📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 তৃতীয় পদক্ষেপ : মুসলমানদের বিরুদ্ধে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ

📄 তৃতীয় পদক্ষেপ : মুসলমানদের বিরুদ্ধে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ


ইসলামী খেলাফতের পতন ঘটাতে সড়ক প্রস্তুতি, প্রচারাভিযানের সরঞ্জামাদি সরবরাহ ও তাতারীদের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার বাস্তবায়ন ছাড়াও হালাকু খান একটি ভয়াবহ যুদ্ধের আশ্রয় নেয়। তা হলো, মুসলমানদের বিরুদ্ধে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। এই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ পরিচালনার জন্য হালাকু খানের সম্মুখে বহু পথ উন্মুক্ত ছিল। উদাহরণস্বরূপ-
এক. ইরাকের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহে কিছু সন্ত্রাসী প্রচারণা চালানো। এর একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল, চেঙ্গিজ খান ও উকিতাইয়ের যুগের তাতারী হামলার ভয়াবহতা স্মরণ করিয়ে দেওয়া এবং আতঙ্ক সৃষ্টি করা। কারণ, তাতারীদের প্রথম আক্রমণ-যা চেঙ্গিজখানের যুগে সংঘটিত হয়েছিল ত্রিশ ঊর্ধ্ব বছর পূর্বে সংঘটিত হয়েছিল। তাই হালাকু খানের যুগের (বর্তমান সময়ের) বহু মুসলমান তাতারীদের সেই ভয়াবহতা ও নিষ্ঠুরতা পর্যবেক্ষণ করেনি। তারা সেসব ঘটনা তাদের বাপ-দাদাদের মুখে কল্পকাহিনির মতো শুনেছে মাত্র। শ্রবণকারী তো প্রত্যক্ষদর্শীর মতো নয়। আর জ্বালাও পোড়াও ও ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি উকিতাই এর যুগে সংঘটিত তাতারীদের দ্বিতীয় আক্রমণের মূল লক্ষ্য ছিল না। কারণ, এ যুগে তাতারীরা কেবল রাশিয়া ও পূর্ব ইউরোপ অভিমুখে ব্যস্ত ছিল। ফলে এই দ্বিতীয় আক্রমণে মুসলমানরা ততটা প্রভাবিত হয়নি।
এ কারনেই হালাকু খান কতিপয় ধ্বংসাত্মক ও সন্ত্রাসবাদী সামরিক কার্যকলাপ পরিচালনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। যাতে মুসলমানরা জানতে পারে যে, আজও তাতারীরা দুর্বার, অপ্রতিরোধ্য, ক্ষমতাশালী ও দাপুটে।
উদাহরণস্বরূপ, ৬৫০ হিজরীতে তাতারী বাহিনী আলজেরিয়া ও উত্তর ইরাকে অবস্থিত সারুজ ও সাঞ্জার অঞ্চলে আক্রমণ করে। ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ, লুটতরাজ চালায় ও অঞ্চলবাসীকে গ্রেপ্তার করে। এক বাণিজ্যিক কাফেলার ছয় লক্ষ স্বর্ণমুদ্রারও বেশি অর্থ আত্মসাৎ করে। [বর্তমান যুগে সম্পদ বাজেয়াপ্তের নামে যে আত্মসাৎ চলে, তা এরই প্রতিচ্ছবি।]
নিঃসন্দেহে এটি আব্বাসী খেলাফতের জন্য ছিল বড় ক্ষতি এবং তাতারী বাহিনীর জন্য যুদ্ধের প্রস্তুতি। উপরন্তু এ সকল আক্রমণের ফলে তাতারীদের কাছে ইরাকের পথ-ঘাট তথা ভৌগলিক অবস্থান সুস্পষ্ট ফুটে উঠেছিল। এসব কিছুর উদ্দেশ্য ছিল মুসলমানদের অন্তরে ভীতি-সঞ্চার করা। সুতরাং বলা যায়, এসব কোনো সাধারণ যুদ্ধ ছিল না; বরং এসব ছিল অস্তিত্বের যুদ্ধ। ফলে মুসলমানদের চেয়ে তাতারীদের শক্তি বহুকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছিল। সবাই একটি আশু মহাযুদ্ধের অপেক্ষা করছিল। ইতিহাসে এমন যুদ্ধের পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকে।
দুই. অশুভ-মিডিয়া যুদ্ধ। তাতারীদের কতিপয় অনুসারী মুসলিম দেশসমূহে তাতারীদের অস্বাভাবিক শক্তি, সামর্থ্য ও অলৌকিক দক্ষতার কথা প্রচার করত। মুসলমান ও তাতারীদের শক্তির মাঝে পার্থক্য তুলে ধরত। সে যুগে তাদের এই প্রচারণা কৌশল মিডিয়ার কাজ দেয়। মূলত তৎকালে প্রচারণার মাধ্যম ছিল কবি, সাহিত্যিক ও ইতিহাসবিদগণ। তৎকালীন কবি, সাহিত্যিক ও ঐতিহাসিকদের লিখনী ও রচনায় তাতারী আক্রমণে মুসলিমনিধনের ঘটনা বিবৃত হয়। যেমন-
• তাতারীদের কাছে গোটা বিশ্বের খবরাখবর পৌঁছত। কিন্তু তাদের সব খবর বিশ্ববাসীর কাছে পৌছত না। [লেখক বোঝাতে চেয়েছেন যে, তাতারী গুপ্তচর খুবই শক্তিশালী ছিল।]
• তাতারীরা নিজেদের অভিপ্রায় গোপন রাখত। কোথাও আক্রমণ করতে হলে একযোগে আক্রমণ করত। ফলে শহরবাসীর অজ্ঞাতসারে তারা শহরে প্রবেশ করত।
• তাতারী মহিলারা পুরুষের মতো লড়াই করত। [ফলে মুসলিম পুরুষরা তাতারী মহিলাদের পর্যন্ত ভয় করত।]
• তাতারীদের ঘোড়াগুলো খুর দ্বারা মাটি খুঁড়ে গাছের শেকড় ভক্ষণ করত। সেগুলো বার্লি করার দরকার হতো না।
• তাতারীদের আসবাপত্র, খাদ্যদ্রব্য ও খবরাদি সরবরাহ করার প্রয়োজন পড়ত না। কারণ তারা মেষ, ঘোড়া, গবাদি পশু সঙ্গে নিয়ে ভ্রমণ করত।
• তাতারীরা সকল প্রকার গোশত ভক্ষণ করত ... তারা মানুষ ভক্ষণ করত।
নিঃসন্দেহে এ জাতীয় লেখালেখি সাধারণ মানুষের মাঝে ভীতি বিস্তার করত। এমনকি কখনো কখনো তা বিশেষ ব্যক্তিবর্গের মাঝেও প্রভাব সৃষ্টি করত। এটি জাতির নিজ হাতে অর্জিত বিপদ। এমন বিপদ কেউ কোনোদিন ডেকে আনেনি।
তিন. বিশ্বের রাজা-বাদশা ও মুসলিম আমীর-উমারাদের নিকট সতর্কবাণী সম্বলিত চিঠি-পত্র প্রেরণ। সে সকল আমীর ওমারাদের নির্বুদ্ধিতার পরিচায়ক হলো, তারা সে সকল চিঠি-পত্র সাধারণ মানুষের মাঝে প্রকাশ করত। ফলে জনসাধারণের মাঝে 'তাতারীত্রাস' ছড়িয়ে পড়ত। আর তাতারীরা এভাবে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছিল যে, তারা মুনাফিক মুসলিম সাহিত্যিকদের মাধ্যমে এসব চিঠি-পত্র লিখাত। তারা সে যুগের উপযুক্ত ভাষাশৈলীর মাধ্যমে চিঠিগুলো লিখত, যা সহজেই মুসলমানদের বোধগম্য হতো। নিঃসন্দেহে এ পদ্ধতিটি অধিক ক্রিয়াশীল ছিল ভাষান্তর পদ্ধতি অবলম্বনের চেয়ে। যেমন তাতারীরা তাদের চিঠিতে একথা বুঝাবার চেষ্টা করেছে যে, তারা মুসলমান, কাফের নয়। তারা কুরআনের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে। তাদের পূর্বপুরুষগণ মুসলমান এবং তারা মুসলিমবিশ্বের অত্যাচারী জালেম শাসকদের ধ্বংসের জন্য আগমন করেছে তারা কেবল ইরাক স্বাধীনতার জন্যই এসেছে!)। তাতারীদের অত্যাচার ও অবিচারের কথা সুপ্রসিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও এসব কথাবার্তা দুর্বল রোগাক্রান্ত ভীত হৃদয়ের অধিকারীদের মাঝে প্রভাব সৃষ্টি করত। ফলে তারা মুসলিমবিশ্বের ওপর তাতারী আক্রমণকে সহজে মেনে নিত এবং তাদের স্বাধীনতাকামী বিজয়ীদের সংবর্ধনা প্রদান করত।
তাতারীদের এসব চিঠিপত্র সুস্পষ্ট বাস্তবতা বিরোধী ছিল। কিন্তু যে ব্যক্তি আত্মিক অধঃপতনে নিমজ্জিত, তার হাতে এসব চিঠি পড়লে সে যারপরনাই প্রভাবিত হতো।
সেসব চিঠি-পত্রের মধ্য হতে হালাকু খান কর্তৃক জনৈক মুসলিম নেতার নিকট প্রেরিত একটি চিঠি নিম্নে উল্লেখ করছি। হালাকু খান লিখেছে—
“আমরা আল্লাহর সৈন্য।
যে জুলুম ও অত্যাচার করে, সীমালঙ্ঘন ও ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করে এবং আল্লাহর নির্দেশমতো ক্ষমতা পরিচালনা করে না, তার সঙ্গে আমরা যুদ্ধ করি। আমরা বহু দেশ ও জনপদ ধ্বংস করেছি। বহু মানুষ হত্যা করেছি। অসংখ্য নারী-শিশু গ্রেপ্তার করেছি।
সুতরাং হে জীবিতরা, তোমরাও পূর্ববর্তীদের পথেই ধাবিত হতে যাচ্ছ। হে উদাসীনরা, তোমাদেরও সে পথে ধাবিত করা হবে। আমাদের মূল লক্ষ্য শাস্তি প্রদান। রাজত্ব আমাদের উদ্দেশ্য নয়। অত্যাচার অবিচার আমাদের গন্তব্য নয়।
তাতারী সাম্রাজ্যে আমাদের ন্যায়-শাসন সুপ্রসিদ্ধ। আমাদের তলোয়ার থেকে বেঁচে কোথায় পালাবে? আমরা বহু দেশ বিধ্বস্ত করেছি। সন্তানদের ছিনিয়ে নিয়েছি। ধ্বংস করেছি জনপদবাসী। তাদের আস্বাদন করিয়েছি নির্মম আজাব। তাদের বড়দের ছোট করেছি। রাজাকে প্রজা বানিয়েছি।
তোমরা ভাবছ, আমাদের হাত থেকে রক্ষা পাবে। শীঘ্রই জানবে যে, কোন পথে তোমরা অগ্রসর হচ্ছ। অনুগত ব্যক্তিই মুক্তি পাবে।”
একথা নিশ্চিত যে, এ জাতীয় চিঠি কোনো ভীত লোক পাঠ করলে সে যুদ্ধের শক্তি হারিয়ে ফেলবে। আর এটাই ছিল এ জাতীয় চিঠি প্রেরণের মূল লক্ষ্য।
চার. মুসলমানদের বিরুদ্ধে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ সৃষ্টির আরেকটি উপায় ছিল, তাতার, জুজিয়া, আর্মেনিয়া ও অন্যান্য দেশসমূহের মধ্যবর্তী সংঘটিত গোপন চুক্তিপত্রগুলো প্রকাশ করা এবং ইউরোপের ক্রুশেড নেতৃবর্গ কর্তৃক সহযোগিতা প্রদানের আশ্বাস ব্যক্ত করা। এসব চুক্তিনামা প্রকাশ পাওয়ার পর মুসলমানরা একথা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেছিল যে, তাতারীরা বিশ্ববাসীকে ধ্বংস করে ফেলবে। তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার শক্তি কারও নেই। অথচ মুসলমানদের স্বর্ণোজ্জ্বল ইতিহাস একথার সাক্ষ্য প্রদান করে যে, তাতারীদের বিরুদ্ধে মুসলমানরা জয়লাভ করেছিল। আফসোস! মুসলমানরা নিজেদের ইতিহাস ভুলে গিয়েছিল। শত্রুপক্ষ ও তাদের দোসরদের ভয়ে তারা ভীতিবিহ্বল হয়েছিল।
পাঁচ. মুসলমানদের বিরুদ্ধে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ সৃষ্টির আরেকটি পথ ছিল, কতিপয় মুসলিম নেতৃবর্গের পক্ষ থেকে সহযোগিতা প্রদানের আশ্বাস, যা আমরা তাতারীদের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আলোচনা করতে গিয়ে উল্লেখ করেছি। একথা সুস্পষ্ট যে, যখন কোনো মুসলিম জনপদ তাদের নেতাকে তাতারীদের পক্ষাবলম্বন করতে দেখবে, দেখবে সে তার রাজ্য রক্ষার স্বার্থে নিরাপদ পথ অবলম্বন করছে, সে তাতারীদের সঙ্গে চুক্তি আবদ্ধ হচ্ছে, তাদের সহযোগিতা প্রদান করছে, স্বাভাবিকভাবেই তখন তারা মনোবল হারিয়ে ফেলবে, দেশ রক্ষার সাহসিকতা ও উদ্যম হারিয়ে ফেলবে। এ সকল উপায় ও আরও কতিপয় পদ্ধতি অবলম্বন করে তাতারীরা মুসলমানদের অন্তরে 'তাতারীত্রাস' সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিল। এভাবেই অপরাজেয় তাতারীশক্তি মুসলিম ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছিল।

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 চতুর্থ পদক্ষেপ আব্বাসী সৈন্যবাহিনীকে দুর্বলকরণ

📄 চতুর্থ পদক্ষেপ আব্বাসী সৈন্যবাহিনীকে দুর্বলকরণ


হালাকু খান ওযীর মুআইয়িদ উদ্দীন আলকামীর কাছে এই প্রস্তাব পেশ করে যে, আব্বাসী খলীফা মুসতা'সিম বিল্লাহ যেন সামরিক বাহিনীর বাজেট কিছুটা কমিয়ে দেন ও সৈন্যসংখ্যাও কমিয়ে দেন এবং রাষ্ট্রের মানসিকতা যেন যুদ্ধ-বিগ্রহ থেকে ফিরিয়ে নেন; এমনকি তিনি যেন সামরিক শক্তিকে পরিবেশ পরিকল্পনা ও শহরের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড যেমন চাষাবাদ, শিল্প-কারখানা ইত্যাদিতে ব্যয় করেন। যেমন: বর্তমানে আমরা কতিপয় মুসলিম রাষ্ট্রে সেনাবাহিনীকে শাক-সব্জি বপন, পুল-ব্রিজ নির্মাণ ইত্যাদি কাজে ব্যস্ত দেখতে পাই। যুদ্ধ-জিহাদ, লড়াই ইত্যাদি দেশ রক্ষামূলক কাজে তারা ততটা গুরুত্ব প্রদান করে না।
উযীর মুআইয়িদ উদ্দীন আলকামী হালাকু খানের এই প্রস্তাব যথাযথ বাস্তবায়ন করে। তার পক্ষ থেকে এ জাতীয় কাজ সংঘটিত হওয়া ছিল খুব স্বাভাবিক। তবে খলিফা মুসতা'সিম বিল্লাহর পক্ষে এই প্রস্তাব গ্রহণ ছিল বড়ই আশ্চর্যের! যেন তিনি একজন শান্তিকামী মানব; যিনি যুদ্ধ-বিগ্রহ পছন্দ করেন না। কার্যত খলিফা মুসতা'সিম বিল্লাহ সামরিক বাজেট কমিয়ে দেন। সৈন্যসংখ্যাও কমিয়ে দেন। এমনকি যেখানে খলিফা মুসতা'সিমের পিতা মুসতানসির বিল্লাহর শেষ যুগে ৬৪০ হিজরীতে সৈন্যসংখ্যা ছিল প্রায় এক লাখ, সেখানে ৬৪৫ হিজরীতে সৈন্যসংখ্যা দাঁড়ায় মাত্র দশ হাজার। এর দ্বারাই তৎকালে সামরিক শক্তির অবস্থান ফুটে ওঠে। শুধু এতটুকুই নয়; বরং সৈন্যবাহিনী চরম সংকটাপন্ন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। তারা বাজারে বাজারে মানুষের দ্বারস্থ হয়। মোটকথা, সামরিক অবকাঠামো ভেঙে পড়ে। সেনাপতিরা নিজেদের অবস্থান ভুলে যায়। তাদের মধ্য হতে এমন কোনো ব্যক্তির আলোচনা হয় না, যে সৈন্যবাহিনীর নেতৃত্ব গ্রহণ করতে পারে। মুসলমানরা সমর-বিজ্ঞান ভুলে যায়। তাদের মস্তিষ্ক থেকে জিহাদের অর্থ দূর হয়ে যায়।
আল্লাহর শপথ! এটি ছিল বিরাট খেয়ানত! বড় অন্যায়!!
উযীর মুআইয়িদ উদ্দীন আলকামী খলিফা মুসতাসিম বিল্লাহকে আলোচ্য বিষয়ে উপদেশ প্রদানের কারণে ইবনে কাছীর রহ. তার ঘোর নিন্দা জ্ঞাপন করেন। কিন্তু আমি খোদ খলিফার নিন্দা জ্ঞাপন করি, যিনি এই অপমান-অপদস্থতাকে মেনে নিয়েছেন। নিজের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ জনসাধারণের নিরাপত্তা প্রদান করা, নিজের দেশ ও মাটি থেকে শত্রুকে তাড়িয়ে দেওয়া, সৈন্যবাহিনী সুসংগঠিত করা এবং গোটা জাতিকে, কেবল সৈন্যবাহিনীকেই নয়, জিহাদ ও মউত ফি সাবিলিল্লাহর চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে ভুলে গিয়েছিলেন। খলিফা মুসতাসিম বিল্লাহ সাহেব এসবের কিছুই করেননি। তাকে অপারগ ভাবার কোনো সুযোগ পাই না। তিনি কেবল সেই কাজ করার ক্ষমতা রাখতেন, যা করলে তার রাজত্ব সিংহাসন টিকে থাকবে। কিন্তু হায়! দুর্বল হৃদয়ের অধিকারী ক্ষমতা নিষ্কলুষ ধরে রাখতে পারে না।
এ পর্যায়ে আসন্ন মহাযুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণের পাঁচ বছর পর ৬৪৫ হিজরীর অবস্থা নিয়ে আলোকপাত করা জরুরি মনে করছি-
এক. চীন থেকে ইরাক পর্যন্ত সুদীর্ঘ মহাসড়ক অসংখ্য বাহিনী দ্বারা বেষ্টিত ছিল। ভারী যন্ত্রপাতি বহনের জন্য ঠেলাগাড়ি বানানো হয়েছিল। সমতল ভূমি ও রাস্তাঘাট তাতারী ঘোড়ার জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছিল, যাতে ঘোড়ার খাদ্য বহন করতে না হয় [এ বিষয়ে পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে।]
দুই. তাতারীরা চীন ও ইরাকের মধ্যবর্তী গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলসমূহে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করেছিল। এর মাধ্যমে সফরকালে তাতারী বাহিনীর নিরাপত্তা বাস্তবায়িত হয়েছিল।
তিন. প্রয়োজনীয় কতিপয় বিষয়ে হালাকু খানের পর্যাপ্ত জ্ঞান অর্জিত হয়েছিল। যথা-
১. ইরাক ভূখণ্ড।
২. বাগদাদের দুর্গ।
৩. আব্বাসী সৈন্যবাহিনীর সংখ্যা ও তাদের সামরিক শক্তির কৌশল।
৪. এর মাধ্যমে তিনি মুসলিমবিশ্বের অর্থনৈতিক উৎস ও আব্বাসী সাম্রাজ্যের উত্থান-পতনের মূল কারণ সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করেন। পাশাপাশি তিনি মানুষের আগ্রহ-অনাগ্রহ সম্পর্কিত আত্মিক অবস্থারও জ্ঞানলাভ করেন।
এ সকল জ্ঞান তিনি বিভিন্ন মাধ্যমে অর্জন করেন। যথা: প্রচুর গুপ্তচর, মুসলিম সাম্রাজ্যের সঙ্গে ওঠাবসা ও তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে [এ বিষয়ে আমরা পূর্বে আলোচনা করেছি।]
চার. তাতারীরা আর্মেনিয়া, জুজিয়া ও আন্তাকিয়ার খ্রিস্টানদের সঙ্গে সন্ধিচুক্তিতে আবদ্ধ হয়। তারা তাদের কাছে সামরিক সহযোগিতা ও আসন্ন যুদ্ধে গুপ্ত সংবাদ আদান-প্রদান বিষয়ক সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করে।
পাঁচ. পশ্চিম ইউরোপের রাজা-বাদশাদের নিরপেক্ষ রাখার পদক্ষেপও সফল হয়েছিল। প্রথমত এটি রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা ছিল না। এটি ছিল বল প্রয়োগমূলক সিদ্ধান্ত।
ছয়. ইরাকের পশ্চিম-উত্তরের মুসলিম দেশগুলোর (তুরস্ক ও সিরিয়ার) রাজা-বাদশাদের সঙ্গে এ বিষয়ে তারা ঐকমত্য হয়েছিল যে, তারা হালাকু খানকে শর্তহীন সহযোগিতা প্রদান করবে। হায়! আফসোস! সে সকল রাজা বাদশাদের অধিকাংশ কুর্দী, যারা সুলতান সালাহ উদ্দীন আইয়ূবীর বংশধর ছিল।
সাত. হালাকু খান ইরাক ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহের মুসলমানদের মনোবলে পতন ঘটিয়েছিল। চির ধরিয়েছিল। এক্ষেত্রে শাসক-শাসিত উভয়ে বরাবর ছিল।
আট. হালাকু খান উযীর মুআইয়িদ উদ্দীনের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক সৃষ্টি করেছিল এবং তাকে তার ব্যক্তিগত সম্পত্তির পূর্ণ নিরাপত্তা প্রদান করেছিল।
নয়. হালাকু খান আব্বাসী সৈন্যবাহিনীর দুর্বলতা ও যুদ্ধনীতির অপ্রতুলতা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছিল। সে একথা বুঝতে পেরেছিল যে, বাগদাদ তো দূরের কথা, তারা নিজেদেরই রক্ষা করতে পারবে না।
দশ. হালাকু খান খলিফাতুল মুসলিমীন মুসতা'সিম বিল্লাহর থেকে সবকিছু লাভ করেছিল। জানতে পেরেছিল তার মান-অবস্থান, শক্তি-সামর্থ্য এবং তার দুর্বল দিকগুলোও নির্ণয় করতে পেরেছিল। এভাবেই ৬৫৪ হিজরীর সমাপ্তি ঘটে।
পাঁচ বছর পর হালাকু খান দেখল যে, আব্বাসী খেলাফতের ওপর আক্রমণ করার এবং বাগদাদ পতনের এটাই উপযুক্ত মুহূর্ত। তাই সে লক্ষ্যে তাতারী বাহিনীদের একত্রিত করতে শুরু করে। যাতে তাতারী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর থেকে সার্বিক বিবেচনা এটাই হয় তাতারী বাহিনীর বড় সমাবেশ। অবস্থা এমন দাঁড়িয়ে ছিল যে, যাদের বাগদাদ অবরোধের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিল, তাদের সংখ্যা ছিল দুই লাখের বেশি। এছাড়াও উত্তর ইরাকে সড়ক ও মালামাল নিরাপত্তায় বহুসংখ্যক সৈন্য নিয়োজিত ছিল। আর সহযোগী দল উপদলগুলোর সংখ্যা তো আছেই।
নিম্নে তাতারী বাহিনীর বিন্যাস উল্লেখ করা হলো-
এক. মূল তাতারী বাহিনী ও দীর্ঘদিন ধরে পারস্য ও আযারবাইজানের নিয়োজিত বাহিনী ইরাকের পূর্বে নিয়োজিত ছিল।
দুই. হালাকু খান ভলগা নদীর তীরে অবস্থিত তাতারী বাহিনীর মধ্য হতে একটি ক্ষুদ্র দল তলব করে। যারা প্রসিদ্ধ তাতারী নেতা (ইউরোপ বিজেতা) পাতোর অধীনস্থ ছিল। তবে পাতো নিজে না এসে তার তিন ভাতিজাকে পাঠায়। পাতো ও তার বংশধররা ভলগা নদীর তীরে একটি স্বতন্ত্র সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে এবং নিজেদের 'স্বর্ণগোত্র' উপাধিতে ভূষিত করে। তবে তারা মূলত তাতারী সম্রাট চেঙ্গিজ খানেরই অনুসরণ করত।
তিন. হালাকু খান ইউরোপ বিজয়কার্যে আলাতোলিয়া (উত্তর তুরস্কে) নিয়োজিত একটি দলকে ডেকে পাঠায়। মঙ্গোল নেতা পোয়গেয়টের নেতৃত্বে একদল তাতারী তার ডাকে সাড়া দেয়। পথিমধ্যে তারা আলাতোলিয়া, উত্তর ইরাক ও বাগদাদ অতিক্রম করে। কিন্তু এই দীর্ঘ পথে কোনোরূপ বাধাপ্রাপ্ত হয় না। কারণ, এসব অঞ্চলের শাসকবর্গ তাতারীশক্তির সম্মুখে নতজানু হয়েছিল। ফলে আলাতোলিয়া, মসুল, আলেপ্পো ও হিমস তাদের জন্য উন্মুক্ত প্রান্তরে পরিণত হয়।
চার. হালাকু খান স্বীয় বন্ধু আর্মেনিয়ার রাজার কাছে সহযোগিতা কামনা করে চিঠি প্রেরণ করে। এতে স্বয়ং আর্মেনিয়ার রাজা হাইতুম একদল যোদ্ধাসহ আগমন করে।
পাঁচ. হালাকু খান জুজিয়ার রাজার কাছে ইরাক অবরোধের জন্য চিঠি প্রেরণ করে। সে তৎক্ষণাৎ হালাকু খানের ডাকে সাড়া দেয়।
ছয়. হালাকু খান এক হাজার প্রসিদ্ধ দক্ষ চীনা তীরন্দাজ চেয়ে পাঠায়, যারা অগ্নিতীর নিক্ষেপে বিশ্ববিখ্যাত ছিল।
সাত. হালাকু খান তার শ্রেষ্ঠ সেনাপতিকে সৈন্যবাহিনীর প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেয়। তার নাম ছিল কাতবুগা নওয়েন। সে ছিল খ্রিস্টান। ফলে সে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বৃহৎ সংখ্যক খ্রিস্টান বাহিনীর সঙ্গে সহজে মিশতে সক্ষম হয়। মোটকথা, পৃথিবীর ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ তিন সেনাপতির নেতৃত্বে (১. হালাকু ২. কাতবুগা ৩. পোয়গেয়ট) তাতারী বাহিনী যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়।
আট. হালাকু খান আন্তাকিয়ার আমীর বুহমন্দের সঙ্গে যোগাযোগ করে। কিন্তু যুদ্ধের পূর্ণ সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও সে ইরাক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে অপারগতা প্রকাশ করে। তবে ইরাক পতনশেষে সিরিয়া পতনে অংশগ্রহণ করবে বলে আশা ব্যক্ত করে।
নয়. দামেস্কের আমীর নাছের ইউসুফের ছেলে আযীযকে হালাকু খানের দলে শরিক হওয়ার জন্য প্রেরণ করে।
দশ. মসুলের আমীর বদর উদ্দীন লুলু একটি বাহিনী পাঠায়। শেষোক্ত দল দুটি যদিও খুব দুর্বল শীর্ণকায় ছিল, তবে তারা অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজ আঞ্জাম দিত। এ যুদ্ধে তাতারী বাহিনীর মাঝে বহু মুসলমানও শরিক ছিল। যারা তাতারীদের পক্ষে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। এমনকি ইরাক পতনযুদ্ধে বহু ইরাকবাসী তাতারীদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল। ইরাকবাসী সামান্য ক্ষমতা কিংবা ভুয়া রাজত্ব বা সামান্য কিছু অর্থে অথবা জীবনের মায়ার বিনিময়ে তাতারীদের কাছে সবকিছু বিক্রি করেছিল!!

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 বন্ধুরা!

📄 বন্ধুরা!


যে ব্যক্তি কেবল একত্ববাদী হওয়ার ওপর ভরসা করে আর কোনো প্রস্তুতি গ্রহণ করে না, পথ-পন্থা অবলম্বন করে না, সে আল্লাহর পক্ষ থেকে সহযোগিতা লাভ করতে পারে না।
মনে রাখবেন, তাতারীরা আল্লাহর নিকট সম্মানী, এজন্য তারা বিজয়ী হয়নি; তারা তো ভূপৃষ্ঠের সবচেয়ে জঘন্য জাতি, সবচেয়ে নিকৃষ্ট। তবে তারা প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিল, উপায়-উপকরণ অবলম্বন করেছিল। এ কারণেই তারা ফলাফল ভোগ করেছে, জয়লাভ করেছে।
এটাই চিরন্তন নীতি! আমরা ইহুদী, খ্রিস্টান ও বিধর্মীদের মুসলমানদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করতে দেখি। তারা যত্রতত্র মুসলমানদের অপমান অপদস্থ করে। এর কারণ হলো, তারা বৈষয়িক আসবাব অবলম্বন করে। আর মুসলমানরা তা বর্জন করে।
এর অর্থ এই নয় যে, মুসলমানরা বস্তুবাদী হয়ে যাবে, আর সবকিছুর নিয়ন্তা আল্লাহকে বর্জন করবে; বরং এর অর্থ হলো, আল্লাহর কাছে তাওফিক ও সহযোগিতা কামনা করার সঙ্গে সঙ্গে পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করা। এরপর সহযোগিতা লাভ হলে, জয়লাভ হলে আমরা একথা বিশ্বাস করব যে, বিজয় আল্লাহর পক্ষ থেকেই এসেছে। এতে আমরা অহংকার করব না, ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করব না, আল্লাহর গণ্ডি থেকে বের হয়ে আসব না।
والتاريخ - يا اخواني بتكرر
'বন্ধুরা, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকে।'
মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাতারীরা যে প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিল, পরবর্তীতে অন্যরা তা করবে। আর মুসলমানরা যে অবহেলা ও গাফলতি প্রদর্শন করেছে, পরবর্তী মুসলমানরাও তা-ই করবে।
তাতারীদের যুগে যে ফলাফল দাঁড়িয়েছিল, বর্তমান মুসলমানরা যদি সেই ইতিহাস থেকে শিক্ষা লাভ না করে, তবে সেই ফলাফলের পুনরাবৃত্তি হবে। আল্লাহ তা'আলা আমাদের সঠিক বুঝ দান করুন। আমীন।
আছে কি কোনো উপদেশ গ্রহণকারী?!

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00