📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 সুলতান জালাল উদ্দীনের মৃত্যুর পর গুরমাজান কী করল

📄 সুলতান জালাল উদ্দীনের মৃত্যুর পর গুরমাজান কী করল


শুরমাজান পারস্যের উত্তরাঞ্চলকে (বর্তমান ইরানের উত্তরাঞ্চল) তাতারী সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে। এটি ৬২৯ হিজরীর ঘটনা। এরপর আযারবাইজান আক্রমণ করে সেটাও তাতারী সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে।
এর মাধ্যমে গোটা পারস্য ভূখণ্ড তাতারীদের অধ্যুষিত অঞ্চলে পরিণত হয়। তবে পশ্চিম পারস্যের এক সংকীর্ণ ভূখণ্ড শীয়াদের ইসমাঈলী গ্রুপের দখলে থেকে যায়।
এরপর শুরমাজান এসব অঞ্চলে স্থায়ী বসবাস শুরু করে। নিজ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা ও সৈন্যবাহিনী সুসংহতকরণ ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহ সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞানার্জনের পূর্বে তার মিশন শেষ হয় না। এসব বিষয় তাতারী নেতা শুরমাজানকে এসব অঞ্চলে আক্রমণ করতে সহযোগিতা করে।
৬২৯ থেকে ৬৩৪ হিজরী পর্যন্ত মোট পাঁচ বছর শুরমাজান এসব অঞ্চলে তাতারী রাজত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত রাখে। এই পাঁচ বছরের মাঝে একবারের জন্য মুসলমানদের ভয়ভীতি তাকে স্পর্শ করেনি। তার সঙ্গে লড়াই করার জন্য মুসলিম বাহিনী একটু নড়াচড়াও করেনি। অথচ চারপাশের অঞ্চলসমূহ ছিল মুসলমানদের দখলে। যেমন পারস্য, আযারবাইজান, ইরাক, মসুল, মিশর, হেজাজ ইত্যাদি। সবাই মনে করত, এটি পারস্য ও আযারবাইজানের জন্য দুঃশ্চিন্তার কারণ। আপামর মুসলমানদের বিপদ নয়। সেসব মুসলমানদের ওপর তখনো তাতারী হামলার নির্মম দুর্যোগ নেমে আসেনি, তারা বোঝেনি যে, খানিক বাদে তারাও তাতারীদের শিকারে পরিণত হবে। বিপদ আজ বা কাল, অবশ্যই তাদের পাকড়াও করবে।
এখানে আমি আরেকটু সংযোজন করি—ইরাক, সিরিয়া, মিশর, হেজাজের অধিকাংশ মুসলমান হলো আরবীয়। পক্ষান্তরে পারস্য, আযারবাইজান ও খাওয়ারেযম সাম্রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলের আরবরা হলো অনারবীয়। তাদের মাঝে ইসলামের সঠিক বুঝ অবিদ্যমান। এ কারণেই আরবীয় ও অনারবীয়দের মাঝে বিস্তর ব্যবধান পরিলক্ষিত হয়। পরস্পর যেন তারা অপরিচিত। অথচ ইসলামের শিক্ষা, মুসলমানরা পরস্পর ভাই ভাই (শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ন্যায়)।

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 মুমিনগণ একে অপরের ভাই!

📄 মুমিনগণ একে অপরের ভাই!


অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, আরবীয় মুসলিমরা তুর্কী, আফগানী, শিশানী, হিন্দুস্তানী কিংবা পারসীয় মুসলিম ভাইদের ব্যথায় ব্যথিত হয় না। এটি অত্যন্ত দুঃখের বিষয়। এটি মুসলিম উম্মাহর মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার মতো মারাত্মক দুর্যোগ। কারণ, ইসলাম এমন এক দ্বীন (ধর্ম), যা বংশ, জাতি কিংবা বর্ণের মাধ্যমে গঠিত হয় না। ইসলাম গঠন হয় একমাত্র আল্লাহ, রাসূল ও এই দ্বীনের প্রতি অগাধ বিশ্বাসস্থাপনের মাধ্যমে। এটি হলো আকীদা-বিশ্বাসের বন্ধন।
ইমাম আহমদ রহ. আবু নাজরা রহ.-এর সূত্রে মুরসাল রেওয়ায়েতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—
يَا أَيُّهَا النَّاسُ، أَلَا إِنَّ رَبَّكُمْ وَاحِدٌ، وَإِنَّ أَبَاكُمْ وَاحِدٌ، أَلَا لَا فَضْلَ لِعَرَبِيٌّ عَلَى عَجَمِيَّ ، وَلَا لِعَجَمِيَّ عَلَى عَرَبِيَّ، وَلَا أَحْمَرَ عَلَى أَسْوَدَ، وَلَا أَسْوَدَ عَلَى أَحْمَرَ، إِلَّا بِالتَّقْوَى
“হে লোকসকল, তোমাদের রব এক, তোমাদের পিতা এক। জেনে রাখো, তাকওয়া (খোদাভীতি) ব্যতীত (একে অপরের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব নেই) অনারবীয়দের ওপর আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই। আরবীয়দের ওপর অনারবীরা শ্রেষ্ঠত্ব নেই। শ্বেতাঙ্গদের ওপর কৃষ্ণাঙ্গদের কিংবা কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর শ্বেতাঙ্গদের শ্রেষ্ঠত্ব নেই।”৩৭
হাদীস শরীফে শ্রেষ্ঠত্বের নীতিমালা সুস্পষ্ট বিবৃত হয়েছে। ইসলামে বংশ কিংবা বর্ণের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। শ্রেষ্ঠত্ব নিরূপিত হয় তাকওয়া ও খোদাভীতির মাধ্যমে।
এমনকি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলমানদের প্রধান দুটি দলে বিভক্ত করেছেন। তৃতীয় কোনো দলে বিভক্ত করেননি। তাঁর এই বিভক্তকরণ ছিল তাকওয়ার ভিত্তিতে। হাদীস শরীফে এসেছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَذْهَبَ عَنْكُمْ عُبِيَّةَ الْجَاهِلِيَّةِ وَتَكَبُّرَهَا بِآبَائِهَا، النَّاسُ رَجُلَانِ بَرُّ تَقِيُّ كَرِيمٌ عَلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ وَفَاجِرُ شَقِيٌّ هَيِّنٌ عَلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ ثُمَّ تَلَا: {يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُمْ مِنْ ذَكَرٍ وَأُنْثَى}
“হে লোকসকল, আল্লাহ তা'আলা তোমাদের জাহেলী যুগের অহংকার ও গর্ব দূর করেছেন। মানুষ দুই দলে বিভক্ত: ১. মুমিন মুত্তাকী, আল্লাহর নিকট সম্মানী। ২. পাপিষ্ঠ হতভাগা, আল্লাহর কাছে হীন। এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তেলাওয়াত করেন, (অর্থ) হে মানুষ, আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে।"৩৮
সুতরাং সত্যনিষ্ঠ মুমিন হলো সেই ব্যক্তি, যে আকীদা-বিশ্বাসে এক ও অভিন্ন ব্যক্তিদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়। যদিও জাত ও বংশ কিংবা বর্ণ ও ভাষা ভিন্ন হয়।
সুতরাং ইসলামের গ্রহণযোগ্যতার একমাত্র মানদণ্ড হলো আকীদা-বিশ্বাস ও তাকওয়া-পরহেজগারি।

টিকাঃ
৩৭ মুসনাদে আহমদ: ২৩৪৮৬।
৩৮ আবু দাউদ, তিরমিযী, আহমদ, ইবনে খুযায়মা, ইবনে হিব্বান, তাফসীরে ইবনে মারদুয়া।

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 ৬৩৪ হিজরী থেকে ৬৩৯ হিজরী পর্যন্ত তাতারী আক্রমণ

📄 ৬৩৪ হিজরী থেকে ৬৩৯ হিজরী পর্যন্ত তাতারী আক্রমণ


৬২৯ থেকে ৬৩৪ হিজরী পর্যন্ত মোট পাঁচ বছর পর শুরমাজান ৬৩৪ হিজরীতে কাযবিন সমুদ্র অভিমুখে বিজয়ধারা অব্যাহত রাখতে রওনা হয়। সে খুব দ্রুতই আর্মেনিয়া জুজিয়া, শিশান ও দাগিস্তান অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করে।
অপরদিকে ভিন্ন আরেকটি তাতারীদল বাতু ইবনে জাজীর নেতৃত্বে কাযবিন সমুদ্রের উত্তরে আক্রমণ শুরু করে এবং ভোগলা নদীর নিম্নবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত গোত্রসমূহকে নির্মূল করতে শুরু করে। এটি ৬৩৪ হিজরীরই ঘটনা। এরপর ৬৩৫ হিজরীতে রাশিয়ার বিস্তৃত ভূখণ্ডের ওপর আক্রমণ শুরু করে।
এরপর বর্বর তাতারীরা খ্রিস্টান সাম্রাজ্য রাশিয়া পতনের ডাক দেয়। রাশিয়ায় কতেক শহরকে মানুষ হত্যার কসাইখানায় পরিণত করে। এটি ৬৩৫-৬৩৬ হিজরীর ঘটনা। অল্প কিছুদিনের মাঝে রিদান ও কলম্বিয়া শহর দখল করে নেয়। এরপর ছয় দিনের মাথায় তাদের হাতে ব্লাদিমির (Vladimir) শহরের পতন ঘটে। কসাইখানায় যেমন গরু একটার পর একটা জবাই করা হয়, অনরূপ তাতারীদের হাতে একের পর এক শহরের পতন হতে থাকে। এরপর সুদান পতিত হয়। এ পর্যায়ে তারা রাশিয়ার রাজধানী মস্কো নগরীর দিকে হাত বাড়ায়। মস্কোকেও তারা তাতারী আক্রমণের কালো মানচিত্রে পরিণত করে। এরপর ক্রমান্বয়ে ইউরোপ, জালিশ, বারিসলাফ, রুস্তুফ, ইয়ারুসলাফ, তোরঝোক শহর ধ্বংসের মাধ্যমে তাতারীরা গোটা রাশিয়া দখল করে নেয়। (রাশিয়ার আয়তন হলো সতেরো মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটার। এই সুবিশাল আয়তনের দেশটির জনসংখ্যাও ছিল বিপুল। অথচ তাতারীরা মাত্র দুই বছরে দেশটিকে দখল করে নেয়!)
৬৩৮ হিজরীতে বাতু ইবনে জাজীর নেতৃত্বে পশ্চিমে গোটা উকরানি (Ukraine) সাম্রাজ্যের ওপর কালো থাবা বিস্তৃত করে। উকরানির আয়তন ছিল ছয় লক্ষ বর্গ কিলোমিটার। তারা উকরানির রাজধানী কাইভে আক্রমণ করে অধিকাংশ জনগণকে হত্যা করে শহরটিকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে।
৬৩৯ হিজরীতে তাতারী বাহিনী একটি শক্তিশালী দল বাইদারের নেতৃত্বে ইউক্রেন পোল্যান্ড রাজত্বের দিকে অগ্রসর হয়। পোল্যান্ড শহরে প্রবেশ করে অধিকাংশ জনপদ ধ্বংস করে ফেলে। কিন্তু পোলিশ রাজা অল্পসংখ্যক জার্মানি সৈন্যের সহযোগিতা পায়। (জার্মানি পোলিশের পশ্চিমে অবস্থিত)। প্রিন্স হেনরি ডিউক (Silesian) পোল্যান্ডের রাজার সঙ্গে একক সেনাবাহিনী গঠনের জন্য জোট বাঁধেন। কিন্তু এই সামরিক বাহিনী বাইদারের নেতৃত্বপূর্ণ তাতারী বাহিনীর হাতে নির্মম পরাজয় বরণ করে। এভাবেই পোল্যান্ড শহর তাতারী বাহিনীর হাতে পরাজিত হয়।
এরই মধ্যে ৬৩৯ হিজরীতে তাতারীদের ইউক্রেনের কমান্ডার বাতু এ অঞ্চলে একদল সৈন্য রেখে প্রধান দলটি নিয়ে হাঙ্গরের রাজার সঙ্গে দেখা করে। মুখোমুখি যুদ্ধে হাঙ্গরের রাজা পরাজিত হয়। এ যুদ্ধের মাধ্যমে হাঙ্গরও তাতারীদের চারণভূমিতে পরিণত হয়।
এদিকে পোল্যান্ড থেকে বাইদার বাতুর নেতৃত্বে প্রধান তাতারীদলের সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে বের হয়। পথিমধ্যে স্লোভাকিয়া আক্রমণ করে তাতারী সাম্রাজ্যকে আরও সম্প্রসারিত করে।
এরপর তাতারী বাহিনী ক্রোয়েশিয়া আক্রমণ করে তা ছিন্ন ভিন্ন করে দেয়। এভাবেই তাতারী বাহিনী আদ্রিয়াটিক সাগরউপকূলে পৌঁছে যায় (আদ্রিয়াটিক সাগর ইটালি ও ক্রোয়েশিয়ার মাঝামাঝি অবস্থিত)। এভাবে তাতারীরা ইউরোপের প্রায় অর্ধেকাংশ তাদের রাজত্বের অন্তর্ভুক্ত করে।
ইউরোপে অব্যাহত তাতারী বিজয় সম্ভব ছিল যদি তাদের মহান নেতা উকিতাই এ বছর (৬৩৯ হিজরী) মারা না যেত। ইতিমধ্যে তাতারী সাম্রাজ্য জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও ইটালি পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। ফলে তাতারী নেতা বাতু ইবনে জাজী যুদ্ধ বন্ধ করতে বাধ্য হয়। সে জনৈক তাতারী কমান্ডারকে বিজিত অঞ্চলসমূহের দায়িত্ব প্রদানকরত তাতারীদের নতুন প্রিন্স নির্ধারণী নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য মঙ্গোলিয়ায় তাতারীদের রাজধানী কারাকুরমে ফিরে যায়।

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 পরিস্থিতি বিশ্লেষণ (৬৩৯ হিজরী ও পরবর্তী সময়)

📄 পরিস্থিতি বিশ্লেষণ (৬৩৯ হিজরী ও পরবর্তী সময়)


এক. এ বছর তাতারী সাম্রাজ্যের সীমানা পূর্ব-পশ্চিমে ইউরোপ থেকে পশ্চিমে পোল্যান্ড, উত্তরে সাইবেরিয়া থেকে দক্ষিণে চীন সাগর পর্যন্ত পৌঁছেছে। এটিকে অতি স্বল্প সময়ে ভয়াবহ প্রসার বলা যেতে পারে। তখন তাতারী শক্তি পৃথিবীর প্রধান পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল, এতে কোনো দ্বিমত নেই।
দুই. তাতারী সম্রাট উকিতাইয়ের পর তার ছেলে কায়ুক ইবনে উকিতাই তাতারীদের নেতৃত্ব গ্রহণ করে। নতুন সম্রাট কায়ুক ইবনে উকিতাইয়ের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, নতুন এলাকা বিজয় করার চেয়ে বিজিত অঞ্চলসমূহে ক্ষমতা সুপ্রতিষ্ঠিত করা। অন্যথায় ক্ষমতা বিলুপ্তির আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে নতুন সম্রাটের আমলে তাতারীদের বিজয়ধারা বাধাগ্রস্ত হয়। তবে বিজিত অঞ্চলসমূহে ক্ষমতা সুপ্রতিষ্ঠিত করতে তারা সচেষ্ট থাকে।
তিন. তাতারীরা পূর্ববর্তী বিজয়ের মাধ্যমে মুসলিমবিশ্বের অর্ধেক পূর্বাচল গিলে ফেলেছিল। এশিয়ার অধিকাংশ মুসলিম অঞ্চলগুলোকে তারা তাতারী সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেছিল। এসব অঞ্চলের সকল সভ্যতা-সংস্কৃতি তারা ধ্বংস করে ফেলেছিল। পরবর্তী বহু বছরের জন্য তাতারীরা এই সুবিশাল বিস্তৃত অঞ্চলের সভ্যতা, সংস্কৃতি, উন্নতিও অগ্রগতির সোপান ভেঙে দেয়।
চার. ইতিমধ্যে তাতারীরা মুসলিমবিশ্বের মধ্যভূখণ্ডকে খণ্ড-বিখণ্ড করে ফেলে, যা ইরাক থেকে মিশর পর্যন্ত বিস্তৃত। ফলে এ অঞ্চলের মুসলমানরা পরস্পর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-কলহে লিপ্ত হয়ে পড়ে। তাদের পরস্পর সম্পর্কহীনতা ও বিরোধ বিকট আকার ধারণ করে। অনুরূপ লিবিয়া, তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া, মরক্কো ও ওয়েস্ট আফ্রিকা তথা মুসলিমবিশ্বের পশ্চিম ভূখণ্ড মুওয়াহিদ্বীন সাম্রাজ্য পতনের পর খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যায়।
পাঁচ. মুসলমানদের পূর্বেই ইউরোপীয় খ্রিস্টানরা তাতারী হামলার স্বাদ আস্বাদন করেছে। হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ ইউরোপবাসীকে জবাই করা হয়, গির্জা ধ্বংস করা হয়, বহু শহর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। বস্তুত এটি ছিল রোমান খ্রিস্টান ক্যাথলিকদের অভ্যন্তরে প্রবেশের পূর্ব সতর্কবাণী।
ছয়. খ্রিস্টানরা তাতারীদের নির্মম ধ্বংসযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করা সত্ত্বেও পশ্চিম ইউরোপ (ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, ইটালি ও জার্মানি)-এর খ্রিস্টানরা মনে করত, তাতারী আক্রমণ একটি সাময়িক বিষয়। তা যেকোনো মুহূর্তে বন্ধ হবে। কিন্তু মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাদের যুদ্ধ অবিরাম চলবে, তা কখনো থামবে না। আর এ কারণেই খ্রিস্টান সম্রাটরা নিজেদের লক্ষ লক্ষ মানুষ তাতারীদের হাতে নিহত হওয়ার পরও মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাতারীদের পূর্ণ সহযোগিতা প্রদান করতে প্রস্তুত থাকত।
আচ্ছা, কেন ক্রুশেড (খ্রিস্টান) সম্রাটরা এ ধারণা পোষণ করত যে, মুসলমানদের যুদ্ধ চিরস্থায়ী। আর তাতারীদের যুদ্ধ সাময়িক? কারণ, মুসলমানদের সঙ্গে খ্রিস্টান সম্রাটদের যুদ্ধ হলো আকীদা-বিশ্বাসের যুদ্ধ। মুসলমান-খ্রিস্টানদের যুদ্ধ হলো দ্বীন-ধর্মের যুদ্ধ। মুসলিম-খ্রিস্টানদের যুদ্ধ হলো চিরন্তন যুদ্ধ। যতদিন পর্যন্ত মুসলমান ও খ্রিস্টানরা একই ধর্মালম্বী না হবে ততদিন পর্যন্ত মুসলমান ও খ্রিস্টানদের যুদ্ধ থামবে না। যেমন মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীন কুরআনে কারীমে বলেন-
وَلَنْ تَرْضَى عَنْكَ الْيَهُودُ وَلَا النَّصَارَى حَتَّى تَتَّبِعَ مِلَّتَهُمْ
"ইহুদী ও নাসারা তোমার প্রতি কিছুতেই খুশি হবে না যতক্ষণ না তুমি তাদের ধর্মের অনুসরণ করবে।”৩৯
পক্ষান্তরে খ্রিস্টানদের সঙ্গে তাতারীদের আকীদাগত কোনো যুদ্ধ ছিল না। তাতারীদের আকীদা ছিল বিকৃত, বিভিন্ন ধর্মের সমন্বয়ে সৃষ্টি। একজন তাতারী নেতাও সভ্য দেশগুলোতে তাদের আকীদা-বিশ্বাস প্রচারে সক্ষম ছিল না। তাতারীদের মূল লক্ষ্য ছিল জ্বালাও-পোড়াও ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানো, শিশু নারীদের বন্দীকরণ ও ধন-সম্পদ পুঞ্জীভূত করা। এসব যাদের গুণ ও বৈশিষ্ট্য হয় তাদের পক্ষ থেকে কোনো কিছুর ধারাবাহিকতা আশা করা যায় না।
এ কারণেই ইউরোপীয় খ্রিস্টানরা তাতারীদের পক্ষ থেকে নানান রকম কষ্ট-যন্ত্রণা পেয়েও তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি না নিয়ে মিশর, সিরিয়া তথা মুসলিম সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করে। তৎকালীন নাজুক মুহূর্তে খ্রিস্টানরা মুসলিম উম্মাহকে নির্মূল করার জন্য তাতারী সম্রাটের পক্ষ থেকে সহযোগিতা লাভের ব্যাপারে নিরাশ হয় ন।
সাত. ইউরোপ আক্রমণের পর তাতারী বাহিনীর আকীদা-বিশ্বাসে পরিবর্তন সাধিত হয়। বহুসংখ্যক মোঘল নেতা খ্রিস্টান মেয়েদের বিয়ে করে। এতে মোঘল ও খ্রিস্টধর্মের সংমিশ্রণ ঘটে। তাতার ও খ্রিস্টানদের পরস্পর সহযোগিতার এটি একটি অন্যতম কারণ।
আট. বহুদিন পূর্ব থেকে ইউরোপীয় খ্রিস্টান ও মিশর-সিরিয়ার মুসলমানদের পরস্পর যুদ্ধ চলছিল। তৎকালীন মিশর ও সিরিয়ায় আইয়ূবীদের শাসন চলত। কিন্তু সে সময়টি ছিল আইয়ূবীদের শেষ সময়। আইয়ূবীদের পরস্পর যুদ্ধ-বিগ্রহ চলছিল। মাঝে মুসলমানগণ উভয় সংকটে দিনাতিপাত করছিল। একদিকে তাতারী হামলা, অন্যপাশে ক্রুশেড (খ্রিস্টান) হামলা।
নয়. ৬৪০ হিজরীতে আব্বাসী খলিফা মুনতাসির বিল্লাহ মৃত্যুবরণ করেন। তারপর তার ছেলে মুস্তাসিম বিল্লাহ খলিফা মনোনিত হন। তখন তার বয়স ছিল ত্রিশ বছর। যদিও অধিক কুরআন তেলাওয়াত, ফিকাহ ও তাফসীরশাস্ত্রে গভীর জ্ঞান ও অধিক পুণ্যকাজে তার সুখ্যাতি রয়েছে; কিন্তু তিনি রাজনীতির 'র'ও বুঝতেন না। 'মানবজ্ঞান' বলতে তার কোনো জ্ঞান ছিল না। (তিনি মানুষ চিনতেন না।) ফলে তিনি অসৎ বন্ধু গ্রহণ করেন এবং পূর্বের তুলনায় খেলাফত আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। শীঘ্রই এর বিস্তারিত বিবরণ আসবে ইনশাআল্লাহ! তিনি সর্বশেষ আব্বাসী খলিফা। এরপর তার শাসনামলেই বাগদাদের পতন ঘটে।
দশ. তাতার ও ইরাকের আব্বাসী খেলাফতের মাঝে শুধু পারস্যের (বর্তমান ইরানের) পশ্চিমে অবস্থিত একটি সংকীর্ণ অঞ্চলের ব্যবধান ছিল। আয়তনের দিক থেকে খুব ছোট হলেও ভৌগলিক দিক থেকে অঞ্চলটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এ অঞ্চলে বাস করত ইসমাঈলী শিয়াদের একটি গ্রুপ। তারা ছিল যুদ্ধপ্রিয়। তাদের বহু মজবুত দুর্গ ও ঘাঁটি ছিল। আব্বাসী খেলাফতের সঙ্গে সর্বদা তাদের বিরোধ লেগেই থাকত। তারা সুন্নী মাযহাবকে প্রচণ্ড ঘৃণা করত। তারা ইসলামের শত্রুদের প্রচুর সহযোগিতা করত। তারা একবার তাতারদের অনুগামী হতো, আরেকবার খ্রিস্টানদের অনুগামী হতো। তাতারীরা তাদের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত ছিল না। ভূপৃষ্ঠে কোথাও কোনো শক্তিশালী দল টিকে থাকুক, তাতারীরা তা কখনোই চাইত না।
মোটকথা, নতুন তাতারী সম্রাট কায়ুক ইবনে উকিতাই সুবিশাল রাজত্ব লাভ করে, যাকে তৎকালীন বিশ্বের পরাশক্তি মনে করা হতো। আর খ্রিস্টানরা তাতারীদের অনিরাময় ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করেও মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাদের সহযোগিতা কামনা করে। অপর দিকে মুসলমানগণ ছিলেন চিরন্তন বিরোধে লিপ্ত। উভয় সংকট তাদের ঘিরে রেখেছিল; একপাশে তাতারী আক্রমণ, অন্য পাশে ক্রুশেড আক্রমণ। ছোট-বড় নির্বিশেষে কোনো মুসলিম নেতার তখন দেশ স্বাধীন করা কিংবা জুলুম থেকে আল্লাহর বান্দাদের মুক্তি দেওয়ার কোনো চিন্তা ছিল না। তখন তাদের চাওয়া-পাওয়া বলতে ছিল নিজ বসবাস-ভূমিতে নিজের ক্ষমতা সুরক্ষিত রাখা। নিজ ক্ষমতাশীল এলাকা চাই ছোট হোক বা দুর্বল হোক। লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।

টিকাঃ
৩৯ সুরা বাকারা: ১২০।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00