📄 হালাকু খানের খ্রিস্টান দূতের সঙ্গে কামেল মোহাম্মদ রহ. কী করলেন
তিনি দূতকে বন্দী করে হত্যা করলেন!
দূতহত্যা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। তবুও কামেল আইয়ূবী রহ. হালাকু খানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দেওয়ার জন্য এবং বাগদাদের নির্মম হত্যাযজ্ঞের প্রতিশোধ গ্রহণের প্রতি মুসলমানদের উদ্বুদ্ধ করার জন্য এ কাজ করেছেন। তা ছাড়া তাতারীরা কখনোই আইনের কোনো তোয়াক্কা করেনি。
তাতারদূত কাসীস ইয়াকুবের হত্যা কামেল মোহাম্মদ রহ. এর পক্ষ থেকে হালাকু খানের প্রতি খোলা চিঠি ছিল। এতে হালাকু খান বুঝতে পেরেছিল কামেল মোহাম্মদ রহ. কে ধ্বংস করা ব্যতীত সিরিয়ায় প্রবেশ করা যাবে না। [দূতহত্যার নীতিমালা সামনে আসবে—ইনশাআল্লাহ!]
হালাকু খান এই বিষয়টির প্রতি খুব গুরুত্বারোপ করেন। এটি ছিল হালাকু খানের মোক্ষম সুযোগ। তাই সে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত বিশাল বাহিনী প্রস্তুত করে। নিজ সন্তান আশমুত ইবনে হালাকুকে সেনাপতি নিযুক্ত করে।
মসুলের আমীর তার দেশ দিয়ে অতিক্রমের সুযোগ করে দিলে তারা প্রকাশ্যে মিয়াফারেকীনের উদ্দেশে রওনা হয়।
আশমুত ইবনে হালাকু বিশাল বাহিনী নিয়ে মিয়াফারেকীন সাম্রাজ্যের প্রধান ঘাঁটির দিকে রওয়ানা হয়, যা মিয়াফারেকীনেই অবস্থিত। যে ঘাঁটিতে কামেল মোহাম্মদ রহ. নিজেও অবস্থান করতেন। কামেল মোহাম্মদ আইয়ূবী রহ. তার সকল বাহিনীকে এই ঘাঁটিতে একত্রিত করেছিলেন। কারণ, যদি সৈন্যবাহিনীকে চতুর্দিক ছড়িয়ে দেন, তাহলে বিপুলসংখ্যক তাতারী বাহিনীর মোকাবেলা করা সম্ভব হবে না।
যা ঘটার ছিল তা-ই ঘটল। তাতারীরা মিয়াফারেকীন অবরোধ করল এবং পূর্বদিক থেকে আর্মেনিয়া ও জর্জিয়া সাম্রাজ্যও মিয়াফারেকীন অবরোধ করার জন্য এগিয়ে এল। এটি ছিল বাগদাদ পতনের চার মাস পর ৬৫৬ হিজরীর রজব মাসে সংঘটিত ঘটনা।
অপরাজেয় মিয়াফারেকীন শহর প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। শহরের আনাচে কানাচে প্রতিবাদের তীব্র দাবানল দাউ দাউ করে। মোহাম্মদ আইয়ূবী রহ. প্রাণপণ লড়াইয়ের প্রতি উদ্বুদ্ধ করেন।
তিনি ছিলেন নিকৃষ্টের মাঝে উৎকৃষ্টতর (গোবরে পদ্মফুল)!!
কাপুরুষদের মাঝে বীরপুরুষ!! মূর্খদের বস্তিতে সঠিক চিন্তার ধারক-বাহক! যদি বলি গণ্ডমূর্খদের মাঝে, তবুও অত্যুক্তি হবে না।
অবরোধকালে পার্শ্ববর্তী মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর পক্ষ থেকে সাহায্য সহযোগিতা আসা স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু এমন হয়নি। কোনো রকম খাবার-দাবার, অস্ত্র-শস্ত্র বা চিকিৎসাসামগ্রী তাদের কাছে আসেনি। মুসলিম নেতৃবর্গগণ নিজ ভাই-বোন, ছেলে-সন্তান, বাপ-দাদা ও আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে নব পরাশক্তি তথা তাতারীশক্তির প্রতি নতজানু হয়েছিল।
জাতির এই মানসিক বিপর্যয় দেখে আমি সত্যিই অভিভূত হই!! সেদিন জাতি কোথায় ছিল? কোথায় ছিল জাতির মনুষ্যত্ব?!
যখন শাসকবর্গ নৈতিক অবক্ষয়ে নিমজ্জিত, তখন জাতি কেন নীরব ছিল?! কেন তারা নিজেদের ভাইদের দ্বীন-ধর্ম কিংবা রক্ত-বংশ রক্ষার্থে জেগে ওঠেনি?!
জাতি নীরব ছিল। তাদের নীরবতা তাদেরকে ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দিয়েছে—
এক. ফলশ্রুতিতে জনগণ কোনোভাবে বেঁচে থাকতে চেয়েছিল। বেঁচে থাকাই ছিল মূল লক্ষ্য।
দুই. সকল অঞ্চলের মানুষের মগজধোলাই প্রক্রিয়া চলমান ছিল। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, শাসকবর্গ, মন্ত্রীপরিষদ ও তাদের দরবারি আলেমগণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় জনগণকে সান্ত্বনা প্রদান করেছিল এবং তাদের দমিয়ে রেখেছিল। এতেও কোনো সন্দেহ নেই যে, তারা মোহাম্মদ আইয়ুবী রহ. এর নিন্দা জ্ঞাপন করে বেড়াত, যিনি নিজ মর্যাদা, জাতির মর্যাদা এমনকি মুসলমানদের মর্যাদা রক্ষায় লড়ে গেছেন।
নিঃসন্দেহে অনেক বক্তার আবির্ভাব ঘটেছিল, যারা বলত— “জাতিকে ধ্বংস করার চেয়ে কামেল মোহাম্মদের উচিত সরে দাঁড়ানো।”! অথবা কেউ বলত, “কামেলা মোহাম্মদ যদি অস্ত্র অর্পণ করতেন, তাহলে সকল সমস্যার সমাধান হতো। কিন্তু তিনি পৃথিবীর পরাশক্তি তাতারীদের থেকে অস্ত্র গোপন করছেন। তিনি এমন এক ভুলের শিকার, যা মিয়াফারেকীনবাসীকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছে।”
এতেও কোনো সন্দেহ নেই যে, হালাকু খান চিঠি পাঠিয়ে একথা বলেছিল, হালাকু কামেল মোহাম্মদকে অপসারণের জন্য আগমন করেছে। মিয়াফারেকীনবাসীর সঙ্গে তার কোনো শত্রুতা নেই। হালাকু খান সবার সঙ্গে মিলে-মিশে থাকতে চায়।
এই ছিল মগজধোলাই পদ্ধতি, যা জাতির বীরত্বকে অবদমিত করেছে। সাহসিকতা ও ব্যক্তিত্বকে গলা টিপে হত্যা করেছে।
তিন. আমন্ত্রণ-নিমন্ত্রণ, কথা-বার্তা, চিঠি-পত্র ইত্যাদির মাধ্যমে সে দমিত হবে না। তার দমন-প্রক্রিয়া হবে তরবারি।
জনগণ শাসকদের পক্ষ থেকে জুলুম-অত্যাচার, নিপীড়ন ও দুঃশাসনে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। মানুষ শাসক ও শাসিত শ্রেণির মধ্যকার ঘৃণাবোধের মাঝে বসবাস করছে।
এই লজ্জাজনক ও বিপর্যস্ত পরিস্থিতিতে আমরা বুঝতে পারি, কেন মিয়াফারেকীন সাম্রাজ্য পূর্ণতা পাবে? কেন মুসলিম জাতি মৃত্যুর উপকণ্ঠে দাঁড়িয়ে থাকলেও শাসক ও পার্শ্ববর্তী মুসলিম সাম্রাজ্যগুলো কোনো হরকত করে না?!
তখন আমরা বুঝতে পারব, মসুলের আমীর বদর উদ্দীন লুলু, সেলজুকী আমীর কেকেভাস ছানী ও কালাজ আরসালান রাবে' কী লাঞ্ছনাকর পরিস্থিতে দিনাতিপাত করছিল! আর আলেপ্পো ও দামেস্কের আমীর নাছের ইউসুফ আইয়ূবী লাঞ্ছনা ও অপমানের যে চরম শিখায় সময় পার করছিলেন, তা বুঝে উঠা বড়ই কঠিন!!
কামেল মোহাম্মদ আইয়ূবীর সঙ্গে নাছের ইউসুফ আইয়ূবীর গভীর সম্পর্ক ছিল। দ্বীন-ধর্মের সম্পর্ক, প্রতিবেশীর সম্পর্ক, আলেপ্পোর রাজনৈতিক সম্পর্কের ঊর্ধ্বে। কারণ, মিয়াফারেকীন আলেপ্পোর উত্তর-পূর্বে অবস্থিত। সুতরাং যদি মিয়াফারেকীনের পতন ঘটে, তাহলে এর পরই হবে আলেপ্পোর পালা। তাদের মাঝে ছিল রক্তের সম্পর্ক, বংশের সম্পর্ক। কারণ, তারা উভয়ই আইয়ূবী (তথা তারা উভয়ই আইয়ূব বংশদ্ভূদ)। তাদের দাদা ইসলামী বীরসেনা সালাহ উদ্দীন আইয়ূবীর যুগ বেশি দিন পূর্বে অতিবাহিত হয়নি। সালাহ উদ্দীন আইয়ূবীর ইন্তেকালের এখনো সত্তর বছর অতিবাহিত হয়নি। [সালাহ উদ্দীন আইয়ূবী ৫৮৯ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন] মুসলমানদের শত্রুদের বিরুদ্ধে তার শক্ত অবস্থানের কথা জাতি এখনো ভোলেনি। তথাপি তার নাতি নাছের ইউসুফের অবস্থা এতটা লাঞ্ছনাকর হলো কী করে?!
এটি একটি জটিল প্রশ্ন? নাছের ইউসুফের পক্ষে এই প্রশ্নের সন্তোষজনক কোনো উত্তর নেই; না শরীয়তসম্মত, না যুক্তিসঙ্গত।
কামেল মোহাম্মদ রহ. নাছের ইউসুফ আইয়ূবীর কাছে সাহায্য কামনা করলে তিনি কোনোরূপ চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই সম্পূর্ণরূপে তা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি সবকিছু বিক্রি করে বিনিময়ে তাতারীদের ভালোবাসা ক্রয় করেছেন। একাজ করার মুহূর্তে তিনি জানতেন না যে, তাতারীদের কথার কোনো মূল্য নেই। তারা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে না। তা ছাড়া তাতারীরা প্রতিশ্রুতিপরায়ণ হলেও কি তিনি মুসলমানদের তাতারীদের কাছে বিক্রি করতে পারেন? বিনিময়ে তারা সারা দুনিয়া প্রদান করলেও?!
নাছের ইউসুফ কামেল মোহাম্মদ রহ. কে সহযোগিতা প্রদান না করেই ক্ষান্ত হননি, মিয়াফারেকীন অবরোধে অংশগ্রহণ করেই ক্ষান্ত হননি, বরং তার সন্তানের মাধ্যমে হালাকু খানের কাছে এই মর্মে চিঠি প্রেরণ করেন যে, সে যেন তাকে মিশর আক্রমণে এবং দাস বংশের হাত থেকে মিশর দখল করার ক্ষেত্রে তাকে সহযোগিতা প্রদান করে!!
পাঠকবৃন্দ, একটু ভেবে দেখুন, মুসলিমবিশ্বের এহেন বিপর্যস্ত মুহূর্তে নাছের ইউসুফ তাতারীদের কাছে মিশর আক্রমণের জন্য সাহায্য প্রার্থনা করছেন!!
নাছের ইউসুফ চিঠি প্রেরণের সময় নববন্ধু হালাকু খানের জন্য মূল্যবান হাদিয়া-তোহফা, উপহার-উপঢৌকন পাঠাতে ভোলেননি।
আল্লাহর কী মহিমা! নাছের ইউসুফ খাল কেটে কুমির আনলেন!!
অন্যান্য সকল আমীরগণ নিজেরাই সশরীরে হালাকু খানের দরবারে এসেছে। কিন্তু নাছের ইউসুফ সশরীরে গমন না করে ছেলেকে পাঠিয়েছেন। হালাকু খান এটিকে তার পক্ষ থেকে এক প্রকার ঔদ্ধত্য মনে করে। পাশাপাশি মিশর আক্রমণের জন্য সাহায্য কামনা করাকে হালাকু খান তার পক্ষ থেকে অহংকার বোধ করে। কারণ, হালাকু খান সিরিয়া ও মিশর উভয় অঞ্চলকে তার সাম্রাজ্যভুক্ত করার ইচ্ছা করেছিল। নাছের ইউসুফের এই অহমিকা ও দুঃসাহস দেখে হালাকু খান অগ্নিশর্মা হয়ে ওঠে। নাছের ইউসুফের কাছে জ্বালাময়ী ভাষায় একটি চিঠি প্রেরণ করে। এতকিছুর পরেও আযীয ইবনে নাছের ইউসুফ হালাকু খানের দলে থেকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে!!
এটি আশ্চর্যের কিছুই নয়!! কারণ, এ তো নাছের ইউসুফ নামক সিংহের সিংহশাবক!!
হালাকু খান কর্তৃক দামেস্ক ও আলেপ্পোর শাসক নাছের ইউসুফের নিকট প্রেরিত চিঠিটি পাঠ করলে একথা সুস্পষ্ট প্রতিভাত হয় যে, হালাকু খানের দরবারে এমন কতিপয় মুসলিম সাহিত্যিক ছিলেন, যারা হালাকু খানের চিন্তা-ভাবনাকে বিশুদ্ধ আরবি ও উৎকৃষ্ট যুগোপযোগী ভাষাশৈলীর মাধ্যমে পত্রস্থ করত।
হালাকু খান তার চিঠিতে লেখে—
"আলেপ্পোর অধিপতি নাছের ইউসুফের জানা উচিত, আমি আল্লাহর মদদে বাগদাদ জয় করেছি, সেখানকার যোদ্ধাদের হত্যা করেছি, ঘর-বাড়ি, প্রাসাদ-অট্টালিকাসমূহ বিধ্বস্ত করেছি, জনগণকে বন্দী করেছি। যেমন মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীন কুরআনে কারীমে বলেন—
قَالَتْ إِنَّ الْمُلُوكَ إِذَا دَخَلُوا قَرْيَةً أَفْسَدُوهَا وَجَعَلُوا أَعِزَّةَ أَهْلِهَا أَذِلَّةً وَكَذَلِكَ يَفْعَلُونَ
'রানি বলল, প্রকৃত ব্যাপার হলো, রাজা-বাদশাগণ যখন কোনো জনপদে ঢুকে পড়ে, তখন তাকে ধ্বংস করে ফেলে এবং তার মর্যদাবান বাসিন্দাদের লাঞ্ছিত করে ছাড়ে। এরাও তো তা-ই করবে।'৫৮
আমি তথাকার খলিফাকে উপস্থিত করে কিছু কাজ করতে বললে সে তা অস্বীকার করে। ফলে সে লজ্জিত হয় এবং আমি তাকে নির্মূল করে দিই। সে অনেক মূল্যবান সম্পত্তি সঞ্চয় করেছিল। সে ছিল নিকৃষ্ট। তাই সম্পদ জমা করেছিল। অথচ অন্যদের কোনো খোঁজ-খবর রাখত না। সে খ্যাতি লাভ করেছিল। সর্বত্র তার নাম-ধাম ছড়িয়ে পড়েছিল। আমি পূর্ণাঙ্গতা ও পরিপূর্ণতা থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাই।
إذا تم أمر دنا نقصه توقع زوالاً إذا قيل تم إذا كنت في نعمة فارعها فإن المعاصي تزيل النعم وكم من فتى بات في نعمة فلم يدر بالموت حتى هجم
"পূর্ণতা লাভ করলে ধ্বংস নিকটবর্তী হয়। ধ্বংসের অপেক্ষা করো যখন বলা হবে তুমি পূর্ণতা লাভ করেছ। নেয়ামত থাকতে যত্ন নাও। পাপকর্ম নেয়ামত ধ্বংস করে দেয়। কমবখতরা বিলাসিতায় মত্ত ছিল। আকস্মিক মৃত্যুতে ধ্বংস হয়েছে, বুঝতে পারেনি।"
আমার এই চিঠি হাতে পাওয়ামাত্রই লোকজন, ধন-সম্পত্তি সবকিছু নিয়ে ভূপৃষ্ঠের সুলতান, যাকে রাজাধিরাজ বলা হয়, তার পানে দ্রুত রওয়ানা করবে। তাহলে তার অনিষ্ট থেকে বাঁচতে পারবে এবং কল্যাণের নিকটবর্তী হবে। যেমন আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলেন-
وَأَنْ لَيْسَ لِلْإِنْسَانِ إِلَّا مَا سَعَى وَأَنَّ سَعْيَهُ سَوْفَ يُرَى
"আর এই যে, মানুষ নিজের প্রচেষ্টা ছাড়া অন্য কোনো কিছুর (বিনিময় লাভের) হকদার হয় না এবং এই যে তার চেষ্টা অচিরেই দেখা যাবে। তারপর তার প্রতিফল তাকে পুরোপুরি দেওয়া হবে।"৫৯
আর আমার দূতদের বাধাগ্রস্ত করবে না যেমন ইতিপূর্বে করেছিলে। ন্যায়সঙ্গত পন্থায় আটকে রাখবে নতুবা উত্তম পন্থায় ছেড়ে দেবে। আমি সংবাদ পেয়েছি সিরিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলে অনেক ব্যবসায়ী মিশর অভিমুখে পলায়ন করেছে (বাস্তবেই তা-ই ঘটেছিল, তাতারীদের আগমনবার্তা শুনে অনেক ব্যবসায়ী মিশরের দিকে পলায়ন করেছিল) যদি তারা পাহাড়ে আরোহণরত হয়, তবে তাদের নিক্ষেপ করে হত্যা করব। আর যদি তারা জমিনে চলমান হয়, তবে ভূমিধসে তাদের ধ্বংস করব।
أين النجاة ولا مناص الهارب ولي البسيطان الندى والماء ذلت لهيبتنا الأسود وأصبحت في قبضتي الأمراء والوزراء
"মুক্তি কোথায়? পলায়নকারীর কোনো পরিত্রাণ নেই। বাগানের নিকটবর্তী হয়েছে শিশির বিন্দু ও জলরাশি। আমার ভয়ে তারা হতবিহ্বল হয়ে ধরা পড়েছে। আমীর-উমারা ও শাসকবর্গদের হাতে।"
এই ছিল হালাকু খানের কম্পন সৃষ্টিকারী চিঠি!! চিঠি পড়ে নাছের ইউসুফ হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন!! এখন তিনি কী করবেন?!
টিকাঃ
৫৮ সুরা নামল : ৩৪।
৫৯ সুরা নাজম: ৩৯-৪১।
📄 নাছের ইউসুফ কর্তৃক জিহাদের ঘোষণা
নাছের ইউসুফ হালাকু খানের চক্রান্ত বুঝতে পারলেন। সে তার কাছে পূর্ণ আত্মসমর্পণ কামনা করছিল এবং তাকে এ সংবাদ প্রদান করেছিল যে, যেসব ব্যবসায়ী ও সাধারণ জনগণ পালিয়েছে, সে তাদেরও ধরে আনবে। হালাকু খান তাকে হতভাগা আব্বাসী খলিফার নির্মম পরিণতির কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন। তাহলে কি তিনি সবকিছু হালাকু খানকে অর্পণ করবেন? পরবর্তীতে তার জন্য কী অবশিষ্ট থাকবে? ক্ষমতা ও রাজত্বের নেশা হালাকু খানের শিরা-উপশিরায় ধাবমান। যদি হালাকু খান তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে, তাহলে তাঁর কী বাকি থাকবে?!
তাই নাছের ইউসুফ রহ. দৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। তিনি অনন্যোপায় হয়ে তাতারীদের বিরুদ্ধে জীবনের মায়া ভুলে জিহাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন।
অথচ সবাই জানত, নাছের ইউসুফ জিহাদের উপযুক্ত নন। জিহাদ করার জন্য যে দ্বীন-ধর্ম, আকীদা-বিশ্বাস, ব্যক্তিত্ব ও আত্মমর্যাদার প্রয়োজন, তা তার মাঝে নেই। তবুও তিনি তাতারীদের বিরুদ্ধে জিহাদের ঘোষণা দিলেন!!
এটি ছিল এমন ব্যক্তির হাস্যকর প্রত্যাবর্তন, যিনি দুই-এক মুহূর্তের ক্ষমতার জন্য সবকিছু বিক্রি করে দিতে অভ্যস্ত ছিলেন!
এটা কী ঘটল?!!
নাছের ইউসুফ দেশের পতাকা উত্তোলন করলেন। পতাকার গায়ে 'আল্লাহু আকবার' লিখলেন। তার বাহিনীকে জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহর জন্য উদ্বুদ্ধ করতে শুরু করলেন!!
নাছের ইউসুফ জিহাদের ঘোষণা দিচ্ছেন?!
নাছের ইউসুফ যিনি ইতিপূর্বে লুইস তাসে' ফ্রান্সের রাজাকে বাইতুল মাকদিস অর্পণের শর্তে মিশর যুদ্ধে সহযোগিতা কামনা করেছিলেন, তিনি জিহাদের ঘোষণা দিচ্ছেন!!
নাছের ইউসুফ যিনি তাতারীদের বাগদাদ প্রবেশে সহযোগিতা করেছেন, তিনি জিহাদের ঘোষণা দিচ্ছেন!!
নাছের ইউসুফ যিনি মিয়াফারেকীনের আমীর কামেল মোহাম্মদ আইয়ূবী রহ. থেকে পৃথক হয়েছেন। খাবার দিয়েও তাকে সহযোগিতা করেননি, তিনি জিহাদের ঘোষণা দিচ্ছেন!!
নাছের ইউসুফ যিনি কয়েকদিন পূর্বেও হালাকু খানের কাছে মিশর যুদ্ধের জন্য সহযোগিতা কামনা করেছিলেন, তিনি জিহাদের ঘোষণা দিচ্ছেন!!
নাছের ইউসুফ এসব পচা ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও জিহাদের ঘোষণা দিচ্ছেন!! হায়! হাস্যকর ঘটনা!!
📄 বন্ধুরা, আল্লাহ ফ্যাসাদ সৃষ্টিকারীদের কাজ সফল হতে দেন না
إِنَّ اللَّهَ لَا يُصْلِحُ عَمَلَ الْمُفْسِدِينَ
“আল্লাহ ফ্যাসাদ সৃষ্টিকারীদের কাজ সফল হতে দেন না।”৬০
নাছের ইউসুফ জনগণের আবেগ নিয়ে খেলতামাশা করত। তার অসৎ চরিত্র, বিভ্রান্ত আকীদা ও অদূরদর্শিতা সম্পর্কে জনগণ সম্যক অবগত ছিল। কতিপয় মুসলমানের চরম নির্বুদ্ধিতা ছিল, তারা বিশ্বাস করেছিল, আল্লাহ তা'আলা তার হাতে ইসলামের জয় ঘটাবেন।
তিনি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ নয়, বরং ক্ষমতা ও অস্তিত্ব রক্ষার পথে জিহাদের ডাক দিয়েছিলেন।
কতিপয় অতি উৎসাহী নাছের ইউসুফের ডাকে সাড়া দেয়। তারা তার পতাকাতলে জিহাদ করতে আসে। কিন্তু ইতিহাস ও বাস্তবতা একথার প্রতি ইঙ্গিত বহন করে যে, যুদ্ধের মুখোমুখি মুহূর্তে নাছের ইউসুফ পলায়ন করবেন। রণভূমিতে নাছের ইউসুফ বেশিক্ষণ অবস্থান করতে পারবেন না; বরং যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বেই তিনি পলায়ন করবেন। সেই মুহূর্তটি অতিউৎসাহী লোকদের ব্যথিত করবে। তারা কঠিন অধঃপতনের শিকার হবে। তাদের উচিত নিজেদের মাঝে একটু বোঝাপড়া করা। আমীরের পলায়নের পর পরাজয় মেনে নেওয়া তাদের বড় ভুল নয়। তাদের বড় ভুল হলো নাছের ইউসুফের প্রতি এই বিশ্বাস স্থাপন করা যে, তিনি জিহাদের পতাকা বহন করতে পারবেন!!
বন্ধুরা, আপনারা জিহাদের ডাক শুনলে, কে ডাক দিচ্ছে তাকে ভালোভাবে পরখ করবেন। কারণ, জিহাদ ইসলামের শীর্ষস্থানীয় আমল। সর্বমহৎ ব্যক্তি ব্যতীত অন্য কেউ জিহাদের সত্য ডাক দিতে পারেন না।
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নাছের ইউসুফ জিহাদের ডাক দিয়ে দামেস্কের উত্তরে বারযা নামক গ্রামে তাঁবু গেড়েছেন। অথচ উচিত ছিল সেনাবাহিনী নিয়ে আলেপ্পো নগরীর দিকে অগ্রসর হওয়া। আলেপ্পো তার সাম্রাজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহর এবং হালাকু খানের মুখোমুখি হওয়ার জন্য সিরিয়ায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট। অথবা উচিত ছিল মিয়াফারেকীনের উদ্দেশে সদলবলে রওনা হওয়া। যাতে কামেল মোহাম্মদের সঙ্গে গিয়ে মিলিত হয়ে মুসলিম শক্তি বৃদ্ধি করতে পারেন। কিন্তু নাছের ইউসুফ এ দুইয়ের কোনোটাই করেননি; বরং তিনি দামেস্কে তাঁবু গেড়েছেন। যাতে হালাকু খান আসলে পালাবার সুযোগ পান। তিনি তার মূল্যবান জীবনকে সামান্যতম ক্ষতির মুখোমুখি হতে দিতে চাননি!
এরপর নাছের ইউসুফ পার্শ্ববর্তী আমীরদের তার দলে যোগ দেওয়ার জন্য পত্র প্রেরণ শুরু করেন। তিনি মরু সাগরের পূর্বে অবস্থিত (বর্তমান জর্ডানে অবস্থিত) কারাক অঞ্চলের নেতাকে চিঠি লেখেন। তার নাম ছিল 'মুগীছ ফাতাহুদ্দীন ওমর' (তার নামের অর্থ হলো আশ্রয়দাতা দ্বীন বিজেতা ওমর)। তিনি অন্যকে আশ্রয় দিতেন না। কেবল নিজেকেই আশ্রয় দিতেন। তিনি দ্বীন বিজেতা ছিলেন না। তিনি ওমর রা. এর সদৃশও ছিলেন না। তিনি নাছের ইউসুফের মতোই ছিলেন। তিনি কখনো তাতারীদের বিপক্ষে যুদ্ধ করতেন। আবার কখনো তাদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করতেন!!
নাছের ইউসুফ আরেক আমীরের কাছে চিঠি প্রেরণ করেন। কেউ ভাবতেও পারেননি যে, তিনি তার কাছে চিঠি প্রেরণ করবেন। তিনি মিশরের আমীরের কাছে তাতারীদের বিরুদ্ধে সহযোগিতা চেয়ে চিঠি প্রেরণ করেন।
সুবহানাল্লাহ! যিনি দীর্ঘদিন ধরে মিশরের আমীরের শত্রু। যিনি তাতারীদের কাছে তার বিপক্ষে যুদ্ধ করার জন্য সাহায্য কামনা করেছেন। বর্তমানে তাতারীদের শত্রু। এখন তিনি মিশরের আমীরের কাছে তাতারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য সহযোগিতা চাইছেন!
তার সামনে কোনো মূলনীতি ছিল না। ছিল না কোনো নীতিমালা। ব্যক্তিগত স্বার্থই ছিল তার প্রধান প্রেরণা।
নাছের ইউসুফ ও তার সৈন্যবাহিনীর কথা রাখুন। চলুন হালাকু খানের দিকে ফিরে যাওয়া যাক। সে শাহী দুর্গ থেকে হামাদান নগরীর দিকে প্রত্যাবর্তন করে, যেটি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিচালনার প্রধান কেন্দ্র ছিল। হালাকু খান পুনরায় পরিকল্পনা শুরু করল, যা এই উদ্দীপ্ত অঞ্চল (মধ্যপ্রাচ্যের) এর জন্য অধিক উপযোগী।
এক.
খ্রিস্টানদের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধির জোর দিল। বিশেষত তাতারীদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি মুসলিম শক্তির কতিপয় নমুনা প্রকাশ পাওয়ার পর হালাকু খান খ্রিস্টানদের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধির প্রতি জোর দিল। তখন খ্রিস্টশক্তির সহযোগিতার প্রয়োজন দেখা দিল— ১. মুসলমানদের শোভা নির্বাপিত করার জন্য ২. গোপন সংবাদ আদান-প্রদানের জন্য ৩. সিরিয়া পতন শেষে পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের জন্য।
তাই হালাকু খান খ্রিস্টান রাজাদের তথা আর্মেনিয়ার রাজা হাইতুম জর্জিয়ার রাজা ও আন্তাকিয়ার রাজা বুহমন্দকে মূল্যবান হাদিয়া-তোহফা পাঠায়।
দুই. মিয়াফারেকীনের অবরোধ অব্যাহত থাকবে। অবরোধের নেতৃত্বে থাকবে হালাকু খানের ছেলে আশমুত। তবে কামেল মোহাম্মদের বীরত্ব ও দুঃসাহসিকতার সামনে অবরোধ চলমান রাখা বড়ই কঠিন কাজ। তাই আর্মেনিয়া ও জুজিয়া শক্তিও অবরোধে অংশগ্রহণ করবে। অবরোধ ভঙ্গে কোনো মুসলিম নেতা যেন সহযোগিতা না করে।
তিন. দামেস্ক ও আলেপ্পোর আমীর নাছের ইউসুফ আইয়ূবীর বৈরী অবস্থান প্রকাশ পেয়েছে। সে দামেস্কের উত্তরে তাঁবু গেড়েছে এবং তাতারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। কিন্তু হালাকু খান এই বিষয়টি খুব আমলে নেয়নি। কারণ, সে নাছেরের মনোবল ও ক্ষমতা সম্পর্কে পূর্ব থেকেই অবগত। তাই নাছেরের বিদ্রোহের বিষয়টি হালাকু খানের চোখে অপেক্ষাকৃত তুচ্ছ।
চার. মধ্য ইরাক বিশেষত বাগদাদ নগরী প্রকাশ্যে তাতারীদের কাছে আত্মসমর্পণের ঘোষণা দিয়েছে। এখন বাগদাদ নিরাপদ নগরীতে পরিণত হয়েছে। অনুরূপ মসুলের আমীরও আত্মসমর্পণ করেছে। খুব শীঘ্রই উত্তর-পূর্ব ইরাকও নিরাপত্তার ছায়াতলে আশ্রয় নেবে।
পাঁচ. সিরিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী শহর হলো আলেপ্পো ও দামেস্ক। এই শহর দুটি পতন হওয়া মানে গোটা সিরিয়ার পতন হওয়া। আলেপ্পো নগরী দামেস্কের তিনশ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত।
উল্লেখিত বিষয়াবলিকে সামনে রেখে হালাকু খান এই দুই শহরে যে কোনো একটির ওপর প্রথমত প্রকাশ্যে আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু কোন শহরে আক্রমণ করবে হালাকু খান?
হালাকু খান গবেষণায় দেখতে পেল, যদি সে আলেপ্পো অভিমুখে রওয়ানা হয়, তাহলে প্রথমত উত্তর ইরাক পাড়ি দিয়ে তারপর তুরস্কের সীমান্ত অঞ্চল দিয়ে উত্তর ইরাক হয়ে সিরিয়া প্রবেশ করতে হবে। অবশেষে সিরিয়ার উত্তর পশ্চিম অঞ্চল দিয়ে আলেপ্পো পৌঁছতে হবে। এসব অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে নদ-নদী থাকলেও যুদ্ধাভিযানে নদ-নদীকে বড় বাধা মনে করা হয়। বিশেষত যখন সৈন্যবাহিনী প্রচুর হয়। এখান থেকে মিয়াফারেকীন খুব নিকটবর্তী। সুতরাং যদি কোনো কারণে আশমুত ইবনে হালাকু প্রধান তাতারী দলের সহযোগিতার প্রয়োজন মনে করে, তাহলে সহজে সাহায্য পেতে পারে।
পক্ষান্তরে প্রথমত হালাকু খান যদি দামেস্ক অভিমুখে রওয়ানা হয়, এটি হালাকু খানের জন্য একটু কষ্টকর হবে। যদিও এটি দামেস্কবাসীর জন্য আকস্মিক ভয়ংকর আক্রমণ হবে। কারণ, হালাকু খান এমন দিক থেকে আগমন করবে, যা তারা বুঝতে পারবে না। কারণ, দামেস্কের পথে সিরিয়ার মরু অঞ্চল পাড়ি দিতে হয়। এই উপত্যকাটিতে পানির খুব অভাব। বিশাল বাহিনী নিয়ে এই উপত্যকা পাড়ি দেওয়া রীতিমতো ভয়ংকর। হালাকু খান এই ভয়াবহ পদক্ষেপ গ্রহণে সক্ষম হবে না। পাশাপাশি এ পথে নাছের ইউসুফ এমন দিক থেকে আকস্মিক আক্রমণ করতে পারে, যা কেউ কল্পনাও করতে পারবে না।
সুবহানাল্লাহ! এরও ছয়শো বছর পূর্বে যখন যোগাযোগব্যবস্থা ছিল আরো শোচনীয়, আধুনিক রণকৌশল বলতে ছিল না, তখন হযরত খালেদ ইবনে ওয়ালিদ রা. দামেস্কের নিকটবর্তী অঞ্চলে রোমানবাহিনীর মোকাবেলা করার জন্য সৈন্যবাহিনী নিয়ে ইরাক থেকে এই ভয়াবহ দুর্গম মরুভূমি পাড়ি দিয়েছিলেন। যুদ্ধে হযরত খালেদ রা. অভাবনীয় জয় লাভ করেন। হায় কোথায় সাহাবী খালেদ ইবনে ওয়ালিদ রা. আর কোথায় মানুষ হত্যাকারী হালাকু খান! [তার ওপর আল্লাহর লা'নত]
এসব কিছু বিবেচনাকরত হালাকু খান প্রথমত সদলবলে আলেপ্পো অভিমুখে যাত্রা করার সিদ্ধান্ত নিল। ততদিন পর্যন্ত ছেলে আশমুত মিয়াফারেকীন অবরোধ করে রাখবে।
টিকাঃ
৬০ সূরা ইউনুস: ৮১।
📄 আলেপ্পো অভিমুখে তাতারী বাহিনী
বর্বর তাতারী বাহিনী গৃহীত নীতিমালা অনুসারে ইরানের পশ্চিমে পাহাড় অতিক্রম করতে শুরু করে। এরপর ইরাকের সীমান্তে উত্তর-পশ্চিম দিক দিয়ে প্রবেশ করে। এরপর আর্বিল শহর অতিক্রম করে নিকটবর্তী মসুল শহরে পৌঁছে যায়, যা তাদের জন্য ছিল সহযোগী। মসুলের পাশে দাজলা [টাইগ্রিস] নদী পাড়ি দেওয়া ছিল আবশ্যক। অত্র অঞ্চলে মসুল শহরের চেয়ে তাদের জন্য অধিক উপযোগী কোনো শহর ছিল না!! এরপর (বর্তমান তুরস্কের) নুসাইবিন শহরে পৌঁছার জন্য তাতারী বাহিনী দাজলা নদীর পশ্চিম তীর ঘেঁষে যাত্রা শুরু করে। এই শহরটি মিয়াফারেকীন থেকে ১৭০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত। এভাবেই হালাকু খান ছেলে আশমুতের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। তবে ছেলের প্রতি পূর্ণ আস্থা থাকায় সে তার কাছে যায়নি।
উল্লেখযোগ্য বাধা ছাড়া হালাকু খান নুসাইবিন শহর আক্রমণ করে। এরপর ক্রমান্বয়ে হারান, এডেসা ও এলবিয়া আক্রমণ করে। এসব ক'টি শহর তুরস্কের দক্ষিণে অবস্থিত। আলেপ্পো পৌঁছার জন্য তুরস্কের সব ক'টি শহর অতিক্রম করার প্রয়োজন ছিল। ইসলামী কোনো সাম্রাজ্য তাদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি বলে হালাকু খান নিশ্চিন্ত মনে এ দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়।
এলবিয়া শহরের কাছে হালাকু খান মহানদী ফুরাত (ইউফ্রেটিস) পূর্ব থেকে পশ্চিমে পাড়ি দেয়।
এভাবেই হালাকু খান উল্লেখযোগ্য কোনো প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই পানিপথের দ্বিতীয় বাধা পাড়ি দেয়। এরপর আলেপ্পো নগরী অভিমুখী হয়ে তুরস্ক ও সিরিয়ার সীমান্ত অঞ্চল পাড়ি দেওয়ার জন্য ফুরাত (ইউফ্রেটিস) নদীর পশ্চিম দিকে রওনা হয়। তুরস্কের সীমান্ত অঞ্চল থেকে আলেপ্পো নগরীর দূরত্ব হলো মাত্র পঞ্চাশ কিলোমিটার।
তাতারী বাহিনীর অবিরাম সফর পূর্ণ বছর চলতে থাকে। এই সফরে তারা পারস্য, ইরাক, তুরস্ক ও সিরিয়া ভূমি পাড়ি দেয়। এটি ৬৫৭ হিজরীর ঘটনা। হালাকু খান ৬৫৮ হিজরীর মহররম মাসে আলেপ্পো নগরীতে পৌঁছে। তাতারীরা চতুর্দিক থেকে আলেপ্পো নগরী ঘিরে ফেলে। তবুও আলেপ্পোবাসী মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আত্মসমর্পণ করে না। নাছের ইউসুফ আইয়ূবীর চাচা তাওরান শাহ এই প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তিনি ছিলেন সত্যিকার অর্থে এক বীর মুজাহিদ। তিনি ভাতিজা নাছের ইউসুফের মতো ছিলেন না। তাতারীরা শহরের চারপাশে কামান স্থাপন করে। লাগাতার গোলাবর্ষণ করতে থাকে। তখন নাছের ইউসুফ আইয়ূবী তিনশো কিলোমিটার দূরে দামেস্কের দক্ষিণে অবস্থান করছিল!!