📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 দ্বিতীয় বাধা

📄 দ্বিতীয় বাধা


দ্বিতীয় বাধা : এটি অপেক্ষাকৃত সহজ ও হালকা বাধা। তা হলো, সে সকল মুসলিম আমীর-উমারা হালাকু খানের সঙ্গে শান্তিচুক্তিতে আবদ্ধ হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেছে, তাদের কামনা ছিল তারা স্ব স্ব স্থানে অবস্থান করবে, নিজ দেশে স্বায়ত্তশাসন করবে, যদিও তারা তাতারীদের ছত্রছায়ায় থাকবে। অথচ হালাকু খানের ইচ্ছা ছিল, সে নিজের মতো করে পরিপূর্ণভাবে এই অঞ্চল শাসন করবে। যাকে ইচ্ছা প্রশাসনে নিয়োগ দেবে, যাকে ইচ্ছা বরখাস্ত করবে। এক্ষেত্রে হালাকু খান কাউকে নিজের সহযোগী পায়নি।
কিন্তু হালাকু খান সম্পর্কে একথা সুপ্রসিদ্ধ রয়েছে যে, সে যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিকে উত্তম পন্থায় নিজের মতো করে নিতে পারে। সে সর্বপ্রথম কামেল মোহাম্মদ আইয়ূবীর পদক্ষেপকে ধূলিসাৎ করাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করল। এরপর সিরিয়ার দিকে মনোনিবেশ করবে। তখন যদি কোনো সংগ্রামী নেতা তার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় তবে সে তার প্রতি অতি সহজ স্বভাবসুলভ আচরণ প্রদর্শন করবে!!

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 এই সংকট থেকে মুক্তি পেতে হালাকু খানের প্রয়াস

📄 এই সংকট থেকে মুক্তি পেতে হালাকু খানের প্রয়াস


এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 মিয়াফারেকীন অবরোধ

📄 মিয়াফারেকীন অবরোধ


হালাকু খান অতি সহজভাবে কামেল মোহাম্মদ আইয়ূবীর বিদ্রোহ দমন করতে শুরু করল। সে তার জিহাদী প্রেরণাকে দমিত করার লক্ষ্যে শর্তহীন আত্মসমর্পণ করার এবং অন্যান্য মুসলিম আমীরদের দলভুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে দূত পাঠাল। দূত নির্বাচনে হালাকু খান ছিল খুবই বিচক্ষণ। সে কোনো তাতারী দূত পাঠায়নি। সে 'কাসীস ইয়াকুবী' নামক জনৈক আরবী খ্রিষ্টানকে দূত হিসেবে পাঠায়। কারণ, খ্রিষ্টান দূত এক দিক থেকে কামেল মোহাম্মদকে তার গোত্রীয় ভাষায় বোঝাতে সক্ষম হবে, হালাকু খানের সংবাদ, তার ক্ষমতা ও শক্তি সহজেই বোঝাতে পারবে। অন্যদিকে, যেহেতু সে একজন খ্রিস্টান, তাই কামেল মোহাম্মদ সহজেই বুঝতে পারবে যে, খ্রিষ্টানরা তাতারীদের সহযোগিতা প্রদান করছে। এটি ছিল হালাকু খানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রণকৌশল। কারণ, আপনি যদি তৎকালীন মিয়াফারেকীন সাম্রাজ্যের ভৌগলিক অবস্থান প্রত্যক্ষ করেন, তাহলে দেখতে পাবেন, মিয়াফারেকীনের চতুর্দিক থেকে খ্রিস্টান দ্বারা পরিবেষ্টিত। পূর্বদিকে আর্মেনিয়া (খ্রিস্টান) সাম্রাজ্য, যা তাতারীদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ। উত্তর পূর্বাঞ্চলে জুজিয়া সাম্রাজ্য। তারা খ্রিস্টান ও তাতারীদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ।
সুতরাং ভৌগলিক অবস্থানের দিক থেকে মিয়াফারেকীন মুনাফিক ও মুশরিক সাম্রাজ্যবেষ্টিত একটি ছোট্ট উপত্যকা।
পূর্বে খ্রিস্টান আর্মেনিয়া সাম্রাজ্য।
উত্তরপূর্বে খ্রিস্টান জর্জিয়া সাম্রাজ্য।
দক্ষিণপূর্বে তাতারীদের সহোদর মসুল সাম্রাজ্য।
পশ্চিমে তাতার প্রতিনিধি সেলজুকী সাম্রাজ্য। দক্ষিণ পশ্চিমে তাতার প্রতিনিধি আলেপ্পো সাম্রাজ্য।
সুতরাং মিয়াফারেকীন সাম্রাজ্য ভৌগলিক দিক থেকে বড় ভয়াবহ!!

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 হালাকু খানের খ্রিস্টান দূতের সঙ্গে কামেল মোহাম্মদ রহ. কী করলেন

📄 হালাকু খানের খ্রিস্টান দূতের সঙ্গে কামেল মোহাম্মদ রহ. কী করলেন


তিনি দূতকে বন্দী করে হত্যা করলেন!
দূতহত্যা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। তবুও কামেল আইয়ূবী রহ. হালাকু খানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দেওয়ার জন্য এবং বাগদাদের নির্মম হত্যাযজ্ঞের প্রতিশোধ গ্রহণের প্রতি মুসলমানদের উদ্বুদ্ধ করার জন্য এ কাজ করেছেন। তা ছাড়া তাতারীরা কখনোই আইনের কোনো তোয়াক্কা করেনি。
তাতারদূত কাসীস ইয়াকুবের হত্যা কামেল মোহাম্মদ রহ. এর পক্ষ থেকে হালাকু খানের প্রতি খোলা চিঠি ছিল। এতে হালাকু খান বুঝতে পেরেছিল কামেল মোহাম্মদ রহ. কে ধ্বংস করা ব্যতীত সিরিয়ায় প্রবেশ করা যাবে না। [দূতহত্যার নীতিমালা সামনে আসবে—ইনশাআল্লাহ!]
হালাকু খান এই বিষয়টির প্রতি খুব গুরুত্বারোপ করেন। এটি ছিল হালাকু খানের মোক্ষম সুযোগ। তাই সে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত বিশাল বাহিনী প্রস্তুত করে। নিজ সন্তান আশমুত ইবনে হালাকুকে সেনাপতি নিযুক্ত করে।
মসুলের আমীর তার দেশ দিয়ে অতিক্রমের সুযোগ করে দিলে তারা প্রকাশ্যে মিয়াফারেকীনের উদ্দেশে রওনা হয়।
আশমুত ইবনে হালাকু বিশাল বাহিনী নিয়ে মিয়াফারেকীন সাম্রাজ্যের প্রধান ঘাঁটির দিকে রওয়ানা হয়, যা মিয়াফারেকীনেই অবস্থিত। যে ঘাঁটিতে কামেল মোহাম্মদ রহ. নিজেও অবস্থান করতেন। কামেল মোহাম্মদ আইয়ূবী রহ. তার সকল বাহিনীকে এই ঘাঁটিতে একত্রিত করেছিলেন। কারণ, যদি সৈন্যবাহিনীকে চতুর্দিক ছড়িয়ে দেন, তাহলে বিপুলসংখ্যক তাতারী বাহিনীর মোকাবেলা করা সম্ভব হবে না।
যা ঘটার ছিল তা-ই ঘটল। তাতারীরা মিয়াফারেকীন অবরোধ করল এবং পূর্বদিক থেকে আর্মেনিয়া ও জর্জিয়া সাম্রাজ্যও মিয়াফারেকীন অবরোধ করার জন্য এগিয়ে এল। এটি ছিল বাগদাদ পতনের চার মাস পর ৬৫৬ হিজরীর রজব মাসে সংঘটিত ঘটনা।
অপরাজেয় মিয়াফারেকীন শহর প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। শহরের আনাচে কানাচে প্রতিবাদের তীব্র দাবানল দাউ দাউ করে। মোহাম্মদ আইয়ূবী রহ. প্রাণপণ লড়াইয়ের প্রতি উদ্বুদ্ধ করেন।
তিনি ছিলেন নিকৃষ্টের মাঝে উৎকৃষ্টতর (গোবরে পদ্মফুল)!!
কাপুরুষদের মাঝে বীরপুরুষ!! মূর্খদের বস্তিতে সঠিক চিন্তার ধারক-বাহক! যদি বলি গণ্ডমূর্খদের মাঝে, তবুও অত্যুক্তি হবে না।
অবরোধকালে পার্শ্ববর্তী মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর পক্ষ থেকে সাহায্য সহযোগিতা আসা স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু এমন হয়নি। কোনো রকম খাবার-দাবার, অস্ত্র-শস্ত্র বা চিকিৎসাসামগ্রী তাদের কাছে আসেনি। মুসলিম নেতৃবর্গগণ নিজ ভাই-বোন, ছেলে-সন্তান, বাপ-দাদা ও আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে নব পরাশক্তি তথা তাতারীশক্তির প্রতি নতজানু হয়েছিল।
জাতির এই মানসিক বিপর্যয় দেখে আমি সত্যিই অভিভূত হই!! সেদিন জাতি কোথায় ছিল? কোথায় ছিল জাতির মনুষ্যত্ব?!
যখন শাসকবর্গ নৈতিক অবক্ষয়ে নিমজ্জিত, তখন জাতি কেন নীরব ছিল?! কেন তারা নিজেদের ভাইদের দ্বীন-ধর্ম কিংবা রক্ত-বংশ রক্ষার্থে জেগে ওঠেনি?!
জাতি নীরব ছিল। তাদের নীরবতা তাদেরকে ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দিয়েছে—
এক. ফলশ্রুতিতে জনগণ কোনোভাবে বেঁচে থাকতে চেয়েছিল। বেঁচে থাকাই ছিল মূল লক্ষ্য।
দুই. সকল অঞ্চলের মানুষের মগজধোলাই প্রক্রিয়া চলমান ছিল। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, শাসকবর্গ, মন্ত্রীপরিষদ ও তাদের দরবারি আলেমগণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় জনগণকে সান্ত্বনা প্রদান করেছিল এবং তাদের দমিয়ে রেখেছিল। এতেও কোনো সন্দেহ নেই যে, তারা মোহাম্মদ আইয়ুবী রহ. এর নিন্দা জ্ঞাপন করে বেড়াত, যিনি নিজ মর্যাদা, জাতির মর্যাদা এমনকি মুসলমানদের মর্যাদা রক্ষায় লড়ে গেছেন।
নিঃসন্দেহে অনেক বক্তার আবির্ভাব ঘটেছিল, যারা বলত— “জাতিকে ধ্বংস করার চেয়ে কামেল মোহাম্মদের উচিত সরে দাঁড়ানো।”! অথবা কেউ বলত, “কামেলা মোহাম্মদ যদি অস্ত্র অর্পণ করতেন, তাহলে সকল সমস্যার সমাধান হতো। কিন্তু তিনি পৃথিবীর পরাশক্তি তাতারীদের থেকে অস্ত্র গোপন করছেন। তিনি এমন এক ভুলের শিকার, যা মিয়াফারেকীনবাসীকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছে।”
এতেও কোনো সন্দেহ নেই যে, হালাকু খান চিঠি পাঠিয়ে একথা বলেছিল, হালাকু কামেল মোহাম্মদকে অপসারণের জন্য আগমন করেছে। মিয়াফারেকীনবাসীর সঙ্গে তার কোনো শত্রুতা নেই। হালাকু খান সবার সঙ্গে মিলে-মিশে থাকতে চায়।
এই ছিল মগজধোলাই পদ্ধতি, যা জাতির বীরত্বকে অবদমিত করেছে। সাহসিকতা ও ব্যক্তিত্বকে গলা টিপে হত্যা করেছে।
তিন. আমন্ত্রণ-নিমন্ত্রণ, কথা-বার্তা, চিঠি-পত্র ইত্যাদির মাধ্যমে সে দমিত হবে না। তার দমন-প্রক্রিয়া হবে তরবারি।
জনগণ শাসকদের পক্ষ থেকে জুলুম-অত্যাচার, নিপীড়ন ও দুঃশাসনে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। মানুষ শাসক ও শাসিত শ্রেণির মধ্যকার ঘৃণাবোধের মাঝে বসবাস করছে।
এই লজ্জাজনক ও বিপর্যস্ত পরিস্থিতিতে আমরা বুঝতে পারি, কেন মিয়াফারেকীন সাম্রাজ্য পূর্ণতা পাবে? কেন মুসলিম জাতি মৃত্যুর উপকণ্ঠে দাঁড়িয়ে থাকলেও শাসক ও পার্শ্ববর্তী মুসলিম সাম্রাজ্যগুলো কোনো হরকত করে না?!
তখন আমরা বুঝতে পারব, মসুলের আমীর বদর উদ্দীন লুলু, সেলজুকী আমীর কেকেভাস ছানী ও কালাজ আরসালান রাবে' কী লাঞ্ছনাকর পরিস্থিতে দিনাতিপাত করছিল! আর আলেপ্পো ও দামেস্কের আমীর নাছের ইউসুফ আইয়ূবী লাঞ্ছনা ও অপমানের যে চরম শিখায় সময় পার করছিলেন, তা বুঝে উঠা বড়ই কঠিন!!
কামেল মোহাম্মদ আইয়ূবীর সঙ্গে নাছের ইউসুফ আইয়ূবীর গভীর সম্পর্ক ছিল। দ্বীন-ধর্মের সম্পর্ক, প্রতিবেশীর সম্পর্ক, আলেপ্পোর রাজনৈতিক সম্পর্কের ঊর্ধ্বে। কারণ, মিয়াফারেকীন আলেপ্পোর উত্তর-পূর্বে অবস্থিত। সুতরাং যদি মিয়াফারেকীনের পতন ঘটে, তাহলে এর পরই হবে আলেপ্পোর পালা। তাদের মাঝে ছিল রক্তের সম্পর্ক, বংশের সম্পর্ক। কারণ, তারা উভয়ই আইয়ূবী (তথা তারা উভয়ই আইয়ূব বংশদ্ভূদ)। তাদের দাদা ইসলামী বীরসেনা সালাহ উদ্দীন আইয়ূবীর যুগ বেশি দিন পূর্বে অতিবাহিত হয়নি। সালাহ উদ্দীন আইয়ূবীর ইন্তেকালের এখনো সত্তর বছর অতিবাহিত হয়নি। [সালাহ উদ্দীন আইয়ূবী ৫৮৯ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন] মুসলমানদের শত্রুদের বিরুদ্ধে তার শক্ত অবস্থানের কথা জাতি এখনো ভোলেনি। তথাপি তার নাতি নাছের ইউসুফের অবস্থা এতটা লাঞ্ছনাকর হলো কী করে?!
এটি একটি জটিল প্রশ্ন? নাছের ইউসুফের পক্ষে এই প্রশ্নের সন্তোষজনক কোনো উত্তর নেই; না শরীয়তসম্মত, না যুক্তিসঙ্গত।
কামেল মোহাম্মদ রহ. নাছের ইউসুফ আইয়ূবীর কাছে সাহায্য কামনা করলে তিনি কোনোরূপ চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই সম্পূর্ণরূপে তা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি সবকিছু বিক্রি করে বিনিময়ে তাতারীদের ভালোবাসা ক্রয় করেছেন। একাজ করার মুহূর্তে তিনি জানতেন না যে, তাতারীদের কথার কোনো মূল্য নেই। তারা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে না। তা ছাড়া তাতারীরা প্রতিশ্রুতিপরায়ণ হলেও কি তিনি মুসলমানদের তাতারীদের কাছে বিক্রি করতে পারেন? বিনিময়ে তারা সারা দুনিয়া প্রদান করলেও?!
নাছের ইউসুফ কামেল মোহাম্মদ রহ. কে সহযোগিতা প্রদান না করেই ক্ষান্ত হননি, মিয়াফারেকীন অবরোধে অংশগ্রহণ করেই ক্ষান্ত হননি, বরং তার সন্তানের মাধ্যমে হালাকু খানের কাছে এই মর্মে চিঠি প্রেরণ করেন যে, সে যেন তাকে মিশর আক্রমণে এবং দাস বংশের হাত থেকে মিশর দখল করার ক্ষেত্রে তাকে সহযোগিতা প্রদান করে!!
পাঠকবৃন্দ, একটু ভেবে দেখুন, মুসলিমবিশ্বের এহেন বিপর্যস্ত মুহূর্তে নাছের ইউসুফ তাতারীদের কাছে মিশর আক্রমণের জন্য সাহায্য প্রার্থনা করছেন!!
নাছের ইউসুফ চিঠি প্রেরণের সময় নববন্ধু হালাকু খানের জন্য মূল্যবান হাদিয়া-তোহফা, উপহার-উপঢৌকন পাঠাতে ভোলেননি।
আল্লাহর কী মহিমা! নাছের ইউসুফ খাল কেটে কুমির আনলেন!!
অন্যান্য সকল আমীরগণ নিজেরাই সশরীরে হালাকু খানের দরবারে এসেছে। কিন্তু নাছের ইউসুফ সশরীরে গমন না করে ছেলেকে পাঠিয়েছেন। হালাকু খান এটিকে তার পক্ষ থেকে এক প্রকার ঔদ্ধত্য মনে করে। পাশাপাশি মিশর আক্রমণের জন্য সাহায্য কামনা করাকে হালাকু খান তার পক্ষ থেকে অহংকার বোধ করে। কারণ, হালাকু খান সিরিয়া ও মিশর উভয় অঞ্চলকে তার সাম্রাজ্যভুক্ত করার ইচ্ছা করেছিল। নাছের ইউসুফের এই অহমিকা ও দুঃসাহস দেখে হালাকু খান অগ্নিশর্মা হয়ে ওঠে। নাছের ইউসুফের কাছে জ্বালাময়ী ভাষায় একটি চিঠি প্রেরণ করে। এতকিছুর পরেও আযীয ইবনে নাছের ইউসুফ হালাকু খানের দলে থেকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে!!
এটি আশ্চর্যের কিছুই নয়!! কারণ, এ তো নাছের ইউসুফ নামক সিংহের সিংহশাবক!!
হালাকু খান কর্তৃক দামেস্ক ও আলেপ্পোর শাসক নাছের ইউসুফের নিকট প্রেরিত চিঠিটি পাঠ করলে একথা সুস্পষ্ট প্রতিভাত হয় যে, হালাকু খানের দরবারে এমন কতিপয় মুসলিম সাহিত্যিক ছিলেন, যারা হালাকু খানের চিন্তা-ভাবনাকে বিশুদ্ধ আরবি ও উৎকৃষ্ট যুগোপযোগী ভাষাশৈলীর মাধ্যমে পত্রস্থ করত।
হালাকু খান তার চিঠিতে লেখে—
"আলেপ্পোর অধিপতি নাছের ইউসুফের জানা উচিত, আমি আল্লাহর মদদে বাগদাদ জয় করেছি, সেখানকার যোদ্ধাদের হত্যা করেছি, ঘর-বাড়ি, প্রাসাদ-অট্টালিকাসমূহ বিধ্বস্ত করেছি, জনগণকে বন্দী করেছি। যেমন মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীন কুরআনে কারীমে বলেন—
قَالَتْ إِنَّ الْمُلُوكَ إِذَا دَخَلُوا قَرْيَةً أَفْسَدُوهَا وَجَعَلُوا أَعِزَّةَ أَهْلِهَا أَذِلَّةً وَكَذَلِكَ يَفْعَلُونَ
'রানি বলল, প্রকৃত ব্যাপার হলো, রাজা-বাদশাগণ যখন কোনো জনপদে ঢুকে পড়ে, তখন তাকে ধ্বংস করে ফেলে এবং তার মর্যদাবান বাসিন্দাদের লাঞ্ছিত করে ছাড়ে। এরাও তো তা-ই করবে।'৫৮
আমি তথাকার খলিফাকে উপস্থিত করে কিছু কাজ করতে বললে সে তা অস্বীকার করে। ফলে সে লজ্জিত হয় এবং আমি তাকে নির্মূল করে দিই। সে অনেক মূল্যবান সম্পত্তি সঞ্চয় করেছিল। সে ছিল নিকৃষ্ট। তাই সম্পদ জমা করেছিল। অথচ অন্যদের কোনো খোঁজ-খবর রাখত না। সে খ্যাতি লাভ করেছিল। সর্বত্র তার নাম-ধাম ছড়িয়ে পড়েছিল। আমি পূর্ণাঙ্গতা ও পরিপূর্ণতা থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাই।
إذا تم أمر دنا نقصه توقع زوالاً إذا قيل تم إذا كنت في نعمة فارعها فإن المعاصي تزيل النعم وكم من فتى بات في نعمة فلم يدر بالموت حتى هجم
"পূর্ণতা লাভ করলে ধ্বংস নিকটবর্তী হয়। ধ্বংসের অপেক্ষা করো যখন বলা হবে তুমি পূর্ণতা লাভ করেছ। নেয়ামত থাকতে যত্ন নাও। পাপকর্ম নেয়ামত ধ্বংস করে দেয়। কমবখতরা বিলাসিতায় মত্ত ছিল। আকস্মিক মৃত্যুতে ধ্বংস হয়েছে, বুঝতে পারেনি।"
আমার এই চিঠি হাতে পাওয়ামাত্রই লোকজন, ধন-সম্পত্তি সবকিছু নিয়ে ভূপৃষ্ঠের সুলতান, যাকে রাজাধিরাজ বলা হয়, তার পানে দ্রুত রওয়ানা করবে। তাহলে তার অনিষ্ট থেকে বাঁচতে পারবে এবং কল্যাণের নিকটবর্তী হবে। যেমন আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলেন-
وَأَنْ لَيْسَ لِلْإِنْسَانِ إِلَّا مَا سَعَى وَأَنَّ سَعْيَهُ سَوْفَ يُرَى
"আর এই যে, মানুষ নিজের প্রচেষ্টা ছাড়া অন্য কোনো কিছুর (বিনিময় লাভের) হকদার হয় না এবং এই যে তার চেষ্টা অচিরেই দেখা যাবে। তারপর তার প্রতিফল তাকে পুরোপুরি দেওয়া হবে।"৫৯
আর আমার দূতদের বাধাগ্রস্ত করবে না যেমন ইতিপূর্বে করেছিলে। ন্যায়সঙ্গত পন্থায় আটকে রাখবে নতুবা উত্তম পন্থায় ছেড়ে দেবে। আমি সংবাদ পেয়েছি সিরিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলে অনেক ব্যবসায়ী মিশর অভিমুখে পলায়ন করেছে (বাস্তবেই তা-ই ঘটেছিল, তাতারীদের আগমনবার্তা শুনে অনেক ব্যবসায়ী মিশরের দিকে পলায়ন করেছিল) যদি তারা পাহাড়ে আরোহণরত হয়, তবে তাদের নিক্ষেপ করে হত্যা করব। আর যদি তারা জমিনে চলমান হয়, তবে ভূমিধসে তাদের ধ্বংস করব।
أين النجاة ولا مناص الهارب ولي البسيطان الندى والماء ذلت لهيبتنا الأسود وأصبحت في قبضتي الأمراء والوزراء
"মুক্তি কোথায়? পলায়নকারীর কোনো পরিত্রাণ নেই। বাগানের নিকটবর্তী হয়েছে শিশির বিন্দু ও জলরাশি। আমার ভয়ে তারা হতবিহ্বল হয়ে ধরা পড়েছে। আমীর-উমারা ও শাসকবর্গদের হাতে।"
এই ছিল হালাকু খানের কম্পন সৃষ্টিকারী চিঠি!! চিঠি পড়ে নাছের ইউসুফ হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন!! এখন তিনি কী করবেন?!

টিকাঃ
৫৮ সুরা নামল : ৩৪।
৫৯ সুরা নাজম: ৩৯-৪১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00