📄 প্রথম পদক্ষেপ : অবকাঠামোর উন্নয়ন
অবকাঠামোর উন্নয়ন, আমলী প্রশিক্ষণ, প্রশিক্ষণের ধারাবাহিকতা রক্ষা ও রসদ জোগান।
১. হালাকু ইরাক থেকে চীন পর্যন্ত দীর্ঘ অঞ্চলজুড়ে সর্বত্র এই উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড শুরু করে। তবে সে তাজাকিস্তান, আফগানিস্তান ও পারস্যের অনুকূল ও প্রতিকূল পরিবেশ বিবেচনা করেই বিপুলসংখ্যক তাতারী সৈন্য প্রস্তুতির পদক্ষেপে অগ্রসর হয়।
২. হালাকু খান পথিমধ্যে যে সব নদী অবস্থিত, বিশেষত সাইহুন ও জাইহুন নদীর ওপর সেতু নির্মাণ করে এবং সেগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য পর্যাপ্ত সেনা মোতায়েন করে। শুধু তাতারীদের গমনাগমনের জন্যই এসব সেতুপথ খুলে দেওয়া হতো।
৩. হালাকু খান নিরোধ সরঞ্জামাদি চীন থেকে বাগদাদ নিয়ে যাওয়ার জন্য বিপুলসংখ্যক কুলি প্রস্তুত করে। এ কারণেই এত বিপুল সরঞ্জামাদি অতি অল্পসময়ের এত দূরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়।
৪. তাতারী বাহিনীর সবাই যেন নির্বিঘ্ন আকস্মিক আক্রমণ ও লুটতরাজ থেকে নিরাপদ থাকে, সে লক্ষ্যে হালাকু খান প্রতিটি শহর ও পথিমধ্যের ঘাঁটিসমূহে নিজ আধিপত্য বিস্তার শুরু করে।
৫. হালাকু খান একটি অদ্ভুত বস্তুর পদক্ষেপ গ্রহণ করে। সত্যিই এতে তার প্রখর মেধা ও বিচক্ষণতার প্রমাণ মেলে। তা হলো, সে বাগদাদ থেকে চীন পর্যন্ত সুদীর্ঘ পথের গাছপালা কাটার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। যাতে তাতারী বাহিনীর বিপুল সংখ্যক সওয়ারী এবং যুদ্ধের সরঞ্জামাদি বহনকারী জন্তুসমূহ খাদ্যাভাবমুক্ত থাকে। ফলে সওয়ারীর খাবার বহন করার প্রয়োজন পড়ে না এবং হঠাৎ খাদ্য সংকটের শঙ্কা থেকেও মুক্ত থাকে। চলন্ত গাড়ির পেট্রোল ফুরিয়ে যাওয়ার চেয়েও বিপজ্জনক হলো বাহনজন্তুর খাদ্য ফুরিয়ে যাওয়া। কারণ, পেট্রোল ফুরিয়ে গেলে গাড়ি অক্ষত থাকে। পক্ষান্তরে খাবার ফুরিয়ে গেলে বাহনজন্তু মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
📄 দ্বিতীয় পদক্ষেপ : রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পদক্ষেপ
বৃহৎ বিজয়সাধনের লক্ষ্যে তাতারীরা পার্শ্ববর্তী শক্তিশালী দেশসমূহের সঙ্গে কতিপয় রাজনৈতিক চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়ার ইচ্ছা করে। এতে তাতারী রাজনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়, যা ইতিপূর্বে দেখা যায় নি। যেহেতু এই দ্বিতীয় পদক্ষেপটি তাতারী রাজনীতির জন্য বড়ই ভয়াবহ ছিল, তাই মানকু খান নিজেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই দায়িত্ব পালনের জন্য দাঁড়িয়ে যায়। এক্ষেত্রে হালাকু খানের কোনো এখতিয়ার রাখা হয়নি; যদিও তৎকালে সময়ে হালাকু খানের মতামতই সর্বাধিক গৃহীত হতো।
১. মানকু খান ফ্রান্সের রাজা লুইস নাসের পক্ষ থেকে ৬৫১ হিজরীতে একটি চিঠি পায়। লুইস মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাতারীদের সহযোগিতা পাওয়ার বিষয়ে তখনো নিরাশ হয়নি। ঠিক ৬৪৮ হিজরীতে মানসুরার যুদ্ধে মুসলমানদের কাছে পরাজয়বরণ করার কারণে স্বভাবতই তার ভেতরে ক্রোধ দানা বেঁধেছিল। তখন ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত ছিলেন উইলিয়াম রোবরোক। দুই দেশের মাঝে সংলাপ শুরু হলেও অতি দ্রুত তা ব্যর্থ হয়। কারণ, মানকু খান দিলদরিয়া মানুষ ছিল না এবং এতটা রাজনৈতিক দূরদর্শীও ছিল না, যা চুক্তিরক্ষার জন্য জরুরি। সে পাশ্চাত্যের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বুঝত না এবং বুঝত না পাশ্চাত্যের রাজনৈতিক প্যাঁচ। উত্তম কলাকৌশল প্রয়োগ করে কথাও বলতে পারত না। জানত না স্বার্থ কীভাবে হাসিল করতে হয়। সে ইউরোপীয় কপটতা কিংবা ইউরোপীয় মুচকি হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা বিদ্বেষ সম্বন্ধে কিছুই জানত না। সে ছিল একজন সহজ সরল স্পষ্টভাষী।
মানকু খান আলোচনার শুরুতে বলে, গোটা বিশ্বে তিনি ছাড়া অন্য কোনো রাজা থাকতে পারবে না এবং কেউ তার সমকক্ষ থাকবে না। একমাত্র তার অনুসারীরাই পৃথিবীতে থাকতে পারবে। তারাই তার সাথী-সঙ্গী বিবেচিত হবে, যারা তার অন্ধ-অনুসরণ করবে এবং তার নেতৃত্ব ও আনুগত্যের কথা ঘোষণা করবে। পক্ষান্তরে যারা তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে কিংবা তার আনুগত্য প্রদর্শন করবে না, তাদের সঙ্গে তার কোনো সংলাপ চলবে না। তারা তার শত্রু বলে বিচেচিত হবে। যুদ্ধ ও ধ্বংসই তাদের একমাত্র পরিণাম।
এটি ছিল খুব সহজ রাজনীতি। এক নায়কতন্ত্রের রাজনীতি!! তিনি বিশ্বকে দুটি সাম্রাজ্যে বিভক্ত করেন: ১. শত্রু সাম্রাজ্য ২. মিত্র সাম্রাজ্য। ফ্রান্সের রাজা স্বভাবতই তাই এই শর্ত প্রত্যাখ্যান করে। এ কারণেই তাতারী ও পশ্চিম ইউরোপের মধ্যকার প্রথম সংলাপ ব্যর্থতায় পর্যুদস্ত হয়।
২. আনুগত্য প্রদর্শনে অস্বীকৃতি জ্ঞাপনপূর্বক যখন পশ্চিম ইউরোপের খ্রিস্টান ও রাজা বাদশারা মানকু খানকে সহযোগিতা প্রদানে অস্বীকৃতি জানাল, তখন অন্যান্য রাজা বাদশা এই প্রস্তাব গ্রহণ করল।
খ্রিস্টান রাজ্য আর্মেনিয়ার রাজা হাইতুম মানকু খানের শর্ত মেনে নিয়ে তার সঙ্গে জোট বাঁধলেন। তিনি তাতারীদের ক্ষমতা সম্পর্কে সম্যক অবগত ছিলেন। কারণ, ইতিপূর্বে তাতারী সম্রাট চেঙ্গিজ খান ও উকিতাই-এর যুগে তাতারীদের হাতে তার সাম্রাজ্য বিধ্বস্ত হয়েছিল।
তিনি একথাও জানতেন যে, কোনো অবস্থাতেই তার দুর্বল সাম্রাজ্য তাতারী সাম্রাজ্যের মোকাবেলা করতে পারবে না। আর্মেনিয়া সাম্রাজ্যের আয়তন হলো ৩০,০০০ (ত্রিশ হাজার) বর্গকিলোমিটার। উপরন্ত আর্মেনিয়ার রাজা জানত তার সাম্রাজ্য একদিক থেকে তাতারীদের কারণে অবরুদ্ধ, অন্য দিকে মুসলমানদের কাছে অবরুদ্ধ। মুসলমানদের সঙ্গে তাদের বিরোধ দীর্ঘদিনের। মুসলমানদের আক্রমণ করার জন্য এবং আব্বাসী খেলাফত ধ্বংস করার জন্য তার অন্তর অস্থির হয়েছিল। কাজেই সে যদি আজ তাতারীদের বশ্যতা মেনে না নেয়, কাল মুসলমানরা তার ওপর চড়াও হবে এবং তার সাম্রাজ্য ধূলিসাৎ হবে।
রাজা হাইতুম এসব কিছু মোঘল রাজধানী কারাকুরামে নিজেই মানকু খানের মোকাবেলা করার জন্য করেছিল। সে জেনেছিল, মানকু খান রাজনীতিতে কলাকৌশল আয়ত্ত করেছে। মানকু খান বিশাল বাহিনীর উপস্থিতিতে আর্মেনিয়ার রাজা হাইতুমকে জমকালো সংবর্ধনা জ্ঞাপন করে। তাকে একজন রাজা হিসেবে মূল্যায়ন করে, অনুসারী হিসেবে নয়। যদিও তাদের মধ্যকার চুক্তিনামা ও সংলাপ রাজা ও প্রজা হিসেবে সম্পাদিত হয়েছিল।
রাজা হাইতুমকে যিনি নিজেকে একজন সাধারণ প্রজা হিসেবে মানকু খানের সামনে উপস্থিত করেছেন, জমকালো সংবর্ধনা জ্ঞাপন শেষে মানকু খান বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি প্রদান করে এবং বহু মূল্যবান উপঢৌকন প্রদান করে। এর মাধ্যমে মানকু খান রাজা হাইতুমের আনুগত্য ক্রয় করেছিল。
📄 মানকু খান রাজা হাইতুমকে কী কী প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছিল
মারকু খান তাকে প্রদান করেছিল: ১. ব্যক্তিগত সম্পত্তির পূর্ণ নিরাপত্তা। ২. সমস্ত খ্রিস্টান গির্জা ও উপাসনালয়ের করের অব্যাহতি। ৩. সেলজুক যুদ্ধের সময় মুসলমানরা তাদের যেসব অঞ্চল দখল করেছিল, তা ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি। ৪. আর্মেনিয়া সাম্রাজ্যকে পশ্চিম এশিয়া বিষয়ক মানকু খানের উপদেষ্টা বানানো。
এভাবেই আর্মেনিয়ার রাজা তাতারী সম্রাটের নৈকট্যলাভে ধন্য হয়। কিন্তু জিজ্ঞাসার বিষয় হলো, আর্মেনিয়া সাম্রাজ্যের সঙ্গে তাতারীদের বিনয়ের কী লক্ষ্য ছিল? তৎকালীন সামরিক দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি জেনে থাকবেন, আর্মেনিয়ার সামরিক শক্তি তাতারীশক্তির ধারে-কাছেরও ছিল না। তাহলে তাতারী সাম্রাজ্য কেন আর্মেনিয়া নামক ক্ষুদ্র খ্রিস্টান সাম্রাজ্যের সম্মুখে বিনয়াবত হলো এবং নানান প্রতিশ্রুতি প্রদান করল?
📄 পাঠকবৃন্দ এই ঘটনা থেকে যা খুঁজে পাবে
এক. তাতারী সম্রাট মুসলমানদের যুদ্ধে আর্মেনিয়ার রাজার বিচক্ষণতা ও অভিজ্ঞতা থেকে উপকৃত হতে চেয়েছিল। কারণ, আর্মেনিয়া ও মুসলমানদের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। মুসলিম সাম্রাজ্য ও তাদের স্বভাব-চরিত্র সম্পর্কে আর্মেনিয়া ভালো ধারণা রাখত। আর্মেনীয়রা মুসলমানদের সম্পর্কে তাতারীদের যে তথ্য প্রদান করবে, নিঃসন্দেহে তা যুদ্ধে কাজে আসবে। (যেমন: বর্তমান পরাশক্তি আমেরিকা দুর্বল শক্তি ইংল্যান্ডের সঙ্গে একতা ঘোষণা করে কেবল এজন্য যে, মুসলিম ভূখণ্ড ও বিশেষত ইরাক সম্পর্কে ইংল্যান্ডের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অনেক।)
দুই. এই সুবিশাল সাম্রাজ্য পরিচালনার জন্য তাতারী সম্রাটের অনেক সহযোগিতা প্রয়োজন। সুতরাং নিজ দেশের ওয়াফাদার বিশ্বস্ত সহযোগী বহির্বিশ্বের সহযোগীর চেয়ে উত্তম। কারণ, অভ্যন্তরীণ সহযোগী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও গোত্রীয় দাঙ্গা-হাঙ্গামা নিয়ন্ত্রণে অধিক ক্ষমতাবান হয়।
তিন. এই পদক্ষেপের মাধ্যমে তাতারী সম্রাট নতুনভাবে খ্রিস্টানদের সঙ্গে সম্পর্কের দ্বারা উন্মুক্ত করল। কারণ, সিরিয়া মিশর বিজয়ের সময় খ্রিস্টানদের প্রয়োজন দেখা দেবে। তা ছাড়া ইউরোপ সংলাপে আর্মেনিয়া রাজার প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। এতকিছুর পরেও তাতারী সম্রাট জানত, খ্রিস্টানদের অন্তরে তাদের প্রতি রয়েছে চরম বিদ্বেষ। কারণ, তাতারীরা রাশিয়া ও পূর্ব ইউরোপে খ্রিস্টানদের অকাতরে জবাই করেছিল। এবার জাতীয় স্বার্থে উভয়দল একই প্লাটফর্মে আসার সুযোগ পেয়েছে।
চার. আর্মেনিয়া সাম্রাজ্যের সঙ্গে তাতারীদের ঐকমত্য মুসলমানদের মানসিকতার ওপর এক বড় প্রভাব সৃষ্টি করবে। কারণ তাতারীদের সঙ্গে যুদ্ধ করা এক কথা। আর জোট শক্তির সঙ্গে যুদ্ধ করা আরেক বিষয়। বস্তুত আর্মেনিয়ার একাত্মতা যদিও তাতারী শক্তির সামান্যতম শক্তিবৃদ্ধি করেনি, তথাপি 'জোট' শব্দটি মুসলমানদের মাঝে বড় প্রভাব সৃষ্টি করেছিল।
পাঁচ. এতে আর্মিনিয়ান জোট শক্তির ওপর কতিপয় বিপদ আবর্তিত হয়। যে বিপদ তাতরীদের উপর আবর্তিত হওয়ার কথা ছিল। ফলে এই পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে তাতারীদের পরিবর্তে আর্মেনিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সুতরাং যে ব্যক্তি বিশ্লেষকের চোখে তাতারী ও আর্মেনিয়ার মধ্যকার সংলাপ পর্যবেক্ষণ করবে, সে দেখতে পাবে যে, এতে তাতারীরা বিন্দুমাত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। মূলত সংলাপ হয়েছিল একজন রাজা যে সবকিছুর মালিক, একজন প্রজা যেকোনো কিছুরই মালিক নয়—এর মাঝে। এই হলো বিশ্বনেতাদের চরিত্র। তারা ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোকে নানান প্রতিশ্রুতি প্রদান করে। গুরুত্বপূর্ণ বহু কাজ আঞ্জাম দেওয়ার আশ্বাস প্রদান করে। বিনিময়ে তাদের প্রতিবেশী মিত্রদেশ হওয়া ছাড়া আর কিছুই পাওয়া হয় না।
পাশাপাশি কিছু গর্বিত উপাধি পাওয়া যায়। যেমন পশ্চিম এশিয়া বিষয়ক তাতারীদের উপদেষ্টা, মিত্ররাজ্য, মিত্র সাম্রাজ্য ইত্যাদি।
উপাধির ফুলঝুড়ি কখনো ক্ষুধা মেটায় না। হাজারো উপাধি কোনো উপকারে আসে না। বাস্তবতা হলো তাতারীশক্তি যেমন মিত্রের ঝাণ্ডা প্রত্যাখ্যান করেছিল, অনুরূপ প্রত্যেক যুগে প্রত্যেক দেশে শক্তিশালীরা দুর্বলদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে। অধিকার শক্তি ব্যতীত কখনো আদায় হয় না।
তাতারী সম্রাটের এসব প্রতিশ্রুতি পেয়ে রাজা হাইতুম খুশি মনে, আনন্দচিত্তে, গর্বিত হৃদয়ে উদ্বেলিত হয়ে ফিরে আসেন। কারণ, তিনি যুদ্ধ-বিগ্রহ থেকে নিজ রাজ্যকে বিরত রাখতে পেরেছেন।
৩. মানকু খানের আরেক ইচ্ছা এও ছিল যে, তিনি সিরিয়ার ক্রুশেড নেতাদের সঙ্গে জোট বাঁধবেন। কারণ, আন্তাকিয়া, ত্রিপোলি, সিদোন ও হাইফা সাম্রাজ্যের চেয়ে তাদের সাম্রাজ্য বড় ছিল। সিরিয়া ছিল মুসলমানদের তীর্থভূমি। কাজেই তারা সবাই যদি মুসলমানদের ওপর আক্রমণ চালায়, তাহলে মুসলমানরা আব্বাসী খেলাফত রক্ষা করতে পারবে না।
ক্রুশেডনেতাদের বীরত্ব ও সাহসিকতা বিবেচনা করে মানকু খান ঐক্যের আহ্বান নিয়ে তার নতুন বন্ধু হাইতুমকে পাঠায়, যে তৎকালে এসব অঞ্চলে তাতারী বাহিনীর দূত হিসেবে দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়েছিল। ক্রুশেড নেতাদের বীরত্বের দরুন তাতারী সম্রাট মানকু খান তাদের বাইতুল মুকাদ্দাস হস্তান্তর করার প্রতিশ্রুতি প্রদান করে। (উল্লেখ্য সিরিয়ার আইয়ূবী নেতাগণ ৬২৬ হিজরীতে বাইতুল মুকাদ্দাসকে ক্রুশেডারদের হাতে অর্পণ করার পর তা ৬৪৩ হিজরীতে দ্বিতীয় বারের মতো সুলতান আইয়ূবীর হাতে বিজিত হয়েছিল।) যেন মানকু খান বাইতুল মুকাদ্দাসের মালিক! যেন বাইতুল মুকাদ্দাস হাদিয়া হিসেবে ক্রুশেডারদের দেওয়ার অধিকার সে সংরক্ষণ করে!!
এটি হলো মালিকানাহীন বস্তু অযোগ্য ব্যক্তিকে অর্পণ করার নামান্তর .... ইতিহাস পুনরাবৃত্তি হয় আদ্যোপান্তসহ!!
তবে সিরিয়ার ক্রুশেডনেতারা তাতারী সম্রাটের আহ্বানে ঐকমত্য হতে পারছিল না। তবে আন্তাকিয়ার নেতা বুহমন্দ ছিলেন ব্যতিক্রম, সে বিষয়টিকে উত্তম মনে করে কার্যত তাতারীদের সঙ্গে মিলিত হয়।
সিরিয়ার অন্যান্য নেতাদের মিলিত না হওয়ার কারণ কী ছিল?
এক. তারা জানত, তাতারীরা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে না। তারা তাদের মূল্য ছাড়াই বিক্রি করে দেবে। অথবা যেকোনো কিছুর বিনিময়ে তারা তাদের জবাই করে দেবে কিংবা বিনিময় ছাড়াই জবাই করবে।
দুই. দ্বিতীয়ত তারা ইসলামী বিশ্বের মধ্যভাগে বসবাস করে। তারা নিজেদের ব্যাপারে মুসলমানদের যেমন ভয় পায়, তাতারীদেরও তেমন ভয় পায়। এমনকি তাতারীদের তারা মুসলমানদের চেয়েও বেশি ভয় পেত। এ কারণেই তারা প্রকাশ্যে তাতারীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করার দুঃসাহস দেখায়নি। যদিও স্পষ্টত তা প্রত্যাখ্যানও করেনি। এক্ষেত্রে তারা রাজনৈতিক কপটতার আশ্রয় নেয়। সাক্ষাতে মুচকি হাসির আড়ালে তাতারীশক্তি ও মুসলিমশক্তি—এই দুই শক্তির কোনো একটি বিজয়ের অপেক্ষায় দিনাতিপাত করছিল। তখন তারা বিজয়ী দলের দিকে সফলবলে অগ্রসর হবে, করমর্দন করবে, শুভেচ্ছা ও সংবর্ধনা জানাবে আর এই বলে ওজরখাহী করবে, যদি পরিবেশ-পরিস্থিতি প্রতিকূল না হতো, তবে তারা তাদের সঙ্গেই থাকত। কেউ কেউ বলেন, এই কর্মপদ্ধতির নামই হলো 'রাজনীতি'।
৪. মানকু খান সিরিয়া ও ইরাকের খ্রিস্টানদের সঙ্গে কতিপয় বিষয়ে সন্ধিচুক্তি করার চেষ্টার করে। এই সকল খ্রিস্টান রাজা-বাদশা বা আমীর-ওমারা ছিলেন না। তারা ছিলেন সেই সকল খ্রিস্টান, যারা সিরিয়ার মুসলিম সাম্রাজ্যের তত্ত্বাবধানে কিংবা ইরাকে আব্বাসী খেলাফতের অধীনে বসবাস করত। এটা স্বভাবতই প্রচলিত কিংবা প্রকাশ্য কোনো জোট বা একাত্মতা ছিল না; এটা ছিল কতিপয় খ্রিস্টান পাদরির সঙ্গে পরোক্ষ সন্ধিচুক্তি। এর উদ্দেশ্য ছিল, সহজে এসব দেশে অনুপ্রবেশ করা ও তাতারীদের খবরাখবর আদান-প্রদান করা।
কার্যত মানকু খান সে সকল খ্রিস্টানদের কাছে পৌঁছতে সফল হয়। বাগদাদে খ্রিস্টানপ্রধান ছিল মাকিকা। তাতারীদের বাগদাদ প্রবেশের ক্ষেত্রে সে বিরাট ভূমিকা রাখে।
৫. মানকু খান খ্রিস্টসাম্রাজ্য জুজিয়ার সঙ্গেও সন্ধিচুক্তিতে আবদ্ধ হয়। যদিও জুজিয়া সাম্রাজ্যের সঙ্গে তাতারীদের রয়েছে এক কালো ইতিহাস; তবে মুসলমানদের সঙ্গে জুজিয়া সাম্রাজ্যের ইতিহাসও কম কালো নয়। তাই জুজিয়ার খ্রিস্টানরা তাদের নতুন শত্রু তাতারীদের প্রবীণ শত্রু মুসলমানদের বিপক্ষে সহযোগিতা প্রদান করে। এর দুটি কারণ ছিল-
এক. তৎকালে তাতারীরা ছিল বিশ্বের পরাশক্তি। তারা জয়লাভ করবে, এটাই ছিল স্বাভাবিক।
দুই. খ্রিস্টান ও মুসলমানদের যুদ্ধ হলো আকীদাগত চিরন্তন যুদ্ধ। (যেমনটি আমরা আলোচনা করেছি) উভয়পক্ষেই ঘৃণাবোধ ছিল বদ্ধমূল। আর এই ঘৃণাবোধ তখনই দূর হওয়া সম্ভব, যখন আকীদাগত বিরোধ দূর হবে। আর তা কোনোদিনই সম্ভব নয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
وَلَا يَزَالُونَ يُقَاتِلُونَكُمْ حَتَّى يَرُدُّوكُمْ عَنْ دِينِكُمْ إِنِ اسْتَطَاعُوا
"তারা (কাফেরগণ) ক্রমাগত তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে থাকবে, এমনকি পারলে তারা তোমাদের তোমাদের দ্বীন থেকে ফেরাতে চেষ্টা করবে।"
পক্ষান্তরে তাতারীদের সঙ্গে খ্রিস্টানদের যুদ্ধ হলো স্বার্থের যুদ্ধ। স্বার্থে ব্যাঘাত ঘটলে যুদ্ধ আরম্ভ হয়। আর স্বার্থ নিষ্কলুষ থাকলে সৌম্য ভ্রাতৃত্ব টিকে থাকে। তৎকালে খ্রিস্টান জুজিয়া সাম্রাজ্যের সঙ্গে মূর্তিপূজারি তাতারীদের স্বার্থগত মিল থাকায় তারা এক পথের পথযাত্রী হয়েছিল। এটাকেই 'রাজনীতি' বলা হয়।
৬. এসব সংলাপ, সন্ধিচুক্তি ও প্রতিশ্রুতি ছিল একদিকে আর অপর দিকে সেসব সংলাপ ও সন্ধিচুক্তি চলছিল, কেবল সেগুলোর গুরুত্বের কারণে নয়, বরং সেগুলো বড়ই অদ্ভুত ও কদর্যপূর্ণ হওয়ার কারণে সেগুলো এখন উল্লেখ করব!!
মুসলিম সাম্রাজ্যের ওপর আক্রমণ ও আঘাত হালকা ও লঘুকরণের উদ্দেশ্যে এসব সংলাপ কতিপয় মুসলিম নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সংঘটিত হয়েছিল।
সম্রাট মানকু খান নিজে এসব সংলাপ বাস্তবায়ন করেননি। কারণ তিনি এসব মুসলিম আমীরদের তুচ্ছতাচ্ছল্যের দৃষ্টিতে দেখতেন। কারণ, এদের প্রত্যেকের সাম্রাজ্য ছিল মাত্র কয়েক কিলোমিটারব্যাপী। এইটুকু সাম্রাজ্য নিয়েই তারা নিজেদের 'আমীর' নামকরণ করেছিল। এমনকি বহু বিখ্যাত উপাধিতে তারা ভূষিত হতো। যেমন: মু'জাম, আশরাফ, আযীম, সাঈদ ইত্যাদি।
সম্রাট মানকু খান এসব সংলাপ বাস্তবায়নের জন্য সহোদর হালাকু খানকে দায়িত্ব প্রদান করে। ফলে দুর্বল মুসলিম নেতৃবৃন্দ শক্তিশালী তাতারী বাহিনীর দিকে অগ্রসর হয়।
فَتَرَى الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ مَرَضٌ يُسَارِعُونَ فِيهِمْ يَقُولُونَ نَخْشَى أَنْ تُصِيبَنَا دَائِرَةُ فَعَسَى اللَّهُ أَنْ يَأْتِيَ بِالْفَتْحِ أَوْ أَمْرٍ مِنْ عِنْدِهِ فَيُصْبِحُوا عَلَى مَا أَسَرُّوا فِي أَنْفُسِهِمْ نَادِمِينَ
“সুতরাং যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে তুমি তাদের দেখতে পাচ্ছ যে, তারা অতি দ্রুত তাদের মধ্যে ঢুকে পড়ছে। তারা বলছে, আমাদের আশঙ্কা হয়, আমরা কোনো মসিবতের পাকে পড়ে যাব। (কিন্তু) এটা দূরে নয় যে, আল্লাহ মুসলমানদের বিজয় দান করবেন অথবা নিজের পক্ষ থেকে অন্য কিছু ঘটাবেন। ফলে তখন তারা নিজেদের অন্তরে যা গোপন রেখেছিল, তজ্জন্য অনুতপ্ত হবে।”৪২
মসুলের নেতা এবং বদর উদ্দীন লুলু সেলজুকের দুই নেতা কেকাভাস ছানি ও কালাজ আরসালান রাবে হালাকু খানের কাছে সন্ধিচুক্তির জন্য আসে। সেলজুকের দুই নেতা উত্তর ইরাকের একটি স্পর্শকাতর স্থানে (বর্তমান তুরস্ক) অবস্থান করতেন। তাদের সন্ধিচুক্তির ফলে উত্তর থেকে ইরাক অবরুদ্ধ হয়। কেকাভাস ছানির তাতারী নেতাদের তোষামোদ করার পদ্ধতি ছিল বড়ই লজ্জাজনক ও লাঞ্ছনাকর।
আলেপ্পো ও দামেস্কের আমীর নাছের ইউসুফ ও নাছের সালাহ উদ্দীন আইয়ূবীর মিত্র হওয়া সত্ত্বেও তাতারীদের আনুগত্য প্রদর্শন করেন। অথচ কেবল মিত্রই নয়, বরং নাম ও উপাধিতেও তিনি ছিলেন সালাহ উদ্দীন আইয়ূবী। তবে রূহ ও প্রাণ, আখলাক ও চরিত্রের দিক থেকে সালাহ উদ্দীন আইয়ূবীর সঙ্গে তার কোনো মিল ছিল না। এমনকি তিনি এতটা নীচ ছিলেন যে, নিজ সন্তান আযীযকে কেবল হালাকু খানের অনুগত্য প্রদর্শনের জন্যই পাঠাননি, বরং হালাকু খানের একজন আমীর হিসেবে কাজ করার জন্য পাঠিয়েছিলেন।
অনুরূপ হিমসের আমীর আশরাফ আইয়ূবী তাতারী নেতার প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনের জন্য আসেন।
এ সমস্ত সন্ধিচুক্তি ও ঐক্যজোট ছিল খুবই ভয়াবহ। সন্ধিচুক্তির বিষয়াদি নিকৃষ্ট হেয়পূর্ণ হওয়া ছাড়াও এসব সন্ধির কারণে তাতারীদের শক্তি বৃদ্ধি পেয়েছিল। তারা ইরাককে চতুর্দিক থেকে অবরোধ করতে শুরু করেছিল এবং মুসলিম বিশ্বের অভ্যন্তরীণ সংবাদ সম্পর্কে অবগত হওয়ার পথ তাদের সামনে উন্মুক্ত হয়েছিল। এ ছাড়াও দল-উপদল গোত্র-উপগোত্রসমূহ এসব সন্ধির কারণে চরম অবক্ষয় ও অধঃপতনের শিকার হয়েছিল। কারণ, তারা আমীর-ওমারাদের লাঞ্ছনাকর পরিস্থিতি দেখে মনোবল হারাতে বসেছিল, সংকল্পচ্যুত হয়েছিল, নেতা নেতৃদের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেছিল। এ কারণে তাতারীদের মুখোমুখি দাঁড়াবার কোনো শক্তি তাদের ছিল না।
৭. হালাকু খান রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় আব্বাসী সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় প্রতাপশালী মন্ত্রী মুআইয়িদ উদ্দীন আলকামী শা'বীর কাছে পৌঁছেছিল।
মুআইয়িদ উদ্দীন ছিলেন একজন ফেতনাবাজ, নিকৃষ্ট রাফেজী। (সে হযরত আবু বকর ও হযরত ওমর রা. এর খেলাফতকে প্রত্যাখ্যান করে) সে কট্টর শিয়া ছিল। সুন্নত ও আহলে সুন্নতকে খুব ঘৃণা করত। অতি আশ্চর্যের বিষয় হলো, আকীদাগত চরম অধঃপতন সত্ত্বেও সে এই গর্বিত আসনে (খেলাফতে) অধিষ্ঠিত হয়েছিল। সুন্নী সাম্রাজ্য আমলে সে খলীফা নাম ধারণ করেছিল।
নিঃসন্দেহে এটি খলিফা মুসতা'সিম বিল্লাহর অদূরদর্শিতা ও স্থূল চিন্তার ফল, যিনি এই ফেতনাবাজ ওযীরকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদ প্রদান করেছেন। এই মন্ত্রীকে হাদীসের ভাষায় بطانة السوء [দুষ্ট বন্ধু] বলা হয়। আর বিবেকবানদের কাছে একথা অস্পষ্ট নয় যে, দেশ ও দেশবাসীর বিপর্যয়ে দুষ্টবন্ধুর চক্রান্ত কতটা নিকৃষ্ট হয়।
ইমাম বুখারী রহ. হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা. এর সূত্রে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
مَا اسْتُخْلِفَ خَلِيفَةٌ إِلَّا لَهُ بِطَانَتَانِ بِطَانَةُ تَأْمُرُهُ بِالخَيْرِ وَتَحُضُهُ عَلَيْهِ، وَبِطَانَةُ تَأْمُرُهُ بِالشَّرِّ وَتَحْضُهُ عَلَيْهِ، وَالمَعْصُومُ مَنْ عَصَمَ اللَّهُ
"প্রত্যেক খলিফার দুইজন বন্ধু থাকে। একবন্ধু তাকে সৎকাজের আদেশ দেয় এবং সৎকাজের প্রতি উৎসাহিত করে। আরেক বন্ধু তাকে অসৎকাজের আদেশ দেয় এবং অসৎকাজের প্রতি তাকে প্ররোচিত করে। সেই খলিফা নিরাপদে থাকে, আল্লাহ তা'আলা যাকে নিরাপদ রাখেন।"৪৩
আরও নিকৃষ্ট হলো, এক মাস দুই মাস নয়, এক বছর দুই বছর নয়, মুআইয়িদ উদ্দীন পূর্ণ ৬৪২ হিজরী থেকে ৬৫৬ হিজরী তথা বাগদাদ অধঃপতন পর্যন্ত ক্ষমতাসীন ছিল। এই চেদ্দো বছরেও যখন খলিফা তার চক্রান্ত বুঝতে পারেন নি, তখন খলিফার আকল-বিবেক অবশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ?
হালাকু খান মুআইয়িদ উদ্দীনের ফেতনা-ফ্যাসাদ ও সুন্নতের প্রতি ঘৃণাবোধের ফায়েদা উঠাতে তার সঙ্গে মিলিত হন এবং তাতারী বাহিনী বাগদাদে অনুপ্রবেশের ব্যাপারে শৈথিল্য প্রদর্শন বিষয়ে তার সঙ্গে একমত হন। খেলাফত পতনের পর বাগদাদ নগরী পরিচালনার জন্য বিচারালয়ে তার ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মুআইয়িদ উদ্দীন তাকে অসাধু পরামর্শ এবং খলিফা মুসতা'সিম বিল্লাহর কাছে মুসলিম উম্মাহর জন্য ক্ষতিকর আবেদন নিয়ে যাওয়ার জন্য সহযোগিতা প্রদান করে। এ উদ্দেশ্য সাধনে মন্ত্রী কোনোরূপ অবহেলা করেনি। খেলাফত পতন ও তৎকালে বাগদাদের সংঘটিত সকল দুর্ঘটনার পেছনে এই অসাধু মন্ত্রী অনস্বীকার্য হাত ছিল।
মানকু খান ও হালাকু খানের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার আলোকে এ কথা সুস্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, এই ভয়ংকর আক্রমণের প্রস্তুতি গ্রহণে তারা সামান্যতম অবহেলা করেনি এবং এমন ভয়ংকর পদক্ষেপ পৃথিবীর ইতিহাসে আর একবারও ঘটেনি। তা হলো, আব্বাসী খেলাফতের পতন ঘটানো।
তাতারীদের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সারমর্ম হলো, তাতারীরা আর্মেনিয়া, জুজিয়া ও আন্তাকিয়ার পক্ষ থেকে গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতাপ্রাপ্ত হয়েছে। তারা সিরিয়ার বহুসংখ্যক ক্রুশেডনেতাকে নিরপেক্ষ করে রেখেছিল। সিরিয়া ও ইরাকের খ্রিস্টানদের সঙ্গে গোপন সমঝোতা স্থাপন করেছিল। অনুরূপ কতিপয় মুসলিম নেতৃবর্গ ও উযীর মুআইয়িদ উদ্দীন আলকামীর সঙ্গে সন্ধি স্থাপন করেছিল। অবলীলায় বলা যায় যে, এ সকল কূটনৈতিক প্রচেষ্টা তাতারীদের সফলতার নেপথ্যে বড় ভূমিকা রেখেছিল।
উল্লেখযোগ্য, এহেন দুর্যোগপূর্ণ ভয়াবহ পরিস্থিতিতে দু-চারজন ব্যতীত সাধারণ মুসলমানরা দূর থেকে এ অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছিল। যেন এটি ছিল তাদের কাছে অতি সাধারণ ঘটনা। অথবা তারা কোনো অপ্রতিরোধ্য গুপ্ত ঘাতকের সন্ধান পেয়ে ঘাপটি মেরে বসেছিল, যার বিপক্ষে দাঁড়াবার ক্ষমতা তাদের নেই। লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ!
টিকাঃ
৪২ সুরা মায়েদা: ৫২।
৪৩ বুখারী: ৬৬১১।