📄 সুবিশাল বাগদাদ পাঠাগার
এই পাঠাগারটিকে প্রায় পাঁচ শতক ধরে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পাঠাগার বলা হলে অত্যুক্তি হবে না।
আব্বাসী খলিফা হারুন-উর-রশীদ এই পাঠাগারটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যিনি ১৭০ হিজরী থেকে ১৯৩ হিজরী পর্যন্ত মুসলিম সাম্রাজ্য শাসন করেছিলেন। অতঃপর খলিফাতুল মুসলিমীন মামুনুর রশীদের খেলাফতকালে [১৯৮-২১৮ হি.] বইপত্র কিতাবাদি বর্ধিত হয়। ধীরে ধীরে একপর্যায়ে এটি দারুল ইলম [জ্ঞানকেন্দ্র]-এ পরিণত হয়। এর ভেতরে কত কিতাবাদি আছে কেউ কল্পনা করতে পারবে না!!
আমরা আজ থেকে হাজার বছর পূর্বেকার জ্ঞানকেন্দ্রের কথা আলোচনা করছি, তখন সেখানে লক্ষ লক্ষ কিতাবাদি ছিল।
আমরা সেই যুগের আলোচনা করছি, যখন কোনো ছাপাখানা ছিল না। সে যুগে পাঠাগারে লক্ষ লক্ষ কিতাব থাকা সত্যিই আশ্চর্যতম বিষয়!! বর্তমান যুগের জন্য এটি খুব স্বাভাবিক ও সম্ভবপর বিষয়।
বাগদাদের পাঠাগারের কিতাবাদির নির্দিষ্ট সংখ্যা আমার জানা নেই। তবে অঙ্ক টানলে অবশ্যই কয়েক মিলিয়ন ছাড়িয়ে যাবে। কারণ, লেবাননের ত্রিপোলি পাঠাগারের—সেটা কখনো বাগদাদের পাঠাগারের সাদৃশ্য হবে না—তিন মিলিয়ন খণ্ড কিতাব ইউরোপের খ্রিস্টানরা জ্বালিয়ে দিয়েছিল। সুতরাং ভেবে দেখুন! বাগদাদের পাঠাগারের কিতাবাদির সংখ্যা কত বেশি হতে পারে!!
বাগদাদের পাঠাগারে বহুসংখ্যক কামরা ছিল। কয়েকটি কামরায় এক এক শাস্ত্রের কিতাবাদি রাখা হতো। ফিকাহশাস্ত্রের কিতাবাদি রাখার জন্য কয়েকটি নির্দিষ্ট কামরা ছিল। কয়েকটি কামরা ছিল চিকিৎসাশাস্ত্রের কিতাবাদির জন্য। অনুরূপ রসায়নশাস্ত্র, রাজনীতি ইত্যাদি ভিন্ন ভিন্ন শাস্ত্রের কিতাবাদির জন্য নির্দিষ্ট কামরা ছিল।
পাঠাগারটিতে বেতনভুক্ত কয়েকশো কর্মচারী ছিল, যারা পাঠাগারটি দেখাশোনা করত এবং সর্বদা এটি সংস্কারের কাজ করত। সেখানে একদল লিপিকার ছিলেন, যারা প্রত্যেকটি কিতাবের একাধিক কপি তৈরি করতেন। আরও ছিলেন একদল অনুবাদক, যারা অন্যভাষায় রচিত কিতাবাদি আরবি ভাষায় রূপান্তরিত করতেন। এছাড়াও একদল গবেষক ছিলেন, যারা পাঠকদের পাঠাগারের বিভিন্ন কিতাবাদির পরিচয়, গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদান করতেন।
পড়াশোনার জন্য কয়েকটি নির্দিষ্ট কামরা ছিল। কয়েকটি নির্দিষ্ট কামরা ছিল ইলমী পর্যালোচনা ও সেমিনারের জন্য। কয়েকটি কামরা ছিল বিশ্রাম ও পানাহারের জন্য। এমনকি দূরবর্তী স্থান থেকে আগত ছাত্রদের জন্য অবস্থান করার জন্য কয়েকটি কামরা ছিল!!
এতক্ষণ আমরা যা আলোচনা করলাম, তা কেবল একটি সুসমৃদ্ধ পাঠাগারই নয়, বরং সুসমৃদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়!!
এই পাঠাগারটি তৎকালীন বিশ্বমানবতার চিন্তা-চেতনাকে লালন করত!!
খলিফা মামুনুর রশীদ রোমান সম্রাটের বিপক্ষে বিখ্যাত জয়লাভ করার পর সন্ধিচুক্তির সময় এই প্রস্তাব পেশ করেছিলেন যে, ইস্তাম্বুলের পাঠাগারে যেসব কিতাবাদি রয়েছে, মুসলিম অনুবাদকদের যেনো সেসব কিতাবাদি অনুবাদের সুযোগ দেওয়া হয়। আব্বাসী খেলাফতের পক্ষ থেকে বেশ কিছু বেতনভুক্ত কর্মচারী ছিলেন, যাদের কাজ ছিল, সারা পৃথিবী ভ্রমণ করে জ্ঞানগর্ভ কিতাবাদি অনুবাদের উদ্দেশ্যে সংগ্রহ করা, তা যে ভাষায়ই রচিত হোক না কেন। এরপর মুসলিম উলামায়ে কেরাম দেখে-শুনে সেই কিতাবগুলোকে পাঠাগারে রেজিষ্ট্রিভুক্ত করতেন। বাগদাদ পাঠাগারে গ্রিক, সুরিয়ানি, হিন্দি, ফার্সি, লেটিন, সংস্কৃত ইত্যাদি বিভিন্ন ভাষার কিতাবাদি অনুবাদ করা হয়।
এই হলো বাগদাদ পাঠাগার!!
যেই পাঠাগারে তৎকালীন বিশ্বের সকল জ্ঞান-বিজ্ঞানের কিতাবাদি সংগৃহীত ছিল。
📄 সুবিশাল বাগদাদ পাঠাগার : পাপিষ্ঠ তাতারী বাহিনীর জঘন্য হামলা
তাতারীরা এই মূল্যবান কিতাবসমূহ দাজলা [টাইগ্রিস] নদীতে নিক্ষেপ করে। কোটি কোটি কিতাব! তাতারীদের মূর্খতা ও নির্বুদ্ধিতার কোনো অন্ত নেই। ধারণা করা হয়েছিল, তাতারীরা কিতাবাদিগুলো তুলে নিয়ে মঙ্গোলের রাজধানী কারাকুরামে এই মূল্যবান জ্ঞানসমুদ্র থেকে উপকৃত হওয়ার জন্য হেফাজত করবে। কিন্তু আজীবন সভ্যতার প্রাইমারি লেভেলেই রয়ে গেল। তারা তো বর্বর জাতি। পড়াশুনা জানে না। শিখতেও চায় না। ভোগ-বিলাস ও আনন্দ-উল্লাসই তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র উদ্দেশ্য। গোটা বিশ্বকে ধ্বংস করা তাদের টার্গেট।
বিগত কয়েক শতাব্দীর পরিশ্রমকে তাতারীরা দাজলা [টাইগ্রিস] নদীতে ভাসিয়ে দিল। কিতাবের দোয়াতের কালি পানিতে মিশে গোটা দাজলা [টাইগ্রিস] নদীর পানি কালো হয়ে গিয়েছিল। [কথিত আছে, হালাকু খান মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পাঠাগারটি পুড়ে ছাই করে দেয়। সেই ছাই বাগদাদ নদীতে নিক্ষেপ করা হলে দীর্ঘ ছয় মাস দাজলা নদীর পানি কালো রঙ ধারণ করে।] পাঠাগার ধ্বংস করে কেবল মুসলমানদের সঙ্গেই অপরাধ করা হয়নি; বরং গোটা মানবতার সঙ্গে অমার্জনীয় অপরাধ করা হয়েছে।
ইতিহাসে এই অপরাধ বার বার ঘটতে থাকে। খ্রিস্টান ক্রুশেডাররা স্পেনের কর্ডোভার লাইব্রেরিতে এমন ঘটনাই ঘটিয়েছিল, যা আমরা ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি।
খ্রিস্টান ক্রুশেডাররা গ্রানাডার গণপাঠাগারও ধ্বংস করেছিল। গ্রানাডা অধঃপতনের সময় তারা কয়েক মিলিয়ন কিতাব জ্বালিয়ে দেয়।
এভাবে স্পেনে খ্রিস্টানরা প্রায় দশবার বিভিন্ন পাঠাগার জ্বালিয়ে দেয়। যেমন টলেডো, ভ্যালেন্সিয়া, জারাগোজার ইত্যাদি পাঠাগার। খ্রিস্টানরা ফিলিস্তিনের গাজা, কুদস ও আসকালানের পাঠাগারও ধ্বংস করেছিল।
ইউরোপীয় নব উপনিবেশবাদী, যারা উনিশ শতকে মুসলিমবিশ্বে অবতরণ করেছে, তারাও এই কাজ করেছিল। তবে তারা ছিল অত্যন্ত মেধাবী। তারা বই-পত্র চুরি করে ইউরোপে পাঠিয়ে দেয়। জ্বালিয়ে দেয় না। ধ্বংস করে না। ফলে আজ ইউরোপের পাঠাগারসমূহ পৃথিবীর মহামূল্যবান কিতাবাদি ও বই-পত্রে ভরপুর। যা মুসলিম পণ্ডিতগণ দীর্ঘ কয়েক শতাব্দী যাবৎ রচনা করেছেন। এতে কেউ সন্দেহ পোষণ করে না যে, ইউরোপের পাঠাগারসমূহে সংরক্ষিত ইসলামী বই-পত্রের সংখ্যা মুসলিম দেশসমূহে সংরক্ষিত বইপত্রের চেয়ে বহুগুণে বেশি।
ইসলামের শত্রুদের ইচ্ছা ছিল, মুসলিম উম্মাহকে দ্বীনী জ্ঞান-বিজ্ঞান থেকে সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত করা। চাই কিতাবাদি জ্বালিয়ে কিংবা নদীতে ভাসিয়ে বা চুরি করে হোক অথবা (বর্তমান সময়ের মতো) পাঠদান পদ্ধতির মাঝে পরিবর্তন সৃষ্টি করে। কারণ ইসলামের শত্রুরা দ্বীন ইসলামের জ্ঞান-বিজ্ঞানের মূল্য খুব ভালোভাবে জানে। তারা জানে, জ্ঞান-বিজ্ঞানই হলো মুসলমানদের মূল শক্তি। সভ্যতা-সংস্কৃতি ও জ্ঞান-বিজ্ঞান থেকে কোনো জাতিকে দূরে ঠেলে দিলে সে জাতির মেরুদণ্ড এমনিতে ভেঙে যায়।
চলুন, আমরা আবার তাতারীদের আলোচনায় ফিরে যাই-
তাতারীরা বাগদাদের সুবিশাল পাঠাগার ধ্বংস করে দৃষ্টিনন্দন ও চোখজুড়ানো প্রাসাদগুলোর দিকে দৃষ্টি দেয়। অধিকাংশ প্রাসাদ জ্বালিয়ে দেয় এবং ভেঙে ফেলে। মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি করে। আর যেসব বস্তু তারা বহন করতে পারেনি, সেগুলো জ্বালিয়ে দেয়!! এভাবে একপর্যায় অধিকাংশ ঘর-বাড়ি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। ধ্বংসাবশেষ থেকে আগুনের লেলিহান শিখা ও ধোঁয়া উৎক্ষিপ্ত হতে থাকে। টানা চল্লিশদিন পর্যন্ত এই ধ্বংসযজ্ঞ চলতে থাকে। বাগদাদের প্রধান সড়কগুলো মৃতলাশে ভরে যায়। শহরময় লাশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাস্তাঘাট রক্তে রঞ্জিত লালবর্ণ ধারণ করে। গোটা শহর নীরব নিস্তব্ধ পড়ে থাকে। কেবল উন্মাদ তাতারীদের হাস্যধ্বনি কিংবা অবলা নারী-শিশুদের বুকফাটা আর্তনাদ শোনা যায়।
হালাকু খান লাশের দুর্গন্ধে মহামারি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করে। (কারণ, লক্ষ লক্ষ লাশ দাফনহীন রাস্তায় পচে-গলে গিয়েছিল।) তাই হালাকু সৈন্যবাহিনীকে মহামারির হাত থেকে বাঁচার জন্য নিম্নবর্তী পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ করে—
এক. তাতারী বাহিনী বাগদাদ থেকে বের হয়ে উত্তর ইরাকের অন্য শহরে আশ্রয় নেবে। বাগদাদের আশপাশে ছোট্ট একটি বাহিনী থাকবে, যেখানে মহামারি ছড়াবার আশঙ্কা নেই।
দুই. হালাকু খান বাগদাদে সাধারণ নিরাপত্তা ঘোষণা করে। সুতরাং এই চল্লিশদিন পর আর কোনো মুসলিমকে এলোপাতাড়িভাবে হত্যা করা হবে না। তাতারীরা এই নিরাপত্তা প্রদানের পর অবশিষ্ট আত্মগোপনকারী মুসলমানরা নিহত মুসলমানদের দাফন করার জন্য বের হয়ে আসে। কিন্তু এ-সংখ্যক লাশ দাফন করা বিরাট সময়সাপেক্ষ ছিল। যদি সময়মতো এই কাজ সম্পন্ন না হয়, তবে আবহাওয়া নষ্ট হয়ে যাবে। কেবল বাগদাদ নয়, বরং গোটা ইরাক ও সিরিয়া—এমনকি সর্বত্র দুরারোগ্য ব্যাধি তথা মহামারি ছড়িয়ে পড়বে। মুসলমান তাতারী—কেউ এই মহামারীর হাত থেকে রক্ষা পাবে না। তাই হালাকু খান মুসলমানদের মাধ্যমে লাশগুলো দাফন করাতে ইচ্ছা করল।
বাস্তবেই যারা খন্দক, কবর ও গোপন কূপে লুকিয়েছিল, তারা বের হয়ে আসেন। তাদের চেহারা, রঙ পরিবর্তন হয়ে গিয়েছিল, শরীর দুর্বল হয়ে পড়েছিল। এমনকি নিজেরাই নিজেদের চিনতে পারছিল না!!
সবাই পচা লাশের মাঝে ছড়িয়ে পরে আপনজনদের লাশ খুঁজতে শুরু করে। কেউ ছেলে, কেউ ভাই, কেউ বাবা আবার কেউ নিজের মাকে খুঁজতে থাকে!! মহা বিপদ!
মুসলমানরা লাশ দাফন করতে শুরু করে। কিন্তু হালাকু খান যে মহামারির আশঙ্কা করেছিল তা-ই ছড়িয়ে পড়ল। ফলে এই দুরারোগ্য মহামারিতে অসংখ্য মুসলমান মৃত্যুবরণ করল। ইবনে কাছীর রহ. এর ভাষায়—
'যারা طعن ]তআন: মার] থেকে রক্ষা পেয়েছিল, তারা طعون ]তউন: মহামারি] থেকে রক্ষা পায়নি।'
এটি ছিল বাগদাদের নতুন আরেক দুর্ঘটনা। লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ!
তিন. মুআইয়িদ উদ্দীন আলকামীকে তাতারীদের পক্ষ থেকে বাগদাদের গভর্নিং কাউন্সিলের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার যে সিদ্ধান্ত হালাকু খান প্রদান করেছিল, তা বাস্তবায়ন করা হলো। তবে মুআইয়িদ উদ্দীন কেবল বাহ্যিকভাবেই বাগদাদের শাসক নিযুক্ত হয়। প্রকৃত ক্ষমতা ও নেতৃত্ব মূলত তাতারীদেরই ছিল। এমনকি সে শাসক হওয়ার পর তাতারীদের কর্তৃত্ব বহুগুণে বেড়ে যায়। নবনিযুক্ত বাগদাদ-প্রধান লাঞ্ছনার শিকার হয়। তবে এই লাঞ্ছনা ও অপমান হালাকু খানের পক্ষ থেকে ছিল না। এসব ছিল তাতারী বাহিনীর পক্ষ থেকে। মুআইয়িদ উদ্দীন শাসক হয়েও তাতারীদের অনুসারী হয়ে বেঁচে থাকে। জনৈক মুসলিম মহিলা তাকে অশ্বারোহী অবস্থায় দেখতে পেল, তাতারী বাহিনী দ্রুত ঘোড়া চালানোর জন্য তাকে ধমক দিচ্ছে এবং ঘোড়াকে চাবুক মারছে। এটি অবশ্যই বাগদাদ শাসকের জন্য অতি লাঞ্ছনাকর। এদেখে মুসলিম মেধাবী মহিলা তাকে সম্বোধন করে বলল, 'বনু আব্বাস কি তোমার সঙ্গে এমন আচরণ করত?
মুসলিম মহিলা এই বক্তব্যের মাধ্যমে তার সম্বিত ফিরিয়ে দিল। তাকে ফিরে তাকাতে বাধ্য করল তার কৃতকর্মের প্রতি এবং তার গোত্রের প্রতি। বনু আব্বাসের শাসনামলে সে ছিল সম্মানের পাত্র। অন্যের চেয়ে সে অগ্রগামী ছিল। বাগদাদের সকলে তার কথা মান্য করত। এমনকি খলিফাতুল মুসলিমীন পর্যন্ত।
আর এখন! হায় হতভাগ্য! তাতারী বাহিনীর সাধারণ সদস্য, যাদের নাম পর্যন্ত কেউ জানে না, এমনকি হালাকু খানও যাদের চেনে না, তারাও তাকে লাঞ্ছিত করছে। হে বন্ধুরা, যারা নিজেদের দ্বীন, দেশ এবং নিজেকে বিক্রি করে দেয়, শত্রুদের কাছে তারা মূল্যহীন হয়ে পড়ে। এটাই পৃথিবীর নীতি। প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে শত্রুদের কাছে কারও কোনো মূল্য থাকে না। শত্রুদের উদ্দেশ্য হাসিল হয়ে গেলে আপনি তাদের কাছে মূল্যহীন। তাই সাবধান! শত্রুদের পক্ষাবলম্বন ভারি ভয়ংকর!
মুসলিম মহিলার এই কথাটি মুআইয়িদ উদ্দীনের মনে রেখাপাত করে। সে বিষণ্ণ অবস্থায় ঘরে ফিরে আসে। নীরবে ঘরে অবস্থান করে। দুশ্চিন্তা, পেরেশানি ও বিষণ্ণতা তাকে ঘিরে ফেলে। সে ভেবে দেখল, তাতারীদের আগমনে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সে তাদের অন্যতম। হতে পারে সে এখন বাগদাদের শাসক। কিন্তু সে ক্ষমতাহীন শাসক। সে একটি বিধ্বস্ত শহরের শাসক। সে মৃত ও অসুস্থদের শাসক!!
বিশ্বাসঘাতক মন্ত্রী মুআইয়িদ উদ্দীন এই নব লাঞ্ছনাকে সহ্য করতে পারছিল না। তাই শ্বাসরুদ্ধকর ও বেদনাকাতর কয়েকদিন পর সে নিজ ঘরে ইন্তেকাল করে।
তাতারীরা বাগদাদে অনুপ্রবেশের মাত্র কয়েক মাস পর সে ইন্তেকাল করে। এটি ৬৫৬ হিজরীর ঘটনা। সে তার শাসনক্ষমতা, বিশ্বাসঘাতকতা ও মিথ্যা রাজত্বের মাধ্যমে কোনোরূপ উপকৃত হতে পারে না। মুআইয়িদ উদ্দীন পরবর্তী সকল বিশ্বাসঘাতকদের জন্য শিক্ষণীয় হয়ে থাকে।
وَكَذَلِكَ أَخْذُ رَبِّكَ إِذَا أَخَذَ الْقُرَى وَهِيَ ظَالِمَةٌ إِنَّ أَخْذَهُ أَلِيمٌ شَدِيدٌ
“যে সকল জনপদ জুলুমে লিপ্ত হয়, তোমার প্রতিপালক যখন তাদের ধরেন, তখন তাঁর ধরা এমনই হয়ে থাকে। বাস্তবিকই তার ধরা অতি মর্মন্তুদ, অতি কঠিন।”৫০
তারপর তাতারীরা তার ছেলেকে বাগদাদের শাসক নিযুক্ত করে। ছেলে বাবার কাছ থেকে উত্তরাধিকারস্বরূপ বিশ্বাসঘাতকতা লাভ করেছিল। সুবহানাল্লাহ! যেন এই পদটি পরবর্তীদের জন্য অশুভ হয়েছে। এর অল্প কিছুদিন পরই সেও ইন্তেকাল করে। সে বাগদাদ পতনের বছর তথা ৬৫৬ হিজরীতেই ইন্তেকাল করে।
আশ্চর্যিত হবেন না!
যারাই দুনিয়াকে আঁকড়ে ধরেছে, দুনিয়া তাদের ধ্বংস করে ছেড়েছে। খলিফা দুনিয়াকে আঁকড়ে ধরেছিলেন, ফলে তিনি ধ্বংস হয়েছেন।
বিশ্বাসঘাতক মন্ত্রী দুনিয়াকে আঁকড়ে ধরেছিল, সেও ধ্বংস হয়েছে। মন্ত্রীর ছেলে দুনিয়া আঁকড়ে ধরেছিল, সেও ধ্বংস হয়েছে।
বাগদাদবাসী দুনিয়াকে আঁকড়ে ধরেছিল বিধায় তারা সবাই ধ্বংসের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কতইনা চমৎকার বলেছেন! ইমাম তিরমিযী রহ. হযরত আমর ইবনে আউফ রা. সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
فو الله ما الفقر أخشى علي كم، ولكني أخشى أن تبسط الدنيا عليكم كما بسطت على من قبلكم، فتنافسوها كما تنافسوها، فتهلككم كما أهلكتهم
"আল্লাহর শপথ! আমি তোমাদের জন্য দরিদ্রতার আশঙ্কা করি না। আমি আশঙ্কা করি দুনিয়া তোমাদের ওপর এমনভাবে ছেয়ে যাবে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ছেয়ে গিয়েছিল। ফলে পূর্ববর্তীদের মতো তোমরাও দুনিয়া নিয়ে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবে। ফলশ্রুতিতে পূর্ববর্তীদের ন্যায় দুনিয়া তোমাদের ধ্বংস করবে।”৫১
ইতিমধ্যে বাগদাদ পতনের সংবাদ সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।
তবে মুসলিমবিশ্বের জন্য বাগদাদ পতন ছিল চরম দুঃসংবাদ, যা সহ্য করা ছিল খুবই কঠিন। বাগদাদ কোনো সাধারণ শহর ছিল না। তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ শহর ছিল বাগদাদ। সেখানে তিন কোটিরও বেশিসংখ্যক মুসলমান বসবাস করত। তা ছিল তৎকালীন বিশ্বের শিক্ষা-সংস্কৃতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সভ্যতা ও আধুনিকতার প্রধান কেন্দ্র। তা ছিল ইসলামের প্রাচীন সুরক্ষিত সীমান্ত শহর। সবচেয়ে বড় কথা হলো, তা ছিল ইসলামী খেলাফতের রাজধানী।
বাগদাদ পতনের অর্থ কী?
বাগদাদ পতন কী অশুভ বার্তা প্রদান করে?
সবাই নিজেদের এই কঠিন প্রশ্নটি করত।
খলিফা নিহত হওয়া, অন্য কোনো খলিফা নির্ধারণ না হওয়া, কিসের সংবাদ প্রদান করে?
এটি আরেকটি কঠিন প্রশ্ন।
খেলাফত ও খলিফা ব্যতীত দুনিয়া মুসলমানদের কিছুই দেয়নি। আব্বাসী খেলাফতের শেষ বছরেও খেলাফত সাম্রাজ্য দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও কেবল বাগদাদ ও ইরাকের কিছু অংশের ওপর খেলাফত টিকে থাকা সত্ত্বেও খেলাফতই মুসলমানদের শক্তি ছিল। কারণ, খেলাফত মুসলমানদের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
যদি খেলাফত টিকে থাকে, নিভু নিভু হলেও অবশ্যই এমন সময় আসবে যখন খেলাফত স্বীয় মহিমায় জাগ্রত হবে, মুসলমানগণ খেলাফতের পতাকাতলে এসে একত্রিত হবে। পক্ষান্তরে খেলাফত টিকে না থাকলে মুসলমানদের একত্রিত হওয়া খুবই কঠিন; বরং অতি দুরূহ ব্যাপার।
খেলাফত টিকে না থাকা বড় বিপদ! খলিফা না থাকা মহা বিপদ! খলিফাশূন্য পৃথিবী!!
আমরা আল্লাহর দরবারে এই মুনাজাত করি, যেন তিনি মুসলমানদের খেলাফত আলা মিনহাজিন নবুওয়ার উপর টিকিয়ে রাখেন।
বাগদাদ পতনের পর মুসলমানদের মাঝে এক অদ্ভুত আকীদা ছড়িয়ে পড়ে। চতুর্দিকে একটি গুঞ্জরন ছড়িয়ে পড়ে। খুব দ্রুত এই ভ্রান্ত আকীদাটি ছড়িয়ে পড়ে। মানবস্বভাব হলো, অদ্ভুদ বস্তুর প্রতি তারা দ্রুত কান দেয়!
তাদের মাছে ছড়িয়ে পড়ে যে, তাতারী আগমন, মুসলমানদের পরাজয় ও বাগদাদ পতন হলো কেয়ামতের নিদর্শন এবং অতি শীঘ্রই তাতারীদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের সহযোগিতা ও নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য হযরত মাহদী আ. এর আবির্ভাব ঘটবে!!
আমি [লেখক] বলব, অবশ্যই কোনো একদিন হযরত মাহদী আ. এর আবির্ভাব ঘটবে। অবশ্যই একদিন হযরত ঈসা আ. এর শুভাগমন ঘটবে। একদিন অবশ্যই কেয়ামত প্রতিষ্ঠিত হবে। এ সবকিছুই এমন বিষয়, যা অবশ্যই সংঘটিত হবে, অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে। কিন্তু নির্দিষ্ট করে কি কেউ বলতে পারে যে, কখন এসব ঘটবে? কেউ তা জানে না।
يَسْأَلُكَ النَّاسُ عَنِ السَّاعَةِ ۖ قُلْ إِنَّمَا عِلْمُهَا عِنْدَ اللَّهِ ۚ وَمَا يُدْرِيكَ لَعَلَّ السَّاعَةَ تَكُونُ قَرِيبًا
“লোক তোমাকে কেয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে, বলে দাও, এর জ্ঞান কেবলই আল্লাহরই কাছে আছে। তোমার কী করে জানা থাকবে? হয়তো কেয়ামত নিকটেই এসে পড়েছে।”৫২
পরাজয় ও বিপদের মুহূর্তে এসব অবান্তর ভিত্তিহীন কথা ছড়ানোর কারণ কী? এর কারণ একটাই। তা হলো, মানুষ যখন পুরোপুরি ভেঙে পড়ে, তখন আল্লাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে সাহায্য কামনা করে। তখন মানুষের এই একীন হয়েছিল যে, হালাকু খান ও তার সৈন্যবাহিনীর বিরুদ্ধে মুসলমানদের লড়াই করার ক্ষমতা নেই। তাই তারা আরেকটি সমাধানের পথ (পরিত্রাণের পথ) অবলম্বন করে। তাই তারা হযরত মাহদী আ. এর আবির্ভাবের প্রত্যাশায় দিন কাটায়। তাঁর আগমনকালে তারাও তার সঙ্গে মিলে লড়াই করবে। এর পূর্বে লড়াই করার ক্ষমতা তাদের নেই।
কিছুক্ষণ পরই আমরা এ বিষয়ে পর্যালোচনা করব। আমরা অলৌকিক কিছু প্রত্যক্ষের জন্য অপেক্ষা করছি। অধঃপতন, হতাশা, নিরাশা; এর কোনোটিই মুমিনদের গুণাবলি নয়।
إِنَّهُ لَا يَيْأَسُ مِنْ رَوْحِ اللَّهِ إِلَّا الْقَوْمُ الْكَافِرُونَ
"তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হোয়ো না। নিশ্চিত জেনো, আল্লাহর রহমত থেকে কেবল তারাই নিরাশ হয়, যারা কাফের।”৫৩
কেউ যদি আপনাকে এই সংবাদ প্রদান করে যে, আপনি হযরত মাহদী আ. এর আবির্ভাবের সময় পর্যন্ত বেঁচে থাকবেন। তাহলে আপনার একথাও জেনে রাখা আবশ্যক যে, আল্লাহ তা'আলা আপনার আমল অনুযায়ী আপনাকে প্রতিদান দান করবেন। মাহদী আ. এর যুগে বেঁচে থাকলেই খাতেমা বিল খায়ের হবে না। কেউ যদি আপনাকে সংবাদ প্রেরণ করে যে, হযরত মাহদী আ. আগমন করেছেন, তাহলেই আপনি হযরত মাহদী আ. এর দলভুক্ত হতে পারবেনা। কারণ, তাঁর দলবলও মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীন কর্তৃক নির্বাচিত। এই নির্বাচন এলোপাতাড়ি কোনো নির্বাচন নয়। এই নির্বাচন হবে ঈমান ও আমল অনুযায়ী। আল্লাহ তা'আলা যেন আমাদের তার দ্বীনের কাজে ব্যবহার করেন।
এই ছিল বাগদাদ পতনের পর সামগ্রিক ইসলামী মননশীলতার অবক্ষয়।
তাহলে একটু ভেবে দেখুন, খ্রিস্টান বিশ্বের পতন কীরূপ ছিল?
মুসলিমবিশ্বের পতনে খ্রিস্টানবিশ্ব আনন্দে-উল্লাসে মেতে ওঠেছিল। এটি খুবই স্বাভাবিক ঘটনা ছিল। যেমনটি বক্ষ্যমাণ গ্রন্থের প্রারম্ভে বর্ণিত হয়েছে, হিজরী সপ্তম শতাব্দীতে প্রধান বিশ্ব পরাশক্তি তিন ভাগে বিভক্ত ছিল—
১. মুসলিম পরাশক্তি ২. খ্রিস্টান পরাশক্তি ৩. তাতারী পরাশক্তি।
মুসলমান ও খ্রিস্টানদের মধ্যকার যুদ্ধ দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছিল। অপর দিকে তাতার বাহিনী মুসলিম পরাশক্তির কারণে খুব ব্যথিত ছিল।
উপরন্ত সর্বশেষ আক্রমণে খ্রিস্টানরা তাতারীদের সহযোগিতা প্রদান করেছে বিধায় তারা যারপরনাই আনন্দিত ছিল। আর্মেনিয়া, জুজিয়া ও আন্তাকিয়া তাতারী অধ্যুষিত এলাকায় পরিণত হয়েছিল। তাদের আনন্দের আরেকটি বড় কারণ ছিল, তাতারীরা প্রথমবারের মতো তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছিল। কারণ তাতারীরা তাদের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছিল যে, বাগদাদে তারা তাদের কোনো কষ্ট দিবে না। তাতারীরা এই প্রতিশ্রুতি যথাযথভাবে রক্ষা করেছিল। এমনকি হালাকু খান খ্রিস্টানকুল নেতা মাকিকাকে উপহার উপঢৌকন দিয়ে ভাসিয়ে দিয়েছিল। দাজলা [টাইগ্রিস] নদীর তীরে তাকে আব্বাসী রাজপ্রাসাদের মধ্য থেকে একটি শাহী মহল প্রদান করেছিল। তাকে তার ব্যক্তিগত উপদেষ্টা ও গভর্নিং কাউন্সিলের সদস্য বানিয়েছিল।
হালাকু খানের এই সদাচরণের কারণে খ্রিস্টানরা উৎফুল্লচিত্তে বলেছিল, তাতারীরা আল্লাহর সৈন্য, যারা মাসীহের শত্রুদের প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য আবির্ভূত হয়েছে। মাসীহের শত্রু বলে তারা মুসলমানদের বুঝিয়েছে। অথচ কিছুদিন পূর্বে তাতারীরা ইউরোপ খ্রিস্টানদের হত্যা করেছে। বোঝা গেল, খ্রিস্টানদের উক্তি মিথ্যা ও অবান্তর। তাতারীরা যখন মুসলমানদের খুন করছিল, তখন খ্রিস্টানরা পুরোপুরি ভুলে গিয়েছিল, ইতিপূর্বে তাতারীরা তাদের সঙ্গে কী আচরণ করেছিল। যেমন বর্তমানে ইহুদীরা মুসলমানদের হত্যা করার সময় খ্রিস্টানরা ভুলে গিয়েছে, ইতিপূর্বে তাদের সঙ্গে ইহুদীরা কী করেছে?
মনে রাখবেন, সর্বদা ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে।
তাতারীদের সম্পর্কে খ্রিস্টানদের প্রশংসাবাণী এবং মুসলমানদের সম্পর্কে তাদের যে বিদ্বেষবাণী তা কথার কথা, মিথ্যা ও অবান্তর। এটা সেই বিদ্বেষ, যা স্পেনের গ্রানাডা পতনের পর সৃষ্টি হয়েছিল। সুবহানাল্লাহ! যে ব্যক্তি 'গ্রানাডার পতন' অধ্যয়ন করবে, সে ব্যক্তি গ্রানাডা পতন ও বাগদাদ পতনের মাঝে আশ্চর্য মিল খুঁজে পাবে, যা ইতিহাস অধ্যয়নের অধিক গুরুত্ব প্রদান করে। কারণ, ইতিহাস বারংবার পুনরাবৃত্ত হতে থাকে। কখনো কখনো মানুষ তা বুঝতে পারে না!!
টিকাঃ
৫০ সুরা হুদ: ১০২।
৫১ মুসলিম: ২৯৬৫, তিরমিযী: ২৪৬২।
৫২ সূরা আহযাব: ৬৩।
৫৩ সূরা ইউসুফ: ৮৭।