📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 মানকু খানের মৃত্যু

📄 মানকু খানের মৃত্যু


এরই মাঝে এমন একটি দুর্ঘটনা ঘটে, যা হালাকু খানের হিসাব-নিকাশে গোলমাল সৃষ্টি করে। তাতারী সাম্রাজ্যের মহাসম্রাট মানকু খানের মৃত্যু ঘটে। দামেস্ক পৌঁছার পূর্বেই হালাকু খানের কাছে এই সংবাদ পৌঁছে। সত্যিই মানকু খানের মৃত্যু হালাকু খানের জন্য ছিল একটি বড় পরীক্ষা। মানকু খান পৃথিবীর ইতিহাসের সর্ববৃহৎ সাম্রাজ্য শাসন করত। আকস্মিক যেকোনো ভাঙন এই সাম্রাজ্যের জন্য ভয়াবহ হতে পারে। নিঃসন্দেহে হালাকু খানও তাতারী সাম্রাজ্যের অন্যতম স্থপতি ছিল। সে মানকু খানের ভাই। চেঙ্গিজ খানের পৌত্র। তার হাতে অসংখ্য অঞ্চল বিজিত হয়েছে। তার বীরত্ব বর্ণনার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, ইতিহাসে সেই প্রথম মুসলিম খেলাফতের পতন ঘটায়। এ সকল কীর্তি ও যোগ্যতার বলে হালাকু খান মধ্যপ্রাচ্যের তাতারী সাম্রাজ্য ব্যতীতই মূল তাতারী সাম্রাজ্যের অন্যতম প্রধান স্থপতির আসনে সমাসীন হয়েছে।
তাই মানকু খানের মৃত্যুসংবাদ পাওয়ামাত্রই সৈন্যবাহিনী ছেড়ে কালক্ষেপণ না করে 'পরবর্তী খলিফা নির্বাচন সভায়' যোগ দিতে তাতারী সাম্রাজ্যের রাজধানী কারাকুরামে ফিরে আসে। তার অন্যতম প্রধান ও বিচক্ষণ সেনাপতি কাতবুগা নবীনকে সৈন্যবাহিনীর দায়িত্ব অর্পণ করে। সে (আমরা পূর্বে আলোচনা করেছি) খ্রিস্টান ছিল।
হালাকু খান খুব দ্রুত প্রত্যাবর্তন করছিল। পারস্য অঞ্চলে পৌঁছলে কারাকুরাম থেকে কয়েকজন দূত তার নিকট এই সংবাদ নিয়ে আগমন করে যে, খলিফা নির্বাচনের বিষয়টি পূর্ণ হয়েছে। নব নির্বাচিত তাতার খলিফা হলো তার ভাই 'কাবিলা খাকান'। এটি তার প্রত্যাশাবিরুদ্ধ ছিল; এমনকি চেঙ্গিজ খান কর্তৃক খলিফা নির্বাচনের নীতিমালা পরিপন্থী ছিল। যদিও বিষয়টি হালাকু খানের স্বপ্নের ওপর বড় আঘাত হানে, তথাপি সে বিষয়টি শান্তভাবে মেনে নেয় এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থান করাকেই প্রাধান্য দেয়। সে এসব অঞ্চলে বহু কল্যাণ দেখতে পায়। তাই পুনরায় সিরিয়ায় প্রত্যাবর্তন না করে (বর্তমান ইরানের) তিবরিয শহরে গমন করে এবং তিবরিষ অঞ্চলকে মধ্যপ্রাচ্যের সুবিশাল অঞ্চলের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত করে। তিবরিষ একদিক থেকে সুরক্ষিত শহর। অন্যদিক থেকে এর আবহাওয়া নাতিশীতোষ্ণ। অঞ্চলটি হালাকু খান পরিচালিত সাম্রাজ্যের মধ্যখানে অবস্থিত। তার সাম্রাজ্য খাওয়ারেযম, কাজাকিস্তান, তুরমেনিস্তান, উজবেকিস্তান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, পারস্য, আযারবাইজান, ইরাক, তুরস্ক ও সিরিয়াব্যাপী বিস্তৃত। হালাকু খানকে সিরিয়ায় প্রত্যাবর্তন না করার প্রতি যে বিষয়টি অধিক প্রেরণা দিয়েছে, তা হলো, সিরিয়ার যেসব অঞ্চল এখনো বিজিত হয়নি, তা খুবই সামান্য। সেখানে খুব বেশি শহর নেই। উপরন্তু সে ফিরে যাওয়ার পূর্বে নাছের ইউসুফ বাহিনীর দামেস্ক অরক্ষিত রেখে ফিলিস্তিন পালিয়ে যাওয়ার সংবাদ পায়। তবে হালাকু খান কাতবুগার কাছে নাছের ইউসুফকে বন্দী করার নির্দেশ দিয়ে চিঠি পাঠাতে ভোলেনি।

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 পতন শেষে দামেস্কের অবস্থা

📄 পতন শেষে দামেস্কের অবস্থা


চলুন! আবার আমরা দামেস্কের আলোচনায় ফিরে যাই—
দামেস্কের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ ও জ্ঞানীগুণীজনরা শহরের চাবি বহন করে তাতারী বাহিনীর কাছে নিয়ে যায়। নতুন সেনাপতি কাতবুগা তাদের সংবর্ধনা জানায়। তাদের আত্মসমর্পণ মেনে নিয়ে তাদের নিরাপত্তা প্রদান করে এবং সৈন্যবাহিনীসহ দামেস্কে প্রবেশের জন্য অগ্রসর হয়।
হায়! উমাইয়া খেলাফতের রাজধানী দামেস্কের আজ পতন ঘটছে, যেমনটি ইতিপূর্বে আব্বাসী খেলাফতের রাজধানী বাগদাদের পতন ঘটেছিল!! তৎকালীন বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞানের অন্যতম প্রধান সুসমৃদ্ধ নগরী, জিহাদের প্রাণকেন্দ্র, মুসলিমবিশ্বের শ্রেষ্ঠ শহর দামেস্কের পতন হলো!!
তাতারী বাহিনী অবলীলায় অকুণ্ঠচিত্তে দামেস্কের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে, ঢুকে পড়েছে অভ্যন্তরে। কিন্তু কেউ প্রতিবাদ করেনি; কেউ বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়নি!!
আহ! শত আক্ষেপ!! হায়রে দামেস্ক!!! হে সিরিয়ার রাজধানী, হে মুসলিমবিশ্বের প্রাণ!!
কোথায় আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ, খালেদ ইবনে ওয়ালীদ, ইয়াযিদ ইবনে আবু সুফিয়ান, আমর ইবনে আস ও শুরাহবিল ইবনে হাসানা রা.; যারা ছয়শো বছরের অধিক সময় ব্যয়ে এই শহর জয় করেছিলেন!
কোথায় মু'আবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান, যিনি এখানে বসে দুনিয়া শাসন করেছিলেন?
কোথায় ওমর ইবনে আবদুল আযীয রহ. যিনি এই শহরে বসে সারা পৃথিবীতে ন্যায়-ইনসাফ ছড়িয়ে দিয়েছিলেন!
কোথায় উমাইয়া বংশের খলিফাবর্গ, যারা সুবিশাল বিস্তৃত ভূমি জয় করেছিলেন, যা আজ তাতারীদের হাতে পরাজিত?
কোথায় ইমাদুদ্দীন জঙ্গী ও নুরুদ্দীন মাহমুদ রহ., যারা জিহাদ করে ইজ্জত-সম্মান ও গর্ব অর্জন করেছিলেন?
কোথায় সালাহ উদ্দীন আইয়ূবী রহ., যিনি দামেস্কের ভূমিতে শুয়ে আছেন?
দীর্ঘদিন অতিবাহিত হয়েছে এবং মুসলমানগণ দামেস্কে ক্রমশ সব বস্তু প্রত্যক্ষ করেছে, যা কেউ কোনোদিন কল্পনাও করেনি।
মুসলমানগণ তিনজন খ্রিস্টান আমীর প্রত্যক্ষ করেছে, যারা দলের সম্মুখ ভাগে ঘোড়া হাঁকিয়ে গর্ব প্রকাশ করছিল। তারা দামেস্কের প্রধান ফটক ভেঙে প্রধান সড়কগুলোতে হইহুল্লোড় করছিল। তাতারী বাহিনীর অগ্রে ছিল তাতারী সেনাপতি কাতবুগা নবীন। আর তার দু-পাশে ছিল আর্মেনিয়ার রাজা হাইতুম ও আন্তাকিয়ার রাজা বুহমন্দ। তারা সকলে মুসলমানদের পবিত্র নগরীতে প্রবেশ করে। ১৪ হিজরীতে রোমসম্রাট কায়সার হিরাক্লিয়াসের যুদ্ধে রোমান বাহিনী দামেস্ক ছেড়ে পালাবার পর এই প্রথম কোনো খ্রিস্টান আমীর দামেস্কে প্রবেশ করল।
লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ!
তাতারীরা দামেস্কাবাসীকে কার্যত নিরাপত্তা প্রদান করেছিল। তারা কাউকে হত্যা করেনি। তবে যারা দুর্গে আশ্রয় নিয়েছিল, তাদের কয়েক সপ্তাহ অবরোধ করে রাখার পর দুর্গ ভেঙে হত্যা করে।
৬৫৮ হিজরীর শেষদিকে দামেস্কের পতন ঘটে। এটি বাগদাদ পতনের পূর্ণ দুই বছর পরের ঘটনা। এটি তাতারী কর্তৃক নির্ধারিত সময়। কারণ, এ সময়ে তারা বহু অঞ্চল দখল করেছে এবং ইরাক, তুরস্ক ও সিরিয়ায় অগণিত শহর ধ্বংস করেছে। হ্যাঁ! অধঃপতিত প্রধান তিনটি শহর হলো বাগদাদ, আলেপ্পো ও দামেস্ক। কিন্তু অন্য শহরগুলো যেনতেন শহর ছিলনা। কারণ এসব শহরের উর্বরতা, প্রাচীনতা, ঐতিহ্য, জীবনযাত্রার মান, উন্নত ও আধুনিক সভ্যতা-সংস্কৃতির কারণে প্রচুর জনগণ বাস করত।
স্বাভাবিকভাবেই গোটা মুসলিমবিশ্বের মনোবল ক্ষীণ হয়ে গিয়েছিল। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান একথা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল যে, তাতারীরা অপরাজেয়। তাদের পরাজয় করা সম্ভব নয় এবং অধিকাংশ একথা ভাবতে শুরু করেছিল যে, মুসলিম উম্মাহর অবশিষ্ট হায়াত খুবই সামান্য।
শহরের প্রাচীর ও দুর্গগুলো ভেঙে ফেলার পর তাতারীরা খ্রিস্টানদের মাধ্যমে দামেস্ক পরিচালনা শুরু করে। তারা 'আপেল সিয়ান' নামক তাতারীকে শহর পরিচালনার দায়িত্ব প্রদান করে। সে খ্রিস্টান না হলেও খ্রিস্টানদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিল। তাদের পক্ষপাতিত্ব করত। দামেস্ক শহর তার ইতিহাসের সবচেয়ে আশ্চর্য সময় পার করতে থাকে!
ইবনে কাছীর রহ. আপেল সিয়ান দামেস্ক পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণের সময়কার দামেস্কের পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে যে বক্তব্য পেশ করেছেন, এ পর্যায়ে আমি তা উল্লেখ করছি। ইবনে কাছীর রহ. বলেন—
“আপেল সিয়ান (তার ওপর আল্লাহর লা'নত নাজিল হোক) খ্রিস্টান যাজক ও গির্জাপ্রধানদের একত্রিত করে তাদের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে এবং তাদের গির্জাসমূহ পরিদর্শন করে। একদল খ্রিস্টান হালাকু খানের সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে তিবরিয গমন করে। সঙ্গে বহু মূল্যবান হাদিয়া-তোহফাও নিয়ে যায়। তাদের সঙ্গে হালাকু খান কর্তৃক নিরাপত্তানামা ছিল। তারা তাওমা দরজা (দামেস্কের একটি ফটক) দিয়ে প্রবেশ করে। তারা সঙ্গে একটি লম্বা ক্রুশ বহন করে নিয়েছিল। তারা তাদের ধর্মীয় প্রতিটি বার্তা সমস্বরে উচ্চারণ করছিল। তারা বলছিল, 'সঠিক দ্বীন তথা দ্বীনে মাসীহ জয়লাভ করেছে।' তারা ইসলাম ধর্ম ও ইসলামধর্মের অনুসারীদের নিন্দা গাইছিল। তাদের সঙ্গে মদভর্তি অনেক মটকা ছিল। কোনো মসজিদ অতিক্রম করলে মসজিদে মদ ছিটাত। আর কিছু মদভর্তি পাতিল ছিল, সেগুলো মানুষের চেহারা ও কাপড়ের ওপর ছিটাত। বাজার ও পথ-ঘাটে কেউ তাদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করলে ক্রুশ বহনের নির্দেশ দিত। বাজারের এক দোকানের উঁচু স্থানে দাঁড়িয়ে তাদের বক্তা খ্রিস্টধর্মের প্রশংসা জ্ঞাপন এবং ইসলামধর্ম ও মুসলমানদের নিন্দা জ্ঞাপন করছিল। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
এরপর তারা মদ নিয়ে জামে মসজিদে প্রবেশ করে। এই ঘটনা ঘটার পর মুসলিম বিচারক ও উলামা-ফুকাহাগণ একত্রিত হয়ে তাতারী-প্রধান আপেল সিয়ানের কাছে এগিয়ে এই ঘটনার প্রতিবাদ জানান। কিন্তু তাদের কথা প্রত্যাখ্যান করা হয় এবং তাদের অপমানিত করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে খ্রিস্টানদের কথা প্রাধান্য দেওয়া হয়। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।"
এটি ছিল দামেস্কবাসী মুসলমানদের জন্য দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্ত। মুসলমানগণ উভয় সংকটে পড়েছিল। একদিকে তাতারী অন্যদিকে খ্রিস্টান। একথা সকলেরই জানত যে, তাতারী ও খ্রিস্টানদের মাঝে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বিরাজমান। একে অপরের জন্য সহযোগী। বিশেষত সিরিয়ার তাতারী সেনাপতি কাতবুগা খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী। আর যে সকল খ্রিস্টান সিরিয়ায় বাস করে তারা সিরিয়ার সকল গোপন ভেদ জানত। সুতরাং নিঃসন্দেহে খ্রিস্টানরা তাতারীদের সহযোগিতা করলে তা মুসলমানদের জন্য বড়ই দুঃখজনক ও আক্ষেপের বিষয় হবে।

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 ফিলিস্তিন দখল

📄 ফিলিস্তিন দখল


এরপর কাতবুগা ফিলিস্তিন দখলের সিদ্ধান্ত নেয়। সে একদল সৈন্যবাহিনী পাঠায়। তারা নাবলুস অতঃপর গাজা দখল করে। তবে তাতারীরা ফিলিস্তিনে ছড়িয়ে থাকা ইউরোপীয় খ্রিস্টান সাম্রাজ্যের ধারেকাছেও যায় না। যেমন তারা লেবানন ও সিরিয়ার খ্রিস্টান সাম্রাজ্যের নিকটবর্তী হয়নি। এভাবে ফিলিস্তিন তাতারী ও খ্রিস্টানদের মাঝে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়।
খ্রিস্টান ও তাতারীদের পরস্পর সহযোগিতার বিষয়টি সুস্পষ্ট হলেও কাতবুগা হালাকু খানের পদাঙ্ক অনুসরণ করত। সে খ্রিস্টান হলেও ইউরোপের হোক বা সিরিয়ার কোনো খ্রিস্টানকে তার সাম্রাজ্য ও রাজত্ব থেকে বহিষ্কৃত করতে সমীহ করত না।
উদাহরণস্বরূপ এমন একটি ঘটনা সীদোনের আমীর জুলিয়ানের সঙ্গে ঘটে। সীদোন অঞ্চলটি ইউরোপীয় খ্রিস্টানরা দখল করেছিল। জুলিয়ান যখন তাতারী ও মুসলমানদের মধ্যকার বিরোধ দেখতে পেল, এটাকে নিজ সাম্রাজ্য বৃদ্ধির সুবর্ণ সুযোগ মনে করল এবং একখণ্ড উর্বর সমতল ভূমি দখল করে ফেলল। কাতবুগা লোক পাঠিয়ে তাকে বাধা প্রদান করলে সে বিরত হয় না। ফলে কাতবুগা সীদোন বিধ্বংস করার নির্দেশ দিয়ে একটি বিশাল দল পাঠায় এবং বাস্তবে সীদোন অঞ্চলকে ধ্বংস করে ফেলা হয়। জুলিয়ান সমুদ্র পাড়ি দিয়ে পলায়ন করে। এমন আরেকটি ঘটনা বাইরূতের আমীর ইউহান্না ছানীর সঙ্গে ঘটে। যখন সে জালীল নামক অঞ্চল দখল করেছিল।
এ সকল ঘটনা দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয় যে, তাতারী মানচিত্রের প্রতিটি ইঞ্চি নিজেদের করায়ত্তে রাখতে চাইত। কেউ তাদের সহযোগিতা করতে চাইলে কিংবা তাদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হতে চাইলে তাদের অনুসারী হয়ে আসতে হত; বন্ধু কিংবা মিত্র হয়ে নয়। এটি ভূপৃষ্ঠে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নীতি, যে নীতি অন্য কোনো শক্তিকে দাঁড়াতে দেয় না।
নিঃসন্দেহে কাতবুগা ও এরও পূর্বে হালাকু খানের খ্রিস্টানদের ওপর তাতারীদের প্রাধান্যপ্রদান নীতিমালা (এমনকি খ্রিস্টানদের গির্জা প্রধান নিয়োগের বেলাও) সিরিয়ার খ্রিস্টান আমীরদের অন্তরকে ক্ষীপ্ত করে তুলেছিল। এর আরেকটি অন্যতম কারণ হলো, তাতারী আগমনের পূর্বে খ্রিস্টানরা ছিল প্রতিষ্ঠিত। কারণ, তারা মুসলামনদের দুর্বলতা সম্পর্কে নিশ্চিত ছিল। পাশাপাশি মুসলমানদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ না হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত ছিল। কারণ, মুসলমানরা বিশ্বাসঘাতকতা করেনা। পক্ষান্তরে তাতারীরা সম্পূর্ণ উল্টো। উপরন্ত তাতারী কর্তৃক আন্তাকিয়ার আমীর, সীদোনের আমীর এরপর বাইরূতের আমীর অপমানিত হওয়ার পর অন্যান্য খ্রিস্টান আমীররা তটস্থ হয়ে পড়েছে। একথার একীন তাদের মাঝে বদ্ধমূল হয়েছে যে, এ অঞ্চলে তাতারীদের ক্ষমতা চিরপ্রতিষ্ঠিত। তারা সিরিয়ার সাধারণ খ্রিস্টান ও খ্রিস্টান আমীরদের সঙ্গে তা-ই করবে, যা ইতিপূর্বে উকিতাই ইবনে চেঙ্গিজ খানের রাজত্বকালে পূর্ব ইউরোপের খ্রিস্টানদের সঙ্গে করা হয়েছিল।
যাই হোক, এই অন্তর্নিহিত অস্থিরতা ও চরম হতাশা সত্ত্বেও খ্রিস্টান আমীরগণ প্রতিবাদ না করে কেবল দূর থেকে চেয়ে চেয়ে দেখছিল। আগামী দিনগুলোতে কী ঘটতে যাচ্ছে, তাদের কেউই জানত না।
সর্বশেষ ফিলিস্তিন দখলের মাধ্যমে তাতারীরা গোটা ইরাক, তুরস্কের অধিকাংশ অঞ্চল এবং গোটা সিরিয়ার পতন ঘটাল। অনুরূপ লেবানন ও ফিলিস্তিনেরও পতন ঘটাল!! এ সবকিছু মাত্র দুই বছরে সংঘটিত হয়!!
তাতারীরা ফিলিস্তিনের গাজা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। (যেমনটি আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি) তারা সিনা পর্বত থেকে মাত্র পঁয়ত্রিশ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থান করছিল। সবাই জানত, তাতারীদের পরবর্তী পদক্ষেপ মিশর আক্রমণ!!

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 মিশর তাতারীদের চারণভূমিতে পরিণত হওয়া ছিল স্বাভাবিক

📄 মিশর তাতারীদের চারণভূমিতে পরিণত হওয়া ছিল স্বাভাবিক


এই বিষয়টি নিয়ে অধিক গবেষণা করার কোনো প্রয়োজন নেই। তাতারীদের দুর্বার গতি একথার একীন প্রদান করে যে, খুব শীঘ্রই মিশর তাদের প্রধান লক্ষ্যে পরিণত হবে। এর অনেকগুলো কারণ ছিল। তন্মধ্যে—
১. তাতারীদের সম্প্রসারণমূলক রাজনীতি। তারা এক অঞ্চল শেষে পরবর্তী অঞ্চলের খোঁজে থাকে। আর মিশর তো ফিলিস্তিনের গা ঘেঁষে অবস্থিত।
২. তৎকালীন মুসলিমবিশ্বে মিশর ব্যতীত কোনো শক্তি অবশিষ্ট ছিল না, যে তাতারীদের ঘুম কেড়ে নিতে পারে। বাকি সব মুসলিমশক্তি, দুর্গ, ইসলামী শহরের পতন ঘটেছে। শুধু মিশরই রয়ে গেছে।
৩. মিশর যুদ্ধের উপযুক্ত ভূমি। তা বিশ্বমানচিত্রের মধ্যভাগে অবস্থিত। আর মিশরের বাণিজ্যিক সমৃদ্ধির বিষয়টি কারোর অজানা নয়।
৪. মিশর আফ্রিকার মুখোমুখি অবস্থিত। তাতারীরা যদি মিশরের পতন ঘটাতে পারে, তাহলে উত্তর আফ্রিকা দখল করা তাদের জন্য খুবই সহজ হবে। ইতিপূর্বে উত্তর আফ্রিকা দখল করার জন্য তারা কোনো প্রচেষ্টা করেনি। কারণ, সিরিয়া পর্যন্ত পৌঁছতে তাদের পশ্চিমা মুসলিম সাম্রাজ্যের পতন ঘটাতে হয়েছে। উত্তর আফ্রিকার ঝুঁকি নেওয়া হতো বাড়তি ঝুঁকি। যদি মিশরের পতন ঘটে তবে স্বল্প প্রচেষ্টায় উত্তর আফ্রিকা দখল করা যাবে।
৫. মিশরের জনসংখ্যা অন্যান্য মুসলিম অঞ্চলের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। তাই মিশর পতন ঘটানো তাতারীদের জন্য জরুরি ছিল।
৬. মিশরবাসী ইসলামী জাগরণ ও দ্বীনী চেতনায় ছিল উজ্জীবিত। তাতারীরা এই আশঙ্কা করছিল যে, যদি কোনো প্রচুর জনসংখ্যা সম্বলিত, দীনি চেতনায় উজ্জীবিত সৎ মুজাহিদ-ব্যক্তি মিশরের নেতৃত্ব গ্রহণ করে, তাহলে প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে। হতে পারে তাতারীদের আকস্মিক পতন ঘটবে!
এই সকল কারণ ও অন্যান্য আরও কিছু কারণে তাতারীরা ফিলিস্তিন থেকে মিশর দ্রুত গমনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তারা খুব দ্রুত গমনের সিদ্ধান্ত এ জন্য গ্রহণ করে যে, যাতে তাদের আকস্মিক আগমনে মিশরবাসী যুদ্ধের কোনো প্রস্তুতি গ্রহণ না করতে পারে।
কিন্তু সিরিয়া ও ফিলিস্তিন আক্রমণের সময় মিশরের কী অবস্থা ছিল? সে সময় মিশরবাসী ধারাবহিক কঠোর সংকটে সময় পার করছিল। তারা রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে সমান্তরালভাবে সংকটাপন্ন ছিল। এর অনেক কারণ ছিল। সামনে আমরা তা বিস্তারিত আলোচনা করব—ইনশাআল্লাহ।
এখানে একটি বিষয় আলোচনা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তা হলো, ইতিমধ্যে দাসবংশ মিশর শাসন শুরু করেছিলেন। এ সময়ে মিশরের সিংহাসনে কুতয রহ. সমাসীন হয়েছিলেন।
তাতারীদের মিশর আক্রমণ, মিশর সাম্রাজ্যের প্রতিরোধ এবং তাদের রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা আলোচনার পূর্বে দাসবংশের উত্থান সম্পর্কে সামান্য আলোকপাত করার চেষ্টা করব। কীভাবে তারা মিশরের রাজক্ষমতায় সমাসীন হলেন? কীভাবে কুতয রহ. এই পবিত্র ভূমির শাসনভার গ্রহণ করলেন? তৎকালীন সার্বিক পরিস্থিতি কীভাবে একথার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত প্রদান করে যে, দাসবংশের নেতৃত্বে তাতারী বাহিনী ও মিশরীয় বাহিনীর মাঝে অনিবার্য সংঘাত ঘটবে?
এ সবকিছু পর্যালোচনা করলে আমরা ঘটনার সঠিক কারণ খুঁজে বের করতে পারব। খুঁজে পাব বহু উপদেশ ও শিক্ষা এবং শেষ পরিণতি, যা আমরা প্রত্যক্ষ করব। ধ্বংসে উপনীত হওয়ার কারণসমূহ উদ্‌ঘাটন করতে পারব।
চলুন! এখন আমরা দাসবংশ নিয়ে আলোচনা করি!

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00