📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 ৬২৩ হিজরীর ঘটনাবলি

📄 ৬২৩ হিজরীর ঘটনাবলি


খলিফা নাছেরের পর আব্বাসী খেলাফতের রাজভার গ্রহণ করেন তদীয় পুত্র জাহের বি আমরিল্লাহ। তিনি পিতার মতো ছিলেন না। তিনি ছিলেন সৎ ও মুত্তাকী। তিনি যে ন্যায়-ইনসাফ ও সৎকর্ম প্রদর্শন করেছেন, ইতিহাসে এর নজির বড়ই বিরল। ইবনুল আছীর রহ. বলেন-
“যদি কেউ বলে যে, খলীফা ওমর ইবনে আবদুল আযীযের পর তার মতো কোনো খলিফা ছিল না, তাহলে সে যথার্থই বলেছে।”
তিনি রাজস্ব কর কমিয়ে দেন। জনসাধারণের প্রাপ্য ফিরিয়ে দেন। মজলুমদের জেল থেকে মুক্তি দেন এবং গরীব দুঃখীদের দান-সদকা করেন। এমনকি তার সম্পর্কে বলা হয়, 'এই বিপর্যস্ত যুগে তিনি ছিলেন একজন বিরল ব্যক্তিত্ব।'
ইবনুল আছীর রহ. তার সমকালীন ছিলেন। তিনি তাঁর সম্পর্কে একটি বাক্য লেখেন। তিনি লেখেন— 'আমি তার খেলাফতকাল সংকীর্ণ হওয়ার আশঙ্কা করছি। কারণ এই যুগ ও এই যুগবাসী তার খেলাফতের যোগ্য নয়।'
সুবহানাল্লাহ!
ইবনুল আছীর রহ. এর উপলব্ধি বাস্তবায়িত হয়েছিল। খলিফা জাহের বি আমরিল্লাহ অকালে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। তিনি মাত্র নয় মাস কয়েক দিন রাজত্ব পরিচালনা করেছিলেন। এই কয়েক দিনই তিনি ইতিহাসের স্মরণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। ইতিহাসবিদগণ লেখেন— 'তার খেলাফতকালে দ্রব্যমূল্য ভারসাম্য ফিরে পায়। ইরাকের সুষম অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা পায়। এসবের মাধ্যমে তার প্রজ্ঞা প্রতিভাত হয়।'
সকল প্রশংসা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের, যিনি ভূপৃষ্ঠে এমন কতিপয় নীতিমালা স্থাপন করেছেন, যা কখনো পরিবর্তন পরিবর্ধন হয় না। আছে কি কোনো উপদেশ গ্রহণকারী?!”
খলিফা জাহের বি আমরিল্লাহর পর মুসতানসির বিল্লাহ খলিফা মনোনিত হন। তিনি প্রায় সতেরো বছর অর্থাৎ ৬৪০ হিজরী পর্যন্ত এ দায়িত্ব আঞ্জাম দেন। মধ্যবর্তী এ দীর্ঘ সময় সুলতান জালাল উদ্দীন অবিরাম যুদ্ধ করতে থাকেন। তাতারী বাহিনীর বিরুদ্ধে নয়, বরং মুসলমানদের বিরুদ্ধে!! কিছু কিছু শহর, অঞ্চলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। তার সবচেয়ে বর্বরোচিত কাজ হলো, খালাতবাসীকে অবরোধ করা। খালাত (বর্তমান তুরস্কের) একটি মুসলিম শহর। তিনি বহুসংখ্যক খালাতবাসী হত্যা করেছেন। খাওয়ারেযম বাহিনীর অশুভ থাবায় খালাতবাসীর প্রাণ ছিল ওষ্ঠাগত। তারা গোটা শহর লুণ্ঠন করেছে; এমনকি মুসলিম নারীদের পর্যন্ত বন্দী করেছে।
৬২৪ হিজরীতে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কেন্দ্রীয় ঘটনা সংঘটিত হয়। তা হলো, খুনি, রক্তপাতকারী বর্বর তাতারী বাহিনীর প্রধান নেতা চেঙ্গিজ খানের মৃত্যু। সে ৭২ বছর বয়সে ইন্তেকাল করে। তার জীবনে ছিল হত্যা, লুণ্ঠন, জ্বালাও পোড়াও ইত্যাদি অপকর্মের সমারোহ। পূর্বে কোরিয়া থেকে পশ্চিমে পারস্য পর্যন্ত তার রাজত্ব বিস্তৃত করে। এই সুবিশাল রাজত্বে মৌলিক ভিত ছিল মানুষ হত্যা ও রক্তপাত, নির্যাতন ও নিপীড়ন। (নিহতদের অধিকাংশই ছিল মুসলমান।)
চেঙ্গিজ খানের মৃত্যুতে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়। সুলতান জালাল উদ্দীন যখন ইরান ও কাযবিন সমুদ্রের পশ্চিমাঞ্চলসমূহে ক্ষমতা বিস্তার করছিলেন, তখন তাতারীরা তাদের অধ্যুষিত এলাকাগুলো সুরক্ষিত রাখে, যেনো উভয় দলই নিজ মালিকানাধীন অঞ্চল নিয়ে সন্তুষ্ট ছিল এবং যেসব অঞ্চলকে নিজেদের নিষ্কলুষ হক মনে করত। তার সুরক্ষায় যত্নবান ছিল।

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 ৬২৪-৬২৭ হিজরীর মধ্যবর্তী সময়

📄 ৬২৪-৬২৭ হিজরীর মধ্যবর্তী সময়


৬২৪-৬২৭ হিজরীর মধ্যবর্তী তিন বছর হলো চেঙ্গিজ খানের মৃত্যু পরবর্তী যুদ্ধবিরতির সময়।

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 এই মধ্যবর্তী সময়ে মুসলমানরা কোথায় ছিলেন

📄 এই মধ্যবর্তী সময়ে মুসলমানরা কোথায় ছিলেন


এই মধ্যবর্তী সময়ে মুসলমানরা পরস্পর বিভেদ ও বিভাজন, এখতেলাফ ও মতানৈক্য, দ্বন্দ্ব ও সংঘাতে লিপ্ত ছিল। মুসলমানরা চেঙ্গিজ খানের মৃত্যুতে তাতারীদের দুর্বলতা ও মনোবলহীনতাকে কাজে লাগাতে পারেননি; বরং তারা নিজেদের মাঝে যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত ছিল, একে অপরের প্রতি জুলুম করছিল। সুলতান জালাল উদ্দীন ও তার ভাই গিয়াশ উদ্দীনের মাঝে নতুন বিরোধ দেখা দেয়; এমনকি গিয়াশ উদ্দীন জালাল উদ্দীনকে ধ্বংস করার জন্য তার শত্রুদের সহযোগিতা প্রদান করেন।
শুধু এতটুকুই নয়, বরং গোটা সাম্রাজ্য ফেতনা-ফ্যাসাদ, অস্থিরতা ও ব্যাকুলতায় ভরে গিয়েছিল। শুধু ইরাক ও পারস্য ভূখণ্ড নয়, বরং গোটা মুসলিমবিশ্বে। সিরিয়া ও মিশরের আমীর-ওমারাদের মাঝে দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ চলছিল। তারা ঐক্যের পতাকাতলে আসতে পারেননি। অথচ তাদের অধিকাংশ ছিলেন সালাহ উদ্দীন আইয়ূবীর পরিবারভুক্ত। এই অনৈক্যের ফলাফলস্বরূপ ৬২৬ হিজরীতে এক ভয়ংকর ঘটনা ঘটে। তা হলো, বাইতুল মুকাদ্দাস (যা ইতিপূর্বে ছালাহ উদ্দীন আইয়ুবী রহ. স্বাধীন করেছিলেন) সন্ধিস্বরূপ ক্রুশেডারদের হাতে অর্পণ করা। অর্থাৎ সিরিয়ার মুসলমানরা ক্রুশেডারদের এই শর্তে বাইতুল মুকাদ্দাস অর্পণ করতে সম্মত হয় যে, ক্রুশেডাররা সিরিয়ার কতিপয় সরকারি উচ্চপদে তাদের নিয়োগ দেবে।
আমরা আল্লাহ তা'আলার কাছে ক্ষমতার পর দুর্বলতা, সম্মানের পর অসম্মান এবং সহযোগিতার পর অসহযোগিতা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।
এদিকে সুলতান জালাল উদ্দীন অবিরাম যুদ্ধ চালাতে থাকেন। দ্বিতীয় বারের মতো খালাত শহর অবরোধ করেন। অবরোধ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকে। একপর্যায়ে শহরবাসী ঘোড়া ও গাধার গোশত ভক্ষণ করতে বাধ্য হয়। এমনকি কুকুর বিড়াল ইঁদুর পর্যন্ত ভক্ষণ করে। 'খালাত' শহর সুলতান জালাল উদ্দীনের হাতে পরাজিত হয়। তিনি শহরটিকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেন। অধিকাংশ জনগণকে হত্যা করেন, নারী-শিশুদের বন্দী করেন। ইবনুল আছীর রহ. বলেন-
“পৃথিবীর ইতিহাসে এমন ঘটনা কখনো শোনা যায়নি। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, আল্লাহ তা'আলা তাকে রেহাই দেবেন না।”
উপরোল্লিখিত সমগ্র মুসলিম ভূখণ্ডে সংঘটিত ঘটনাবলি থেকে আমরা উপলব্ধি করতে পারি যে, মুসলিমবিশ্বের বিশালতা, সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও প্রবল-প্রতাপ সত্ত্বেও কেন তাতারীরা সফল হলো? এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই যে, এটাই পৃথিবীর চিরায়ত বিধান। কারণ, যে জাতির অবস্থা এমন হবে—যেমনটি আমরা ইতিপূর্বে লক্ষ করেছি—তাদের ওপর তাগুতি শক্তি সয়লাব করবে। আল্লাহ রব্বুল আলামীন তাকেই সহযোগিতা করেন, যারা তার দ্বীনকে সহযোগিতা করে।
إِنْ يَنْصُرْكُمُ اللَّهُ فَلَا غَالِبَ لَكُمْ وَإِنْ يَخْذُلْكُمْ فَمَنْ ذَا الَّذِي يَنْصُرُكُمْ مِنْ بَعْدِهِ
"আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করলে কেউ তোমাদের পরাস্ত করতে পারবে না। আর তিনি যদি তোমাদের একা ছেড়ে দেন, তবে কে আছে যে তোমাদের সাহায্য করবে?"৩৫

টিকাঃ
৩৫ আলে ইমরান: ১৬০।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00