📄 গির্জার গালে চড়!!
হালাকু খান ল্যাটিন কুলপতির স্থানে 'ইউমনেমিউস' নামক গ্রিক কুলপতি নির্ধারিত করে। আমরা জানি তৎকালীন সিরিয়ার খ্রিস্ট সাম্রাজ্য মূলত পশ্চিম ইউরোপীয় খ্রিস্ট সাম্রাজ্য ছিল। তারা সকলে ক্যাথলিক মতবাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। অথচ নবনিয়োজিত গ্রিক কুলপতি অর্থডক্স মতবাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত। অর্থডক্স হলো পূর্ব ইউরোপের মতবাদ। এই দুই মতবাদের ওপর বিস্তর ব্যবধান বিরাজমান। এমনকি দুই মতাদর্শের মাঝে দীর্ঘদিন ধরে চরম সংঘর্ষ চলছে। এতে বোঝা যায়, হালাকু খানের এই পদক্ষেপের সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য উদ্দেশ্য রয়েছে। প্রথমত সে আন্তাকিয়া ও আর্মেনিয়ার রাজাদ্বয়কে অপমানিত অবস্থায় রাখতে চেয়েছিল। যেন তারা বুঝতে পারে তারা কেবল হালাকু খানের তাবে। তাদের নিজস্ব রায় বাস্তবায়নের কোনো অধিকার তাদের নেই এবং তাদের মাথায় যেন কখনো এ কথা না আসে যে, তারা হালাকু খানের সঙ্গে মিত্রের ন্যায় চলাফেরা করবে। দ্বিতীয়ত হালাকু খান চায়নি এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা বিরাজমান হোক। অন্যথায় তার অজ্ঞাতে আঞ্চলিক আমির বা রাজা ক্ষমতাশীল হয়ে উঠতে পারে। তাই সে তার মিত্রদের একজনের ওপর আরেকজনের মাধ্যমে নজরদারি করত। তৃতীয়ত হালাকু খান গ্রিক সাম্রাজ্যের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক সৃষ্টির ইচ্ছা করেছিল। এর মাধ্যমে সিরিয়া ও আলাতোনিয়ায় (তুরস্ক অঞ্চলসমূহে) তার ক্ষমতার স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে চেয়েছিল। কারণ, সিরিয়া ও আলাতোলিয়া গ্রিক সাম্রাজ্যের পার্শ্ববর্তী দেশ।
স্বাভাবিকভাবে এটি আন্তাকিয়ার আমীরের জন্য ছিল বিরাট অপমান। কিন্তু এটাই বাস্তব ছিল। নিজের ইজ্জত সম্মান হারিয়েও সে কোনো প্রতিবাদ করেনি। কিন্তু তার উপদেষ্টামণ্ডলী ও মন্ত্রিপরিষদ আপত্তি প্রকাশ করে। কিন্তু আমীর বুহমন্দ হালাকু খানের সামনে বিনয়াবত। সে তাতারীদের প্রকৃত মর্যাদা প্রদান করে। সে সময় তাতারীরা এত বড় সাম্রাজ্য শাসন করত, পৃথিবীর মানচিত্রে এতবড় সাম্রাজ্য কখনো স্থান পায় নি। পূর্বে কোরিয়া পশ্চিমে পোল্যান্ড। মধ্যবর্তী সকল ক্রুশেডযুদ্ধ এবং গত দশ বছরে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ইউরোপ যেসব যুদ্ধ করেছে—এসব যুদ্ধে লেবানন, ফিলিস্তিন, সিরিয়া ও তুরস্কের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অঞ্চল ব্যতীত কিছুই তারা জয়লাভ করতে পারেনি। সাধারণত কয়েকটি গ্রাম সম্বলিত একটি শহর ছিল তাদের সাম্রাজ্য।
📄 হামাতবাসীর আত্মসমর্পণ
তাতারী বাহিনী হামাত আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, এমন সময় হামাতের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবর্গের একটি দল হালাকু খানের কাছে এসে শহরের চাবি হস্তান্তর করে। নিঃশর্তে শহরকে হালাকু খানের হাতে অর্পণ করে। স্বেচ্ছায় স্বপ্রণোদিত হয়ে! হালাকু খানের পক্ষ থেকে কোনো চাপ কিংবা আহ্বানে নয়!! হালাকু খান শহরের চাবি গ্রহণ করে এবং তাদের নিরাপত্তা প্রদান করে। এবার সে সত্যি সত্যিই নিরাপত্তা প্রদান করেছিল, যাতে অন্যরা তাদের দেখে আত্মসমর্পণের প্রতি উৎসাহিত হয়।
হালাকু খান তার বর্বর বাহিনী নিয়ে দক্ষিণ অভিমুখে রওয়ানা হয়। হামাত নগরীর পাশ দিয়ে অতিক্রম করে। তবে হামাত প্রবেশ করে না। বন্ধু আশরাফ আইয়ূবীর শহর হিমসও অতিক্রম করে। তাতেও প্রবেশ করে না। এরপর দামেস্ক অভিমুখে রওয়ানা হয়। দামেস্ক হিমস থেকে ১২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
আসুন হালাকু খানের আলোচনা রেখে আমরা সে সময়ের দামেস্কে অবস্থান নিয়ে কিছুটা আলোকপাত করি-
নাছের ইউসুফ তখন দামেস্কের বাইরে সৈন্যবাহিনীসহ অবস্থান করছিল। ইতিমধ্যে ক্রমান্বয়ে তার কাছে মিয়াফারেকীনের পতন, নিকৃষ্ট পন্থায় মোহাম্মদ আইয়ূবীর হত্যা, আলেপ্পো নগরীর পতন, হারেম দুর্গের পতন এবং হামাত ও হিমসের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের সংবাদ পৌঁছেছে। নিঃসন্দেহে তাতারীদের সামনের লক্ষ্য হলো দামেস্ক!!
ভীরু সম্রাট নাছের ইউসুফ কী করবে? শক্তি নেই, ক্ষমতা নেই, অথচ যুদ্ধের ঘোষণা দিয়ে বসেছে? তার দুর্বলতা ও ভীরুতা আপেক্ষিক কোনো বিষয় নয় যে, সে তাতারীদের অপেক্ষা দুর্বল; বরং ভীরুতা ও দুর্বলতা তার রক্ত-মাংসে মিশ্রিত।
নাছের ইউসুফ তার সেনাপতিদের নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শসভার আয়োজন করল।
...আমি কী করতে পারি?
📄 ভীরুদের জলাশয়ে এক বীর বাহাদুরের আত্মপ্রকাশ
সভায় গুরুত্বপূর্ণ সেনাপতিগণ উপস্থিত ছিলেন। তাদের প্রধান ছিল আমীর যাইনুদ্দীন হাফেজী। আরও ছিলেন সেনাপতি রুকন উদ্দীন বাইবার্স বান্দকাদারী। ইতিপূর্বে মিশরে যুদ্ধ চলাকালে যেসব আমীর পলায়ন করেছিল, সে তাদের অন্যতম ছিল। নাছের ইউসুফ তাকে আশ্রয় দেয় এবং রণদক্ষতা ও নেতৃত্ব-গুণ দেখে তাকে নিজের অন্যতম সেনাপতি হিসেবে নিয়োগ দেয়।
সভা শুরু হয়। কিন্তু উপস্থিত সভাসদবৃন্দের মাঝে নাছের ইউসুফ ও পরবর্তীতে অন্যান্যদের মাঝে যে তাতারীত্রাস সংক্রমিত হয়েছে, তা গোপন থাকে না।
একথাও সুস্পষ্ট হয় যে, নাছের ইউসুফ ও তার সেনাপতিদের মাঝে যুদ্ধের ক্ষমতা নেই। তাই তারা প্রথমত নিজেদের হীনতা, দুর্বলতা, অক্ষমতা ও তাতারীদের সঙ্গে নিজেদের শক্তি-সামর্থ্যগত বিস্তর ফারাকের আলোচনা করতে শুরু করল। সেনাপতি যাইনুদ্দীন হাফেজীর পালা এলে সে তাতারীদের বিশালতা ও মুসলমানদের ক্ষুদ্রতার প্রসঙ্গ তুলে ধরে নাছের ইউসুফকে যুদ্ধবিরতির পরামর্শ প্রদান করে।
সভায় এসব কাপুরুষতাপূর্ণ বক্তব্য শুনে হুংকার দিয়ে ওঠেন সেনাপতি রুকন উদ্দীন বাইবার্স। তিনি ছিলেন দ্বীনী চেতনায় উদ্দীপ্ত এক মহাপুরুষ। তাতারীদের বিরুদ্ধে আক্রমণে দুঃসাহসী। আফসোস! তিনি উপস্থিত সবাইকে ভীরু কাপুরুষ ও বিশ্বাসঘাতক দেখতে পান।
তিনি যাইনুদ্দিন হাফেজীর সামনে চিৎকার করে ওঠেন। তার বক্তব্যের প্রতি তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করেন; এমনকি তিনি নিজেকে সংযত রাখতে না পেরে তাকে প্রহার করেন। তাকে লক্ষ্য করে বলেন, তুমিই মুসলমান ধ্বংসের কারণ। বাইবার্স যদিও যাইনুদ্দীন হাফেজীকে লক্ষ্য করে কথাগুলো বলেন, তবে তার বক্তব্যের প্রধান সম্বোধিত ব্যক্তি হলো নাছের ইউসুফ। কারণ, সেই মুসলমান ধ্বংসের অন্যতম প্রধান কারণ। কিন্তু বাইবার্স তো একদল লাশের সামনে বক্তব্য দিচ্ছিলেন। আর লাশ তো শুনতে পায় না। তাই তার হৃদয়বিদারক বক্তব্য কারও মনে আঘাত হানে নি।
إِنَّكَ لَا تُسْمِعُ الْمَوْتَى وَلَا تُسْمِعُ الصُّمَّ الدُّعَاءَ إِذَا وَلَّوْا مُدْبِرِينَ
“স্মরণ রেখো! তুমি মৃতদের তোমার কথা শোনাতে পারবে না এবং বধিরকেও তোমার ডাক শোনাতে সক্ষম নও! যখন তারা পেছন ফিরে চলে যায়।”৬৩
এরা সবাই মৃত ... বধির ... পেছন ফিরে পলায়নকারী! তারা সকলে মিলে পরামর্শসভায় উপযুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তাদের উক্তযুক্ত সিদ্ধান্ত .... পলায়ন করা!!
ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
রুকন উদ্দীন বাইবার্স কোনো সমাধান খুঁজে না পেয়ে ফিলিস্তিনের গাজা অভিমুখে রওনা হন। ইতিপূর্বে মিশর সম্রাট তাকে তাতারীদের মোকাবেলা করার আশা ব্যক্ত করে তাকে তার কাছে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়ে চিঠি লিখেছিলেন। বাস্তবেও মিশর সম্রাট তাকে সাদর অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। সামনে আমরা এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব—ইনশাআল্লাহ!
টিকাঃ
৬৩ সূরা নামল: ৮০।
📄 দামেস্কবাসীর আত্মসমর্পণ!!
দামেস্ক একটি বিখ্যাত ও সুরক্ষিত শহর। পতনের পূর্বে আশা করা হতো দামেস্ক দীর্ঘদিন টিকে থাকবে। কিন্তু নাছের ইউসুফের মতো আমীরগণ যতক্ষণ শত্রুপক্ষ দূরে থাকবে, ততক্ষণ প্রতিরোধের ও জিহাদের ঘোষণা দেয়। কিন্তু যখনই শত্রুপক্ষ নিকটবর্তী হয়, তখন সব সময় তাদের পরবর্তী পদক্ষেপ হয় পলায়ন করা।
এমন ঘটনা আজ দামেস্কে ঘটেছে। এখানেই শেষ নয়, নাছের ইউসুফের মতো কাপুরুষ, মুনাফিক আমীর যতদিন এই ভূপৃষ্ঠে থাকবে, ততদিন বারংবার এমন ঘটনা ঘটতে থাকবে।
দামেস্কবাসী চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। কী করবে তারা? খুব অল্প সময়ের মাঝে তাতারী বাহিনী চলে আসবে। তাতারী বাহিনী সবকিছু জ্বালিয়ে দেয়। কাঁচা-পাকা কোন কিছুই অবশিষ্ট রাখে না। দামেস্কবাসী পূর্বে জিহাদের অনুশীলন গ্রহণ করেনি। যুদ্ধশাস্ত্র সম্পর্কে তাদের তেমন কোনো-জানা শোনা নেই। অভিজ্ঞ সৈন্যবাহিনী ও সেনাপতিগণ তো রণভূমি থেকে পলায়ন করেছে। দামেস্ক অধঃপতনের শেষসীমায় উপনীত ছিল।
দামেস্কের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ ও জ্ঞানীগুণীজন একত্রিত হয়ে হামাতবাসীর ন্যায় আত্মসমর্পণ করতে একমত হন। তারা সিদ্ধান্ত নেন শহরের চাবি হালাকু খানের কাছে হস্তান্তর করবেন। এরপর তার কাছে নিরাপত্তা কামনা করবেন। হাতে গোনা কয়েকজন মুজাহিদ ব্যতীত সকলেই এ ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেন। তারা দুর্গে আশ্রয় গ্রহণ করার এবং শরীরের শেষ রক্তবিন্দু থাকা পর্যন্ত লড়াই করার সিদ্ধান্ত নেয়।
হালাকু খান হামাতবাসীকে নিরাপত্তা প্রদানের সময় সত্যবাদিতার পরিচয় দিয়েছিল। কারণ, তখন সে অন্যদেরও আত্মসমর্পণের প্রতি উৎসাহিত করেছিল। দামেস্কের জ্ঞানীগুণী একদল হালাকু বাহিনীর সাক্ষাৎ এবং শহর ও রাজভাণ্ডারের চাবি অর্পণের উদ্দেশ্যে বের হন।