহ ও আমীর-উমারাগণ। তাঁর কবিতা পৌঁছে গিয়েছিল আশপাশের শিক্ষিত সমাজে। তাঁদের সাথ ছিল তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করার।
আর তিনি মদীনায় নিজের কওমের কাছে রয়েছেন, কিন্তু কেউ তাঁর সাথে কথা বলে না। তাঁর দিকে ভ্রুক্ষেপও করে না। এভাবে যখন তাঁর অসহায় চরমে এবং সংকট চতুর্থীয়, তখন নেমে এল আরও এক পরীক্ষা। তিনি একদিন বাজারে ঘুরেছিলেন। হঠাৎ দেখা গেল শাম থেকে আগত এক খ্রিস্টানকে। সে বলছে– আমাকে কা'ব ইবনে মলেকের সন্ধান দিতে পারবে কে?
লোকজন ইশারা করে কা'ব ﷺ-কে দেখিয়ে দিল। লোকটি তাঁর কাছে এগিয়ে এসে গাসসানার সম্রাটের একটি পত্র তাঁর হাতে তুলে দিল। আরব ব্যবসা! গাসসান-সম্রাটের পত্র! তা হলে কি তাঁর সংবাদ শাম পর্যন্ত পৌঁছে গেছে! গাসসান-সম্রাটের কাছেও তার গুরুত্ব আছে। আশ্চর্য! সম্রাটের উদ্দেশ্য কী? কা'ব ﷺ চিঠিটি খুললেন। দেখলেন, তাতে লেখা আছে–
'পর সমাচার! হে কা'ব ইবনে মালেক! আমাদের কাছে সংবাদ এসেছে, আপনার নেতা আপনার উপর নিষ্ঠুর হয়েছেন এবং তিনি আপনাকে তাড়িয়ে দিয়েছেন। আপনি ধ্বংস ও অপমানের দেশে থাকার জন্য সৃষ্ট হননি। আপনি আমাদের কাছে চলে আসুন। আমরা আপনাকে প্রবেশ দিব।'
চিঠি পড়া সম্পন্ন করে কা'ব ﷺ বললেন, ইয়া লিল্লাহি ওয়া ইয়া ইলাইহি রাজিউন! কুফরের লোকজন আমাকে প্রলোভন দিচ্ছে! এ তো আরেক বিপদ! চিঠিটি নিয়ে তিনি চুলার কাছে গেলেন। চুলা জ্বালিয়ে চিঠিখানা ভস্ম করে দিলেন। সম্রাটের প্রলোভনের দিকে কোনো প্রকার ভ্রুক্ষেপ করলেন না।
হাঁ, কা'ব ﷺ-র জন্য খুলে গেছে সম্রাটের দুয়ার। আমীর- উমারাদের প্রাসাদ তাঁকে সম্মান করার জন্য আহ্বান করছে। অথচ চারপাশের মদীনা তাঁকে তিরস্কার করছে। সেখানকার লোকজন তাকে ভ্রুকুটি করছে। তিনি সালাম দিলে জওয়াব দেওয়া হয় না। তাঁর জিজ্ঞাসায় কোনো সাড়া দেওয়া হয় না। এরপরও তিনি কাফেরদের দিকে ভ্রুক্ষেপ করলেন না। শয়তান তাঁকে প্ররোচনা দিতে গিয়ে অথব প্রবৃত্তির পূজারী বানাতে গিয়ে ব্যর্থ হল। সম্রাটের চিঠি তিনি আগুনে জ্বালিয়ে দিলেন।
এভাবে দিনের পর দিন অতিবাহিত হতে লাগল। পুরো হয়ে গেল একটি মাস। অবস্থা কোনোও পরিবর্তন নেই। রায়কটে তাঁর গলা শক্তিয়ে গেল এবং আরও দূর্নীতিগ্রস্ত হতে লাগল। নবীজীও তাকে ডাকেন না, অধীও কোনো ফায়সালা দেয় না। যখন চল্লিশ দিন পূর্ণ হল, তখন নবীজীর একজন দূত কা'ব ﷺ এর কাছে। দরজা কড়া নাড়লেন দূত। হয়তো তিনি সংকট-ত্রাণের কোনো সংবাদ নিয়ে এসেছেন– এই আশায় এগিয়ে গেলেন কা'ব ﷺ। কিন্তু না, দূত বললেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ আপনাকে নির্দেশ দিয়েছেন স্ত্রী থেকে দূরে সরে যেতো।
কা'ব ﷺ বললেন, আমি কি তাকে তালাক দিয়ে দিব, না এর মতলব অন্য কিছু?
দূত বললেন, না; তালাক দিতে হবে না। তবে তার থেকে দূরে থাকবেন এবং তার কাছে ঘেঁষবেন না।
কা'ব ﷺ স্ত্রীর কাছে গেলেন। বললেন, তুমি বাপের বাড়ি চলে যাও এবং এই বিষয়ে কোনো ফায়সালা না হওয়া পর্যন্ত সেখানেই থাকো। নবীজী কা'ব ﷺ-র সঙ্গীয়দ্বয়ের কাছেও একই খবর পাঠালেন। তখন হেলাল ইবনে উমাইয়্যা স্ত্রী তাঁর কাছে এসে বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! হেলাল ইবনে উমাইয়্যা অত্যন্ত দুর্বল একজন বৃদ্ধো মানুষ। আপনি কি আমাকে তার খেদমত করার অনুমতি দিবেন? রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, অনুমতি দিচ্ছি, তবে তিনি যেন তোমার কাছে না আসেন।
মহিলা বললেন, আল্লাহর কসম! তার তো নড়বার শক্তিও নেই। এই ঘটনা ঘটার পর থেকে তিনি সব সময় বিষণ্ণ থাকেন এবং রাত-দিন শুধু কাঁদেন।
দিনগুলো কা'ব ﷺ-র জন্য আরও ভারী হয়ে উঠল এবং ভয়কট হয়ে উঠল আরও অসহনীয়। এমনকি তিনি উসমান ইবনে দুনায়ায় পড়ে গেলেন। তিনি মুসলমানদের সাথে কথা বলতে চেষ্টা করেন, কিন্তু তারা কেউই সাড়া দেন না; রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে সালাম দেন, কিন্তু কোনো অভাবী শোনা যায় না। তা হলে তিনি এখন কোথায় যাবেন! কার কাছ থেকে পরামর্শ নিবেন!
কা’ব (রা.) বলেন, যখন আমার পরীক্ষা দীর্ঘ হয়ে গেল, তখন আমি আমার চাচাতো ভাই আবু কাতাদার কাছে গেলাম। তিনি আমার সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তি। গিয়ে দেখি তিনি তার বাগানে রয়েছেন। আমি দেয়াল টপকে ভেতরে গেলাম। তাকে সালাম দিলাম। তিনি আমার সালামের জবাব দিলেন না। আমি বললাম, আমি আপনাকে আল্লাহর নামে কসম দিচ্ছি হে আবু কাতাদা! আপনি কি জানেন যে, আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসি?
তিনি চুপ থাকলেন। তখন আমি আবার বললাম, আবু কাতাদা! আমি আপনাকে আল্লাহর নামে কসম দিচ্ছি, আপনি কি জানেন যে, আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসি?
তিনি এবারও চুপ থাকলেন। আমি তখন আবারও তাঁকে বললাম, আবু কাতাদা! আমি আপনাকে আল্লাহর নামে কসম দিচ্ছি, আপনি কি জানেন যে, আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসি?
তিনি বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন।
চাচাতো ভাই এবং সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তির কাছ থেকে এমন জবাব পেয়ে কা’ব (রা.) তিনি জানেন না, এখন তিনি মুমিন কি না! তিনি এই জবাব সহ্য করতে পারলেন না। তাঁর চোখ দু’টি অশ্রুতে ভরে গেল। তিনি আবার দেয়াল টপকে বেরিয়ে এলেন। চলে গেলেন নিজ বাড়িতে। বসে গেলেন সেখানে। বাড়ির দেয়ালের দিকে নজর বুলোতে লাগলেন। বাড়িতে স্ত্রী নেই যে পাশে এসে বসবেন। কোনো আত্মীয় নেই যে প্রবোধ দিবেন।
রাসূলুল্লাহ (সা.) লোকজনকে তাঁদের সঙ্গে কথা বলতে নিষেধ করে দেওয়ার পর এভাবে গত হয়ে গেল পঞ্চাশটি দিন।
পঞ্চাশ তম রাতের তৃতীয় প্রহরে নবীজী (সা.)-র উপর তাঁদের তাওবা কবুল হওয়ার ঘোষণা নাজিল হলো। নবীজী তখন উম্মে সালামা (রা.)-র ঘরে ছিলেন। তিনি আয়াগুলো তেলাওয়াত করলেন। তখন উম্মে সালামা (রা.) বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমরা কি কা’বকে সুসংবাদ পাঠাব না?
রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, তা হলে লোকজন তোমাদের উপর ভেঙে পড়বে। বাকি রাত আর ঘুমাতে পারবে না। তারপর রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন ফজরের সালাত আদায় করলেন, তখন লোকজনের মাঝে তাঁদের তাওবা কবুল হওয়ার ঘোষণা করলেন।
— লোকজন তাঁদেরকে সুসংবাদ দেওয়ার জন্য চলে গেল।
কা’ব (রা.) বলেন, আমি বাড়ির ছাদে ফজরের সালাত পড়ে সে অবস্থায় বসে ছিলাম, সে অবস্থার কথা আল্লাহ (তা.) উল্লেখ করেছেন। নিজের উপর আমার ঘৃণাবোধ জন্মে গিয়েছিল। জমিনের প্রশস্ততাও সত্ত্বেও তা আমার জন্য সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিল। একটি চিন্তায় ভীষণভাবে আচ্ছন্ন ছিলাম যে, আমি মরে যাব কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা.) আমার জানাযা পড়াবেন না, অথবা তিনি মারা যাবেন কিন্তু আমি এই অবস্থায়ই থেকে যাব, কেউ আমার সাথে কথা বলবে না এবং আমার জানাযাও পড়া হবে না।
এমনই চিন্তায় মগ্ন ছিলাম আমি। হঠাৎ কোনো ব্যক্তির কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম, যা ভেসে আসছিল সালাতগাহ্ থেকে। লোকটি বলছিলেন– হে কা’ব ইবনে মালেক! সুসংবাদ গ্রহণ করুন।
আমি তখনই সেজদায় পড়ে গেলাম। বুঝে নিলাম আল্লাহ (রা.)-র পক্ষ থেকে অনুগ্রহ এসে পড়েছে। ইতোমধ্যে ঘোড়ায় চড়ে আমার কাছে এগিয়ে এলেন একজন। আরেকজন পাহাড়ের চূড়া থেকে চিৎকার দিলেন। ঘোড়ার চেয়ে আওয়াজের গতি ছিল বেশি। তারপর যার কণ্ঠ আমি সুসংবাদ শুনেছিলাম, তিনি যখন আমার কাছে এসে পৌঁছলেন, আমি গায়ের কাপড় দু’টি খুলে তার গায়ে জড়িয়ে দিলাম, সুসংবাদের পুরস্কারস্বরূপ। আল্লাহর কসম! আমার আর কোনো কাপড় ছিল না! কাজেই অপর দু’টি কাপড় ধার করে এনে পড়তে হল।
এরপর আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-র কাছে ছুটলাম। দলে দলে লোকজন আমার সাথে দেখা করল এবং তাওবা কবুল হওয়ার সুসংবাদ দিল। তারা বলছিল, আপনার তাওবা কবুল হয়েছে এজন্য অভিনন্দন।
আমি গিয়ে মসজিদে প্রবেশ করলাম। দেখলাম, রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবাদের নিয়ে বসে আছেন। আমি আরও এগিয়ে গেলাম। রাসূলুল্লাহর সামনে গিয়ে তাঁকে সালাম দিলাম। তাঁর চেহারা আনন্দে ঝলমল করছিল। যখন তিনি আনন্দিত হলেন, তখন তাঁর চেহারা ঝলমল করা মনে হত চাঁদের টুকরো।
যখন তিনি আমাকে দেখলেন, তখন বললেন, তোমার মা তোমাকে জন্ম দেওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত সবচেয়ে দিনের সুসংবাদ গ্রহণ কর।
আমি বললাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনার পক্ষ থেকে, না আল্লাহর পক্ষ থেকে?
তিনি বললেন, না; বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে। তারপর তিনি আয়াতগুলো তেলাওয়াত করলেন। আমি তাঁর সামনে বললাম। বললাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমার তাওবা কবুলের শুকরিয়া হিসেবে আমার যাবতীয় বিষয়-সম্পত্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে প্রদান করে মুক্ত হতে চাই।
তিনি বললেন, না; নিজের জন্য কিছু সম্পদ রেখে দাও। এটা তোমার জন্য ভালো হবে।
আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ আমাকে সত্যের কারণে মুক্তি দিয়েছেন। আমি তাওবার অংশ হিসেবেই বাকি জীবনে কখনও সত্য ছাড়ব না।
হ্যাঁ, আল্লাহ (তা.) কা’ব (রা.) ও তাঁর সঙ্গীদের তাওবা কবুল করেছেন এবং এ প্রসঙ্গে কুরআনের কয়েকটি আয়াতও নাজিল করেছেন। যেমন, পবিত্র কুরআনে তিনি ইরশাদ করেছেন–
لَقَدْ تَابَ اللّٰهُ عَلَى النَّبِيِّ وَالْمُهٰجِرِيْنَ وَالْاَنْصَارِ الَّذِيْنَ اتَّبَعُوْهُ فِيْ سَاعَةِ الْعُسْرَةِ مِنْ بَعْدِ مَا كَادَ يَزِيْغُ قُلُوْبُ فَرِيْقٍ مِّنْهُمْ ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ اِنَّهٗ بِهِمْ رَءُوْفٌ رَّحِيْمٌ وَّعَلَى الثَّلٰثَةِ الَّذِيْنَ خُلِّفُوْا حَتّٰى اِذَا ضَاقَتْ عَلَيْهِمُ الْاَرْضُ بِمَا رَحُبَتْ وَضَاقَتْ عَلَيْهِمْ اَنْفُسُهُمْ وَظَنُّوْٓا اَنْ لَّا مَلْجَاَ مِنَ اللّٰهِ اِلَّا اِلَيْهِ ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ لِيَتُوْبُوْا اِنَّ اللّٰهَ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيْمُ
আল্লাহ অবশ্যই অনুগ্রহপরায়ণ হয়েছেন নবীর প্রতি এবং মুহাজির ও আনসারদের প্রতি, যারা কঠিন মুহূর্তে নবীর সঙ্গে ছিল, যখন তাদের এক দলের অন্তর ফিরে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। অতঃপর আল্লাহ তাদের ক্ষমা করেন। নিঃসন্দেহে তিনি তাদের প্রতি দয়াবান ও করুণাময়। এবং [তিনি ক্ষমা করলেন] অপর তিনজনকেও, যাদেরকে পেছনে রাখা হয়েছিল, যখন পৃথিবী বিস্তৃত হওয়া সত্ত্বেও তাদের জন্য সংকুচিত হয়ে গেল এবং তাদের জীবন দুর্বিসহ হয়ে উঠল; আর তারা বুঝতে পারল যে, আল্লাহ ব্যতীত আর কোনো আশ্রয়স্থল নেই। অতঃপর তিনি সদয় হলেন তাদের প্রতি, যাতে তারা ফিরে আসে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ দয়াময়, করুণাশীল। [সূরা তাওবা : ১১৭-১১৮]
📄 তাওবার পুরস্কার
আল্লাহ (তা.) তাওবাকারীদের প্রতি খুশি হন। খুশি হয়ে কেবল তাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করেন না, বরং তাদের যাবতীয় গুনাহ ও পাপসমূহকে নেকী ও পুণ্য দ্বারা পরিবর্তন করে দেন। যেমন, পবিত্র কুরআনে তিনি ইরশাদ করেছেন–
وَاُولٰٓئِكَ لَا يَجْتَمِعُوْنَ مَعَ اللّٰهِ اِلٰهًا اٰخَرَ وَ لَا يَقْتُلُوْنَ النَّفْسَ الَّتِيْ حَرَّمَ اللّٰهُ اِلَّا بِالْحَقِّ وَ لَا يَزْنُوْنَ وَمَنْ يَّفْعَلْ ذٰلِكَ يَلْقَ اَثَامًا يُّضٰعَفْ لَهُ الْعَذَابُ يَوْمَ الْقِيٰمَةِ وَ يَخْلُدْ فِيْهِ مُهَانًا اِلَّا مَنْ تَابَ وَاٰمَنَ وَ عَمِلَ عَمَلًا صَالِحًا فَاُولٰٓئِكَ يُبَدِّلُ اللّٰهُ سَيِّاٰتِهِمْ حَسَنٰتٍ وَكَانَ اللّٰهُ غَفُوْرًا رَّحِيْمًا وَمَنْ تَابَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَاِنَّهٗ يَتُوْبُ اِلَى اللّٰهِ مَتَابًا
...এবং যারা আল্লাহর সাথে অন্য উপাস্যের ইবাদত করে না, আল্লাহ যার হত্যা অবৈধ করেছেন, সঙ্গত কারণ ব্যতীত তাকে হত্যা করে না এবং ব্যভিচার করে না। যারা এ কাজ করে, তারা শাস্তির সম্মুখীন হবে। কেয়ামতের দিন তাদের শাস্তি দ্বিগুণ হবে এবং তথায় লাঞ্ছিত অবস্থায় চিরকাল বসবাস করবে। কিন্তু যারা তাওবা করে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের গুনাহকে পুণ্য দ্বারা পরিবর্তন করে দিবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। যে তাওবা করে ও সৎকর্ম করে, সে ফিরে আসার স্থান আল্লাহর দিকে ফিরে আসে। [সূরা ফুরকান : ৬৮-৭১]
সহীহ বুখারীর এক রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে–
اَنَّ حَكِيْمَ بْنَ حِزَامٍ اَخْبَرَهُ اَنَّهُ قَالَ يَا رَسُوْلَ اللّٰهِ اَرَأَيْتَ اُمُوْرًا كُنْتُ اَتَحَنَّثُ اَوْ اَتَعَبَّدُ بِهَا فِي الْجَاهِلِيَّةِ مِنْ صِلَةٍ وَعَتَاقَةٍ وَصَدَقَةٍ فَهَلْ لِّيْ فِيهَا اَجْرٌ فَقَالَ حَكِيْمٌ رَضِيَ اللّٰهُ عَنْهُ قَالَ رَسُوْلُ اللّٰهِ صَلَّى اللّٰهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اَسْلَمْتَ عَلَى مَا سَلَفَ لَكَ مِنْ خَيْرٍ
হাকীম ইবনে হিযাম (রা.) রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করেছেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি বলুন, আমি জাহেলী যুগে দান-খয়রাত, গোলাম আযাদ ও আত্মীয়-স্বজনের সাথে সদ্ব্যবহার ইত্যাদি যেসব নেক কাজ করেছি, তাতে কি আমি প্রতিদান পাব? হাকীম ইবনে হিযام রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, তুমি তোমার অতীতের সৎকর্মসমূহ ইসলাম গ্রহণ করেছ। অর্থাৎ তুমি যেসব নেকীর কাজ করেছ, তার পূর্ণ প্রতিদান পাবে। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১২২০]
সুবহানাল্লাহ! আল্লাহু আকবার! সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়। যাবতীয় গুনাহের পরিবর্তে সাওয়াব লিখে দেওয়া হয়। তাওবার পর [ইসলাম গ্রহণের পর] জাহেলী যুগের [ইসলাম গ্রহণের পূর্বের] যাবতীয় নেককাজের প্রতিদান দেওয়া হয়। তা হলে আর বাকি থাকল কী?! আর কী চাইছি?
📄 তাঁর দয়া ও দানের শেষ নেই
আল্লাহ মহান। তাঁর দয়া অফুরান। তাঁর দয়া ও দানের কোনো সীম শেষ নেই; ক্ষমা ও মাগফিরাতের কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। তিনি তাওবা কবুলকারী। বান্দার তাওবা কবুল করেন। অনুতপ্ত বান্দাকে সামনে বরণ করেন। তিনি দয়াময়, মেহেরবান। তাঁর রহমত সর্বব্যাপী; সবকিছুকে আচ্ছন্নকারী। তাঁর দয়া ও দুয়ার নেককার-বদকার সকলের জন্য উন্মুক্ত।
বান্দা গুনাহ করে ফেলল।এর পর ফিরে এলে, তাওবা করলে আল্লাহ খুশি হন। মানুষ মাত্রই ভুলভ্রান্তি হতে পারে, বান্দা গুনাহ করতেই পারে; তবে সমস্যা হচ্ছে গুনাহকে অভ্যাসে পরিণত করে নেওয়া। অতঃপর গুনাহ করতেই থাকা। তাওবা না করা।
- আল্লাহ রহমান, রহীম।
- বান্দার প্রতি অত্যন্ত দয়ালু।
- তাঁর দয়া তাঁর ক্রোধের চেয়ে অগ্রগামী।
- তাঁর ক্ষমা তাঁর শাস্তির তুলনায় দ্রুতগামী।
- তিনি তাঁর বান্দাদের প্রতি তাদের পিতামাতার চেয়ে দয়ালু।
সহীহাইনেন বর্ণনায় এসেছে— নবীজী একবার এক যুদ্ধবন্দী নারীকে দেখিয়ে সাহাবায়ে কেরামকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা কি মনে কর এ স্ত্রীলোকটি তার সন্তানকে আগুনেন ফেলে দিতে পারবে? সাহাবায়ে কেরাম বললেন, ফেরার ক্ষমতা থাকলেও সে কখনোই ফেলবে না। নবীজী ইরশাদ করলেন—
أَ اللهُ أَرْحَمُ بِعِبَادِهِ مِنْ هَذِهِ بِوَلَدِهَا.
আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি তার চেয়েও বেশি দয়ালু। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫৯৯৪, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৭৯৯৪]
হ্যাঁ, প্রিয় পাঠক!
আমাদের আল্লাহ আমাদের প্রতি আমাদের পিতামাতার চাইতেও বেশি দয়ালু। তাঁর দয়া, অনুগ্রহ ও ক্ষমার বিশালতা লক্ষ করুন। তিনি সকলের জন্যই তাওবার দরজা খোলা রেখেছেন। কারও জন্যই বন্ধ নয়। এমনকি কাফের-মুশরিকদের জন্যও তাঁর দরজা বন্ধ নয়। যত বড় গুনাহগার ও পাপীই হোক না কেন, তাওবার দরজা তার জন্যও খোলা।
দেখুন সেই বৃদ্ধকে, যার বয়স অনেক হয়ে গেছে, বার্ধক্যে পিঠ বাঁকা হয়ে গেছে, হাড়গোড় দুর্বল হয়ে গেছে। তিনি এসেছেন নবীজীর দরবারে। নবীজী তখন সাহাবায়ে কেরামের মাঝে বসা ছিলেন। বৃদ্ধ অতি কষ্টে, পা টেনে টেনে, লাঠির উপর ভর করে এলেন। বয়সের ভারে তার ভ্রুযুগল চোখের উপর ঝুলে পড়েছিল। এগিয়ে এসে দাঁড়ালেন নবীজীর সামনে। অতঃপর বললেন –কথা বলতে তার কষ্ট হচ্ছিল— ইয়া রাসূলাল্লাহ! ওই ব্যক্তির ব্যাপারে আপনি কী বলেন, যে সব ধরনের গুনাহই করেছে! কোনো গুনাহই বাদ রাখেনি। ছোট-বড় এমন কোনো গুনাহ নেই, যা সে করেনি। তার গুনাহগুলো যদি সমস্ত জমিনবাসীর মাঝে বণ্টন করে দেওয়া হয়, তা হলে তা সকলকেই বরবাদ করে দিবে। ইয়া রাসূলাল্লাহ! এমন ব্যক্তির জন্য কি তাওবার কোনো সুযোগ আছে?
আশ্চর্যের কথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ তার দিকে চোখ তুলে তাকালনে। দেখলেন, অতিশয় বৃদ্ধ এক লোক। বয়সের ভারে পিঠ বাঁকা হয়ে গেছে। জীবনের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে।
রাসূলুল্লাহ্ তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি ইসলাম গ্রহণ করেছ?
লোকটি জবাব দিলেন, আমি এ কথার সাক্ষ্য দেই যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং আপনি আল্লাহর রাসূল।
রাসূলুল্লাহ্ বললেন, তা হলে তুমি নেক ও কল্যাণের কাজ করে যাও, গুনাহ পরিত্যাগ কর, আল্লাহ তোমার সবককে নেকী দ্বারা পরিবর্তন করে দিবেন।
বৃদ্ধ বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার যত ধোঁকাবাজি, অন্যায়-অবিচার ও পাপাচার সবই?!
নবীজী বললেন, হ্যাঁ।
এ কথা শুনে বৃদ্ধ চিৎকার করে উঠলেন— আল্লাহু আকবার... আল্লাহু আকবার... আল্লাহু আকবার...! এভাবে চিৎকার করতে করতে আড়ালে হয়ে গেলেন। [তবরাণী, মুসনাদে বাযযার]