📄 প্রথম ঘটনা
তাতারী বাহিনী রাশিয়া ভূখণ্ডে প্রবেশ করে এবং বহু প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করে। কিন্তু তারা রাশিয়ার সীমান্ত অঞ্চলে বুলগার অঞ্চলের একদল রাশিয়ানের মুখোমুখি হয়। দু-দলের মাঝে বিকট যুদ্ধ সংঘটিত হয়। তাতারী বাহিনী প্রথমবারের মতো এ অঞ্চলে পরাজিত হয়। যুদ্ধে বহুসংখ্যক তাতারী নিহত হয়। রাশিয়া ভূখণ্ডে তাতারীরা থমকে দাঁড়ায়। তাদের সৈন্যসংখ্যা হ্রাস পায়। এটা ছিল মুসলমানদের মোক্ষম সুযোগ। এ সুযোগে মুসলমানরা নিজেদের ছত্রভঙ্গ বাহিনীকে নতুনভাবে সাজাতে পারত। কারণ, তখন তাতারীরা বুলগায় পরাজিত হয়ে হীনম্মন্যতায় ভুগছিল।
📄 তা কাম্য ছিল, তবে বাস্তবায়িত হয়নি
তবে যা ঘটেছে, তা হলো, এ অঞ্চলের জনৈক মুসলিম আমীর তার সেনাবাহিনী নিয়ে জুজিয়া অঞ্চলের ওপর আক্রমণ করে। এই মুসলিম আমীর মূসা ইবনে আদেলের অধীনস্থ ছিল। যিনি বহু উপত্যকার রাজা ছিলেন। (তিনি কুর্দী ছিলেন, ইরাকের উত্তরাঞ্চল শাসন করতেন।) ঘটনাটি বড়ই বিস্ময়কর। কারণ, যদিও জুজিয়াবাসী ও মুসলমানদের মাঝে টানা যুদ্ধ লেগে থাকত, তবে সম্প্রতি তারা যুদ্ধবিরতি পালন করছিল। উপরন্তু তাতারী আক্রমণ প্রতিহত করতে নিজেদের যুদ্ধবিরতি করাই সময়ের দাবি ছিল। কারণ, জুজিয়াবাসীও তাতারীদের ঘৃণা করত। মুসলমানদের মতো তারাও তাতারীত্রাসে তটস্থ ছিল। তাই মুসলমানদের জন্য সময় উপযোগী পদক্ষেপ হতো তাতারীদের বিরুদ্ধে জুজিয়াবাসীর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়া কিংবা কমপক্ষে জুজিয়াবাসীকে যুদ্ধ থেকে বিরত রাখা। যাতে অন্যত্র যুদ্ধ করে মুসলমানদের শক্তি নিঃশেষ না হয়। অধিকন্তু জুজিয়াবাসী এসব অঞ্চল সম্পর্কে সম্যক অবহিত। ফলে যদি কোনোভাবে তাতারীরা জুজিয়াবাসীকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়, তাহলে মুসলমানরা বড় বিপদে পতিত হবে!
মুসলমানগণ এমন বিপদসংকুল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে, যাকে আমরা ‘রাজনৈতিক সংকট’ নামে অভিহিত করতে পারি। তারা সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি, রণকৌশল, বিশুদ্ধ লক্ষ্য ও একতা হারিয়ে ফেলেছিল। মুসলমানদের অবস্থা হয়েছিল অসামঞ্জস্যশীল, অস্থিতিশীল ও অপরিপক্ব।
জুজিয়াবাসীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন যুদ্ধ চলার কারণে উভয় দলের বহুসংখ্যক সৈন্য নিহত হয়। তাতারীদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ভরসাও তারা হারিয়ে ফেলে। ফলে কল্যাণকর পদক্ষেপ গ্রহণে দৃঢ়সংকল্প হওয়া অতি সহজ ছিল না। তাদের মনোবলহীনতার বড় কারণ ছিল এটি। যুদ্ধ বন্ধ হলো। নতুনভাবে সন্ধিচুক্তিও হলো বটে; তবে বহু পরে, যখন উভয়দল মৃত্যুর পথযাত্রী!!
📄 দ্বিতীয় ঘটনা
এ যাত্রায় তাতারীদের পরাজয়ের কারণ হলো, মুহাম্মদ ইবনে খাওয়ারেযম শাহের সন্তান, হিন্দুস্তান অভিমুখে পলায়নকারী জালাল উদ্দীন ইবনে মুহাম্মদ ইবনে খাওয়ারেযম শাহের ভাই গিয়াশ উদ্দীন ইবনে মোহাম্মদ ইবনে খাওয়ারেযম শাহের আবির্ভাব।
গিয়াস উদ্দীন সৈন্যবাহিনীকে নতুন ধাঁচে ঢেলে সাজায়। রায়, ইস্পাহান, এমনকি ইরানের দক্ষিণে অবস্থিত কিরমান অঞ্চল পর্যন্ত তার ক্ষমতা বিস্তৃত হয়। তখনো তাতারীরা কিরমান অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছেনি। ফলে ইরানের দক্ষিণ ও উত্তর পশ্চিমাঞ্চল গিয়াশ উদ্দীনের কর্তৃত্বে চলে আসে। তবে পূর্ব ও পূর্ব উত্তরাঞ্চল তখনো (তথা গোটা খোরাসান ভূমি) তাতারীদের দখলেই ছিল। এভাবেই গিয়াস উদ্দীন তাতারীদের ও আব্বাসী খেলাফতের সম্মুখে বন্ধকপাট ও দুর্ভেদ্য প্রাচীরে পরিণত হন।
তৎকালীন আব্বাসী খলীফা নাছের লি ফি দীনিল্লাহ এসব অঞ্চলে গিয়াশ উদ্দীনের প্রভাব-প্রতিপত্তি বদ্ধমূল করার জন্য সহযোগিতা করবেন, এটাই সকলের প্রত্যাশা ছিল। এটাও প্রত্যাশা ছিল যে, তিনি খাওয়ারেযম সাম্রাজ্য আব্বাসী খেলাফতের মধ্যকার দীর্ঘদিনের মতভেদকে ভুলে যাবেন। কারণ, এখন দলমত নির্বিশেষে সকলে এক শক্তিধর শত্রুর মুখোমুখি — তা হলো, তাতারী বাহিনী।
যদিও দ্বীন হেফাজত, ভ্রাতৃত্ব রক্ষা কিংবা মুসলমানদের সহযোগিতার জন্য এই প্রত্যাশা ছিল না; তবে অত্র অঞ্চলে গিয়াশ উদ্দীনের ক্ষমতাকে নির্ভেজাল করার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ রণকৌশল অনস্বীকার্য বিধায় আব্বাসী খলীফা নাছের লি দীনিল্লাহর কাছে এই সহযোগিতা ছিল বহু কাঙ্ক্ষিত। কারণ, গিয়াশ উদ্দীনই তাতারীদের মুখোমুখি হতে পারেন। যদি তাতারীরা গিয়াশ উদ্দীনকে পরাজিত করতে পারে, তাহলে তাতারীদের দ্বিতীয় চারণক্ষেত্র হবে আব্বাসী খেলাফত!! কিন্তু আব্বাসী খলিফা 'নাছের লি দীনিল্লাহ' এই সহযোগিতা প্রদানের প্রয়োজন অনুভব করেননি। তিনি রাজনৈতিক সংকটকে খুব ভয় পেয়েছিলেন। ইতিহাসবিদদের ভাষায় তিনি ছিলেন, স্বৈরাচার জালেম শাসক। তিনি প্রজাদের ওপর শুল্ক-ট্যাক্স নির্ধারণ করেছিলেন। জনগণের আয়ের প্রতিটি উৎসের ওপর কর বসিয়েছিলেন।
আনন্দ-উল্লাস, খেল-তামাশা, প্রাণী শিকার ইত্যাদি মনোরঞ্জনকর অনুষ্ঠানের প্রতি তিনি গুরুত্বারোপ করতেন। তার খেলাফতকালে সর্বত্র ফেতনা-ফ্যাসাদ ছড়িয়ে পড়েছিল। পণ্যমূল্য ঊর্ধ্বগতিতে বৃদ্ধি পেয়েছিল। বেতন-ভাতা হ্রাস পেয়েছিল। তিনি সংঘটিত ঘটনাবলি বা আসন্ন প্রেক্ষাপট নিয়ে সর্বদা গভীর চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজন উপলব্ধি করতেন না। তৎকালে সংঘটিত কোনো ঘটনার ব্যাপারে তিনি নিশ্চিন্ত মনোভাব পোষণ করতেন না।
📄 খলীফা নাছের লি দীনিল্লাহ যা করলেন
তিনি খাওয়ারেযম সাম্রাজ্যের মধ্যকার পুরোনো বিরোধ ভুলে যাননি। তিনি তাতারীত্রাসের কথা ভুলে গিয়ে সুলতান গিয়াস উদ্দীনের ক্ষমতাকে ভেঙে চুরমার করে দিতে চাইলেন। তিনি গিয়াশ উদ্দীনের মামা ইগান তাইসীর কাছে পত্র প্রেরণ করেন। ইগান তাইসী ছিলেন মহৎ ব্যক্তি। রণক্ষেত্রে তিনি ছিলেন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন। তিনি ছিলেন গিয়াশ উদ্দীনের সেনাপ্রধান। গিয়াশ উদ্দীন তার পরামর্শ ব্যতীত কোনো বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন না। খলিফা 'নাছের লি দীনিল্লাহ' পত্রযোগে তাকে গিয়াশ উদ্দীনের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতে উৎসাহিত করেন এবং তাকে রাজত্বের লোভ দেখিয়ে প্ররোচিত করেন। এভাবে খলিফা নাছের লি দীনিল্লাহ ইগান তাইসীর বন্ধুত্ব লাভ করেন এবং গিয়াস উদ্দীনকে অঞ্চল থেকে বিতাড়িত করেন। কিন্তু পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে তাতারী ফেতনা যে বিকট আকার ধারণ করছে তা তাকে সামান্যতম বিচলিত করেনি।
বিষয়টি ইগান তাইসীকে মুগ্ধ করল। বিষয়টি বহু আগ থেকে তার মাথায় ঘোরপাক খাচ্ছিল। খলিফা নাছের তাকে পত্র প্রেরণ করলে এবং সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি প্রদান করলে তার সংকল্প দৃঢ় হয়। সে কতিপয় সেনাপতিকে এ বিষয়ে লোভ দেখায়। ধীরে ধীরে যখন তার শক্তি-সামর্থ্য ও অনুসারী বৃদ্ধি পায়, তখন সে গিয়াশ উদ্দীনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। সঙ্গীদের সঙ্গে নিয়ে সে বিপর্যয় সৃষ্টি করে। যোগাযোগব্যবস্থা ছিন্ন করে দেয়, শহর-জনপদের ধন-সম্পত্তি লুট করতে থাকে। কিন্তু মানুষ উপলব্ধি করতে পারেনি এই ধ্বংসযজ্ঞ কোত্থেকে আসছে? মুসলিম বাহিনীর পক্ষ থেকে নাকি বর্বর তাতারীদের পক্ষ থেকে?! উগ্রপন্থি বিপর্যয় সৃষ্টিকারী অসংখ্য মানুষ ইগান তাইসীর সঙ্গে মিলিত হয়।
তখনো তাতারীরা বহু দূরে অবস্থান করছিল। অজ্ঞতার ঘোরে নিমজ্জিত খলিফা নাছের অত্যাসন্ন মহা বিপর্যয় দেখেও সন্তুষ্ট ছিলেন। ইগান তাইসী ভাগ্নে গিয়াশ উদ্দীনের সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
দুই মুসলিম দল যুদ্ধে মুখোমুখি হয়। উভয় দলের মাঝে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মুসলমানের হাতে অসংখ্য মুসলমান নিহত হয়। যুদ্ধে ইগান তাইসী পরাজিত হয়। তার দলের অধিক সৈন্য নিহত হয়। অবশিষ্টরা বন্দী হয়। ইগান তাইসী তার কতিপয় সৈন্যসহ লাঞ্ছনার পরাজয় মাথায় নিয়ে পালিয়ে আযারবাইজান চলে যায়। লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ!
ইমাম মুসলিম ও তিরমিযী রহ. হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ রা.-এর সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
إِنَّ الشَّيْطَانَ قَدْ أَيِسَ أَنْ يَعْبُدَهُ الْمُصَلُّونَ فِي جَزِيرَةِ الْعَرَبِ، وَلَكِنْ فِي التَّحْرِيشِ بَيْنَهُمْ
"শয়তান এ বিষয়ে নিরাশ হয়েছে যে, মুসল্লীরা তার ইবাদত করবে। তবে তাদের মাঝে ফেতনা সৃষ্টির ব্যাপারে সে হতাশ হয়নি।” মুসলিম শরীফের বর্ণনায় "আরব ভূখণ্ড” শব্দ অতিরিক্ত এসেছে।
তৎকালীন মুসলমানদের অভ্যন্তরীণ লড়াই ও দ্বন্দ্ব-সংঘাত দেখে বিস্মিত হওয়ার কিছুই নেই। মুসলিম উম্মাহর এই মহাসংকট ছিল চিরবাস্তব। সম্প্রতি আমরা মুসলমানদের পরস্পর দ্বন্দ্ব-লড়াই দেখতে পাই। অথচ মুসলমানগণ চরম সংকটাপন্ন। তবু খুব কমসংখ্যক মুসলমানই এই সংকটাপন্ন পরিস্থিতি দেখে বিচলিত হয়!!
মিশর ও সুদানের বিরোধ কিংবা লিবিয়া ও আফ্রিকার প্রদেশ 'চাদের' মধ্যকার বিরোধ, মাগরিব ও পশ্চিমা মরুভূমির উপত্যকাসমূহের মধ্যকার বিরোধ, সেনেগাল ও সেনেগাল নদীর তীরে অবস্থিত মৌরিতানিয়া দেশের মধ্যকার বিরোধ, সৌদি আরব ও ইয়েমেনের মধ্যকার বিভেদ, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরানের মধ্যকার বিভাজন, সিরিয়া ও তুরস্কের মধ্যকার বিরোধ; এছাড়াও অন্য মুসলিম দেশসমূহের মধ্যকার বিভেদসমূহ খুব কমসংখ্যক লোককেই আতঙ্কিত করে? ইরাক ও ইরান যুদ্ধে মুসলমানদের ক্ষয়-ক্ষতির কথা আমাদের সবারই জানা। ইরাক ও কুয়েত যুদ্ধের কথাও আমাদের অজানা নয়। মুসলিম উম্মাহর এ সকল বিভেদ-বিভাজন মুসলিম ভূখণ্ডের জন্য বড় ঝুঁকিপূর্ণ। অশুভ কালো থাবার পূর্বাভাস। দৈনন্দিন পত্রিকার পাতা খুললেই ভেসে ওঠে ফিলিস্তিন, ইরাক, শিশান, কাশ্মীর, সুদান, আলজেরিয়া, নাইজেরিয়া, সুমাল ও অন্যান্য দেশের মুসলিম-নিধনের নির্মম হত্যাযজ্ঞ। গগন-জাগানিয়া আহাজারি! অথচ আমরা অধিকাংশ এসব সংবাদ নিত্যদিনের স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে পাঠ করি। আমাদের মাঝে না কোনো যন্ত্রণা কাজ করে আর না আমরা সামান্যতম ব্যথিত হই। আমাদের মতোই তৎকালীন মুসলিমবিশ্বের মুসলমানরাও অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত মুসলিম-নিধনের ঘটনাগুলো বোধ ও চেতনাহীনভাবে শ্রবণ করত। এতে তারা না ব্যথিত হতো, না অন্তর্দহনে ভুগত। এসব ঘটনা কাছের দূরের কাউকেই ভাবিয়ে তুলত না। সত্যিই এ ছিল দুঃখজনক ও অনাকাঙ্ক্ষিত। আহ! সবাই কেবল নিজেকে নিয়ে ব্যতিব্যস্ত ছিল। আহ! তারা কেবল নিজের জীবন ও আত্মীয়-স্বজনের জীবন নিয়ে ভাবত! অপর ভাই নির্মমভাবে নিহত হলেও চোখ তুলে তাকাত না! কারও ঘর-বাড়ি ধ্বংস হলে, কারও স্ত্রী চুরি হলে কিংবা কারও ভূমি লুণ্ঠিত হলেও কেউ তাদের প্রতি দয়ার দৃষ্টিতে তাকাত না। সার্বিক বিবেচনায় সত্যিই এ ছিল চরম হতাশার ও দুঃখজনক। ইসলামের বিচারে ভ্রাতৃত্ব বিবেচনায় এমনকি মানবতার বিচারে এ ছিল মুসলিম উম্মাহর চরম অধঃপতন! লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ!