📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 দাস/মামলুক বংশের পরিচয়

📄 দাস/মামলুক বংশের পরিচয়


আরবী ভাষায় 'মামলুক' বলা হয় গোলাম বা দাসকে। বিশেষত সেই সব লোককে 'মামলুক' বলা হয়, যারা যুদ্ধে বন্দী হয়েছে। তবে তাদের বাবা-মা বন্দী হয়নি। 'মামলুক' একবচন। এর বহুবচন হলো 'মামালিক'। মোটকথা, সেই গোলামকে মামলুক বলা হয়, যাকে কেনাবেচা করা হয়। [আর যেসব লোক বাবা-মাসহ বন্দী হয়, তাদের আরবী ভাষায় 'কিন' বলা হয়; মামলুক নয়। তবে 'মামলুক' শব্দ উল্লেখিত সংজ্ঞা অনুযায়ী ব্যাপকার্থে সকল দাসের ওপরই প্রয়োগ হয়। তবে ইসলামী ইতিহাসের পরিভাষায় মামলুক শব্দটি বিশেষ অর্থ প্রদান করে। এটি পারিভাষিক রূপ লাভ করে প্রসিদ্ধ আব্বাসী খলিফা মামুনুর রশীদের আমল [১৯৮হি.-২১৮ হি.] ও তাঁর ভাই মু'তাসিম বিল্লাহের শাসনামল [২১৮-২২৮ হি.] থেকে। এই দুই মহান খলিফা তাদের শাসনামলে দাস ব্যবসায়ীদের বাজার থেকে তারা বহুসংখ্যক দাস/মামলুক ক্রয় করে আনেন এবং তাদের প্রভাব জোরদার করার জন্য সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে তাদের যুদ্ধের কাজে ব্যবহার করেন।
দিনে দিনে মামলুকরাই অধিকাংশ মুসলিম দেশে যুদ্ধের প্রধান শক্তি, কখনো কখনো একক শক্তি হয়ে দাঁড়ায়। আইয়ূবী সাম্রাজ্যের আমীরগণ নিজেদের ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিশেষভাবে দাসবংশের ওপর ভরসা করতেন। যুদ্ধে তাদের কাজে লাগাতেন। কিন্তু সংখ্যায় তারা খুবই কম ছিল। একসময় নাজমুদ্দীন রহ. শাসনামলে যখন খাওয়ারের্যমরা তার দল থেকে বের হয়ে যায়, তখন নাজমুদ্দীন রহ.-এর তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে বাধ্য হন। এভাবেই বিশ্বমানচিত্রে দাসবংশের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, বিশেষত মিশরে।

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 দাস বংশের উৎস

📄 দাস বংশের উৎস


দাসদের প্রধান উৎস ছিল— ১. হয়তো যুদ্ধে বন্দী হয়ে আসা ২. অথবা ক্রয় করা।
মা ওরাউন নাহার থেকে সবচেয়ে বেশি দাস আমদানী হতো। মাওরাউন নাহার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো জাইহুন নদী, যা তুমেনিস্তান ও আফগানিস্তানে উত্তর এবং উজবেকিস্তান ও তজাকিস্তানের দক্ষিণে প্রবাহিত। এসব অঞ্চলের মূল অধিবাসীরা হলো তুর্কী। এসব এলাকা সর্বদা অস্থিতিশীল থাকত। একের পর এক যুদ্ধ-বিগ্রহ লেগেই থাকত। তাই এসব অঞ্চল থেকে আমদানিকৃত বন্দীদের সংখ্যা বেশি হতো। তৎকালে 'দাস শহর' হিসেবে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ শহর ছিল সমরকন্দ, ফারগানা, খাওয়ারের্যম ইত্যাদি। তাই তুর্কী বংশোদ্ভূত অধিকাংশই দাস। তা ছাড়াও এসব অঞ্চলে আর্মেনিয়া, মঙ্গোল ও ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত দাসরাও ছিল। এ সকল ইউরোপীয়রা সকালিয়া নামে পরিচিত ছিল। তারা বিশেষভাবে পূর্ব ইউরোপ থেকে আগমন করত।
এ ছিল শত বছরের নিত্য ঘটনা। তবে নাজমুদ্দীন আইয়ূবী রহ. ও তার অনুসরণে পরবর্তী মামলুক সাম্রাজ্যে সুলতানরাও অল্প বয়স্ক দাসদের ক্রয় করতেন। অর্থাৎ তারা উঠতি বয়সের দাসদের ক্রয় করতেন। অধিকাংশ দাস অমুসলিম রাষ্ট্র থেকে আগমন করত। যদিও মাঝে মাঝে আরবি বলতে পারে না এমন মুসলিম সন্তান বন্দী হওয়ার সংবাদ পাওয়া যেত। তবে তাদের চেনা যেত না। চেনা যেত না তাদের বংশ ও ধর্ম। ফলে তাদের সঙ্গেও দাসের ন্যায় আচরণ করা হতো।

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 দাসদের প্রতিপালন

📄 দাসদের প্রতিপালন


নাজমুদ্দীন আইয়ূব ও অন্যান্য আমীরগণ মমলুকদের সঙ্গে দাসের ন্যায় আচরণ করতেন না; বরং সম্পূর্ণ বিপরীত আচরণ করতেন। তাদের নিজেদের ঔরসজাত সন্তানের চেয়ে অধিক আপন মনে করতেন। কখনোই মালিক ও মমলুকের মধ্যকার সম্পর্ক মুনিব ও গোলামের মতো ছিল না; বরং শিক্ষক-ছাত্র কিংবা পিতা-পুত্রের সম্পর্ক ছিল। তাদের সম্পর্ক ছিল মহব্বত-ভালোবাসার সম্পর্ক। তাই মামলুকরা তাদের মুনিবকে 'উস্তাদ বা সাইয়িদ' উপাধিতে সম্বোধন করত। ক্রয়কৃত ছোট্ট দাসদের কীভাবে লালন-পালন করা হতো, এখনো যাদের শৈশবকাল অতিবাহিত হয়নি? মাক্রিজী রহ. এ প্রশ্নের উত্তরে বলেন-
"তাদের প্রথমত আরবি ভাষায় লেখাপড়া শেখানো হতো। এরপর এমন কারও হাতে তাদেরকে সোপর্দ করা হতো, যিনি তাদেরকে কুরআনে কারীম শিক্ষা দিতেন। এরপর ফিকহে ইসলামীর প্রাথমিক জ্ঞান ও শিষ্টাচার শিক্ষা দেওয়া হতো। নামাজ আদায়ের গুরুত্ব প্রদান করা হতো। অনুরূপ মাসনুন আমল ও দুআ শিক্ষা দেওয়া হতো। মামলুকরা দক্ষ তত্ত্বাবধানে বেড়ে উঠত। তারা কোনো ভুলের শিকার হলে ইসলামী বিধান শিক্ষা প্রদান করত। তাদের সতর্ক করা হত।"
মামলুকদের প্রতিপালন-নীতি থেকে একথা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, সেই যুগটি ছিল দক্ষ ও আন্তরিক দায়ী ও অভিভাবকের যুগ। যারা ছোটদের সঠিক পন্থায় বেড়ে ওঠার প্রতি পূর্ণ গুরুত্বারোপ করতেন। এতে তারা খুব সহজেই কঠিন ও জটিল বিষয়গুলোকে মেনে নিতে পারত। কারণ, তাদের মেধা-মস্তিষ্কে কোনো বক্রতা ছিল না। তারা হৃদয়াত্মায় কোনো ভ্রান্ত মতবাদ লালন করত না। ফলে তারা যাবতীয় কঠিন দায়িত্ব ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ উত্তম পন্থায় আঞ্জাম দিত।
প্রতিপালনের এ সকল ধাপ মুনিবগণ নিজেরাই তত্ত্বাবধান করতেন। এমনকি কখনো কখনো সুলতান নাজমুদ্দীন আইয়ূব রহ. নিজেই তাদের থাকা-খাওয়া নিশ্চিত করতেন। অনেক সময় তাদের সঙ্গে খেতে বসতেন, তাদের সঙ্গে খোশ মেজাজে কথা বলতেন। মামলুকগণও তাকে সত্যিকার অর্থে ভালোবাসত। তার প্রতি ছিল পরিপূর্ণ আনুগত্য-পরায়ণ।
এটাই নিয়ম, যখন রাজা কিংবা নেতা প্রজা বা জনসাধারণের ব্যথায় ব্যথিত হবেন, তাদের সুখে আনন্দ প্রকাশ করবেন, তাদের খোঁজখবর নেবেন, তাদের সঙ্গে ওঠা-বসা করবেন, তারাও তাকে মনেপ্রাণে ভালোবাসবে, তার প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধাপ্রদর্শন করবে। নিঃসন্দেহে তার প্রতি তারা হবে আস্থাভাজন। যখন তিনি তাদের জিহাদের প্রতি আহ্বান করবেন, তারা সকলে দ্রুত তার ডাকে সাড়া দেবে। কোনো কিছুর নির্দেশ দিলে, তা পালনের জন্য প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবে। তা বাস্তবায়নের জন্য প্রাণ পর্যন্ত বিসর্জন দেবে। পক্ষান্তরে নেতা যখন জনসাধারণ থেকে দূরে থাকবেন, একাকী জীবনযাপন করবেন, ভোগ-বিলাসে মত্ত থাকবেন, তাদের দুঃখের কোনো খোঁজখবর নিবেন না, তখন তারাও নেতার আদেশ নিষেধের পরোয়া করবে না। এমনকি অনেক সময় তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে।
দ্বীনদারী ও সামরিকবিদ্যায় কোন মমলুক উৎকৃষ্ট বিবেচিত হলে ধীরে ধীরে তার পদোন্নতি হতো। একপর্যায়ে সে অন্যান্য মামলুকদের নেতায় পরিণত হতো। এরপর আরও পারদর্শী হলে তাকে রাজ্যের বিশেষ পদ প্রদান করা হত। এভাবে সে এতোপর্যায়ে আঞ্চলিক আমীরের পদ লাভ করত, সেনাপতির আসনে আসীন হত।
সাধারণত মামলুকদের তাদের— সাইয়িদ যিনি তাদেরকে ক্রয় করেছেন—তার নামের দিকে সম্বন্ধ করে ডাকা হতো। সুতরাং যাদের মালিকুস সালেহ ক্রয় করেছেন, তাদের সালেহিয়া, যাদের মালিকুল কামেল ক্রয় করেছেন তাদের কামেলিয়া বলে ডাকা হতো ইত্যাদি।
সালেহিয়া মামলুকগণের সংখ্যা অধিক বৃদ্ধি পেয়েছিল। নাজমুদ্দীন আইয়ূব রহ. এর যুগে তাদের মর্যাদাও বৃদ্ধি পেয়েছিল। এমনকি নাজমুদ্দীন আইয়ূব রহ. নীলনদের তীরে নিজের জন্য একটি প্রাসাদ নির্মাণ করলে পাশেই সালেহিয়া মামলুকদের জন্য একটি পূর্ণ দুর্গ প্রতিষ্ঠা করেন। প্রাসাদ ও দুর্গটি কায়রোর পর্যটন অঞ্চলে নির্মাণ করা হয়েছিল। নীলনদ সে সময় 'বাহর' [সমুদ্র] নামে পরিচিত ছিল। এ কারণে সালেহিয়া মামলুকগণ 'বাহরিয়া মামলুক' নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। কারণ, তারা বাহর [সমুদ্র] পাড়ে বাস করত।
এভাবেই আল মালিকুস সালেহ নাজমুদ্দীন আইয়ূব রহ. যে সকল মামলুক সাম্রাজ্য ও সৈন্যবাহিনীর উচ্চপদে অধিষ্ঠিত হয়েছে, তাদের সহযোগিতায় নিজ সাম্রাজ্যকে শক্তিশালী করেছেন। তার যুগে মামলুক 'ফারেসুদ্দীন আকতাই' সেনাপ্রধানের পদের অধিষ্ঠিত হয়েছেন এবং সহকারী সেনা প্রধানের পদে অধিষ্ঠিত হন মামলুক 'রুকন উদ্দীন বাইবার্স'। তারা উভয়েই বাহরিয়া মামলুক ছিলেন।

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 লুইস তাসে’র আক্রমণ

📄 লুইস তাসে’র আক্রমণ


চলুন, ৬৪৭ হিজরীর দিকে একটু মনোনিবেশ করি-
৬৪৭ হিজরীতে মালিকুস সালেহ নাজমুদ্দীন আইয়ূব রহ. মারাত্মক ব্যাধিতে আক্রান্ত হন। বার্ধক্যে উপনীত হওয়া ছাড়াও যক্ষারোগে আক্রান্ত হন। এতে তিনি শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। সে সময় ফ্রান্সের রাজা লুইস তাসে' মুসলিমবিশ্বের পূর্বাঞ্চলে তাতারী আক্রমণ করার সুযোগ সন্ধান করছিল। নাজমুদ্দীন রহ. অসুস্থতার সুযোগে সে মুসলিম বিশ্বের মিশর ও সিরিয়ায় আক্রমণ করে বসে। আমরা ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি যে, লুইস তাসে' পূর্বে তাতার সম্রাট কাযুক ইবনে উকিতাই এর সহযোগিতা লাভের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তার চেষ্টা ব্যর্থ হয়। তবে লুইস তাসে' আক্রমণ অব্যাহত রাখে।
আক্রমণের জন্য সর্বপ্রথম মিশরের শহর দিময়াত নগরীকে বেছে নেয়। কারণ, দিময়াত নগরী তৎকালীন ভূমধ্যসাগরের পূর্বদিকের সবচেয়ে বড় বন্দর। এই আক্রমণকে মুসলিম ইতিহাসের 'সপ্তম ক্রুশেড আক্রমণ' নামে আখ্যায়িত করা হয়।
এখানে আমরা এই আক্রমণের বিস্তারিত আলোচনা করব না। যদিও এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। 'ক্রুশেড আক্রমণ' কিতাবে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।
৬৪৭ হিজরীর ২০ শে সফর লুইস তাসে' দলবল নিয়ে দিময়াত নগরীতে অবতরণ করে। আফসোস! শহর প্রতিরক্ষাবাহিনী ভেবেছিল যে, তাদের সুলতান নাজমুদ্দীন আইয়ূব ইন্তেকাল করেছেন। ফলে তারা শহর ছেড়ে পলায়ন করে। আর খুব সহজে খ্রিস্টানদের হাতে দিময়াত নগরীর পতন ঘটে। এটি সেই শহর, যা ইতিপূর্বে খ্রিস্টানদের পঞ্চম আক্রমণের সময় ধোঁকা খেয়েছিল। নাজমুদ্দীন আইয়ূব রহ. এ সংবাদ পেয়ে যারপরনাই ব্যথিত হন এবং দিময়াত পতনের কারণে দায়িত্বশীলদের শাস্তি প্রদান করেন। তিনি ভবিষ্যদ্বাণী প্রদান করেন, খ্রিস্টানরা মিশরের রাজধানী কায়রো আক্রমণের জন্য নীলনদ পাড়ি দিয়ে অগ্রসর হবে। এর মাধ্যমে তারা মিশর সাম্রাজ্য পতনের প্রয়াস চালাবে।
তিনি বিজ্ঞোচিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, কায়রো ও দিময়াতের মাঝপথে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হোক। এ জন্য তিনি 'মানসুরা' শহর নির্বাচন করেন। কারণ, মানসুরা শহর নীলনদের পাড়ে অবস্থিত। বাস্তবেই খ্রিস্টানরা অসংখ্য জাহাজ নিয়ে সমুদ্রপথ পাড়ি দেওয়ার জন্য নীলনদকে বেছে নেয়।
মালিকুস সালেহ নাজমুদ্দীন রহ. নীলনদের তীরে অবস্থিত মানসুরা শহরে তাকে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। কারণ, সেখানে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ চলছে। বাস্তবেই তিনি দুরারোগে আক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও তাকে মানসুরা শহরে নিয়ে যাওয়া হয়। এদিকে ফারেসুদ্দীন আকতাই ও রুকন উদ্দীন বাইবার্স যুদ্ধের সুষ্ঠু পরিকল্পনা করতে থাকেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00