📄 হামাদান ও আরদাবীল আক্রমণ
হামাদান ও আরদাবীল বর্তমান ইরাকের আওতাভুক্ত শহর। তাতারীরা হামাদান শহর অবরোধ করে রাখে। অবরুদ্ধ শহরবাসীর খাদ্যদ্রব্য শেষ হয়ে গেলে তাদের ওপর আক্রমণ চালায়। উভয় দলের মাঝে এক বিরাট রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়। তবে অবশেষে তাতারীরাই জয়লাভ করে। তারা শহরে রক্তের বন্যা বইয়ে দেয়। ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে ছাই করে দেয়। এরপর আরদাবিল শহরে গিয়ে একই ঘটনা পুনরাবৃত্তি ঘটায়।
📄 তিবরিয় অভিমুখে তাতারী হামলা
তিবরিয ইরানের একটি বড় শহর। তাতারীরা এবার তিবরিয অভিমুখে রওয়ানা হয়। ইতিপূর্বে তাতারীরা হাড়-ভাঙা শীতকালে তিবরিয শহরে এসে শহরের যাবতীয় সম্পত্তি ছিনতাই করে। তবে প্রচণ্ড ঠাণ্ডার কারণে যুদ্ধ বিরত থাকে। আউযবেক ইবনে বাহলাওয়ান হলেন এই শহরের বাদশা। এখন আবহাওয়া অনুকূলের কারণে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করতে তাতারীদের কোনো বাধা নেই।
পথিমধ্যে তাতারীরা একটি নতুন সংবাদ পেয়ে থমকে দাঁড়ায়। তারা জানতে পারে, আউযবেক ইবনে বাহলাওয়ানের পরিবর্তে তিবরিযের নেতৃত্ব গ্রহণ করেছেন শামছুদ্দীন তাগরাই। তিনি ছিলেন বীর মুজাহিদ। দ্বীন ও দুনিয়া সম্পর্কে তার জ্ঞান ছিল অগাধ। তিনি জনসাধারণকে জিহাদের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে উৎসাহিত করেন। তাদের মনোবল চাঙা করেন। ভীরুতা ও লাঞ্ছনার অশুভ পরিণাম সম্পর্কে তাদের সতর্ক করেন। তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞান শিক্ষার পরিবর্তে বাস্তবজীবনের কার্যকরী শিক্ষা দান করেন। তিনি তাদের শিক্ষা দেন, মানুষ কখনোই তার নির্দিষ্ট মৃত্যুক্ষণের পূর্বে ইন্তেকাল করে না। জন্মের পূর্বেই মানুষের রিজিক ও মৃত্যুক্ষণ নির্ধারিত হয়। আর মুসলমানরা তাতারীত্রাসে যতই পলায়ন করুক, তাতারীরা তাদের পিছু ছাড়বে না। তাতারীত্রাস থেকে মুসলমানগণ তখনই রক্ষা পাবে, যখন তারা তলোয়ার ও ঢালের আশ্রয় নেবে। আর যুদ্ধের প্রস্তুতি ব্যতীত ভূপৃষ্ঠে হক সুরক্ষিত থাকে না।
তিবরিযবাসীর অন্তরে আত্মমর্যাদাবোধ জাগ্রত হয়। তারা তাদের মহান নেতার নেতৃত্বে দেশ রক্ষার জন্য দাঁড়িয়ে যায়। শহরের বেড়িবাঁধ সংস্করণ করে। খন্দক খনন করে। যুদ্ধের সরঞ্জামাদি প্রস্তুত করে। বহু বেরিকেড নির্মাণ করে। সুবিন্যস্ত কাতার সাজায়। দীর্ঘকাল পরে মুসলিম সম্প্রদায় জিহাদের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন।
ইতিমধ্যে তাতারীরা মুসলমানদের জিহাদের প্রস্তুতি ও ব্যাপক সৈন্যবাহিনী সম্পর্কে অবগত হয়। তারা 'নাড়ায়ে তাকবীর' শ্লোগানে মুখরিত জিহাদের ডাক শোনে! কারও কারও ধারণা ছিল, সঙ্ঘবদ্ধ তাতারী বাহিনী তিবরিয মূলোৎপাটনের দৃঢ় প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করেছে। তাদের মাঝে ক্রোধ ও ঘৃণা উথলে উঠেছে। তারা দীপ্তকণ্ঠে এগিয়ে আসছে।
কক্ষনো নয়; এমন হতে পারে না!!
তারা তিবরিয আক্রমণের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে। জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহর পতাকাবাহী দলের সঙ্গে যুদ্ধে না নামার সিদ্ধান্ত নেয়। আল্লাহ তা'আলা তিবরিযবাসীর ভয় তাদের অন্তরে ঢেলে দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আল্লাহ তা'আলা ভয়ের মাধ্যমে সহযোগিতা করেছিলেন। অনুরূপ যারাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আদর্শ গ্রহণ করবে, তাদের ভয়ের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা সহযোগিতা করবেন। আল্লাহ তা'আলা জিহাদকে বহু কাঙ্ক্ষিত ও কার্যকরী সাব্যস্ত করেছেন। যদি কোনো সম্প্রদায় জিহাদ নাও করে, অন্তরে জিহাদে শরিক হওয়ার একনিষ্ঠ নিয়ত রাখার পাশাপাশি যথাসাধ্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে, এতেই আল্লাহর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হবে। তা হলো 'শত্রুর অন্তরে ভীতি সঞ্চার'।
وَأَعِدُّوا لَهُمْ مَا اسْتَطَعْتُمْ مِنْ قُوَّةٍ وَمِنْ رِبَاطِ الْخَيْلِ তُرْهِبُونَ بِهِ عَدُوَّ اللَّهِ وَعَدُوَّكُمْ وَآخَرِينَ مِنْ دُونِهِمْ لَا تَعْلَمُونَهُمُ اللَّهُ يَعْلَمُهُمْ وَمَا تُنْفِقُوا مِنْ شَيْءٍ فِي سَبِيلِ اللَّهِ يُوَفَّ إِلَيْكُمْ وَأَنْتُمْ لَا تُظْلَمُونَ
“(হে মুসলিমগণ,) তোমরা তাদের মোকাবেলার জন্য যথাসাধ্য শক্তি ও অশ্ব-ছাউনী প্রস্তুত করো, যা দ্বারা তোমরা আল্লাহর শত্রু ও নিজেদের (বর্তমান) শত্রুদের সন্ত্রস্ত করে রাখবে এবং তাদের ছাড়া সেইসব লোককেও যাদের তোমরা এখনো জানো না (কিন্তু) আল্লাহ জানেন। তোমরা আল্লাহর পথে যা কিছু ব্যয় করবে তা তোমাদের পরিপূর্ণরূপে দেওয়া হবে এবং তোমাদের কিছু কম দেওয়া হবে না।”২৯
এটি হলো মেঘাচ্ছন্ন আকাশের আড়ালে আলোকময় সূর্যের হাতছানি। আল্লাহ তা'আলা শাসছুদ্দীন তাগরাই রহ.কে অশেষ রহমত দান করুন, যিনি তিবরিয শহরে দ্বীন ইসলামকে পুনর্জীবন দান করেছেন।
টিকাঃ
২৯ সুরা আনফাল: ৬০।
📄 বিলকান আক্রমণ
বিলকান বর্তমান ইরানের একটি অন্যতম শহর। আফসোস! বিলকানবাসী তিবরিযবাসীর আদর্শ গ্রহণ করতে পারেনি। তাতারীরা ৬১৮ হিজরীর রমজান মাসে বিলকান আক্রমণ করে। নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ কারও প্রতিই এই পশুরা কোনো দয়া করেনি। যাকে পেয়েছে, তাকেই হত্যা করেছে। ইবনে আছীর রহ. বলেন—
“তারা পাগলদের পর্যন্ত হত্যা করেছে। পেট ফেড়ে গর্ভের সন্তান পর্যন্ত হত্যা করেছে। মহিলাদের সঙ্গে কুকর্মে লিপ্ত হয়েছে। মনোরঞ্জন শেষে স্বভাব অনুযায়ী শহরের সব ধন-সম্পত্তি লুট করে আগুন জ্বালিয়ে তা ভস্ম করেছে। লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ!”
📄 কুনজা অভিমুখে তাতারী হামলা
তাতারী বাহিনী কুনজা অভিমুখে রওয়ানা হয়। কুনজাবাসী তিবরিযবাসীর আদর্শ গ্রহণ করে এবং তাতারীরা তাদের সঙ্গে তা-ই করল, যা করেছিল তিবরিযবাসীর সঙ্গে। কুনজাবাসী জিহাদের ঘোষণা দেয় এবং যথাসাধ্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে। ফলে একজন তাতারীও কুনজা শহরে প্রবেশ করেনি। এ শহর ছেড়ে অন্যত্র পলায়ন করে।
এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। যেই দেশ জিহাদের পতাকা হাতে তুলে নেয় এবং জিহাদের প্রস্তুতি গ্রহণ করে, তাতারী বাহিনী তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে ভয় পায়। এটা কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। এটি আল্লাহর অমোঘনীতি। যদি প্রত্যেক শহরবাসী এ কাজ করত, শুধু তাতারী নয়, বরং কেউই মুসলিম ভূখণ্ডের ওপর অপবিত্র পা ফেলার দুঃসাহস পেত না।
মুসলমানগণ বছরের পর বছর এই দেশগুলোকে শত্রুর আক্রমণ থেকে সুরক্ষিত রেখেছিল। সংখ্যাধিক্যের বলে নয়, অন্যের সঙ্গে সন্ধিচুক্তি করে নয়, বরং তারা এই ভূখণ্ডগুলোকে সংরক্ষিত রেখেছিল একনিষ্ঠ জিহাদ, পবিত্র রক্ত ও ইখলাছপূর্ণ পবিত্রাত্মার বিনিময়ে। আল্লাহর রীতি-নীতিতে কোনো পরিবর্তন ঘটে না; পরিবর্তন ঘটে বান্দার রীতিতে, বান্দার আমলে। আল্লাহ তা'আলা কারও প্রতি সামান্য জুলুম করেন না। কিন্তু মানুষ নিজেরাই নিজেদের প্রতি জুলুম করে।