📄 অবরোধের সূচনা!!
১২ মুহাররম ৬৫৬ হিজরীতে হালাকু খানের দল আকস্মিক বাগদাদ নগরীর পূর্ব প্রাচীরের সামনাসামনি এসে দাঁড়ায়। হালাকু খান শহরের চারপাশে অবরোধের সরঞ্জামাদি স্থাপন শুরু করে। অপর দিকে পূর্ব-দক্ষিণ দিক থেকে কাতবুগা দলবল নিয়ে এসে উপস্থিত হয়।
তাতারী বাহিনীর দুর্ধর্ষ দুই দলের আকস্মিক আগমন দেখে খলিফাতুল মুসলিমীন আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। দ্রুত বিশিষ্ট উপদেষ্টাবৃন্দকে একত্রিত করেন। যাদের প্রধান ছিলেন বিশ্বাসঘাতক মন্ত্রী মুআইয়িদ উদ্দীন আলকামী। এমন দুর্বিষহ পরিস্থিতিতে আমরা কী করব? মুক্তির পথ কী? কোথায় পালাবার স্থান?
فَنَادَوْا وَلَاتَ حِينَ مَنَاصٍ
"তারা আর্তচিৎকার করেছিল। কিন্তু তখন পালাবার কোনো পথ ছিল না।”৪৪
উযীর মুআইয়িদ উদ্দীন আলকামী ও তার সহোদররা তাতারীদের পক্ষ সমর্থন করে তাদের সঙ্গে শান্তিচুক্তি প্রতিষ্ঠার জন্য তাকিদ প্রদান করে। সামান্য পতন কিংবা সামগ্রিক পতন ঘটলেও তাদের বাধা দেওয়ার মতো কিছু ছিল না। মুআইয়িদ উদ্দীন তাতার ও মুসলমানদের ভেতর সুযোগ সন্ধান করছিল, যাতে তাতারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কিংবা রুখে দাঁড়াবার কোনো চিন্তা অবশিষ্ট না থাকে। শর্তহীন শান্তিচুক্তি ছিল তাদের পরামর্শ।
একথা অনস্বীকার্য সে, মুসলিম উম্মাহ কখনো কল্যাণশূন্য হবে না। দু'জন মন্ত্রী দাঁড়িয়ে খলিফাকে জিহাদের ইঙ্গিত প্রদান করে। 'জিহাদ' শব্দটি আব্বাসী সাম্রাজ্যের এই প্রজন্মের কাছে ছিল একটি নতুন শব্দ। কিন্তু তাদের কাছে জিহাদ শব্দটি নতুন ও অদ্ভুত হলেও তা প্রত্যাখ্যান করার কোনো উপায় ছিল না।
মুজাহিদ উদ্দীন আইবেক ও সুলাইমান শাহ প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য উৎসাহিত করেন। কিন্তু সময় ফুরিয়ে যাওয়ার পর তারা এই ইঙ্গিত প্রদান করেছেন। শুধু সময় ফুরিয়ে বললে ভুল হবে, বরং বহু পরে তারা এই উদ্যোগ গ্রহণ করলেন। কারণ, জিহাদের প্রস্তুতির সময় অনেক পূর্বেই শেষ হয়ে গেছে। সামনে পরীক্ষার সময় অত্যাসন্ন। হতে পারে, হয়তো তারা অনেক দিন থেকে জিহাদের পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু কেউ তাদের কথায় কর্ণপাত করেনি। মুআইয়িদ উদ্দীন ও মুজাহিদ উদ্দীন আইবেকের মধ্যকার সম্পর্কে দীর্ঘদিন ধরে টানাপোড়া চলছিল। বিশ্বাসঘাতকের সম্পর্কে টানাপোড়া থাকাই আবশ্যক। কিন্তু আফসোস! খলিফা বিশ্বাসঘাতকদের কথা দীর্ঘদিন ধরে মেনে আসছে!! খলিফা হতভম্ব!!
মুআইয়িদ উদ্দীনের কথার প্রতি সে দুর্বল। তার অন্তর যুদ্ধ করতে শক্তি পাচ্ছিল না।
কিন্তু বিবেক মুজাহিদ উদ্দীন আইবেকের কথার প্রতি সায় দিচ্ছে। কারণ, তাতারীদের ইতিহাস শান্তির ইতিহাস নয়। যেমন কখনো শোনা যায়নি, তাতারীরা অধিকার প্রদান করে; বরং তারা অধিকার ছিনিয়ে নেয়। খলিফা বিবেকশূন্য হয়ে পড়েন। শেষমেশ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। আলহামদুলিল্লাহ! তিনি বিবেকের কথা শুনেছেন। তিনি জিহাদের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কিন্তু দ্বন্দ্বপূর্ণ.... দুর্বল.... মনোবলহীন!!
এভাবে জিহাদ কোনো উপকারে আসে না। জিহাদ কখনো অপরিকল্পিতভাবে হয় না। হঠাৎ করে মুজাহিদ সৃষ্টি হয় না!!
জিহাদ হলো প্রস্তুতির নাম। পরিচর্যার নাম, আত্মবিসর্জনের নাম এবং ঈমানের পথে দীর্ঘদিনের পরামর্শ ও পর্যালোচনার নাম।
জিহাদ সম্মুখপানে অগ্রসর ... ঊর্ধ্বগামী... ঊর্ধ্বগামী ... ঊর্ধ্বগামী। ইসলামের স্বর্ণশিখরে পৌঁছা পর্যন্ত। তবে আমরা সর্বাবস্থায় জিহাদ করব (অভিজ্ঞতার আলোকে)। খলিফা জীবনে একবারের জন্য হলেও সেনাবাহিনীর খেদমত করার ইচ্ছা করল!
এরপর মুজাহিদ উদ্দীন আইবেকের নেতৃত্বে একটি ক্ষুদ্র দুর্বল দল হালাকু খানের সঙ্গে লড়াইয়ের উদ্দেশ্যে বের হলো। আব্বাসী বাহিনী বের হতে না হতেই এবং হালাকু খানের মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ না করতেই সংবাদ এল, উত্তর দিক থেকে আরেকটি তাতারী বাহিনী আগমন করছে। সেটি হলো তাতারী সেনাপতি পোয়গেয়টের দল, যারা ইউরোপ থেকে তুরস্ক ও উত্তর ইরাক পাড়ি দিয়ে এসেছে। এই দলটি দাজলা নদীর পূর্বাঞ্চলীয় ইরাকভূমি পাড়ি দিয়ে দাজলা নদীর পশ্চিমাঞ্চল মসুল পৌঁছেছে। এরপর সেখান থেকে দাজলা ও ফুরাত নদীর মধ্যবর্তী অবরুদ্ধ অঞ্চল থেকে মাত্র পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে। তারা যখন উত্তর বাগদাদে অবস্থান করছিল, তখন মুজাহিদ উদ্দীন আইবেক তাদের আগমন-সংবাদ পান।
মুজাহিদ উদ্দীন আইবেক অনুধাবন করেন, যদি এই দলটি বাগদাদ পৌঁছে, তাহলে উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আক্রমণ করবে এবং এর মাধ্যমে মুসলিম প্রাচীন রাজধানী চারদিক থেকে অবরুদ্ধ হয়ে পড়বে। তাই তৎক্ষণাৎ মুজাহিদ উদ্দীন আইবেক পোয়গেয়টকে প্রতিহত করতে দাজলা ও ফুরাত নদীর উত্তর দিকে যাত্রা শুরু করেন। আম্বার নামক স্থানে তারা মুখোমুখি হয়। এটি সেই স্থান যেখানে পাঁচশ বছর পূর্বে মুসলিম সেনাপতি খালেদ বিন ওয়ালিদ রা. বিজয় লাভ করেছিলেন। কিন্তু আফসোস! এবার মুসলিম নেতা জয় লাভ করতে পারেনি।
পোয়গেয়ট প্রতারণার আশ্রয় গ্রহণ করে। সে মুসলমানদের সামনে থেকে ফিরে যেতে উদ্যত হয়। মুসলমানরা পিছু ধাওয়া করে। একসময় তারা ফুরাত নদীর নিকটবর্তী এক জলাভূমিতে গিয়ে উপস্থিত হয়। এরপর পোয়গেয়ট তাতারী প্রকৌশলীদের নদীর বাঁধ কেটে দেওয়ার নির্দেশ দেয়। যাতে আব্বাসী বাহিনী ফিরে যেতে না পারে। এরপর পোয়গেয়ট ইরাকী বাহিনীকে অবরোধ করে এবং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। মুজাহিদ উদ্দীন আইবেক সামান্য কয়েকজন সৈন্যবাহিনী নিয়ে নদীর পাড় দিয়ে বাগদাদ ফিরে যেতে সক্ষম হন। কিন্তু আফসোস! অসংখ্য সৈন্য আম্বার অঞ্চলে নিহত হয়।
১৯ শে মুহাররম এই অপূরণীয় ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ সংঘটিত হয়। অর্থাৎ হালাকু খান বাগদাদ পৌঁছার এক সপ্তাহ পর এই দুর্ঘটনা ঘটে। এদিকে পোয়গেয়ট কালক্ষেপণ না করে তৎক্ষণাৎ পরের দিনই উত্তর দিক থেকে বাগদাদ পৌঁছে যায়। অতঃপর বাগদাদের পশ্চিম দিক থেকে অবরোধ শুরু করে। বাগদাদ নগরী পূর্বে হালাকু খান ও পশ্চিমে পোয়গেয়ট; এই দুই বাহিনীর মাধ্যমে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। অবরুদ্ধ হয় ইসলামী খেলাফতের ঐতিহ্যবাহী রাজধানী। খলিফাতুল মুসলিমীন কল্পনাও করেননি যে, এভাবে অবরোধের শিকার হবেন। তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন, বিবেক বিস্মৃত হন!!
সুযোগ-সন্ধানী উযীর মুআইয়িদ উদ্দীন এটাকে বড় সুযোগ মনে করে। সে খলিফাকে সম্বোধন করে বলে, খলিফাতুল মুসলিমীন! আমাদের তাতারীদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সংলাপে বসা উচিত। কিন্তু খলিফা জানতেন, তাদের সঙ্গে সংলাপে বসা মানে হলো, শক্তিশালীর সঙ্গে অতি দুর্বলের বৈঠক। তা কোনো ফল বয়ে আনবে না। কারণ, মুআইয়িদ উদ্দীনের উদ্দেশ্য সংলাপ নয়; বরং আত্মসমর্পণ। আর আত্মসমর্পণ অর্থ হলো প্রশ্নাতীতভাবে বিজয়ীর যাবতীয় শর্ত মেনে নিয়ে পরাজয় মেনে নেওয়া।
এতসত্ত্বেও নিরুপায় হয়ে অসহায় খলিফা মাথানত করে আত্মসমর্পণকেই মেনে নিলেন। তিনি সংলাপে একমত হলেন। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, তার পক্ষ থেকে সংলাপের জন্য দুজনকে পাঠাবেন। কোন দুজনকে পাঠাবেন?
তিনি শীয়া মতালম্বী মুআইয়িদ উদ্দীন আলকামীকে পাঠালেন, যে অন্তরে আব্বাসী সাম্রাজ্যের প্রতি ঘোর বিদ্বেষ লালন করে এবং বাগদাদের খ্রিস্টান কুলপতি মাকিকাকে পাঠান। এভাবে ইসলামী সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সংলাপের জন্য প্রতিনিধি হিসেবে দুজনকে নিয়োগ করা হয়। তাদের একজন শীয়া, অন্যজন খ্রিস্টান!!
হালাকু খান ও দুই মুসলিম প্রতিনিধির মাঝে গোপন সংলাপ সংঘটিত হয়। হালাকু খান তাদের বাগদাদ পতনে সহযোগিতা প্রদানের শর্তে নানান প্রতিশ্রুতি প্রদান করে। তন্মধ্যে অন্যতম প্রতিশ্রুতি হলো, তারা দুজন নতুন গভর্নর বডির সদস্যপদ প্রাপ্ত হবে এবং তাদের অন্যতম বিবেচিত হবে, যারা পরবর্তীতে ইরাক শাসন করবে। একথা সুস্পষ্ট যে, এগুলো মিথ্যা প্রতিশ্রুতি বৈ কিছুই নয়।
এই মিথ্যা প্রতিশ্রুতি পেয়ে তারা আব্বাসী সাম্রাজ্য পতনের জন্য পাগলপারা হয়ে ওঠে। যদিও এর বিনিময়ে তারা কিছুই পাবে না। একটু ভেবে দেখুন, যদি আপনাকে এ জাতীয় লোভনীয় প্রতিশ্রুতি (যেমন ক্ষমতা, পদ, সম্পদ) দেওয়া হতো, তবে আপনি কী করতেন? নিঃসন্দেহে তাতারী সম্রাট হালাকু খান স্থান-কাল-পাত্রের চাহিদা খুব ভালো বুঝত!
প্রতিনিধি দুজন হালাকু খানের কাছ থেকে অদ্ভুত আবেদন নিয়ে ফিরে এল। বাগদাদের অভ্যন্তরীণ কট্টর মুসলমান, যারা জিহাদের চেতনায় উজ্জীবিত, জিহাদের হুঙ্কার দেয়, তাদের বিষয়ে ইতিপূর্বেই হালাকু খান শুনেছে। জিহাদের ডাক নিঃসন্দেহে তাদের শান্তিচুক্তিকে ভেঙে চুরমার করে দেবে। তারা ভাবল, খলিফাতুল মুসলিমীনের আত্মসমর্পণ করা অত্যন্ত জরুরি এবং জিহাদী চেতনায় উজ্জীবিত মুজাহিদ উদ্দীন আইবেক ও সুলাইমান শাহকে আত্মসমর্পণ করা দরকার।
এখানে বর্ণনার বৈপরীত্য পাওয়া যায়। আমি (লেখক) জানি না, তারা বাস্তবে আত্মসমর্পণ করেছিল, না করেনি? তবে সবার সামনে তাতারীদের মতলব সুস্পষ্ট হয়েছে। সবার সামনে শত্রুদের দ্বীন ইসলামকে মিটিয়ে দেওয়ার অভিলাষ প্রতিভাত হয়েছে। হ্যাঁ, খলিফা ক্ষমতার আসনে উপবিষ্ট থাকবে!! যদি হালাকু সত্য বলে থাকে!!
এটা তো জোরজবরদস্তি, অনধিকার চর্চা। খলিফা কি এটি গ্রহণ করবেন? আর কেনই বা গ্রহণ করবেন না। তার পরামর্শদাতারা তাকে বলছে, এটাকে রাজনৈতিক ভাষায় 'বাস্তবতা' বলা হয়। যদি আপনি আত্মসমর্পণ না করেন, তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। তবে নিশ্চিত বাগদাদের পতন ঘটবে। বাগদাদবাসীর অপমৃত্যু ঘটবে। পক্ষান্তরে যদি আপনি আত্মসমর্পণ করেন। তবে দূরবর্তী হলেও সম্ভাবনা রয়েছে আমরা প্রাণে বাঁচব!!
হ্যাঁ! তিনি লাঞ্ছিত অবস্থায় বেঁচে থাকবেন! তবুও তো বেঁচে থাকবেন!!
হ্যাঁ! তিনি নতজানু হয়ে বেঁচে থাকবেন! তবুও তো বেঁচে থাকবেন!!
হ্যাঁ! তিনি সবকিছু সস্তায় বিক্রি করে দেবেন! তবুও তো জীবন ফিরে পাবেন!!
খলিফাতুল মুসলিমীন সর্বদাই দ্বিধান্বিত ছিলেন।
আর লক্ষ কোটি জনতা তার পেছনে দ্বন্দ্বে ভুগছিল।
জিহাদের ডাক খুব কম মানুষের মুখ থেকেই বের হয়! আর সাধারণ মানুষের অন্তর তাতারী অবরোধের শিকল পায়ে পরার জন্য প্রস্তুত হয়েছিল।
পার্থিব জগৎ তাদের চোখের সামনে বৃহদাকার মনে হয়েছিল। তাই পার্থিব জগৎকে বলিদান দেওয়া তাদের ভাগ্যে জুটল না।
বস্তুত বাগদাদে অন্যায় অপকর্ম বৃদ্ধি পেয়েছিল। আর কোনো জনপদে যখন অন্যায় অপকর্ম ছড়িয়ে পড়ে, ধ্বংস তখন নিকটবর্তী হয়ে পড়ে।
বিষয়টি নিয়ে ভাববার জন্য খলিফার কিছু সময়ের প্রয়োজন ছিল। সিদ্ধান্ত বড়ই কঠিন। তিনি পরামর্শের প্রয়োজন অনুভব করলেন। কিন্তু অপরদিকে হালাকু খানের হাতে নষ্ট করার মতো সময় ছিল না। কারণ, বাগদাদ অবরুদ্ধকারী তাতারী বাহিনীর পেছনে প্রতিদিন হাজার হাজার স্বর্ণমুদ্রা ব্যয় হচ্ছিল। তখন ছিল ৬৫৬ হিজরী মুহাররম মাস মোতাবেক ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাস। তখন তীব্র শীত। তা ছাড়া বড় কথা হলো, তাতারী বাহিনী ভেতর থেকে বাগদাদ অবলোকন করার জন্য অস্থির হয়ে ছিল।
অবস্থা ক্রমেই কঠিন ও তীব্রতর হচ্ছে। হালাকু খান ও খলিফার মাঝে দূতের আনাগোনা চলতেই থাকে। এসব দূত মুআইয়িদ উদ্দীন ও মাকিকার কাছে খুব আস্থাভাজন ছিল।
সংলাপের ফলাফল খুবই মনঃপূত হয়েছে বলে ইবনে আলকামী খলিফার সম্মুখে প্রকাশ করেছে। ইবনে আলকামী হালাকু খানের পক্ষ থেকে কতিপয় (মিথ্যা) প্রতিশ্রুতি নিয়ে এসেছিল। তিনি এসব প্রতিশ্রুতিকে রাজনীতির জন্য কল্যাণকর মনে করেন। তবে কিছু শর্ত ছিল, যা তৎক্ষণাৎ পূরণ করা খলিফার জন্য আবশ্যকীয় ছিল।
প্রতিশ্রুতি ছিল— ১. তাতারীরা দুই সাম্রাজ্যের মাঝে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা এবং স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করবে। ২. লক্ষ লক্ষ মুসলমান হত্যাকারী হালাকু খানের মেয়ের সঙ্গে খলিফাতুল মুসলিমীন মুসতা'সিম বিল্লাহর ছেলে বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হবে। ৩. খলিফা মুসতা'সিম বিল্লাহ নিজ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকবেন। ৪. তাতারীরা গোটা বাগদাদবাসীকে নিরাপত্তা প্রদান করবে।
এসব প্রতিশ্রুতি নিম্নবর্ণিত শর্তসাপেক্ষে বাস্তবায়িত হবে— ১. ইরাকের দুর্গসমূহ ধ্বংস করতে হবে। ২. খন্দকসমূহ ভরাট করতে হবে। ৩. অস্ত্র তাতারীদের হাতে অর্পণ করতে হবে। ৪. বাগদাদের রাজত্ব তাতারীদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে।
হালাকু খান প্রেরিত দুই প্রতিনিধির সঙ্গে সংলাপ সমাপ্ত করে। যেন সে এ দেশে ন্যায়-ইনসাফ, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা প্রদানের উদ্দেশ্যে আগমন করেছে এবং এসব কল্যাণকর উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হলে সে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করবে। তখন ইরাকবাসী নিজেদের মতো জীবনযাপন করবে এবং নিজেরাই নিজেদের জন্মভূমি পরিচালনা করবে।
এসব প্রতিশ্রুতি ও শর্ত শুনে খলিফার মনে নতুন করে স্বপ্ন জাগে!! হালাকু খান কি প্রতিশ্রুতি প্রদানে সত্যবাদী?! নাকি খলিফার মনে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ ছিল?!
উপরন্তু শর্তগুলো ছিল খুবই কঠোর। নিঃসন্দেহে এসব শর্ত যুদ্ধের সকল সম্ভাবনাকে বিলুপ্ত করে দেবে। কিন্তু অপরদিকে হালাকু খান খলিফার সামনে স্বপ্নের প্রদীপ জ্বালিয়েছিল। তা হলো, দেশের রাজত্বে তারা হস্তক্ষেপ করবে না। খলিফার রাজত্ব বহাল থাকবে। তবে তাতারীদের তত্ত্বাবধানে।
টিকাঃ
৪৪ সুরা সাদ: ৩।
📄 বাঁদি আরাফার মৃত্যু
হালাকু খান দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেনি এবং তার বন্ধু 'খলিফা' গভীর চিন্তা-ভাবনার জন্য যে সময় চেয়েছিলেন, তাও দেয়নি; বরং তৎকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সামরিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাগদাদের ওপর পাথর ও আগুন নিক্ষেপ করে সে তাকে দ্রুত চিন্তা-ভাবনা করতে বাধ্য করেছে।
শুরু হয় বাগদাদের ঘর-বাড়ি, প্রাসাদ-অট্টালিকা, দুর্গ-ক্যন্টনমেন্ট ও প্রাচীরের ওপর ভয়াবহ গোলাবর্ষণ। নিরাপদ ও শান্ত শহর (বাগদাদ) তার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রকম্পিত হয়।
সর্বপ্রথম গোলাবর্ষণ শুরু হয় ৬৫৬ হিজরীর সফর মাসে। টানা চারদিন গোলাবর্ষণ চলতে থাকে। উল্লেখযোগ্য কোনো প্রতিবাদ সেখানে দেখা যায় নি। আল্লামা ইবনে কাছীর রহ. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থে এ অবস্থার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে অতি সংক্ষেপে বিষয়গুলো উল্লেখ করেছেন। কোনো ব্যাখ্যা দাঁড় করাননি। তবে তিনি বহু অর্থবহ কথা উল্লেখ করেছেন। ইবনে কাছীর রহ. বলেন-
"তাতারী বাহিনী খেলাফত সাম্রাজ্যকে ঘিরে ফেলেছে। চতুর্দিক থেকে তীর নিক্ষেপ করছে। এমন সময় খলিফার সম্মুখে এক বাঁদি নগ্নগায়ে খলিফার মনোরঞ্জন করছিল। তার গায়েও তীর বিদ্ধ হয়। এটি খলিফার ভুলের প্রায়শ্চিত্ত ছিল। বাঁদিটির নাম ছিল আরাফা। জানালার ফাঁক দিয়ে তীর এসে বাঁদিকে আঘাত করে। এতে বাঁদিটি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। সেই তীরটিকে খলিফার সামনে এসে দাঁড় করানো হয়। তাতে লেখা ছিল-
"إذا أراد الله إنفاذ قضائه وقدره، أذهب من ذوي العقول عقولهم"
যখন আল্লাহ তা'আলা নিজ ফায়সালা বাস্তবায়িত করতে চান, তখন জ্ঞানীদের বিবেক-বুদ্ধি ছিনিয়ে নেন।"
আশ্চর্য! ইবনে কাছীর রহ. এই ঘটনাটি কোনো ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ছাড়াই উল্লেখ করলেন!!
বাহ্যদৃষ্টিতে ঘটনাটি খুব স্বাভাবিক মনে হলেও এতে লুকিয়ে আছে বহু মর্মবাণী!!
প্রত্যেক বাগদাদবাসীর হৃদয়ের পার্থিব দুনিয়ার গভীর লোভ গেড়ে বসেছিল। আর সবার পূর্বে যার অন্তরে দুনিয়া চেপে বসেছিল, সেই মহান ব্যক্তি হলেন খলিফাতুল মুসলিমীন। এই হলেন সেই মহান খলিফা, যার স্কন্ধে এহেন ভয়াবহ মুহূর্তে মুসলিম উম্মাহর ঈমান-আমল ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার গুরুদায়িত্ব অর্পিত ছিল।
হ্যাঁ, অবশ্যই! বাঁদিটি খলিফার মালিকানাধীন। সে তার জন্য হালাল। বাঁদি খলিফার মনোরঞ্জন করবে, খলিফা একাকী বাঁদিকে ভোগ করবেন, তার নাচ উপভোগ করবেন, এতে কোনো বাধা নেই; কিন্তু খলিফাতুল মুসলিমীনের বিবেক-বুদ্ধি কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল!! ইসলামী খেলাফতের রাজধানী অবরুদ্ধ। কয়েক হাত দূরে মৃত্যুর হাতছানি। মোঙ্গলী গোলাবর্ষণ হচ্ছে। তীরাগ্নি বর্ষিত হচ্ছে। জনমানব চরম সংকটে নিপতিত। এমতাবস্থায় খলিফা বাঁদির নাচ উপভোগ করছেন!!!
কোথায় বিবেক?! কোথায় বুদ্ধি?! কোথায় প্রজ্ঞা?!
বাঁদিভোগ তার রক্ত-মাংসে মিশে গিয়েছিল। আহার পানীয়ের মতো তা মৌলিক চাহিদায় পরিণত হয়েছিল। তাই তো যুদ্ধের মুহূর্তে তা অত্যাবশ্যকীয় ছিল!! আমি (লেখক) অনুধাবন করতে পারছি না, কীভাবে তিনি এসব কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখলেন; অথচ দেশ-শহর, জনগণ সবাই, এমনকি তিনি নিজেও সংকটাপন্ন।
রাজভবনে নিক্ষেপিত তীর, যেই তীরের আঘাতে অসহায় বাঁদিটি মারা যায়। তার গায়ে তাতারীরা কী চমৎকার অর্থবহ বাণী লিখেছিল। তাতে লিখা ছিল—
"যখন আল্লাহ তা'আলা নিজ ফায়সালা বাস্তবায়িত করতে চান, জ্ঞানীদের বিবেক-বুদ্ধি ছিনিয়ে নেন।"
সে সময় আল্লাহ তা'আলা বাগদাদ পতনের ফায়সালা করেছিলেন। তাই তো খলিফা, উপদেষ্টামণ্ডলী ও জনগণ; সকলের বিবেক কেড়ে নিয়েছিলেন।
নিঃসন্দেহে এই নির্বাচিত বাণীটি যুদ্ধের অংশ ছিল; তাতারীরা বাগদাদবাসীকে নিয়ে গবেষণা করে তা বুঝতে পেরেছিল।
এই ঘটনাটি খলিফার বিবেকহীনতা কিংবা বিবেক-স্বল্পতার প্রমাণ বহন করে। কারণ, তিনি এই দুঃখজনক ঘটনার (বাঁদির মৃত্যুর) পরও জনগণকে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দেননি। বিপদ-আতঙ্ক রাজভবনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছে। আর তিনি কেবল হেফাজতে থাকার নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছেন। লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ!
📄 সর্বশেষ পর্যালোচনা
তাতারী বাহিনী ৬৫৬ হিজরীর ১ লা সফর থেকে চারদিন ৪ই সফর পর্যন্ত গোলাবর্ষণ করতে থাকে। ৪ই সফরে পশ্চিমের প্রাচীর ভাঙতে শুরু করে। প্রাচীর ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে খলিফাও সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়েন।
জীবনের মাত্র কয়েকটি মুহূর্ত অবশিষ্ট ছিল।
এমন দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তে খলিফা তার বিশ্বাসঘাতক বন্ধু মুআইয়িদ উদ্দীন আলকামীর শরণাপন্ন হন। এহেন পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞাসা করেন। সে তাকে সশরীরে হালাকু খানের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেয়, যাতে সংলাপের দ্বার উন্মুক্ত হয়।
দূত হালাকু খানের কাছে গিয়ে খলিফার আগমন সম্পর্কে সংবাদ দেয়। হালাকু খান খলিফাকে আসার নির্দেশ দেয়। কিন্তু একাকী নয়; বরং তার সাম্রাজ্যের বিশিষ্ট উপদেষ্টাবৃন্দ ও বিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ, মন্ত্রী পরিষদ, ফুকাহা, উলামা ও সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গসহ আসার নির্দেশ দেয়। নির্দেশমতো তারা সবাই হালাকু খানের তাঁবুতে উপস্থিত হন। হালাকু খানের কথামতো সবার উপস্থিতিতে সংলাপ সংঘটিত হবে।
খলিফার সম্মুখে কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না। খলিফা জাতির শ্রেষ্ঠজ্ঞানীদের একত্রিত করেছেন এবং নিজে সশরীরে বাগদাদের প্রাচীর থেকে বের হয়ে হালাকু খানের তাঁবুতে উপস্থিত হয়েছেন। খলিফার দু-চোখ বেয়ে অশ্রু প্রবাহিত হচ্ছিল, ধমনিতে রক্ত জমাট বেঁধেছিল, হৃদয়ের স্পন্দন থেমে গিয়েছিল, দীর্ঘশ্বাস বের হচ্ছিল।
খলিফা অপমানিত অপদস্থ হয়ে বের হয়েছেন। তিনি তো সেই খলিফাতুল মুসলিমীন, যাকে তার রাজপ্রাসাদে দেশ-বিদেশের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা সংবর্ধনা জানায়। যার পূর্বপুরুষরা এই প্রাসাদ থেকে সারা পৃথিবী শাসন করতেন। যে প্রাসাদ থেকে আজ তিনি অপমানিত হয়ে বের হয়েছেন।
খলিফার সঙ্গে প্রায় সাতশোজন বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের এক মহতি জামাত ছিল। এতে মন্ত্রী মুআইয়িদ উদ্দীন আলকামীও ছিল। দলটি হালাকু খানের তাঁবুর নিকটবর্তী হলে একদল তাতারী পাহারাদার তাদের বাধা প্রদান করে। তারা কাউকে হালাকু খানের তাঁবুতে প্রবেশের অনুমতি দেয় না; বরং তারা বলে, খলিফার সঙ্গে মাত্র সতেরোজন প্রবেশ করবে। পাহারাদারদের ভাষ্যমতে অবশিষ্টদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। খলিফা সতেরো জনকে নিয়ে প্রবেশ করেন। অবশিষ্টদের কোনো কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় না; বরং সকলকে হত্যা করার জন্য বন্দী করা হয়!!
খলিফা ও তার সঙ্গীরা ছাড়া সবাইকে হত্যা করা হয়। নিহত হয় জাতির নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ, মন্ত্রী পরিষদ, জ্ঞানীগুণীরা, বিশিষ্ট ফুকাহায়ে কেরাম ও উলামায়ে কেরাম।
খলিফাকে হত্যা করা হয়নি। কারণ, হালাকু খান তার মাধ্যমে কিছু স্বার্থ উদ্ধার করার ইচ্ছা করেছিল।
হালাকু খান গর্বভরে অহংকারবশত বিষয়গুলো প্রকাশ করতে থাকে।
খলিফা বুঝতে পারেন, দলের সবাইকে হত্যা করা হয়েছে। এতদিনে খলিফার কাছে তাতারীদের স্বভাব প্রকাশ পায়। তিনি বুঝতে পারেন, তাতারীদের কোনো প্রতিশ্রুতি নেই, তাদের নিরাপত্তা প্রদান মূলত বিপদের কারণ।
لَا يَرْقُبُونَ فِي مُؤْمِنٍ إِلَّا وَلَا ذِمَّةً
"তারা কোনো মুমিনের সঙ্গে আত্মীয়তা ও অঙ্গীকারের মর্যাদা রক্ষা করে না।”৪৫
খলিফা একথাও বুঝতে পেরেছিলেন যে, অধিকার রক্ষার জন্য এমন শক্তি সঞ্চয় করা উচিত, যা অধিকারকে সুরক্ষিত রাখবে। সুতরাং যদি আপনি শক্তি সঞ্চয় না করার কারণে অধিকার খর্ব হয়, তবে নিজেকেই ধিক্কার দিন। কিন্তু আফসোস! খলিফা অনেক পরে তা বুঝতে পেরেছেন।
টিকাঃ
৪৫ সুরা তাওবা: ১০।
📄 হালাকু খানের পক্ষ থেকে কড়া আদেশাবলি
খলিফা বাগদাদবাসীকে নির্দেশ দেবেন, যেন তারা সকল অস্ত্র অর্পণ করে এবং কোনো প্রকার আন্দোলন বা প্রতিরোধ না করে। এটি একটি সহজ বিষয় ছিল। কারণ, বাগদাদবাসী অস্ত্রবহন করতে পারত না এবং তাতারীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার প্রতি তাদের কোনো আগ্রহ ছিল না।
খলিফাকে বন্দী করে বাগদাদ নিয়ে যাওয়া হবে। যেন তিনি তাতারীদেরকে আব্বাসীদের ধন-সম্পত্তির সন্ধান দেন। স্বর্ণ, রুপা, মূল্যবান আসবাবপত্র এবং রাজপ্রাসাদ ও বাইতুল মালের দামি জিনিসপত্রের সংবাদ দেন।
খলিফার চোখের সামনে তার দুই সন্তানকে হত্যা করা হবে। নির্দেশমতো তা-ই করা হয়। তার চোখের সামনে তার বড় ছেলে আহমদ আবুল আব্বাস ও মেঝো ছেলে আবদুর রহমান আবুল ফাজায়েলকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। আর তৃতীয় ছেলে মুবারক আবুল মানাকেবকে বন্দী করা হয়। অনুরূপ তিন কন্যা ফাতেমা, খাদিজা ও মারয়ামকেও বন্দী করা হয়।
বাগদাদ থেকে নির্দিষ্ট কতিপয় লোককে ডেকে আনা হয়। ইবনে আলকামী এদের নামের তালিকা হালাকু খানকে দিয়েছিলেন। তারা ছিল হাদীস বিশারদ। ভেতরে ভেতরে ইবনে আলকামী তাদের প্রচণ্ড ঘৃণা করত। বাস্তবেই তাদের সবাইকে ডেকে আনা হয়। তারা এক এক করে ঘর থেকে বের হয়। সঙ্গে তাদের সন্তান ও স্ত্রীরাও বের হয়। বাগদাদের বাইরে কবরস্থানের পাশে তাদের নিয়ে ছাগল জবাই করার মত জবাই করা হয়। আর তাদের স্ত্রী-সন্তানদের বন্দী কিংবা হত্যা করার জন্য গ্রেপ্তার করা হয়। আপনি যেভাবেই দেখুন না কেন, এটি ছিল হৃদয়বিদারক মর্মন্তুদ ঘটনা।
এই প্রক্রিয়ায় বিশ্বের অন্যতম আলেমে দ্বীন, দারুল খেলাফতের উস্তাদ শায়েখ মুহিউদ্দীন ইউসুফ ইবনে শায়েখ আবুল ফরজ ইবনে জাওযী রহ. এবং তার তিন সন্তান আবদুল্লাহ, আবদুর রহমান ও আবদুল করীমকেও জবাই করা হয়। মুজাহিদ উদ্দীন আইবেক ও তার সঙ্গী সুলাইমান শাহকে জবাই করা হয়, যে দুইজন বাগদাদে সর্বপ্রথম জিহাদের ডাক দিয়েছিলেন। জবাই করা হয় খলিফাতুল মুসলিমীনের উস্তাদ ও অভিভাবক সদর উদ্দীন আলী ইবনে নায়ার রহ. কে। এরপর মসজিদের খতিব, ইমাম ও হাফেজে কুরআনদের জবাই করা হয়!!
এসব কিছু খলিফার চোখের সামনে সংঘটিত হয়। খলিফা নিথর চোখে নির্মম জবাইযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করছিলেন। আমি জানি না, খলিফা ব্যথা, লজ্জা, লাঞ্ছনা ও ভয় কি গোপন করেছিলেন? নিঃসন্দেহে রাজ্য পরিচালনার রূপরেখা ভিন্ন হতো, যদি খলিফা জানতেন যে, শেষ পরিণাম এমন হবে। কিন্তু আল্লাহর অবধারিত নীতি—'অতীত কখনো ফিরে আসে না'। এরপর খলিফা দেখতে পান যে, হালাকু খান ইবনে আলকামীর সঙ্গে সহানুভূতিপূর্ণ আচরণ করছে। তাদের মাঝে গভীর বন্ধুত্ব। এতক্ষণে খলিফার সামনে এসব কিছুর রহস্য দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট হয়। অযোগ্যকে দায়িত্ব প্রদানের ফলাফল তিনি জানতে পারেন। কিন্তু বড্ড দেরি হয়ে যায়!!