📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 সর্বশেষ পর্যালোচনা

📄 সর্বশেষ পর্যালোচনা


তাতারী বাহিনী ৬৫৬ হিজরীর ১ লা সফর থেকে চারদিন ৪ই সফর পর্যন্ত গোলাবর্ষণ করতে থাকে। ৪ই সফরে পশ্চিমের প্রাচীর ভাঙতে শুরু করে। প্রাচীর ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে খলিফাও সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়েন।
জীবনের মাত্র কয়েকটি মুহূর্ত অবশিষ্ট ছিল।
এমন দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তে খলিফা তার বিশ্বাসঘাতক বন্ধু মুআইয়িদ উদ্দীন আলকামীর শরণাপন্ন হন। এহেন পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞাসা করেন। সে তাকে সশরীরে হালাকু খানের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেয়, যাতে সংলাপের দ্বার উন্মুক্ত হয়।
দূত হালাকু খানের কাছে গিয়ে খলিফার আগমন সম্পর্কে সংবাদ দেয়। হালাকু খান খলিফাকে আসার নির্দেশ দেয়। কিন্তু একাকী নয়; বরং তার সাম্রাজ্যের বিশিষ্ট উপদেষ্টাবৃন্দ ও বিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ, মন্ত্রী পরিষদ, ফুকাহা, উলামা ও সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গসহ আসার নির্দেশ দেয়। নির্দেশমতো তারা সবাই হালাকু খানের তাঁবুতে উপস্থিত হন। হালাকু খানের কথামতো সবার উপস্থিতিতে সংলাপ সংঘটিত হবে।
খলিফার সম্মুখে কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না। খলিফা জাতির শ্রেষ্ঠজ্ঞানীদের একত্রিত করেছেন এবং নিজে সশরীরে বাগদাদের প্রাচীর থেকে বের হয়ে হালাকু খানের তাঁবুতে উপস্থিত হয়েছেন। খলিফার দু-চোখ বেয়ে অশ্রু প্রবাহিত হচ্ছিল, ধমনিতে রক্ত জমাট বেঁধেছিল, হৃদয়ের স্পন্দন থেমে গিয়েছিল, দীর্ঘশ্বাস বের হচ্ছিল।
খলিফা অপমানিত অপদস্থ হয়ে বের হয়েছেন। তিনি তো সেই খলিফাতুল মুসলিমীন, যাকে তার রাজপ্রাসাদে দেশ-বিদেশের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা সংবর্ধনা জানায়। যার পূর্বপুরুষরা এই প্রাসাদ থেকে সারা পৃথিবী শাসন করতেন। যে প্রাসাদ থেকে আজ তিনি অপমানিত হয়ে বের হয়েছেন।
খলিফার সঙ্গে প্রায় সাতশোজন বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের এক মহতি জামাত ছিল। এতে মন্ত্রী মুআইয়িদ উদ্দীন আলকামীও ছিল। দলটি হালাকু খানের তাঁবুর নিকটবর্তী হলে একদল তাতারী পাহারাদার তাদের বাধা প্রদান করে। তারা কাউকে হালাকু খানের তাঁবুতে প্রবেশের অনুমতি দেয় না; বরং তারা বলে, খলিফার সঙ্গে মাত্র সতেরোজন প্রবেশ করবে। পাহারাদারদের ভাষ্যমতে অবশিষ্টদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। খলিফা সতেরো জনকে নিয়ে প্রবেশ করেন। অবশিষ্টদের কোনো কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় না; বরং সকলকে হত্যা করার জন্য বন্দী করা হয়!!
খলিফা ও তার সঙ্গীরা ছাড়া সবাইকে হত্যা করা হয়। নিহত হয় জাতির নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ, মন্ত্রী পরিষদ, জ্ঞানীগুণীরা, বিশিষ্ট ফুকাহায়ে কেরাম ও উলামায়ে কেরাম।
খলিফাকে হত্যা করা হয়নি। কারণ, হালাকু খান তার মাধ্যমে কিছু স্বার্থ উদ্ধার করার ইচ্ছা করেছিল।
হালাকু খান গর্বভরে অহংকারবশত বিষয়গুলো প্রকাশ করতে থাকে।
খলিফা বুঝতে পারেন, দলের সবাইকে হত্যা করা হয়েছে। এতদিনে খলিফার কাছে তাতারীদের স্বভাব প্রকাশ পায়। তিনি বুঝতে পারেন, তাতারীদের কোনো প্রতিশ্রুতি নেই, তাদের নিরাপত্তা প্রদান মূলত বিপদের কারণ।
لَا يَرْقُبُونَ فِي مُؤْمِنٍ إِلَّا وَلَا ذِمَّةً
"তারা কোনো মুমিনের সঙ্গে আত্মীয়তা ও অঙ্গীকারের মর্যাদা রক্ষা করে না।”৪৫
খলিফা একথাও বুঝতে পেরেছিলেন যে, অধিকার রক্ষার জন্য এমন শক্তি সঞ্চয় করা উচিত, যা অধিকারকে সুরক্ষিত রাখবে। সুতরাং যদি আপনি শক্তি সঞ্চয় না করার কারণে অধিকার খর্ব হয়, তবে নিজেকেই ধিক্কার দিন। কিন্তু আফসোস! খলিফা অনেক পরে তা বুঝতে পেরেছেন।

টিকাঃ
৪৫ সুরা তাওবা: ১০।

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 হালাকু খানের পক্ষ থেকে কড়া আদেশাবলি

📄 হালাকু খানের পক্ষ থেকে কড়া আদেশাবলি


খলিফা বাগদাদবাসীকে নির্দেশ দেবেন, যেন তারা সকল অস্ত্র অর্পণ করে এবং কোনো প্রকার আন্দোলন বা প্রতিরোধ না করে। এটি একটি সহজ বিষয় ছিল। কারণ, বাগদাদবাসী অস্ত্রবহন করতে পারত না এবং তাতারীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার প্রতি তাদের কোনো আগ্রহ ছিল না।
খলিফাকে বন্দী করে বাগদাদ নিয়ে যাওয়া হবে। যেন তিনি তাতারীদেরকে আব্বাসীদের ধন-সম্পত্তির সন্ধান দেন। স্বর্ণ, রুপা, মূল্যবান আসবাবপত্র এবং রাজপ্রাসাদ ও বাইতুল মালের দামি জিনিসপত্রের সংবাদ দেন।
খলিফার চোখের সামনে তার দুই সন্তানকে হত্যা করা হবে। নির্দেশমতো তা-ই করা হয়। তার চোখের সামনে তার বড় ছেলে আহমদ আবুল আব্বাস ও মেঝো ছেলে আবদুর রহমান আবুল ফাজায়েলকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। আর তৃতীয় ছেলে মুবারক আবুল মানাকেবকে বন্দী করা হয়। অনুরূপ তিন কন্যা ফাতেমা, খাদিজা ও মারয়ামকেও বন্দী করা হয়।
বাগদাদ থেকে নির্দিষ্ট কতিপয় লোককে ডেকে আনা হয়। ইবনে আলকামী এদের নামের তালিকা হালাকু খানকে দিয়েছিলেন। তারা ছিল হাদীস বিশারদ। ভেতরে ভেতরে ইবনে আলকামী তাদের প্রচণ্ড ঘৃণা করত। বাস্তবেই তাদের সবাইকে ডেকে আনা হয়। তারা এক এক করে ঘর থেকে বের হয়। সঙ্গে তাদের সন্তান ও স্ত্রীরাও বের হয়। বাগদাদের বাইরে কবরস্থানের পাশে তাদের নিয়ে ছাগল জবাই করার মত জবাই করা হয়। আর তাদের স্ত্রী-সন্তানদের বন্দী কিংবা হত্যা করার জন্য গ্রেপ্তার করা হয়। আপনি যেভাবেই দেখুন না কেন, এটি ছিল হৃদয়বিদারক মর্মন্তুদ ঘটনা।
এই প্রক্রিয়ায় বিশ্বের অন্যতম আলেমে দ্বীন, দারুল খেলাফতের উস্তাদ শায়েখ মুহিউদ্দীন ইউসুফ ইবনে শায়েখ আবুল ফরজ ইবনে জাওযী রহ. এবং তার তিন সন্তান আবদুল্লাহ, আবদুর রহমান ও আবদুল করীমকেও জবাই করা হয়। মুজাহিদ উদ্দীন আইবেক ও তার সঙ্গী সুলাইমান শাহকে জবাই করা হয়, যে দুইজন বাগদাদে সর্বপ্রথম জিহাদের ডাক দিয়েছিলেন। জবাই করা হয় খলিফাতুল মুসলিমীনের উস্তাদ ও অভিভাবক সদর উদ্দীন আলী ইবনে নায়ার রহ. কে। এরপর মসজিদের খতিব, ইমাম ও হাফেজে কুরআনদের জবাই করা হয়!!
এসব কিছু খলিফার চোখের সামনে সংঘটিত হয়। খলিফা নিথর চোখে নির্মম জবাইযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করছিলেন। আমি জানি না, খলিফা ব্যথা, লজ্জা, লাঞ্ছনা ও ভয় কি গোপন করেছিলেন? নিঃসন্দেহে রাজ্য পরিচালনার রূপরেখা ভিন্ন হতো, যদি খলিফা জানতেন যে, শেষ পরিণাম এমন হবে। কিন্তু আল্লাহর অবধারিত নীতি—'অতীত কখনো ফিরে আসে না'। এরপর খলিফা দেখতে পান যে, হালাকু খান ইবনে আলকামীর সঙ্গে সহানুভূতিপূর্ণ আচরণ করছে। তাদের মাঝে গভীর বন্ধুত্ব। এতক্ষণে খলিফার সামনে এসব কিছুর রহস্য দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট হয়। অযোগ্যকে দায়িত্ব প্রদানের ফলাফল তিনি জানতে পারেন। কিন্তু বড্ড দেরি হয়ে যায়!!

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 বাগদাদ দখল

📄 বাগদাদ দখল


বাগদাদবাসী অস্ত্র অর্পণ করা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সুবিশাল জামাত নিহত হওয়া এবং হালাকু বাহিনী বাগদাদের রাস্তা-ঘাট সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ার পর হালাকু খান তার মূল টার্গেট বাস্তবায়ন শুরু করে। তা হলো, 'মুসলিম সাম্রাজ্যের রাজধানী বাগদাদ দখল।' বাগদাদ দখল অর্থ হলো, তাতারী বাহিনী বাগদাদে যা ইচ্ছা করতে থাকে। হত্যা, বন্দী, চুরি, অশ্লীল কর্ম, ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া ইত্যাদি। মোটকথা তাতারী বাহিনীর পক্ষে যা যা করা শোভনীয় তারা তা-ই করে!!
বর্বর তাতারী বাহিনীর কীটপতঙ্গ মুসলমানদের শরীরে অনুপ্রবেশ করে। সুবিশাল বাগদাদ নগরী তাতারীদের দখলে চলে যায়।
আল্লাহুম্মা লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ!
এই নগরী থেকে কত বাহিনী আল্লাহর পথে জিহাদ করার উদ্দেশ্যে বের হয়েছিল!!
কত শত উলামায়ে কেরাম দ্বীন শিক্ষা দেওয়ার জন্য এই নগরীতে দরসগাহ বানিয়েছিলেন!!
কত তালেবুল ইলম (ছাত্র) পৃথিবীর আনাচে-কানাচে থেকে ইলম অর্জনের উদ্দেশ্যে এই নগরীতে এসেছিলেন!!
আহ! হায় বাগদাদ! আজ তোমার জন্য কেউ বেঁচে নেই!
কোথায় খালেদ ইবনে ওয়ালিদ? কোথায় মুছান্না ইবনে হারেছা?
কোথায় কা'কা' ইবনে আমর? কোথায় নুমান ইবনে মুকরিন?
কোথায় সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস? কোথায় সে মানবতার বাহাদুরী?
কোথায় মুসলিম প্রজন্মের বিবেক-বুদ্ধি? কোথায় ইজ্জত-সম্মান ও আত্মমর্যাদাবোধ?
কোথায় জান্নাতাকাঙ্ক্ষী পবিত্র জামাত? কোথায় আল্লাহর পথের যোদ্ধারা?
কোথায় তারা, যারা নিজেদের ইজ্জত-সম্মান, স্ত্রী-সন্তান, ঘর-বাড়ি ও ধন-সম্পত্তি রক্ষায় লড়াই করে? কোথায়? কোথায়?! কেউ নেই!!
আজ বাগদাদ মৃত লাশের জন্য উন্মুক্ত। কোনো যুদ্ধ নেই, কোনো প্রতিবাদ নেই। বাগদাদে কোনো পুরুষ বেঁচে নেই। আছে কেবল পুরুষরূপী কিছু কাপুরুষ!! সুবিশাল বাগদাদ নগরী দখল হয়ে যায়।
ইমাম আবু হানীফার শহর, ইমাম শাফেয়ীর শহর, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের শহর আজ তাতারীদের দখলে। খলিফা মামুনুর রশিদের শহর আজ অন্যের দখলে, যিনি এক বছর হজ্ব করতেন, আরেক বছর জিহাদ করতেন।
দখল হলো রোমের অঞ্চল আমুরিয়ার বিজেতা খলিফা মু'তাসিম বিল্লাহর শহর।
পাঁচ যুগ পূর্বেকার ইসলামের প্রাণকেন্দ্র (রাজধানী) আজ বিজাতিদের দখলে!! তাতারীরা বাগদাদ নগরীতে এমন কাজ করেছে, যা কল্পনাও করা সম্ভব নয়।
তাতারীরা ঘরে ঘরে, বাগানে বাগানে, রাস্তা-ঘাটে, শহর-বন্দরে, মসজিদে মসজিদে মুসলমানদের খুঁজতে থাকে। মুসলমানদের ব্যাপকভাবে হত্যা করতে থাকে। লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ! মুসলমানরা পালাতে থাকে। ঘরের দরজা বন্ধ করে দরজা ধাক্কা দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তাতারীরা দরজায় আগুন লাগিয়ে দেয় কিংবা দরজা ভেঙে ফেলে। এরপর ঘরে প্রবেশ করে। মুসলমানরা ভয়ে দৌড়ে বাড়ির ছাদে আশ্রয় নেয়। তাতারীরা পিছে পিছে ছাদে ওঠে। এরপর সেখানেই মুসলমানদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। মুসলমানদের রক্তে শহরের ড্রেন-নালা ভেসে যায়।
তাতারীরা শক্তিশালী পুরুষদের হত্যা করেই ক্ষান্ত থাকে নি, বরং বৃদ্ধ ও অচলদেরও হত্যা করেছে। তারা মহিলাদেরও হত্যা করেছে। তবে কোনো মহিলাকে তাদের ভালো লাগলে বন্দী করে নিয়ে যেত। তাদের হত্যাকাণ্ড থেকে ছোটরাও রেহায় পায়নি-এমনকি দুগ্ধপোষ্য শিশুও। মোটকথা নারী-পুরুষ ও শিশু-বৃদ্ধ কারো প্রতিই এই পশুরা কোনো দয়া করে নি। যাকে পেয়েছে তাকেই খুন করেছে; পেট ফেড়ে গর্ভের সন্তান পর্যন্ত।
একদল তাতারী চল্লিশজন ছোট্ট শিশুকে রাস্তার কিনারা পড়ে থাকে দেখে। তাদের মায়েদের খুন করা হয়েছিল। এই পশুরা তাদেরও হত্যা করে!! তাদের অন্তর ছিল পাথরের মতো। না, পাথরের চেয়েও কঠোর!!
নিহতের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। এক, দুই, তিন এভাবে দশদিন অতিবাহিত হলো। খুন, হত্যা বন্ধ হচ্ছিল না। অবিরাম ধ্বংসযজ্ঞ চলছিল। কিন্তু কোনো প্রতিরোধ কিংবা প্রতিবাদ নেই। মানুষের অন্তরে একথা বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিল যে, তাতারীরা অপরাজেয়। তাদের পরাজিত করা সম্ভব নয়। তাদেরকে আঘাত করা সম্ভব নয়। হয়তো তারা কখনো মারা যাবে না।
এসব কিছু খলিফার উপস্থিতিতে সংঘটিত হচ্ছিল। খলিফা স্বচক্ষে এ আজাব প্রত্যক্ষ করছিলেন।
আপনি একটু ভেবে দেখুন, খলিফার উপস্থিতিতে এসব ঘটনা ঘটছে?!
একটু ভেবে দেখুন, খলিফা ইবনুল খুলাফা (খলিফার সন্তান খলিফা) আযীম ইবনুল উজামা (বাদশার ছেলে বাদশা) বন্দী অবস্থায় এসব মর্মন্তুদ ঘটনা প্রত্যক্ষ করছিলেন!!
১. তার দুই সন্তানকে খুন করা হয়েছে।
২. তৃতীয় সন্তানকে বন্দী করা হয়েছে।
৩. তিন মেয়েকে বন্দী করা হয়েছে।
৪. রাজসভার মন্ত্রীদের হত্যা করা হয়েছে।
৫. শহরের সকল উলামায়ে কেরাম, খতিব ও হাফেজে কুরআনদের খুন করা হয়েছে।
৬. সবচেয়ে নিকটবর্তী মানুষ মুআইয়িদ উদ্দীন আলকামীর বিশ্বাসঘাতকতা প্রকাশ পেয়েছে।
৭. তার সৈন্যবাহিনীকে ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে।
৮. তার ধন-সম্পত্তি, অর্থ-সম্পদ সবকিছু ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। শহর দখল হয়েছে।
৯. চোখের সামনে লক্ষ লক্ষ শহরবাসীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে।
১০. আব্বাসী সাম্রাজ্যের রাজধানী জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিল্ডিং-প্রাসাদ বিধ্বস্ত করা হয়েছে।
১১. তাতারীরা নির্মম, নিষ্ঠুর, অকৃতজ্ঞ, কালো চেহারা নিয়ে গোটা বাগদাদে ছড়িয়ে পড়েছে। শস্যখেতে পঙ্গপাল ছড়িয়ে পড়ে শস্যখেত যেমন ধ্বংস করে ফেলে অনুরূপ তারা বাগদাদে ছড়িয়ে পড়ে বাগদাদকে ধ্বংস করে ছেড়েছে।
১২. শিকল পরানো হয়েছে তার গর্দানে, হাতে ও পায়ে এবং উটকে যেভাবে হাঁকিয়ে নেওয়া হয় তাকেও সেভাবে টেনে-হেঁচড়ে হাঁকিয়ে নেওয়া হয়েছে। এসব কিছু খলিফা নিজ চোখে প্রত্যক্ষ করছিলেন। আফসোস আর আক্ষেপের কোনো অন্ত ছিল না। নিঃসন্দেহে তিনি বার বার বলেছিলেন—
يَا لَيْتَنِي مِتُّ قَبْلَ هَذَا وَكُنْتُ نَسْيًا مَنْسِيًّا
“হায়! আমি যদি এর আগেই মারা যেতাম এবং সম্পূর্ণ বিস্মৃত বিলুপ্ত হয়ে যেতাম।”৪৬
নিঃসন্দেহে তিনি অনুতপ্ত হয়ে বলেছিলেন—
مَا أَغْنَى عَنِّي مَالِيَهُ هَلَكَ عَنِّي سُلْطَانِيَهُ
“আমার অর্থ-সম্পদ আমার কোনো কাজে আসল না। আমার থেকে আমার সব ক্ষমতা লুপ্ত হয়ে গেল।”৪৭
নিঃসন্দেহে তিনি মনে মনে বলেছিলেন এবং তার অবস্থাও একথার সাক্ষ্য দিচ্ছিল—
رَبِّ ارْجِعُونِ لَعَلِّي أَعْمَلُ صَالِحًا فِيمَا تَرَكْتُ
“হে আমার প্রতিপালক, আমাকে পুনরায় প্রেরণ করো। যাতে আমি সৎকর্ম করতে পারি, যা আমি পূর্বে করিনি।”৪৮
হায়! যদি আমি সৈন্যবাহিনীকে প্রস্তুত করতাম। তাদের শক্তিশালী বানাতাম!!
হায়! দ্বীনের শত্রুরা চারদিক থেকে যখন দ্বীনকে ঘিরে ফেলেছিল, তখন যদি আমি এ জাতিকে জিহাদের জন্য উদ্বুদ্ধ করতাম!!
হায়! যদি আমি মানুষের সামনে; বরং অন্তরে ইসলামকে সমুন্নত করতাম এবং ইসলাম তাদের জান-মালের চেয়ে তাদের কাছে অধিক মূল্যবান হতো!!
হায়! যদি আমি খেল-তামাশা, রঙ্গমঞ্চ ছেড়ে দিতাম!!
হায়! যদি আমি সম্পদ সঞ্চয়ের জন্য বেঁচে না থাকতাম!!
হায়! যদি আমি প্রচুর বাঁদি না রাখতাম।
হায়! যদি আমি গানবাদ্য না শুনতাম।
হায়! যদি আমি উত্তম সঙ্গী নির্বাচন করতাম!!
হায়! যদি আমি উলামায়ে কেরামকে সম্মান করতাম, শত্রুদের বর্জন করতাম!!
হায়! আফসোস! হায়! আফসোস! হায়! আক্ষেপ!!
কিন্তু শিকলাবদ্ধ গর্দান, হাত, পা তাকে বাস্তবতার মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়েছে। তিনি যেন একথা জানতে পারেন যে, অতীত কখনো ফিরে আসে না। সময় কখনো পেছনের দিকে ফিরে যায় না!
ইমাম আবু দাউদ ও আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. এর সূত্রে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
إذا تبايعتم بالعين، وأخذتم أذناب البقر ، ورضيتم بالزرع، وتركتم الجهاد، سلط الله عليكم ذلاً، لا يترعه حتى ترجعوا إلى دينكم.
“তোমরা যখন সুদি লেনদেন করবে, গরুর লেজ ধরবে (চতুষ্পদ জন্তু লালন করবে) চাষাবাদে সন্তুষ্ট থাকবে (অর্থাৎ জিহাদের সময় দুনিয়ার কাজে ব্যস্ত থাকবে) এবং জিহাদ ছেড়ে দেবে, তখন আল্লাহ রব্বুল আলামীন তোমাদের ওপর লাঞ্ছনা চাপিয়ে দিবেন। যতক্ষণ তোমরা দ্বীনের দিকে ফিরে না আসবে, ততক্ষণ আল্লাহ এই লাঞ্ছনা দূর করবেন না।” ৪৯
বাগদাদবাসী কৃষিকাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য, রচনা-সংকলন এবং বিভিন্ন শিল্পকর্ম ইত্যাদি পেশায় জড়িত ছিল। এমনকি ইলম অর্জন ও বিতরণও তাদের পেশা ছিল। কিন্তু তারা জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ বর্জন করেছিল। ফলে এর ফলাফল ছিল লাঞ্ছনা আর অপমান। যা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি।
এটি প্রত্যেক মুসলমান নর-নারী, শাসক-শাসিত, ছাত্র-উস্তাদ, ছোট-বড় সকলের জন্য মূল্যবান শিক্ষণীয় বিষয়।
-সত্য প্রতিষ্ঠা ও হক আদায়ের জন্য শক্তি প্রয়োজন।'
-অধিকার সহজলভ্য নয়; অধিকার আদায় করতে হয়। অধিকার আদায়ের পথে মূল্য ব্যয় করতে হয়।
-যারাই জিহাদ ছেড়ে দিয়েছে, তারাই লাঞ্ছিত হয়েছে।
-মুসলমানদের শত্রুরা কখনো প্রতিশ্রুতি পূরণ করে না।

টিকাঃ
৪৬ সুরা মারইয়াম: ২৩।
৪৭ সুরা হাক্কাহ: ২৭-২৮।
৪৮ সুরা মুমিনুন: ৯৯-১০০।
৪৯ আবু দাউদ : ৩৪৬২।

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 পদাঘাতে মৃত্যু

📄 পদাঘাতে মৃত্যু


এবার খলিফাকে হত্যা করার পালা। হালাকু খান অসহায় খলিফাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। এমন সময় হালাকু খানের কতিপয় সহযোগী তাকে এক অদ্ভুত পরামর্শ প্রদান করে। তারা তাঁকে বলে, যদি মুসলিম খলিফার রক্ত মাটিতে প্রবাহিত হয়, তবে পরবর্তীতে মুসলমানরা বদলা নিতে চাবে; দীর্ঘদিন পরে হলেও। তাই খলিফাকে এমন পন্থায় হত্যা করা হোক, যাতে রক্ত মাটিতে প্রবাহিত না হয়। তলোয়ার ব্যবহারের কোনো প্রয়োজন নেই।
এটি এক ধরনের প্রতারণা। কারণ, মুসলমানরা শুধু খলিফা হত্যার নয়; বরং হালাকু খান ও তার বাহিনী যত মুসলমানকে হত্যা করেছে, তাদের প্রতিশোধ অবশ্যই গ্রহণ করবে। চাই যে পন্থায়ই তাদের হত্যা করা হোক। তবুও হালাকু খান তাদের কথায় কান দিল। সুবহানাল্লাহ! যেন আল্লাহর অভিপ্রায় এমনই ছিল। খলিফা এমন লাঞ্ছনাকর পন্থায় নিহত হলেন, পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো খলিফা এভাবে মৃত্যুবরণ করেননি। মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে পৃথিবীর কোনো রাজা-বাদশার ব্যাপারে এমন লাঞ্ছনাকর ঘটনা শোনা যায়নি।
হালাকু খান খলিফাকে ‘পদাঘাতে খুন’ করার নির্দেশ দিল!! কার্যত খলিফাকে মাটিতে শোয়ানো হয়। আর তাতারী বাহিনী খলিফাকে লাথি মারতে শুরু করে।
পদাঘাত খলিফাকে মৃত্যুর কোলে পৌঁছে দেয়!! আহ! কী ব্যথা! আহ! কী লাঞ্ছনা! আহ কী অপমান অপদস্থতা! শরীর থেকে রুহ পৃথক হওয়া পর্যন্ত তারা তাকে লাথি মারতে থাকে। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
শুধু বাগদাদের পতন ঘটেনি!! বাগদাদে আব্বাস গোত্রের সর্বশেষ খলিফারও পতন ঘটে। সাথে সাথে গোটা বাগদাদবাসীর পতন হলো।
এটি ছিল ১৪ই সফর ৬৫৬ হিজরী তথা তাতারীদের বাগদাদ প্রবেশের দশম দিন।
খলিফা হত্যার পরও হত্যাকাণ্ড শেষ হয়নি। হালাকু খান (তার ওপর আল্লাহর অভিশাপ নাজিল হোক) লাগাতার হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। বাগদাদ ছিল তৎকালীন বিশ্বের সর্ববৃহৎ শহর। তাই তাতারীরা এই শহরটিকে পরবর্তীদের জন্য ‘শিক্ষণীয় শহর’ বানাতে চাইল।
বাগদাদ পতনের পর আরও চল্লিশদিন অবিরাম হত্যাকাণ্ড চলল। একটু ভেবে দেখুন! বাগদাদে নিহতের সংখ্যা কত হতে পারে?! পুরুষ, মহিলা, শিশু, বৃদ্ধ নির্বিশেষে লক্ষ লক্ষ মুসলমান নির্মম হত্যা করা হয়। মাত্র চল্লিশ দিনে লক্ষ লক্ষ মুসলমান খুন হয়!! মাত্র চল্লিশদিনের মাঝে বাগদাদ লক্ষ লক্ষ অধিবাসী হারিয়েছে। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক ভয়াবহ ঘটনা।
একথা এজন্য উল্লেখ করছি যে, বর্তমানে মুসলমানগণ যেসব বিপদাপদ ও বালা-মসিবতের সম্মুখীন হয়, তা যত কঠিনই হোক না কেন তা পূর্ববর্তীদের বিপদ তুলনায় খুবই হালকা। আপনি দেখবেন, আল্লাহর ইচ্ছায় মুসলমানরা আবার ঘুরে দাঁড়াবে। এ থেকে বোঝা যায়, আল্লাহর ইচ্ছায় কোমর ভেঙে গেলেও আমরা আবার কোমর সোজা করে দাঁড়াতে পারি। বাগদাদে কেবল খ্রিস্টানরাই খুনের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিল!!

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00