📄 বিস্তৃত আফগানিস্তান পতন অনেকগুলো দুর্যোগ ও দুর্ঘটনার কারণ
কেন আফগানিস্তান পতন মুসলিম উম্মাহর পতনের পথ রচনা করবে? কেন গোটা মুসলিম উম্মাহর জন্য বিধ্বংসী হাতে আফগানিস্তানের পতন ঘটবে? বস্তুত আফগানিস্তান পতন অনেকগুলো দুর্যোগ ও দুর্ঘটনার কারণ-
এক. যেকোনো সাম্রাজ্যের মজ্জাগত স্বভাব হলো, শত্রুপক্ষের আক্রমণকে সে প্রায় অসম্ভব মনে করে। আত্মনির্ভরতার এই মজ্জাগত স্বভাবই আফগানিস্তানের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহ অরক্ষিত হওয়ার কারণ। ফলে আফগানিস্তান পতনের সঙ্গে সঙ্গে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহ পতনের শিকার হয়। পরবর্তীতে পাকিস্তান, ইরান, ইরাক খুব সহজেই পতনের মুখ দেখে।
দুই. সমর-দক্ষতা ও উপযুক্ত রণভূমি হিসেবে আফগানিস্তান মুসলিমবিশ্বের মানচিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। কারণ, আফগানিস্তান এশিয়া মহাদেশের মধ্যভাগে অবস্থিত। যারাই আফগানিস্তান দখল করতে পারবে, অন্যান্য অঞ্চলের ওপর প্রভাব বিস্তারকরণ তাদের পক্ষে খুবই সহজ। শুধু ইরান ও পাকিস্তান নয়; বরং রাশিয়া-হিন্দুস্তানের মত গুরুত্বপূর্ণ দেশের এবং চীনের কিয়দাংশের ওপর তাদের পক্ষে প্রভাব বিস্তার করা খুবই সহজ। এ কারণে আফগানিস্তান দখল করার পর গোটা এশিয়া মহাদেশের ওপর প্রভাব ও কর্তৃত্ব বিস্তার করা সম্ভব।
তিন. সার্বিক দিক বিবেচনায় আফগানিস্তান তার ঘাঁটি ও উপত্যকাসমূহকে শক্তিশালী হিসেবে গড়ে তুলেছিল। কাজেই আফগানিস্তান পতন অন্য অঞ্চলসমূহের পতনের পথকে সহজ করেছিল।
চার. আফগানিস্তানবাসীও ইসলামী চেতনায় সমুন্নত ও জিহাদী প্রেরণায় ছিল উজ্জীবিত। তাই তারা সহজে অন্যের হস্তক্ষেপ ও আধিপত্য বিস্তার মেনে নিত না। পরপর দুই বার তাতারী বাহিনীর ওপর জয় লাভ একথার সুস্পষ্ট প্রমাণও বহন করে। কিন্তু মুসলিম বাহিনীর বিভক্তি-বিভাজন শত্রুপক্ষের প্রত্যাগমনের পথ সুগম করে দেয়।
পাঁচ. পূর্ব-বর্ণিত সকল প্রতিক্রিয়া ছাড়া সবচেয়ে ক্ষতিকর দিকটি হলো, আফগানিস্তান পতনের ফলে মুসলিম উম্মাহর মনোবলে নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি হয়। পক্ষান্তরে তাতারী বাহিনীর মনোবল চাঙা হয়। কাজেই একটি পরাজিত জাতি কী করে নতুনভাবে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াবে? কী করে সহজ জয়লাভ কামনা করতে পারে? এটি বাস্তবেই অসম্ভব!
এই বিজয়লাভের মাধ্যমে তাতারীরা চীন হয়ে কাজাকিস্তান, উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান অতঃপর ইরান, আযারবাইজান, আর্মেনিয়া ও জুজিয়ায় পৌঁছে যায়। তারা ইরাকের একদম কাছাকাছি পৌঁছে যায়। এ সকল ঘটনা মাত্র এক বছরেই তথা ৬১৭ হিজরীতে সংঘটিত হয়।
টিকাঃ
২৬. সুরা বাকারা: ২৫৯।
২৭. সুরা ইউনুস: ২৪।
২৮. বাইহাকী শরীফ: ১৩২, জামে মা' মার ইবনে রাশেদ: ২০২৬২।
📄 ৬১৮ হিজরীতে আযারবাইজান অভিমুখে তাতারী বাহিনীর পুনরাগমন
৬১৮ হিজরীতে তাতারী বাহিনী আযারবাইজানের দিকে ফিরে আসে এবং মারাগা শহরে প্রবেশ করে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, শহরটি একজন নারী পরিচালনা করত। জানি না কেন মুসলমানরা নিজেদের লাগাম একজন নারীকে প্রদান করেছিল! বিশেষত তৎকালীন ভয়ংকর মুহূর্তে। যদি কোনো রাষ্ট্রে নেতৃত্বযোগ্য পুরুষ না থাকে, তবে ভিন্ন কথা!!
তাতারীরা মারাগা শহর অবরোধ করে চারপাশে ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপন করে। চতুর্দিক থেকে শহরে আক্রমণ শুরু করে। ফলে শহরবাসী যুদ্ধের জন্য বেরিয়ে পড়ে। প্রথমত তাতারীরা বিভিন্ন দেশ থেকে বন্দী করে আনা মুসলমানদের ঢালস্বরূপ ব্যবহার করে। তাদের পক্ষে যুদ্ধ করতে বাধ্য করে। যারা যুদ্ধ করতে অনাগ্রহ প্রকাশ করে, তাদের হত্যা করে ফেলে। সামান্য জীবনের মায়ায় বন্দী মুসলমানরা মুসলমান ভাইদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। সুবহানাল্লাহ! মৃত্যু যখন অবশ্যম্ভাবী, তখন নিজে শাহাদাতের সুধা পান না করে কেন নিজ ভাইকে হত্যা করবে? যদি সে সময় মুসলিম বন্দীরা তাতারীদের বিরুদ্ধে সঙ্ঘবদ্ধ আক্রমণ করত, হয়তো মুক্তির সুযোগ তৈরি হতো। কিন্তু আফসোস! তাদের চেতনাশক্তি লোপ পেয়েছিল, চোখ দৃষ্টিশূন্য হয়ে পড়েছিল! লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।
তাতারীরা মারাগা শহরে ৪ঠা সফর ৬১৮ হিজরীতে প্রবেশ করে। এতে তারা অগণিত মানুষ হত্যা করে। আর যা কিছু ছিনতাইযোগ্য সবই তারা ছিনতাই করে। আর যেসব সম্পদ তারা বহন করে নিতে পারেনি, সেগুলো আগুনে জ্বালিয়ে দেয়।
ইবনুল আছীর রহ. উল্লেখ করেন- "একজন তাতারী মহিলা ঘরে প্রবেশ করে একদল মুসলমানকে হত্যা করে!! তিনি আরও লেখেন যে, স্বয়ং আমি জনৈক মারাগাবাসীর কাছে শুনেছি, একজন তাতারী সৈন্য একটি গলিতে প্রবেশ করে। সেখানে একশোজন মুসলমান পুরুষ ছিল। সে একা এক এক করে একশজনকে হত্যা করে। কিন্তু তারা তার সামনে প্রতিরোধের হাত বাড়ায়নি, পাল্টা আক্রমণ করেনি। মুসলমানদের ওপর লাঞ্ছনা নেমে এসেছিল। ফলে তারা সংখ্যায় কম হোক বা বেশি, কোনো অবস্থাতেই নিজেদের রক্ষা করতে পারেনি।”
📄 উত্তর ইরাক আক্রমণের সতর্কবাণী
তাতারীরা ইরাকের উত্তরে অবস্থিত আরবিল শহরে আক্রমণের চিন্তা করে। আরবিল শহরে 'তাতারী ত্রাস' ছড়িয়ে পড়ে। অনুরূপ আরবিল শহরের পশ্চিমে অবস্থিত 'মসুল' শহরেও তাতারীদের ভয় ছড়িয়ে পড়ে। কতিপয় শহরবাসী দেশ ছেড়ে পালাবার চিন্তা করে। তৎকালীন আব্বাসী খলিফা নাছের তাতারীদের আরবিল শহর থেকে ফিরিয়ে দিতে ভয় পান। ফলে শহরবাসী সবাই বাগদাদ অভিমুখে পালাতে শুরু করে। সবার পলায়নপর পরিস্থিতি দেখে খলিফার গভীর তন্দ্রা উড়ে যায়, যে তন্দ্রায় তিনি বিগত কয়েক বছর ডুবন্ত ছিলেন। তাদের পালাবার সংবাদ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।
আপনি কি জানেন, খলিফা কয়জন সেনাকে একত্রিত করতে পেরেছিলেন? খলিফা মাত্র আটশোজন সেনাকে একত্রিত করতে পেরেছিলেন!! আমি জানি না, মাত্র আটশো সৈন্য নিয়ে কীভাবে খলিফা নাছের (সাহায্যকারী) আল্লাহর দ্বীনকে সাহায্য করবেন? কোথায় শক্তিশালী বিশেষ ফোর্স? কোথায় খলিফার দেহরক্ষীরা? কোথায় তুর্কীবাহিনী? কোথায় জিহাদী প্রেরণা? খলিফা নাছের খলিফা ছিলেন না; মূলত তিনি বাহ্যিকভাবে খেলাফতের বেশভূষা অবলম্বন করেছিলেন অথবা ছিলেন খলিফার অপচ্ছায়া!!
সেনাপ্রধান মুজাফ্ফর উদ্দীন সামান্যসংখ্যক বাহিনী নিয়ে তাতারীদের মোকাবেলা করার সাহস পায়নি। তাই তিনি সেনাবাহিনীসহ পালাতে থাকেন। কিন্তু সুবহানাল্লাহ! অতি অল্পসংখ্যক বাহিনী দেখে তাতারীরা এটাকে এক ধরনের ধোঁকা মনে করে। মনে করে এরা অগ্রগামী সৈন্যদল। এটি বোধগম্য নয় যে, আব্বাসী খেলাফতের সৈন্যবাহিনীর সংখ্যা মাত্র আটশো। এ কারণেই তাতারীরা প্রত্যাগমনের সিদ্ধান্ত নেয়। এতে ইরাক শহর আরও কয়েক বছর জীবন লাভ করে।
📄 তাতারী বাহিনী প্রত্যাগমনের কারণ
এখানে তাতারী বাহিনীর প্রত্যাগমনের কারণ উল্লেখ করা প্রয়োজন উপলব্ধি করছি। তৎকালীন খেলাফতে আব্বাসীর শক্তি সামর্থ্যের কথা শুনলে তাতারীদের গা ঝাঁকুনি দিত। আব্বাসী খেলাফতের শক্তি-সামর্থ্য ও শৌর্য-বীর্যের কথা কে না জানত? আব্বাসী খেলাফতের রয়েছে বিজয়গাথার এক গর্বিত সুদীর্ঘ ইতিহাস। তাতারীরা তো পৃথিবীর বুকে মাত্র কয়েক বছর রাজত্ব করেছে। পক্ষান্তরে আব্বাসী খেলাফত ইতিহাসের সুদীর্ঘ পাঁচশ বছরের। কাজেই তাতারীরা ইরাকের শক্তি সম্পর্কে বাস্তবতার অধিক জ্ঞান করত। এ কারণেই তারা মুখোমুখি সংঘর্ষ ছেড়ে 'ক্ষয়-যুদ্ধের' পথ বেছে নেয়।
ক্ষয়-যুদ্ধের পন্থা ছিল- ১. অতর্কিত হিংস্র আক্রমণ। ২. টানা দীর্ঘ অবরোধ। ৩. পার্শ্ববর্তী দেশ ও রাষ্ট্রসমূহের সঙ্গে ইরাকবিরোধী ঐক্য গঠন।