📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 ভীরুদের জলাশয়ে এক বীর বাহাদুরের আত্মপ্রকাশ

📄 ভীরুদের জলাশয়ে এক বীর বাহাদুরের আত্মপ্রকাশ


সভায় গুরুত্বপূর্ণ সেনাপতিগণ উপস্থিত ছিলেন। তাদের প্রধান ছিল আমীর যাইনুদ্দীন হাফেজী। আরও ছিলেন সেনাপতি রুকন উদ্দীন বাইবার্স বান্দকাদারী। ইতিপূর্বে মিশরে যুদ্ধ চলাকালে যেসব আমীর পলায়ন করেছিল, সে তাদের অন্যতম ছিল। নাছের ইউসুফ তাকে আশ্রয় দেয় এবং রণদক্ষতা ও নেতৃত্ব-গুণ দেখে তাকে নিজের অন্যতম সেনাপতি হিসেবে নিয়োগ দেয়।
সভা শুরু হয়। কিন্তু উপস্থিত সভাসদবৃন্দের মাঝে নাছের ইউসুফ ও পরবর্তীতে অন্যান্যদের মাঝে যে তাতারীত্রাস সংক্রমিত হয়েছে, তা গোপন থাকে না।
একথাও সুস্পষ্ট হয় যে, নাছের ইউসুফ ও তার সেনাপতিদের মাঝে যুদ্ধের ক্ষমতা নেই। তাই তারা প্রথমত নিজেদের হীনতা, দুর্বলতা, অক্ষমতা ও তাতারীদের সঙ্গে নিজেদের শক্তি-সামর্থ্যগত বিস্তর ফারাকের আলোচনা করতে শুরু করল। সেনাপতি যাইনুদ্দীন হাফেজীর পালা এলে সে তাতারীদের বিশালতা ও মুসলমানদের ক্ষুদ্রতার প্রসঙ্গ তুলে ধরে নাছের ইউসুফকে যুদ্ধবিরতির পরামর্শ প্রদান করে।
সভায় এসব কাপুরুষতাপূর্ণ বক্তব্য শুনে হুংকার দিয়ে ওঠেন সেনাপতি রুকন উদ্দীন বাইবার্স। তিনি ছিলেন দ্বীনী চেতনায় উদ্দীপ্ত এক মহাপুরুষ। তাতারীদের বিরুদ্ধে আক্রমণে দুঃসাহসী। আফসোস! তিনি উপস্থিত সবাইকে ভীরু কাপুরুষ ও বিশ্বাসঘাতক দেখতে পান।
তিনি যাইনুদ্দিন হাফেজীর সামনে চিৎকার করে ওঠেন। তার বক্তব্যের প্রতি তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করেন; এমনকি তিনি নিজেকে সংযত রাখতে না পেরে তাকে প্রহার করেন। তাকে লক্ষ্য করে বলেন, তুমিই মুসলমান ধ্বংসের কারণ। বাইবার্স যদিও যাইনুদ্দীন হাফেজীকে লক্ষ্য করে কথাগুলো বলেন, তবে তার বক্তব্যের প্রধান সম্বোধিত ব্যক্তি হলো নাছের ইউসুফ। কারণ, সেই মুসলমান ধ্বংসের অন্যতম প্রধান কারণ। কিন্তু বাইবার্স তো একদল লাশের সামনে বক্তব্য দিচ্ছিলেন। আর লাশ তো শুনতে পায় না। তাই তার হৃদয়বিদারক বক্তব্য কারও মনে আঘাত হানে নি।
إِنَّكَ لَا تُسْمِعُ الْمَوْتَى وَلَا تُسْمِعُ الصُّمَّ الدُّعَاءَ إِذَا وَلَّوْا مُدْبِرِينَ
“স্মরণ রেখো! তুমি মৃতদের তোমার কথা শোনাতে পারবে না এবং বধিরকেও তোমার ডাক শোনাতে সক্ষম নও! যখন তারা পেছন ফিরে চলে যায়।”৬৩
এরা সবাই মৃত ... বধির ... পেছন ফিরে পলায়নকারী! তারা সকলে মিলে পরামর্শসভায় উপযুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তাদের উক্তযুক্ত সিদ্ধান্ত .... পলায়ন করা!!
ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
রুকন উদ্দীন বাইবার্স কোনো সমাধান খুঁজে না পেয়ে ফিলিস্তিনের গাজা অভিমুখে রওনা হন। ইতিপূর্বে মিশর সম্রাট তাকে তাতারীদের মোকাবেলা করার আশা ব্যক্ত করে তাকে তার কাছে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়ে চিঠি লিখেছিলেন। বাস্তবেও মিশর সম্রাট তাকে সাদর অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। সামনে আমরা এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব—ইনশাআল্লাহ!

টিকাঃ
৬৩ সূরা নামল: ৮০।

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 দামেস্কবাসীর আত্মসমর্পণ!!

📄 দামেস্কবাসীর আত্মসমর্পণ!!


দামেস্ক একটি বিখ্যাত ও সুরক্ষিত শহর। পতনের পূর্বে আশা করা হতো দামেস্ক দীর্ঘদিন টিকে থাকবে। কিন্তু নাছের ইউসুফের মতো আমীরগণ যতক্ষণ শত্রুপক্ষ দূরে থাকবে, ততক্ষণ প্রতিরোধের ও জিহাদের ঘোষণা দেয়। কিন্তু যখনই শত্রুপক্ষ নিকটবর্তী হয়, তখন সব সময় তাদের পরবর্তী পদক্ষেপ হয় পলায়ন করা।
এমন ঘটনা আজ দামেস্কে ঘটেছে। এখানেই শেষ নয়, নাছের ইউসুফের মতো কাপুরুষ, মুনাফিক আমীর যতদিন এই ভূপৃষ্ঠে থাকবে, ততদিন বারংবার এমন ঘটনা ঘটতে থাকবে।
দামেস্কবাসী চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। কী করবে তারা? খুব অল্প সময়ের মাঝে তাতারী বাহিনী চলে আসবে। তাতারী বাহিনী সবকিছু জ্বালিয়ে দেয়। কাঁচা-পাকা কোন কিছুই অবশিষ্ট রাখে না। দামেস্কবাসী পূর্বে জিহাদের অনুশীলন গ্রহণ করেনি। যুদ্ধশাস্ত্র সম্পর্কে তাদের তেমন কোনো-জানা শোনা নেই। অভিজ্ঞ সৈন্যবাহিনী ও সেনাপতিগণ তো রণভূমি থেকে পলায়ন করেছে। দামেস্ক অধঃপতনের শেষসীমায় উপনীত ছিল।
দামেস্কের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ ও জ্ঞানীগুণীজন একত্রিত হয়ে হামাতবাসীর ন্যায় আত্মসমর্পণ করতে একমত হন। তারা সিদ্ধান্ত নেন শহরের চাবি হালাকু খানের কাছে হস্তান্তর করবেন। এরপর তার কাছে নিরাপত্তা কামনা করবেন। হাতে গোনা কয়েকজন মুজাহিদ ব্যতীত সকলেই এ ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেন। তারা দুর্গে আশ্রয় গ্রহণ করার এবং শরীরের শেষ রক্তবিন্দু থাকা পর্যন্ত লড়াই করার সিদ্ধান্ত নেয়।
হালাকু খান হামাতবাসীকে নিরাপত্তা প্রদানের সময় সত্যবাদিতার পরিচয় দিয়েছিল। কারণ, তখন সে অন্যদেরও আত্মসমর্পণের প্রতি উৎসাহিত করেছিল। দামেস্কের জ্ঞানীগুণী একদল হালাকু বাহিনীর সাক্ষাৎ এবং শহর ও রাজভাণ্ডারের চাবি অর্পণের উদ্দেশ্যে বের হন।

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 মানকু খানের মৃত্যু

📄 মানকু খানের মৃত্যু


এরই মাঝে এমন একটি দুর্ঘটনা ঘটে, যা হালাকু খানের হিসাব-নিকাশে গোলমাল সৃষ্টি করে। তাতারী সাম্রাজ্যের মহাসম্রাট মানকু খানের মৃত্যু ঘটে। দামেস্ক পৌঁছার পূর্বেই হালাকু খানের কাছে এই সংবাদ পৌঁছে। সত্যিই মানকু খানের মৃত্যু হালাকু খানের জন্য ছিল একটি বড় পরীক্ষা। মানকু খান পৃথিবীর ইতিহাসের সর্ববৃহৎ সাম্রাজ্য শাসন করত। আকস্মিক যেকোনো ভাঙন এই সাম্রাজ্যের জন্য ভয়াবহ হতে পারে। নিঃসন্দেহে হালাকু খানও তাতারী সাম্রাজ্যের অন্যতম স্থপতি ছিল। সে মানকু খানের ভাই। চেঙ্গিজ খানের পৌত্র। তার হাতে অসংখ্য অঞ্চল বিজিত হয়েছে। তার বীরত্ব বর্ণনার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, ইতিহাসে সেই প্রথম মুসলিম খেলাফতের পতন ঘটায়। এ সকল কীর্তি ও যোগ্যতার বলে হালাকু খান মধ্যপ্রাচ্যের তাতারী সাম্রাজ্য ব্যতীতই মূল তাতারী সাম্রাজ্যের অন্যতম প্রধান স্থপতির আসনে সমাসীন হয়েছে।
তাই মানকু খানের মৃত্যুসংবাদ পাওয়ামাত্রই সৈন্যবাহিনী ছেড়ে কালক্ষেপণ না করে 'পরবর্তী খলিফা নির্বাচন সভায়' যোগ দিতে তাতারী সাম্রাজ্যের রাজধানী কারাকুরামে ফিরে আসে। তার অন্যতম প্রধান ও বিচক্ষণ সেনাপতি কাতবুগা নবীনকে সৈন্যবাহিনীর দায়িত্ব অর্পণ করে। সে (আমরা পূর্বে আলোচনা করেছি) খ্রিস্টান ছিল।
হালাকু খান খুব দ্রুত প্রত্যাবর্তন করছিল। পারস্য অঞ্চলে পৌঁছলে কারাকুরাম থেকে কয়েকজন দূত তার নিকট এই সংবাদ নিয়ে আগমন করে যে, খলিফা নির্বাচনের বিষয়টি পূর্ণ হয়েছে। নব নির্বাচিত তাতার খলিফা হলো তার ভাই 'কাবিলা খাকান'। এটি তার প্রত্যাশাবিরুদ্ধ ছিল; এমনকি চেঙ্গিজ খান কর্তৃক খলিফা নির্বাচনের নীতিমালা পরিপন্থী ছিল। যদিও বিষয়টি হালাকু খানের স্বপ্নের ওপর বড় আঘাত হানে, তথাপি সে বিষয়টি শান্তভাবে মেনে নেয় এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থান করাকেই প্রাধান্য দেয়। সে এসব অঞ্চলে বহু কল্যাণ দেখতে পায়। তাই পুনরায় সিরিয়ায় প্রত্যাবর্তন না করে (বর্তমান ইরানের) তিবরিয শহরে গমন করে এবং তিবরিষ অঞ্চলকে মধ্যপ্রাচ্যের সুবিশাল অঞ্চলের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত করে। তিবরিষ একদিক থেকে সুরক্ষিত শহর। অন্যদিক থেকে এর আবহাওয়া নাতিশীতোষ্ণ। অঞ্চলটি হালাকু খান পরিচালিত সাম্রাজ্যের মধ্যখানে অবস্থিত। তার সাম্রাজ্য খাওয়ারেযম, কাজাকিস্তান, তুরমেনিস্তান, উজবেকিস্তান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, পারস্য, আযারবাইজান, ইরাক, তুরস্ক ও সিরিয়াব্যাপী বিস্তৃত। হালাকু খানকে সিরিয়ায় প্রত্যাবর্তন না করার প্রতি যে বিষয়টি অধিক প্রেরণা দিয়েছে, তা হলো, সিরিয়ার যেসব অঞ্চল এখনো বিজিত হয়নি, তা খুবই সামান্য। সেখানে খুব বেশি শহর নেই। উপরন্তু সে ফিরে যাওয়ার পূর্বে নাছের ইউসুফ বাহিনীর দামেস্ক অরক্ষিত রেখে ফিলিস্তিন পালিয়ে যাওয়ার সংবাদ পায়। তবে হালাকু খান কাতবুগার কাছে নাছের ইউসুফকে বন্দী করার নির্দেশ দিয়ে চিঠি পাঠাতে ভোলেনি।

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 পতন শেষে দামেস্কের অবস্থা

📄 পতন শেষে দামেস্কের অবস্থা


চলুন! আবার আমরা দামেস্কের আলোচনায় ফিরে যাই—
দামেস্কের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ ও জ্ঞানীগুণীজনরা শহরের চাবি বহন করে তাতারী বাহিনীর কাছে নিয়ে যায়। নতুন সেনাপতি কাতবুগা তাদের সংবর্ধনা জানায়। তাদের আত্মসমর্পণ মেনে নিয়ে তাদের নিরাপত্তা প্রদান করে এবং সৈন্যবাহিনীসহ দামেস্কে প্রবেশের জন্য অগ্রসর হয়।
হায়! উমাইয়া খেলাফতের রাজধানী দামেস্কের আজ পতন ঘটছে, যেমনটি ইতিপূর্বে আব্বাসী খেলাফতের রাজধানী বাগদাদের পতন ঘটেছিল!! তৎকালীন বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞানের অন্যতম প্রধান সুসমৃদ্ধ নগরী, জিহাদের প্রাণকেন্দ্র, মুসলিমবিশ্বের শ্রেষ্ঠ শহর দামেস্কের পতন হলো!!
তাতারী বাহিনী অবলীলায় অকুণ্ঠচিত্তে দামেস্কের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে, ঢুকে পড়েছে অভ্যন্তরে। কিন্তু কেউ প্রতিবাদ করেনি; কেউ বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়নি!!
আহ! শত আক্ষেপ!! হায়রে দামেস্ক!!! হে সিরিয়ার রাজধানী, হে মুসলিমবিশ্বের প্রাণ!!
কোথায় আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ, খালেদ ইবনে ওয়ালীদ, ইয়াযিদ ইবনে আবু সুফিয়ান, আমর ইবনে আস ও শুরাহবিল ইবনে হাসানা রা.; যারা ছয়শো বছরের অধিক সময় ব্যয়ে এই শহর জয় করেছিলেন!
কোথায় মু'আবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান, যিনি এখানে বসে দুনিয়া শাসন করেছিলেন?
কোথায় ওমর ইবনে আবদুল আযীয রহ. যিনি এই শহরে বসে সারা পৃথিবীতে ন্যায়-ইনসাফ ছড়িয়ে দিয়েছিলেন!
কোথায় উমাইয়া বংশের খলিফাবর্গ, যারা সুবিশাল বিস্তৃত ভূমি জয় করেছিলেন, যা আজ তাতারীদের হাতে পরাজিত?
কোথায় ইমাদুদ্দীন জঙ্গী ও নুরুদ্দীন মাহমুদ রহ., যারা জিহাদ করে ইজ্জত-সম্মান ও গর্ব অর্জন করেছিলেন?
কোথায় সালাহ উদ্দীন আইয়ূবী রহ., যিনি দামেস্কের ভূমিতে শুয়ে আছেন?
দীর্ঘদিন অতিবাহিত হয়েছে এবং মুসলমানগণ দামেস্কে ক্রমশ সব বস্তু প্রত্যক্ষ করেছে, যা কেউ কোনোদিন কল্পনাও করেনি।
মুসলমানগণ তিনজন খ্রিস্টান আমীর প্রত্যক্ষ করেছে, যারা দলের সম্মুখ ভাগে ঘোড়া হাঁকিয়ে গর্ব প্রকাশ করছিল। তারা দামেস্কের প্রধান ফটক ভেঙে প্রধান সড়কগুলোতে হইহুল্লোড় করছিল। তাতারী বাহিনীর অগ্রে ছিল তাতারী সেনাপতি কাতবুগা নবীন। আর তার দু-পাশে ছিল আর্মেনিয়ার রাজা হাইতুম ও আন্তাকিয়ার রাজা বুহমন্দ। তারা সকলে মুসলমানদের পবিত্র নগরীতে প্রবেশ করে। ১৪ হিজরীতে রোমসম্রাট কায়সার হিরাক্লিয়াসের যুদ্ধে রোমান বাহিনী দামেস্ক ছেড়ে পালাবার পর এই প্রথম কোনো খ্রিস্টান আমীর দামেস্কে প্রবেশ করল।
লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ!
তাতারীরা দামেস্কাবাসীকে কার্যত নিরাপত্তা প্রদান করেছিল। তারা কাউকে হত্যা করেনি। তবে যারা দুর্গে আশ্রয় নিয়েছিল, তাদের কয়েক সপ্তাহ অবরোধ করে রাখার পর দুর্গ ভেঙে হত্যা করে।
৬৫৮ হিজরীর শেষদিকে দামেস্কের পতন ঘটে। এটি বাগদাদ পতনের পূর্ণ দুই বছর পরের ঘটনা। এটি তাতারী কর্তৃক নির্ধারিত সময়। কারণ, এ সময়ে তারা বহু অঞ্চল দখল করেছে এবং ইরাক, তুরস্ক ও সিরিয়ায় অগণিত শহর ধ্বংস করেছে। হ্যাঁ! অধঃপতিত প্রধান তিনটি শহর হলো বাগদাদ, আলেপ্পো ও দামেস্ক। কিন্তু অন্য শহরগুলো যেনতেন শহর ছিলনা। কারণ এসব শহরের উর্বরতা, প্রাচীনতা, ঐতিহ্য, জীবনযাত্রার মান, উন্নত ও আধুনিক সভ্যতা-সংস্কৃতির কারণে প্রচুর জনগণ বাস করত।
স্বাভাবিকভাবেই গোটা মুসলিমবিশ্বের মনোবল ক্ষীণ হয়ে গিয়েছিল। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান একথা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল যে, তাতারীরা অপরাজেয়। তাদের পরাজয় করা সম্ভব নয় এবং অধিকাংশ একথা ভাবতে শুরু করেছিল যে, মুসলিম উম্মাহর অবশিষ্ট হায়াত খুবই সামান্য।
শহরের প্রাচীর ও দুর্গগুলো ভেঙে ফেলার পর তাতারীরা খ্রিস্টানদের মাধ্যমে দামেস্ক পরিচালনা শুরু করে। তারা 'আপেল সিয়ান' নামক তাতারীকে শহর পরিচালনার দায়িত্ব প্রদান করে। সে খ্রিস্টান না হলেও খ্রিস্টানদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিল। তাদের পক্ষপাতিত্ব করত। দামেস্ক শহর তার ইতিহাসের সবচেয়ে আশ্চর্য সময় পার করতে থাকে!
ইবনে কাছীর রহ. আপেল সিয়ান দামেস্ক পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণের সময়কার দামেস্কের পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে যে বক্তব্য পেশ করেছেন, এ পর্যায়ে আমি তা উল্লেখ করছি। ইবনে কাছীর রহ. বলেন—
“আপেল সিয়ান (তার ওপর আল্লাহর লা'নত নাজিল হোক) খ্রিস্টান যাজক ও গির্জাপ্রধানদের একত্রিত করে তাদের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে এবং তাদের গির্জাসমূহ পরিদর্শন করে। একদল খ্রিস্টান হালাকু খানের সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে তিবরিয গমন করে। সঙ্গে বহু মূল্যবান হাদিয়া-তোহফাও নিয়ে যায়। তাদের সঙ্গে হালাকু খান কর্তৃক নিরাপত্তানামা ছিল। তারা তাওমা দরজা (দামেস্কের একটি ফটক) দিয়ে প্রবেশ করে। তারা সঙ্গে একটি লম্বা ক্রুশ বহন করে নিয়েছিল। তারা তাদের ধর্মীয় প্রতিটি বার্তা সমস্বরে উচ্চারণ করছিল। তারা বলছিল, 'সঠিক দ্বীন তথা দ্বীনে মাসীহ জয়লাভ করেছে।' তারা ইসলাম ধর্ম ও ইসলামধর্মের অনুসারীদের নিন্দা গাইছিল। তাদের সঙ্গে মদভর্তি অনেক মটকা ছিল। কোনো মসজিদ অতিক্রম করলে মসজিদে মদ ছিটাত। আর কিছু মদভর্তি পাতিল ছিল, সেগুলো মানুষের চেহারা ও কাপড়ের ওপর ছিটাত। বাজার ও পথ-ঘাটে কেউ তাদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করলে ক্রুশ বহনের নির্দেশ দিত। বাজারের এক দোকানের উঁচু স্থানে দাঁড়িয়ে তাদের বক্তা খ্রিস্টধর্মের প্রশংসা জ্ঞাপন এবং ইসলামধর্ম ও মুসলমানদের নিন্দা জ্ঞাপন করছিল। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
এরপর তারা মদ নিয়ে জামে মসজিদে প্রবেশ করে। এই ঘটনা ঘটার পর মুসলিম বিচারক ও উলামা-ফুকাহাগণ একত্রিত হয়ে তাতারী-প্রধান আপেল সিয়ানের কাছে এগিয়ে এই ঘটনার প্রতিবাদ জানান। কিন্তু তাদের কথা প্রত্যাখ্যান করা হয় এবং তাদের অপমানিত করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে খ্রিস্টানদের কথা প্রাধান্য দেওয়া হয়। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।"
এটি ছিল দামেস্কবাসী মুসলমানদের জন্য দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্ত। মুসলমানগণ উভয় সংকটে পড়েছিল। একদিকে তাতারী অন্যদিকে খ্রিস্টান। একথা সকলেরই জানত যে, তাতারী ও খ্রিস্টানদের মাঝে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বিরাজমান। একে অপরের জন্য সহযোগী। বিশেষত সিরিয়ার তাতারী সেনাপতি কাতবুগা খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী। আর যে সকল খ্রিস্টান সিরিয়ায় বাস করে তারা সিরিয়ার সকল গোপন ভেদ জানত। সুতরাং নিঃসন্দেহে খ্রিস্টানরা তাতারীদের সহযোগিতা করলে তা মুসলমানদের জন্য বড়ই দুঃখজনক ও আক্ষেপের বিষয় হবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00