📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 উত্তর ইরাক আক্রমণের সতর্কবাণী

📄 উত্তর ইরাক আক্রমণের সতর্কবাণী


তাতারীরা ইরাকের উত্তরে অবস্থিত আরবিল শহরে আক্রমণের চিন্তা করে। আরবিল শহরে 'তাতারী ত্রাস' ছড়িয়ে পড়ে। অনুরূপ আরবিল শহরের পশ্চিমে অবস্থিত 'মসুল' শহরেও তাতারীদের ভয় ছড়িয়ে পড়ে। কতিপয় শহরবাসী দেশ ছেড়ে পালাবার চিন্তা করে। তৎকালীন আব্বাসী খলিফা নাছের তাতারীদের আরবিল শহর থেকে ফিরিয়ে দিতে ভয় পান। ফলে শহরবাসী সবাই বাগদাদ অভিমুখে পালাতে শুরু করে। সবার পলায়নপর পরিস্থিতি দেখে খলিফার গভীর তন্দ্রা উড়ে যায়, যে তন্দ্রায় তিনি বিগত কয়েক বছর ডুবন্ত ছিলেন। তাদের পালাবার সংবাদ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।

আপনি কি জানেন, খলিফা কয়জন সেনাকে একত্রিত করতে পেরেছিলেন? খলিফা মাত্র আটশোজন সেনাকে একত্রিত করতে পেরেছিলেন!! আমি জানি না, মাত্র আটশো সৈন্য নিয়ে কীভাবে খলিফা নাছের (সাহায্যকারী) আল্লাহর দ্বীনকে সাহায্য করবেন? কোথায় শক্তিশালী বিশেষ ফোর্স? কোথায় খলিফার দেহরক্ষীরা? কোথায় তুর্কীবাহিনী? কোথায় জিহাদী প্রেরণা? খলিফা নাছের খলিফা ছিলেন না; মূলত তিনি বাহ্যিকভাবে খেলাফতের বেশভূষা অবলম্বন করেছিলেন অথবা ছিলেন খলিফার অপচ্ছায়া!!

সেনাপ্রধান মুজাফ্ফর উদ্দীন সামান্যসংখ্যক বাহিনী নিয়ে তাতারীদের মোকাবেলা করার সাহস পায়নি। তাই তিনি সেনাবাহিনীসহ পালাতে থাকেন। কিন্তু সুবহানাল্লাহ! অতি অল্পসংখ্যক বাহিনী দেখে তাতারীরা এটাকে এক ধরনের ধোঁকা মনে করে। মনে করে এরা অগ্রগামী সৈন্যদল। এটি বোধগম্য নয় যে, আব্বাসী খেলাফতের সৈন্যবাহিনীর সংখ্যা মাত্র আটশো। এ কারণেই তাতারীরা প্রত্যাগমনের সিদ্ধান্ত নেয়। এতে ইরাক শহর আরও কয়েক বছর জীবন লাভ করে।

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 তাতারী বাহিনী প্রত্যাগমনের কারণ

📄 তাতারী বাহিনী প্রত্যাগমনের কারণ


এখানে তাতারী বাহিনীর প্রত্যাগমনের কারণ উল্লেখ করা প্রয়োজন উপলব্ধি করছি। তৎকালীন খেলাফতে আব্বাসীর শক্তি সামর্থ্যের কথা শুনলে তাতারীদের গা ঝাঁকুনি দিত। আব্বাসী খেলাফতের শক্তি-সামর্থ্য ও শৌর্য-বীর্যের কথা কে না জানত? আব্বাসী খেলাফতের রয়েছে বিজয়গাথার এক গর্বিত সুদীর্ঘ ইতিহাস। তাতারীরা তো পৃথিবীর বুকে মাত্র কয়েক বছর রাজত্ব করেছে। পক্ষান্তরে আব্বাসী খেলাফত ইতিহাসের সুদীর্ঘ পাঁচশ বছরের। কাজেই তাতারীরা ইরাকের শক্তি সম্পর্কে বাস্তবতার অধিক জ্ঞান করত। এ কারণেই তারা মুখোমুখি সংঘর্ষ ছেড়ে 'ক্ষয়-যুদ্ধের' পথ বেছে নেয়।

ক্ষয়-যুদ্ধের পন্থা ছিল- ১. অতর্কিত হিংস্র আক্রমণ। ২. টানা দীর্ঘ অবরোধ। ৩. পার্শ্ববর্তী দেশ ও রাষ্ট্রসমূহের সঙ্গে ইরাকবিরোধী ঐক্য গঠন।

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 হামাদান ও আরদাবীল আক্রমণ

📄 হামাদান ও আরদাবীল আক্রমণ


হামাদান ও আরদাবীল বর্তমান ইরাকের আওতাভুক্ত শহর। তাতারীরা হামাদান শহর অবরোধ করে রাখে। অবরুদ্ধ শহরবাসীর খাদ্যদ্রব্য শেষ হয়ে গেলে তাদের ওপর আক্রমণ চালায়। উভয় দলের মাঝে এক বিরাট রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়। তবে অবশেষে তাতারীরাই জয়লাভ করে। তারা শহরে রক্তের বন্যা বইয়ে দেয়। ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে ছাই করে দেয়। এরপর আরদাবিল শহরে গিয়ে একই ঘটনা পুনরাবৃত্তি ঘটায়।

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 তিবরিয় অভিমুখে তাতারী হামলা

📄 তিবরিয় অভিমুখে তাতারী হামলা


তিবরিয ইরানের একটি বড় শহর। তাতারীরা এবার তিবরিয অভিমুখে রওয়ানা হয়। ইতিপূর্বে তাতারীরা হাড়-ভাঙা শীতকালে তিবরিয শহরে এসে শহরের যাবতীয় সম্পত্তি ছিনতাই করে। তবে প্রচণ্ড ঠাণ্ডার কারণে যুদ্ধ বিরত থাকে। আউযবেক ইবনে বাহলাওয়ান হলেন এই শহরের বাদশা। এখন আবহাওয়া অনুকূলের কারণে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করতে তাতারীদের কোনো বাধা নেই।

পথিমধ্যে তাতারীরা একটি নতুন সংবাদ পেয়ে থমকে দাঁড়ায়। তারা জানতে পারে, আউযবেক ইবনে বাহলাওয়ানের পরিবর্তে তিবরিযের নেতৃত্ব গ্রহণ করেছেন শামছুদ্দীন তাগরাই। তিনি ছিলেন বীর মুজাহিদ। দ্বীন ও দুনিয়া সম্পর্কে তার জ্ঞান ছিল অগাধ। তিনি জনসাধারণকে জিহাদের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে উৎসাহিত করেন। তাদের মনোবল চাঙা করেন। ভীরুতা ও লাঞ্ছনার অশুভ পরিণাম সম্পর্কে তাদের সতর্ক করেন। তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞান শিক্ষার পরিবর্তে বাস্তবজীবনের কার্যকরী শিক্ষা দান করেন। তিনি তাদের শিক্ষা দেন, মানুষ কখনোই তার নির্দিষ্ট মৃত্যুক্ষণের পূর্বে ইন্তেকাল করে না। জন্মের পূর্বেই মানুষের রিজিক ও মৃত্যুক্ষণ নির্ধারিত হয়। আর মুসলমানরা তাতারীত্রাসে যতই পলায়ন করুক, তাতারীরা তাদের পিছু ছাড়বে না। তাতারীত্রাস থেকে মুসলমানগণ তখনই রক্ষা পাবে, যখন তারা তলোয়ার ও ঢালের আশ্রয় নেবে। আর যুদ্ধের প্রস্তুতি ব্যতীত ভূপৃষ্ঠে হক সুরক্ষিত থাকে না।

তিবরিযবাসীর অন্তরে আত্মমর্যাদাবোধ জাগ্রত হয়। তারা তাদের মহান নেতার নেতৃত্বে দেশ রক্ষার জন্য দাঁড়িয়ে যায়। শহরের বেড়িবাঁধ সংস্করণ করে। খন্দক খনন করে। যুদ্ধের সরঞ্জামাদি প্রস্তুত করে। বহু বেরিকেড নির্মাণ করে। সুবিন্যস্ত কাতার সাজায়। দীর্ঘকাল পরে মুসলিম সম্প্রদায় জিহাদের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন।

ইতিমধ্যে তাতারীরা মুসলমানদের জিহাদের প্রস্তুতি ও ব্যাপক সৈন্যবাহিনী সম্পর্কে অবগত হয়। তারা 'নাড়ায়ে তাকবীর' শ্লোগানে মুখরিত জিহাদের ডাক শোনে! কারও কারও ধারণা ছিল, সঙ্ঘবদ্ধ তাতারী বাহিনী তিবরিয মূলোৎপাটনের দৃঢ় প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করেছে। তাদের মাঝে ক্রোধ ও ঘৃণা উথলে উঠেছে। তারা দীপ্তকণ্ঠে এগিয়ে আসছে।

কক্ষনো নয়; এমন হতে পারে না!!

তারা তিবরিয আক্রমণের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে। জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহর পতাকাবাহী দলের সঙ্গে যুদ্ধে না নামার সিদ্ধান্ত নেয়। আল্লাহ তা'আলা তিবরিযবাসীর ভয় তাদের অন্তরে ঢেলে দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আল্লাহ তা'আলা ভয়ের মাধ্যমে সহযোগিতা করেছিলেন। অনুরূপ যারাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আদর্শ গ্রহণ করবে, তাদের ভয়ের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা সহযোগিতা করবেন। আল্লাহ তা'আলা জিহাদকে বহু কাঙ্ক্ষিত ও কার্যকরী সাব্যস্ত করেছেন। যদি কোনো সম্প্রদায় জিহাদ নাও করে, অন্তরে জিহাদে শরিক হওয়ার একনিষ্ঠ নিয়ত রাখার পাশাপাশি যথাসাধ্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে, এতেই আল্লাহর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হবে। তা হলো 'শত্রুর অন্তরে ভীতি সঞ্চার'।

وَأَعِدُّوا لَهُمْ مَا اسْتَطَعْتُمْ مِنْ قُوَّةٍ وَمِنْ رِبَاطِ الْخَيْلِ তُرْهِبُونَ بِهِ عَدُوَّ اللَّهِ وَعَدُوَّكُمْ وَآخَرِينَ مِنْ دُونِهِمْ لَا تَعْلَمُونَهُمُ اللَّهُ يَعْلَمُهُمْ وَمَا تُنْفِقُوا مِنْ شَيْءٍ فِي سَبِيلِ اللَّهِ يُوَفَّ إِلَيْكُمْ وَأَنْتُمْ لَا تُظْلَمُونَ

“(হে মুসলিমগণ,) তোমরা তাদের মোকাবেলার জন্য যথাসাধ্য শক্তি ও অশ্ব-ছাউনী প্রস্তুত করো, যা দ্বারা তোমরা আল্লাহর শত্রু ও নিজেদের (বর্তমান) শত্রুদের সন্ত্রস্ত করে রাখবে এবং তাদের ছাড়া সেইসব লোককেও যাদের তোমরা এখনো জানো না (কিন্তু) আল্লাহ জানেন। তোমরা আল্লাহর পথে যা কিছু ব্যয় করবে তা তোমাদের পরিপূর্ণরূপে দেওয়া হবে এবং তোমাদের কিছু কম দেওয়া হবে না।”২৯

এটি হলো মেঘাচ্ছন্ন আকাশের আড়ালে আলোকময় সূর্যের হাতছানি। আল্লাহ তা'আলা শাসছুদ্দীন তাগরাই রহ.কে অশেষ রহমত দান করুন, যিনি তিবরিয শহরে দ্বীন ইসলামকে পুনর্জীবন দান করেছেন।

টিকাঃ
২৯ সুরা আনফাল: ৬০।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00