📄 তৃতীয় দল
তৃতীয় দলটি (বর্তমান তুরস্কের উত্তরে অবস্থিত) আলাতোলিয়ার সীমান্ত এলাকায় নিয়োজিত ছিল। ইতিপূর্বে যেই দলটি ইউরোপ জয়ের দায়িত্ব পালন করেছিল। তাতারী নেতা পাতো ছিল এই দলের প্রধান। এ দলের দায়িত্ব ছিল উত্তরাঞ্চল থেকে দক্ষিণমুখী হয়ে বাগদাদের উত্তর থেকে বাগদাদ পৌঁছা। অতঃপর পশ্চিম দিক থেকে বাগদাদ অবরোধ করা। এভাবেই বাগদাদ চারদিক থেকে অবরুদ্ধ হয়ে পড়বে; পূর্বে হালাকু খান, পূর্ব দক্ষিণে কাতবুগা ও পশ্চিমে পাতোর মাধ্যমে।
📄 তৃতীয় দলের সম্মুখে বড় দুটি বাধা
কিন্তু তৃতীয় দলটির সম্মুখে বড় দুটি বাধা ছিল।
📄 প্রথম বাধা
তাদের জন্য সময় নিয়ন্ত্রণ ছিল অত্যন্ত জরুরি অর্থাৎ হালাকু বাহিনী যে সময় বাগদাদ পৌঁছবে ঠিক সে সময়েই তাদেরও বাগদাদে পৌঁছতে হবে। অন্যথায় তারা যদি দ্রুত বাগদাদ পৌঁছে, তবে আব্বাসীদের হাতে ধরা পড়ে যাবে। আর যদি পৌঁছতে বিলম্ব করে, তবে হালাকু বাহিনী একাকী ধরা পড়ে যাবে! মুহূর্তের মাঝে দ্রুত সংবাদ পৌঁছাবার কোনো মাধ্যম তখন ছিল না। ঘোড়া বা বাহন ব্যতীত দ্রুত পৌঁছাবার কোনো উপায় ছিল না; তখন বর্তমান সময়ের মতো মসৃণ পথও ছিল না। যদি আমরা এসব বিষয় পর্যালোচনা করে দেখি, তবে জানতে পারব, একই মুহূর্তে উভয় দলের বাগদাদ পৌঁছা ছিল অত্যন্ত দুরূহ ব্যাপার। বিষয়টি অতি দুরূহ হওয়া সত্ত্বেও পাতো তার হিসাববিদ্যার সূক্ষ্মতা ও সময়জ্ঞানের নিপুণতার দরুন উপযুক্ত সময়ে বাগদাদ পৌঁছে!
📄 দ্বিতীয় বাধা
এটি প্রথম বাধার চেয়ে জটিল ও কঠিন ছিল। দ্বিতীয় বাধাটি হলো, তৃতীয় দলটিকে বাগদাদ পৌঁছতে হলে প্রথমত তুরস্কের পাঁচশো কিলোমিটার, অতঃপর ইরাকের পাঁচশো কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হবে। এই সুদীর্ঘ এক হাজার কিলোমিটার পথ হলো মুসলিম অধ্যুষিত!! অর্থাৎ বাগদাদ পৌঁছতে হলে মুসলিমবিশ্বের এক হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হবে। ভুলবেন না, আমরা এমন যুগের আলোচনা করছি, যখন কোনো যাত্রীবাহী জাহাজ ছিল না এবং আকাশপথে নিরাপদ ভ্রমণের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। এই দলটি সর্বনিম্ন যে বিপদের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে, তা হলো, তাদের গোপন দুরভিসন্ধি প্রকাশ পেয়ে যাবে। ফলে তারা আকস্মিক আক্রমণের সুযোগ হারিয়ে ফেলবে এবং আব্বাসী বাহিনী তাদের পৌঁছার পূর্বে মোকাবেলার প্রস্তুতি গ্রহণ করবে। আর বৃহত্তর যে বিপদ তাদের সামনে অপেক্ষা করছিল তা হলো, সুবিশাল মুসলিম জনপদসমূহ তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে। কারণ, পথিমধ্যে অবস্থিত সকল গোষ্ঠী হলো মুসলিম সম্প্রদায়। অথবা আক্রমণের জন্য গোপন ফাঁদ আঁটবে। ভেবে দেখুন, তারা এমন ভূমিতে প্রবেশ করছে, ইতিপূর্বে যেখানে তারা একবারের জন্যও আসেনি। কিন্তু সুবহানাল্লাহ! আল্লাহর কী মহিমা! এর কোনোটিই ঘটেনি। পোয়গেয়ট তার দলবলসহ প্রায় ৯৫ ভাগ রাস্তা (তথা প্রায় ৯৫০ কিলোমিটার পথ) অতিক্রম করে চলে এসেছে। কিন্তু আব্বাসী সাম্রাজ্য টেরও পায়নি। পোয়গেয়ট বাগদাদের উত্তর-পশ্চিমে মাত্র ৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে। যখন হালাকু ও পোয়গেয়ট উভয় দল বাগদাদ পৌঁছতে মাত্র একদিনের পথ বাকি, তখন আব্বাসীরা বিষয়টি অনুধাবন করে!!
আমরা যদি বলি যে, হালাকু খানের দল পাহাড়-পর্বতের আড়ালে আত্মগোপন করে তাতারী অধ্যুষিত অঞ্চল অতিক্রম করেছে, তাহলে পোয়গেয়টের আকস্মিক বাগদাদ আগমনের কী ব্যাখ্যা দেব?! পোয়গেয়টের দল নিরাপদে মুসলিম ভূখণ্ড পাড়ি দেওয়া দুটি মহা বিপদের বার্তা বহন করে-
প্রথম বিপদ : মুসলিমবিশ্ব সম্পূর্ণরূপে গোয়েন্দামুক্ত হয়ে পড়েছে। একথা সুস্পষ্ট যে, রণশাস্ত্র ও সমরবিদ্যা সম্পর্কে আব্বাসী বাহিনীর ন্যূনতম জ্ঞান ছিল না।
দ্বিতীয় বিপদ: আলাতোলিয়া ও মসুলের নেতৃবর্গের পক্ষ থেকে বড় ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা হয়েছে। আর তাদের এই বিশ্বাসঘাতকতা তাতারী বাহিনীর দ্বার খুলে দিয়েছে। ফলে কোনো প্রতিরোধ দানা বাধেনি। তাতারীরা ধীরশান্ত মনে বাগদাদে অনুপ্রবেশ করে। যেন তারা বনভোজনের যাত্রা করছে। বাগদাদ খেলাফতের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকায় পথিমধ্যে তারা কোনো হত্যাকাণ্ড ঘটায়নি। আর তাদের অনিষ্ট থেকে সাময়িকভাবে বাঁচতে পেরেই সবাই সন্তুষ্ট থাকে। পরবর্তী বিপদের আশঙ্কায় কেউ তাদের বিরুদ্ধে সাহসী ভূমিকা রাখে না।
এটি ছিল আলাতোলিয়ার আমীর কেকেভাস ছানী ও কালাজ আরাসলান রাবে' এর পক্ষ থেকে চরম বিশ্বাসঘাতকতা এবং মসুলের আমীর বদর উদ্দীনের পক্ষ থেকে জঘন্য প্রতারণা।
বদর উদ্দীন লুলু কেবল তাতারীদের সম্মান প্রদর্শনই করেনি, কেবল দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে তাদের সেবাযত্নই করেনি, বরং আব্বাসী শাসন থেকে ইরাকমুক্ত করার জন্য তাতারীদের সঙ্গে একদল সেনাও পাঠিয়েছে!!
এখানে একটি কথা উল্লেখ করা অতি গুরুত্বপূর্ণ মনে করছি। তা হলো, যখন বদর উদ্দীন লুলু এই বিশ্বাসঘাতকতা করে, তখন তার বয়স ছিল আশি বছর। কেউ কেউ বলেন একশো বছর!! আরও উল্লেখের বিষয় হলো, এই বিশ্বাসঘাতকতার কয়েক মাস পরই সে ইন্তেকাল করে!!!
আল্লাহ তা'আলা আমাদের সবাইকে শুভ সমাপ্তি দান করুন। এই ছিল তাতারী বাহিনীর বাগদাদ আক্রমণের পূর্বপ্রস্তুতি。