📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 আব্বাসী খেলাফত পতনে হালাকু খানের পদক্ষেপ

📄 আব্বাসী খেলাফত পতনে হালাকু খানের পদক্ষেপ


হালাকু খান ৬৪৯ হিজরীতে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে ও দৃঢ় প্রত্যয়ী হয়ে তার কাজ শুরু করে। সে প্রত্যেক কাজ ধৈর্য, সহনশীলতা ও ধীরস্থিরভাবে করত। কাজেই আব্বাসী খেলাফতের প্রতি প্রচণ্ড ঘৃণাবোধ, তা ধ্বংস করার প্রতি তীব্র বাসনা, আব্বাসীদের ধন-সম্পত্তির লোভ, বিপুল সৈন্য এবং বাহ্যত আব্বাসীদের চেয়ে অধিক রণকৌশলী হওয়া সত্ত্বেও আব্বাসী খেলাফতের বিরুদ্ধে হুট করে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয় না; বরং ৬৪৯ থেকে ৬৫৪ হিজরী পর্যন্ত দীর্ঘ পাঁচ বছর ধৈর্যধারণ করে যুদ্ধের পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করে।
আসুন! হালাকু খানের যুদ্ধের প্রস্তুতি ও পদক্ষেপসমূহের প্রতি একটু দৃষ্টিপাত করি। হালাকু খান সমন্বিতভাবে প্রধান চারটি পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এই পদক্ষেপসমূহ আব্বাসী খেলাফতের বিরুদ্ধে বিজয়-সম্ভাবনা অনেক বাড়িয়ে দেয়। এগুলো ছিল যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার পূর্ব পদক্ষেপ। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এসব প্রস্তুতি মুসলিম-অমুসলিম সবার চোখের সামনে গ্রহণ করা হয়েছিল!!

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 প্রথম পদক্ষেপ : অবকাঠামোর উন্নয়ন

📄 প্রথম পদক্ষেপ : অবকাঠামোর উন্নয়ন


অবকাঠামোর উন্নয়ন, আমলী প্রশিক্ষণ, প্রশিক্ষণের ধারাবাহিকতা রক্ষা ও রসদ জোগান।
১. হালাকু ইরাক থেকে চীন পর্যন্ত দীর্ঘ অঞ্চলজুড়ে সর্বত্র এই উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড শুরু করে। তবে সে তাজাকিস্তান, আফগানিস্তান ও পারস্যের অনুকূল ও প্রতিকূল পরিবেশ বিবেচনা করেই বিপুলসংখ্যক তাতারী সৈন্য প্রস্তুতির পদক্ষেপে অগ্রসর হয়।
২. হালাকু খান পথিমধ্যে যে সব নদী অবস্থিত, বিশেষত সাইহুন ও জাইহুন নদীর ওপর সেতু নির্মাণ করে এবং সেগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য পর্যাপ্ত সেনা মোতায়েন করে। শুধু তাতারীদের গমনাগমনের জন্যই এসব সেতুপথ খুলে দেওয়া হতো।
৩. হালাকু খান নিরোধ সরঞ্জামাদি চীন থেকে বাগদাদ নিয়ে যাওয়ার জন্য বিপুলসংখ্যক কুলি প্রস্তুত করে। এ কারণেই এত বিপুল সরঞ্জামাদি অতি অল্পসময়ের এত দূরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়।
৪. তাতারী বাহিনীর সবাই যেন নির্বিঘ্ন আকস্মিক আক্রমণ ও লুটতরাজ থেকে নিরাপদ থাকে, সে লক্ষ্যে হালাকু খান প্রতিটি শহর ও পথিমধ্যের ঘাঁটিসমূহে নিজ আধিপত্য বিস্তার শুরু করে।
৫. হালাকু খান একটি অদ্ভুত বস্তুর পদক্ষেপ গ্রহণ করে। সত্যিই এতে তার প্রখর মেধা ও বিচক্ষণতার প্রমাণ মেলে। তা হলো, সে বাগদাদ থেকে চীন পর্যন্ত সুদীর্ঘ পথের গাছপালা কাটার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। যাতে তাতারী বাহিনীর বিপুল সংখ্যক সওয়ারী এবং যুদ্ধের সরঞ্জামাদি বহনকারী জন্তুসমূহ খাদ্যাভাবমুক্ত থাকে। ফলে সওয়ারীর খাবার বহন করার প্রয়োজন পড়ে না এবং হঠাৎ খাদ্য সংকটের শঙ্কা থেকেও মুক্ত থাকে। চলন্ত গাড়ির পেট্রোল ফুরিয়ে যাওয়ার চেয়েও বিপজ্জনক হলো বাহনজন্তুর খাদ্য ফুরিয়ে যাওয়া। কারণ, পেট্রোল ফুরিয়ে গেলে গাড়ি অক্ষত থাকে। পক্ষান্তরে খাবার ফুরিয়ে গেলে বাহনজন্তু মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 দ্বিতীয় পদক্ষেপ : রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পদক্ষেপ

📄 দ্বিতীয় পদক্ষেপ : রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পদক্ষেপ


বৃহৎ বিজয়সাধনের লক্ষ্যে তাতারীরা পার্শ্ববর্তী শক্তিশালী দেশসমূহের সঙ্গে কতিপয় রাজনৈতিক চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়ার ইচ্ছা করে। এতে তাতারী রাজনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়, যা ইতিপূর্বে দেখা যায় নি। যেহেতু এই দ্বিতীয় পদক্ষেপটি তাতারী রাজনীতির জন্য বড়ই ভয়াবহ ছিল, তাই মানকু খান নিজেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই দায়িত্ব পালনের জন্য দাঁড়িয়ে যায়। এক্ষেত্রে হালাকু খানের কোনো এখতিয়ার রাখা হয়নি; যদিও তৎকালে সময়ে হালাকু খানের মতামতই সর্বাধিক গৃহীত হতো।
১. মানকু খান ফ্রান্সের রাজা লুইস নাসের পক্ষ থেকে ৬৫১ হিজরীতে একটি চিঠি পায়। লুইস মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাতারীদের সহযোগিতা পাওয়ার বিষয়ে তখনো নিরাশ হয়নি। ঠিক ৬৪৮ হিজরীতে মানসুরার যুদ্ধে মুসলমানদের কাছে পরাজয়বরণ করার কারণে স্বভাবতই তার ভেতরে ক্রোধ দানা বেঁধেছিল। তখন ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত ছিলেন উইলিয়াম রোবরোক। দুই দেশের মাঝে সংলাপ শুরু হলেও অতি দ্রুত তা ব্যর্থ হয়। কারণ, মানকু খান দিলদরিয়া মানুষ ছিল না এবং এতটা রাজনৈতিক দূরদর্শীও ছিল না, যা চুক্তিরক্ষার জন্য জরুরি। সে পাশ্চাত্যের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বুঝত না এবং বুঝত না পাশ্চাত্যের রাজনৈতিক প্যাঁচ। উত্তম কলাকৌশল প্রয়োগ করে কথাও বলতে পারত না। জানত না স্বার্থ কীভাবে হাসিল করতে হয়। সে ইউরোপীয় কপটতা কিংবা ইউরোপীয় মুচকি হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা বিদ্বেষ সম্বন্ধে কিছুই জানত না। সে ছিল একজন সহজ সরল স্পষ্টভাষী।
মানকু খান আলোচনার শুরুতে বলে, গোটা বিশ্বে তিনি ছাড়া অন্য কোনো রাজা থাকতে পারবে না এবং কেউ তার সমকক্ষ থাকবে না। একমাত্র তার অনুসারীরাই পৃথিবীতে থাকতে পারবে। তারাই তার সাথী-সঙ্গী বিবেচিত হবে, যারা তার অন্ধ-অনুসরণ করবে এবং তার নেতৃত্ব ও আনুগত্যের কথা ঘোষণা করবে। পক্ষান্তরে যারা তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে কিংবা তার আনুগত্য প্রদর্শন করবে না, তাদের সঙ্গে তার কোনো সংলাপ চলবে না। তারা তার শত্রু বলে বিচেচিত হবে। যুদ্ধ ও ধ্বংসই তাদের একমাত্র পরিণাম।
এটি ছিল খুব সহজ রাজনীতি। এক নায়কতন্ত্রের রাজনীতি!! তিনি বিশ্বকে দুটি সাম্রাজ্যে বিভক্ত করেন: ১. শত্রু সাম্রাজ্য ২. মিত্র সাম্রাজ্য। ফ্রান্সের রাজা স্বভাবতই তাই এই শর্ত প্রত্যাখ্যান করে। এ কারণেই তাতারী ও পশ্চিম ইউরোপের মধ্যকার প্রথম সংলাপ ব্যর্থতায় পর্যুদস্ত হয়।
২. আনুগত্য প্রদর্শনে অস্বীকৃতি জ্ঞাপনপূর্বক যখন পশ্চিম ইউরোপের খ্রিস্টান ও রাজা বাদশারা মানকু খানকে সহযোগিতা প্রদানে অস্বীকৃতি জানাল, তখন অন্যান্য রাজা বাদশা এই প্রস্তাব গ্রহণ করল।
খ্রিস্টান রাজ্য আর্মেনিয়ার রাজা হাইতুম মানকু খানের শর্ত মেনে নিয়ে তার সঙ্গে জোট বাঁধলেন। তিনি তাতারীদের ক্ষমতা সম্পর্কে সম্যক অবগত ছিলেন। কারণ, ইতিপূর্বে তাতারী সম্রাট চেঙ্গিজ খান ও উকিতাই-এর যুগে তাতারীদের হাতে তার সাম্রাজ্য বিধ্বস্ত হয়েছিল।
তিনি একথাও জানতেন যে, কোনো অবস্থাতেই তার দুর্বল সাম্রাজ্য তাতারী সাম্রাজ্যের মোকাবেলা করতে পারবে না। আর্মেনিয়া সাম্রাজ্যের আয়তন হলো ৩০,০০০ (ত্রিশ হাজার) বর্গকিলোমিটার। উপরন্ত আর্মেনিয়ার রাজা জানত তার সাম্রাজ্য একদিক থেকে তাতারীদের কারণে অবরুদ্ধ, অন্য দিকে মুসলমানদের কাছে অবরুদ্ধ। মুসলমানদের সঙ্গে তাদের বিরোধ দীর্ঘদিনের। মুসলমানদের আক্রমণ করার জন্য এবং আব্বাসী খেলাফত ধ্বংস করার জন্য তার অন্তর অস্থির হয়েছিল। কাজেই সে যদি আজ তাতারীদের বশ্যতা মেনে না নেয়, কাল মুসলমানরা তার ওপর চড়াও হবে এবং তার সাম্রাজ্য ধূলিসাৎ হবে।
রাজা হাইতুম এসব কিছু মোঘল রাজধানী কারাকুরামে নিজেই মানকু খানের মোকাবেলা করার জন্য করেছিল। সে জেনেছিল, মানকু খান রাজনীতিতে কলাকৌশল আয়ত্ত করেছে। মানকু খান বিশাল বাহিনীর উপস্থিতিতে আর্মেনিয়ার রাজা হাইতুমকে জমকালো সংবর্ধনা জ্ঞাপন করে। তাকে একজন রাজা হিসেবে মূল্যায়ন করে, অনুসারী হিসেবে নয়। যদিও তাদের মধ্যকার চুক্তিনামা ও সংলাপ রাজা ও প্রজা হিসেবে সম্পাদিত হয়েছিল।
রাজা হাইতুমকে যিনি নিজেকে একজন সাধারণ প্রজা হিসেবে মানকু খানের সামনে উপস্থিত করেছেন, জমকালো সংবর্ধনা জ্ঞাপন শেষে মানকু খান বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি প্রদান করে এবং বহু মূল্যবান উপঢৌকন প্রদান করে। এর মাধ্যমে মানকু খান রাজা হাইতুমের আনুগত্য ক্রয় করেছিল。

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 মানকু খান রাজা হাইতুমকে কী কী প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছিল

📄 মানকু খান রাজা হাইতুমকে কী কী প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছিল


মারকু খান তাকে প্রদান করেছিল: ১. ব্যক্তিগত সম্পত্তির পূর্ণ নিরাপত্তা। ২. সমস্ত খ্রিস্টান গির্জা ও উপাসনালয়ের করের অব্যাহতি। ৩. সেলজুক যুদ্ধের সময় মুসলমানরা তাদের যেসব অঞ্চল দখল করেছিল, তা ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি। ৪. আর্মেনিয়া সাম্রাজ্যকে পশ্চিম এশিয়া বিষয়ক মানকু খানের উপদেষ্টা বানানো。
এভাবেই আর্মেনিয়ার রাজা তাতারী সম্রাটের নৈকট্যলাভে ধন্য হয়। কিন্তু জিজ্ঞাসার বিষয় হলো, আর্মেনিয়া সাম্রাজ্যের সঙ্গে তাতারীদের বিনয়ের কী লক্ষ্য ছিল? তৎকালীন সামরিক দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি জেনে থাকবেন, আর্মেনিয়ার সামরিক শক্তি তাতারীশক্তির ধারে-কাছেরও ছিল না। তাহলে তাতারী সাম্রাজ্য কেন আর্মেনিয়া নামক ক্ষুদ্র খ্রিস্টান সাম্রাজ্যের সম্মুখে বিনয়াবত হলো এবং নানান প্রতিশ্রুতি প্রদান করল?

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00