📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 হালাকু খানের পক্ষ থেকে কড়া আদেশাবলি

📄 হালাকু খানের পক্ষ থেকে কড়া আদেশাবলি


খলিফা বাগদাদবাসীকে নির্দেশ দেবেন, যেন তারা সকল অস্ত্র অর্পণ করে এবং কোনো প্রকার আন্দোলন বা প্রতিরোধ না করে। এটি একটি সহজ বিষয় ছিল। কারণ, বাগদাদবাসী অস্ত্রবহন করতে পারত না এবং তাতারীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার প্রতি তাদের কোনো আগ্রহ ছিল না।
খলিফাকে বন্দী করে বাগদাদ নিয়ে যাওয়া হবে। যেন তিনি তাতারীদেরকে আব্বাসীদের ধন-সম্পত্তির সন্ধান দেন। স্বর্ণ, রুপা, মূল্যবান আসবাবপত্র এবং রাজপ্রাসাদ ও বাইতুল মালের দামি জিনিসপত্রের সংবাদ দেন।
খলিফার চোখের সামনে তার দুই সন্তানকে হত্যা করা হবে। নির্দেশমতো তা-ই করা হয়। তার চোখের সামনে তার বড় ছেলে আহমদ আবুল আব্বাস ও মেঝো ছেলে আবদুর রহমান আবুল ফাজায়েলকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। আর তৃতীয় ছেলে মুবারক আবুল মানাকেবকে বন্দী করা হয়। অনুরূপ তিন কন্যা ফাতেমা, খাদিজা ও মারয়ামকেও বন্দী করা হয়।
বাগদাদ থেকে নির্দিষ্ট কতিপয় লোককে ডেকে আনা হয়। ইবনে আলকামী এদের নামের তালিকা হালাকু খানকে দিয়েছিলেন। তারা ছিল হাদীস বিশারদ। ভেতরে ভেতরে ইবনে আলকামী তাদের প্রচণ্ড ঘৃণা করত। বাস্তবেই তাদের সবাইকে ডেকে আনা হয়। তারা এক এক করে ঘর থেকে বের হয়। সঙ্গে তাদের সন্তান ও স্ত্রীরাও বের হয়। বাগদাদের বাইরে কবরস্থানের পাশে তাদের নিয়ে ছাগল জবাই করার মত জবাই করা হয়। আর তাদের স্ত্রী-সন্তানদের বন্দী কিংবা হত্যা করার জন্য গ্রেপ্তার করা হয়। আপনি যেভাবেই দেখুন না কেন, এটি ছিল হৃদয়বিদারক মর্মন্তুদ ঘটনা।
এই প্রক্রিয়ায় বিশ্বের অন্যতম আলেমে দ্বীন, দারুল খেলাফতের উস্তাদ শায়েখ মুহিউদ্দীন ইউসুফ ইবনে শায়েখ আবুল ফরজ ইবনে জাওযী রহ. এবং তার তিন সন্তান আবদুল্লাহ, আবদুর রহমান ও আবদুল করীমকেও জবাই করা হয়। মুজাহিদ উদ্দীন আইবেক ও তার সঙ্গী সুলাইমান শাহকে জবাই করা হয়, যে দুইজন বাগদাদে সর্বপ্রথম জিহাদের ডাক দিয়েছিলেন। জবাই করা হয় খলিফাতুল মুসলিমীনের উস্তাদ ও অভিভাবক সদর উদ্দীন আলী ইবনে নায়ার রহ. কে। এরপর মসজিদের খতিব, ইমাম ও হাফেজে কুরআনদের জবাই করা হয়!!
এসব কিছু খলিফার চোখের সামনে সংঘটিত হয়। খলিফা নিথর চোখে নির্মম জবাইযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করছিলেন। আমি জানি না, খলিফা ব্যথা, লজ্জা, লাঞ্ছনা ও ভয় কি গোপন করেছিলেন? নিঃসন্দেহে রাজ্য পরিচালনার রূপরেখা ভিন্ন হতো, যদি খলিফা জানতেন যে, শেষ পরিণাম এমন হবে। কিন্তু আল্লাহর অবধারিত নীতি—'অতীত কখনো ফিরে আসে না'। এরপর খলিফা দেখতে পান যে, হালাকু খান ইবনে আলকামীর সঙ্গে সহানুভূতিপূর্ণ আচরণ করছে। তাদের মাঝে গভীর বন্ধুত্ব। এতক্ষণে খলিফার সামনে এসব কিছুর রহস্য দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট হয়। অযোগ্যকে দায়িত্ব প্রদানের ফলাফল তিনি জানতে পারেন। কিন্তু বড্ড দেরি হয়ে যায়!!

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 বাগদাদ দখল

📄 বাগদাদ দখল


বাগদাদবাসী অস্ত্র অর্পণ করা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সুবিশাল জামাত নিহত হওয়া এবং হালাকু বাহিনী বাগদাদের রাস্তা-ঘাট সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ার পর হালাকু খান তার মূল টার্গেট বাস্তবায়ন শুরু করে। তা হলো, 'মুসলিম সাম্রাজ্যের রাজধানী বাগদাদ দখল।' বাগদাদ দখল অর্থ হলো, তাতারী বাহিনী বাগদাদে যা ইচ্ছা করতে থাকে। হত্যা, বন্দী, চুরি, অশ্লীল কর্ম, ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া ইত্যাদি। মোটকথা তাতারী বাহিনীর পক্ষে যা যা করা শোভনীয় তারা তা-ই করে!!
বর্বর তাতারী বাহিনীর কীটপতঙ্গ মুসলমানদের শরীরে অনুপ্রবেশ করে। সুবিশাল বাগদাদ নগরী তাতারীদের দখলে চলে যায়।
আল্লাহুম্মা লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ!
এই নগরী থেকে কত বাহিনী আল্লাহর পথে জিহাদ করার উদ্দেশ্যে বের হয়েছিল!!
কত শত উলামায়ে কেরাম দ্বীন শিক্ষা দেওয়ার জন্য এই নগরীতে দরসগাহ বানিয়েছিলেন!!
কত তালেবুল ইলম (ছাত্র) পৃথিবীর আনাচে-কানাচে থেকে ইলম অর্জনের উদ্দেশ্যে এই নগরীতে এসেছিলেন!!
আহ! হায় বাগদাদ! আজ তোমার জন্য কেউ বেঁচে নেই!
কোথায় খালেদ ইবনে ওয়ালিদ? কোথায় মুছান্না ইবনে হারেছা?
কোথায় কা'কা' ইবনে আমর? কোথায় নুমান ইবনে মুকরিন?
কোথায় সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস? কোথায় সে মানবতার বাহাদুরী?
কোথায় মুসলিম প্রজন্মের বিবেক-বুদ্ধি? কোথায় ইজ্জত-সম্মান ও আত্মমর্যাদাবোধ?
কোথায় জান্নাতাকাঙ্ক্ষী পবিত্র জামাত? কোথায় আল্লাহর পথের যোদ্ধারা?
কোথায় তারা, যারা নিজেদের ইজ্জত-সম্মান, স্ত্রী-সন্তান, ঘর-বাড়ি ও ধন-সম্পত্তি রক্ষায় লড়াই করে? কোথায়? কোথায়?! কেউ নেই!!
আজ বাগদাদ মৃত লাশের জন্য উন্মুক্ত। কোনো যুদ্ধ নেই, কোনো প্রতিবাদ নেই। বাগদাদে কোনো পুরুষ বেঁচে নেই। আছে কেবল পুরুষরূপী কিছু কাপুরুষ!! সুবিশাল বাগদাদ নগরী দখল হয়ে যায়।
ইমাম আবু হানীফার শহর, ইমাম শাফেয়ীর শহর, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের শহর আজ তাতারীদের দখলে। খলিফা মামুনুর রশিদের শহর আজ অন্যের দখলে, যিনি এক বছর হজ্ব করতেন, আরেক বছর জিহাদ করতেন।
দখল হলো রোমের অঞ্চল আমুরিয়ার বিজেতা খলিফা মু'তাসিম বিল্লাহর শহর।
পাঁচ যুগ পূর্বেকার ইসলামের প্রাণকেন্দ্র (রাজধানী) আজ বিজাতিদের দখলে!! তাতারীরা বাগদাদ নগরীতে এমন কাজ করেছে, যা কল্পনাও করা সম্ভব নয়।
তাতারীরা ঘরে ঘরে, বাগানে বাগানে, রাস্তা-ঘাটে, শহর-বন্দরে, মসজিদে মসজিদে মুসলমানদের খুঁজতে থাকে। মুসলমানদের ব্যাপকভাবে হত্যা করতে থাকে। লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ! মুসলমানরা পালাতে থাকে। ঘরের দরজা বন্ধ করে দরজা ধাক্কা দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তাতারীরা দরজায় আগুন লাগিয়ে দেয় কিংবা দরজা ভেঙে ফেলে। এরপর ঘরে প্রবেশ করে। মুসলমানরা ভয়ে দৌড়ে বাড়ির ছাদে আশ্রয় নেয়। তাতারীরা পিছে পিছে ছাদে ওঠে। এরপর সেখানেই মুসলমানদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। মুসলমানদের রক্তে শহরের ড্রেন-নালা ভেসে যায়।
তাতারীরা শক্তিশালী পুরুষদের হত্যা করেই ক্ষান্ত থাকে নি, বরং বৃদ্ধ ও অচলদেরও হত্যা করেছে। তারা মহিলাদেরও হত্যা করেছে। তবে কোনো মহিলাকে তাদের ভালো লাগলে বন্দী করে নিয়ে যেত। তাদের হত্যাকাণ্ড থেকে ছোটরাও রেহায় পায়নি-এমনকি দুগ্ধপোষ্য শিশুও। মোটকথা নারী-পুরুষ ও শিশু-বৃদ্ধ কারো প্রতিই এই পশুরা কোনো দয়া করে নি। যাকে পেয়েছে তাকেই খুন করেছে; পেট ফেড়ে গর্ভের সন্তান পর্যন্ত।
একদল তাতারী চল্লিশজন ছোট্ট শিশুকে রাস্তার কিনারা পড়ে থাকে দেখে। তাদের মায়েদের খুন করা হয়েছিল। এই পশুরা তাদেরও হত্যা করে!! তাদের অন্তর ছিল পাথরের মতো। না, পাথরের চেয়েও কঠোর!!
নিহতের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। এক, দুই, তিন এভাবে দশদিন অতিবাহিত হলো। খুন, হত্যা বন্ধ হচ্ছিল না। অবিরাম ধ্বংসযজ্ঞ চলছিল। কিন্তু কোনো প্রতিরোধ কিংবা প্রতিবাদ নেই। মানুষের অন্তরে একথা বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিল যে, তাতারীরা অপরাজেয়। তাদের পরাজিত করা সম্ভব নয়। তাদেরকে আঘাত করা সম্ভব নয়। হয়তো তারা কখনো মারা যাবে না।
এসব কিছু খলিফার উপস্থিতিতে সংঘটিত হচ্ছিল। খলিফা স্বচক্ষে এ আজাব প্রত্যক্ষ করছিলেন।
আপনি একটু ভেবে দেখুন, খলিফার উপস্থিতিতে এসব ঘটনা ঘটছে?!
একটু ভেবে দেখুন, খলিফা ইবনুল খুলাফা (খলিফার সন্তান খলিফা) আযীম ইবনুল উজামা (বাদশার ছেলে বাদশা) বন্দী অবস্থায় এসব মর্মন্তুদ ঘটনা প্রত্যক্ষ করছিলেন!!
১. তার দুই সন্তানকে খুন করা হয়েছে।
২. তৃতীয় সন্তানকে বন্দী করা হয়েছে।
৩. তিন মেয়েকে বন্দী করা হয়েছে।
৪. রাজসভার মন্ত্রীদের হত্যা করা হয়েছে।
৫. শহরের সকল উলামায়ে কেরাম, খতিব ও হাফেজে কুরআনদের খুন করা হয়েছে।
৬. সবচেয়ে নিকটবর্তী মানুষ মুআইয়িদ উদ্দীন আলকামীর বিশ্বাসঘাতকতা প্রকাশ পেয়েছে।
৭. তার সৈন্যবাহিনীকে ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে।
৮. তার ধন-সম্পত্তি, অর্থ-সম্পদ সবকিছু ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। শহর দখল হয়েছে।
৯. চোখের সামনে লক্ষ লক্ষ শহরবাসীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে।
১০. আব্বাসী সাম্রাজ্যের রাজধানী জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিল্ডিং-প্রাসাদ বিধ্বস্ত করা হয়েছে।
১১. তাতারীরা নির্মম, নিষ্ঠুর, অকৃতজ্ঞ, কালো চেহারা নিয়ে গোটা বাগদাদে ছড়িয়ে পড়েছে। শস্যখেতে পঙ্গপাল ছড়িয়ে পড়ে শস্যখেত যেমন ধ্বংস করে ফেলে অনুরূপ তারা বাগদাদে ছড়িয়ে পড়ে বাগদাদকে ধ্বংস করে ছেড়েছে।
১২. শিকল পরানো হয়েছে তার গর্দানে, হাতে ও পায়ে এবং উটকে যেভাবে হাঁকিয়ে নেওয়া হয় তাকেও সেভাবে টেনে-হেঁচড়ে হাঁকিয়ে নেওয়া হয়েছে। এসব কিছু খলিফা নিজ চোখে প্রত্যক্ষ করছিলেন। আফসোস আর আক্ষেপের কোনো অন্ত ছিল না। নিঃসন্দেহে তিনি বার বার বলেছিলেন—
يَا لَيْتَنِي مِتُّ قَبْلَ هَذَا وَكُنْتُ نَسْيًا مَنْسِيًّا
“হায়! আমি যদি এর আগেই মারা যেতাম এবং সম্পূর্ণ বিস্মৃত বিলুপ্ত হয়ে যেতাম।”৪৬
নিঃসন্দেহে তিনি অনুতপ্ত হয়ে বলেছিলেন—
مَا أَغْنَى عَنِّي مَالِيَهُ هَلَكَ عَنِّي سُلْطَانِيَهُ
“আমার অর্থ-সম্পদ আমার কোনো কাজে আসল না। আমার থেকে আমার সব ক্ষমতা লুপ্ত হয়ে গেল।”৪৭
নিঃসন্দেহে তিনি মনে মনে বলেছিলেন এবং তার অবস্থাও একথার সাক্ষ্য দিচ্ছিল—
رَبِّ ارْجِعُونِ لَعَلِّي أَعْمَلُ صَالِحًا فِيمَا تَرَكْتُ
“হে আমার প্রতিপালক, আমাকে পুনরায় প্রেরণ করো। যাতে আমি সৎকর্ম করতে পারি, যা আমি পূর্বে করিনি।”৪৮
হায়! যদি আমি সৈন্যবাহিনীকে প্রস্তুত করতাম। তাদের শক্তিশালী বানাতাম!!
হায়! দ্বীনের শত্রুরা চারদিক থেকে যখন দ্বীনকে ঘিরে ফেলেছিল, তখন যদি আমি এ জাতিকে জিহাদের জন্য উদ্বুদ্ধ করতাম!!
হায়! যদি আমি মানুষের সামনে; বরং অন্তরে ইসলামকে সমুন্নত করতাম এবং ইসলাম তাদের জান-মালের চেয়ে তাদের কাছে অধিক মূল্যবান হতো!!
হায়! যদি আমি খেল-তামাশা, রঙ্গমঞ্চ ছেড়ে দিতাম!!
হায়! যদি আমি সম্পদ সঞ্চয়ের জন্য বেঁচে না থাকতাম!!
হায়! যদি আমি প্রচুর বাঁদি না রাখতাম।
হায়! যদি আমি গানবাদ্য না শুনতাম।
হায়! যদি আমি উত্তম সঙ্গী নির্বাচন করতাম!!
হায়! যদি আমি উলামায়ে কেরামকে সম্মান করতাম, শত্রুদের বর্জন করতাম!!
হায়! আফসোস! হায়! আফসোস! হায়! আক্ষেপ!!
কিন্তু শিকলাবদ্ধ গর্দান, হাত, পা তাকে বাস্তবতার মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়েছে। তিনি যেন একথা জানতে পারেন যে, অতীত কখনো ফিরে আসে না। সময় কখনো পেছনের দিকে ফিরে যায় না!
ইমাম আবু দাউদ ও আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. এর সূত্রে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
إذا تبايعتم بالعين، وأخذتم أذناب البقر ، ورضيتم بالزرع، وتركتم الجهاد، سلط الله عليكم ذلاً، لا يترعه حتى ترجعوا إلى دينكم.
“তোমরা যখন সুদি লেনদেন করবে, গরুর লেজ ধরবে (চতুষ্পদ জন্তু লালন করবে) চাষাবাদে সন্তুষ্ট থাকবে (অর্থাৎ জিহাদের সময় দুনিয়ার কাজে ব্যস্ত থাকবে) এবং জিহাদ ছেড়ে দেবে, তখন আল্লাহ রব্বুল আলামীন তোমাদের ওপর লাঞ্ছনা চাপিয়ে দিবেন। যতক্ষণ তোমরা দ্বীনের দিকে ফিরে না আসবে, ততক্ষণ আল্লাহ এই লাঞ্ছনা দূর করবেন না।” ৪৯
বাগদাদবাসী কৃষিকাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য, রচনা-সংকলন এবং বিভিন্ন শিল্পকর্ম ইত্যাদি পেশায় জড়িত ছিল। এমনকি ইলম অর্জন ও বিতরণও তাদের পেশা ছিল। কিন্তু তারা জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ বর্জন করেছিল। ফলে এর ফলাফল ছিল লাঞ্ছনা আর অপমান। যা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি।
এটি প্রত্যেক মুসলমান নর-নারী, শাসক-শাসিত, ছাত্র-উস্তাদ, ছোট-বড় সকলের জন্য মূল্যবান শিক্ষণীয় বিষয়।
-সত্য প্রতিষ্ঠা ও হক আদায়ের জন্য শক্তি প্রয়োজন।'
-অধিকার সহজলভ্য নয়; অধিকার আদায় করতে হয়। অধিকার আদায়ের পথে মূল্য ব্যয় করতে হয়।
-যারাই জিহাদ ছেড়ে দিয়েছে, তারাই লাঞ্ছিত হয়েছে।
-মুসলমানদের শত্রুরা কখনো প্রতিশ্রুতি পূরণ করে না।

টিকাঃ
৪৬ সুরা মারইয়াম: ২৩।
৪৭ সুরা হাক্কাহ: ২৭-২৮।
৪৮ সুরা মুমিনুন: ৯৯-১০০।
৪৯ আবু দাউদ : ৩৪৬২।

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 পদাঘাতে মৃত্যু

📄 পদাঘাতে মৃত্যু


এবার খলিফাকে হত্যা করার পালা। হালাকু খান অসহায় খলিফাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। এমন সময় হালাকু খানের কতিপয় সহযোগী তাকে এক অদ্ভুত পরামর্শ প্রদান করে। তারা তাঁকে বলে, যদি মুসলিম খলিফার রক্ত মাটিতে প্রবাহিত হয়, তবে পরবর্তীতে মুসলমানরা বদলা নিতে চাবে; দীর্ঘদিন পরে হলেও। তাই খলিফাকে এমন পন্থায় হত্যা করা হোক, যাতে রক্ত মাটিতে প্রবাহিত না হয়। তলোয়ার ব্যবহারের কোনো প্রয়োজন নেই।
এটি এক ধরনের প্রতারণা। কারণ, মুসলমানরা শুধু খলিফা হত্যার নয়; বরং হালাকু খান ও তার বাহিনী যত মুসলমানকে হত্যা করেছে, তাদের প্রতিশোধ অবশ্যই গ্রহণ করবে। চাই যে পন্থায়ই তাদের হত্যা করা হোক। তবুও হালাকু খান তাদের কথায় কান দিল। সুবহানাল্লাহ! যেন আল্লাহর অভিপ্রায় এমনই ছিল। খলিফা এমন লাঞ্ছনাকর পন্থায় নিহত হলেন, পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো খলিফা এভাবে মৃত্যুবরণ করেননি। মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে পৃথিবীর কোনো রাজা-বাদশার ব্যাপারে এমন লাঞ্ছনাকর ঘটনা শোনা যায়নি।
হালাকু খান খলিফাকে ‘পদাঘাতে খুন’ করার নির্দেশ দিল!! কার্যত খলিফাকে মাটিতে শোয়ানো হয়। আর তাতারী বাহিনী খলিফাকে লাথি মারতে শুরু করে।
পদাঘাত খলিফাকে মৃত্যুর কোলে পৌঁছে দেয়!! আহ! কী ব্যথা! আহ! কী লাঞ্ছনা! আহ কী অপমান অপদস্থতা! শরীর থেকে রুহ পৃথক হওয়া পর্যন্ত তারা তাকে লাথি মারতে থাকে। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
শুধু বাগদাদের পতন ঘটেনি!! বাগদাদে আব্বাস গোত্রের সর্বশেষ খলিফারও পতন ঘটে। সাথে সাথে গোটা বাগদাদবাসীর পতন হলো।
এটি ছিল ১৪ই সফর ৬৫৬ হিজরী তথা তাতারীদের বাগদাদ প্রবেশের দশম দিন।
খলিফা হত্যার পরও হত্যাকাণ্ড শেষ হয়নি। হালাকু খান (তার ওপর আল্লাহর অভিশাপ নাজিল হোক) লাগাতার হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। বাগদাদ ছিল তৎকালীন বিশ্বের সর্ববৃহৎ শহর। তাই তাতারীরা এই শহরটিকে পরবর্তীদের জন্য ‘শিক্ষণীয় শহর’ বানাতে চাইল।
বাগদাদ পতনের পর আরও চল্লিশদিন অবিরাম হত্যাকাণ্ড চলল। একটু ভেবে দেখুন! বাগদাদে নিহতের সংখ্যা কত হতে পারে?! পুরুষ, মহিলা, শিশু, বৃদ্ধ নির্বিশেষে লক্ষ লক্ষ মুসলমান নির্মম হত্যা করা হয়। মাত্র চল্লিশ দিনে লক্ষ লক্ষ মুসলমান খুন হয়!! মাত্র চল্লিশদিনের মাঝে বাগদাদ লক্ষ লক্ষ অধিবাসী হারিয়েছে। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক ভয়াবহ ঘটনা।
একথা এজন্য উল্লেখ করছি যে, বর্তমানে মুসলমানগণ যেসব বিপদাপদ ও বালা-মসিবতের সম্মুখীন হয়, তা যত কঠিনই হোক না কেন তা পূর্ববর্তীদের বিপদ তুলনায় খুবই হালকা। আপনি দেখবেন, আল্লাহর ইচ্ছায় মুসলমানরা আবার ঘুরে দাঁড়াবে। এ থেকে বোঝা যায়, আল্লাহর ইচ্ছায় কোমর ভেঙে গেলেও আমরা আবার কোমর সোজা করে দাঁড়াতে পারি। বাগদাদে কেবল খ্রিস্টানরাই খুনের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিল!!

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 পাপিষ্ঠ তাতারী বাহিনীর জঘন্য অভিপ্রায়

📄 পাপিষ্ঠ তাতারী বাহিনীর জঘন্য অভিপ্রায়


সংখ্যাগরিষ্ঠ তাতারী যখন মুসলিম-নিধনে ব্যস্ত, নির্মম হত্যাকাণ্ডে লিপ্ত, তখন একদল তাতারী ভিন্ন অপরাধকর্মে জড়িয়ে পড়ে। তারা এই অপরাধের মাধ্যমে মুসলিম জাতির অপূরণীয় ক্ষতিসাধন করেছে, যা কোনো দিন পূরণ হওয়ার নয়। মুসলমানদের সভ্যতা-সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চা দেখে তাতারীদের গা জ্বলে যাচ্ছিল। তারা দেখল সভ্যতা ও সংস্কৃতির দিক থেকে মুসলমানরা তাদের চেয়ে বহুধাপ এগিয়ে। কারণ, মুসলমানদের জ্ঞানচর্চা, শিক্ষা-দীক্ষার রয়েছে সুদীর্ঘ ইতিহাস। মুসলমানদের মাঝে জাগতিক ও পারলৌকিক বিভিন্ন শাস্ত্রে প্রায় দশ হাজার আলেম গুণীজন রয়েছেন। এ সকল বিজ্ঞ পণ্ডিতগণ হাজার হাজার কিতাবাদি রচনার মাধ্যমে ইসলামী সভ্যতার বিশ্বময় বিস্তার ঘটিয়েছেন। অথচ তাতারীদের নেই কোনো সভ্যতা, না আছে কোনো সংস্কৃতি। তাদের মূল ভিত্তি বলতে কিছুই নেই। তারা তো হঠাৎ গজে ওঠা পরগাছা। যারা চীনের উত্তর মরুভূমিতে বেড়ে উঠেছে। তারা তো জংলি সভ্যতায় লালিত হয়েছে। তাই তো তারা জীবজন্তুর মতো লড়াই করে। এমনকি তারা জীবজন্তুর মতোই জীবনযাপন করে। এই পৃথিবীকে আবাদ করা কিংবা পৃথিবীর কল্যাণসাধনের কোনো ইচ্ছা তাদের নেই। তাদের বেঁচে থাকার মূল উদ্দেশ্য হলো জ্বালাও, পোড়াও, ধ্বংসযজ্ঞ ও হত্যাকাণ্ড। তাদের মাঝে ও উম্মতে মুসলিমার মাঝে বিস্তর ব্যবধান। এমনকি পৃথিবীর অন্য যেকোনো জাতি থেকে তারা বহুগুণ পিছিয়ে।
বাগদাদের ইতিহাসে যে ধ্বংসলীলা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি, তা পৃথিবীর ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা মুশকিল নয়; বরং অসম্ভব।
এই মানবরূপী পশুরা যেই জঘন্য অপরাধের ইচ্ছা করেছিল, তা হলো, বাগদাদের সুবিশাল গণপাঠাগারকে ধ্বংস করা। তা ছিল তৎকালীন বিশ্বের সর্ববৃহৎ পাঠাগার। এই পাঠাগারটি ছয়শো বছর যাবৎ মুসলমানদের চিন্তা-চেতনার নির্যাস বহন করত। সকল বিষয়ের সকল শাস্ত্রের সব কিতাবাদি এই পাঠাগারে সংগ্রহ করা হয়েছিল—শরয়ী জ্ঞানশাস্ত্র যেমন: তাফসীর, হাদীস, ফেকাহ, আকীদা, আখলাক ইত্যাদি, সাধারণবিদ্যা যেমন: চিকিৎসাশাস্ত্র, জ্যোতির্বিদ্যা, প্রকৌশলবিদ্যা, রসায়নবিদ্যা, পদার্থবিদ্যা, ভূগোল ইত্যাদি শাস্ত্রের বহু মূল্যবান বইপত্র এই পাঠাগারে সংরক্ষিত ছিল। তা ছাড়া অসংখ্য কবিতার কবিতাগুচ্ছ এবং দশ হাজারের মতো গল্প ও গদ্য সংগৃহিত ছিল। উল্লেখিত শাস্ত্রের যাবতীয় বইপত্রের সঙ্গে যদি আপনি গ্রিক, ফার্সি, হিন্দি বিভিন্ন ভাষায় রচিত কিতাবাদির অনুবাদগ্রন্থগুলোকেও মিলান, তাহলে সত্যিই আপনি তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম অলৌকিক বিষয় বলে এই পাঠাগারকে মূল্যায়ন করবেন।
যেকোনো দিক থেকে তুলনা করুন না কেন, বাগদাদ-পাঠাগার ছিল সুবিশাল বিশ্ববিখ্যাত পাঠাগার। স্পেনের কর্ডোভার পাঠাগারই একমাত্র পাঠাগার, যেটি বাগদাদের পাঠাগারের কিছুটা সাদৃশ্য রাখত। সুবহানাল্লাহ! বাগদাদের পাঠাগারের ওপর দিয়ে যে মহাপ্রলয় বয়ে গেছে, তা কার্ডোভার পাঠাগারের ওপর দিয়ে বয়ে গিয়েছিল।
স্পেনের খ্রিস্টানদের হাতে ৬৩৬ হিজরীতে বাগদাদ পতনের বিশ বছর পূর্বে যখন কর্ডোভার পতন ঘটে, তখন তারা কর্ডোভার সম্পূর্ণ পাঠাগার জ্বালিয়ে দেয়। কামবিস নামক জনৈক হতভাগা খ্রিস্টান এই কাজ সম্পন্ন করে। হাজার হাজার মানুষ সারাজীবন ব্যয় করে যেসব বইপত্র কিতাবাদি রচনা করেছিল, যেসব বইপত্র-কিতাবাদি রচনা করতে গিয়ে প্রচুর ধন-সম্পত্তি, পরিশ্রম-মুজাহাদা ব্যয় হয়, সে মুহূর্তে সেসব বইপত্র-কিতাবাদি জ্বালিয়ে দেয়!! হায় এই তো হলো খ্রিস্টান ও তাতারীদের স্বভাব-চরিত্র।
তাতারীদের যুদ্ধ সভ্যতার বিরুদ্ধে, শহরের বিরুদ্ধে, ইসলামের বিরুদ্ধে; এমনকি সুস্থ মানবতার বিরুদ্ধে।
তাতারীরা বাগদাদের পাঠাগারকে কীভাবে ধ্বংস করেছিল, তা আলোচনা করার পূর্বে আসুন আমরা বাগদাদের পাঠাগার সম্পর্কে সামান্য আলোকপাত করি-

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00