📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 ৬২০ হিজরীতে তাতারীদের অবস্থান

📄 ৬২০ হিজরীতে তাতারীদের অবস্থান


তাতারী সম্রাট চেঙ্গিজ খান খাওয়ারেযম সাম্রাজ্যে নিজ প্রভাব বিস্তরকরত রাশিয়া অঞ্চলে একের পর এক আক্রমণ করছিল। এ বছর পরপর চারটি দুর্ঘটনা ঘটে। ঘটনাগুলো তৎকালীন মুসলমানদের সার্বিক পরিস্থিতির বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরে। অনুরূপ এ কথার বর্ণনাও দেয় যে, তাতারীরা কীভাবে এই সুবিশাল অঞ্চল অতি অল্প সময়ে দখল করল?

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 প্রথম ঘটনা

📄 প্রথম ঘটনা


তাতারী বাহিনী রাশিয়া ভূখণ্ডে প্রবেশ করে এবং বহু প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করে। কিন্তু তারা রাশিয়ার সীমান্ত অঞ্চলে বুলগার অঞ্চলের একদল রাশিয়ানের মুখোমুখি হয়। দু-দলের মাঝে বিকট যুদ্ধ সংঘটিত হয়। তাতারী বাহিনী প্রথমবারের মতো এ অঞ্চলে পরাজিত হয়। যুদ্ধে বহুসংখ্যক তাতারী নিহত হয়। রাশিয়া ভূখণ্ডে তাতারীরা থমকে দাঁড়ায়। তাদের সৈন্যসংখ্যা হ্রাস পায়। এটা ছিল মুসলমানদের মোক্ষম সুযোগ। এ সুযোগে মুসলমানরা নিজেদের ছত্রভঙ্গ বাহিনীকে নতুনভাবে সাজাতে পারত। কারণ, তখন তাতারীরা বুলগায় পরাজিত হয়ে হীনম্মন্যতায় ভুগছিল।

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 তা কাম্য ছিল, তবে বাস্তবায়িত হয়নি

📄 তা কাম্য ছিল, তবে বাস্তবায়িত হয়নি


তবে যা ঘটেছে, তা হলো, এ অঞ্চলের জনৈক মুসলিম আমীর তার সেনাবাহিনী নিয়ে জুজিয়া অঞ্চলের ওপর আক্রমণ করে। এই মুসলিম আমীর মূসা ইবনে আদেলের অধীনস্থ ছিল। যিনি বহু উপত্যকার রাজা ছিলেন। (তিনি কুর্দী ছিলেন, ইরাকের উত্তরাঞ্চল শাসন করতেন।) ঘটনাটি বড়ই বিস্ময়কর। কারণ, যদিও জুজিয়াবাসী ও মুসলমানদের মাঝে টানা যুদ্ধ লেগে থাকত, তবে সম্প্রতি তারা যুদ্ধবিরতি পালন করছিল। উপরন্তু তাতারী আক্রমণ প্রতিহত করতে নিজেদের যুদ্ধবিরতি করাই সময়ের দাবি ছিল। কারণ, জুজিয়াবাসীও তাতারীদের ঘৃণা করত। মুসলমানদের মতো তারাও তাতারীত্রাসে তটস্থ ছিল। তাই মুসলমানদের জন্য সময় উপযোগী পদক্ষেপ হতো তাতারীদের বিরুদ্ধে জুজিয়াবাসীর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়া কিংবা কমপক্ষে জুজিয়াবাসীকে যুদ্ধ থেকে বিরত রাখা। যাতে অন্যত্র যুদ্ধ করে মুসলমানদের শক্তি নিঃশেষ না হয়। অধিকন্তু জুজিয়াবাসী এসব অঞ্চল সম্পর্কে সম্যক অবহিত। ফলে যদি কোনোভাবে তাতারীরা জুজিয়াবাসীকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়, তাহলে মুসলমানরা বড় বিপদে পতিত হবে!
মুসলমানগণ এমন বিপদসংকুল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে, যাকে আমরা ‘রাজনৈতিক সংকট’ নামে অভিহিত করতে পারি। তারা সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি, রণকৌশল, বিশুদ্ধ লক্ষ্য ও একতা হারিয়ে ফেলেছিল। মুসলমানদের অবস্থা হয়েছিল অসামঞ্জস্যশীল, অস্থিতিশীল ও অপরিপক্ব।
জুজিয়াবাসীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন যুদ্ধ চলার কারণে উভয় দলের বহুসংখ্যক সৈন্য নিহত হয়। তাতারীদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ভরসাও তারা হারিয়ে ফেলে। ফলে কল্যাণকর পদক্ষেপ গ্রহণে দৃঢ়সংকল্প হওয়া অতি সহজ ছিল না। তাদের মনোবলহীনতার বড় কারণ ছিল এটি। যুদ্ধ বন্ধ হলো। নতুনভাবে সন্ধিচুক্তিও হলো বটে; তবে বহু পরে, যখন উভয়দল মৃত্যুর পথযাত্রী!!

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 দ্বিতীয় ঘটনা

📄 দ্বিতীয় ঘটনা


এ যাত্রায় তাতারীদের পরাজয়ের কারণ হলো, মুহাম্মদ ইবনে খাওয়ারেযম শাহের সন্তান, হিন্দুস্তান অভিমুখে পলায়নকারী জালাল উদ্দীন ইবনে মুহাম্মদ ইবনে খাওয়ারেযম শাহের ভাই গিয়াশ উদ্দীন ইবনে মোহাম্মদ ইবনে খাওয়ারেযম শাহের আবির্ভাব।
গিয়াস উদ্দীন সৈন্যবাহিনীকে নতুন ধাঁচে ঢেলে সাজায়। রায়, ইস্পাহান, এমনকি ইরানের দক্ষিণে অবস্থিত কিরমান অঞ্চল পর্যন্ত তার ক্ষমতা বিস্তৃত হয়। তখনো তাতারীরা কিরমান অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছেনি। ফলে ইরানের দক্ষিণ ও উত্তর পশ্চিমাঞ্চল গিয়াশ উদ্দীনের কর্তৃত্বে চলে আসে। তবে পূর্ব ও পূর্ব উত্তরাঞ্চল তখনো (তথা গোটা খোরাসান ভূমি) তাতারীদের দখলেই ছিল। এভাবেই গিয়াস উদ্দীন তাতারীদের ও আব্বাসী খেলাফতের সম্মুখে বন্ধকপাট ও দুর্ভেদ্য প্রাচীরে পরিণত হন।
তৎকালীন আব্বাসী খলীফা নাছের লি ফি দীনিল্লাহ এসব অঞ্চলে গিয়াশ উদ্দীনের প্রভাব-প্রতিপত্তি বদ্ধমূল করার জন্য সহযোগিতা করবেন, এটাই সকলের প্রত্যাশা ছিল। এটাও প্রত্যাশা ছিল যে, তিনি খাওয়ারেযম সাম্রাজ্য আব্বাসী খেলাফতের মধ্যকার দীর্ঘদিনের মতভেদকে ভুলে যাবেন। কারণ, এখন দলমত নির্বিশেষে সকলে এক শক্তিধর শত্রুর মুখোমুখি — তা হলো, তাতারী বাহিনী।
যদিও দ্বীন হেফাজত, ভ্রাতৃত্ব রক্ষা কিংবা মুসলমানদের সহযোগিতার জন্য এই প্রত্যাশা ছিল না; তবে অত্র অঞ্চলে গিয়াশ উদ্দীনের ক্ষমতাকে নির্ভেজাল করার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ রণকৌশল অনস্বীকার্য বিধায় আব্বাসী খলীফা নাছের লি দীনিল্লাহর কাছে এই সহযোগিতা ছিল বহু কাঙ্ক্ষিত। কারণ, গিয়াশ উদ্দীনই তাতারীদের মুখোমুখি হতে পারেন। যদি তাতারীরা গিয়াশ উদ্দীনকে পরাজিত করতে পারে, তাহলে তাতারীদের দ্বিতীয় চারণক্ষেত্র হবে আব্বাসী খেলাফত!! কিন্তু আব্বাসী খলিফা 'নাছের লি দীনিল্লাহ' এই সহযোগিতা প্রদানের প্রয়োজন অনুভব করেননি। তিনি রাজনৈতিক সংকটকে খুব ভয় পেয়েছিলেন। ইতিহাসবিদদের ভাষায় তিনি ছিলেন, স্বৈরাচার জালেম শাসক। তিনি প্রজাদের ওপর শুল্ক-ট্যাক্স নির্ধারণ করেছিলেন। জনগণের আয়ের প্রতিটি উৎসের ওপর কর বসিয়েছিলেন।
আনন্দ-উল্লাস, খেল-তামাশা, প্রাণী শিকার ইত্যাদি মনোরঞ্জনকর অনুষ্ঠানের প্রতি তিনি গুরুত্বারোপ করতেন। তার খেলাফতকালে সর্বত্র ফেতনা-ফ্যাসাদ ছড়িয়ে পড়েছিল। পণ্যমূল্য ঊর্ধ্বগতিতে বৃদ্ধি পেয়েছিল। বেতন-ভাতা হ্রাস পেয়েছিল। তিনি সংঘটিত ঘটনাবলি বা আসন্ন প্রেক্ষাপট নিয়ে সর্বদা গভীর চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজন উপলব্ধি করতেন না। তৎকালে সংঘটিত কোনো ঘটনার ব্যাপারে তিনি নিশ্চিন্ত মনোভাব পোষণ করতেন না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00