📘 তাতারীদের ইতিহাস 📄 মিয়াফারেকীন পতন

📄 মিয়াফারেকীন পতন


এই সময়ের মধ্যে একটি মর্মন্তুদ ও হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। তা হলো, দেড় বছরের দীর্ঘ অবরোধের পর তাতারীদের পায়ের নিচে মিয়াফারেকীনের পতন ঘটে।
টানা আঠারো মাস জিহাদ ও সংগ্রাম চলতে থাকে। তবুও পৃথিবীর অন্য কোনো আমীর-উমারা কিংবা রাজা-বাদশার হৃদয় বিগলিত হয় না। নাছের, আশরাফ, মুগীস ইত্যাদি বিখ্যাত উপাধিধারী ব্যক্তিরা দূর থেকে নাটক প্রত্যক্ষ করে। কিন্তু কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করে না।
মিয়াফারেকীন শহরের পতন ঘটে। শহরের সবকিছু ছিনিয়ে নেওয়া হয়। আশমুত ইবনে হালাকু এই অঞ্চলের প্রতিবাদমুখর সব শহরের জন্য এটিকে শিক্ষণীয় ঘটনা বানায়। শহরবাসীর সবাইকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ঘর-বাড়ি আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। সবকিছু ধ্বংস করে ফেলা হয়। আশমুত কামেল মোহাম্মদ আইয়ূবী রহ. কে আরও কঠোর আজাব প্রদানের জন্য জীবিত রাখে। তাকে নিয়ে পিতা হালাকু খানের কাছে যায়। সে তখন আলেপ্পো নগরীর অবরোধ কাজে ব্যস্ত ছিল।
হালাকু খান ইসলামী বীরসেনানী কামেল মোহাম্মদ আইয়ূবীর প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য তার সকল অনিষ্টকে সুসমন্বিত করে। তাকে বন্দী করে জীবিত অবস্থায় তার হাত পা কাটতে শুরু করে। এমনকি হালাকু খান তার গোশত ভক্ষণের হুঙ্কারও দেয়!! এমন নির্মম শাস্তি ভোগ করতে করতেই এই মরদে মুজাহিদের প্রাণ আল্লাহর দরবারে হাজিরা দেয়। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। তিনি শাহাদাতের অমীয় সুধাপানে ধন্য হন।
وَلَا تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ قُتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَاتًا بَلْ أَحْيَاءٌ عِنْدَ رَبِّهِمْ يُرْزَقُونَ فَرِحِينَ بِمَا آتَاهُمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ وَيَسْتَبْشِرُونَ بِالَّذِينَ لَمْ يَلْحَقُوا بِهِمْ مِنْ خَلْفِهِمْ أَلَّا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ يَسْتَبْشِرُونَ بِنِعْمَةٍ مِنَ اللَّهِ وَفَضْلٍ وَأَنَّ اللَّهَ لَا يُضِيعُ أَجْرَ الْمُؤْمِنِينَ
“এবং যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে, তাদের কখনোই মৃত মনে কোরো না; বরং তারা জীবিত। তাদের তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে রিজিক দেওয়া হয়। আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের যা কিছু দিয়েছেন, তারা তাতে প্রফুল্ল। আর তাদের পরে এখনো যারা তাদের সঙ্গে মিলিত হয়নি, তাদের ব্যাপারে এ কারণে তারা আনন্দবোধ করে যে, (তারা যখন তাদের সঙ্গে এসে মিলিত হবে, তখন) তাদের কোনো ভয় থাকবে না এবং তারা দুঃখিতও হবে না। তারা আল্লাহর নেয়ামত ও অনুগ্রহের কারণেও আনন্দ উদ্যাপন করবে এবং এ কারণেও যে, আল্লাহ মুমিনদের কর্মফল নষ্ট করেন না।”৬১
ইমাম বুখারী ও মুসলিম রহ. হযরত আনাস রা. সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—
مَا مِنْ عَبْدٍ يَمُوتُ، لَهُ عِنْدَ اللَّهِ خَيْرٌ، يَسُرُّهُ أَنْ يَرْجِعَ إِلَى الدُّنْيَا، وَأَنَّ لَهُ الدُّنْيَا وَمَا فِيهَا إِلَّا الشَّهِيدَ لِمَا يَرَى مِنْ فَضْلِ الشَّهَادَةِ، فَإِنَّهُ يَسُرُّهُ أَنْ يَرْجِعَ إِلَى الدُّنْيَا، فَيُقْتَلَ مَرَّةً أُخْرَى
"বান্দা মৃত্যুবরণ করলে শহীদ ব্যতীত অন্য কেউ দুনিয়ায় ফিরে আসার কামনা রাখে না। কারণ, মৃত্যুর পর শহীদ ব্যক্তি আল্লাহর পথে শাহাদাতের মর্যাদা ও ফজিলত প্রত্যক্ষ করে। সে দুনিয়ায় এসে পুনরায় শহীদ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা রাখে।”৬২
জনৈক ব্যক্তি বলেন, কামেল মোহাম্মদ যিনি প্রতিবাদ করেছিলেন, তাকে হত্যা করা হয়েছিল যেমন হত্যা করা হয়েছিল খলিফা মুসতা'সিম বিল্লাহকে। যিনি প্রতিবাদ করেননি। কিন্তু বন্ধুরা, আমি আপনাদের মাঝে এই দুই মহান ব্যক্তির মাঝে পার্থক্য দেখিয়ে দিচ্ছি...!!
একজন মাথা উঁচিয়ে মৃত্যুবরণ করেছে। অপরজন মাথানত করে অপমানিত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে।
একজন তলোয়ার হাতে বীরবেশে শাহাদাতবরণ করেছে। আরেকজন হাত উঁচিয়ে প্রাণভিক্ষা চেয়ে মৃত্যুবরণ করেছে।
একজন সম্মুখপানে এগিয়ে গিয়ে বুকে বর্শার আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। আরেকজন পলায়নপর অবস্থায় পিঠে তীর নিক্ষিপ্ত হয়ে মারা গেছেন।
কামেল মোহাম্মদ সেই মৃত্যুক্ষণে নিহত হয়েছেন, যা আল্লাহ রব্বুল আলামীন নির্ধারণ করেছিলেন। সামান্য পূর্বে বা পরে নয়। অনুরূপ খলিফা মুসতা'সিম বিল্লাহ আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত মৃত্যুক্ষণে ইন্তেকাল করেছেন। সামান্য পূর্বে বা পরে নয়।
বন্ধুরা, আল্লাহর কসম!
কাপুরুষতা সামান্য হায়াত বৃদ্ধি করতে পারে না। আর বীরত্ব সামান্য হায়াত হ্রাস করতে পারে না।
এই বাক্যটি খুব ভালোভাবে মুখস্থ করে নিন!!
সত্যিই ... কাপুরুষতা সামান্য হায়াত বৃদ্ধি করতে পারে না। আর বীরত্ব সামান্য হায়াত হ্রাস করতে পারে না।
কিন্তু কোথায় এ একীন ও বিশ্বাস?!
আমীর কামেল মোহাম্মদ আইয়ূবী, যিনি অন্ধকারাচ্ছন্ন পৃথিবীকে আলোকিতকারী মোমবাতি ছিলেন, তিনি শাহাদাতবরণ করলেন। খুনি হালাকু খান তার মাথা ধর থেকে আলাদা করে ফেলল এবং সিরিয়ার সব শহরে তার কর্তিত মাথা প্রদর্শন করানোর জন্য নির্দেশ দিল। যাতে সকল মুসলমান দেখে শিক্ষা গ্রহণ করে।
সবশেষে দামেস্কে কর্তিত মাথা প্রদর্শনের পর দামেস্কের এক ফটকে কিছুক্ষণ সময়ের জন্য মাথাটি ঝুলিয়ে রাখা হয়। সেই ফটকটির নাম হলো ফারাদিস। এরপর এক মসজিদে তাকে দাফন করা হয়। পরবর্তীতে সেই মসজিদটি 'মাসজিদুর রাস' (মাথার মসজিদ) নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে।
আমরা আল্লাহর কাছে দুআ করি, তিনি যেন জান্নাতবাসী হন।

টিকাঃ
৬১ সুরা ইমরান: ১৬৯-১৭১।
৬২ বুখারী: ২৭৯৫।

📘 তাতারীদের ইতিহাস 📄 আলেপ্পোর পতন

📄 আলেপ্পোর পতন


আলেপ্পো নগরীর ওপর তাতারীদের গোলাবর্ষণ প্রচণ্ড আকার ধারণ করে। মিয়াফারেকীনের পতন ও কামেল মোহাম্মদ নিহত হওয়ার পর তাতারীদের স্পর্ধা আরও বেড়ে যায়। কামেল মোহাম্মদের মৃত্যু ও মিয়াফারেকীনের পতনে মুসলমানদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি হারিয়ে যায়।
মাত্র সাতদিন আলেপ্পো নগরী অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকে। আলেপ্পোবাসী কোনো প্রতিবাদ ছাড়া শহরের ফটক খুলে দিলে তাতারীরা তাদের নিরাপত্তা প্রদান করে। কিন্তু সেনাপতি তাওরান শাহ তাদের বলেন, এটাও ধোঁকা। তাতারীরা কোনোদিন নিরাপত্তা প্রদান করে না। তারা কখনো প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে না। কিন্তু তারা মিয়াফারেকীনের পতন ও তাদের আমীর নাছের ইউসুফের সাহায্য না পেয়ে মনোবল হারিয়ে ফেলেছিল। তখন নাছের ইউসুফ দামেস্কে অবস্থান করছিল। যা ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। নাছের ইউসুফ আলেপ্পোবাসীকে তাতারীদের অবরোধে ফেলে চলে গেল। এই পতন জাতিকে আত্মসমর্পণের দিকে ঠেলে দেয়। জনসাধারণ হালাকু খানের জন্য ফটক খুলে দেয়। কিন্তু তাদের নেতা তাওরান শাহ ও কতিপয় মুজাহিদ প্রতিবাদ করে এবং শহরের অভ্যন্তরীণ দুর্গে আশ্রয় নেয়।
আলেপ্পোবাসী নিরাপত্তা পেয়ে তাতারীদের জন্য দরজা উন্মুক্ত করে দেয়। তাতারী বাহিনী আলেপ্পো শহরের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ে। শহরের ঘাঁটি ও দুর্গগুলো দখল করতেই তাতারীদের প্রকৃত চেহারা ফুটে ওঠে। আলেপ্পোবাসীর সম্মুখে সেই সব বিষয় স্পষ্ট প্রতিভাত হয়, যা পূর্বে মুজাহিদ তাওরান শাহের সামনে পরিষ্কার ছিল। কিন্তু আফসোস! সময় ফুরিয়ে তারা বুঝতে পারল! আলেপ্পোর মুসলমানদের হত্যা করে এবং খ্রিস্টানদের ছেড়ে দিয়ে হালাকু খান বিষয়টি আরও পরিষ্কার করে!! এটি নিঃসন্দেহে প্রতিক্ষিত বিশ্বাসঘাতকতা ছিল। এটি সেই জাতির ভুলের প্রায়শ্চিত্ত, যে জাতির বালুর প্রাসাদ নির্মাণ করেছিল! আলেপ্পোর নারী-পুরুষ ও শিশুদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। গোটা শহর বিরানভূমিতে পরিণত হয়। এরপর তাতারীরা শহরের প্রাচীরগুলো ভেঙে দেয়, যাতে পরবর্তীতে কেউ প্রতিরোধ গড়তে না পারে। এরপর হালাকু খান আলেপ্পোর অভ্যন্তরীণ দুর্গ, যেই দুর্গে তাওরান শাহ ও কতিপয় মুজাহিদ আশ্রয় নিয়েছিল, সেই দুর্গ ধ্বংসে মনোনিবেশ করে। দুর্গের উপর প্রচণ্ড গোলাবর্ষণ করে। চতুর্দিক থেকে অগণিত তীর বর্ষণ করে। কিন্তু দুর্গটি ছিল অপ্রতিরোধ্য ও অনির্বাণ। চার সপ্তাহব্যাপী গোলাবর্ষণ ও তীর বর্ষণ চলতে থাকল। অবশেষে হালাকু খানের হাতে দুর্গের পতন ঘটে। দুর্গের দরজাসমূহ ভেঙে ফেলা হয়। দুর্গে আশ্রয়গ্রহণকারী সবাইকে হত্যা করে। সেটা ছিল প্রত্যাশিত। কিন্তু সে তাওরান শাহকে হত্যা করে না! কতিপয় ইতিহাসবিদ উল্লেখ করেন, তাওরান শাহের বীরত্বে অভিভূত হয়ে হালাকু খান এই কাজ করেছেন। (তথা তাকে না মেরে জীবিত রেখেছেন।) এটি হালাকু খানের বীরত্ব ও মহানুভবতা। কিন্তু এসব গুণাবলি হালাকু খানের সঙ্গে যায় না। আর হালাকু খান এমন ব্যক্তিও নয়, যে প্রতিরোধকারীকে দেখে অভিভূত হবে। সে এমনও নয় যে, যাকে বীর বা মহানুভব বলে ব্যক্ত করা যায়। আমার [লেখক] কাছে মনে হয়, সে তাকে অন্য কোনো নিকৃষ্ট স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে বাঁচিয়ে রেখেছিল। তার এই ক্ষমাপ্রদর্শন একদিক থেকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, যার মাধ্যমে সে সিরিয়া অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আইয়ূবী বংশোদ্ভূতদের প্রেরণাকে উত্তেজিত করতে চায়। তা ছাড়া সে কিছুদিন পূর্বে কামেল মোহাম্মদ আইয়ূবীকে হত্যা করেছে। সুতরাং আইয়ূবী সেনাপতিরা যখন প্রতিশোধমুখর হয়ে উঠবে, তখন হালাকু খানের এই উদারতা দেখে তাদের প্রতিশোধ-স্পৃহা নির্বাপিত হবে। আপনি ভুলবেন না, বহু আইয়ুবী হালাকু খানের সঙ্গে শান্তিচুক্তিবদ্ধ হয়েছিল। তাদের মাঝে অন্যতম হলো, হিমসের আমীর আশরাফ আইয়ূবী। সে সিরিয়ায় তার অবস্থান নষ্ট করতে চায়নি। এটা ছিল তার এক দৃষ্টিভঙ্গি। অন্য দৃষ্টিতে সে চেয়েছিল, মুসলিম আমীররা প্রতিবাদ ব্যতীতই হালাকুর সামনে আত্মসমর্পণ করুক।
সুবহানাল্লাহ! হালাকু খান তো অত্যন্ত আমানতদার বিশ্বস্ত ব্যক্তি। কোমল হৃদয়ের অধিকারী। শান্তিকামী। সে সকল সেনাপতি তার মোকাবেলা করতে চায়, এমন লোকদের সে নিরাপত্তা প্রদান করবে!! আপনার কী মনে হয়, যারা তার সঙ্গে চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে, তাদের পরিণাম কী হবে?
তৃতীয় আরেক কারণ এও হতে পারে যে, আমরা জানি তাওরান শাহ দামেস্কের আমীর নাছের ইউসুফের চাচা। তাই তাওরান শাহকে বাঁচিয়ে রাখা নাছের ইউসুফের সাক্ষাতের একটি অসিলা হতে পারে। অথবা এতে নাছের ইউসুফের ওজরখাহী করার পথ উন্মুক্ত হতে পারে। এর মাধ্যমে হালাকু খান সম্ভাব্য যুদ্ধ থেকে নিজেকে বিরত রেখে সৈন্যসংখ্যা অক্ষত রাখতে চেয়েছিল।
আমি [লেখক] বিশ্বাস করি, রক্তপিপাসু হালাকু খানের চরিত্রের সঙ্গে শেষোক্ত ব্যাখ্যা দুটি সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু হালাকু খান উদারতা প্রদর্শন করেছেন, তাওরান শাহের বীরত্ব দেখে অভিভূত হয়েছেন, তার ক্ষেত্রে এজাতীয় ব্যাখ্যা দাঁড় করানো অযাচিত বৈ কিছু নয়!!
এভাবেই হালাকু খান আলেপ্পো নগরীতে খুঁটি গেড়ে বসে। সকল প্রতিবাদ প্রতিরোধ থেমে যায়। ভেঙে পড়ে সব দুর্গ ও প্রাচীর। এরপর হালাকু খান সিরিয়ার অন্যত্র গমনের ইচ্ছা করে। হিমসের আমীর আশরাফ আইয়ূবী এগিয়ে আসে। সে সেই সব বিশ্বাসঘাতক আমীরদের অন্যতম, যারা তাতারীদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল। হালাকু খান আশরাফ আইয়ূবীকে স্বভাববিরুদ্ধ সম্মানপ্রদর্শন করে!! সে তাকে আলেপ্পো থেকে হিমস পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চলের নেতৃত্ব দান করে, তার পূর্ণ আনুগত্য নিশ্চিত করতে এবং তাকে এ কথায় নিশ্চিত জ্ঞান প্রদান করতে যে, হালাকু খান কোনো অঞ্চল দখল করে সেই অঞ্চল প্রধানকেই শাসক নিযুক্ত করে। তবে কতিপয় তাতারী বাহিনীর তত্ত্বাবধানে সেটি পরিচালিত হয়। তাই আশরাফ আইয়ূবী আমীর হিসেবে নিযুক্ত হয়। যেন সে শহরের প্রশাসনিক শাসক। তবে রাজত্ব ও ক্ষমতার যাবতীয় চাবিকাঠি হালাকু খানের হাতে!
আলেপ্পো পতনের পর হালাকু খান পশ্চিমে মুসলমানদের 'হারেম' দুর্গের দিকে দৃষ্টি দেয়। দুর্গটি আলেপ্পো থেকে পঞ্চাশ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত। সেখানে কতিপয় মুসলিম মুজাহিদ আশ্রয় নিয়েছিল, যারা হালাকু খানের সামনে আত্মসমর্পণ করেনি। বেশ কিছুদিন হামলার পর হালাকু খান তাদের প্রত্যেককে জবাই করে হত্যা করে।
পশ্চিমে পথ উন্মুক্ত হতে হতে একপর্যায়ে হালাকু খান আন্তাকিয়া সাম্রাজ্যে পৌঁছে যায়। এটি হালাকু খানের মিত্র খ্রিস্টান আমীর বুহমন্দের সাম্রাজ্য। হালাকু খান শহরের বাইরে তাঁবু ফেলে। তারপর নতুন মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে পর্যালোচনা করার জন্য একটি সম্মেলনের আহ্বান করে। হালাকু খানের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা ও আনুগত্য প্রদর্শনার্থে তার সকল মিত্ররা সদলবলে আগমন করে। আর্মেনিয়ার রাজা হাইতুম, আন্তাকিয়ার রাজা বুহমন্দ, অনুরূপ সেলজুকী মুসলিম আমীরবৃন্দ তথা কেকেভাস ছানী, কালাজ আরসালান রাবে' আগমন করে। মুসলিম আমীরদ্বয়ের সাম্রাজ্য আন্তাকিয়া সাম্রাজ্যের খুব কাছে ছিল।

📘 তাতারীদের ইতিহাস 📄 এরপর হালাকু খান কতিপয় সিদ্ধান্ত ও নির্দেশাবলি জারি করে

📄 এরপর হালাকু খান কতিপয় সিদ্ধান্ত ও নির্দেশাবলি জারি করে


এক. বাগদাদ, মিয়াফারেকীন ও আলেপ্পো পতনে সামরিক সহযোগিতা প্রদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আর্মেনিয়ার রাজা হাইতুমকে একটি বড় পুরস্কারে পুরস্কৃত করা হবে।
দুই. কেকেভাস ছানী ও কালাজ আরসালান রাবে'; এই দুই সেলজুকী সুলতান ইতিপূর্বে মুসলমানরা যেসব দুর্গ ও শহর জয় করেছিল, তন্মধ্যে কয়েকটি শহর ও দুর্গ আর্মেনিয়া সাম্রাজ্য ফিরিয়ে দেওয়া হবে আর্মেনিয়া সাম্রাজ্যের শক্তিবর্ধনের জন্য। এই অঞ্চলে তার ক্ষমতা আরও মজবুত ও দৃঢ়করণের জন্য হালাকু খান এই নির্দেশ জারি করে। যেন আর্মেনিয়ার রাজা হালাকু খানের স্থায়ী মিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। সেলজুকি মুসলিম দুই সুলতানের কোনো আপত্তি করারও সুযোগ ছিল না!
তিন. হালাকু খানকে সহযোগিতা প্রদানের জন্য আন্তাকিয়ার আমীর বুহমন্দকে পুরস্কৃত করা হবে। আন্তাকিয়ার আমীর নিজ সাম্রাজ্যের সঙ্গে এই শহরটিকে মিলিয়ে নেবেন। লাতাকিয়া শহরটিকে সুলতান সালাহ উদ্দীন আইয়ূবীর আমলে খ্রিস্টানদের থেকে জয় করা হয়েছিল। অথচ এক বাক্যে এই শহরটিকে খ্রিস্টানদের হাতে দিয়ে দেওয়া হয়!! 'অন্যায় দখলকারী নিজে যে বস্তুর মালিক নয়; এমন বস্তু অযোগ্যকে প্রদান করে' এই ধ্বংসাত্মক মূলনীতির বাস্তবায়নস্বরূপ দ্বিতীয় ও তৃতীয় নির্দেশ দেওয়া হয়।
চার. চতুর্থ সিদ্ধান্তটি ছিল অদ্ভুত এক সিদ্ধান্ত। এটি না আন্তাকিয়ার রাজার কল্যাণে গ্রহণ করা হয়, না আর্মেনিয়ার রাজার কল্যাণে। এটি এই জন্য গ্রহণ করা হয় যে, আজ থেকে প্রত্যেক বস্তুর একক কর্তৃত্ব থাকবে হালাকু খানের। আর এসব রাজা-বাদশা কেবল বাহ্যিক রাজা-বাদশা বৈ কিছু নয়। এই অদ্ভুত সিদ্ধান্তের দাবি ছিল আন্তাকিয়া চার্চের নতুন কুলপতি খ্রিস্টান নিযুক্ত করা! আলেপ্পো ও বাগদাদের বিষয় কিছুটা ভিন্ন। কিন্তু আমরা জানি যে, হালাকু খান নিজেও খ্রিস্টান ছিল না। সুতরাং এসব সিদ্ধান্ত এমন ব্যক্তির পক্ষ থেকে দেওয়া হচ্ছে, যে নিজেই খ্রিস্টধর্ম সম্পর্কে কিছুই জানে না। উপরন্তু নবকুলপতি আন্তাকিয়ার বংশোদ্ভূত নয়! এত আরও ক্ষতিকর। সুতরাং চার্চের নবকুলপতি নিজেও খ্রিস্টধর্মাবলম্বী নয়, বুহমন্দ ও হাইতুম যে ধর্মের অনুসারী!! খ্রিস্টানদের ইতিহাসে এমন বিপজ্জনক ঘটনা নেই।

📘 তাতারীদের ইতিহাস 📄 গির্জার গালে চড়!!

📄 গির্জার গালে চড়!!


হালাকু খান ল্যাটিন কুলপতির স্থানে 'ইউমনেমিউস' নামক গ্রিক কুলপতি নির্ধারিত করে। আমরা জানি তৎকালীন সিরিয়ার খ্রিস্ট সাম্রাজ্য মূলত পশ্চিম ইউরোপীয় খ্রিস্ট সাম্রাজ্য ছিল। তারা সকলে ক্যাথলিক মতবাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। অথচ নবনিয়োজিত গ্রিক কুলপতি অর্থডক্স মতবাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত। অর্থডক্স হলো পূর্ব ইউরোপের মতবাদ। এই দুই মতবাদের ওপর বিস্তর ব্যবধান বিরাজমান। এমনকি দুই মতাদর্শের মাঝে দীর্ঘদিন ধরে চরম সংঘর্ষ চলছে। এতে বোঝা যায়, হালাকু খানের এই পদক্ষেপের সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য উদ্দেশ্য রয়েছে। প্রথমত সে আন্তাকিয়া ও আর্মেনিয়ার রাজাদ্বয়কে অপমানিত অবস্থায় রাখতে চেয়েছিল। যেন তারা বুঝতে পারে তারা কেবল হালাকু খানের তাবে। তাদের নিজস্ব রায় বাস্তবায়নের কোনো অধিকার তাদের নেই এবং তাদের মাথায় যেন কখনো এ কথা না আসে যে, তারা হালাকু খানের সঙ্গে মিত্রের ন্যায় চলাফেরা করবে। দ্বিতীয়ত হালাকু খান চায়নি এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা বিরাজমান হোক। অন্যথায় তার অজ্ঞাতে আঞ্চলিক আমির বা রাজা ক্ষমতাশীল হয়ে উঠতে পারে। তাই সে তার মিত্রদের একজনের ওপর আরেকজনের মাধ্যমে নজরদারি করত। তৃতীয়ত হালাকু খান গ্রিক সাম্রাজ্যের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক সৃষ্টির ইচ্ছা করেছিল। এর মাধ্যমে সিরিয়া ও আলাতোনিয়ায় (তুরস্ক অঞ্চলসমূহে) তার ক্ষমতার স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে চেয়েছিল। কারণ, সিরিয়া ও আলাতোলিয়া গ্রিক সাম্রাজ্যের পার্শ্ববর্তী দেশ।
স্বাভাবিকভাবে এটি আন্তাকিয়ার আমীরের জন্য ছিল বিরাট অপমান। কিন্তু এটাই বাস্তব ছিল। নিজের ইজ্জত সম্মান হারিয়েও সে কোনো প্রতিবাদ করেনি। কিন্তু তার উপদেষ্টামণ্ডলী ও মন্ত্রিপরিষদ আপত্তি প্রকাশ করে। কিন্তু আমীর বুহমন্দ হালাকু খানের সামনে বিনয়াবত। সে তাতারীদের প্রকৃত মর্যাদা প্রদান করে। সে সময় তাতারীরা এত বড় সাম্রাজ্য শাসন করত, পৃথিবীর মানচিত্রে এতবড় সাম্রাজ্য কখনো স্থান পায় নি। পূর্বে কোরিয়া পশ্চিমে পোল্যান্ড। মধ্যবর্তী সকল ক্রুশেডযুদ্ধ এবং গত দশ বছরে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ইউরোপ যেসব যুদ্ধ করেছে—এসব যুদ্ধে লেবানন, ফিলিস্তিন, সিরিয়া ও তুরস্কের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অঞ্চল ব্যতীত কিছুই তারা জয়লাভ করতে পারেনি। সাধারণত কয়েকটি গ্রাম সম্বলিত একটি শহর ছিল তাদের সাম্রাজ্য।

ফন্ট সাইজ
15px
17px
🎤 ভাষা বেছে নিন
🇧🇩
বাংলা
Bengali
🕌
আরবি
العربية