📄 লুইস তাসে’র আক্রমণ
চলুন, ৬৪৭ হিজরীর দিকে একটু মনোনিবেশ করি-
৬৪৭ হিজরীতে মালিকুস সালেহ নাজমুদ্দীন আইয়ূব রহ. মারাত্মক ব্যাধিতে আক্রান্ত হন। বার্ধক্যে উপনীত হওয়া ছাড়াও যক্ষারোগে আক্রান্ত হন। এতে তিনি শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। সে সময় ফ্রান্সের রাজা লুইস তাসে' মুসলিমবিশ্বের পূর্বাঞ্চলে তাতারী আক্রমণ করার সুযোগ সন্ধান করছিল। নাজমুদ্দীন রহ. অসুস্থতার সুযোগে সে মুসলিম বিশ্বের মিশর ও সিরিয়ায় আক্রমণ করে বসে। আমরা ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি যে, লুইস তাসে' পূর্বে তাতার সম্রাট কাযুক ইবনে উকিতাই এর সহযোগিতা লাভের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তার চেষ্টা ব্যর্থ হয়। তবে লুইস তাসে' আক্রমণ অব্যাহত রাখে।
আক্রমণের জন্য সর্বপ্রথম মিশরের শহর দিময়াত নগরীকে বেছে নেয়। কারণ, দিময়াত নগরী তৎকালীন ভূমধ্যসাগরের পূর্বদিকের সবচেয়ে বড় বন্দর। এই আক্রমণকে মুসলিম ইতিহাসের 'সপ্তম ক্রুশেড আক্রমণ' নামে আখ্যায়িত করা হয়।
এখানে আমরা এই আক্রমণের বিস্তারিত আলোচনা করব না। যদিও এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। 'ক্রুশেড আক্রমণ' কিতাবে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।
৬৪৭ হিজরীর ২০ শে সফর লুইস তাসে' দলবল নিয়ে দিময়াত নগরীতে অবতরণ করে। আফসোস! শহর প্রতিরক্ষাবাহিনী ভেবেছিল যে, তাদের সুলতান নাজমুদ্দীন আইয়ূব ইন্তেকাল করেছেন। ফলে তারা শহর ছেড়ে পলায়ন করে। আর খুব সহজে খ্রিস্টানদের হাতে দিময়াত নগরীর পতন ঘটে। এটি সেই শহর, যা ইতিপূর্বে খ্রিস্টানদের পঞ্চম আক্রমণের সময় ধোঁকা খেয়েছিল। নাজমুদ্দীন আইয়ূব রহ. এ সংবাদ পেয়ে যারপরনাই ব্যথিত হন এবং দিময়াত পতনের কারণে দায়িত্বশীলদের শাস্তি প্রদান করেন। তিনি ভবিষ্যদ্বাণী প্রদান করেন, খ্রিস্টানরা মিশরের রাজধানী কায়রো আক্রমণের জন্য নীলনদ পাড়ি দিয়ে অগ্রসর হবে। এর মাধ্যমে তারা মিশর সাম্রাজ্য পতনের প্রয়াস চালাবে।
তিনি বিজ্ঞোচিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, কায়রো ও দিময়াতের মাঝপথে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হোক। এ জন্য তিনি 'মানসুরা' শহর নির্বাচন করেন। কারণ, মানসুরা শহর নীলনদের পাড়ে অবস্থিত। বাস্তবেই খ্রিস্টানরা অসংখ্য জাহাজ নিয়ে সমুদ্রপথ পাড়ি দেওয়ার জন্য নীলনদকে বেছে নেয়।
মালিকুস সালেহ নাজমুদ্দীন রহ. নীলনদের তীরে অবস্থিত মানসুরা শহরে তাকে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। কারণ, সেখানে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ চলছে। বাস্তবেই তিনি দুরারোগে আক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও তাকে মানসুরা শহরে নিয়ে যাওয়া হয়। এদিকে ফারেসুদ্দীন আকতাই ও রুকন উদ্দীন বাইবার্স যুদ্ধের সুষ্ঠু পরিকল্পনা করতে থাকেন।
📄 আল মালিকুস সালেহ নাজমুদ্দীন আইয়ূব রহ. এর ইন্তেকাল
১২ই শাবান ৬৪৭ হিজরীতে খ্রিস্টানরা দিময়াত শহর থেকে কায়রোর উদ্দেশে নীলনদ পাড়ি দেওয়ার জন্য রওয়ানা হয়। নিশ্চিত ছিল যে, তারা মানসুরা নগরীর পাশ দিয়ে অতিক্রম করবে। যেমনটি নাজমুদ্দীন আইয়ূব রহ. ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। কিন্তু আল্লাহর কী মহিমা! ১৫ ই শাবান দিবাগত রজনী ৬৪৭ হিজরীতে আল মালিকুস সালেহ নাজমুদ্দীন আইয়ূব রহ. ইন্তেকাল করেন। তখন তিনি কায়রো রক্ষার উদ্দেশ্যে মানসুরা শহরে সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করছিলেন। আল্লাহ তা'আলা তাকে ক্ষমা করুন, তার প্রতি রহমত নাজিল করুন এবং তাকে শাহাদাতের মর্যাদায় ভূষিত করুন। আমীন।
আন নুজুমুয যাহেরা ফি মুলুকি মিশর ওয়াল কাহেরা নামক কিতাবের লেখক ইবনে তাগরী বারদী রহ. [মৃত্যু ৮৭৪ হি.] লেখেন—
'মুসলমানদের রক্ষা করার উদ্দেশ্যে মানসুরা নামক স্থানে দুরারোগে আক্রান্ত অবস্থায় যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ ব্যতীত মালিকুস সালেহ নাজমুদ্দীন আইয়ূব রহ. অন্য কোনো নেক আমল না থাকলেও তার নাজাতের জন্য এটিই যথেষ্ট।'
এরপর তিনি লেখেন, তিনি ছিলেন ধৈর্যের পাহাড় ও সুমহান ব্যক্তিত্বের অধিকারী।
মুসলমানদের জন্য এ ছিল মহাসংকট! শুধু মুসলিম নেতার বিয়োগের কারণে নয়, বরং তৎকালীন সংকটময় মুহূর্তে মুসলিম খলিফার ইন্তেকালের কারণে, যখন দেশ ছিল বিপদসংকুল, দিময়াত বন্দর ছিল বেদখল। খ্রিস্টান বাহিনী ছিল মাঝপথে।
তখন সুলতান নাজমুদ্দীন রহ. এর স্ত্রী বিজ্ঞোচিত পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তার নাম ছিল 'শাজারাতুদ দুর'। শাজারাতুদ দুর মূলত তুর্কী কিংবা আর্মেনিয়ার বাঁদি ছিলেন। সুলতান তাকে ক্রয় করে পরবর্তীতে আজাদ করে বিয়ে করেন। তাই তিনিও মূলত মমলুক ছিলেন।
📄 নাজমুদ্দীনের মৃত্যুর পর স্ত্রী শাজারাতুদ দুর কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপ
স্ত্রী শাজারাতুদ দুর সুলতানের মৃত্যুর সংবাদ গোপন রেখে বললেন, ডাক্তারগণ তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে নিষেধ করেছেন এবং তিনি সুলতানের ছেলে তাওরান শাহ ইবনে নাজমুদ্দীন আইয়ূব, [যিনি কিফা নামক শহরের গভর্নর ছিলেন]। তার নিকট খুব দ্রুত তার পিতার মৃত্যুসংবাদ জানিয়ে এই মর্মে চিঠি প্রেরণ করেন যে, তিনি যেন ফিরে এসে মিশর ও সিরিয়ার রাজত্বভার গ্রহণ করেন। তিনি মুখ্যমন্ত্রী ফখরুদ্দীন ইউসুফের সঙ্গে তাকে যাবতীয় দায়িত্ব অর্পণের ব্যাপারে একমত হন এবং ফারেসুদ্দীন আকতাই ও রুকন উদ্দীন বাইবার্সকে মানসুরার যুদ্ধপ্রস্তুতি জারি রাখার নির্দেশ প্রদান করেন। শাজারাতুদ দুরের বিচক্ষণতা ও বুদ্ধিমত্তার কারণে সুলতানের মৃত্যুর পরও সবকিছু ঠিকঠাক চলতে থাকে। সুলতানের মৃত্যুর পর যে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিরাজ করার কথা ছিল, তা আর হয় না।
শাজারাতুদ দুর কর্তৃক যাবতীয় সতর্কতা অবলম্বন সত্ত্বেও সুলতানের মৃত্যু সংবাদ ধীরে ধীরে জনগণের কাছে পৌঁছে যায়। এমনকি খ্রিস্টানদের পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এতে খ্রিস্টানদের সাহস বেড়ে যায় এবং মিশরীয় বাহিনীর মনোবল হ্রাস পায়। যদিও তারা মানসুরা ভূমিতে অবিচল থাকে। ফারেসুদ্দীন আকতাই ও রুকন উদ্দীন বাইবার্স ফ্রান্স বাহিনীর মোকাবেলায় চমৎকার পদক্ষেপ গ্রহণ করেন এবং তা শাজারাতুদ দুরের সামনে পেশ করেন। তাওরান শাহের আগমন পর্যন্ত শাজারাতুদ দুর ভারপ্রাপ্ত সুলতানের ভূমিকা পালন করেন। তিনি তাদের যুদ্ধকৌশলকে সমর্থন করেন এবং মিশরীয়বাহিনী যুদ্ধের চূড়ান্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করে।
📄 মানসুরার যুদ্ধ
৪ ই যিলকদ ৬৪৭ হিজরীতে মানসুরা নগরীতে এক মহাযুদ্ধ সংঘটিত হয়। যুদ্ধে মুসলমানরা কল্পনাতীত জয়লাভ করেন। যুদ্ধের চমৎকার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ রয়েছে, তবে স্থান অনুপযোগী হওয়ায় তা ছেড়ে দেওয়া হলো।
৭ই যিলকদ ৬৪৭ হিজরীতে লুইস তাসে'র সৈন্যবাহিনীর ওপর মানসুরার বাইরে আরেক বার আক্রমণ হয়। তবে লুইস তাসে' কোনোমতে এই আক্রমণ প্রতিরোধ করে।
এই দ্বিতীয় আক্রমণের দশ দিন পর ১৭ই যিলকদ ৬৪৭ হিজরীতে তাওরান শাহ আগমন করেন এবং রাজত্বভার গ্রহণ করেন। এরপর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে মালিকুস সালেহ নাজমুদ্দীন আইয়ূব রহ. এর ইন্তেকাল ও তার ক্ষমতাসীন হওয়ার ঘোষণা দেন। তিনি নতুনভাবে খ্রিস্টানদের আক্রমণ করার পরিকল্পনা করতে শুরু করেন। তখন খ্রিস্টান বাহিনী ছিল বিপর্যস্ত। দিময়াত নগরী ছেড়ে তারা পালাতে শুরু করেছিল। তারা বিগত পরাজয়সমূহ বিশেষত মানসুরার যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার ফলে এবং তাওরান শাহের আগমনসংবাদ পেয়ে মনোবল হারিয়ে ফেলেছিল।
সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণ শেষে তাওরান শাহ ইবনে সালেহ আইয়ূব মানসুরার যুদ্ধের দুই মাস পর ৬৪৮ হিজরীর মহররম মাসের শুরুর দিকে দ্বিতীয়বার খ্রিস্টানদের ওপর আক্রমণ করার জন্য ফারেসকুর নামক শহরের কাছে মিশরীয় বাহিনীকে প্রস্তুত করেন। সেখানে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যুদ্ধে খ্রিস্টান বাহিনী পিষ্ট হয়। লুইস তাসে' গ্রেপ্তার হয়। লুইস তাসে'কে বেড়ি পরিয়ে টেনে-হেঁচড়ে মানসুরা নগরীতে নিয়ে আসা হয় এবং ফখরুদ্দীন ইবরাহীম ইবনে লুকমানের ঘরে তাকে বন্দী করে রাখা হয়। খ্রিস্টান বাহিনী পালাবার কোনো সুযোগ পায়না। নিহত হয় অথবা বন্দী!
বন্দীদশা থেকে মুক্তি পেতে লুইস তাসে'র সামনে কঠিন কয়েকটি শর্তারোপ করা হয়। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য শর্ত হলো— ১. আট লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা অর্পণ করতে হবে। অর্থেক নগদ, অর্ধেক বাকি। ২. অবশিষ্ট স্বর্ণমুদ্রা প্রদান পর্যন্ত অন্যান্য সৈন্য বন্দী থাকবে। ৩. মুসলিম বন্দীদের ছেড়ে দিতে হবে। ৪. দিময়াত নগরী মুসলমানদের হাতে ছেড়ে দিতে হবে। ৫. দুই দলের মাঝে দশ বছর যুদ্ধবিরতি থাকবে।
সার্বিক বিবেচনায় মুসলমানগণ অভাবনীয় বিজয় লাভ করেছিল।
লুইস তাসে' বহু কষ্টে চার লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা ব্যবস্থা করে। এরপর তাকে তৎকালীন খ্রিস্টানদের প্রধান সাম্রাজ্য আক্কা নগরীতে ছেড়ে দেওয়া হয়। আল্লাহ যেন আক্কা নগরীকে ইহুদীদের অশুভ থাবা থেকে রক্ষা করেন। আমীন।