📄 দ্বিতীয় কারণ
৬২৮ হিজরীতে মুসলিম উম্মাহর মাঝে বিভেদ-বিভাজন বিরাজমান ছিল। প্রত্যেক মুসলিম নেতা নিজ নিজ রাজসীমা নিয়ে ব্যস্ত ছিল। রাজ্য যত ছোটই হোক না কেন? এমনকি কোনো কোনো রাজ্য মাত্র একটি শহরের ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল। মুসলিম নেতারা কেবল বিভেদ-বিভাজনে লিপ্ত ছিল এমন নয়, বরং পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত ছিল, একে অপরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করত। কেউ কাউকে শর্তহীন নিরাপত্তা প্রদান করত না। তাদের মাঝে ঐক্য ও একতার কোনো চিন্তাই ছিল না।
📄 তৃতীয় কারণ
এই বছরটি সুলতান জালাল উদ্দীন ইবনে খাওয়ারেযম শাহের জন্য ছিল চরম বেদনাদায়ক ও হৃদয়বিদারক।
কারণ, যখন সেনাপতি শুরমাজানের নেতৃত্বে তাতারী বাহিনী মুসলিম সাম্রাজ্য আক্রমণের জন্য অগ্রসর হয়, তখন তারা জানতে পারে যে, সুলতান জালাল উদ্দীন এ বছর পরপর দুবার উত্তর ইরাক ও দক্ষিণ তুরস্কের নেতা আশরাফ ইবনে আদেলের সঙ্গে যুদ্ধে পরাজয়বরণ করার কারণে যারপরনাই দুর্বল হয়ে পড়েছে।
আশরাফ ইবনে আদেল চিঠি মারফত সুলতান জালাল উদ্দীনের দুর্বলতার কথা তাতারীদের জানিয়ে দেয়। আশরাফ ইবনে আদেলের সঙ্গে জালাল উদ্দীনের বিরোধ ছিল দীর্ঘদিনের। তাদের মাঝে বহু যুদ্ধ সংঘটিত হয়। তাই সে তাতারীদের আক্রমণকে প্রতিশোধ গ্রহণে উপযুক্ত সুযোগ মনে করে তাতারীদের তার দুর্বলতার কথা জানিয়ে দেয়।
বিপুলসংখ্যক তাতারী আগমন করে। রাস্তার দু-ধারের ঘর-বাড়ি গাছ-পালা সবকিছু ধ্বংস করে দেয়। কাঁচাপাকা সব ধরনের ফল-ফলাদি ও খাদ্যদ্রব্য খেয়ে ফেলে। তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল জালাল উদ্দীন ইবনে খাওয়ারেযম শাহকে গ্রেপ্তার করা। এক রণভূমিতে জালাল উদ্দীনের সঙ্গে তাদের দেখা হয়। যুদ্ধে সুলতান জালাল উদ্দীন নিকৃষ্ট পরাজয়বরণ করেন। সৈন্যবাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। সুলতান জালাল উদ্দীন পালাবার পথ ধরেন। তার বাবার শেষ পরিণতির পথে তিনিও অগ্রসর হন। গ্রাম থেকে গ্রাম, শহর থেকে শহর পালাতে থাকেন। তাতারী বাহিনী পিছু ধাওয়া করতে থাকে। আর পথিমধ্যে যাদের পায় হত্যা করে। বন্দী করে ও মালামাল ছিনতাই করে। একপর্যায়ে জালাল উদ্দীন উত্তর ইরাকে অবস্থিত উপত্যকায় পৌঁছেন। সেখানে তার সকল সৈন্য তার থেকে পৃথক হয়ে যায়। তিনি একাকী অসহায় সহযোগীহীন পড়ে থাকেন। ঠিক যেমন ঘটেছিল তার বাবার বেলায়। তাতারীদের ভয়ে গ্রামের পর গ্রাম একাই পালাতে থাকেন। এরপর দীর্ঘদিন পর্যন্ত তিনি গুম হয়ে ছিলেন। কেউ জানত যে, তিনি নিহত হয়েছেন, আত্মগোপন করেছেন, নাকি এক দেশ থেকে অন্য দেশে পলায়ন করেছেন? একসময় জনৈক গ্রাম্য কুর্দী কৃষকের সঙ্গে তার দেখা হয়। কৃষক তাকে জিজ্ঞাসা করে, কে আপনি? কৃষক তার গায়ে পরিহিত দামি পোশাক ও স্বর্ণালঙ্কার দেখে অবাক হন। সুলতান জালাল উদ্দীন তাকে বলেন, আমি খাওয়ারেযমের সুলতান। তিনি কৃষকের অন্তরে ভয় সৃষ্টির জন্য একথা বলেন। কিন্তু সুবহানাল্লাহ! তার এই বক্তব্য যেন আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত বিষয়ে ঘোষণা ছিল। এর পূর্বে কৃষকের অন্তরে খাওয়ারেযমদের প্রতি ঘৃণা ও ক্ষোভ দানা বেঁধেছিল। কৃষক সুলতানের পরিচয় পেয়ে সংবর্ধনা জানাল। সম্মান প্রদর্শন করল এবং আদর আপ্যায়ন করল। আহার গ্রহণ শেষে সুলতান নিশ্চিন্ত মনে ঘুমিয়ে পড়েন। এই সুযোগে কৃষক কুঠারাঘাতে সুলতানকে হত্যা করে এবং তার সঙ্গে থাকা স্বর্ণালঙ্কার ও দামি আসবাবপত্র এই অঞ্চলের আমীর গাজী শিহাব উদ্দীনকে অর্পণ করে।
এই হলো জালেমদের শেষ পরিণতি! সীমালঙ্ঘনকারীদের শেষ ফল! এই হলো সেইসব রাজা-বাদশার নিকৃষ্ট পরিণতি, যারা প্রজাদের শাসন করেন, কিন্তু আল্লাহর হক, প্রজাদের হক; এমনকি আত্মীয়তার হক আদায় করেন না। কেবল নিজেদের নিয়ে ভোগ-বিলাসে মত্ত থাকেন। জনৈক ব্যক্তি যথার্থ বলেছেন-
“যে ব্যক্তি কেবল নিজেকে নিয়ে বেঁচে থাকে, তার জন্ম নেওয়ার কোনো অধিকার ছিল না।”
ইমাম বুখারী ও মুসলিম রহ. হযরত আবূ মূসা আশ'আরী রা.-এর সূত্রে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
إِنَّ اللَّهَ لَيُمْلِي لِلظَّالِمِ حَتَّى إِذَا أَخَذَهُ لَمْ يُفْلِتْهُ قَالَ: ثُمَّ قَرَأَ : وَكَذَلِكَ أَخْذُ رَبِّكَ إِذَا أَخَذَ القُرَى وَهِيَ ظَالِمَةٌ إِنَّ أَخْذَهُ أَلِيمٌ شَدِيدٌ.
"আল্লাহ তা'আলা জালেমকে সুযোগ দেন। আর যখন ধরেন, তখন কোনোক্রমেই ছাড়েন না। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তেলাওয়াত করেন, (অর্থ) যে সকল জনপদ জুলুমে লিপ্ত হয়, তোমার প্রতিপালক যখন তাদের ধরেন, তখন তাঁর ধরা এমনই হয়ে থাকে। বাস্তবেই তার ধরা অতি মর্মন্তুদ, অতি কঠিন।"৩৬
টিকাঃ
৩৬ বুখারী: ৪৬৮৬, সুরা হৃদ: ১০২।
📄 চতুর্থ কারণ
পূর্ববর্তী কৃতকর্মের ফলাফল অনুপযুক্ত প্রতিপালন, ইসলামের সঠিক বুঝের অভাব, সর্বাত্মকভাবে দুনিয়াকে আঁকড়ে ধরা এবং মানুষের সম্মুখে সঠিক বিষয়বস্তু বর্ণনা না করা। ফলে তারা জানত না কে বন্ধু কে শত্রু? তাতারীদের পূর্বেকার যুদ্ধ-বিগ্রহের ফলাফল, তাতারীরা যেসব জনপদ ও গ্রাম অতিক্রম করেছে, সেসব অঞ্চলের কালো ইতিহাস—এসব বিষয় মুসলমানদের অন্তরে পরাজয়ের শিকল পরিধান করিয়েছিল। ফলে তারা তলোয়ার বহন করতে পারেনি, ঘোড়ার পিঠে আরোহণ করতে পারেনি— এমনকি তাদের মাথা থেকে তাতারীদের মুখোমুখি দাঁড়াবার চিন্তাই দূর হয়ে গিয়েছিল। নিঃসন্দেহে এসব বিষয় তাতারীদের পথ বাধাহীন উন্মুক্ত করেছিল।
ইবনুল আছীর রহ. কামেল ফিত তারীখ গ্রন্থে ৬২৮ হিজরীর ঘটনাবলি বর্ণনা করতে গিয়ে এমন কিছু চিত্র ফুটিয়ে তোলেন, যা তিনি তাতারী হামলা থেকে রক্ষাপ্রাপ্ত কতিপয় ব্যক্তিবর্গের কাছ থেকে নিজ কানে শুনেছেন। তিনি বলেন—
* এক একজন তাতারী সৈন্য এক এক গ্রামে প্রবেশ করত। এরপর এক এক করে গ্রামবাসী সবাইকে হত্যা করত। অথচ গ্রামবাসীর সংখ্যা অনেক হওয়া সত্ত্বেও একজনও প্রতিরক্ষা কিংবা আত্মরক্ষার জন্য হাত তুলত না।
* জনৈক তাতারী একজন মুসলমানকে ধরল। তার সঙ্গে হত্যা করার মতো কোনো অস্ত্র ছিল না। সে মুসলমান ব্যক্তিকে বলল, মাথা জমিনে ঠেকিয়ে রাখো। কোথাও যাবে না। মুসলমান ব্যক্তিটি জমিনে মাথা ঠেকিয়ে রাখল। এরপর তাতারীসেনাটি তলোয়ার ব্যবস্থা করে এনে তাকে হত্যা করল।
* এক ব্যক্তি ইবনুল আছীর রহ.কে বর্ণনা করে বলেন, আমি ও আমার সঙ্গে সতেরোজন রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলাম। একজন তাতারী সেনা এল। আমাদের নির্দেশ দিল, যেন আমরা পরস্পর নিজেদের বন্দী করি। আমার সাথীরা তার হুকুম মতো কাজ শুরু করল। আমি তাদের বললাম, সে তো একা। আমরা কেন তাকে হত্যা করব না? তারা বলল, আমরা ভয় পাই। (তাতারীত্রাস!) আমি বললাম, সে তোমাদের হত্যা করতে চায়। চলো উল্টো আমরাই তাকে হত্যা করি। নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের রক্ষা করবেন। আল্লাহর শপথ কেউ এ কাজ করার দুঃসাহস দেখায়নি। ফলে বাধ্য হয়ে আমিই তলোয়ার হাতে নিয়ে তাকে হত্যা করলাম। এরপর সে অঞ্চল ছেড়ে পলায়ন করলাম এবং রক্ষা পেলাম। এ-জাতীয় বহু ঘটনা রয়েছে।
* তাতারী বাহিনী বর্তমান তুরস্কের দক্ষিণে অবস্থিত 'বাদলিস' শহরে প্রবেশ করল। এটি একটি সুরক্ষিত শহর। পাহাড়ের একটি সংকীর্ণ গিরিপথ ছাড়া শহরে প্রবেশ করার কোনো রাস্তা নেই। একজন শহরবাসীর বক্তব্য, আমাদের পাঁচশো সৈন্য থাকলে একজন তাতারীও রক্ষা পেত না। কারণ, পথ ছিল সংকীর্ণ। আর একথা বাস্তব যে, সংখ্যালঘুরা সংখ্যাগরিষ্ঠদের পরাজিত করতে পারে। কিন্তু সুবহানাল্লাহ! শহরবাসী তাতারীদের হাতে শহর ছেড়ে দিয়ে পাহাড়ের দিকে পলায়ন করে। এরপর তাতারীরা বাদলিস শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে।
* তাতারীদের হাতে নিহত হওয়ার পূর্বে প্রত্যেক মুসলমান আল্লাহর ওয়াস্তে নিজের জান ভিক্ষা চেয়ে বলত, আমাকে হত্যা করো না। তাতারীরা মুসলমানদের এই আত্মরক্ষামূলক বাণী 'আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে হত্যা করো না' শুনতে শুনতে তারা এই বাক্যটিকে গানের সুরে গাইত 'লা বিল্লাহ'। জনৈক মুসলমান একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে লুকিয়ে ছিল। তাতারীরা টের পায়নি। তার বক্তব্য, আমি জানালার ফাঁক দিয়ে তাতারীদের দেখছিলাম। তারা নারী-পুরুষদের হত্যা করার পর বীরবেশে ঘোড়ার পিঠে আরোহণ করে হাসতে হাসতে গান গাইছিল—লা বিল্লাহি, লা বিল্লাহি। ইবনুল আছীর রহ.-এর বক্তব্য অনুযায়ী এটি ছিল মহাবিপর্যয় ও তীব্র সংকট। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
এই ছিল তৎকালীন মুসলমানদের অধঃপতন, তিক্ত পরাজয়... বর্বর তাতারীদের আক্রমণ।
📄 সুলতান জালাল উদ্দীনের মৃত্যুর পর গুরমাজান কী করল
শুরমাজান পারস্যের উত্তরাঞ্চলকে (বর্তমান ইরানের উত্তরাঞ্চল) তাতারী সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে। এটি ৬২৯ হিজরীর ঘটনা। এরপর আযারবাইজান আক্রমণ করে সেটাও তাতারী সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে।
এর মাধ্যমে গোটা পারস্য ভূখণ্ড তাতারীদের অধ্যুষিত অঞ্চলে পরিণত হয়। তবে পশ্চিম পারস্যের এক সংকীর্ণ ভূখণ্ড শীয়াদের ইসমাঈলী গ্রুপের দখলে থেকে যায়।
এরপর শুরমাজান এসব অঞ্চলে স্থায়ী বসবাস শুরু করে। নিজ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা ও সৈন্যবাহিনী সুসংহতকরণ ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহ সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞানার্জনের পূর্বে তার মিশন শেষ হয় না। এসব বিষয় তাতারী নেতা শুরমাজানকে এসব অঞ্চলে আক্রমণ করতে সহযোগিতা করে।
৬২৯ থেকে ৬৩৪ হিজরী পর্যন্ত মোট পাঁচ বছর শুরমাজান এসব অঞ্চলে তাতারী রাজত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত রাখে। এই পাঁচ বছরের মাঝে একবারের জন্য মুসলমানদের ভয়ভীতি তাকে স্পর্শ করেনি। তার সঙ্গে লড়াই করার জন্য মুসলিম বাহিনী একটু নড়াচড়াও করেনি। অথচ চারপাশের অঞ্চলসমূহ ছিল মুসলমানদের দখলে। যেমন পারস্য, আযারবাইজান, ইরাক, মসুল, মিশর, হেজাজ ইত্যাদি। সবাই মনে করত, এটি পারস্য ও আযারবাইজানের জন্য দুঃশ্চিন্তার কারণ। আপামর মুসলমানদের বিপদ নয়। সেসব মুসলমানদের ওপর তখনো তাতারী হামলার নির্মম দুর্যোগ নেমে আসেনি, তারা বোঝেনি যে, খানিক বাদে তারাও তাতারীদের শিকারে পরিণত হবে। বিপদ আজ বা কাল, অবশ্যই তাদের পাকড়াও করবে।
এখানে আমি আরেকটু সংযোজন করি—ইরাক, সিরিয়া, মিশর, হেজাজের অধিকাংশ মুসলমান হলো আরবীয়। পক্ষান্তরে পারস্য, আযারবাইজান ও খাওয়ারেযম সাম্রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলের আরবরা হলো অনারবীয়। তাদের মাঝে ইসলামের সঠিক বুঝ অবিদ্যমান। এ কারণেই আরবীয় ও অনারবীয়দের মাঝে বিস্তর ব্যবধান পরিলক্ষিত হয়। পরস্পর যেন তারা অপরিচিত। অথচ ইসলামের শিক্ষা, মুসলমানরা পরস্পর ভাই ভাই (শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ন্যায়)।