📄 মুমিনগণ একে অপরের ভাই!
অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, আরবীয় মুসলিমরা তুর্কী, আফগানী, শিশানী, হিন্দুস্তানী কিংবা পারসীয় মুসলিম ভাইদের ব্যথায় ব্যথিত হয় না। এটি অত্যন্ত দুঃখের বিষয়। এটি মুসলিম উম্মাহর মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার মতো মারাত্মক দুর্যোগ। কারণ, ইসলাম এমন এক দ্বীন (ধর্ম), যা বংশ, জাতি কিংবা বর্ণের মাধ্যমে গঠিত হয় না। ইসলাম গঠন হয় একমাত্র আল্লাহ, রাসূল ও এই দ্বীনের প্রতি অগাধ বিশ্বাসস্থাপনের মাধ্যমে। এটি হলো আকীদা-বিশ্বাসের বন্ধন।
ইমাম আহমদ রহ. আবু নাজরা রহ.-এর সূত্রে মুরসাল রেওয়ায়েতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—
يَا أَيُّهَا النَّاسُ، أَلَا إِنَّ رَبَّكُمْ وَاحِدٌ، وَإِنَّ أَبَاكُمْ وَاحِدٌ، أَلَا لَا فَضْلَ لِعَرَبِيٌّ عَلَى عَجَمِيَّ ، وَلَا لِعَجَمِيَّ عَلَى عَرَبِيَّ، وَلَا أَحْمَرَ عَلَى أَسْوَدَ، وَلَا أَسْوَدَ عَلَى أَحْمَرَ، إِلَّا بِالتَّقْوَى
“হে লোকসকল, তোমাদের রব এক, তোমাদের পিতা এক। জেনে রাখো, তাকওয়া (খোদাভীতি) ব্যতীত (একে অপরের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব নেই) অনারবীয়দের ওপর আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই। আরবীয়দের ওপর অনারবীরা শ্রেষ্ঠত্ব নেই। শ্বেতাঙ্গদের ওপর কৃষ্ণাঙ্গদের কিংবা কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর শ্বেতাঙ্গদের শ্রেষ্ঠত্ব নেই।”৩৭
হাদীস শরীফে শ্রেষ্ঠত্বের নীতিমালা সুস্পষ্ট বিবৃত হয়েছে। ইসলামে বংশ কিংবা বর্ণের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। শ্রেষ্ঠত্ব নিরূপিত হয় তাকওয়া ও খোদাভীতির মাধ্যমে।
এমনকি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলমানদের প্রধান দুটি দলে বিভক্ত করেছেন। তৃতীয় কোনো দলে বিভক্ত করেননি। তাঁর এই বিভক্তকরণ ছিল তাকওয়ার ভিত্তিতে। হাদীস শরীফে এসেছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَذْهَبَ عَنْكُمْ عُبِيَّةَ الْجَاهِلِيَّةِ وَتَكَبُّرَهَا بِآبَائِهَا، النَّاسُ رَجُلَانِ بَرُّ تَقِيُّ كَرِيمٌ عَلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ وَفَاجِرُ شَقِيٌّ هَيِّنٌ عَلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ ثُمَّ تَلَا: {يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُمْ مِنْ ذَكَرٍ وَأُنْثَى}
“হে লোকসকল, আল্লাহ তা'আলা তোমাদের জাহেলী যুগের অহংকার ও গর্ব দূর করেছেন। মানুষ দুই দলে বিভক্ত: ১. মুমিন মুত্তাকী, আল্লাহর নিকট সম্মানী। ২. পাপিষ্ঠ হতভাগা, আল্লাহর কাছে হীন। এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তেলাওয়াত করেন, (অর্থ) হে মানুষ, আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে।"৩৮
সুতরাং সত্যনিষ্ঠ মুমিন হলো সেই ব্যক্তি, যে আকীদা-বিশ্বাসে এক ও অভিন্ন ব্যক্তিদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়। যদিও জাত ও বংশ কিংবা বর্ণ ও ভাষা ভিন্ন হয়।
সুতরাং ইসলামের গ্রহণযোগ্যতার একমাত্র মানদণ্ড হলো আকীদা-বিশ্বাস ও তাকওয়া-পরহেজগারি।
টিকাঃ
৩৭ মুসনাদে আহমদ: ২৩৪৮৬।
৩৮ আবু দাউদ, তিরমিযী, আহমদ, ইবনে খুযায়মা, ইবনে হিব্বান, তাফসীরে ইবনে মারদুয়া।
📄 ৬৩৪ হিজরী থেকে ৬৩৯ হিজরী পর্যন্ত তাতারী আক্রমণ
৬২৯ থেকে ৬৩৪ হিজরী পর্যন্ত মোট পাঁচ বছর পর শুরমাজান ৬৩৪ হিজরীতে কাযবিন সমুদ্র অভিমুখে বিজয়ধারা অব্যাহত রাখতে রওনা হয়। সে খুব দ্রুতই আর্মেনিয়া জুজিয়া, শিশান ও দাগিস্তান অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করে।
অপরদিকে ভিন্ন আরেকটি তাতারীদল বাতু ইবনে জাজীর নেতৃত্বে কাযবিন সমুদ্রের উত্তরে আক্রমণ শুরু করে এবং ভোগলা নদীর নিম্নবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত গোত্রসমূহকে নির্মূল করতে শুরু করে। এটি ৬৩৪ হিজরীরই ঘটনা। এরপর ৬৩৫ হিজরীতে রাশিয়ার বিস্তৃত ভূখণ্ডের ওপর আক্রমণ শুরু করে।
এরপর বর্বর তাতারীরা খ্রিস্টান সাম্রাজ্য রাশিয়া পতনের ডাক দেয়। রাশিয়ায় কতেক শহরকে মানুষ হত্যার কসাইখানায় পরিণত করে। এটি ৬৩৫-৬৩৬ হিজরীর ঘটনা। অল্প কিছুদিনের মাঝে রিদান ও কলম্বিয়া শহর দখল করে নেয়। এরপর ছয় দিনের মাথায় তাদের হাতে ব্লাদিমির (Vladimir) শহরের পতন ঘটে। কসাইখানায় যেমন গরু একটার পর একটা জবাই করা হয়, অনরূপ তাতারীদের হাতে একের পর এক শহরের পতন হতে থাকে। এরপর সুদান পতিত হয়। এ পর্যায়ে তারা রাশিয়ার রাজধানী মস্কো নগরীর দিকে হাত বাড়ায়। মস্কোকেও তারা তাতারী আক্রমণের কালো মানচিত্রে পরিণত করে। এরপর ক্রমান্বয়ে ইউরোপ, জালিশ, বারিসলাফ, রুস্তুফ, ইয়ারুসলাফ, তোরঝোক শহর ধ্বংসের মাধ্যমে তাতারীরা গোটা রাশিয়া দখল করে নেয়। (রাশিয়ার আয়তন হলো সতেরো মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটার। এই সুবিশাল আয়তনের দেশটির জনসংখ্যাও ছিল বিপুল। অথচ তাতারীরা মাত্র দুই বছরে দেশটিকে দখল করে নেয়!)
৬৩৮ হিজরীতে বাতু ইবনে জাজীর নেতৃত্বে পশ্চিমে গোটা উকরানি (Ukraine) সাম্রাজ্যের ওপর কালো থাবা বিস্তৃত করে। উকরানির আয়তন ছিল ছয় লক্ষ বর্গ কিলোমিটার। তারা উকরানির রাজধানী কাইভে আক্রমণ করে অধিকাংশ জনগণকে হত্যা করে শহরটিকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে।
৬৩৯ হিজরীতে তাতারী বাহিনী একটি শক্তিশালী দল বাইদারের নেতৃত্বে ইউক্রেন পোল্যান্ড রাজত্বের দিকে অগ্রসর হয়। পোল্যান্ড শহরে প্রবেশ করে অধিকাংশ জনপদ ধ্বংস করে ফেলে। কিন্তু পোলিশ রাজা অল্পসংখ্যক জার্মানি সৈন্যের সহযোগিতা পায়। (জার্মানি পোলিশের পশ্চিমে অবস্থিত)। প্রিন্স হেনরি ডিউক (Silesian) পোল্যান্ডের রাজার সঙ্গে একক সেনাবাহিনী গঠনের জন্য জোট বাঁধেন। কিন্তু এই সামরিক বাহিনী বাইদারের নেতৃত্বপূর্ণ তাতারী বাহিনীর হাতে নির্মম পরাজয় বরণ করে। এভাবেই পোল্যান্ড শহর তাতারী বাহিনীর হাতে পরাজিত হয়।
এরই মধ্যে ৬৩৯ হিজরীতে তাতারীদের ইউক্রেনের কমান্ডার বাতু এ অঞ্চলে একদল সৈন্য রেখে প্রধান দলটি নিয়ে হাঙ্গরের রাজার সঙ্গে দেখা করে। মুখোমুখি যুদ্ধে হাঙ্গরের রাজা পরাজিত হয়। এ যুদ্ধের মাধ্যমে হাঙ্গরও তাতারীদের চারণভূমিতে পরিণত হয়।
এদিকে পোল্যান্ড থেকে বাইদার বাতুর নেতৃত্বে প্রধান তাতারীদলের সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে বের হয়। পথিমধ্যে স্লোভাকিয়া আক্রমণ করে তাতারী সাম্রাজ্যকে আরও সম্প্রসারিত করে।
এরপর তাতারী বাহিনী ক্রোয়েশিয়া আক্রমণ করে তা ছিন্ন ভিন্ন করে দেয়। এভাবেই তাতারী বাহিনী আদ্রিয়াটিক সাগরউপকূলে পৌঁছে যায় (আদ্রিয়াটিক সাগর ইটালি ও ক্রোয়েশিয়ার মাঝামাঝি অবস্থিত)। এভাবে তাতারীরা ইউরোপের প্রায় অর্ধেকাংশ তাদের রাজত্বের অন্তর্ভুক্ত করে।
ইউরোপে অব্যাহত তাতারী বিজয় সম্ভব ছিল যদি তাদের মহান নেতা উকিতাই এ বছর (৬৩৯ হিজরী) মারা না যেত। ইতিমধ্যে তাতারী সাম্রাজ্য জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও ইটালি পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। ফলে তাতারী নেতা বাতু ইবনে জাজী যুদ্ধ বন্ধ করতে বাধ্য হয়। সে জনৈক তাতারী কমান্ডারকে বিজিত অঞ্চলসমূহের দায়িত্ব প্রদানকরত তাতারীদের নতুন প্রিন্স নির্ধারণী নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য মঙ্গোলিয়ায় তাতারীদের রাজধানী কারাকুরমে ফিরে যায়।
📄 পরিস্থিতি বিশ্লেষণ (৬৩৯ হিজরী ও পরবর্তী সময়)
এক. এ বছর তাতারী সাম্রাজ্যের সীমানা পূর্ব-পশ্চিমে ইউরোপ থেকে পশ্চিমে পোল্যান্ড, উত্তরে সাইবেরিয়া থেকে দক্ষিণে চীন সাগর পর্যন্ত পৌঁছেছে। এটিকে অতি স্বল্প সময়ে ভয়াবহ প্রসার বলা যেতে পারে। তখন তাতারী শক্তি পৃথিবীর প্রধান পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল, এতে কোনো দ্বিমত নেই।
দুই. তাতারী সম্রাট উকিতাইয়ের পর তার ছেলে কায়ুক ইবনে উকিতাই তাতারীদের নেতৃত্ব গ্রহণ করে। নতুন সম্রাট কায়ুক ইবনে উকিতাইয়ের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, নতুন এলাকা বিজয় করার চেয়ে বিজিত অঞ্চলসমূহে ক্ষমতা সুপ্রতিষ্ঠিত করা। অন্যথায় ক্ষমতা বিলুপ্তির আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে নতুন সম্রাটের আমলে তাতারীদের বিজয়ধারা বাধাগ্রস্ত হয়। তবে বিজিত অঞ্চলসমূহে ক্ষমতা সুপ্রতিষ্ঠিত করতে তারা সচেষ্ট থাকে।
তিন. তাতারীরা পূর্ববর্তী বিজয়ের মাধ্যমে মুসলিমবিশ্বের অর্ধেক পূর্বাচল গিলে ফেলেছিল। এশিয়ার অধিকাংশ মুসলিম অঞ্চলগুলোকে তারা তাতারী সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেছিল। এসব অঞ্চলের সকল সভ্যতা-সংস্কৃতি তারা ধ্বংস করে ফেলেছিল। পরবর্তী বহু বছরের জন্য তাতারীরা এই সুবিশাল বিস্তৃত অঞ্চলের সভ্যতা, সংস্কৃতি, উন্নতিও অগ্রগতির সোপান ভেঙে দেয়।
চার. ইতিমধ্যে তাতারীরা মুসলিমবিশ্বের মধ্যভূখণ্ডকে খণ্ড-বিখণ্ড করে ফেলে, যা ইরাক থেকে মিশর পর্যন্ত বিস্তৃত। ফলে এ অঞ্চলের মুসলমানরা পরস্পর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-কলহে লিপ্ত হয়ে পড়ে। তাদের পরস্পর সম্পর্কহীনতা ও বিরোধ বিকট আকার ধারণ করে। অনুরূপ লিবিয়া, তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া, মরক্কো ও ওয়েস্ট আফ্রিকা তথা মুসলিমবিশ্বের পশ্চিম ভূখণ্ড মুওয়াহিদ্বীন সাম্রাজ্য পতনের পর খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যায়।
পাঁচ. মুসলমানদের পূর্বেই ইউরোপীয় খ্রিস্টানরা তাতারী হামলার স্বাদ আস্বাদন করেছে। হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ ইউরোপবাসীকে জবাই করা হয়, গির্জা ধ্বংস করা হয়, বহু শহর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। বস্তুত এটি ছিল রোমান খ্রিস্টান ক্যাথলিকদের অভ্যন্তরে প্রবেশের পূর্ব সতর্কবাণী।
ছয়. খ্রিস্টানরা তাতারীদের নির্মম ধ্বংসযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করা সত্ত্বেও পশ্চিম ইউরোপ (ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, ইটালি ও জার্মানি)-এর খ্রিস্টানরা মনে করত, তাতারী আক্রমণ একটি সাময়িক বিষয়। তা যেকোনো মুহূর্তে বন্ধ হবে। কিন্তু মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাদের যুদ্ধ অবিরাম চলবে, তা কখনো থামবে না। আর এ কারণেই খ্রিস্টান সম্রাটরা নিজেদের লক্ষ লক্ষ মানুষ তাতারীদের হাতে নিহত হওয়ার পরও মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাতারীদের পূর্ণ সহযোগিতা প্রদান করতে প্রস্তুত থাকত।
আচ্ছা, কেন ক্রুশেড (খ্রিস্টান) সম্রাটরা এ ধারণা পোষণ করত যে, মুসলমানদের যুদ্ধ চিরস্থায়ী। আর তাতারীদের যুদ্ধ সাময়িক? কারণ, মুসলমানদের সঙ্গে খ্রিস্টান সম্রাটদের যুদ্ধ হলো আকীদা-বিশ্বাসের যুদ্ধ। মুসলমান-খ্রিস্টানদের যুদ্ধ হলো দ্বীন-ধর্মের যুদ্ধ। মুসলিম-খ্রিস্টানদের যুদ্ধ হলো চিরন্তন যুদ্ধ। যতদিন পর্যন্ত মুসলমান ও খ্রিস্টানরা একই ধর্মালম্বী না হবে ততদিন পর্যন্ত মুসলমান ও খ্রিস্টানদের যুদ্ধ থামবে না। যেমন মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীন কুরআনে কারীমে বলেন-
وَلَنْ تَرْضَى عَنْكَ الْيَهُودُ وَلَا النَّصَارَى حَتَّى تَتَّبِعَ مِلَّتَهُمْ
"ইহুদী ও নাসারা তোমার প্রতি কিছুতেই খুশি হবে না যতক্ষণ না তুমি তাদের ধর্মের অনুসরণ করবে।”৩৯
পক্ষান্তরে খ্রিস্টানদের সঙ্গে তাতারীদের আকীদাগত কোনো যুদ্ধ ছিল না। তাতারীদের আকীদা ছিল বিকৃত, বিভিন্ন ধর্মের সমন্বয়ে সৃষ্টি। একজন তাতারী নেতাও সভ্য দেশগুলোতে তাদের আকীদা-বিশ্বাস প্রচারে সক্ষম ছিল না। তাতারীদের মূল লক্ষ্য ছিল জ্বালাও-পোড়াও ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানো, শিশু নারীদের বন্দীকরণ ও ধন-সম্পদ পুঞ্জীভূত করা। এসব যাদের গুণ ও বৈশিষ্ট্য হয় তাদের পক্ষ থেকে কোনো কিছুর ধারাবাহিকতা আশা করা যায় না।
এ কারণেই ইউরোপীয় খ্রিস্টানরা তাতারীদের পক্ষ থেকে নানান রকম কষ্ট-যন্ত্রণা পেয়েও তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি না নিয়ে মিশর, সিরিয়া তথা মুসলিম সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করে। তৎকালীন নাজুক মুহূর্তে খ্রিস্টানরা মুসলিম উম্মাহকে নির্মূল করার জন্য তাতারী সম্রাটের পক্ষ থেকে সহযোগিতা লাভের ব্যাপারে নিরাশ হয় ন।
সাত. ইউরোপ আক্রমণের পর তাতারী বাহিনীর আকীদা-বিশ্বাসে পরিবর্তন সাধিত হয়। বহুসংখ্যক মোঘল নেতা খ্রিস্টান মেয়েদের বিয়ে করে। এতে মোঘল ও খ্রিস্টধর্মের সংমিশ্রণ ঘটে। তাতার ও খ্রিস্টানদের পরস্পর সহযোগিতার এটি একটি অন্যতম কারণ।
আট. বহুদিন পূর্ব থেকে ইউরোপীয় খ্রিস্টান ও মিশর-সিরিয়ার মুসলমানদের পরস্পর যুদ্ধ চলছিল। তৎকালীন মিশর ও সিরিয়ায় আইয়ূবীদের শাসন চলত। কিন্তু সে সময়টি ছিল আইয়ূবীদের শেষ সময়। আইয়ূবীদের পরস্পর যুদ্ধ-বিগ্রহ চলছিল। মাঝে মুসলমানগণ উভয় সংকটে দিনাতিপাত করছিল। একদিকে তাতারী হামলা, অন্যপাশে ক্রুশেড (খ্রিস্টান) হামলা।
নয়. ৬৪০ হিজরীতে আব্বাসী খলিফা মুনতাসির বিল্লাহ মৃত্যুবরণ করেন। তারপর তার ছেলে মুস্তাসিম বিল্লাহ খলিফা মনোনিত হন। তখন তার বয়স ছিল ত্রিশ বছর। যদিও অধিক কুরআন তেলাওয়াত, ফিকাহ ও তাফসীরশাস্ত্রে গভীর জ্ঞান ও অধিক পুণ্যকাজে তার সুখ্যাতি রয়েছে; কিন্তু তিনি রাজনীতির 'র'ও বুঝতেন না। 'মানবজ্ঞান' বলতে তার কোনো জ্ঞান ছিল না। (তিনি মানুষ চিনতেন না।) ফলে তিনি অসৎ বন্ধু গ্রহণ করেন এবং পূর্বের তুলনায় খেলাফত আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। শীঘ্রই এর বিস্তারিত বিবরণ আসবে ইনশাআল্লাহ! তিনি সর্বশেষ আব্বাসী খলিফা। এরপর তার শাসনামলেই বাগদাদের পতন ঘটে।
দশ. তাতার ও ইরাকের আব্বাসী খেলাফতের মাঝে শুধু পারস্যের (বর্তমান ইরানের) পশ্চিমে অবস্থিত একটি সংকীর্ণ অঞ্চলের ব্যবধান ছিল। আয়তনের দিক থেকে খুব ছোট হলেও ভৌগলিক দিক থেকে অঞ্চলটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এ অঞ্চলে বাস করত ইসমাঈলী শিয়াদের একটি গ্রুপ। তারা ছিল যুদ্ধপ্রিয়। তাদের বহু মজবুত দুর্গ ও ঘাঁটি ছিল। আব্বাসী খেলাফতের সঙ্গে সর্বদা তাদের বিরোধ লেগেই থাকত। তারা সুন্নী মাযহাবকে প্রচণ্ড ঘৃণা করত। তারা ইসলামের শত্রুদের প্রচুর সহযোগিতা করত। তারা একবার তাতারদের অনুগামী হতো, আরেকবার খ্রিস্টানদের অনুগামী হতো। তাতারীরা তাদের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত ছিল না। ভূপৃষ্ঠে কোথাও কোনো শক্তিশালী দল টিকে থাকুক, তাতারীরা তা কখনোই চাইত না।
মোটকথা, নতুন তাতারী সম্রাট কায়ুক ইবনে উকিতাই সুবিশাল রাজত্ব লাভ করে, যাকে তৎকালীন বিশ্বের পরাশক্তি মনে করা হতো। আর খ্রিস্টানরা তাতারীদের অনিরাময় ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করেও মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাদের সহযোগিতা কামনা করে। অপর দিকে মুসলমানগণ ছিলেন চিরন্তন বিরোধে লিপ্ত। উভয় সংকট তাদের ঘিরে রেখেছিল; একপাশে তাতারী আক্রমণ, অন্য পাশে ক্রুশেড আক্রমণ। ছোট-বড় নির্বিশেষে কোনো মুসলিম নেতার তখন দেশ স্বাধীন করা কিংবা জুলুম থেকে আল্লাহর বান্দাদের মুক্তি দেওয়ার কোনো চিন্তা ছিল না। তখন তাদের চাওয়া-পাওয়া বলতে ছিল নিজ বসবাস-ভূমিতে নিজের ক্ষমতা সুরক্ষিত রাখা। নিজ ক্ষমতাশীল এলাকা চাই ছোট হোক বা দুর্বল হোক। লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।
টিকাঃ
৩৯ সুরা বাকারা: ১২০।
📄 ৬৩৯ হিজরী থেকে ৬৪৯ হিজরীর মধ্যবর্তী সময়
তাতারীদের নতুন সম্রাট কায়ুক ইবনে উকিতাই ক্ষমতা গ্রহণের পর ব্যাপক হামলানীতি প্রত্যাহার করে এবং তাতারী অধ্যুষিত বিক্ষিপ্ত অঞ্চলসমূহে নিজের ক্ষমতা সুদৃঢ় করার প্রতি মনোযোগ দেয়। সম্রাট কায়ুকু ৬৩৯ হিজরী থেকে ৬৪৬ হিজরী পর্যন্ত রাজত্ব পরিচালনা করে। এই সাত বছরে তাতারীরা দু-একটি অঞ্চল ব্যতীত নতুন কোনো অঞ্চলে প্রবেশ করে না।
পশ্চিম ইউরোপের খ্রিস্টানরা যখন দেখতে পেল, সম্রাট কায়ুক কোনো যুদ্ধ-সম্প্রসারণ নীতি অবলম্বন করছে না, তখন তাতারীদের পক্ষ থেকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে সহযোগিতা লাভের কামনা তাদের মাঝে তীব্র আকার ধারণ করল। তারা ইনোসেন্ট রাবে' পোপকে ৬৪৩ হিজরীতে দূত হিসেবে মঙ্গোলিয়ায় প্রেরণ করে। তাকে দূত বানানোর উদ্দেশ্য ছিল মিশর ও সিরিয়ার মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাতারীদের সমর্থন জোগানো। (তাকে দূত বানানোর উদ্দেশ্য এটা ছিল না যে, তিনি রাশিয়া ও ইউরোপের খ্রিস্টানদের ওপর থেকে জুলুম ও অত্যাচার রোধ করবেন।) তাতারী সম্রাট কায়ুক খ্রিস্টান দূতকে মোঘল অঞ্চলে খ্রিস্টানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ বলে উষ্ণ সংবর্ধনা জানাল। কিন্তু সম্রাট কায়ুক দূতের চিঠি পাঠ করে দেখতে পেল, মুসলমানদের বিরুদ্ধে সামরিক সহযোগিতা কামনার তুলনায় চিঠিতে তাকে খ্রিস্টধর্মের প্রতি আকৃষ্ট করা হয়েছে। সে এটিকে একপ্রকার সীমালঙ্ঘন মনে করে। কীভাবে খ্রিস্টানরা তাতারী সম্রাটের ধর্মপরিবর্তন কামনা করে?!
সম্রাট কায়ুক চিঠির উত্তরে লেখে, তারা যেন পশ্চিম ইউরোপের আমীর-উমারাদের একত্রিত করে সম্রাটের আনুগত্য প্রদর্শনার্থে মঙ্গোলিয়ায় নিয়ে আসে। এরপর সহযোগিতা প্রদান করা হবে। স্বভাবতই পশ্চিম ইউরোপের আমীর-উমারারা তার এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। এ কারণে তাদের দৃঢ় উদ্দেশ্য সাধন ব্যর্থ হয়।
কিন্তু ক্যাথলিক পোপ ইনোসেন্ট রাবে' এতে নিরাশ না হয়ে আরেকটি চিঠি পাঠান। তবে এবার তিনি চিঠিটি ইসলামী খেলাফতের পারস্য অঞ্চলের তিবরিয শহরের তাতারী কমান্ডারের কাছে পাঠান। এই তাতারী কমান্ডারের নাম ছিল বিজু। এটি ৬৪৫ হিজরীর ঘটনা। পোপ তার পক্ষ থেকে আক্রমণ কিংবা সীমালঙ্ঘনের আশঙ্কা টের পায়নি; বরং সে তাকে সহযোগী হিসেবে পেয়েছে। পোপ বিজুর পক্ষ থেকে অভিনন্দিত হয়। বিজু মনে করে, মিশর ও সিরিয়ার মুসলমানদের ওপর খ্রিস্টানরা আক্রমণ করলে মুসলমানরা ইরাকের আব্বাসী খেলাফত রক্ষায় ব্যস্ত থাকবে। ফলে তাদের আক্রমণ করা খুবই সহজ হবে। কিন্তু একথা দিবালোকের মতো সুস্পষ্ট যে, খ্রিস্টানদের সহযোগিতা করার জন্য যে সামরিক যোগ্যতার প্রয়োজন, তা বিজুর মাঝে নেই। এদিকে কায়ুক ইবনে উকিতাই রাজ্য অসম্প্রসারণ নীতি এবং খ্রিস্টানদের সহযোগিতা প্রদান না করার নীতিতে অটল। তবে খ্রিস্টানরা যদি বিনয়াবত হয়ে তার কাছে আসে তবে তা ভিন্ন বিষয়। এভাবে দ্বিতীয় বারের সহযোগিতা কামনাও ভেস্তে যায়।
এ সময় ফ্রান্সের অধিপতি লুইস তাসে মিশর আক্রমণের প্রস্তুতি গ্রহণ করে। ইতিহাস পাঠ করে আমি জানতে পেরেছি এটি ছিল খ্রিস্ট-আক্রমণ। সে সাইপ্রাস দ্বীপে সৈন্যবাহিনী একত্রিত করতে থাকে। এটি ৬৪৬ হিজরীর ঘটনা। লুইস দেখল, মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাতারীদের সমর্থনের সম্ভাবনা এখনো শেষ হয়নি। তাই সে তৃতীয় বারের মতো সাইপ্রাস থেকে মঙ্গোলিয়া যায়। তাতারী সম্রাট কায়ুকের সহযোগিতা কামনা করে চিঠি পাঠায়। চিঠির সঙ্গে বহু মূল্যবান হাদিয়া উপঢৌকন ও দামি দামি হিরা জহরত পাঠায়। কিন্তু চিঠিটা যখন মঙ্গোলিয়ার রাজধানী কারাকুরামে পৌঁছে তখন তাতারী সম্রাট কায়ুকের আকস্মিক মৃত্যু ঘটে। কায়ুক ছোট তিনজন সন্তান রেখে মারা যায়। তাদের কেউ এই বয়সে রাজত্ব গ্রহণের উপযুক্ত নয়। ফলে কায়ুকের স্ত্রী উগল কিউমেশ (Oogol Qemesh) ক্ষমতা গ্রহণ করে। এটি ৬৪৬ হিজরীর প্রথম দিকের ঘটনা। তার ক্ষমতা তিন বছর দীর্ঘায়িত হয়।
লুইস নতুন তাতারী সম্রাজ্ঞীর কাছে দূত প্রেরণ করে। সম্রাজ্ঞী তাকে সাদর সম্ভাষণ জানায়। কিন্তু সে খ্রিস্টানদের সহযোগিতা করতে না পারায় অপারগতা প্রকাশ করে। কারণ, কায়ুকের অকালমৃত্যুর কারণে তাতারী সাম্রাজ্যে যেসব বিপর্যয় দেখা দিয়েছে, সে তা সমাধানে ব্যতিব্যস্ত রয়েছে। উপরন্তু অধিকাংশ তাতারী নেতা সুবিশাল তাতারী সাম্রাজ্যের উপর নারীর ক্ষমতায়নকে মেনে নিতে পারছিল না, যেই সাম্রাজ্যের মূল বুনিয়াদ হলো শক্তি, ক্ষমতা ও দৌরাত্ম্য। কিন্তু লুইস তাতারীদের অংশগ্রহণ ব্যতীতই আক্রমণের সিদ্ধান্তে অটল থাকে। তাই সে সাইপ্রাস থেকে মিশর অভিমুখে রওয়ানা হয় এবং ৬৪৭ হিজরীতে দামিয়েত্তা নগরীতে অবতরণ করে তা ধ্বংস করে নীলনদ পাড়ি দিয়ে মিশরে পৌঁছে যায়। কিন্তু মানসুরা নামক স্থানে মিশরীয় বাহিনী তাদের মুখোমুখি হয়। তাদের সঙ্গে মিশরের সুলতান সালেহ আইয়ূবী ছিলেন। তিনি যুদ্ধ শুরু হওয়ার তিনদিন পর 'মানসুরা' স্থানে মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর পর মিশরের রাজক্ষমতা তার স্ত্রী শাজারাতুদ দুর গ্রহণ করেন। তিনি স্বামীর মৃত্যুর সংবাদ গোপন রাখেন এবং তুর্কীর এক প্রদেশের আমীর তাওরান শাহ ইবনে মালিক সালেহ নাজমুদ্দীন আইয়ূবীকে চলে আসতে বলেন। শাজারাতুদ দুর ক্রুশেডবিরোধী প্রসিদ্ধ যুদ্ধ মানসুরায় ফারেস উদ্দীন আকতাই ও রুকন উদ্দীন বাইবার্সের সঙ্গে অংশগ্রহণ করেন। এ যুদ্ধে মুসলমানরা বিজয়লাভ করেন। অতঃপর তাওরান শাহ মিশর পৌঁছে রাজকর্মে মনোনিবেশ করেন। তিনি ফারেসকুর অঞ্চলে আরেকবার ক্রুশেডারদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করেন এবং ফ্রান্স সম্রাট লুইস যুদ্ধে বন্দী হয়। এটি ৬৪৮ হিজরীর ঘটনা। এরপর মিশরে বেশ কিছু যুদ্ধ সংঘটিত হয়। তাওরান শাহ নিহত হন। শাজারাতুদ দুর প্রকাশ্যে মিশরের ক্ষমতা হাতে তুলে নেন। কিন্তু মিশরের পরিবেশ-পরিস্থিতি নারী নেতৃত্ব মেনে নেয় না। তাই তিনি ইজ্জুদ্দীন আইবেকের বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হন। ইজ্জুদ্দীন ছিলেন মিশরের একজন সেনাপতি। তিনি সম্রাজ্ঞীর বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে মিশরের সম্রাটে পরিণত হন। ইজ্জুদ্দীন আইবেক ছিলেন দাস বংশের। তার মাধ্যমে আইয়ূবীদের পর মিশরে দাসবংশের ক্ষমতার সূচনা ঘটে। তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা সামনে আসবে ইনশাআল্লাহ।
দাস শক্তির উত্থান, খ্রিস্টানদের সপ্তম আক্রমণের ব্যর্থতা সম্পর্কে সামান্য আলোকপাত করাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছি। নিঃসন্দেহে পরাজয় খ্রিস্টানদের সুপ্তক্ষোভের তীব্রতা বাড়িয়ে দিয়েছে এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাতারীদের সহযোগিতা প্রদানের বিষয়টি আরও জোরালো করেছে।
এদিকে মঙ্গোলিয়ার অবস্থা স্থিতিশীল ছিল না। তাতারীরা সম্রাট কায়ুকের স্ত্রীর নেতৃত্ব মেনে নিতে পারছিল না। এ কারণেই ৬৪৯ হিজরীতে বালকুরালতাই নামক একটি জাতীয় কাউন্সিল সংঘটিত হয়। তারা নতুন সম্রাট নির্বাচনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এ পরিপ্রেক্ষিতে তারা মানকু খানকে তাতারীদের নতুন সম্রাট হিসেবে নির্বাচন করে।
মানকু খান তাতারী সাম্রাজ্যের সম্রাট নির্বাচিত হওয়ার পর তাতারী রাজনীতি ও পার্শ্ববর্তী দেশসমূহে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়। তাতারী সাম্রাজ্যের প্রধান স্থপতি চেঙ্গিজ খানের রাজনীতির সঙ্গে মানকু খানের রাজনীতির খুব মিল ছিল এবং ইউরোপ-বিজেতা উকিতাইর রাজনীতির সঙ্গেও যথেষ্ট সাদৃশ্য ছিল। মানকু খান প্রথমত নতুনভাবে আব্বাসী খেলাফত পতনের চিন্তা করে, এরপর অন্যান্য অঞ্চল।
অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, মানকু খান ক্ষমতা গ্রহণের সময় মুসলিম আমীর-ওমারাগণ সঠিক মতাদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন না। যদিও মুসলমানরা ৬৪৮ হিজরীতে মানসুরার যুদ্ধে জয় লাভ করে। তথাপি তারা নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত ছিল। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-কলহ তো আছেই, মুসলমানদের পরস্পর বহু রক্তক্ষয়ী যুদ্ধও সংঘটিত হতো।
এমনই এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ মিশরী ও সিরিয়ার সেনাবাহিনীর মাঝে সংঘটিত হয়েছিল। মিশরীয় বাহিনীর কমান্ডার ছিলেন ইজ্জুদ্দীন আইবেক। সিরিয়ার সেনাবাহিনীকে পাঠিয়েছিলেন আলেপ্পো ও দামেস্কের আমীর নাসের ইউসুফ। আব্বাসিয়া নামক স্থানে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এটি বর্তমানে মিশরীয় শহর জাগাজিগের থেকে আঠারো কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত। যুদ্ধে মিশরীয় বাহিনী জয়লাভ করে। আমি [লেখক] জানি না, এসব যুদ্ধে তারা কী স্বাদ খুঁজে পেত? অপর দিকে ক্রুশেড আক্রমণ অব্যাহত ছিল। আর তাতারী বাহিনী আব্বাসী খেলাফতের দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছিল।
বড় আশ্চর্যের বিষয় হলো, এ সময় সমাজের জ্ঞানী-গুণী, গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ—এমনকি উলামায়ে কেরামও একদম ভুলে গিয়েছিলেন যে, অর্ধেক মুসলিম জাতি তাতারী আক্রমণের শিকার হয়েছিল এবং তারা একথাও ভুলে গিয়েছিলেন যে, তাতারীরা আব্বাসী খেলাফত, হেজাজ, মিশর ও সিরিয়ার দুই ধনুক দূরে কিংবা আরও কাছে পৌঁছেছে। এই মধ্যবর্তী সময়ে ঐতিহাসিকগণ তাতারীদের কোনো বিষয় উল্লেখ করেননি।
উদাহরণস্বরূপ, পাঠকবৃন্দ এ সময়ের তাতারীদের আলোচনা ইবনে কাছীর রহ. রচিত আল বিদায়া ওয়ান নিহায়ায় অস্পষ্ট আকারে সম্রাট কায়ুকের বিদায় ও স্ত্রীর ক্ষমতায়ন (শিরোনামে) খুঁজে পাবেন।
ইবনে কাছীর রহ. এ সময়ের তাতারীদের ইতিহাস উল্লেখ না করার কারণ হলো, উৎসস্বল্পতা ও তথ্যস্বল্পতা। এ সময়ের ইতিহাস ইতিহাসের কোনো গ্রন্থেই পাওয়া যায়নি। ইরাক, সিরিয়া, মিশরবাসীও এ বিষয়ে খুব সামান্য আলোচনা করেছেন। এমনকি তাতারীদের অত্যাচার ও জুলুম নিষ্পেষিত মাজলুম মুসলমানদের থেকে এ বিষয়ে কোনো বর্ণনা পাওয়া যায়নি।
এমনকি আপনি দেখবেন, ৬৩৯ থেকে ৬৪৯ হিজরী পর্যন্ত ইরাক, সিরিয়া ও মিশরবাসীর জীবনযাপন উল্লেখ করতে গিয়ে ইবনে কাছীর তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপনের চিত্র তুলে ধরেন। যেমন: খলিফা অর্থনৈতিক সমস্যা সুরাহা করছেন, ফকীর-মিসকীনদের মাঝে দান সদকা-করছেন, বিপদাপদ দূর করছেন, বাজারমূল্য বৃদ্ধি পেলে খলিফা উপযুক্ত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন। কেউ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু করছে। কেউ সরাইখানা উদ্বোধন করছে। আবার কেউ চিকিৎসাকেন্দ্র খুলছে। এ সময়ের আরও কিছু ঘটনা — অমুক কবি, অমুক সাহিত্যিক, অমুক মান্যবর ব্যক্তি, অমুক মন্ত্রী ইন্তেকাল করেছেন ইত্যাদি।
কিন্তু কোথায় জ্ঞানীগুণী উলামায়ে কেরামের সুবিশাল জামাত, যারা মিম্বরে ও মতবিনিময় সভায় বসে জাতিকে তাতারী ফেতনা সম্পর্কে সচেতন করবেন? তাতারী অধ্যুষিত অঞ্চলসমূহে তাতারীদের বিপদাপদ ও নির্যাতনের কথা উল্লেখ করবেন?! সেদিন কোথায় ছিলেন প্রজ্ঞাবানরা, যারা অবশ্যম্ভাবী দিবসের জন্য জাতিকে প্রস্তুত করবেন? সত্যিকার অর্থে তৎকালে এসব বিষয় ছিল না বললেই চলে। এ কারণেই ইতিহাসের কিতাবাদিতে তা স্থান পায়নি।
মোটকথা, তৎকালীন ঘটনাবলি এ কথার প্রতি অকুণ্ঠ স্বীকৃতি প্রদান করে যে, তাতারীদের নতুন আক্রমণ শীঘ্রই সংঘটিত হবে। আর তা চেঙ্গিজ খানের যুগে সংঘটিত তাতারীদের প্রথম আক্রমণ ও উকিতাই-এর যুগে সংঘটিত তাতারীদের দ্বিতীয় আক্রমণের মতোই হবে কিংবা আরও ভয়াবহ দুর্বোধ্য। কারণ, মুসলমানরা যতই নতি স্বীকার করে, তাতারীদের স্পর্ধা ততবেশি বৃদ্ধি পায়। মুসলমানরা কোনো কিছু ছেড়ে দিলে তাতারীরা পার্শ্ববর্তী বস্তুটির দিকে হিংস্র থাবা সম্প্রসারিত করে। এটাই বাতেলপন্থীদের চরিত্র। পাঠকবৃন্দ সমীপে ইতিহাস পাঠের আবেদন রইল।