📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 এটা কি কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল

📄 এটা কি কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল


আল্লাহর শপথ! এটা কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না; বরং এটি ছিল কিতাবুল্লাহর হুঁশিয়ারি বাণীর বাস্তবায়ন-
وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَى آمَنُوا وَاتَّقَوْا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِمْ بَرَكَاتٍ مِنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ وَلَكِنْ كَذَّبُوا فَأَخَذْنَاهُمْ بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ
"যদি সে সকল জনপদবাসী ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত, তবে আমি তাদের জন্য আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর উভয়দিক থেকে বরকতের দরজাসমূহ খুলে দিতাম। কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করল। সুতরাং আমি ক্রমাগত অসৎকর্মের পরিণামে তাদের পাকড়াও করি।”৩২
এটি কিতাবুল্লাহর হুঁশিয়ারবাণীর বাস্তব নমুনা। যখন তাকওয়া (খোদাভীতি) তাহারাত (পবিত্রতা) জাতির মাঝে বদ্ধমূল হবে, তখন তাদের জন্য আসমান-জমিনের বরকত খুলে দেওয়া হবে। পক্ষান্তরে যখন তাকওয়া হারিয়ে যাবে—যেমন আমরা তৎকালীন মুসলমানদের অবস্থা প্রত্যাশা করেছি—তখন আমরা ক্রমাগত বিপদাপদ, বালা-মসিবত ও সংকট-জটিলতা দেখতে পাবো।
এমনকি আল্লাহ তা'আলা কুদরত প্রমাণের জন্য কুরআনে কারীমে পঙ্গপালের কথাও উল্লেখ করেছেন যে, যারা শরীয়তের তোয়াক্কা করে না, তাদের ওপর পঙ্গপাল নেমে আসবে। আল্লাহ তা'আলা ফেরাউন সম্প্রদায় সম্পর্কে বলেন—
فَأَرْسَلْنَا عَلَيْهِمُ الطُّوفَانَ وَالْجَرَادَ وَالْقُمَّلَ وَالضَّفَادِعَ وَالدَّمَ آيَاتٍ مُفَصَّلَاتٍ فَاسْتَكْبَرُوا وَكَانُوا قَوْمًا مُجْرِمِينَ
"সুতরাং আমি তাদের ওপর প্লাবন, পঙ্গপাল, ঘুণপোকা, ব্যাঙ ও রক্তের মসিবত ছেড়ে দিই। যেগুলো ছিল পৃথক পৃথক নিদর্শন। তথাপি তারা অহংকার প্রদর্শন করে। বস্তুত তারা ছিল এক অপরাধী সম্প্রদায়।"৩৩
সুবহানাল্লাহ! আমরা দীর্ঘ এক বছর কিংবা ততোধিক সময় ধরে মুসলিমবিশ্বের ওপর ঝাঁকে ঝাঁকে পঙ্গপাল নেমে আসা দেখেছি। আমি (লেখক) মনে করি, এটা কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না; বরং এটি ছিল মুসলমানদের জন্য সতর্কীকরণ, ইতিহাসের স্মারক এবং আল্লাহর পথে ফিরে আসার আহ্বান। আমরা আল্লাহর ক্রোধ থেকে পানাহ চাই। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেনো আমাদের তাঁর নিদর্শনাবলি দেখান এবং তাকওয়া ও খোদাভীতি, এখলাছ ও একনিষ্ঠতার গুণে গুণান্বিত হওয়ার এবং তার যাবতীয় বিধানাবলির ওপর পূর্ণ আমল করার তৌফিক দান করেন। আমীন।

টিকাঃ
৩২ সুরা আ'রাফ: ৯৬।
৩৩ সুরা আ'রাফ: ১৩৩।

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 ৬২১ হিজরীর ঘটনাবলি

📄 ৬২১ হিজরীর ঘটনাবলি


৬২১ হিজরীতে সম্রাট গিয়াশ উদ্দীন (ইরানের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত) নিজ ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করতে চান। কিন্তু তার ও সে অঞ্চলের জনৈক আমীর সা'দ উদ্দীন ইবনে দাকলার মাঝে যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং বছরব্যাপী যুদ্ধ চলতে থাকে। একপর্যায়ে উভয় দলই দেশ বিভক্তির প্রতি সন্তুষ্ট হয়। লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ!
বাদশা গিয়াশ উদ্দীন যখন দক্ষিণ ইরানে সা'দ উদ্দীনের সঙ্গে যুদ্ধে ব্যস্ত। এ সুযোগে তাতারী বাহিনীর ছোট্ট একটি দল—তিন হাজার সৈন্যের বেশি হবে না—রায় নগরীর ওপর আক্রমণ করে বসে। তাতারীরা যেভাবে ইচ্ছা শহরবাসীকে হত্যা করে ও লুণ্ঠন চালায়। রায় নগরীকে বিরানভূমিতে পরিণত করে। এরপর তারা সাওয়া শহরে গিয়ে একই রকম কার্যকলাপ চালায়। এরপর তেহরানের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত কম শহরে (এটি ইরানের একটি শহর Qom) এরপর কাশান শহরে আক্রমণ করে শহর দুটিকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে। এরপর হামাদান শহরে একই রকম কার্যকলাপ শেষে নিরাপদে চেঙ্গিজ খানের দরবারে ফিরে যায়।
মাত্র তিন হাজার তাতারী স্বল্প সময়ে যা আমরা উল্লেখ করলাম, তা সমাধা করে!!
আল্লাহ তা'আলা মুসলমানদের চোখে তাতারীদের অধিকসংখ্যকরূপে তুলে ধরেছিলেন এবং তাতারীদের চোখে মুসলমানদের সংখ্যা স্বল্পরূপে উপস্থাপন করেছিলেন। ফলে তাতারীত্রাস বিকট আকার ধারণ করেছিল। আর তাতারীদের অন্তর থেকে মুসলমানদের ভয়ভীতি দূর হয়ে গিয়েছিল।

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 কেন? এর কারণ কী?

📄 কেন? এর কারণ কী?


এর কারণ হলো, মুসলমানরা নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। তারা শত্রু-মিত্রের মাঝে পার্থক্য ভুলে গিয়েছিল। যখন মুসলমানদের সঙ্ঘবদ্ধ হওয়ার দরকার ছিল, তখন তারা ছিল বিভক্ত। আর তাদের এমন অবস্থার পেছনে কারণ ছিল অন্তরের ঈমান-স্বল্পতা, দুনিয়াকে বড় করে দেখা, নিকৃষ্ট প্রতিপালন ইত্যাদি।
এ ছিল জাতির আত্মার ব্যাধি ও চারিত্রিক অধঃপতনের ফলাফল। যেমনটি ইবনুল আছীর রহ. ৬২১ হিজরীর ঘটনাবলি উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন-
“এ বছর বৃষ্টি-স্বল্পতা দেখা দিয়েছিল। বিভিন্ন সময় দু'এক ফোঁটা বৃষ্টি নামত, যা ফসলাদির জন্য পর্যাপ্ত ছিল না। ফলে ফলন কমে যায়। উপরন্তু বের হয় অগণিত পঙ্গপাল। পঙ্গপাল জমিনের সকল ফসলাদি তছনছ করে ফেলে। ফলে ইরাক, মসুল এবং সকল আরবরাষ্ট্রে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি পায় এবং খাদ্যদ্রব্যের ঘাটতি দেখা দেয়।"
আর এ বছর সংঘটিত যাবতীয় বিপদাপদ, যেমন: পঙ্গপাল, দুর্ভিক্ষ, খাদ্যঘাটতি ছিল একটি স্বাভাবিক ঘটনা। এটি ছিল ঐশী বিধানমাফিক বিষয়। এগুলো আকস্মিক ঘটনা ছিল না।
কোনো যুগে যদি মুসলমানরা পণ্যমূল্য বৃদ্ধি, খাদ্যসংকট, অর্থনৈতিক ঘাটতি, সংকটাপন্ন জীবনযাপন দেখতে পায়, তখন যেন তারা নিজেদের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করে, নিজেদের ঈমান-আমলের খোঁজ-খবর নেয় এবং নিজেদের যেন আল্লাহর কিতাবের কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। বাস্তবেই যদি তারা এ কাজ করতে পারে তবে তারা রোগ নির্ণয় করতে পারবে এবং সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করতে পারবে।
مَا فَرَّطْنَا فِي الْكِتَابِ مِنْ شَيْءٍ
“আমি কিতাব (লওহে মাহফুজে) কোনো ত্রুটি রাখিনি।”৩৪

টিকাঃ
৩৪ সুরা আন'আম: ৩৮।

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 ৬২২ হিজরীর ঘটনাবলি

📄 ৬২২ হিজরীর ঘটনাবলি


৬২১-৬২২ হিজরী এই দুই বছরে খাওয়ারেযম সাম্রাজ্যের পশ্চিম তথা ইরানের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে তাতারীরা আক্রমণ করেছিল। তারা দূরবর্তী অঞ্চলসমূহের ওপর আক্রমণ করার প্রতি ব্যস্ত ছিল। তারা জাইহুন ও জাইহুন নদীর তীরবর্তী খাওয়ারেযম সাম্রাজ্যের পূর্বাঞ্চলসমূহে ও আফগানিস্তানের উত্তর ও ইরানের পূর্বাঞ্চলে আক্রমণ করতে এবং সেসব অঞ্চলে নিজেদের কর্তৃত্ব সুদৃঢ় করতে গুরুত্বারোপ করেছিল। কিন্তু এ বছর নতুন ঘটনা জন্ম নেয়। হঠাৎ জালাল উদ্দীন ইবনে মোহাম্মদ খাওয়ারেযম শাহ, যিনি পাঁচ বছর পূর্বে ৬১৭ হিজরীতে হিন্দুস্তান পলায়ন করেছিলেন, হঠাৎ ফিরে আসেন। হঠাৎ তার ফিরে আসার কারণ হলো, তিনি হিন্দুস্তানে ঠিকঠাক জীবনযাপন করতে পারেননি। কারণ, হিন্দুস্তানের রাজা-বাদশাদের সঙ্গে তিনি সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে পারেননি। ইতিমধ্যে তিনি এ সংবাদ পান যে, তাতারীরা পারস্য ছেড়ে চলে গেছে। আর অন্য কাউকে তাতারী বাহিনীর দায়িত্ববান নিয়োগ করত চেঙ্গিজ খান দেশীয় স্বার্থে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেছেন।
অপরদিকে তার সহোদর গিয়াশ উদ্দীন সা'দ উদ্দীন ইবনে দাকলার সঙ্গে যুদ্ধ শেষে পারস্যের কতিপয় অঞ্চলে কর্তৃত্ব সৃষ্টি করেছেন এবং উভয়ই পারস্য বিভক্ত করতে সহমত পোষণ করেছেন। তবে পারস্যের বৃহদাংশ ছিল গিয়াশ উদ্দীনের ভাগে। এ অবস্থায়ই ৬২১ হিজরী সমাপ্ত হয়।
জালাল উদ্দীন ভাবলেন, খাওয়ারেযম ফিরে গিয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত রাজ্যগুলো নিয়ে সংলাপ করার এটাই উপযুক্ত সময়। কিন্তু আফসোস! তিনি গভীর দৃষ্টিপাত করতে পারেননি এবং তৎকালীন মুসলিম উম্মাহর ব্যাধি নির্ণয় করতে পারেননি। তিনি উপলব্ধি করতে পারেননি, বিভক্তি-বিভাজন এবং মুসলিমবিরোধী পার্টিদের রক্তপাতকে সহনীয় দৃষ্টিতে দেখা বর্তমান মুসলিম উম্মাহর লাঞ্ছনা ও অবমাননার প্রধান কারণ। জালাল উদ্দীন এসব বিষয় উপলব্ধি না করতে পারার কারণেই ধ্বংসপ্রাপ্ত অঞ্চলসমূহে পুনঃসংস্করণ ব্যতীত নিজেকে খাওয়ারেযম সাম্রাজ্যের অন্যতম ওয়ারিশজ্ঞান করে খাওয়ারেযম সাম্রাজ্যে প্রবেশ করেন!!

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00