📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 আফগানিস্তান অভিমুখে তাতারীদের হামলা

📄 আফগানিস্তান অভিমুখে তাতারীদের হামলা


খোরাসান ও খাওয়ারেযম ভূখণ্ড ধ্বংসের মাধ্যমে বর্বর তাতারী বাহিনী খাওয়ারেযম সাম্রাজ্যের উত্তরাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। এমনকি তারা ইরাক-সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তবে তখনো তারা খাওয়ারেযম সাম্রাজ্যের দক্ষিণাঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছতে পারেনি। খাওয়ারেযম সাম্রাজ্যের দক্ষিণাঞ্চল তাতারী বাহিনীর ভয়ে পলাতক ও কাযবিন সমুদ্র উপত্যকায় আশ্রয় গ্রহণকারী মুসলিম সম্রাট মুহাম্মদ ইবনে খাওয়ারেযম শাহের পুত্র জালাল উদ্দীনের অধীনে ছিল।

সে সময় আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের দক্ষিণাঞ্চল ও মধ্যমাঞ্চল খাওয়ারেযম সাম্রাজ্যের দক্ষিণাঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত ছিল। হিন্দুস্তান ও এ অঞ্চলের মাঝে সিন্ধুনদীর ব্যবধান ছিল। সুলতান জালাল উদ্দীন গজনী এই শহরে অবস্থান করতেন। গজনী শহর বর্তমানে আফগানিস্তানের কাবুল শহর থেকে দেড়শো কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত। নিষ্ঠুর চেঙ্গিজ খান মুহাম্মদ ইবনে খাওয়ারেযম শাহের আদিগন্ত বিস্তৃত সাম্রাজ্য তছনছ করার পর পুত্র জালাল উদ্দীনকে হত্যার পাঁয়তারা করে। তাই বিশাল ও শক্তিশালী এক বাহিনীকে গজনী অঞ্চল আক্রমণের জন্য পাঠায়।

স্বভাবতই পুত্র জালাল উদ্দীন খাওয়ারেযম সাম্রাজ্যের ওপর তাতারী বাহিনী অপ্রতিরোধ্য বর্বর আক্রমণ ও পিতার নির্মম মৃত্যুর কথা জানত। ফলে পিতার মৃত্যুর পর সাম্রাজ্য রক্ষার গুরুদায়িত্ব তার কাঁধেই অর্পিত হয়। সে অঘোষিত সম্রাটের আসনে সমাসীন হয়। এ কারণেই তার দায়িত্ব বেড়ে যায়। দেশ, জাতি ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার্থে সে তাতারীদের মোকাবেলার প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু করে। সাম্রাজ্যের সৈন্যবাহিনীকে সঙ্ঘবদ্ধ করে। তুরস্কের রাজা সাইফুদ্দীন বাগরাক তার সঙ্গে মিলিত হয়। সে ছিল একজন দুর্দান্ত রণকৌশলী বীর সেনানী। তার সৈন্যবাহিনীর সংখ্যা ছিল ত্রিশ হাজার। অপরদিকে খাওয়ারেযম পতনের পর সে সকল সৈন্য বিভিন্ন রাজ্যে পালিয়ে আত্মরক্ষা করেছিল, এমন ষাট হাজার সৈন্য এসে তাদের সঙ্গে মিলিত হয়। হেরাত শহরের আমীর মালিক খানও একদল সৈন্য নিয়ে তাদের দলে যুক্ত হয়। ফলে জালাল উদ্দীনের সৈন্যবাহিনী এক বিশাল বাহিনীতে পরিণত হয়। এই বিশাল বাহিনী নিয়ে জালাল উদ্দীন গজনী শহরের পার্শ্ববর্তী শহর বালকে (বালক পাহাড়ি অঞ্চলের এবড়ো-খেবড়ো অঞ্চল) এসে উপস্থিত হয়। তাতারী বাহিনীও এই অঞ্চলে এসে উপস্থিত হয়! গজনী অঞ্চলের সবচেয়ে ভয়ানক স্থান বালকে জালাল উদ্দীনের সঙ্ঘবদ্ধ শক্তি ও তাতারী বাহিনীর অপরাজেয় শক্তি মুখোমুখি হয়।

মুসলমান বাহিনী আত্মঘাতী হামলা শুরু করে। এই অঞ্চলটি হলো খাওয়ারেযম সাম্রাজ্যের সর্বশেষ সীমানা। যদি এ অঞ্চলটি পরাজিত হয়, তবে খাওয়ারেযম সাম্রাজ্যের আর কোনো প্রদেশ অবশিষ্ট থাকবে না। এ যুদ্ধে মুসলমানদের রক্ষার পক্ষে ছিল সাইফ উদ্দীন বাগরাক তুর্কী সুসংহত নেতৃত্ব, জালাল উদ্দীনের অভিজ্ঞ দিকনির্দেশনা এবং লক্ষাধিক মুসলিম সৈন্যের ইতিহাসখ্যাত সমাবেশ। তাতারীদের বিরুদ্ধে জয়লাভের এসব ছিল সুস্পষ্ট নিদর্শন।

তিনদিন পর্যন্ত ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চলতে থাকে। আল্লাহ তা'আলা মুসলমানদের প্রতি ঐশী সাহায্য নাজিল করেন। তাতারীরা প্রথমবারের মতো মুসলিম সাম্রাজ্যে পরাজিত হয়!! ব্যাপকহারে তারা নিহত হয়। অবশিষ্টরা পালিয়ে আফগানিস্তানের পূর্ব-উত্তরে অবস্থিত 'তালিকান' দেশে চেঙ্গিজ খানের কাছে গিয়ে কোনোমতে প্রাণ রক্ষা করে।

এতে মুসলমানগণ হারিয়ে যাওয়া মনোবল ফিরে পান। আকাশচুম্বী দুর্বার হিম্মত ও সাহস তাদের মাঝে জেগে ওঠে। এই যুদ্ধের পূর্বে অধিকাংশ মুসলমানদের মাঝে এই বিশ্বাস বদ্ধমূল হয়েছিল যে, তাতারীরা অপরাজেয়, তাদের পরাজিত করা সম্ভব নয়। কিন্তু গজনীতে মুসলিমবাহিনীর সুসঙ্ঘত পুনর্জাগরণ তাদের বদ্ধমূল ধারণার অপনোদন করে। এই যুদ্ধে জালাল উদ্দীনের সৈন্যবাহিনী, ইবনে খাওয়ারেযমের অবশিষ্ট বাহিনী, সাইফ উদ্দীন বাগরাকের নেতৃত্বে একদল তুর্কীবাহিনী এবং হেরাতের বাদশা মালিক খানের নেতৃত্বে একদল সৈন্য ঐক্যবদ্ধ হয়। মুসলমানগণ যুদ্ধের উপযুক্ত এক স্থান ও যুদ্ধের উপযুক্ত সরঞ্জামাদি গ্রহণ করেন। ফলে আসমান থেকে ঐশী মদদ নেমে আসে!

বাদশা জালাল উদ্দীন তার সৈন্যবাহিনীর অভূতপূর্ব কৃতিত্ব দেখে আস্থা ফিরে পায়। নতুন যুদ্ধের আহ্বানকরত চেঙ্গিজ খানের প্রতি পত্র প্রেরণ করে। চেঙ্গিজ খান একটু হলেও অশুভপরিণতির আশঙ্কা অনুভব করে। ফলে সে নতুন ধাঁচে বিশালবাহিনী প্রস্তুত করে তার এক ছেলের নেতৃত্বে মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য পাঠায়। মুসলিম বাহিনীও প্রস্তুতি গ্রহণ করে। উভয় দল কাবুল শহরে মুখোমুখি হয়।

কাবুল মুসলিম অধ্যুষিত প্রাচীন শহর। শহরটি চতুর্দিক থেকে পাহাড়বেষ্টিত। উত্তরে হিন্দুকুশ, পশ্চিমে বারুবা এবং পূর্ব-দক্ষিণে সুলাইমান পাহাড় অবস্থিত। কাবুলপ্রান্তরে পৃথিবীবিখ্যাত মহাযুদ্ধ সংঘটিত হয়। সংঘটিত হয় গজনীপ্রান্তরে সংঘটিত যুদ্ধের চেয়েও ভয়াবহ তীব্র সংঘাত।

দৃঢ়পদ, উচ্চমনোবলসম্পন্ন মুসলিম বাহিনী তাতারীদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করে। এমনকি তাতারীদের হাত থেকে দশ হাজার মুসলিম বন্দীদের রক্ষা করে। মুসলমানদের মনোবল-সাহস আরও বেড়ে যায়। অসংখ্য তাতারী সৈন্য ধরাশয়ী হয়। এ যুদ্ধে মুসলমানগণ প্রচুর মূল্যবান গনিমত লাভ করেন। কিন্তু আফসোস! গনিমত নেয়ামত হওয়ার পরিবর্তে গজব হয়ে দাঁড়ায়! উপকারের পরিবর্তে অপকার বয়ে আনে!!

তৎকালীন অল্পসংখ্যক মুসলমান ব্যতীত অধিকাংশ মুসলমানদের অন্তর ব্যাপকভাবে পার্থিব রোগে আক্রান্ত ছিল। তারা পার্থিব স্বার্থসিদ্ধির জন্য যুদ্ধ করত। তাদের যুদ্ধ ‘জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ’ ছিল না। তা ছিল অস্তিত্ব রক্ষা, ক্ষমতালিপ্সা। যুদ্ধ ছিল বন্দীদশা ও মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচার যুদ্ধ। গনিমত প্রাচুর্যতা ও সম্পত্তির আধিক্যের সময় তাদের অভ্যন্তরীণ রূপ প্রকাশ পায়। মুসলমান ফেৎনায় নিপতিত হয়!

মুসলমানগণ গনিমতের মাল বণ্টন করতে গিয়ে মতবিরোধে লিপ্ত হয়!! তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী সাইফ উদ্দীন বাগরাক, হেরাত শহর প্রধান মালিক খান গনিমতের অংশ চেয়ে বসে। শুরু হয় মতবিরোধ। হই-হুল্লোড়। সম্পত্তির লোভে শুরু হয় যুদ্ধ!!

হ্যাঁ! মুসলমানরা সম্পদ-লোভে পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত হয়, নিজেরাই নিজেদের হাতে নিহত হয়। যুদ্ধে সাইফ উদ্দীন বাগরাকের ভাই নিহত হয়। এতে সে জালাল উদ্দীনের দল থেকে পৃথক হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তার অধীনে ছিল ত্রিশ হাজার রণযোদ্ধা। সৃষ্টি হয় ঘোলাটে পরিস্থিতি। বাদশা জালাল উদ্দীন সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করে। সাইফ উদ্দীনকে ফিরিয়ে আনতে নিজে অগ্রসর হয়। কারণ, সকলকে ধরে রাখার, সবার শক্তির সমন্বিত শক্তি ও সবার মেধাশক্তিকে কাজে লাগানোর তীব্র প্রয়োজন ছিল। উপরন্তু এই মতবিরোধ অবশিষ্ট বাহিনীর মাঝে পরোক্ষ বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে। কারণ, তুর্কী বাহিনী মুসলিম বাহিনীর মাঝে সবচেয়ে রণকৌশলী ও যোগ্য ছিল। কিন্তু সাইফ উদ্দীন বাগরাক ছিল নাছোড়বান্দা। বাদশা জালাল উদ্দীন তাকে ফেরানোর সকল প্রচেষ্টা ব্যয় করে। সশরীরে তার কাছে যায়। তাকে জিহাদের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। আল্লাহর ভয় দেখায়। কিন্তু সাইফ উদ্দীন কোনো উপদেশ গ্রহণ করে না। কার্যত সৈন্যবাহিনী নিয়ে পৃথক হয়ে যায়!!

মুসলিম বাহিনীর মাঝে বিভক্তি বিভাজন সৃষ্টি হয়। বিচ্ছিন্ন হয় তাদের ঐক্যবদ্ধ শক্তি! প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উভয়ভাবে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। গজনী ও কাবুল শহরে মহান বিজয় লাভের পরও সেই বিজয়কে ফলপ্রসু করতে এবং সেই বিজয়কে টিকিয়ে রাখতে তারা ব্যর্থ হয়।

সেই সংকটময় মুহূর্তে মুসলমানরা দুনিয়ার কদর্যতা ও হাকিকত অনুধাবন করতে পারেনি। তারা ভুলে গিয়েছিল দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী ও পরীক্ষাকেন্দ্র, চিরস্থায়ী নয়; তারা প্রতিপালক আল্লাহ তা'আলাকে ভুলে গিয়েছিল। ভুলে গিয়েছিল তাঁর সম্মুখে দাঁড়ানোর কথা; আখেরাতের প্রস্তুতি গ্রহণের কথা। তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সতর্কবাণী- فَاتَّقُوا الدُّنْيَا 'দুনিয়া থেকে বেঁচে থাকো' ভুলে গিয়েছিল। ফলে তারা ব্যাপক অধঃপতনের শিকার হয়।

মুসলমানদের এহেন আত্মিক অধঃপতনের মুহূর্তে চেঙ্গিজ খান স্বয়ং সৈন্যবাহিনীসহ সেই বীর বাহাদুর মুসলমানদের দেখতে আসে, যারা তার বিরুদ্ধে পরপর দুই বার বিজয় লাভ করে। তার আগমন-বার্তা শুনে মুসলমানরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। আর ভীতসন্ত্রস্ত হবেই না কেন? তাদের সংখ্যা পূর্বের তুলনায় অনেক হ্রাস পেয়েছিল। তারা মনোবল হারিয়ে ফেলেছিল। বাদশা জালাল উদ্দীন তার বাহিনীর মনোবলহীনতা দেখে কী করবে ভেবে উঠতে পারছিলেন না!!

নিরুপায় হয়ে চেঙ্গিজ খানের ভয়ে অথবা (কমপক্ষে এভাবে বলা যায়) যুদ্ধ থেকে বেঁচে থাকার জন্য দক্ষিণ অভিমুখে রওয়ানা হয়। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে বাঁচার জন্য জালাল উদ্দীন সেই পন্থা অবলম্বন করলেন, যেই পন্থা তার পিতা মুহাম্মদ ইবনে খাওয়ারেযম শাহ অবলম্বন করেছিলেন! এক শহর থেকে আরেক শহর পলায়ন। একসময় বর্তমান পাকিস্তানের সীমান্ত অঞ্চল পাড়ি দিয়ে সিন্ধু নদীর পাড়ে এসে পৌঁছেন। তৎকালে হিন্দুস্তানের রাজাদের সঙ্গে বাদশা জালাল উদ্দীনের সুসম্পর্ক ছিল না; এ সত্ত্বেও তিনি চেঙ্গিজ খানের মুখোমুখি হওয়ার চেয়ে হিন্দুস্তানে পলায়ন করাকে অধিক শ্রেয় মনে করলেন!!

কিন্তু বাদশা জালাল উদ্দীন ও তার সৈন্যবাহিনী বিশাল সিন্ধু নদী পাড়ি দেওয়ার জন্য কোনো নৌকা বা জাহাজ পেলেন না। দূরবর্তী স্থান থেকে জাহাজ আনার ব্যবস্থা করেন। জাহাজের অপেক্ষায় থাকাকালীন চেঙ্গিজ খান সৈন্যবাহিনীসহ এসে উপস্থিত হয়!! যুদ্ধ ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। পেছনে সিন্ধু নদী, সামনে চেঙ্গিজ খান! সংঘটিত হয় নজীরবিহীন রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। এমনকি প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য হলো, “এই যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করলে অতীতের সকল যুদ্ধ খেল-তামাশা মাত্র!”।

লাগাতার তিনদিন যুদ্ধ চলে। উভয় দলে রক্তের বন্যা প্রবাহিত হয়। মুসলিম নিহতদের মাঝে আমীর মালিক খান অন্যতম, যে খানিক পূর্বে সাইফ উদ্দীন বাগরাকসহ গনিমতের সম্পত্তি নিয়ে মতবিরোধ করেছিলেন। অথচ দুনিয়া তাকেই কিছুই দেয়নি; বরং দুনিয়া তাকে হত্যা করেছে। তার মৃত্যুক্ষণ এক মুহূর্ত বিলম্বিত হয়নি। যে ব্যক্তি সর্বস্ব ব্যয়ে মুসলমানদের সহযোগিতা করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করে, পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি ফেতনায় নিপতিত হয়ে তিক্ত পরাজয়ে ধ্বংস হয়, এই দুই ব্যক্তির মৃত্যু কি এক পর্যায়ের?!

চতুর্থ দিন মুসলিম বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। প্রত্যেকে নিজ ক্ষতস্থানে পট্টি বাঁধতে থাকে, হিসাবের খাতা গোছাতে থাকে। সৈন্যবাহিনীর এই ছত্রভঙ্গ ক্ষণে জাহাজ নদীর তীরে এসে নোঙর ফেলে। বাদশা জালাল উদ্দীন ভিন্ন চিন্তায় কালক্ষেপণ না করে পূর্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, তা হলো 'পলায়ন'!! মুসলিমপ্রধান লাফ দিয়ে জাহাজে উঠলেন। সাথে তার বিশেষবাহিনী ও সভাসদবৃন্দ। সিন্ধু নদী পাড়ি দিয়ে তারা হিন্দুস্তানে পৌঁছে। কিন্তু জালাল উদ্দীন কি কেবল তাতারীদের এই ভূখণ্ড রেখে গিয়েছিলেন?

না; তাতারীদের সঙ্গে সঙ্গে সে মুসলিম গ্রাম-গঞ্জ, শহর-জনপদ, দেশ-দেশান্তর রেখে গিয়েছিলেন! আর জনপদবাসীর কোনোরূপ সৈন্য-প্রতিরক্ষা ছাড়াই রেখে এসেছিলেন। এ সুযোগে চেঙ্গিজ খান মুসলিম সাম্রাজ্যের ওপর তার ক্রোধের পেয়ালা ঢেলে দেয়। তাতারী বাহিনী যা করার প্রস্তুতি নিয়েছিল, তা-ই করল; বরং আরও বেশি।

মুসলিম শক্তি ঐক্যবদ্ধ থাকাকালীন যেই গজনী শহরে মুসলিম জাতি দীর্ঘদিন যাবৎ বিজয় লাভ করেছিল, চেঙ্গিজ খান সেই শহরে প্রবেশ করে নির্বিচারে সকল পুরুষকে হত্যা করে, সকল নারীদের বন্দী করে, ঘর-বাড়ি সব জ্বালিয়ে দেয়!! গজনী শহর ইবনে আছীর রহ. এর ভাষায়-

যেন তা ছাদ উল্টে (থুবড়ে) পড়েছিল। যেন গতকাল তার অস্তিত্বই ছিল না।

যাদের চেঙ্গিজ খান বন্দী করেছিল তাদের মধ্যে বাদশা জালাল উদ্দীন ইবনে খাওয়ারেযমের সন্তানরাও ছিল। চেঙ্গিজ খান তাদের সবাইকে জবাই করার নির্দেশ দেয়। এভাবেই বাদশা জালাল উদ্দীন তিক্ত জীবনের স্বাদ গ্রহণ করে। হায়! জীবনের মায়া!!

এর মাধ্যমে আরেকবার প্রমাণিত হলো তাতারীরা অপরাজেয়। কিন্তু এত সহজে তা হওয়ার কথা ছিল না। আফগানিস্তান তাতারীদের অধ্যুষিত ভূমিতে পরিণত হলো।

টিকাঃ
২৪. বুখারী: ৩১৫৮, মুসলিম: ২২৯৬।
২৫. মুসলিম: ২৪৭৪।

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 বিস্তৃত আফগানিস্তান পতন অনেকগুলো দুর্যোগ ও দুর্ঘটনার কারণ

📄 বিস্তৃত আফগানিস্তান পতন অনেকগুলো দুর্যোগ ও দুর্ঘটনার কারণ


কেন আফগানিস্তান পতন মুসলিম উম্মাহর পতনের পথ রচনা করবে? কেন গোটা মুসলিম উম্মাহর জন্য বিধ্বংসী হাতে আফগানিস্তানের পতন ঘটবে? বস্তুত আফগানিস্তান পতন অনেকগুলো দুর্যোগ ও দুর্ঘটনার কারণ-

এক. যেকোনো সাম্রাজ্যের মজ্জাগত স্বভাব হলো, শত্রুপক্ষের আক্রমণকে সে প্রায় অসম্ভব মনে করে। আত্মনির্ভরতার এই মজ্জাগত স্বভাবই আফগানিস্তানের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহ অরক্ষিত হওয়ার কারণ। ফলে আফগানিস্তান পতনের সঙ্গে সঙ্গে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহ পতনের শিকার হয়। পরবর্তীতে পাকিস্তান, ইরান, ইরাক খুব সহজেই পতনের মুখ দেখে।

দুই. সমর-দক্ষতা ও উপযুক্ত রণভূমি হিসেবে আফগানিস্তান মুসলিমবিশ্বের মানচিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। কারণ, আফগানিস্তান এশিয়া মহাদেশের মধ্যভাগে অবস্থিত। যারাই আফগানিস্তান দখল করতে পারবে, অন্যান্য অঞ্চলের ওপর প্রভাব বিস্তারকরণ তাদের পক্ষে খুবই সহজ। শুধু ইরান ও পাকিস্তান নয়; বরং রাশিয়া-হিন্দুস্তানের মত গুরুত্বপূর্ণ দেশের এবং চীনের কিয়দাংশের ওপর তাদের পক্ষে প্রভাব বিস্তার করা খুবই সহজ। এ কারণে আফগানিস্তান দখল করার পর গোটা এশিয়া মহাদেশের ওপর প্রভাব ও কর্তৃত্ব বিস্তার করা সম্ভব।

তিন. সার্বিক দিক বিবেচনায় আফগানিস্তান তার ঘাঁটি ও উপত্যকাসমূহকে শক্তিশালী হিসেবে গড়ে তুলেছিল। কাজেই আফগানিস্তান পতন অন্য অঞ্চলসমূহের পতনের পথকে সহজ করেছিল।

চার. আফগানিস্তানবাসীও ইসলামী চেতনায় সমুন্নত ও জিহাদী প্রেরণায় ছিল উজ্জীবিত। তাই তারা সহজে অন্যের হস্তক্ষেপ ও আধিপত্য বিস্তার মেনে নিত না। পরপর দুই বার তাতারী বাহিনীর ওপর জয় লাভ একথার সুস্পষ্ট প্রমাণও বহন করে। কিন্তু মুসলিম বাহিনীর বিভক্তি-বিভাজন শত্রুপক্ষের প্রত্যাগমনের পথ সুগম করে দেয়।

পাঁচ. পূর্ব-বর্ণিত সকল প্রতিক্রিয়া ছাড়া সবচেয়ে ক্ষতিকর দিকটি হলো, আফগানিস্তান পতনের ফলে মুসলিম উম্মাহর মনোবলে নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি হয়। পক্ষান্তরে তাতারী বাহিনীর মনোবল চাঙা হয়। কাজেই একটি পরাজিত জাতি কী করে নতুনভাবে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াবে? কী করে সহজ জয়লাভ কামনা করতে পারে? এটি বাস্তবেই অসম্ভব!

এই বিজয়লাভের মাধ্যমে তাতারীরা চীন হয়ে কাজাকিস্তান, উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান অতঃপর ইরান, আযারবাইজান, আর্মেনিয়া ও জুজিয়ায় পৌঁছে যায়। তারা ইরাকের একদম কাছাকাছি পৌঁছে যায়। এ সকল ঘটনা মাত্র এক বছরেই তথা ৬১৭ হিজরীতে সংঘটিত হয়।

টিকাঃ
২৬. সুরা বাকারা: ২৫৯।
২৭. সুরা ইউনুস: ২৪।
২৮. বাইহাকী শরীফ: ১৩২, জামে মা' মার ইবনে রাশেদ: ২০২৬২।

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 ৬১৮ হিজরীতে আযারবাইজান অভিমুখে তাতারী বাহিনীর পুনরাগমন

📄 ৬১৮ হিজরীতে আযারবাইজান অভিমুখে তাতারী বাহিনীর পুনরাগমন


৬১৮ হিজরীতে তাতারী বাহিনী আযারবাইজানের দিকে ফিরে আসে এবং মারাগা শহরে প্রবেশ করে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, শহরটি একজন নারী পরিচালনা করত। জানি না কেন মুসলমানরা নিজেদের লাগাম একজন নারীকে প্রদান করেছিল! বিশেষত তৎকালীন ভয়ংকর মুহূর্তে। যদি কোনো রাষ্ট্রে নেতৃত্বযোগ্য পুরুষ না থাকে, তবে ভিন্ন কথা!!

তাতারীরা মারাগা শহর অবরোধ করে চারপাশে ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপন করে। চতুর্দিক থেকে শহরে আক্রমণ শুরু করে। ফলে শহরবাসী যুদ্ধের জন্য বেরিয়ে পড়ে। প্রথমত তাতারীরা বিভিন্ন দেশ থেকে বন্দী করে আনা মুসলমানদের ঢালস্বরূপ ব্যবহার করে। তাদের পক্ষে যুদ্ধ করতে বাধ্য করে। যারা যুদ্ধ করতে অনাগ্রহ প্রকাশ করে, তাদের হত্যা করে ফেলে। সামান্য জীবনের মায়ায় বন্দী মুসলমানরা মুসলমান ভাইদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। সুবহানাল্লাহ! মৃত্যু যখন অবশ্যম্ভাবী, তখন নিজে শাহাদাতের সুধা পান না করে কেন নিজ ভাইকে হত্যা করবে? যদি সে সময় মুসলিম বন্দীরা তাতারীদের বিরুদ্ধে সঙ্ঘবদ্ধ আক্রমণ করত, হয়তো মুক্তির সুযোগ তৈরি হতো। কিন্তু আফসোস! তাদের চেতনাশক্তি লোপ পেয়েছিল, চোখ দৃষ্টিশূন্য হয়ে পড়েছিল! লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।

তাতারীরা মারাগা শহরে ৪ঠা সফর ৬১৮ হিজরীতে প্রবেশ করে। এতে তারা অগণিত মানুষ হত্যা করে। আর যা কিছু ছিনতাইযোগ্য সবই তারা ছিনতাই করে। আর যেসব সম্পদ তারা বহন করে নিতে পারেনি, সেগুলো আগুনে জ্বালিয়ে দেয়।

ইবনুল আছীর রহ. উল্লেখ করেন- "একজন তাতারী মহিলা ঘরে প্রবেশ করে একদল মুসলমানকে হত্যা করে!! তিনি আরও লেখেন যে, স্বয়ং আমি জনৈক মারাগাবাসীর কাছে শুনেছি, একজন তাতারী সৈন্য একটি গলিতে প্রবেশ করে। সেখানে একশোজন মুসলমান পুরুষ ছিল। সে একা এক এক করে একশজনকে হত্যা করে। কিন্তু তারা তার সামনে প্রতিরোধের হাত বাড়ায়নি, পাল্টা আক্রমণ করেনি। মুসলমানদের ওপর লাঞ্ছনা নেমে এসেছিল। ফলে তারা সংখ্যায় কম হোক বা বেশি, কোনো অবস্থাতেই নিজেদের রক্ষা করতে পারেনি।”

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 উত্তর ইরাক আক্রমণের সতর্কবাণী

📄 উত্তর ইরাক আক্রমণের সতর্কবাণী


তাতারীরা ইরাকের উত্তরে অবস্থিত আরবিল শহরে আক্রমণের চিন্তা করে। আরবিল শহরে 'তাতারী ত্রাস' ছড়িয়ে পড়ে। অনুরূপ আরবিল শহরের পশ্চিমে অবস্থিত 'মসুল' শহরেও তাতারীদের ভয় ছড়িয়ে পড়ে। কতিপয় শহরবাসী দেশ ছেড়ে পালাবার চিন্তা করে। তৎকালীন আব্বাসী খলিফা নাছের তাতারীদের আরবিল শহর থেকে ফিরিয়ে দিতে ভয় পান। ফলে শহরবাসী সবাই বাগদাদ অভিমুখে পালাতে শুরু করে। সবার পলায়নপর পরিস্থিতি দেখে খলিফার গভীর তন্দ্রা উড়ে যায়, যে তন্দ্রায় তিনি বিগত কয়েক বছর ডুবন্ত ছিলেন। তাদের পালাবার সংবাদ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।

আপনি কি জানেন, খলিফা কয়জন সেনাকে একত্রিত করতে পেরেছিলেন? খলিফা মাত্র আটশোজন সেনাকে একত্রিত করতে পেরেছিলেন!! আমি জানি না, মাত্র আটশো সৈন্য নিয়ে কীভাবে খলিফা নাছের (সাহায্যকারী) আল্লাহর দ্বীনকে সাহায্য করবেন? কোথায় শক্তিশালী বিশেষ ফোর্স? কোথায় খলিফার দেহরক্ষীরা? কোথায় তুর্কীবাহিনী? কোথায় জিহাদী প্রেরণা? খলিফা নাছের খলিফা ছিলেন না; মূলত তিনি বাহ্যিকভাবে খেলাফতের বেশভূষা অবলম্বন করেছিলেন অথবা ছিলেন খলিফার অপচ্ছায়া!!

সেনাপ্রধান মুজাফ্ফর উদ্দীন সামান্যসংখ্যক বাহিনী নিয়ে তাতারীদের মোকাবেলা করার সাহস পায়নি। তাই তিনি সেনাবাহিনীসহ পালাতে থাকেন। কিন্তু সুবহানাল্লাহ! অতি অল্পসংখ্যক বাহিনী দেখে তাতারীরা এটাকে এক ধরনের ধোঁকা মনে করে। মনে করে এরা অগ্রগামী সৈন্যদল। এটি বোধগম্য নয় যে, আব্বাসী খেলাফতের সৈন্যবাহিনীর সংখ্যা মাত্র আটশো। এ কারণেই তাতারীরা প্রত্যাগমনের সিদ্ধান্ত নেয়। এতে ইরাক শহর আরও কয়েক বছর জীবন লাভ করে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00