📄 বাদশা মুগীস উদ্দীন ইবনে আরসালান কী করলেন
তিনি তাদের বললেন, আমার ছেলে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে তাকে বিয়ে করবে।
তারা সবাই এ বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেন। বাস্তবেই তার ছেলে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে জুজিয়ার রানিকে বিয়ে করে এবং জুজিয়ার রাজ্যভার গ্রহণ করার জন্য সেখানে চলে যান। লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ!
সে সময় মুসলমানরা নৈতিক অধঃপতনের এত গভীর গর্তে নিপতিত হয়েছিল যে, এ অবস্থায় আল্লাহর সহযোগিতা লাভ করা অসম্ভব। কীভাবে একজন মুসলিম সম্রাট ও তাঁর ছেলের মাথায় খ্রিস্টান হওয়ার চিন্তা হয়? খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করা তো বহু দূরের কথা!
খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করলে যদি সারা পৃথিবী পরিচালনার দায়িত্বভারও আসে, তবু কি একজন মুসলিম বাদশার পক্ষে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করা সম্ভব? যদি কোনো দুর্বল ব্যক্তির ক্ষেত্রে এ দুর্ঘটনা ঘটত, তবে হয়তো আমরা এই বলে নিজেদের প্রবোধ দিতে পারতাম যে, হয়তো তাকে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করতে বাধ্য করা হয়েছে? কোনো সুস্থ বিবেক এমন চিন্তা করতে পারে না।
আমি জানি না, কেন সম্রাটের নাম মুগীস উদ্দীন (তথা দ্বীনের আশ্রয় দাতা) রাখা হয়েছিল? আমি জানি না, তিনি দ্বীনের জন্য কী সহযোগিতা প্রদান করেছেন? আমি এও জানি না যে, তিনি কোন দ্বীন (ধর্ম) কে আশ্রয় দিয়েছেন? ইসলামধর্ম নাকি খ্রিস্টধর্ম?
فَإِنَّهَا لَا تَعْمَى الْأَبْصَارُ وَلَكِنْ تَعْمَى الْقُلُوبُ الَّتِي فِي الصُّدُورِ
"প্রকৃতপক্ষে চোখ অন্ধ হয় না; বরং অন্ধ হয় সেই হৃদয় যা বক্ষদেশে বিরাজ করে।"৩০
পরিস্থিতির পরিপূর্ণ চিত্র ফুটিয়ে তুলতে তার শেষ পরিণাম উল্লেখ করাকে যথোপযুক্ত মনে করছি। আমরা দেখব, যে ব্যক্তি দ্বীনকে দুনিয়ার স্বার্থে বিক্রি করে, তার পরিণাম কী হয়?
মুসলিম সম্রাট খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করত জুজিয়ার খ্রিস্টান রানিকে বিয়ে করে। মাঝখানে বহুদিন কেটে যায়। বেশ কিছুদিন পর সম্রাট শুনতে পান যে, তার স্ত্রী জনৈক দাসের প্রতি আসক্ত। তার সম্পর্কে অশ্রাব্য কটু মন্তব্য শুনতে পান। কিন্তু এ বিষয়ে কাউকে কিছু বলতে পারেন না। তিনি সুবিশাল রাজ্যে একাকিত্ব অনুভব করেন। একদিন তিনি রাজমহলে প্রবেশ করে রানিকে দাসের সঙ্গে বিছানায় অপ্রীতিকর অবস্থায় দেখতে পান। তার এই কুকর্মকে তিনি ঘৃণা করেন এবং (বৈবাহিক) সম্পর্ক রক্ষায় অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন। রানি সর্বক্ষমতা প্রয়োগ করত বলেন, 'এ অবস্থায় যদি তুমি সন্তুষ্ট থাকতে পারো, তবে থাকো। অন্যথায় চলে যাও।' বাদশা বললেন, আমি এ অবস্থায় সম্পর্ক রক্ষা করতে পারব না। ফলে রানি তাকে অন্য দেশে পাঠিয়ে দেন এবং অন্য আরেক জন বিয়ে করেন!!
আল্লাহ তা'আলা আমাদের লাঞ্ছনা থেকে রক্ষা করুন। আল্লাহর কাছে আমরা শুভ পরিণাম কামনা করি এবং যেদিন আমরা আল্লাহর সাক্ষাতে ধন্য হব, সেদিন যেনো আমাদের শ্রেষ্ঠ দিন হয়।
ইমাম মুসলিম রহ. হযরত আবু হুরায়রা রা. সূত্রে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
بَادِرُوا بِالْأَعْمَالِ فِتَنَا كَقِطَعِ اللَّيْلِ الْمُظْلِمِ، يُصْبِحُ الرَّجُلُ مُؤْمِنًا وَيُمْسِي كَافِرًا، أَوْ يُمْسِي مُؤْمِنًا وَيُصْبِحُ كَافِرًا، يَبِيعُ دِينَهُ بِعَرَضٍ مِنَ الدُّنْيَا
"তোমরা পুণ্যকর্মের মাধ্যমে ফেতনাকে অতিক্রম করবে অন্ধকারাচ্ছন্ন রাত পার করার মতো। (সে সময়) মানুষ সকালে মুমিন হবে আবার সন্ধ্যায় কাফের হবে। মানুষ দ্বীন-ধর্মকে দুনিয়ার বিনিময়ে বিক্রি করবে।"৩১
টিকাঃ
৩০ সুরা হজ: ৪৬।
৩১ মুসলিম: ১৮৬।
📄 চতুর্থ ঘটনা
৬২০ হিজরীতে এমন একটি দুর্ঘটনা ঘটে, কেউ কেউ এটিকে আকস্মিক ঘটনা বলে আখ্যা দেয়। এই বছরগুলোতে মুসলমানদের ফেতনার কোনো অন্ত ছিল না। অর্থনৈতিক হাল ছিল অধঃপতিত। অনুরূপ রাজনৈতিক, সামরিক ও চারিত্রিক অধঃপতন নেমে এসেছিল। সবচেয়ে বড় বিপদ ছিল মুসলিম অঞ্চলসমূহে ঝাঁকে ঝাঁকে পঙ্গপালের আবির্ভাব। ইরাক, আরব ভূখণ্ড, সিরিয়া, পারস্যসহ অন্য মুসলিম দেশের প্রচুর শস্য ফলফলাদি এতে বিনষ্ট হয়।
📄 এটা কি কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল
আল্লাহর শপথ! এটা কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না; বরং এটি ছিল কিতাবুল্লাহর হুঁশিয়ারি বাণীর বাস্তবায়ন-
وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَى آمَنُوا وَاتَّقَوْا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِمْ بَرَكَاتٍ مِنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ وَلَكِنْ كَذَّبُوا فَأَخَذْنَاهُمْ بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ
"যদি সে সকল জনপদবাসী ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত, তবে আমি তাদের জন্য আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর উভয়দিক থেকে বরকতের দরজাসমূহ খুলে দিতাম। কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করল। সুতরাং আমি ক্রমাগত অসৎকর্মের পরিণামে তাদের পাকড়াও করি।”৩২
এটি কিতাবুল্লাহর হুঁশিয়ারবাণীর বাস্তব নমুনা। যখন তাকওয়া (খোদাভীতি) তাহারাত (পবিত্রতা) জাতির মাঝে বদ্ধমূল হবে, তখন তাদের জন্য আসমান-জমিনের বরকত খুলে দেওয়া হবে। পক্ষান্তরে যখন তাকওয়া হারিয়ে যাবে—যেমন আমরা তৎকালীন মুসলমানদের অবস্থা প্রত্যাশা করেছি—তখন আমরা ক্রমাগত বিপদাপদ, বালা-মসিবত ও সংকট-জটিলতা দেখতে পাবো।
এমনকি আল্লাহ তা'আলা কুদরত প্রমাণের জন্য কুরআনে কারীমে পঙ্গপালের কথাও উল্লেখ করেছেন যে, যারা শরীয়তের তোয়াক্কা করে না, তাদের ওপর পঙ্গপাল নেমে আসবে। আল্লাহ তা'আলা ফেরাউন সম্প্রদায় সম্পর্কে বলেন—
فَأَرْسَلْنَا عَلَيْهِمُ الطُّوفَانَ وَالْجَرَادَ وَالْقُمَّلَ وَالضَّفَادِعَ وَالدَّمَ آيَاتٍ مُفَصَّلَاتٍ فَاسْتَكْبَرُوا وَكَانُوا قَوْمًا مُجْرِمِينَ
"সুতরাং আমি তাদের ওপর প্লাবন, পঙ্গপাল, ঘুণপোকা, ব্যাঙ ও রক্তের মসিবত ছেড়ে দিই। যেগুলো ছিল পৃথক পৃথক নিদর্শন। তথাপি তারা অহংকার প্রদর্শন করে। বস্তুত তারা ছিল এক অপরাধী সম্প্রদায়।"৩৩
সুবহানাল্লাহ! আমরা দীর্ঘ এক বছর কিংবা ততোধিক সময় ধরে মুসলিমবিশ্বের ওপর ঝাঁকে ঝাঁকে পঙ্গপাল নেমে আসা দেখেছি। আমি (লেখক) মনে করি, এটা কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না; বরং এটি ছিল মুসলমানদের জন্য সতর্কীকরণ, ইতিহাসের স্মারক এবং আল্লাহর পথে ফিরে আসার আহ্বান। আমরা আল্লাহর ক্রোধ থেকে পানাহ চাই। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেনো আমাদের তাঁর নিদর্শনাবলি দেখান এবং তাকওয়া ও খোদাভীতি, এখলাছ ও একনিষ্ঠতার গুণে গুণান্বিত হওয়ার এবং তার যাবতীয় বিধানাবলির ওপর পূর্ণ আমল করার তৌফিক দান করেন। আমীন।
টিকাঃ
৩২ সুরা আ'রাফ: ৯৬।
৩৩ সুরা আ'রাফ: ১৩৩।
📄 ৬২১ হিজরীর ঘটনাবলি
৬২১ হিজরীতে সম্রাট গিয়াশ উদ্দীন (ইরানের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত) নিজ ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করতে চান। কিন্তু তার ও সে অঞ্চলের জনৈক আমীর সা'দ উদ্দীন ইবনে দাকলার মাঝে যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং বছরব্যাপী যুদ্ধ চলতে থাকে। একপর্যায়ে উভয় দলই দেশ বিভক্তির প্রতি সন্তুষ্ট হয়। লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ!
বাদশা গিয়াশ উদ্দীন যখন দক্ষিণ ইরানে সা'দ উদ্দীনের সঙ্গে যুদ্ধে ব্যস্ত। এ সুযোগে তাতারী বাহিনীর ছোট্ট একটি দল—তিন হাজার সৈন্যের বেশি হবে না—রায় নগরীর ওপর আক্রমণ করে বসে। তাতারীরা যেভাবে ইচ্ছা শহরবাসীকে হত্যা করে ও লুণ্ঠন চালায়। রায় নগরীকে বিরানভূমিতে পরিণত করে। এরপর তারা সাওয়া শহরে গিয়ে একই রকম কার্যকলাপ চালায়। এরপর তেহরানের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত কম শহরে (এটি ইরানের একটি শহর Qom) এরপর কাশান শহরে আক্রমণ করে শহর দুটিকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে। এরপর হামাদান শহরে একই রকম কার্যকলাপ শেষে নিরাপদে চেঙ্গিজ খানের দরবারে ফিরে যায়।
মাত্র তিন হাজার তাতারী স্বল্প সময়ে যা আমরা উল্লেখ করলাম, তা সমাধা করে!!
আল্লাহ তা'আলা মুসলমানদের চোখে তাতারীদের অধিকসংখ্যকরূপে তুলে ধরেছিলেন এবং তাতারীদের চোখে মুসলমানদের সংখ্যা স্বল্পরূপে উপস্থাপন করেছিলেন। ফলে তাতারীত্রাস বিকট আকার ধারণ করেছিল। আর তাতারীদের অন্তর থেকে মুসলমানদের ভয়ভীতি দূর হয়ে গিয়েছিল।