📄 হামাতবাসীর আত্মসমর্পণ
তাতারী বাহিনী হামাত আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, এমন সময় হামাতের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবর্গের একটি দল হালাকু খানের কাছে এসে শহরের চাবি হস্তান্তর করে। নিঃশর্তে শহরকে হালাকু খানের হাতে অর্পণ করে। স্বেচ্ছায় স্বপ্রণোদিত হয়ে! হালাকু খানের পক্ষ থেকে কোনো চাপ কিংবা আহ্বানে নয়!! হালাকু খান শহরের চাবি গ্রহণ করে এবং তাদের নিরাপত্তা প্রদান করে। এবার সে সত্যি সত্যিই নিরাপত্তা প্রদান করেছিল, যাতে অন্যরা তাদের দেখে আত্মসমর্পণের প্রতি উৎসাহিত হয়।
হালাকু খান তার বর্বর বাহিনী নিয়ে দক্ষিণ অভিমুখে রওয়ানা হয়। হামাত নগরীর পাশ দিয়ে অতিক্রম করে। তবে হামাত প্রবেশ করে না। বন্ধু আশরাফ আইয়ূবীর শহর হিমসও অতিক্রম করে। তাতেও প্রবেশ করে না। এরপর দামেস্ক অভিমুখে রওয়ানা হয়। দামেস্ক হিমস থেকে ১২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
আসুন হালাকু খানের আলোচনা রেখে আমরা সে সময়ের দামেস্কে অবস্থান নিয়ে কিছুটা আলোকপাত করি-
নাছের ইউসুফ তখন দামেস্কের বাইরে সৈন্যবাহিনীসহ অবস্থান করছিল। ইতিমধ্যে ক্রমান্বয়ে তার কাছে মিয়াফারেকীনের পতন, নিকৃষ্ট পন্থায় মোহাম্মদ আইয়ূবীর হত্যা, আলেপ্পো নগরীর পতন, হারেম দুর্গের পতন এবং হামাত ও হিমসের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের সংবাদ পৌঁছেছে। নিঃসন্দেহে তাতারীদের সামনের লক্ষ্য হলো দামেস্ক!!
ভীরু সম্রাট নাছের ইউসুফ কী করবে? শক্তি নেই, ক্ষমতা নেই, অথচ যুদ্ধের ঘোষণা দিয়ে বসেছে? তার দুর্বলতা ও ভীরুতা আপেক্ষিক কোনো বিষয় নয় যে, সে তাতারীদের অপেক্ষা দুর্বল; বরং ভীরুতা ও দুর্বলতা তার রক্ত-মাংসে মিশ্রিত।
নাছের ইউসুফ তার সেনাপতিদের নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শসভার আয়োজন করল।
...আমি কী করতে পারি?
📄 ভীরুদের জলাশয়ে এক বীর বাহাদুরের আত্মপ্রকাশ
সভায় গুরুত্বপূর্ণ সেনাপতিগণ উপস্থিত ছিলেন। তাদের প্রধান ছিল আমীর যাইনুদ্দীন হাফেজী। আরও ছিলেন সেনাপতি রুকন উদ্দীন বাইবার্স বান্দকাদারী। ইতিপূর্বে মিশরে যুদ্ধ চলাকালে যেসব আমীর পলায়ন করেছিল, সে তাদের অন্যতম ছিল। নাছের ইউসুফ তাকে আশ্রয় দেয় এবং রণদক্ষতা ও নেতৃত্ব-গুণ দেখে তাকে নিজের অন্যতম সেনাপতি হিসেবে নিয়োগ দেয়।
সভা শুরু হয়। কিন্তু উপস্থিত সভাসদবৃন্দের মাঝে নাছের ইউসুফ ও পরবর্তীতে অন্যান্যদের মাঝে যে তাতারীত্রাস সংক্রমিত হয়েছে, তা গোপন থাকে না।
একথাও সুস্পষ্ট হয় যে, নাছের ইউসুফ ও তার সেনাপতিদের মাঝে যুদ্ধের ক্ষমতা নেই। তাই তারা প্রথমত নিজেদের হীনতা, দুর্বলতা, অক্ষমতা ও তাতারীদের সঙ্গে নিজেদের শক্তি-সামর্থ্যগত বিস্তর ফারাকের আলোচনা করতে শুরু করল। সেনাপতি যাইনুদ্দীন হাফেজীর পালা এলে সে তাতারীদের বিশালতা ও মুসলমানদের ক্ষুদ্রতার প্রসঙ্গ তুলে ধরে নাছের ইউসুফকে যুদ্ধবিরতির পরামর্শ প্রদান করে।
সভায় এসব কাপুরুষতাপূর্ণ বক্তব্য শুনে হুংকার দিয়ে ওঠেন সেনাপতি রুকন উদ্দীন বাইবার্স। তিনি ছিলেন দ্বীনী চেতনায় উদ্দীপ্ত এক মহাপুরুষ। তাতারীদের বিরুদ্ধে আক্রমণে দুঃসাহসী। আফসোস! তিনি উপস্থিত সবাইকে ভীরু কাপুরুষ ও বিশ্বাসঘাতক দেখতে পান।
তিনি যাইনুদ্দিন হাফেজীর সামনে চিৎকার করে ওঠেন। তার বক্তব্যের প্রতি তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করেন; এমনকি তিনি নিজেকে সংযত রাখতে না পেরে তাকে প্রহার করেন। তাকে লক্ষ্য করে বলেন, তুমিই মুসলমান ধ্বংসের কারণ। বাইবার্স যদিও যাইনুদ্দীন হাফেজীকে লক্ষ্য করে কথাগুলো বলেন, তবে তার বক্তব্যের প্রধান সম্বোধিত ব্যক্তি হলো নাছের ইউসুফ। কারণ, সেই মুসলমান ধ্বংসের অন্যতম প্রধান কারণ। কিন্তু বাইবার্স তো একদল লাশের সামনে বক্তব্য দিচ্ছিলেন। আর লাশ তো শুনতে পায় না। তাই তার হৃদয়বিদারক বক্তব্য কারও মনে আঘাত হানে নি।
إِنَّكَ لَا تُسْمِعُ الْمَوْتَى وَلَا تُسْمِعُ الصُّمَّ الدُّعَاءَ إِذَا وَلَّوْا مُدْبِرِينَ
“স্মরণ রেখো! তুমি মৃতদের তোমার কথা শোনাতে পারবে না এবং বধিরকেও তোমার ডাক শোনাতে সক্ষম নও! যখন তারা পেছন ফিরে চলে যায়।”৬৩
এরা সবাই মৃত ... বধির ... পেছন ফিরে পলায়নকারী! তারা সকলে মিলে পরামর্শসভায় উপযুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তাদের উক্তযুক্ত সিদ্ধান্ত .... পলায়ন করা!!
ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
রুকন উদ্দীন বাইবার্স কোনো সমাধান খুঁজে না পেয়ে ফিলিস্তিনের গাজা অভিমুখে রওনা হন। ইতিপূর্বে মিশর সম্রাট তাকে তাতারীদের মোকাবেলা করার আশা ব্যক্ত করে তাকে তার কাছে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়ে চিঠি লিখেছিলেন। বাস্তবেও মিশর সম্রাট তাকে সাদর অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। সামনে আমরা এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব—ইনশাআল্লাহ!
টিকাঃ
৬৩ সূরা নামল: ৮০।
📄 দামেস্কবাসীর আত্মসমর্পণ!!
দামেস্ক একটি বিখ্যাত ও সুরক্ষিত শহর। পতনের পূর্বে আশা করা হতো দামেস্ক দীর্ঘদিন টিকে থাকবে। কিন্তু নাছের ইউসুফের মতো আমীরগণ যতক্ষণ শত্রুপক্ষ দূরে থাকবে, ততক্ষণ প্রতিরোধের ও জিহাদের ঘোষণা দেয়। কিন্তু যখনই শত্রুপক্ষ নিকটবর্তী হয়, তখন সব সময় তাদের পরবর্তী পদক্ষেপ হয় পলায়ন করা।
এমন ঘটনা আজ দামেস্কে ঘটেছে। এখানেই শেষ নয়, নাছের ইউসুফের মতো কাপুরুষ, মুনাফিক আমীর যতদিন এই ভূপৃষ্ঠে থাকবে, ততদিন বারংবার এমন ঘটনা ঘটতে থাকবে।
দামেস্কবাসী চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। কী করবে তারা? খুব অল্প সময়ের মাঝে তাতারী বাহিনী চলে আসবে। তাতারী বাহিনী সবকিছু জ্বালিয়ে দেয়। কাঁচা-পাকা কোন কিছুই অবশিষ্ট রাখে না। দামেস্কবাসী পূর্বে জিহাদের অনুশীলন গ্রহণ করেনি। যুদ্ধশাস্ত্র সম্পর্কে তাদের তেমন কোনো-জানা শোনা নেই। অভিজ্ঞ সৈন্যবাহিনী ও সেনাপতিগণ তো রণভূমি থেকে পলায়ন করেছে। দামেস্ক অধঃপতনের শেষসীমায় উপনীত ছিল।
দামেস্কের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ ও জ্ঞানীগুণীজন একত্রিত হয়ে হামাতবাসীর ন্যায় আত্মসমর্পণ করতে একমত হন। তারা সিদ্ধান্ত নেন শহরের চাবি হালাকু খানের কাছে হস্তান্তর করবেন। এরপর তার কাছে নিরাপত্তা কামনা করবেন। হাতে গোনা কয়েকজন মুজাহিদ ব্যতীত সকলেই এ ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেন। তারা দুর্গে আশ্রয় গ্রহণ করার এবং শরীরের শেষ রক্তবিন্দু থাকা পর্যন্ত লড়াই করার সিদ্ধান্ত নেয়।
হালাকু খান হামাতবাসীকে নিরাপত্তা প্রদানের সময় সত্যবাদিতার পরিচয় দিয়েছিল। কারণ, তখন সে অন্যদেরও আত্মসমর্পণের প্রতি উৎসাহিত করেছিল। দামেস্কের জ্ঞানীগুণী একদল হালাকু বাহিনীর সাক্ষাৎ এবং শহর ও রাজভাণ্ডারের চাবি অর্পণের উদ্দেশ্যে বের হন।
📄 মানকু খানের মৃত্যু
এরই মাঝে এমন একটি দুর্ঘটনা ঘটে, যা হালাকু খানের হিসাব-নিকাশে গোলমাল সৃষ্টি করে। তাতারী সাম্রাজ্যের মহাসম্রাট মানকু খানের মৃত্যু ঘটে। দামেস্ক পৌঁছার পূর্বেই হালাকু খানের কাছে এই সংবাদ পৌঁছে। সত্যিই মানকু খানের মৃত্যু হালাকু খানের জন্য ছিল একটি বড় পরীক্ষা। মানকু খান পৃথিবীর ইতিহাসের সর্ববৃহৎ সাম্রাজ্য শাসন করত। আকস্মিক যেকোনো ভাঙন এই সাম্রাজ্যের জন্য ভয়াবহ হতে পারে। নিঃসন্দেহে হালাকু খানও তাতারী সাম্রাজ্যের অন্যতম স্থপতি ছিল। সে মানকু খানের ভাই। চেঙ্গিজ খানের পৌত্র। তার হাতে অসংখ্য অঞ্চল বিজিত হয়েছে। তার বীরত্ব বর্ণনার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, ইতিহাসে সেই প্রথম মুসলিম খেলাফতের পতন ঘটায়। এ সকল কীর্তি ও যোগ্যতার বলে হালাকু খান মধ্যপ্রাচ্যের তাতারী সাম্রাজ্য ব্যতীতই মূল তাতারী সাম্রাজ্যের অন্যতম প্রধান স্থপতির আসনে সমাসীন হয়েছে।
তাই মানকু খানের মৃত্যুসংবাদ পাওয়ামাত্রই সৈন্যবাহিনী ছেড়ে কালক্ষেপণ না করে 'পরবর্তী খলিফা নির্বাচন সভায়' যোগ দিতে তাতারী সাম্রাজ্যের রাজধানী কারাকুরামে ফিরে আসে। তার অন্যতম প্রধান ও বিচক্ষণ সেনাপতি কাতবুগা নবীনকে সৈন্যবাহিনীর দায়িত্ব অর্পণ করে। সে (আমরা পূর্বে আলোচনা করেছি) খ্রিস্টান ছিল।
হালাকু খান খুব দ্রুত প্রত্যাবর্তন করছিল। পারস্য অঞ্চলে পৌঁছলে কারাকুরাম থেকে কয়েকজন দূত তার নিকট এই সংবাদ নিয়ে আগমন করে যে, খলিফা নির্বাচনের বিষয়টি পূর্ণ হয়েছে। নব নির্বাচিত তাতার খলিফা হলো তার ভাই 'কাবিলা খাকান'। এটি তার প্রত্যাশাবিরুদ্ধ ছিল; এমনকি চেঙ্গিজ খান কর্তৃক খলিফা নির্বাচনের নীতিমালা পরিপন্থী ছিল। যদিও বিষয়টি হালাকু খানের স্বপ্নের ওপর বড় আঘাত হানে, তথাপি সে বিষয়টি শান্তভাবে মেনে নেয় এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থান করাকেই প্রাধান্য দেয়। সে এসব অঞ্চলে বহু কল্যাণ দেখতে পায়। তাই পুনরায় সিরিয়ায় প্রত্যাবর্তন না করে (বর্তমান ইরানের) তিবরিয শহরে গমন করে এবং তিবরিষ অঞ্চলকে মধ্যপ্রাচ্যের সুবিশাল অঞ্চলের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত করে। তিবরিষ একদিক থেকে সুরক্ষিত শহর। অন্যদিক থেকে এর আবহাওয়া নাতিশীতোষ্ণ। অঞ্চলটি হালাকু খান পরিচালিত সাম্রাজ্যের মধ্যখানে অবস্থিত। তার সাম্রাজ্য খাওয়ারেযম, কাজাকিস্তান, তুরমেনিস্তান, উজবেকিস্তান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, পারস্য, আযারবাইজান, ইরাক, তুরস্ক ও সিরিয়াব্যাপী বিস্তৃত। হালাকু খানকে সিরিয়ায় প্রত্যাবর্তন না করার প্রতি যে বিষয়টি অধিক প্রেরণা দিয়েছে, তা হলো, সিরিয়ার যেসব অঞ্চল এখনো বিজিত হয়নি, তা খুবই সামান্য। সেখানে খুব বেশি শহর নেই। উপরন্তু সে ফিরে যাওয়ার পূর্বে নাছের ইউসুফ বাহিনীর দামেস্ক অরক্ষিত রেখে ফিলিস্তিন পালিয়ে যাওয়ার সংবাদ পায়। তবে হালাকু খান কাতবুগার কাছে নাছের ইউসুফকে বন্দী করার নির্দেশ দিয়ে চিঠি পাঠাতে ভোলেনি।