📘 তাতারীদের ইতিহাস 📄 ৬২৮ হিজরীতে তাতারী বাহিনীর আক্রমণের কারণ

📄 ৬২৮ হিজরীতে তাতারী বাহিনীর আক্রমণের কারণ


৬২৮ হিজরী। এ বছর তাতারীরা নব উদ্যমে মুসলিম উম্মাহর ওপর আক্রমণ শুরু করে। বিভিন্ন শক্তির সমন্বয়ে দ্বিতীয় আক্রমণকে পূর্ববর্তী আক্রমণগুলোর সমপর্যায়ের কিংবা অধিক ফলপ্রসূ করতে পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

📘 তাতারীদের ইতিহাস 📄 প্রথম কারণ

📄 প্রথম কারণ


চেঙ্গিজ খানের মৃত্যুর পর মঙ্গোলিয়ায় তাতারী সাম্রাজ্যকে স্থায়ীকরণ। এবার তাতারীদের নতুন নেতা ওয়াকিতাই (Oakitai) নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। এটি ৬২৪ থেকে ৬২৭ হিজরীর ঘটনা (১২২৯-১২২৬ খ্রি.)। ওয়াকিতাই চীন ও মঙ্গোলিয়ায় তার রাজত্ব সুশৃঙ্খলভাবে নিয়ন্ত্রণ করে।
এরপর সে নতুনভাবে মুসলিমবিশ্বের ওপর আক্রমণ-যুদ্ধ এবং ইউরোপ বিজয়ের ইচ্ছা পোষণ করে। রাশিয়া এলাকায় যেখানে ইতিপূর্বে তাতারীরা পরাজিত হয়েছিল। একথা সুস্পষ্ট যে, আব্বাসী খেলাফত আক্রমণ কিংবা বাগদাদ পতন এবারের আক্রমণের মৌলিক লক্ষ্য ছিল না। কারণ, বাগদাদে অবস্থান না করে ইউরোপ পর্যন্ত পৌছা অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার। কারণ, বাগদাদ অত্যন্ত সুরক্ষিত ও ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল। তা ছাড়া বাগদাদ পতন হলে ইরাক, সিরিয়া, মিশর উত্তেজিত হয়ে পড়বে। তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা খুবই দুঃসাধ্য হবে। তাই তাতারীরা বাগদাদকে সর্বশেষে টার্গেট বানাল। আর এটাই ছিল বুদ্ধির পরিচয়।
উকিতাই তাতারীদের দ্বিতীয় আক্রমণের জন্য সেনাপতি শুরমাজানকে দায়িত্ব প্রদান করে। সেনাপতি বিপুলসংখ্যক তাতারী বাহিনী নিয়ে নতুন উদ্যমে মুসলিমবিশ্বের ওপর আক্রমণের প্রস্তুতি নেয়।

📘 তাতারীদের ইতিহাস 📄 দ্বিতীয় কারণ

📄 দ্বিতীয় কারণ


৬২৮ হিজরীতে মুসলিম উম্মাহর মাঝে বিভেদ-বিভাজন বিরাজমান ছিল। প্রত্যেক মুসলিম নেতা নিজ নিজ রাজসীমা নিয়ে ব্যস্ত ছিল। রাজ্য যত ছোটই হোক না কেন? এমনকি কোনো কোনো রাজ্য মাত্র একটি শহরের ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল। মুসলিম নেতারা কেবল বিভেদ-বিভাজনে লিপ্ত ছিল এমন নয়, বরং পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত ছিল, একে অপরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করত। কেউ কাউকে শর্তহীন নিরাপত্তা প্রদান করত না। তাদের মাঝে ঐক্য ও একতার কোনো চিন্তাই ছিল না।

📘 তাতারীদের ইতিহাস 📄 তৃতীয় কারণ

📄 তৃতীয় কারণ


এই বছরটি সুলতান জালাল উদ্দীন ইবনে খাওয়ারেযম শাহের জন্য ছিল চরম বেদনাদায়ক ও হৃদয়বিদারক।
কারণ, যখন সেনাপতি শুরমাজানের নেতৃত্বে তাতারী বাহিনী মুসলিম সাম্রাজ্য আক্রমণের জন্য অগ্রসর হয়, তখন তারা জানতে পারে যে, সুলতান জালাল উদ্দীন এ বছর পরপর দুবার উত্তর ইরাক ও দক্ষিণ তুরস্কের নেতা আশরাফ ইবনে আদেলের সঙ্গে যুদ্ধে পরাজয়বরণ করার কারণে যারপরনাই দুর্বল হয়ে পড়েছে।
আশরাফ ইবনে আদেল চিঠি মারফত সুলতান জালাল উদ্দীনের দুর্বলতার কথা তাতারীদের জানিয়ে দেয়। আশরাফ ইবনে আদেলের সঙ্গে জালাল উদ্দীনের বিরোধ ছিল দীর্ঘদিনের। তাদের মাঝে বহু যুদ্ধ সংঘটিত হয়। তাই সে তাতারীদের আক্রমণকে প্রতিশোধ গ্রহণে উপযুক্ত সুযোগ মনে করে তাতারীদের তার দুর্বলতার কথা জানিয়ে দেয়।
বিপুলসংখ্যক তাতারী আগমন করে। রাস্তার দু-ধারের ঘর-বাড়ি গাছ-পালা সবকিছু ধ্বংস করে দেয়। কাঁচাপাকা সব ধরনের ফল-ফলাদি ও খাদ্যদ্রব্য খেয়ে ফেলে। তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল জালাল উদ্দীন ইবনে খাওয়ারেযম শাহকে গ্রেপ্তার করা। এক রণভূমিতে জালাল উদ্দীনের সঙ্গে তাদের দেখা হয়। যুদ্ধে সুলতান জালাল উদ্দীন নিকৃষ্ট পরাজয়বরণ করেন। সৈন্যবাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। সুলতান জালাল উদ্দীন পালাবার পথ ধরেন। তার বাবার শেষ পরিণতির পথে তিনিও অগ্রসর হন। গ্রাম থেকে গ্রাম, শহর থেকে শহর পালাতে থাকেন। তাতারী বাহিনী পিছু ধাওয়া করতে থাকে। আর পথিমধ্যে যাদের পায় হত্যা করে। বন্দী করে ও মালামাল ছিনতাই করে। একপর্যায়ে জালাল উদ্দীন উত্তর ইরাকে অবস্থিত উপত্যকায় পৌঁছেন। সেখানে তার সকল সৈন্য তার থেকে পৃথক হয়ে যায়। তিনি একাকী অসহায় সহযোগীহীন পড়ে থাকেন। ঠিক যেমন ঘটেছিল তার বাবার বেলায়। তাতারীদের ভয়ে গ্রামের পর গ্রাম একাই পালাতে থাকেন। এরপর দীর্ঘদিন পর্যন্ত তিনি গুম হয়ে ছিলেন। কেউ জানত যে, তিনি নিহত হয়েছেন, আত্মগোপন করেছেন, নাকি এক দেশ থেকে অন্য দেশে পলায়ন করেছেন? একসময় জনৈক গ্রাম্য কুর্দী কৃষকের সঙ্গে তার দেখা হয়। কৃষক তাকে জিজ্ঞাসা করে, কে আপনি? কৃষক তার গায়ে পরিহিত দামি পোশাক ও স্বর্ণালঙ্কার দেখে অবাক হন। সুলতান জালাল উদ্দীন তাকে বলেন, আমি খাওয়ারেযমের সুলতান। তিনি কৃষকের অন্তরে ভয় সৃষ্টির জন্য একথা বলেন। কিন্তু সুবহানাল্লাহ! তার এই বক্তব্য যেন আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত বিষয়ে ঘোষণা ছিল। এর পূর্বে কৃষকের অন্তরে খাওয়ারেযমদের প্রতি ঘৃণা ও ক্ষোভ দানা বেঁধেছিল। কৃষক সুলতানের পরিচয় পেয়ে সংবর্ধনা জানাল। সম্মান প্রদর্শন করল এবং আদর আপ্যায়ন করল। আহার গ্রহণ শেষে সুলতান নিশ্চিন্ত মনে ঘুমিয়ে পড়েন। এই সুযোগে কৃষক কুঠারাঘাতে সুলতানকে হত্যা করে এবং তার সঙ্গে থাকা স্বর্ণালঙ্কার ও দামি আসবাবপত্র এই অঞ্চলের আমীর গাজী শিহাব উদ্দীনকে অর্পণ করে।
এই হলো জালেমদের শেষ পরিণতি! সীমালঙ্ঘনকারীদের শেষ ফল! এই হলো সেইসব রাজা-বাদশার নিকৃষ্ট পরিণতি, যারা প্রজাদের শাসন করেন, কিন্তু আল্লাহর হক, প্রজাদের হক; এমনকি আত্মীয়তার হক আদায় করেন না। কেবল নিজেদের নিয়ে ভোগ-বিলাসে মত্ত থাকেন। জনৈক ব্যক্তি যথার্থ বলেছেন-
“যে ব্যক্তি কেবল নিজেকে নিয়ে বেঁচে থাকে, তার জন্ম নেওয়ার কোনো অধিকার ছিল না।”
ইমাম বুখারী ও মুসলিম রহ. হযরত আবূ মূসা আশ'আরী রা.-এর সূত্রে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
إِنَّ اللَّهَ لَيُمْلِي لِلظَّالِمِ حَتَّى إِذَا أَخَذَهُ لَمْ يُفْلِتْهُ قَالَ: ثُمَّ قَرَأَ : وَكَذَلِكَ أَخْذُ رَبِّكَ إِذَا أَخَذَ القُرَى وَهِيَ ظَالِمَةٌ إِنَّ أَخْذَهُ أَلِيمٌ شَدِيدٌ.
"আল্লাহ তা'আলা জালেমকে সুযোগ দেন। আর যখন ধরেন, তখন কোনোক্রমেই ছাড়েন না। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তেলাওয়াত করেন, (অর্থ) যে সকল জনপদ জুলুমে লিপ্ত হয়, তোমার প্রতিপালক যখন তাদের ধরেন, তখন তাঁর ধরা এমনই হয়ে থাকে। বাস্তবেই তার ধরা অতি মর্মন্তুদ, অতি কঠিন।"৩৬

টিকাঃ
৩৬ বুখারী: ৪৬৮৬, সুরা হৃদ: ১০২।

ফন্ট সাইজ
15px
17px