📄 দ্বিতীয় বাধা
এটি প্রথম বাধার চেয়ে জটিল ও কঠিন ছিল। দ্বিতীয় বাধাটি হলো, তৃতীয় দলটিকে বাগদাদ পৌঁছতে হলে প্রথমত তুরস্কের পাঁচশো কিলোমিটার, অতঃপর ইরাকের পাঁচশো কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হবে। এই সুদীর্ঘ এক হাজার কিলোমিটার পথ হলো মুসলিম অধ্যুষিত!! অর্থাৎ বাগদাদ পৌঁছতে হলে মুসলিমবিশ্বের এক হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হবে। ভুলবেন না, আমরা এমন যুগের আলোচনা করছি, যখন কোনো যাত্রীবাহী জাহাজ ছিল না এবং আকাশপথে নিরাপদ ভ্রমণের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। এই দলটি সর্বনিম্ন যে বিপদের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে, তা হলো, তাদের গোপন দুরভিসন্ধি প্রকাশ পেয়ে যাবে। ফলে তারা আকস্মিক আক্রমণের সুযোগ হারিয়ে ফেলবে এবং আব্বাসী বাহিনী তাদের পৌঁছার পূর্বে মোকাবেলার প্রস্তুতি গ্রহণ করবে। আর বৃহত্তর যে বিপদ তাদের সামনে অপেক্ষা করছিল তা হলো, সুবিশাল মুসলিম জনপদসমূহ তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে। কারণ, পথিমধ্যে অবস্থিত সকল গোষ্ঠী হলো মুসলিম সম্প্রদায়। অথবা আক্রমণের জন্য গোপন ফাঁদ আঁটবে। ভেবে দেখুন, তারা এমন ভূমিতে প্রবেশ করছে, ইতিপূর্বে যেখানে তারা একবারের জন্যও আসেনি। কিন্তু সুবহানাল্লাহ! আল্লাহর কী মহিমা! এর কোনোটিই ঘটেনি। পোয়গেয়ট তার দলবলসহ প্রায় ৯৫ ভাগ রাস্তা (তথা প্রায় ৯৫০ কিলোমিটার পথ) অতিক্রম করে চলে এসেছে। কিন্তু আব্বাসী সাম্রাজ্য টেরও পায়নি। পোয়গেয়ট বাগদাদের উত্তর-পশ্চিমে মাত্র ৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে। যখন হালাকু ও পোয়গেয়ট উভয় দল বাগদাদ পৌঁছতে মাত্র একদিনের পথ বাকি, তখন আব্বাসীরা বিষয়টি অনুধাবন করে!!
আমরা যদি বলি যে, হালাকু খানের দল পাহাড়-পর্বতের আড়ালে আত্মগোপন করে তাতারী অধ্যুষিত অঞ্চল অতিক্রম করেছে, তাহলে পোয়গেয়টের আকস্মিক বাগদাদ আগমনের কী ব্যাখ্যা দেব?! পোয়গেয়টের দল নিরাপদে মুসলিম ভূখণ্ড পাড়ি দেওয়া দুটি মহা বিপদের বার্তা বহন করে-
প্রথম বিপদ : মুসলিমবিশ্ব সম্পূর্ণরূপে গোয়েন্দামুক্ত হয়ে পড়েছে। একথা সুস্পষ্ট যে, রণশাস্ত্র ও সমরবিদ্যা সম্পর্কে আব্বাসী বাহিনীর ন্যূনতম জ্ঞান ছিল না।
দ্বিতীয় বিপদ: আলাতোলিয়া ও মসুলের নেতৃবর্গের পক্ষ থেকে বড় ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা হয়েছে। আর তাদের এই বিশ্বাসঘাতকতা তাতারী বাহিনীর দ্বার খুলে দিয়েছে। ফলে কোনো প্রতিরোধ দানা বাধেনি। তাতারীরা ধীরশান্ত মনে বাগদাদে অনুপ্রবেশ করে। যেন তারা বনভোজনের যাত্রা করছে। বাগদাদ খেলাফতের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকায় পথিমধ্যে তারা কোনো হত্যাকাণ্ড ঘটায়নি। আর তাদের অনিষ্ট থেকে সাময়িকভাবে বাঁচতে পেরেই সবাই সন্তুষ্ট থাকে। পরবর্তী বিপদের আশঙ্কায় কেউ তাদের বিরুদ্ধে সাহসী ভূমিকা রাখে না।
এটি ছিল আলাতোলিয়ার আমীর কেকেভাস ছানী ও কালাজ আরাসলান রাবে' এর পক্ষ থেকে চরম বিশ্বাসঘাতকতা এবং মসুলের আমীর বদর উদ্দীনের পক্ষ থেকে জঘন্য প্রতারণা।
বদর উদ্দীন লুলু কেবল তাতারীদের সম্মান প্রদর্শনই করেনি, কেবল দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে তাদের সেবাযত্নই করেনি, বরং আব্বাসী শাসন থেকে ইরাকমুক্ত করার জন্য তাতারীদের সঙ্গে একদল সেনাও পাঠিয়েছে!!
এখানে একটি কথা উল্লেখ করা অতি গুরুত্বপূর্ণ মনে করছি। তা হলো, যখন বদর উদ্দীন লুলু এই বিশ্বাসঘাতকতা করে, তখন তার বয়স ছিল আশি বছর। কেউ কেউ বলেন একশো বছর!! আরও উল্লেখের বিষয় হলো, এই বিশ্বাসঘাতকতার কয়েক মাস পরই সে ইন্তেকাল করে!!!
আল্লাহ তা'আলা আমাদের সবাইকে শুভ সমাপ্তি দান করুন। এই ছিল তাতারী বাহিনীর বাগদাদ আক্রমণের পূর্বপ্রস্তুতি。
📄 বাগদাদ অধঃপতনের কারণ
তৎযুগে বাগদাদ ছিল পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী সুরক্ষিত শহর। এর প্রাচীর ছিল ইস্পাতকঠিন। তা ছিল পাঁচ যুগ পূর্বেকার মুসলিম খেলাফতের রাজধানী।
শহরের সুরক্ষার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম ও প্রচুর অর্থ ব্যয় করা হয়। কিন্তু হায় আফসোস! শত আফসোস এই সুরক্ষিত শহরটির প্রতি!!
শহরের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজন ছিল শক্তিশালী কিছু লৌহমানব। কিন্তু সেই যুগে লৌহমানবের স্বল্পতা দেখা দিয়েছিল! আব্বাসী খেলাফত আমলে কে এই সুবিশাল সাম্রাজ্যের অধিকারী ছিল? তিনি ছিলেন বনী আব্বাসের শেষ ও সাইত্রিশতম খলিফা। তিনি ছিলেন মুসতা'সিম বিল্লাহ!
কী মহান তার নাম 'মুসতা'সিম বিল্লাহ' (আল্লাহর আশ্রয়গ্রহণকারী) কী মহান তার উপাধি 'খলিফাতুল মুসলিমীন' (মুসলমানদের প্রতিনিধি)।
কোথায় খলিফা মুস্তাসিম বিল্লাহর খেলাফতের (প্রতিনিধিত্বের) প্রতিফলন? আপনি যদি সীরাতের কিতাবাদি-যেমন: সুয়ূতী রহ. রচিত তারীখুল খুলাফা, ইবনে কাছীর রহ. রচিত আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ইত্যাদি কিতাবাদিতে-খলিফার গুণাবলি পাঠ করেন, তাহলে একটি অদ্ভুত বিষয় জানতে পারবেন। দেখতে পাবেন, তারা ব্যক্তিগত জীবন ও সামাজিক জীবনে একজন শ্রেষ্ঠ মানুষের বিবরণ তুলে ধরেন। (যেমন: তারা বলেন, উত্তম গুণাবলি সম্পন্ন একজন মানুষ।)
আল্লামা ইবনে কাছীর রহ. বলেন, খলিফা মুসতা'সিম বিল্লাহ ছিলেন সুদর্শন, চরিত্রবান, বিশুদ্ধ আকীদাসম্পন্ন, ন্যায় প্রতিষ্ঠার পিতা মুসতানছির বিল্লাহর অনুসারী, তিনি প্রচুর দান-সদকা করতেন। উলামা মাশায়েখ ও সাধারণ মানুষের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতেন। মাযহাবগত দিক থেকে তিনি সালাফী ছিলেন।
আমি জানি না সালাফী বলে ইবনে কাছীর রহ. কী বুঝাতে চেয়েছেন?! সলফের (পূর্বসূরিদের) ধর্মে কি জিহাদ ছিল না? সলফের (পূর্বসূরিদের) ধর্মে কি জিহাদের প্রস্তুতির নির্দেশ ছিল না? সলফের (পূর্বসূরিদের) ধর্মে কি ভৌগলিক জ্ঞানের পাঠ হতো না? ইরাক, পারস্য, আযারবাইজান ইত্যাদি অঞ্চলে মুসলিম-নিধন দেখে, মুসলমানদের রক্তপাত হতে দেখে কি সলফের (পূর্ববর্তীদের) গায়ে জ্বলন সৃষ্টি হতো না? তারা কি ক্রোধে অগ্নিশর্মা হতেন না?
সলফের ধর্মে কি ঐক্য, ভালোবাসা, ভ্রাতৃিত্ব, শ্রদ্ধা ছিল না? খলিফা মুসতা'সিম বিল্লাহ ব্যক্তিগতভাবে সৎ ও মার্জিত ছিলেন। তবে তার মাঝে কতিপয় গুণাবলির অভাব ছিল। মুসলিম শাসকের মাঝে সেসব গুণাবলির অভাব থাকতে পারে না।
তারা মাঝে রাজনৈতিক সংকট ও জটিলতা নিরসনশক্তির অভাব ছিল। তার মাঝে যথাযথ নেতৃত্বের অভাব ছিল। তার মাঝে উঁচু মনোবল ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার অভাব ছিল। অভাব ছিল দ্বীন প্রচারের ও শত্রুর ওপর জয়লাভের। তার মাঝে উপযুক্ত সময়ে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার অভাব ছিল।
তার মাঝে অনৈক্য দূরীকরণ, ইসলামী ঐক্যের পতাকা উত্তোলন এবং সকলকে এক কাতারে দাঁড় করানোর ক্ষমতা ছিল না।
তার মাঝে সৎসঙ্গী নির্বাচনের অভাব ছিল। ফলে তার চারপাশে অসৎ সঙ্গের ভিড় জমেছিল। মন্ত্রীরা চুরি করত। পুলিশরা অত্যাচার করত। আর সেনাপতিরা ছিল ভীরু।
তার মাঝে দুর্যোগ ও বিপর্যয় রোধ করার ক্ষমতা ছিল না। ফলে ফেতনা-ফ্যাসাদ ব্যাপক হয়েছিল। সরকারি সম্পত্তি লুট হতো। সুদ ও ঘুষের প্রচলন বৃদ্ধি পেয়েছিল। গান-বাদ্য, খেলতামাশা ও আড্ডাখানা বৃদ্ধি পেয়েছিল; এমনকি প্রকাশ্যে এসবের ঘোষণা দেওয়া হতো।
হ্যাঁ! দ্বীনের রুকন আরকান তথা নামাজ, রোজা, যাকাত আদায়ে তিনি ছিলেন সৎপরায়ণ। তার ভাষা ছিল সুমিষ্ট। তিনি গরিব-গুরাবা ও আলেম-উলামাদের ভালোবাসতেন। এসব কিছু তার দায়িত্ব পরায়ণতার পরিচায়ক ছিল। তবে দেশ জাতি ও উম্মাহর প্রশ্নে তার দায়িত্বপরায়ণতা কোথায় ছিল?!
দেশ ও জাতির প্রশ্নে খলিফা ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছিলেন।
তখনো ইরাকে সাধারণ জনগণ ছাড়াই এক লক্ষ বিশ হাজার সৈন্য অবস্থানরত ছিল। বাগদাদ অবরোধকারী তাতারীদের সৈন্য সংখ্যা ছিল দুই লক্ষ। তখন তাতারীদের মুকাবেলায় রুখে দাঁড়ানো খুবই সহজ ছিল। কিন্তু খলিফার হৃদয় ছিল পরাজিত। সেই প্রাণ তিনি হারিয়ে ফেলেছিলেন, যা শত্রুর মুকাবেলায় রুখে দাঁড়াতে শক্তি জোগায়। তাই তিনি তার জাতিকে জিহাদের শিক্ষা দেননি এবং সমরবিদ্যায় পারদর্শী করেননি।
কোথায় আজ ট্রেনিং-ক্যাম্প, যা বর্তমান যুবক সমাজকে প্রস্তুত করবে?! কেন আজ সাঁতার কাটা, তীর নিক্ষেপ ও ঘোড়া-দৌড়ের প্রতিযোগিতা হয় না?! কোথায় জাতির নৈতিক সংগ্রামের জীবনযাপনের প্রস্তুতি?!
আমি খলিফার পক্ষাবলম্বন করছি না।
খলিফা মুসতা'সিম বিল্লাহ প্রায় ষোলো বছর স্বদেশ শাসন করেছেন।
তিনি হঠাৎ কোনো নির্দেশ দেননি। তড়িগতিতেও কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি।
তিনি লালিত-পালিত হয়েছেন খলিফা হওয়ার জন্য। তিনি রাজত্বভার গ্রহণ করেছিলেন একত্রিশ বছর বয়সে। তখন তিনি ছিলেন টগবগে পরিপক্ব সচেতন যুবক। দেশ পরিচালনার জন্য তিনি পূর্ণ সুযোগ পেয়েছিলেন। পূর্ণ ষোলো বছর তিনি দেশ শাসন করেন। সুতরাং যদি তিনি যোগ্য হন তাহলে তার দায়িত্ব হলো প্রতিশ্রুতি দেওয়া, দেশকে শক্তিশালী করা, দেশের ভাবগাম্ভীর্য তুলে ধরা, মর্যাদা উন্নত করা, সৈন্যদলকে প্রস্তুত করা, দেশের পতাকা উত্তোলন করা।
আর যদি তিনি যোগ্য না হন, যদি তিনি সৎ হয়ে থাকেন তাহলে তার উচিত হলো, যোগ্য লোকের জন্য ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়া। এটা কোনো পরিবার বা গোত্রের বিষয় নয়, এটা এক জাতির প্রশ্ন, ...বিশাল জাতির বিষয়! এমন এক জাতির বিষয়, মানবকল্যাণে যাদের সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু খলিফা এই দুই কাজের কোনো একটিও করেননি। নিজে যোগ্যতার পরিচয় দেননি। আবার ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়াননি। এ কারণেই তাকে মূল্য দিতে হয়েছে। আর যে জাতি তার প্রতি সন্তুষ্ট ছিল, আবশ্যম্ভাবীরূপে তাদেরও মূল্য দিতে হয়েছে।
যে পরিমাণ আমানত নষ্ট হয়েছে, খলিফা ও তার জাতিকে সে পরিমাণ মূল্য দিতে হবে? আপনারা দেখবেন সেই মূল্য কত বৃহদকার হয়!!
দেশে অস্ত্র কেনার বা তৈরি করার জন্য অর্থের কোনো অভাব ছিল না। এমনকি গুদাম গুদাম অস্ত্র পড়ে ছিল। তবে হয়তো তা পুরোনো ক্ষয়প্রাপ্ত অস্ত্র, যা বহুদিন ধরে পড়ে আছে, যা আর শান দেওয়া হয়নি। অথবা নতুন অস্ত্র, যা একবারও ব্যবহার করা হয়নি, আফসোস! (চরম আক্ষেপ) কেউ অস্ত্র প্রশিক্ষণ নেয়ইনি!!
ফলে আব্বাসী সৈন্যবাহিনী দুর্বল ক্ষীণকায় হয়ে পড়েছে। যারা ছোট কোনো রাজত্ব সুরক্ষিত রাখার যোগ্য ছিল না; সুবিশাল খেলাফত তো বহু দূরের কথা! এই ছিল বাগদাদ নগরীর খলিফার অবস্থা!!
আর বাগদাদের অবস্থা কী ছিল? বাগদাদের রাজত্ব কেমন ছিল?
বাগদাদের হুকুমত সৈন্যবাহিনীর মতই দুর্বল রুগ্ন ও শীর্ণকায় ছিল।
মন্ত্রী পরিষদের মনমতো পরিচালিত হতো তাদের লক্ষ্যই ছিল ধন-সম্পদ ও অর্থ-কড়ি সঞ্চয় করা, ক্ষমতার বাগডোর সর্বত্র ছড়িয়ে রাখা, সাধারণের গলায় রাজত্বের রশি ঝুলিয়ে রাখা, তাদের সঙ্গে যাচ্ছেতাই ব্যবহার করা এবং অট্টালিকা, ক্ষমতা কিংবা নারীর জন্য লড়াই করা। এই অধঃপতিত মন্ত্রীসভার প্রধান ছিলেন বিশ্বাসঘাতক প্রধানমন্ত্রী, যিনি দেশ ও জাতিকে বিক্রি করে দিয়েছিলেন। যিনি উম্মাহর শত্রুদের বন্ধু, পরবর্তী প্রজন্মের শত্রুদের বন্ধু। মন্ত্রীদের সঙ্গে সাধারণ মুসলমান, যারা তাদের জান-মাল দিয়ে রক্ষা করে, তাদের সুসম্পর্ক ছিল না। তাদের সঙ্গে ভাইয়ের মতো সম্পর্ক ছিল না; বরং গোলাম মুনিবের সম্পর্ক ছিল。
📄 প্রজাদের আমল অনুযায়ী শাসক নিযুক্ত হয়
বাগদাদের নাগরিকদের অবস্থা কী ছিল? তাদের স্বভাব-প্রকৃতি কেমন ছিল? তাদের উচ্চাভিলাষ কেমন ছিল? আপনারা ভাববেন না, তারা এক দুর্বল বা পরাজিত খলিফার মাজলুম প্রজা ছিল।
তৎকালে বাগদাদে অসংখ্য জনগণ বাস করত। তাদের সংখ্যা ছিল কমপক্ষে তিন কোটি। এ কারণেই তৎকালে বাগদাদ ঘনবসতিসম্পন্ন বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবে গণ্য করা হতো। সুতরাং বোঝা গেল, বাগদাদে জনশক্তির কোনো অভাব ছিল না। কিন্তু তারা ছিল বিলাসপ্রিয়। তারা শান্তশিষ্ট ও আরামপ্রিয় জীবনযাপন করত। দ্বীনদারিত্বের অবস্থা এই ছিল যে, তারা ইলমে দ্বীন অর্জন করত, মসজিদে নামাজ আদায় করত, কুরআন তেলাওয়াত করত। তবে 'এ'লায়ে কালিমাতুল্লাহ' তথা আল্লাহর দ্বীনকে সমুন্নত করার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে ফরিজা নির্ধারণ করেছেন তথা জিহাদকে তারা ভুলে গিয়েছিল। পক্ষান্তরে দ্বীনদারির সঙ্গে যাদের সম্পর্ক ছিল না, তাদের অবস্থা ছিল, তারা মনচাহে জীবনযাপন করত। ভোগ বিলাসে মত্ত ছিল। খাওয়া-দাওয়া, পোশাক-পরিচ্ছদ, দাস-দাসী, ঘর-বাড়ি ইত্যাদিতে তারা ডুবে ছিল। কেউ কেউ তো কুরআন হাদীস ছেড়ে গান-বাজনা শ্রবণ করত। কেউ মদ পান করত, কেউ চুরি করত, কেউ অপরের প্রতি জুলুম করত। এর চেয়ে জঘন্য বিষয় হলো, তারা দীর্ঘ চল্লিশ বছর ধরে পার্শ্ববর্তী দেশ আফগানিস্তান, উজবেকিস্তান, তুরমিনিস্তান, পারস্য, আযারবাইজান ও শিসানবাসীর গগন জাগানিয়া আর্তনাদ শুনে একটুও সহানুভূতি প্রকাশ করেনি; তাদের আত্মমর্যাদায় একটুও আঘাত হানেনি। তারা মুসলিম অবলা হাজার হাজার নারীদের বন্দীর আওয়াজ শুনে একটুও নড়ে চড়ে বসেনি। মুসলমান সন্তানদের ছিনিয়ে নিতে দেখে তাদের হৃদয়াত্মা একটুও ব্যথিত হয়নি। ধন-সম্পত্তি চুরি হতে দেখে, ঘর-বাড়ি ধ্বংস হতে দেখে, মসজিদ জ্বালিয়ে দিতে দেখে তাদের ভেতরে 'আহ!' শব্দও উচ্চারিত হয়নি; এমনকি তারা তাদের খলিফা মুসতা'সিম বিল্লাহকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাতারীদের সহযোগিতা করতে দেখে নীরব ভূমিকা পালন করেছিল। তার এসব কিছু দেখে-শুনে, বরং এরচেয়ে বহু গুণ বেশি অত্যাচার জুলুম দেখে একটুও হরকত করেনি; পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।
সুতরাং যেমন কর্ম ফল তেমনই হওয়া আবশ্যক ছিল!!
📄 যেমন কর্ম তেমন ফল
শীঘ্রই এমন এক সময় আসবে, যখন এই জনপদবাসী অন্যান্য মুসলিম জাতি যে আজাব ভোগ করেছে, হুবহু তা-ই ভোগ করবে। তখন তাদের জন্য একজন মুসলমানও সহানুভূতি প্রদর্শন করবে না। এমনকি তাতারীরা তাদের বিরুদ্ধে সহযোগিতা প্রদান করবে, যেমন আজ তারা তাদের ভাইদের বিরুদ্ধে তাতারীদের সহযোগিতা করছে। এভাবেই চলতে থাকবে।
কেউ বলবে না, তারা নিজেদের কারণে পরাজিত হয়েছে; বরং বিষয় হলো, যেই জনপদ শরীয়ত বিরুদ্ধ কাজ মেনে নিতে পারে, তাদের বেঁচে থাকার কোনো অধিকার থাকে না। যেই জাতি কেবল জীবন ভোগ করতে জানে, এই উদ্দেশ্যেই বেঁচে থাকে, সমাজে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়াবার কোনো অধিকার তাদের থাকে না।
কোথায় উলামা-মাশায়েখের জামাত?
কোথায় বীর যোদ্ধারা?
কোথায় যুবক-সমাজ?
কোথায় মুজাহিদ ফি সাবিলিল্লাহ?
কোথায় সৎকাজের আদেশ দাতারা?
কোথায় অন্যায় কাজে বাধা প্রদানকারী?
কোথায় ঘুণেই ধরা সমাজের সংশোধনী পদক্ষেপ?
কোথায় দ্বীনের সঠিক বুঝ?
বাগদাদে কি কোনো জ্ঞানী ব্যক্তি ছিল না?
এই ছিল বাগদদের অধঃপতন। আর বাগদাদের বাইরের অবস্থা আপনারা জানেন। সেথায় তাতারী বাহিনী মুসলমানদের শাস্তি প্রদানের জন্য অগ্নি প্রজ্বলন করছিল। আর মুসলমানরা নীরবে শাস্তি ভোগ করছিল!!