📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 পাঠকবৃন্দ এই ঘটনা থেকে যা খুঁজে পাবে

📄 পাঠকবৃন্দ এই ঘটনা থেকে যা খুঁজে পাবে


এক. তাতারী সম্রাট মুসলমানদের যুদ্ধে আর্মেনিয়ার রাজার বিচক্ষণতা ও অভিজ্ঞতা থেকে উপকৃত হতে চেয়েছিল। কারণ, আর্মেনিয়া ও মুসলমানদের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। মুসলিম সাম্রাজ্য ও তাদের স্বভাব-চরিত্র সম্পর্কে আর্মেনিয়া ভালো ধারণা রাখত। আর্মেনীয়রা মুসলমানদের সম্পর্কে তাতারীদের যে তথ্য প্রদান করবে, নিঃসন্দেহে তা যুদ্ধে কাজে আসবে। (যেমন: বর্তমান পরাশক্তি আমেরিকা দুর্বল শক্তি ইংল্যান্ডের সঙ্গে একতা ঘোষণা করে কেবল এজন্য যে, মুসলিম ভূখণ্ড ও বিশেষত ইরাক সম্পর্কে ইংল্যান্ডের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অনেক।)
দুই. এই সুবিশাল সাম্রাজ্য পরিচালনার জন্য তাতারী সম্রাটের অনেক সহযোগিতা প্রয়োজন। সুতরাং নিজ দেশের ওয়াফাদার বিশ্বস্ত সহযোগী বহির্বিশ্বের সহযোগীর চেয়ে উত্তম। কারণ, অভ্যন্তরীণ সহযোগী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও গোত্রীয় দাঙ্গা-হাঙ্গামা নিয়ন্ত্রণে অধিক ক্ষমতাবান হয়।
তিন. এই পদক্ষেপের মাধ্যমে তাতারী সম্রাট নতুনভাবে খ্রিস্টানদের সঙ্গে সম্পর্কের দ্বারা উন্মুক্ত করল। কারণ, সিরিয়া মিশর বিজয়ের সময় খ্রিস্টানদের প্রয়োজন দেখা দেবে। তা ছাড়া ইউরোপ সংলাপে আর্মেনিয়া রাজার প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। এতকিছুর পরেও তাতারী সম্রাট জানত, খ্রিস্টানদের অন্তরে তাদের প্রতি রয়েছে চরম বিদ্বেষ। কারণ, তাতারীরা রাশিয়া ও পূর্ব ইউরোপে খ্রিস্টানদের অকাতরে জবাই করেছিল। এবার জাতীয় স্বার্থে উভয়দল একই প্লাটফর্মে আসার সুযোগ পেয়েছে।
চার. আর্মেনিয়া সাম্রাজ্যের সঙ্গে তাতারীদের ঐকমত্য মুসলমানদের মানসিকতার ওপর এক বড় প্রভাব সৃষ্টি করবে। কারণ তাতারীদের সঙ্গে যুদ্ধ করা এক কথা। আর জোট শক্তির সঙ্গে যুদ্ধ করা আরেক বিষয়। বস্তুত আর্মেনিয়ার একাত্মতা যদিও তাতারী শক্তির সামান্যতম শক্তিবৃদ্ধি করেনি, তথাপি 'জোট' শব্দটি মুসলমানদের মাঝে বড় প্রভাব সৃষ্টি করেছিল।
পাঁচ. এতে আর্মিনিয়ান জোট শক্তির ওপর কতিপয় বিপদ আবর্তিত হয়। যে বিপদ তাতরীদের উপর আবর্তিত হওয়ার কথা ছিল। ফলে এই পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে তাতারীদের পরিবর্তে আর্মেনিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সুতরাং যে ব্যক্তি বিশ্লেষকের চোখে তাতারী ও আর্মেনিয়ার মধ্যকার সংলাপ পর্যবেক্ষণ করবে, সে দেখতে পাবে যে, এতে তাতারীরা বিন্দুমাত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। মূলত সংলাপ হয়েছিল একজন রাজা যে সবকিছুর মালিক, একজন প্রজা যেকোনো কিছুরই মালিক নয়—এর মাঝে। এই হলো বিশ্বনেতাদের চরিত্র। তারা ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোকে নানান প্রতিশ্রুতি প্রদান করে। গুরুত্বপূর্ণ বহু কাজ আঞ্জাম দেওয়ার আশ্বাস প্রদান করে। বিনিময়ে তাদের প্রতিবেশী মিত্রদেশ হওয়া ছাড়া আর কিছুই পাওয়া হয় না।
পাশাপাশি কিছু গর্বিত উপাধি পাওয়া যায়। যেমন পশ্চিম এশিয়া বিষয়ক তাতারীদের উপদেষ্টা, মিত্ররাজ্য, মিত্র সাম্রাজ্য ইত্যাদি।
উপাধির ফুলঝুড়ি কখনো ক্ষুধা মেটায় না। হাজারো উপাধি কোনো উপকারে আসে না। বাস্তবতা হলো তাতারীশক্তি যেমন মিত্রের ঝাণ্ডা প্রত্যাখ্যান করেছিল, অনুরূপ প্রত্যেক যুগে প্রত্যেক দেশে শক্তিশালীরা দুর্বলদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে। অধিকার শক্তি ব্যতীত কখনো আদায় হয় না।
তাতারী সম্রাটের এসব প্রতিশ্রুতি পেয়ে রাজা হাইতুম খুশি মনে, আনন্দচিত্তে, গর্বিত হৃদয়ে উদ্বেলিত হয়ে ফিরে আসেন। কারণ, তিনি যুদ্ধ-বিগ্রহ থেকে নিজ রাজ্যকে বিরত রাখতে পেরেছেন।
৩. মানকু খানের আরেক ইচ্ছা এও ছিল যে, তিনি সিরিয়ার ক্রুশেড নেতাদের সঙ্গে জোট বাঁধবেন। কারণ, আন্তাকিয়া, ত্রিপোলি, সিদোন ও হাইফা সাম্রাজ্যের চেয়ে তাদের সাম্রাজ্য বড় ছিল। সিরিয়া ছিল মুসলমানদের তীর্থভূমি। কাজেই তারা সবাই যদি মুসলমানদের ওপর আক্রমণ চালায়, তাহলে মুসলমানরা আব্বাসী খেলাফত রক্ষা করতে পারবে না।
ক্রুশেডনেতাদের বীরত্ব ও সাহসিকতা বিবেচনা করে মানকু খান ঐক্যের আহ্বান নিয়ে তার নতুন বন্ধু হাইতুমকে পাঠায়, যে তৎকালে এসব অঞ্চলে তাতারী বাহিনীর দূত হিসেবে দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়েছিল। ক্রুশেড নেতাদের বীরত্বের দরুন তাতারী সম্রাট মানকু খান তাদের বাইতুল মুকাদ্দাস হস্তান্তর করার প্রতিশ্রুতি প্রদান করে। (উল্লেখ্য সিরিয়ার আইয়ূবী নেতাগণ ৬২৬ হিজরীতে বাইতুল মুকাদ্দাসকে ক্রুশেডারদের হাতে অর্পণ করার পর তা ৬৪৩ হিজরীতে দ্বিতীয় বারের মতো সুলতান আইয়ূবীর হাতে বিজিত হয়েছিল।) যেন মানকু খান বাইতুল মুকাদ্দাসের মালিক! যেন বাইতুল মুকাদ্দাস হাদিয়া হিসেবে ক্রুশেডারদের দেওয়ার অধিকার সে সংরক্ষণ করে!!
এটি হলো মালিকানাহীন বস্তু অযোগ্য ব্যক্তিকে অর্পণ করার নামান্তর .... ইতিহাস পুনরাবৃত্তি হয় আদ্যোপান্তসহ!!
তবে সিরিয়ার ক্রুশেডনেতারা তাতারী সম্রাটের আহ্বানে ঐকমত্য হতে পারছিল না। তবে আন্তাকিয়ার নেতা বুহমন্দ ছিলেন ব্যতিক্রম, সে বিষয়টিকে উত্তম মনে করে কার্যত তাতারীদের সঙ্গে মিলিত হয়।
সিরিয়ার অন্যান্য নেতাদের মিলিত না হওয়ার কারণ কী ছিল?
এক. তারা জানত, তাতারীরা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে না। তারা তাদের মূল্য ছাড়াই বিক্রি করে দেবে। অথবা যেকোনো কিছুর বিনিময়ে তারা তাদের জবাই করে দেবে কিংবা বিনিময় ছাড়াই জবাই করবে।
দুই. দ্বিতীয়ত তারা ইসলামী বিশ্বের মধ্যভাগে বসবাস করে। তারা নিজেদের ব্যাপারে মুসলমানদের যেমন ভয় পায়, তাতারীদেরও তেমন ভয় পায়। এমনকি তাতারীদের তারা মুসলমানদের চেয়েও বেশি ভয় পেত। এ কারণেই তারা প্রকাশ্যে তাতারীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করার দুঃসাহস দেখায়নি। যদিও স্পষ্টত তা প্রত্যাখ্যানও করেনি। এক্ষেত্রে তারা রাজনৈতিক কপটতার আশ্রয় নেয়। সাক্ষাতে মুচকি হাসির আড়ালে তাতারীশক্তি ও মুসলিমশক্তি—এই দুই শক্তির কোনো একটি বিজয়ের অপেক্ষায় দিনাতিপাত করছিল। তখন তারা বিজয়ী দলের দিকে সফলবলে অগ্রসর হবে, করমর্দন করবে, শুভেচ্ছা ও সংবর্ধনা জানাবে আর এই বলে ওজরখাহী করবে, যদি পরিবেশ-পরিস্থিতি প্রতিকূল না হতো, তবে তারা তাদের সঙ্গেই থাকত। কেউ কেউ বলেন, এই কর্মপদ্ধতির নামই হলো 'রাজনীতি'।
৪. মানকু খান সিরিয়া ও ইরাকের খ্রিস্টানদের সঙ্গে কতিপয় বিষয়ে সন্ধিচুক্তি করার চেষ্টার করে। এই সকল খ্রিস্টান রাজা-বাদশা বা আমীর-ওমারা ছিলেন না। তারা ছিলেন সেই সকল খ্রিস্টান, যারা সিরিয়ার মুসলিম সাম্রাজ্যের তত্ত্বাবধানে কিংবা ইরাকে আব্বাসী খেলাফতের অধীনে বসবাস করত। এটা স্বভাবতই প্রচলিত কিংবা প্রকাশ্য কোনো জোট বা একাত্মতা ছিল না; এটা ছিল কতিপয় খ্রিস্টান পাদরির সঙ্গে পরোক্ষ সন্ধিচুক্তি। এর উদ্দেশ্য ছিল, সহজে এসব দেশে অনুপ্রবেশ করা ও তাতারীদের খবরাখবর আদান-প্রদান করা।
কার্যত মানকু খান সে সকল খ্রিস্টানদের কাছে পৌঁছতে সফল হয়। বাগদাদে খ্রিস্টানপ্রধান ছিল মাকিকা। তাতারীদের বাগদাদ প্রবেশের ক্ষেত্রে সে বিরাট ভূমিকা রাখে।
৫. মানকু খান খ্রিস্টসাম্রাজ্য জুজিয়ার সঙ্গেও সন্ধিচুক্তিতে আবদ্ধ হয়। যদিও জুজিয়া সাম্রাজ্যের সঙ্গে তাতারীদের রয়েছে এক কালো ইতিহাস; তবে মুসলমানদের সঙ্গে জুজিয়া সাম্রাজ্যের ইতিহাসও কম কালো নয়। তাই জুজিয়ার খ্রিস্টানরা তাদের নতুন শত্রু তাতারীদের প্রবীণ শত্রু মুসলমানদের বিপক্ষে সহযোগিতা প্রদান করে। এর দুটি কারণ ছিল-
এক. তৎকালে তাতারীরা ছিল বিশ্বের পরাশক্তি। তারা জয়লাভ করবে, এটাই ছিল স্বাভাবিক।
দুই. খ্রিস্টান ও মুসলমানদের যুদ্ধ হলো আকীদাগত চিরন্তন যুদ্ধ। (যেমনটি আমরা আলোচনা করেছি) উভয়পক্ষেই ঘৃণাবোধ ছিল বদ্ধমূল। আর এই ঘৃণাবোধ তখনই দূর হওয়া সম্ভব, যখন আকীদাগত বিরোধ দূর হবে। আর তা কোনোদিনই সম্ভব নয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
وَلَا يَزَالُونَ يُقَاتِلُونَكُمْ حَتَّى يَرُدُّوكُمْ عَنْ دِينِكُمْ إِنِ اسْتَطَاعُوا
"তারা (কাফেরগণ) ক্রমাগত তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে থাকবে, এমনকি পারলে তারা তোমাদের তোমাদের দ্বীন থেকে ফেরাতে চেষ্টা করবে।"
পক্ষান্তরে তাতারীদের সঙ্গে খ্রিস্টানদের যুদ্ধ হলো স্বার্থের যুদ্ধ। স্বার্থে ব্যাঘাত ঘটলে যুদ্ধ আরম্ভ হয়। আর স্বার্থ নিষ্কলুষ থাকলে সৌম্য ভ্রাতৃত্ব টিকে থাকে। তৎকালে খ্রিস্টান জুজিয়া সাম্রাজ্যের সঙ্গে মূর্তিপূজারি তাতারীদের স্বার্থগত মিল থাকায় তারা এক পথের পথযাত্রী হয়েছিল। এটাকেই 'রাজনীতি' বলা হয়।
৬. এসব সংলাপ, সন্ধিচুক্তি ও প্রতিশ্রুতি ছিল একদিকে আর অপর দিকে সেসব সংলাপ ও সন্ধিচুক্তি চলছিল, কেবল সেগুলোর গুরুত্বের কারণে নয়, বরং সেগুলো বড়ই অদ্ভুত ও কদর্যপূর্ণ হওয়ার কারণে সেগুলো এখন উল্লেখ করব!!
মুসলিম সাম্রাজ্যের ওপর আক্রমণ ও আঘাত হালকা ও লঘুকরণের উদ্দেশ্যে এসব সংলাপ কতিপয় মুসলিম নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সংঘটিত হয়েছিল।
সম্রাট মানকু খান নিজে এসব সংলাপ বাস্তবায়ন করেননি। কারণ তিনি এসব মুসলিম আমীরদের তুচ্ছতাচ্ছল্যের দৃষ্টিতে দেখতেন। কারণ, এদের প্রত্যেকের সাম্রাজ্য ছিল মাত্র কয়েক কিলোমিটারব্যাপী। এইটুকু সাম্রাজ্য নিয়েই তারা নিজেদের 'আমীর' নামকরণ করেছিল। এমনকি বহু বিখ্যাত উপাধিতে তারা ভূষিত হতো। যেমন: মু'জাম, আশরাফ, আযীম, সাঈদ ইত্যাদি।
সম্রাট মানকু খান এসব সংলাপ বাস্তবায়নের জন্য সহোদর হালাকু খানকে দায়িত্ব প্রদান করে। ফলে দুর্বল মুসলিম নেতৃবৃন্দ শক্তিশালী তাতারী বাহিনীর দিকে অগ্রসর হয়।
فَتَرَى الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ مَرَضٌ يُسَارِعُونَ فِيهِمْ يَقُولُونَ نَخْشَى أَنْ تُصِيبَنَا دَائِرَةُ فَعَسَى اللَّهُ أَنْ يَأْتِيَ بِالْفَتْحِ أَوْ أَمْرٍ مِنْ عِنْدِهِ فَيُصْبِحُوا عَلَى مَا أَسَرُّوا فِي أَنْفُسِهِمْ نَادِمِينَ
“সুতরাং যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে তুমি তাদের দেখতে পাচ্ছ যে, তারা অতি দ্রুত তাদের মধ্যে ঢুকে পড়ছে। তারা বলছে, আমাদের আশঙ্কা হয়, আমরা কোনো মসিবতের পাকে পড়ে যাব। (কিন্তু) এটা দূরে নয় যে, আল্লাহ মুসলমানদের বিজয় দান করবেন অথবা নিজের পক্ষ থেকে অন্য কিছু ঘটাবেন। ফলে তখন তারা নিজেদের অন্তরে যা গোপন রেখেছিল, তজ্জন্য অনুতপ্ত হবে।”৪২
মসুলের নেতা এবং বদর উদ্দীন লুলু সেলজুকের দুই নেতা কেকাভাস ছানি ও কালাজ আরসালান রাবে হালাকু খানের কাছে সন্ধিচুক্তির জন্য আসে। সেলজুকের দুই নেতা উত্তর ইরাকের একটি স্পর্শকাতর স্থানে (বর্তমান তুরস্ক) অবস্থান করতেন। তাদের সন্ধিচুক্তির ফলে উত্তর থেকে ইরাক অবরুদ্ধ হয়। কেকাভাস ছানির তাতারী নেতাদের তোষামোদ করার পদ্ধতি ছিল বড়ই লজ্জাজনক ও লাঞ্ছনাকর।
আলেপ্পো ও দামেস্কের আমীর নাছের ইউসুফ ও নাছের সালাহ উদ্দীন আইয়ূবীর মিত্র হওয়া সত্ত্বেও তাতারীদের আনুগত্য প্রদর্শন করেন। অথচ কেবল মিত্রই নয়, বরং নাম ও উপাধিতেও তিনি ছিলেন সালাহ উদ্দীন আইয়ূবী। তবে রূহ ও প্রাণ, আখলাক ও চরিত্রের দিক থেকে সালাহ উদ্দীন আইয়ূবীর সঙ্গে তার কোনো মিল ছিল না। এমনকি তিনি এতটা নীচ ছিলেন যে, নিজ সন্তান আযীযকে কেবল হালাকু খানের অনুগত্য প্রদর্শনের জন্যই পাঠাননি, বরং হালাকু খানের একজন আমীর হিসেবে কাজ করার জন্য পাঠিয়েছিলেন।
অনুরূপ হিমসের আমীর আশরাফ আইয়ূবী তাতারী নেতার প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনের জন্য আসেন।
এ সমস্ত সন্ধিচুক্তি ও ঐক্যজোট ছিল খুবই ভয়াবহ। সন্ধিচুক্তির বিষয়াদি নিকৃষ্ট হেয়পূর্ণ হওয়া ছাড়াও এসব সন্ধির কারণে তাতারীদের শক্তি বৃদ্ধি পেয়েছিল। তারা ইরাককে চতুর্দিক থেকে অবরোধ করতে শুরু করেছিল এবং মুসলিম বিশ্বের অভ্যন্তরীণ সংবাদ সম্পর্কে অবগত হওয়ার পথ তাদের সামনে উন্মুক্ত হয়েছিল। এ ছাড়াও দল-উপদল গোত্র-উপগোত্রসমূহ এসব সন্ধির কারণে চরম অবক্ষয় ও অধঃপতনের শিকার হয়েছিল। কারণ, তারা আমীর-ওমারাদের লাঞ্ছনাকর পরিস্থিতি দেখে মনোবল হারাতে বসেছিল, সংকল্পচ্যুত হয়েছিল, নেতা নেতৃদের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেছিল। এ কারণে তাতারীদের মুখোমুখি দাঁড়াবার কোনো শক্তি তাদের ছিল না।
৭. হালাকু খান রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় আব্বাসী সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় প্রতাপশালী মন্ত্রী মুআইয়িদ উদ্দীন আলকামী শা'বীর কাছে পৌঁছেছিল।
মুআইয়িদ উদ্দীন ছিলেন একজন ফেতনাবাজ, নিকৃষ্ট রাফেজী। (সে হযরত আবু বকর ও হযরত ওমর রা. এর খেলাফতকে প্রত্যাখ্যান করে) সে কট্টর শিয়া ছিল। সুন্নত ও আহলে সুন্নতকে খুব ঘৃণা করত। অতি আশ্চর্যের বিষয় হলো, আকীদাগত চরম অধঃপতন সত্ত্বেও সে এই গর্বিত আসনে (খেলাফতে) অধিষ্ঠিত হয়েছিল। সুন্নী সাম্রাজ্য আমলে সে খলীফা নাম ধারণ করেছিল।
নিঃসন্দেহে এটি খলিফা মুসতা'সিম বিল্লাহর অদূরদর্শিতা ও স্থূল চিন্তার ফল, যিনি এই ফেতনাবাজ ওযীরকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদ প্রদান করেছেন। এই মন্ত্রীকে হাদীসের ভাষায় بطانة السوء [দুষ্ট বন্ধু] বলা হয়। আর বিবেকবানদের কাছে একথা অস্পষ্ট নয় যে, দেশ ও দেশবাসীর বিপর্যয়ে দুষ্টবন্ধুর চক্রান্ত কতটা নিকৃষ্ট হয়।
ইমাম বুখারী রহ. হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা. এর সূত্রে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
مَا اسْتُخْلِفَ خَلِيفَةٌ إِلَّا لَهُ بِطَانَتَانِ بِطَانَةُ تَأْمُرُهُ بِالخَيْرِ وَتَحُضُهُ عَلَيْهِ، وَبِطَانَةُ تَأْمُرُهُ بِالشَّرِّ وَتَحْضُهُ عَلَيْهِ، وَالمَعْصُومُ مَنْ عَصَمَ اللَّهُ
"প্রত্যেক খলিফার দুইজন বন্ধু থাকে। একবন্ধু তাকে সৎকাজের আদেশ দেয় এবং সৎকাজের প্রতি উৎসাহিত করে। আরেক বন্ধু তাকে অসৎকাজের আদেশ দেয় এবং অসৎকাজের প্রতি তাকে প্ররোচিত করে। সেই খলিফা নিরাপদে থাকে, আল্লাহ তা'আলা যাকে নিরাপদ রাখেন।"৪৩
আরও নিকৃষ্ট হলো, এক মাস দুই মাস নয়, এক বছর দুই বছর নয়, মুআইয়িদ উদ্দীন পূর্ণ ৬৪২ হিজরী থেকে ৬৫৬ হিজরী তথা বাগদাদ অধঃপতন পর্যন্ত ক্ষমতাসীন ছিল। এই চেদ্দো বছরেও যখন খলিফা তার চক্রান্ত বুঝতে পারেন নি, তখন খলিফার আকল-বিবেক অবশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ?
হালাকু খান মুআইয়িদ উদ্দীনের ফেতনা-ফ্যাসাদ ও সুন্নতের প্রতি ঘৃণাবোধের ফায়েদা উঠাতে তার সঙ্গে মিলিত হন এবং তাতারী বাহিনী বাগদাদে অনুপ্রবেশের ব্যাপারে শৈথিল্য প্রদর্শন বিষয়ে তার সঙ্গে একমত হন। খেলাফত পতনের পর বাগদাদ নগরী পরিচালনার জন্য বিচারালয়ে তার ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মুআইয়িদ উদ্দীন তাকে অসাধু পরামর্শ এবং খলিফা মুসতা'সিম বিল্লাহর কাছে মুসলিম উম্মাহর জন্য ক্ষতিকর আবেদন নিয়ে যাওয়ার জন্য সহযোগিতা প্রদান করে। এ উদ্দেশ্য সাধনে মন্ত্রী কোনোরূপ অবহেলা করেনি। খেলাফত পতন ও তৎকালে বাগদাদের সংঘটিত সকল দুর্ঘটনার পেছনে এই অসাধু মন্ত্রী অনস্বীকার্য হাত ছিল।
মানকু খান ও হালাকু খানের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার আলোকে এ কথা সুস্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, এই ভয়ংকর আক্রমণের প্রস্তুতি গ্রহণে তারা সামান্যতম অবহেলা করেনি এবং এমন ভয়ংকর পদক্ষেপ পৃথিবীর ইতিহাসে আর একবারও ঘটেনি। তা হলো, আব্বাসী খেলাফতের পতন ঘটানো।
তাতারীদের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সারমর্ম হলো, তাতারীরা আর্মেনিয়া, জুজিয়া ও আন্তাকিয়ার পক্ষ থেকে গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতাপ্রাপ্ত হয়েছে। তারা সিরিয়ার বহুসংখ্যক ক্রুশেডনেতাকে নিরপেক্ষ করে রেখেছিল। সিরিয়া ও ইরাকের খ্রিস্টানদের সঙ্গে গোপন সমঝোতা স্থাপন করেছিল। অনুরূপ কতিপয় মুসলিম নেতৃবর্গ ও উযীর মুআইয়িদ উদ্দীন আলকামীর সঙ্গে সন্ধি স্থাপন করেছিল। অবলীলায় বলা যায় যে, এ সকল কূটনৈতিক প্রচেষ্টা তাতারীদের সফলতার নেপথ্যে বড় ভূমিকা রেখেছিল।
উল্লেখযোগ্য, এহেন দুর্যোগপূর্ণ ভয়াবহ পরিস্থিতিতে দু-চারজন ব্যতীত সাধারণ মুসলমানরা দূর থেকে এ অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছিল। যেন এটি ছিল তাদের কাছে অতি সাধারণ ঘটনা। অথবা তারা কোনো অপ্রতিরোধ্য গুপ্ত ঘাতকের সন্ধান পেয়ে ঘাপটি মেরে বসেছিল, যার বিপক্ষে দাঁড়াবার ক্ষমতা তাদের নেই। লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ!

টিকাঃ
৪২ সুরা মায়েদা: ৫২।
৪৩ বুখারী: ৬৬১১।

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 তৃতীয় পদক্ষেপ : মুসলমানদের বিরুদ্ধে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ

📄 তৃতীয় পদক্ষেপ : মুসলমানদের বিরুদ্ধে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ


ইসলামী খেলাফতের পতন ঘটাতে সড়ক প্রস্তুতি, প্রচারাভিযানের সরঞ্জামাদি সরবরাহ ও তাতারীদের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার বাস্তবায়ন ছাড়াও হালাকু খান একটি ভয়াবহ যুদ্ধের আশ্রয় নেয়। তা হলো, মুসলমানদের বিরুদ্ধে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। এই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ পরিচালনার জন্য হালাকু খানের সম্মুখে বহু পথ উন্মুক্ত ছিল। উদাহরণস্বরূপ-
এক. ইরাকের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহে কিছু সন্ত্রাসী প্রচারণা চালানো। এর একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল, চেঙ্গিজ খান ও উকিতাইয়ের যুগের তাতারী হামলার ভয়াবহতা স্মরণ করিয়ে দেওয়া এবং আতঙ্ক সৃষ্টি করা। কারণ, তাতারীদের প্রথম আক্রমণ-যা চেঙ্গিজখানের যুগে সংঘটিত হয়েছিল ত্রিশ ঊর্ধ্ব বছর পূর্বে সংঘটিত হয়েছিল। তাই হালাকু খানের যুগের (বর্তমান সময়ের) বহু মুসলমান তাতারীদের সেই ভয়াবহতা ও নিষ্ঠুরতা পর্যবেক্ষণ করেনি। তারা সেসব ঘটনা তাদের বাপ-দাদাদের মুখে কল্পকাহিনির মতো শুনেছে মাত্র। শ্রবণকারী তো প্রত্যক্ষদর্শীর মতো নয়। আর জ্বালাও পোড়াও ও ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি উকিতাই এর যুগে সংঘটিত তাতারীদের দ্বিতীয় আক্রমণের মূল লক্ষ্য ছিল না। কারণ, এ যুগে তাতারীরা কেবল রাশিয়া ও পূর্ব ইউরোপ অভিমুখে ব্যস্ত ছিল। ফলে এই দ্বিতীয় আক্রমণে মুসলমানরা ততটা প্রভাবিত হয়নি।
এ কারনেই হালাকু খান কতিপয় ধ্বংসাত্মক ও সন্ত্রাসবাদী সামরিক কার্যকলাপ পরিচালনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। যাতে মুসলমানরা জানতে পারে যে, আজও তাতারীরা দুর্বার, অপ্রতিরোধ্য, ক্ষমতাশালী ও দাপুটে।
উদাহরণস্বরূপ, ৬৫০ হিজরীতে তাতারী বাহিনী আলজেরিয়া ও উত্তর ইরাকে অবস্থিত সারুজ ও সাঞ্জার অঞ্চলে আক্রমণ করে। ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ, লুটতরাজ চালায় ও অঞ্চলবাসীকে গ্রেপ্তার করে। এক বাণিজ্যিক কাফেলার ছয় লক্ষ স্বর্ণমুদ্রারও বেশি অর্থ আত্মসাৎ করে। [বর্তমান যুগে সম্পদ বাজেয়াপ্তের নামে যে আত্মসাৎ চলে, তা এরই প্রতিচ্ছবি।]
নিঃসন্দেহে এটি আব্বাসী খেলাফতের জন্য ছিল বড় ক্ষতি এবং তাতারী বাহিনীর জন্য যুদ্ধের প্রস্তুতি। উপরন্তু এ সকল আক্রমণের ফলে তাতারীদের কাছে ইরাকের পথ-ঘাট তথা ভৌগলিক অবস্থান সুস্পষ্ট ফুটে উঠেছিল। এসব কিছুর উদ্দেশ্য ছিল মুসলমানদের অন্তরে ভীতি-সঞ্চার করা। সুতরাং বলা যায়, এসব কোনো সাধারণ যুদ্ধ ছিল না; বরং এসব ছিল অস্তিত্বের যুদ্ধ। ফলে মুসলমানদের চেয়ে তাতারীদের শক্তি বহুকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছিল। সবাই একটি আশু মহাযুদ্ধের অপেক্ষা করছিল। ইতিহাসে এমন যুদ্ধের পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকে।
দুই. অশুভ-মিডিয়া যুদ্ধ। তাতারীদের কতিপয় অনুসারী মুসলিম দেশসমূহে তাতারীদের অস্বাভাবিক শক্তি, সামর্থ্য ও অলৌকিক দক্ষতার কথা প্রচার করত। মুসলমান ও তাতারীদের শক্তির মাঝে পার্থক্য তুলে ধরত। সে যুগে তাদের এই প্রচারণা কৌশল মিডিয়ার কাজ দেয়। মূলত তৎকালে প্রচারণার মাধ্যম ছিল কবি, সাহিত্যিক ও ইতিহাসবিদগণ। তৎকালীন কবি, সাহিত্যিক ও ঐতিহাসিকদের লিখনী ও রচনায় তাতারী আক্রমণে মুসলিমনিধনের ঘটনা বিবৃত হয়। যেমন-
• তাতারীদের কাছে গোটা বিশ্বের খবরাখবর পৌঁছত। কিন্তু তাদের সব খবর বিশ্ববাসীর কাছে পৌছত না। [লেখক বোঝাতে চেয়েছেন যে, তাতারী গুপ্তচর খুবই শক্তিশালী ছিল।]
• তাতারীরা নিজেদের অভিপ্রায় গোপন রাখত। কোথাও আক্রমণ করতে হলে একযোগে আক্রমণ করত। ফলে শহরবাসীর অজ্ঞাতসারে তারা শহরে প্রবেশ করত।
• তাতারী মহিলারা পুরুষের মতো লড়াই করত। [ফলে মুসলিম পুরুষরা তাতারী মহিলাদের পর্যন্ত ভয় করত।]
• তাতারীদের ঘোড়াগুলো খুর দ্বারা মাটি খুঁড়ে গাছের শেকড় ভক্ষণ করত। সেগুলো বার্লি করার দরকার হতো না।
• তাতারীদের আসবাপত্র, খাদ্যদ্রব্য ও খবরাদি সরবরাহ করার প্রয়োজন পড়ত না। কারণ তারা মেষ, ঘোড়া, গবাদি পশু সঙ্গে নিয়ে ভ্রমণ করত।
• তাতারীরা সকল প্রকার গোশত ভক্ষণ করত ... তারা মানুষ ভক্ষণ করত।
নিঃসন্দেহে এ জাতীয় লেখালেখি সাধারণ মানুষের মাঝে ভীতি বিস্তার করত। এমনকি কখনো কখনো তা বিশেষ ব্যক্তিবর্গের মাঝেও প্রভাব সৃষ্টি করত। এটি জাতির নিজ হাতে অর্জিত বিপদ। এমন বিপদ কেউ কোনোদিন ডেকে আনেনি।
তিন. বিশ্বের রাজা-বাদশা ও মুসলিম আমীর-উমারাদের নিকট সতর্কবাণী সম্বলিত চিঠি-পত্র প্রেরণ। সে সকল আমীর ওমারাদের নির্বুদ্ধিতার পরিচায়ক হলো, তারা সে সকল চিঠি-পত্র সাধারণ মানুষের মাঝে প্রকাশ করত। ফলে জনসাধারণের মাঝে 'তাতারীত্রাস' ছড়িয়ে পড়ত। আর তাতারীরা এভাবে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছিল যে, তারা মুনাফিক মুসলিম সাহিত্যিকদের মাধ্যমে এসব চিঠি-পত্র লিখাত। তারা সে যুগের উপযুক্ত ভাষাশৈলীর মাধ্যমে চিঠিগুলো লিখত, যা সহজেই মুসলমানদের বোধগম্য হতো। নিঃসন্দেহে এ পদ্ধতিটি অধিক ক্রিয়াশীল ছিল ভাষান্তর পদ্ধতি অবলম্বনের চেয়ে। যেমন তাতারীরা তাদের চিঠিতে একথা বুঝাবার চেষ্টা করেছে যে, তারা মুসলমান, কাফের নয়। তারা কুরআনের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে। তাদের পূর্বপুরুষগণ মুসলমান এবং তারা মুসলিমবিশ্বের অত্যাচারী জালেম শাসকদের ধ্বংসের জন্য আগমন করেছে তারা কেবল ইরাক স্বাধীনতার জন্যই এসেছে!)। তাতারীদের অত্যাচার ও অবিচারের কথা সুপ্রসিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও এসব কথাবার্তা দুর্বল রোগাক্রান্ত ভীত হৃদয়ের অধিকারীদের মাঝে প্রভাব সৃষ্টি করত। ফলে তারা মুসলিমবিশ্বের ওপর তাতারী আক্রমণকে সহজে মেনে নিত এবং তাদের স্বাধীনতাকামী বিজয়ীদের সংবর্ধনা প্রদান করত।
তাতারীদের এসব চিঠিপত্র সুস্পষ্ট বাস্তবতা বিরোধী ছিল। কিন্তু যে ব্যক্তি আত্মিক অধঃপতনে নিমজ্জিত, তার হাতে এসব চিঠি পড়লে সে যারপরনাই প্রভাবিত হতো।
সেসব চিঠি-পত্রের মধ্য হতে হালাকু খান কর্তৃক জনৈক মুসলিম নেতার নিকট প্রেরিত একটি চিঠি নিম্নে উল্লেখ করছি। হালাকু খান লিখেছে—
“আমরা আল্লাহর সৈন্য।
যে জুলুম ও অত্যাচার করে, সীমালঙ্ঘন ও ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করে এবং আল্লাহর নির্দেশমতো ক্ষমতা পরিচালনা করে না, তার সঙ্গে আমরা যুদ্ধ করি। আমরা বহু দেশ ও জনপদ ধ্বংস করেছি। বহু মানুষ হত্যা করেছি। অসংখ্য নারী-শিশু গ্রেপ্তার করেছি।
সুতরাং হে জীবিতরা, তোমরাও পূর্ববর্তীদের পথেই ধাবিত হতে যাচ্ছ। হে উদাসীনরা, তোমাদেরও সে পথে ধাবিত করা হবে। আমাদের মূল লক্ষ্য শাস্তি প্রদান। রাজত্ব আমাদের উদ্দেশ্য নয়। অত্যাচার অবিচার আমাদের গন্তব্য নয়।
তাতারী সাম্রাজ্যে আমাদের ন্যায়-শাসন সুপ্রসিদ্ধ। আমাদের তলোয়ার থেকে বেঁচে কোথায় পালাবে? আমরা বহু দেশ বিধ্বস্ত করেছি। সন্তানদের ছিনিয়ে নিয়েছি। ধ্বংস করেছি জনপদবাসী। তাদের আস্বাদন করিয়েছি নির্মম আজাব। তাদের বড়দের ছোট করেছি। রাজাকে প্রজা বানিয়েছি।
তোমরা ভাবছ, আমাদের হাত থেকে রক্ষা পাবে। শীঘ্রই জানবে যে, কোন পথে তোমরা অগ্রসর হচ্ছ। অনুগত ব্যক্তিই মুক্তি পাবে।”
একথা নিশ্চিত যে, এ জাতীয় চিঠি কোনো ভীত লোক পাঠ করলে সে যুদ্ধের শক্তি হারিয়ে ফেলবে। আর এটাই ছিল এ জাতীয় চিঠি প্রেরণের মূল লক্ষ্য।
চার. মুসলমানদের বিরুদ্ধে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ সৃষ্টির আরেকটি উপায় ছিল, তাতার, জুজিয়া, আর্মেনিয়া ও অন্যান্য দেশসমূহের মধ্যবর্তী সংঘটিত গোপন চুক্তিপত্রগুলো প্রকাশ করা এবং ইউরোপের ক্রুশেড নেতৃবর্গ কর্তৃক সহযোগিতা প্রদানের আশ্বাস ব্যক্ত করা। এসব চুক্তিনামা প্রকাশ পাওয়ার পর মুসলমানরা একথা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেছিল যে, তাতারীরা বিশ্ববাসীকে ধ্বংস করে ফেলবে। তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার শক্তি কারও নেই। অথচ মুসলমানদের স্বর্ণোজ্জ্বল ইতিহাস একথার সাক্ষ্য প্রদান করে যে, তাতারীদের বিরুদ্ধে মুসলমানরা জয়লাভ করেছিল। আফসোস! মুসলমানরা নিজেদের ইতিহাস ভুলে গিয়েছিল। শত্রুপক্ষ ও তাদের দোসরদের ভয়ে তারা ভীতিবিহ্বল হয়েছিল।
পাঁচ. মুসলমানদের বিরুদ্ধে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ সৃষ্টির আরেকটি পথ ছিল, কতিপয় মুসলিম নেতৃবর্গের পক্ষ থেকে সহযোগিতা প্রদানের আশ্বাস, যা আমরা তাতারীদের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আলোচনা করতে গিয়ে উল্লেখ করেছি। একথা সুস্পষ্ট যে, যখন কোনো মুসলিম জনপদ তাদের নেতাকে তাতারীদের পক্ষাবলম্বন করতে দেখবে, দেখবে সে তার রাজ্য রক্ষার স্বার্থে নিরাপদ পথ অবলম্বন করছে, সে তাতারীদের সঙ্গে চুক্তি আবদ্ধ হচ্ছে, তাদের সহযোগিতা প্রদান করছে, স্বাভাবিকভাবেই তখন তারা মনোবল হারিয়ে ফেলবে, দেশ রক্ষার সাহসিকতা ও উদ্যম হারিয়ে ফেলবে। এ সকল উপায় ও আরও কতিপয় পদ্ধতি অবলম্বন করে তাতারীরা মুসলমানদের অন্তরে 'তাতারীত্রাস' সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিল। এভাবেই অপরাজেয় তাতারীশক্তি মুসলিম ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছিল।

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 চতুর্থ পদক্ষেপ আব্বাসী সৈন্যবাহিনীকে দুর্বলকরণ

📄 চতুর্থ পদক্ষেপ আব্বাসী সৈন্যবাহিনীকে দুর্বলকরণ


হালাকু খান ওযীর মুআইয়িদ উদ্দীন আলকামীর কাছে এই প্রস্তাব পেশ করে যে, আব্বাসী খলীফা মুসতা'সিম বিল্লাহ যেন সামরিক বাহিনীর বাজেট কিছুটা কমিয়ে দেন ও সৈন্যসংখ্যাও কমিয়ে দেন এবং রাষ্ট্রের মানসিকতা যেন যুদ্ধ-বিগ্রহ থেকে ফিরিয়ে নেন; এমনকি তিনি যেন সামরিক শক্তিকে পরিবেশ পরিকল্পনা ও শহরের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড যেমন চাষাবাদ, শিল্প-কারখানা ইত্যাদিতে ব্যয় করেন। যেমন: বর্তমানে আমরা কতিপয় মুসলিম রাষ্ট্রে সেনাবাহিনীকে শাক-সব্জি বপন, পুল-ব্রিজ নির্মাণ ইত্যাদি কাজে ব্যস্ত দেখতে পাই। যুদ্ধ-জিহাদ, লড়াই ইত্যাদি দেশ রক্ষামূলক কাজে তারা ততটা গুরুত্ব প্রদান করে না।
উযীর মুআইয়িদ উদ্দীন আলকামী হালাকু খানের এই প্রস্তাব যথাযথ বাস্তবায়ন করে। তার পক্ষ থেকে এ জাতীয় কাজ সংঘটিত হওয়া ছিল খুব স্বাভাবিক। তবে খলিফা মুসতা'সিম বিল্লাহর পক্ষে এই প্রস্তাব গ্রহণ ছিল বড়ই আশ্চর্যের! যেন তিনি একজন শান্তিকামী মানব; যিনি যুদ্ধ-বিগ্রহ পছন্দ করেন না। কার্যত খলিফা মুসতা'সিম বিল্লাহ সামরিক বাজেট কমিয়ে দেন। সৈন্যসংখ্যাও কমিয়ে দেন। এমনকি যেখানে খলিফা মুসতা'সিমের পিতা মুসতানসির বিল্লাহর শেষ যুগে ৬৪০ হিজরীতে সৈন্যসংখ্যা ছিল প্রায় এক লাখ, সেখানে ৬৪৫ হিজরীতে সৈন্যসংখ্যা দাঁড়ায় মাত্র দশ হাজার। এর দ্বারাই তৎকালে সামরিক শক্তির অবস্থান ফুটে ওঠে। শুধু এতটুকুই নয়; বরং সৈন্যবাহিনী চরম সংকটাপন্ন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। তারা বাজারে বাজারে মানুষের দ্বারস্থ হয়। মোটকথা, সামরিক অবকাঠামো ভেঙে পড়ে। সেনাপতিরা নিজেদের অবস্থান ভুলে যায়। তাদের মধ্য হতে এমন কোনো ব্যক্তির আলোচনা হয় না, যে সৈন্যবাহিনীর নেতৃত্ব গ্রহণ করতে পারে। মুসলমানরা সমর-বিজ্ঞান ভুলে যায়। তাদের মস্তিষ্ক থেকে জিহাদের অর্থ দূর হয়ে যায়।
আল্লাহর শপথ! এটি ছিল বিরাট খেয়ানত! বড় অন্যায়!!
উযীর মুআইয়িদ উদ্দীন আলকামী খলিফা মুসতাসিম বিল্লাহকে আলোচ্য বিষয়ে উপদেশ প্রদানের কারণে ইবনে কাছীর রহ. তার ঘোর নিন্দা জ্ঞাপন করেন। কিন্তু আমি খোদ খলিফার নিন্দা জ্ঞাপন করি, যিনি এই অপমান-অপদস্থতাকে মেনে নিয়েছেন। নিজের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ জনসাধারণের নিরাপত্তা প্রদান করা, নিজের দেশ ও মাটি থেকে শত্রুকে তাড়িয়ে দেওয়া, সৈন্যবাহিনী সুসংগঠিত করা এবং গোটা জাতিকে, কেবল সৈন্যবাহিনীকেই নয়, জিহাদ ও মউত ফি সাবিলিল্লাহর চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে ভুলে গিয়েছিলেন। খলিফা মুসতাসিম বিল্লাহ সাহেব এসবের কিছুই করেননি। তাকে অপারগ ভাবার কোনো সুযোগ পাই না। তিনি কেবল সেই কাজ করার ক্ষমতা রাখতেন, যা করলে তার রাজত্ব সিংহাসন টিকে থাকবে। কিন্তু হায়! দুর্বল হৃদয়ের অধিকারী ক্ষমতা নিষ্কলুষ ধরে রাখতে পারে না।
এ পর্যায়ে আসন্ন মহাযুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণের পাঁচ বছর পর ৬৪৫ হিজরীর অবস্থা নিয়ে আলোকপাত করা জরুরি মনে করছি-
এক. চীন থেকে ইরাক পর্যন্ত সুদীর্ঘ মহাসড়ক অসংখ্য বাহিনী দ্বারা বেষ্টিত ছিল। ভারী যন্ত্রপাতি বহনের জন্য ঠেলাগাড়ি বানানো হয়েছিল। সমতল ভূমি ও রাস্তাঘাট তাতারী ঘোড়ার জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছিল, যাতে ঘোড়ার খাদ্য বহন করতে না হয় [এ বিষয়ে পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে।]
দুই. তাতারীরা চীন ও ইরাকের মধ্যবর্তী গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলসমূহে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করেছিল। এর মাধ্যমে সফরকালে তাতারী বাহিনীর নিরাপত্তা বাস্তবায়িত হয়েছিল।
তিন. প্রয়োজনীয় কতিপয় বিষয়ে হালাকু খানের পর্যাপ্ত জ্ঞান অর্জিত হয়েছিল। যথা-
১. ইরাক ভূখণ্ড।
২. বাগদাদের দুর্গ।
৩. আব্বাসী সৈন্যবাহিনীর সংখ্যা ও তাদের সামরিক শক্তির কৌশল।
৪. এর মাধ্যমে তিনি মুসলিমবিশ্বের অর্থনৈতিক উৎস ও আব্বাসী সাম্রাজ্যের উত্থান-পতনের মূল কারণ সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করেন। পাশাপাশি তিনি মানুষের আগ্রহ-অনাগ্রহ সম্পর্কিত আত্মিক অবস্থারও জ্ঞানলাভ করেন।
এ সকল জ্ঞান তিনি বিভিন্ন মাধ্যমে অর্জন করেন। যথা: প্রচুর গুপ্তচর, মুসলিম সাম্রাজ্যের সঙ্গে ওঠাবসা ও তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে [এ বিষয়ে আমরা পূর্বে আলোচনা করেছি।]
চার. তাতারীরা আর্মেনিয়া, জুজিয়া ও আন্তাকিয়ার খ্রিস্টানদের সঙ্গে সন্ধিচুক্তিতে আবদ্ধ হয়। তারা তাদের কাছে সামরিক সহযোগিতা ও আসন্ন যুদ্ধে গুপ্ত সংবাদ আদান-প্রদান বিষয়ক সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করে।
পাঁচ. পশ্চিম ইউরোপের রাজা-বাদশাদের নিরপেক্ষ রাখার পদক্ষেপও সফল হয়েছিল। প্রথমত এটি রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা ছিল না। এটি ছিল বল প্রয়োগমূলক সিদ্ধান্ত।
ছয়. ইরাকের পশ্চিম-উত্তরের মুসলিম দেশগুলোর (তুরস্ক ও সিরিয়ার) রাজা-বাদশাদের সঙ্গে এ বিষয়ে তারা ঐকমত্য হয়েছিল যে, তারা হালাকু খানকে শর্তহীন সহযোগিতা প্রদান করবে। হায়! আফসোস! সে সকল রাজা বাদশাদের অধিকাংশ কুর্দী, যারা সুলতান সালাহ উদ্দীন আইয়ূবীর বংশধর ছিল।
সাত. হালাকু খান ইরাক ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহের মুসলমানদের মনোবলে পতন ঘটিয়েছিল। চির ধরিয়েছিল। এক্ষেত্রে শাসক-শাসিত উভয়ে বরাবর ছিল।
আট. হালাকু খান উযীর মুআইয়িদ উদ্দীনের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক সৃষ্টি করেছিল এবং তাকে তার ব্যক্তিগত সম্পত্তির পূর্ণ নিরাপত্তা প্রদান করেছিল।
নয়. হালাকু খান আব্বাসী সৈন্যবাহিনীর দুর্বলতা ও যুদ্ধনীতির অপ্রতুলতা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছিল। সে একথা বুঝতে পেরেছিল যে, বাগদাদ তো দূরের কথা, তারা নিজেদেরই রক্ষা করতে পারবে না।
দশ. হালাকু খান খলিফাতুল মুসলিমীন মুসতা'সিম বিল্লাহর থেকে সবকিছু লাভ করেছিল। জানতে পেরেছিল তার মান-অবস্থান, শক্তি-সামর্থ্য এবং তার দুর্বল দিকগুলোও নির্ণয় করতে পেরেছিল। এভাবেই ৬৫৪ হিজরীর সমাপ্তি ঘটে।
পাঁচ বছর পর হালাকু খান দেখল যে, আব্বাসী খেলাফতের ওপর আক্রমণ করার এবং বাগদাদ পতনের এটাই উপযুক্ত মুহূর্ত। তাই সে লক্ষ্যে তাতারী বাহিনীদের একত্রিত করতে শুরু করে। যাতে তাতারী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর থেকে সার্বিক বিবেচনা এটাই হয় তাতারী বাহিনীর বড় সমাবেশ। অবস্থা এমন দাঁড়িয়ে ছিল যে, যাদের বাগদাদ অবরোধের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিল, তাদের সংখ্যা ছিল দুই লাখের বেশি। এছাড়াও উত্তর ইরাকে সড়ক ও মালামাল নিরাপত্তায় বহুসংখ্যক সৈন্য নিয়োজিত ছিল। আর সহযোগী দল উপদলগুলোর সংখ্যা তো আছেই।
নিম্নে তাতারী বাহিনীর বিন্যাস উল্লেখ করা হলো-
এক. মূল তাতারী বাহিনী ও দীর্ঘদিন ধরে পারস্য ও আযারবাইজানের নিয়োজিত বাহিনী ইরাকের পূর্বে নিয়োজিত ছিল।
দুই. হালাকু খান ভলগা নদীর তীরে অবস্থিত তাতারী বাহিনীর মধ্য হতে একটি ক্ষুদ্র দল তলব করে। যারা প্রসিদ্ধ তাতারী নেতা (ইউরোপ বিজেতা) পাতোর অধীনস্থ ছিল। তবে পাতো নিজে না এসে তার তিন ভাতিজাকে পাঠায়। পাতো ও তার বংশধররা ভলগা নদীর তীরে একটি স্বতন্ত্র সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে এবং নিজেদের 'স্বর্ণগোত্র' উপাধিতে ভূষিত করে। তবে তারা মূলত তাতারী সম্রাট চেঙ্গিজ খানেরই অনুসরণ করত।
তিন. হালাকু খান ইউরোপ বিজয়কার্যে আলাতোলিয়া (উত্তর তুরস্কে) নিয়োজিত একটি দলকে ডেকে পাঠায়। মঙ্গোল নেতা পোয়গেয়টের নেতৃত্বে একদল তাতারী তার ডাকে সাড়া দেয়। পথিমধ্যে তারা আলাতোলিয়া, উত্তর ইরাক ও বাগদাদ অতিক্রম করে। কিন্তু এই দীর্ঘ পথে কোনোরূপ বাধাপ্রাপ্ত হয় না। কারণ, এসব অঞ্চলের শাসকবর্গ তাতারীশক্তির সম্মুখে নতজানু হয়েছিল। ফলে আলাতোলিয়া, মসুল, আলেপ্পো ও হিমস তাদের জন্য উন্মুক্ত প্রান্তরে পরিণত হয়।
চার. হালাকু খান স্বীয় বন্ধু আর্মেনিয়ার রাজার কাছে সহযোগিতা কামনা করে চিঠি প্রেরণ করে। এতে স্বয়ং আর্মেনিয়ার রাজা হাইতুম একদল যোদ্ধাসহ আগমন করে।
পাঁচ. হালাকু খান জুজিয়ার রাজার কাছে ইরাক অবরোধের জন্য চিঠি প্রেরণ করে। সে তৎক্ষণাৎ হালাকু খানের ডাকে সাড়া দেয়।
ছয়. হালাকু খান এক হাজার প্রসিদ্ধ দক্ষ চীনা তীরন্দাজ চেয়ে পাঠায়, যারা অগ্নিতীর নিক্ষেপে বিশ্ববিখ্যাত ছিল।
সাত. হালাকু খান তার শ্রেষ্ঠ সেনাপতিকে সৈন্যবাহিনীর প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেয়। তার নাম ছিল কাতবুগা নওয়েন। সে ছিল খ্রিস্টান। ফলে সে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বৃহৎ সংখ্যক খ্রিস্টান বাহিনীর সঙ্গে সহজে মিশতে সক্ষম হয়। মোটকথা, পৃথিবীর ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ তিন সেনাপতির নেতৃত্বে (১. হালাকু ২. কাতবুগা ৩. পোয়গেয়ট) তাতারী বাহিনী যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়।
আট. হালাকু খান আন্তাকিয়ার আমীর বুহমন্দের সঙ্গে যোগাযোগ করে। কিন্তু যুদ্ধের পূর্ণ সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও সে ইরাক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে অপারগতা প্রকাশ করে। তবে ইরাক পতনশেষে সিরিয়া পতনে অংশগ্রহণ করবে বলে আশা ব্যক্ত করে।
নয়. দামেস্কের আমীর নাছের ইউসুফের ছেলে আযীযকে হালাকু খানের দলে শরিক হওয়ার জন্য প্রেরণ করে।
দশ. মসুলের আমীর বদর উদ্দীন লুলু একটি বাহিনী পাঠায়। শেষোক্ত দল দুটি যদিও খুব দুর্বল শীর্ণকায় ছিল, তবে তারা অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজ আঞ্জাম দিত। এ যুদ্ধে তাতারী বাহিনীর মাঝে বহু মুসলমানও শরিক ছিল। যারা তাতারীদের পক্ষে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। এমনকি ইরাক পতনযুদ্ধে বহু ইরাকবাসী তাতারীদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল। ইরাকবাসী সামান্য ক্ষমতা কিংবা ভুয়া রাজত্ব বা সামান্য কিছু অর্থে অথবা জীবনের মায়ার বিনিময়ে তাতারীদের কাছে সবকিছু বিক্রি করেছিল!!

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 বন্ধুরা!

📄 বন্ধুরা!


যে ব্যক্তি কেবল একত্ববাদী হওয়ার ওপর ভরসা করে আর কোনো প্রস্তুতি গ্রহণ করে না, পথ-পন্থা অবলম্বন করে না, সে আল্লাহর পক্ষ থেকে সহযোগিতা লাভ করতে পারে না।
মনে রাখবেন, তাতারীরা আল্লাহর নিকট সম্মানী, এজন্য তারা বিজয়ী হয়নি; তারা তো ভূপৃষ্ঠের সবচেয়ে জঘন্য জাতি, সবচেয়ে নিকৃষ্ট। তবে তারা প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিল, উপায়-উপকরণ অবলম্বন করেছিল। এ কারণেই তারা ফলাফল ভোগ করেছে, জয়লাভ করেছে।
এটাই চিরন্তন নীতি! আমরা ইহুদী, খ্রিস্টান ও বিধর্মীদের মুসলমানদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করতে দেখি। তারা যত্রতত্র মুসলমানদের অপমান অপদস্থ করে। এর কারণ হলো, তারা বৈষয়িক আসবাব অবলম্বন করে। আর মুসলমানরা তা বর্জন করে।
এর অর্থ এই নয় যে, মুসলমানরা বস্তুবাদী হয়ে যাবে, আর সবকিছুর নিয়ন্তা আল্লাহকে বর্জন করবে; বরং এর অর্থ হলো, আল্লাহর কাছে তাওফিক ও সহযোগিতা কামনা করার সঙ্গে সঙ্গে পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করা। এরপর সহযোগিতা লাভ হলে, জয়লাভ হলে আমরা একথা বিশ্বাস করব যে, বিজয় আল্লাহর পক্ষ থেকেই এসেছে। এতে আমরা অহংকার করব না, ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করব না, আল্লাহর গণ্ডি থেকে বের হয়ে আসব না।
والتاريخ - يا اخواني بتكرر
'বন্ধুরা, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকে।'
মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাতারীরা যে প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিল, পরবর্তীতে অন্যরা তা করবে। আর মুসলমানরা যে অবহেলা ও গাফলতি প্রদর্শন করেছে, পরবর্তী মুসলমানরাও তা-ই করবে।
তাতারীদের যুগে যে ফলাফল দাঁড়িয়েছিল, বর্তমান মুসলমানরা যদি সেই ইতিহাস থেকে শিক্ষা লাভ না করে, তবে সেই ফলাফলের পুনরাবৃত্তি হবে। আল্লাহ তা'আলা আমাদের সঠিক বুঝ দান করুন। আমীন।
আছে কি কোনো উপদেশ গ্রহণকারী?!

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00