📄 ফিলিস্তিন দখল
এরপর কাতবুগা ফিলিস্তিন দখলের সিদ্ধান্ত নেয়। সে একদল সৈন্যবাহিনী পাঠায়। তারা নাবলুস অতঃপর গাজা দখল করে। তবে তাতারীরা ফিলিস্তিনে ছড়িয়ে থাকা ইউরোপীয় খ্রিস্টান সাম্রাজ্যের ধারেকাছেও যায় না। যেমন তারা লেবানন ও সিরিয়ার খ্রিস্টান সাম্রাজ্যের নিকটবর্তী হয়নি। এভাবে ফিলিস্তিন তাতারী ও খ্রিস্টানদের মাঝে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়।
খ্রিস্টান ও তাতারীদের পরস্পর সহযোগিতার বিষয়টি সুস্পষ্ট হলেও কাতবুগা হালাকু খানের পদাঙ্ক অনুসরণ করত। সে খ্রিস্টান হলেও ইউরোপের হোক বা সিরিয়ার কোনো খ্রিস্টানকে তার সাম্রাজ্য ও রাজত্ব থেকে বহিষ্কৃত করতে সমীহ করত না।
উদাহরণস্বরূপ এমন একটি ঘটনা সীদোনের আমীর জুলিয়ানের সঙ্গে ঘটে। সীদোন অঞ্চলটি ইউরোপীয় খ্রিস্টানরা দখল করেছিল। জুলিয়ান যখন তাতারী ও মুসলমানদের মধ্যকার বিরোধ দেখতে পেল, এটাকে নিজ সাম্রাজ্য বৃদ্ধির সুবর্ণ সুযোগ মনে করল এবং একখণ্ড উর্বর সমতল ভূমি দখল করে ফেলল। কাতবুগা লোক পাঠিয়ে তাকে বাধা প্রদান করলে সে বিরত হয় না। ফলে কাতবুগা সীদোন বিধ্বংস করার নির্দেশ দিয়ে একটি বিশাল দল পাঠায় এবং বাস্তবে সীদোন অঞ্চলকে ধ্বংস করে ফেলা হয়। জুলিয়ান সমুদ্র পাড়ি দিয়ে পলায়ন করে। এমন আরেকটি ঘটনা বাইরূতের আমীর ইউহান্না ছানীর সঙ্গে ঘটে। যখন সে জালীল নামক অঞ্চল দখল করেছিল।
এ সকল ঘটনা দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয় যে, তাতারী মানচিত্রের প্রতিটি ইঞ্চি নিজেদের করায়ত্তে রাখতে চাইত। কেউ তাদের সহযোগিতা করতে চাইলে কিংবা তাদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হতে চাইলে তাদের অনুসারী হয়ে আসতে হত; বন্ধু কিংবা মিত্র হয়ে নয়। এটি ভূপৃষ্ঠে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নীতি, যে নীতি অন্য কোনো শক্তিকে দাঁড়াতে দেয় না।
নিঃসন্দেহে কাতবুগা ও এরও পূর্বে হালাকু খানের খ্রিস্টানদের ওপর তাতারীদের প্রাধান্যপ্রদান নীতিমালা (এমনকি খ্রিস্টানদের গির্জা প্রধান নিয়োগের বেলাও) সিরিয়ার খ্রিস্টান আমীরদের অন্তরকে ক্ষীপ্ত করে তুলেছিল। এর আরেকটি অন্যতম কারণ হলো, তাতারী আগমনের পূর্বে খ্রিস্টানরা ছিল প্রতিষ্ঠিত। কারণ, তারা মুসলামনদের দুর্বলতা সম্পর্কে নিশ্চিত ছিল। পাশাপাশি মুসলমানদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ না হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত ছিল। কারণ, মুসলমানরা বিশ্বাসঘাতকতা করেনা। পক্ষান্তরে তাতারীরা সম্পূর্ণ উল্টো। উপরন্ত তাতারী কর্তৃক আন্তাকিয়ার আমীর, সীদোনের আমীর এরপর বাইরূতের আমীর অপমানিত হওয়ার পর অন্যান্য খ্রিস্টান আমীররা তটস্থ হয়ে পড়েছে। একথার একীন তাদের মাঝে বদ্ধমূল হয়েছে যে, এ অঞ্চলে তাতারীদের ক্ষমতা চিরপ্রতিষ্ঠিত। তারা সিরিয়ার সাধারণ খ্রিস্টান ও খ্রিস্টান আমীরদের সঙ্গে তা-ই করবে, যা ইতিপূর্বে উকিতাই ইবনে চেঙ্গিজ খানের রাজত্বকালে পূর্ব ইউরোপের খ্রিস্টানদের সঙ্গে করা হয়েছিল।
যাই হোক, এই অন্তর্নিহিত অস্থিরতা ও চরম হতাশা সত্ত্বেও খ্রিস্টান আমীরগণ প্রতিবাদ না করে কেবল দূর থেকে চেয়ে চেয়ে দেখছিল। আগামী দিনগুলোতে কী ঘটতে যাচ্ছে, তাদের কেউই জানত না।
সর্বশেষ ফিলিস্তিন দখলের মাধ্যমে তাতারীরা গোটা ইরাক, তুরস্কের অধিকাংশ অঞ্চল এবং গোটা সিরিয়ার পতন ঘটাল। অনুরূপ লেবানন ও ফিলিস্তিনেরও পতন ঘটাল!! এ সবকিছু মাত্র দুই বছরে সংঘটিত হয়!!
তাতারীরা ফিলিস্তিনের গাজা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। (যেমনটি আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি) তারা সিনা পর্বত থেকে মাত্র পঁয়ত্রিশ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থান করছিল। সবাই জানত, তাতারীদের পরবর্তী পদক্ষেপ মিশর আক্রমণ!!
📄 মিশর তাতারীদের চারণভূমিতে পরিণত হওয়া ছিল স্বাভাবিক
এই বিষয়টি নিয়ে অধিক গবেষণা করার কোনো প্রয়োজন নেই। তাতারীদের দুর্বার গতি একথার একীন প্রদান করে যে, খুব শীঘ্রই মিশর তাদের প্রধান লক্ষ্যে পরিণত হবে। এর অনেকগুলো কারণ ছিল। তন্মধ্যে—
১. তাতারীদের সম্প্রসারণমূলক রাজনীতি। তারা এক অঞ্চল শেষে পরবর্তী অঞ্চলের খোঁজে থাকে। আর মিশর তো ফিলিস্তিনের গা ঘেঁষে অবস্থিত।
২. তৎকালীন মুসলিমবিশ্বে মিশর ব্যতীত কোনো শক্তি অবশিষ্ট ছিল না, যে তাতারীদের ঘুম কেড়ে নিতে পারে। বাকি সব মুসলিমশক্তি, দুর্গ, ইসলামী শহরের পতন ঘটেছে। শুধু মিশরই রয়ে গেছে।
৩. মিশর যুদ্ধের উপযুক্ত ভূমি। তা বিশ্বমানচিত্রের মধ্যভাগে অবস্থিত। আর মিশরের বাণিজ্যিক সমৃদ্ধির বিষয়টি কারোর অজানা নয়।
৪. মিশর আফ্রিকার মুখোমুখি অবস্থিত। তাতারীরা যদি মিশরের পতন ঘটাতে পারে, তাহলে উত্তর আফ্রিকা দখল করা তাদের জন্য খুবই সহজ হবে। ইতিপূর্বে উত্তর আফ্রিকা দখল করার জন্য তারা কোনো প্রচেষ্টা করেনি। কারণ, সিরিয়া পর্যন্ত পৌঁছতে তাদের পশ্চিমা মুসলিম সাম্রাজ্যের পতন ঘটাতে হয়েছে। উত্তর আফ্রিকার ঝুঁকি নেওয়া হতো বাড়তি ঝুঁকি। যদি মিশরের পতন ঘটে তবে স্বল্প প্রচেষ্টায় উত্তর আফ্রিকা দখল করা যাবে।
৫. মিশরের জনসংখ্যা অন্যান্য মুসলিম অঞ্চলের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। তাই মিশর পতন ঘটানো তাতারীদের জন্য জরুরি ছিল।
৬. মিশরবাসী ইসলামী জাগরণ ও দ্বীনী চেতনায় ছিল উজ্জীবিত। তাতারীরা এই আশঙ্কা করছিল যে, যদি কোনো প্রচুর জনসংখ্যা সম্বলিত, দীনি চেতনায় উজ্জীবিত সৎ মুজাহিদ-ব্যক্তি মিশরের নেতৃত্ব গ্রহণ করে, তাহলে প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে। হতে পারে তাতারীদের আকস্মিক পতন ঘটবে!
এই সকল কারণ ও অন্যান্য আরও কিছু কারণে তাতারীরা ফিলিস্তিন থেকে মিশর দ্রুত গমনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তারা খুব দ্রুত গমনের সিদ্ধান্ত এ জন্য গ্রহণ করে যে, যাতে তাদের আকস্মিক আগমনে মিশরবাসী যুদ্ধের কোনো প্রস্তুতি গ্রহণ না করতে পারে।
কিন্তু সিরিয়া ও ফিলিস্তিন আক্রমণের সময় মিশরের কী অবস্থা ছিল? সে সময় মিশরবাসী ধারাবহিক কঠোর সংকটে সময় পার করছিল। তারা রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে সমান্তরালভাবে সংকটাপন্ন ছিল। এর অনেক কারণ ছিল। সামনে আমরা তা বিস্তারিত আলোচনা করব—ইনশাআল্লাহ।
এখানে একটি বিষয় আলোচনা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তা হলো, ইতিমধ্যে দাসবংশ মিশর শাসন শুরু করেছিলেন। এ সময়ে মিশরের সিংহাসনে কুতয রহ. সমাসীন হয়েছিলেন।
তাতারীদের মিশর আক্রমণ, মিশর সাম্রাজ্যের প্রতিরোধ এবং তাদের রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা আলোচনার পূর্বে দাসবংশের উত্থান সম্পর্কে সামান্য আলোকপাত করার চেষ্টা করব। কীভাবে তারা মিশরের রাজক্ষমতায় সমাসীন হলেন? কীভাবে কুতয রহ. এই পবিত্র ভূমির শাসনভার গ্রহণ করলেন? তৎকালীন সার্বিক পরিস্থিতি কীভাবে একথার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত প্রদান করে যে, দাসবংশের নেতৃত্বে তাতারী বাহিনী ও মিশরীয় বাহিনীর মাঝে অনিবার্য সংঘাত ঘটবে?
এ সবকিছু পর্যালোচনা করলে আমরা ঘটনার সঠিক কারণ খুঁজে বের করতে পারব। খুঁজে পাব বহু উপদেশ ও শিক্ষা এবং শেষ পরিণতি, যা আমরা প্রত্যক্ষ করব। ধ্বংসে উপনীত হওয়ার কারণসমূহ উদ্ঘাটন করতে পারব।
চলুন! এখন আমরা দাসবংশ নিয়ে আলোচনা করি!