📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 ন্যায়পরায়ণ বাদশা নাজমুদ্দীন আইয়ূব

📄 ন্যায়পরায়ণ বাদশা নাজমুদ্দীন আইয়ূব


এখন আমরা বিরোধ ও বিভক্তির পঞ্চাশ বছরের ইতিহাস ছেড়ে দিয়ে আইয়ূবী সাম্রাজ্যের শেষ দশ বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করব। যা শুরু হয়েছে ৬৩৭ হিজরী থেকে। এটা সে সময়ের কথা যখন মিশরের আইয়ূবী সাম্রাজ্যের সিংহাসনে নাজম উদ্দীন আইয়ূবী রহ. সমাসীন হয়েছিলেন, যাকে সুলতান সালাহ উদ্দীনের পর আইয়ূবী সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠ সুলতান মনে করা হয়। কিন্তু আক্ষেপের বিষয় হলো, অধিকাংশ মুসলমান, এমনকি মিশরীয় মুসলমানগণও, যা ছিল তার অবস্থানস্থল, এই মহান সুলতান সম্পর্কে কিছুই জানেন না!
সুলতান নাজমুদ্দীন আইয়ূবী রহ. ৬৩৭ হিজরীতে মিশরের ক্ষমতা গ্রহণ করেন।
সে সময়ের চলমান রীতি অনুযায়ী সিরিয়ায় আইয়ূবী নেতারা মিশর খেলাফতের বিরুদ্ধে তার সঙ্গে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করল। তাদের মাঝে বহু যুদ্ধ ও সংঘর্ষ ঘটল। ৬৪১ হিজরীতে যখন নাজমুদ্দীন আইয়ূবীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য সিরিয়ার সকল আইয়ূবী শক্তি ঐক্যবদ্ধ হলো এবং খ্রিস্টানদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হলো, তখন তাদের বিরোধ চূড়ান্ত রূপ ধারণ করল। বিনিময়ে সিরিয়ার আইয়ূবী নেতারা খ্রিস্টানদের জন্য বাইতুল মাকদিস ছেড়ে দেবে!! [যেই বাইতুল মাকদিস সালাহ উদ্দীন রহ. খ্রিস্টানদের হাত থেকে পুনরুদ্ধার করেছিলেন]
সত্যিই কেউ কল্পনাও করতে পারবে না যে, কীভাবে তারা খ্রিস্টানদের বাইতুল মাকদিস ছেড়ে দিতে চাইল? সত্যিকার অর্থের মুসলমানরা নিজ ভূখণ্ড যত ক্ষুদ্রই হোক না কেন, তা অন্যকে ছেড়ে দিতে পারে না। সেখানে বাইতুল মাকদিস ছাড়বে কীভাবে? যেখানে রয়েছে মসজিদে আকসা, যা খ্রিস্টানদের হাত থেকে বীরসেনানী সালাহ উদ্দীন আইয়ূবী আযাদ করেছিলেন। যা স্বাধীন করতে গিয়ে বহু প্রাণ বিসর্জিত হয়েছে এবং মুসলমানরা সহ্য করেছে বহু ঘাত-প্রতিঘাত, যুদ্ধ-সংগ্রাম। কিন্তু হায়।-এ কী ঘটছে?!
সিরিয়ার আইয়ূবী নেতারা খ্রিস্টানদের হাতে হাত মেলাল। মিশর অভিমুখে আক্রমণ শুরু করল। এদিকে মিশরে নাজমুদ্দীন আইয়ূব রহ. সৈন্যবাহিনী প্রস্তুত করেছেন। রুকন উদ্দীন বাইবার্সকে যুদ্ধের সেনাপতির দায়িত্ব অর্পণ করেছেন। মূলত খ্রিস্টান ও সিরিয়ার বিশাল বাহিনীর সঙ্গে তুলনা করলে মিশরীয় বাহিনী খুব সামান্য ও অতি দুর্বল মনে হয়। তাই নাজমুদ্দীন রহ. যে সকল খাওয়ারের্যম যোদ্ধা তাতারীদের হাতে খাওয়ারের্যম পতনের পর পলায়ন করেছিল, তাদের কাছে সহযোগিতা চান। খাওয়ারের্যম পতনের ইতিহাস পূর্বে আমরা সবিস্তার আলোচনা করেছি।
খাওয়ারের্যমের সৈন্যবাহিনী মূলত ছিল ভাড়াটে সৈন্য। অর্থাৎ যারা তাদের অধিক পারিশ্রমিক দেয়, তাদের হয়েই তারা যুদ্ধ করে। সম্পদের বিনিময়ে তারা রণখেদমত আঞ্জাম দেয়। তাই নাজমুদ্দীন রহ. মজুরির বিনিময়ে তাদের কাছে সাহায্য কামনা করেন। নাজমুদ্দীন আইয়ূবী এবং খ্রিস্টান-আইয়ূবীদের যৌথশক্তির মাঝে এক বিরাট রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধটি গাজার যুদ্ধ নামে পরিচিত। ৬৪২ হিজরীতে যুদ্ধটি সংঘটিত হয়। জায়গাটি ফিলিস্তিনের গাজার খুব কাছে অবস্থিত। আমরা গাজাসহ গোটা ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার জন্য দুআ করি।
যুদ্ধে নাজমুদ্দীন আইয়ূব রহ. বিশাল জয়লাভ করেন। খ্রিস্টানদের প্রায় ত্রিশ হাজার যোদ্ধা নিহত হয় এবং বিপুলসংখ্যক আমীর-উমারা ও রাজা-বাদশা বন্দী হয়। অনুরূপ আইয়ূবীদের বন্দী আমীর-উমারাদের সংখ্যা অনেক। নাজমুদ্দীন আইয়ূব রহ. এটাকে মোক্ষম সুযোগ মনে করে বাইতুল মাকদিস অভিমুখে রওয়ানা হন, সিরিয়ার আইয়ূবী নেতারা যা খ্রিস্টানদের অর্পণ করেছিল। খ্রিস্টানদের দুর্গসমূহে আক্রমণ করেন এবং খাওয়ারের্যম বাহিনীর সহযোগিতায় এই পবিত্র নগরী ৬৪৩ হিজরীতে খ্রিস্টানদের হাত থেকে আযাদ করেন। এরপর থেকে দীর্ঘ সাতশ বছর পর্যন্ত খ্রিস্টানরা এই পবিত্র ভূমিতে প্রবেশ করতে পারে না। এরপর ব্রিটিশ সৈন্যরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে মুস্তফা কামাল আতাতুর্কের কুখ্যাত বিশ্বাসঘাতকতায় বাইতুল মাকদিসে প্রবেশ করে। দুআ করি আল্লাহ তা'আলা যেন আবার মাসজিদে আকসাকে ইসলাম ও মুসলমানদের কাছে ফিরিয়ে দেন!
অতঃপর নাজমুদ্দীন রহ. দামেস্ক প্রবেশ করেন এবং নতুনভাবে মিশর ও সিরিয়া তাওহীদের পতাকাতলে নিয়ে আসেন। শুধু এতটুকুই নয়, বরং খ্রিস্টান সাম্রাজ্যের অধীনস্থ কতিপয় মুসলিম নগরী স্বাধীন করার প্রতি মনোযোগ দেন এবং তবারী, আসকালান ইত্যাদি শহরগুলো স্বাধীন করেন।
তবে নাজমুদ্দীন আইয়ূব রহ. এর দলে দ্রুত একটি দুর্ঘটনা ঘটে। তা হলো, ভাড়াকৃত খাওয়ারের্যম বাহিনী তার দল থেকে পৃথক হয়ে যায়। সিরিয়ার জনৈক আইয়ূবী আমীর তাদের নাজমুদ্দীন আইয়ুবের চেয়ে অধিক অর্থ প্রদানের আশা প্রদান করলে তারা তার দল থেকে পৃথক হয়ে যায়। শুধু পৃথকই হয়নি, বরং তার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে যায়। এখন তার সঙ্গে মিশর থেকে আগত মৌলিক দল ব্যতীত কেউ থাকে না। নেতৃত্বে ছিল সেনাপতি রুকন উদ্দীন বাইবার্স। নাজমুদ্দীন আইয়ূব রহ. উপলব্ধি করেন যে, এমন দলের ওপরই ভরসা করতে হবে, যারা তার ব্যক্তিত্বের প্রতি আনুগত্যশীল, সম্পদের প্রতি নয়। তাই তিনি খাওয়ারের্যমদের পরিবর্তে নতুন একটি দলের ওপর ভরসা করতে শুরু করেন। সেই দলটি ছিল 'দাস/মামলুক' দল।

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 দাস/মামলুক বংশের পরিচয়

📄 দাস/মামলুক বংশের পরিচয়


আরবী ভাষায় 'মামলুক' বলা হয় গোলাম বা দাসকে। বিশেষত সেই সব লোককে 'মামলুক' বলা হয়, যারা যুদ্ধে বন্দী হয়েছে। তবে তাদের বাবা-মা বন্দী হয়নি। 'মামলুক' একবচন। এর বহুবচন হলো 'মামালিক'। মোটকথা, সেই গোলামকে মামলুক বলা হয়, যাকে কেনাবেচা করা হয়। [আর যেসব লোক বাবা-মাসহ বন্দী হয়, তাদের আরবী ভাষায় 'কিন' বলা হয়; মামলুক নয়। তবে 'মামলুক' শব্দ উল্লেখিত সংজ্ঞা অনুযায়ী ব্যাপকার্থে সকল দাসের ওপরই প্রয়োগ হয়। তবে ইসলামী ইতিহাসের পরিভাষায় মামলুক শব্দটি বিশেষ অর্থ প্রদান করে। এটি পারিভাষিক রূপ লাভ করে প্রসিদ্ধ আব্বাসী খলিফা মামুনুর রশীদের আমল [১৯৮হি.-২১৮ হি.] ও তাঁর ভাই মু'তাসিম বিল্লাহের শাসনামল [২১৮-২২৮ হি.] থেকে। এই দুই মহান খলিফা তাদের শাসনামলে দাস ব্যবসায়ীদের বাজার থেকে তারা বহুসংখ্যক দাস/মামলুক ক্রয় করে আনেন এবং তাদের প্রভাব জোরদার করার জন্য সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে তাদের যুদ্ধের কাজে ব্যবহার করেন।
দিনে দিনে মামলুকরাই অধিকাংশ মুসলিম দেশে যুদ্ধের প্রধান শক্তি, কখনো কখনো একক শক্তি হয়ে দাঁড়ায়। আইয়ূবী সাম্রাজ্যের আমীরগণ নিজেদের ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিশেষভাবে দাসবংশের ওপর ভরসা করতেন। যুদ্ধে তাদের কাজে লাগাতেন। কিন্তু সংখ্যায় তারা খুবই কম ছিল। একসময় নাজমুদ্দীন রহ. শাসনামলে যখন খাওয়ারের্যমরা তার দল থেকে বের হয়ে যায়, তখন নাজমুদ্দীন রহ.-এর তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে বাধ্য হন। এভাবেই বিশ্বমানচিত্রে দাসবংশের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, বিশেষত মিশরে।

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 দাস বংশের উৎস

📄 দাস বংশের উৎস


দাসদের প্রধান উৎস ছিল— ১. হয়তো যুদ্ধে বন্দী হয়ে আসা ২. অথবা ক্রয় করা।
মা ওরাউন নাহার থেকে সবচেয়ে বেশি দাস আমদানী হতো। মাওরাউন নাহার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো জাইহুন নদী, যা তুমেনিস্তান ও আফগানিস্তানে উত্তর এবং উজবেকিস্তান ও তজাকিস্তানের দক্ষিণে প্রবাহিত। এসব অঞ্চলের মূল অধিবাসীরা হলো তুর্কী। এসব এলাকা সর্বদা অস্থিতিশীল থাকত। একের পর এক যুদ্ধ-বিগ্রহ লেগেই থাকত। তাই এসব অঞ্চল থেকে আমদানিকৃত বন্দীদের সংখ্যা বেশি হতো। তৎকালে 'দাস শহর' হিসেবে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ শহর ছিল সমরকন্দ, ফারগানা, খাওয়ারের্যম ইত্যাদি। তাই তুর্কী বংশোদ্ভূত অধিকাংশই দাস। তা ছাড়াও এসব অঞ্চলে আর্মেনিয়া, মঙ্গোল ও ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত দাসরাও ছিল। এ সকল ইউরোপীয়রা সকালিয়া নামে পরিচিত ছিল। তারা বিশেষভাবে পূর্ব ইউরোপ থেকে আগমন করত।
এ ছিল শত বছরের নিত্য ঘটনা। তবে নাজমুদ্দীন আইয়ূবী রহ. ও তার অনুসরণে পরবর্তী মামলুক সাম্রাজ্যে সুলতানরাও অল্প বয়স্ক দাসদের ক্রয় করতেন। অর্থাৎ তারা উঠতি বয়সের দাসদের ক্রয় করতেন। অধিকাংশ দাস অমুসলিম রাষ্ট্র থেকে আগমন করত। যদিও মাঝে মাঝে আরবি বলতে পারে না এমন মুসলিম সন্তান বন্দী হওয়ার সংবাদ পাওয়া যেত। তবে তাদের চেনা যেত না। চেনা যেত না তাদের বংশ ও ধর্ম। ফলে তাদের সঙ্গেও দাসের ন্যায় আচরণ করা হতো।

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 দাসদের প্রতিপালন

📄 দাসদের প্রতিপালন


নাজমুদ্দীন আইয়ূব ও অন্যান্য আমীরগণ মমলুকদের সঙ্গে দাসের ন্যায় আচরণ করতেন না; বরং সম্পূর্ণ বিপরীত আচরণ করতেন। তাদের নিজেদের ঔরসজাত সন্তানের চেয়ে অধিক আপন মনে করতেন। কখনোই মালিক ও মমলুকের মধ্যকার সম্পর্ক মুনিব ও গোলামের মতো ছিল না; বরং শিক্ষক-ছাত্র কিংবা পিতা-পুত্রের সম্পর্ক ছিল। তাদের সম্পর্ক ছিল মহব্বত-ভালোবাসার সম্পর্ক। তাই মামলুকরা তাদের মুনিবকে 'উস্তাদ বা সাইয়িদ' উপাধিতে সম্বোধন করত। ক্রয়কৃত ছোট্ট দাসদের কীভাবে লালন-পালন করা হতো, এখনো যাদের শৈশবকাল অতিবাহিত হয়নি? মাক্রিজী রহ. এ প্রশ্নের উত্তরে বলেন-
"তাদের প্রথমত আরবি ভাষায় লেখাপড়া শেখানো হতো। এরপর এমন কারও হাতে তাদেরকে সোপর্দ করা হতো, যিনি তাদেরকে কুরআনে কারীম শিক্ষা দিতেন। এরপর ফিকহে ইসলামীর প্রাথমিক জ্ঞান ও শিষ্টাচার শিক্ষা দেওয়া হতো। নামাজ আদায়ের গুরুত্ব প্রদান করা হতো। অনুরূপ মাসনুন আমল ও দুআ শিক্ষা দেওয়া হতো। মামলুকরা দক্ষ তত্ত্বাবধানে বেড়ে উঠত। তারা কোনো ভুলের শিকার হলে ইসলামী বিধান শিক্ষা প্রদান করত। তাদের সতর্ক করা হত।"
মামলুকদের প্রতিপালন-নীতি থেকে একথা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, সেই যুগটি ছিল দক্ষ ও আন্তরিক দায়ী ও অভিভাবকের যুগ। যারা ছোটদের সঠিক পন্থায় বেড়ে ওঠার প্রতি পূর্ণ গুরুত্বারোপ করতেন। এতে তারা খুব সহজেই কঠিন ও জটিল বিষয়গুলোকে মেনে নিতে পারত। কারণ, তাদের মেধা-মস্তিষ্কে কোনো বক্রতা ছিল না। তারা হৃদয়াত্মায় কোনো ভ্রান্ত মতবাদ লালন করত না। ফলে তারা যাবতীয় কঠিন দায়িত্ব ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ উত্তম পন্থায় আঞ্জাম দিত।
প্রতিপালনের এ সকল ধাপ মুনিবগণ নিজেরাই তত্ত্বাবধান করতেন। এমনকি কখনো কখনো সুলতান নাজমুদ্দীন আইয়ূব রহ. নিজেই তাদের থাকা-খাওয়া নিশ্চিত করতেন। অনেক সময় তাদের সঙ্গে খেতে বসতেন, তাদের সঙ্গে খোশ মেজাজে কথা বলতেন। মামলুকগণও তাকে সত্যিকার অর্থে ভালোবাসত। তার প্রতি ছিল পরিপূর্ণ আনুগত্য-পরায়ণ।
এটাই নিয়ম, যখন রাজা কিংবা নেতা প্রজা বা জনসাধারণের ব্যথায় ব্যথিত হবেন, তাদের সুখে আনন্দ প্রকাশ করবেন, তাদের খোঁজখবর নেবেন, তাদের সঙ্গে ওঠা-বসা করবেন, তারাও তাকে মনেপ্রাণে ভালোবাসবে, তার প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধাপ্রদর্শন করবে। নিঃসন্দেহে তার প্রতি তারা হবে আস্থাভাজন। যখন তিনি তাদের জিহাদের প্রতি আহ্বান করবেন, তারা সকলে দ্রুত তার ডাকে সাড়া দেবে। কোনো কিছুর নির্দেশ দিলে, তা পালনের জন্য প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবে। তা বাস্তবায়নের জন্য প্রাণ পর্যন্ত বিসর্জন দেবে। পক্ষান্তরে নেতা যখন জনসাধারণ থেকে দূরে থাকবেন, একাকী জীবনযাপন করবেন, ভোগ-বিলাসে মত্ত থাকবেন, তাদের দুঃখের কোনো খোঁজখবর নিবেন না, তখন তারাও নেতার আদেশ নিষেধের পরোয়া করবে না। এমনকি অনেক সময় তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে।
দ্বীনদারী ও সামরিকবিদ্যায় কোন মমলুক উৎকৃষ্ট বিবেচিত হলে ধীরে ধীরে তার পদোন্নতি হতো। একপর্যায়ে সে অন্যান্য মামলুকদের নেতায় পরিণত হতো। এরপর আরও পারদর্শী হলে তাকে রাজ্যের বিশেষ পদ প্রদান করা হত। এভাবে সে এতোপর্যায়ে আঞ্চলিক আমীরের পদ লাভ করত, সেনাপতির আসনে আসীন হত।
সাধারণত মামলুকদের তাদের— সাইয়িদ যিনি তাদেরকে ক্রয় করেছেন—তার নামের দিকে সম্বন্ধ করে ডাকা হতো। সুতরাং যাদের মালিকুস সালেহ ক্রয় করেছেন, তাদের সালেহিয়া, যাদের মালিকুল কামেল ক্রয় করেছেন তাদের কামেলিয়া বলে ডাকা হতো ইত্যাদি।
সালেহিয়া মামলুকগণের সংখ্যা অধিক বৃদ্ধি পেয়েছিল। নাজমুদ্দীন আইয়ূব রহ. এর যুগে তাদের মর্যাদাও বৃদ্ধি পেয়েছিল। এমনকি নাজমুদ্দীন আইয়ূব রহ. নীলনদের তীরে নিজের জন্য একটি প্রাসাদ নির্মাণ করলে পাশেই সালেহিয়া মামলুকদের জন্য একটি পূর্ণ দুর্গ প্রতিষ্ঠা করেন। প্রাসাদ ও দুর্গটি কায়রোর পর্যটন অঞ্চলে নির্মাণ করা হয়েছিল। নীলনদ সে সময় 'বাহর' [সমুদ্র] নামে পরিচিত ছিল। এ কারণে সালেহিয়া মামলুকগণ 'বাহরিয়া মামলুক' নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। কারণ, তারা বাহর [সমুদ্র] পাড়ে বাস করত।
এভাবেই আল মালিকুস সালেহ নাজমুদ্দীন আইয়ূব রহ. যে সকল মামলুক সাম্রাজ্য ও সৈন্যবাহিনীর উচ্চপদে অধিষ্ঠিত হয়েছে, তাদের সহযোগিতায় নিজ সাম্রাজ্যকে শক্তিশালী করেছেন। তার যুগে মামলুক 'ফারেসুদ্দীন আকতাই' সেনাপ্রধানের পদের অধিষ্ঠিত হয়েছেন এবং সহকারী সেনা প্রধানের পদে অধিষ্ঠিত হন মামলুক 'রুকন উদ্দীন বাইবার্স'। তারা উভয়েই বাহরিয়া মামলুক ছিলেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00