📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 ৪. নিশাপুর আক্রমণ

📄 ৪. নিশাপুর আক্রমণ


খোরাসান সাম্রাজ্যের আরেকটি বড় শহর হলো নিশাপুর। (বর্তমানে তা ইরানের উত্তর-পূর্ব কোণে অবস্থিত) মারওয়া শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার পর তাতারী বাহিনী নিশাপুর আক্রমণের জন্য অগ্রসর হয়েছিল। পাঁচদিন পর্যন্ত তারা নিশাপুর শহর অবরোধ করে রেখেছিল। এ সত্ত্বেও শহরবাসী দৃঢ় মনোবলে সঙ্ঘবদ্ধ অবস্থান করেছিল। তবে মারওয়া বিপর্যয়ের সংবাদ নিশাপুরে পৌঁছেছিল বিধায় তাদের অন্তরে তাতারীভীতি বিস্তার লাভ করেছিল। তাতারী বাহিনীর মোকাবেলা করার মতো শক্তি-সামর্থ্য তাদের ছিল না। তারা সকল শহরবাসীকে মরুভূমিতে এনে দাঁড় করায়। এমন সময় জনৈক ব্যক্তি এসে চেঙ্গিজ খানের পুত্রকে সংবাদ প্রদান করে, মারওয়ার কতিপয় অধিবাসীর প্রাণরক্ষা পেয়েছে। অর্থাৎ তারা তাদের তলোয়ারের আঘাত করেছিল বটে তবে নিহত ধারণায় তাদের ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু মূলত তারা নিহত হয়নি। এ সংবাদ পেয়ে চেঙ্গিজ খানের পুত্র নিশাপুরের সকল পুরুষকে হত্যার নির্দেশ প্রদান করে এবং মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার জন্য ধড় থেকে মাথা ছিন্ন করার নির্দেশ দেয়। এরপর অভিশপ্ত চেঙ্গিজ খানের পুত্র মুসলিম নারীদের বন্দী করে। তাতারীরা দীর্ঘ পনেরো দিন নিশাপুরের ধন-সম্পত্তি হন্যে হয়ে খোঁজে। এরপর তারা নিশাপুর ত্যাগ করে। লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 ৫. হেরাত আক্রমণ

📄 ৫. হেরাত আক্রমণ


মুসলিম সাম্রাজ্যের সুরক্ষিত শহরগুলোর অন্যতম হলো হেরাত শহর। এটি মারওয়ার মতই বৃহৎ শহর ছিল। তা আফগানিস্তানের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত। চেঙ্গিজ খানের পুত্র হেরাত নগরীর দিকে কুদৃষ্টি নিক্ষেপ করে। এই শহরটিও সেই নিকৃষ্ট পরিণতি থেকে রেহাই পায়নি, যেই পরিণতির শিকার হয়েছিল মারওয়া ও নিশাপুর। সেখানকার সকল পুরুষ নিহত হয়। নারীরা বন্দী হয়। গোটা শহর বিরানভূমিতে পরিণত হয়। যদিও তৎকালীন সে অঞ্চলের রাজা 'মালিক খান' একদল সৈন্য নিয়ে আফগানিস্তানের দক্ষিণে অবস্থিত গজনী অভিমুখে পালিয়ে প্রাণে বাঁচে। তৎকালীন সকল মুসলিম রাজা বাদশা আত্মরক্ষামূলক পলায়নপরতার ব্যাপারে একমত ছিল, যখন তাদের প্রজাদের জীবন বর্বর তাতারী বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে বলি হতো। এমনই ছিল তাদের চরিত্র-সুষমা!!

হেরাত পতনের মধ্য দিয়ে খোরাসান সাম্রাজ্যের শেষ ভূখণ্ডও তাতারীদের হাতে পরাজিত হয়। একটি শহরও তাতারী আগ্রাসনের সর্বনাশা থাবা থেকে রক্ষা পায় না। এ সকল দুর্যোগ ও বিপর্যয় মাত্র এক বছরেই সংঘটিত হয়। সেটি হলো ৬১৭ হিজরী। এটি ভূপৃষ্ঠে সংঘটিত আশ্চর্য ঘটনাবলির অন্যতম!!

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 খাওয়ারেষম আক্রমণ

📄 খাওয়ারেষম আক্রমণ


খাওয়ারেযম ছিল মুসলিম সম্রাট মুহাম্মদ ইবনে খাওয়ারেষম শাহের প্রধান কার্যালয়। সেখানে হাজার হাজার মুসলমানদের সমাগম হতো। প্রতিরক্ষা ও সুরক্ষার বিবেচনায় সেখানকার দুর্গগুলো ছিল পৃথিবী-বিখ্যাত। বর্তমানে খাওয়ারেষম সাম্রাজ্য উজবেকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তানের সীমান্তসীমা এবং জাইহুন নদীর গা ঘেঁষে অবস্থিত। অর্থনীতি, রণকৌশল ও আধুনিক রাজনীতির বিবেচনায় খাওয়ারেষম ছিল মুসলিম জাতির আদর্শ শহর।

সার্বিক দিক বিবেচনায় পৃথিবীর অন্যতম প্রধান শহর হওয়ার কারণে চেঙ্গিজ খান তার প্রধান ও শক্তিশালী দলটিকে খাওয়ারেষম আক্রমণ করার জন্য পাঠায়। তাতারী বাহিনী দীর্ঘ পাঁচ মাসব্যাপী শহরটি অবরোধ করে রাখে। তবুও তারা শহরে প্রবেশ করতে পারে না। অপারগতাবশত তারা চেঙ্গিজ খানের কাছে অতিরিক্ত সহযোগিতা কামনা করে। চেঙ্গিজ খান বিপুলসংখ্যক 'বাহিনী' দিয়ে তাদের সহযোগিতা প্রদান করে।

সঙ্ঘবদ্ধভাবে শহরে প্রবেশের অব্যাহত চেষ্টা করতে থাকে। বিভিন্ন স্থানে প্রাচীর ধ্বংসের চেষ্টা করে। অবশেষে তারা একটি সুড়ঙ্গপথ খুঁজে পায়। সে পথ দিয়ে তারা শহরে প্রবেশ করে। শুরু হলো মুসলমান ও তাতারী বাহিনীর মাঝে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। উভয় দলের বহুসংখ্যক সৈন্য নিহত হয়। তবে ময়দানে তাতারীরাই প্রভাব বিস্তার করে রেখেছিল। হঠাৎ তাতারীদের নতুন এক বাহিনী শহরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এতেই মুসলমানদের পরাজয় নেমে আসে। নির্বিচারে মুসলিম-নিধন শুরু হয়। মুসলমানগণ পালাতে শুরু করে। অলি-গলিতে, গর্ত-খন্দকে, ঘর-বাড়িতে আত্মগোপন করতে শুরু করে। আহ! বর্বর তাতারী বাহিনী!! মুসলমানদের সমূলে ধ্বংস করার জন্য কী জঘন্য পন্থা অবলম্বন করল?!

জাইহুন নদীর পানি আটকে রাখার জন্য একটি বিশাল বাঁধ নির্মিত ছিল। তাতারীরা সেই বাঁধ ভেঙে দেয়। এতে গোটা খাওয়ারেষম শহর পানিতে তলিয়ে যায়। বাঁধভাঙা স্রোত ঘর-বাড়ি, খাল-বিল, গর্ত-খন্দক, সর্বত্র পৌঁছে যায়। তুফান স্রোতে ঘর-বাড়ি ভেসে যায়। শহরবাসীর একজনও প্রাণে রক্ষা পায় না। ঘটনাচক্রে কেউ যুদ্ধে প্রাণ রক্ষা পেলেও বাঁধ ভেঙে কিংবা পানিতে ডুবে মারা যায়। সুবিশাল সাম্রাজ্য বিরানভূমিতে পরিণত হয়। পরবর্তী সময় দর্শনার্থী সেই এলাকা পরিদর্শন করলে কোনো জীব-জন্তুর চিহ্ন খুঁজে পেত না। এমন সর্বনাশা দুর্যোগ পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। হয়তোবা নূহ আ. এর সম্প্রদায়ের ওপর এমন ব্যাপক প্লাবন এসেছিল। বিজয়ের পর পরাজয় ও সম্মানের পর বেইজ্জতি হতে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।

৬১৭ হিজরীতেই এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল!!

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 আফগানিস্তান অভিমুখে তাতারীদের হামলা

📄 আফগানিস্তান অভিমুখে তাতারীদের হামলা


খোরাসান ও খাওয়ারেযম ভূখণ্ড ধ্বংসের মাধ্যমে বর্বর তাতারী বাহিনী খাওয়ারেযম সাম্রাজ্যের উত্তরাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। এমনকি তারা ইরাক-সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তবে তখনো তারা খাওয়ারেযম সাম্রাজ্যের দক্ষিণাঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছতে পারেনি। খাওয়ারেযম সাম্রাজ্যের দক্ষিণাঞ্চল তাতারী বাহিনীর ভয়ে পলাতক ও কাযবিন সমুদ্র উপত্যকায় আশ্রয় গ্রহণকারী মুসলিম সম্রাট মুহাম্মদ ইবনে খাওয়ারেযম শাহের পুত্র জালাল উদ্দীনের অধীনে ছিল।

সে সময় আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের দক্ষিণাঞ্চল ও মধ্যমাঞ্চল খাওয়ারেযম সাম্রাজ্যের দক্ষিণাঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত ছিল। হিন্দুস্তান ও এ অঞ্চলের মাঝে সিন্ধুনদীর ব্যবধান ছিল। সুলতান জালাল উদ্দীন গজনী এই শহরে অবস্থান করতেন। গজনী শহর বর্তমানে আফগানিস্তানের কাবুল শহর থেকে দেড়শো কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত। নিষ্ঠুর চেঙ্গিজ খান মুহাম্মদ ইবনে খাওয়ারেযম শাহের আদিগন্ত বিস্তৃত সাম্রাজ্য তছনছ করার পর পুত্র জালাল উদ্দীনকে হত্যার পাঁয়তারা করে। তাই বিশাল ও শক্তিশালী এক বাহিনীকে গজনী অঞ্চল আক্রমণের জন্য পাঠায়।

স্বভাবতই পুত্র জালাল উদ্দীন খাওয়ারেযম সাম্রাজ্যের ওপর তাতারী বাহিনী অপ্রতিরোধ্য বর্বর আক্রমণ ও পিতার নির্মম মৃত্যুর কথা জানত। ফলে পিতার মৃত্যুর পর সাম্রাজ্য রক্ষার গুরুদায়িত্ব তার কাঁধেই অর্পিত হয়। সে অঘোষিত সম্রাটের আসনে সমাসীন হয়। এ কারণেই তার দায়িত্ব বেড়ে যায়। দেশ, জাতি ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার্থে সে তাতারীদের মোকাবেলার প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু করে। সাম্রাজ্যের সৈন্যবাহিনীকে সঙ্ঘবদ্ধ করে। তুরস্কের রাজা সাইফুদ্দীন বাগরাক তার সঙ্গে মিলিত হয়। সে ছিল একজন দুর্দান্ত রণকৌশলী বীর সেনানী। তার সৈন্যবাহিনীর সংখ্যা ছিল ত্রিশ হাজার। অপরদিকে খাওয়ারেযম পতনের পর সে সকল সৈন্য বিভিন্ন রাজ্যে পালিয়ে আত্মরক্ষা করেছিল, এমন ষাট হাজার সৈন্য এসে তাদের সঙ্গে মিলিত হয়। হেরাত শহরের আমীর মালিক খানও একদল সৈন্য নিয়ে তাদের দলে যুক্ত হয়। ফলে জালাল উদ্দীনের সৈন্যবাহিনী এক বিশাল বাহিনীতে পরিণত হয়। এই বিশাল বাহিনী নিয়ে জালাল উদ্দীন গজনী শহরের পার্শ্ববর্তী শহর বালকে (বালক পাহাড়ি অঞ্চলের এবড়ো-খেবড়ো অঞ্চল) এসে উপস্থিত হয়। তাতারী বাহিনীও এই অঞ্চলে এসে উপস্থিত হয়! গজনী অঞ্চলের সবচেয়ে ভয়ানক স্থান বালকে জালাল উদ্দীনের সঙ্ঘবদ্ধ শক্তি ও তাতারী বাহিনীর অপরাজেয় শক্তি মুখোমুখি হয়।

মুসলমান বাহিনী আত্মঘাতী হামলা শুরু করে। এই অঞ্চলটি হলো খাওয়ারেযম সাম্রাজ্যের সর্বশেষ সীমানা। যদি এ অঞ্চলটি পরাজিত হয়, তবে খাওয়ারেযম সাম্রাজ্যের আর কোনো প্রদেশ অবশিষ্ট থাকবে না। এ যুদ্ধে মুসলমানদের রক্ষার পক্ষে ছিল সাইফ উদ্দীন বাগরাক তুর্কী সুসংহত নেতৃত্ব, জালাল উদ্দীনের অভিজ্ঞ দিকনির্দেশনা এবং লক্ষাধিক মুসলিম সৈন্যের ইতিহাসখ্যাত সমাবেশ। তাতারীদের বিরুদ্ধে জয়লাভের এসব ছিল সুস্পষ্ট নিদর্শন।

তিনদিন পর্যন্ত ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চলতে থাকে। আল্লাহ তা'আলা মুসলমানদের প্রতি ঐশী সাহায্য নাজিল করেন। তাতারীরা প্রথমবারের মতো মুসলিম সাম্রাজ্যে পরাজিত হয়!! ব্যাপকহারে তারা নিহত হয়। অবশিষ্টরা পালিয়ে আফগানিস্তানের পূর্ব-উত্তরে অবস্থিত 'তালিকান' দেশে চেঙ্গিজ খানের কাছে গিয়ে কোনোমতে প্রাণ রক্ষা করে।

এতে মুসলমানগণ হারিয়ে যাওয়া মনোবল ফিরে পান। আকাশচুম্বী দুর্বার হিম্মত ও সাহস তাদের মাঝে জেগে ওঠে। এই যুদ্ধের পূর্বে অধিকাংশ মুসলমানদের মাঝে এই বিশ্বাস বদ্ধমূল হয়েছিল যে, তাতারীরা অপরাজেয়, তাদের পরাজিত করা সম্ভব নয়। কিন্তু গজনীতে মুসলিমবাহিনীর সুসঙ্ঘত পুনর্জাগরণ তাদের বদ্ধমূল ধারণার অপনোদন করে। এই যুদ্ধে জালাল উদ্দীনের সৈন্যবাহিনী, ইবনে খাওয়ারেযমের অবশিষ্ট বাহিনী, সাইফ উদ্দীন বাগরাকের নেতৃত্বে একদল তুর্কীবাহিনী এবং হেরাতের বাদশা মালিক খানের নেতৃত্বে একদল সৈন্য ঐক্যবদ্ধ হয়। মুসলমানগণ যুদ্ধের উপযুক্ত এক স্থান ও যুদ্ধের উপযুক্ত সরঞ্জামাদি গ্রহণ করেন। ফলে আসমান থেকে ঐশী মদদ নেমে আসে!

বাদশা জালাল উদ্দীন তার সৈন্যবাহিনীর অভূতপূর্ব কৃতিত্ব দেখে আস্থা ফিরে পায়। নতুন যুদ্ধের আহ্বানকরত চেঙ্গিজ খানের প্রতি পত্র প্রেরণ করে। চেঙ্গিজ খান একটু হলেও অশুভপরিণতির আশঙ্কা অনুভব করে। ফলে সে নতুন ধাঁচে বিশালবাহিনী প্রস্তুত করে তার এক ছেলের নেতৃত্বে মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য পাঠায়। মুসলিম বাহিনীও প্রস্তুতি গ্রহণ করে। উভয় দল কাবুল শহরে মুখোমুখি হয়।

কাবুল মুসলিম অধ্যুষিত প্রাচীন শহর। শহরটি চতুর্দিক থেকে পাহাড়বেষ্টিত। উত্তরে হিন্দুকুশ, পশ্চিমে বারুবা এবং পূর্ব-দক্ষিণে সুলাইমান পাহাড় অবস্থিত। কাবুলপ্রান্তরে পৃথিবীবিখ্যাত মহাযুদ্ধ সংঘটিত হয়। সংঘটিত হয় গজনীপ্রান্তরে সংঘটিত যুদ্ধের চেয়েও ভয়াবহ তীব্র সংঘাত।

দৃঢ়পদ, উচ্চমনোবলসম্পন্ন মুসলিম বাহিনী তাতারীদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করে। এমনকি তাতারীদের হাত থেকে দশ হাজার মুসলিম বন্দীদের রক্ষা করে। মুসলমানদের মনোবল-সাহস আরও বেড়ে যায়। অসংখ্য তাতারী সৈন্য ধরাশয়ী হয়। এ যুদ্ধে মুসলমানগণ প্রচুর মূল্যবান গনিমত লাভ করেন। কিন্তু আফসোস! গনিমত নেয়ামত হওয়ার পরিবর্তে গজব হয়ে দাঁড়ায়! উপকারের পরিবর্তে অপকার বয়ে আনে!!

তৎকালীন অল্পসংখ্যক মুসলমান ব্যতীত অধিকাংশ মুসলমানদের অন্তর ব্যাপকভাবে পার্থিব রোগে আক্রান্ত ছিল। তারা পার্থিব স্বার্থসিদ্ধির জন্য যুদ্ধ করত। তাদের যুদ্ধ ‘জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ’ ছিল না। তা ছিল অস্তিত্ব রক্ষা, ক্ষমতালিপ্সা। যুদ্ধ ছিল বন্দীদশা ও মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচার যুদ্ধ। গনিমত প্রাচুর্যতা ও সম্পত্তির আধিক্যের সময় তাদের অভ্যন্তরীণ রূপ প্রকাশ পায়। মুসলমান ফেৎনায় নিপতিত হয়!

মুসলমানগণ গনিমতের মাল বণ্টন করতে গিয়ে মতবিরোধে লিপ্ত হয়!! তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী সাইফ উদ্দীন বাগরাক, হেরাত শহর প্রধান মালিক খান গনিমতের অংশ চেয়ে বসে। শুরু হয় মতবিরোধ। হই-হুল্লোড়। সম্পত্তির লোভে শুরু হয় যুদ্ধ!!

হ্যাঁ! মুসলমানরা সম্পদ-লোভে পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত হয়, নিজেরাই নিজেদের হাতে নিহত হয়। যুদ্ধে সাইফ উদ্দীন বাগরাকের ভাই নিহত হয়। এতে সে জালাল উদ্দীনের দল থেকে পৃথক হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তার অধীনে ছিল ত্রিশ হাজার রণযোদ্ধা। সৃষ্টি হয় ঘোলাটে পরিস্থিতি। বাদশা জালাল উদ্দীন সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করে। সাইফ উদ্দীনকে ফিরিয়ে আনতে নিজে অগ্রসর হয়। কারণ, সকলকে ধরে রাখার, সবার শক্তির সমন্বিত শক্তি ও সবার মেধাশক্তিকে কাজে লাগানোর তীব্র প্রয়োজন ছিল। উপরন্তু এই মতবিরোধ অবশিষ্ট বাহিনীর মাঝে পরোক্ষ বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে। কারণ, তুর্কী বাহিনী মুসলিম বাহিনীর মাঝে সবচেয়ে রণকৌশলী ও যোগ্য ছিল। কিন্তু সাইফ উদ্দীন বাগরাক ছিল নাছোড়বান্দা। বাদশা জালাল উদ্দীন তাকে ফেরানোর সকল প্রচেষ্টা ব্যয় করে। সশরীরে তার কাছে যায়। তাকে জিহাদের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। আল্লাহর ভয় দেখায়। কিন্তু সাইফ উদ্দীন কোনো উপদেশ গ্রহণ করে না। কার্যত সৈন্যবাহিনী নিয়ে পৃথক হয়ে যায়!!

মুসলিম বাহিনীর মাঝে বিভক্তি বিভাজন সৃষ্টি হয়। বিচ্ছিন্ন হয় তাদের ঐক্যবদ্ধ শক্তি! প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উভয়ভাবে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। গজনী ও কাবুল শহরে মহান বিজয় লাভের পরও সেই বিজয়কে ফলপ্রসু করতে এবং সেই বিজয়কে টিকিয়ে রাখতে তারা ব্যর্থ হয়।

সেই সংকটময় মুহূর্তে মুসলমানরা দুনিয়ার কদর্যতা ও হাকিকত অনুধাবন করতে পারেনি। তারা ভুলে গিয়েছিল দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী ও পরীক্ষাকেন্দ্র, চিরস্থায়ী নয়; তারা প্রতিপালক আল্লাহ তা'আলাকে ভুলে গিয়েছিল। ভুলে গিয়েছিল তাঁর সম্মুখে দাঁড়ানোর কথা; আখেরাতের প্রস্তুতি গ্রহণের কথা। তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সতর্কবাণী- فَاتَّقُوا الدُّنْيَا 'দুনিয়া থেকে বেঁচে থাকো' ভুলে গিয়েছিল। ফলে তারা ব্যাপক অধঃপতনের শিকার হয়।

মুসলমানদের এহেন আত্মিক অধঃপতনের মুহূর্তে চেঙ্গিজ খান স্বয়ং সৈন্যবাহিনীসহ সেই বীর বাহাদুর মুসলমানদের দেখতে আসে, যারা তার বিরুদ্ধে পরপর দুই বার বিজয় লাভ করে। তার আগমন-বার্তা শুনে মুসলমানরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। আর ভীতসন্ত্রস্ত হবেই না কেন? তাদের সংখ্যা পূর্বের তুলনায় অনেক হ্রাস পেয়েছিল। তারা মনোবল হারিয়ে ফেলেছিল। বাদশা জালাল উদ্দীন তার বাহিনীর মনোবলহীনতা দেখে কী করবে ভেবে উঠতে পারছিলেন না!!

নিরুপায় হয়ে চেঙ্গিজ খানের ভয়ে অথবা (কমপক্ষে এভাবে বলা যায়) যুদ্ধ থেকে বেঁচে থাকার জন্য দক্ষিণ অভিমুখে রওয়ানা হয়। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে বাঁচার জন্য জালাল উদ্দীন সেই পন্থা অবলম্বন করলেন, যেই পন্থা তার পিতা মুহাম্মদ ইবনে খাওয়ারেযম শাহ অবলম্বন করেছিলেন! এক শহর থেকে আরেক শহর পলায়ন। একসময় বর্তমান পাকিস্তানের সীমান্ত অঞ্চল পাড়ি দিয়ে সিন্ধু নদীর পাড়ে এসে পৌঁছেন। তৎকালে হিন্দুস্তানের রাজাদের সঙ্গে বাদশা জালাল উদ্দীনের সুসম্পর্ক ছিল না; এ সত্ত্বেও তিনি চেঙ্গিজ খানের মুখোমুখি হওয়ার চেয়ে হিন্দুস্তানে পলায়ন করাকে অধিক শ্রেয় মনে করলেন!!

কিন্তু বাদশা জালাল উদ্দীন ও তার সৈন্যবাহিনী বিশাল সিন্ধু নদী পাড়ি দেওয়ার জন্য কোনো নৌকা বা জাহাজ পেলেন না। দূরবর্তী স্থান থেকে জাহাজ আনার ব্যবস্থা করেন। জাহাজের অপেক্ষায় থাকাকালীন চেঙ্গিজ খান সৈন্যবাহিনীসহ এসে উপস্থিত হয়!! যুদ্ধ ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। পেছনে সিন্ধু নদী, সামনে চেঙ্গিজ খান! সংঘটিত হয় নজীরবিহীন রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। এমনকি প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য হলো, “এই যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করলে অতীতের সকল যুদ্ধ খেল-তামাশা মাত্র!”।

লাগাতার তিনদিন যুদ্ধ চলে। উভয় দলে রক্তের বন্যা প্রবাহিত হয়। মুসলিম নিহতদের মাঝে আমীর মালিক খান অন্যতম, যে খানিক পূর্বে সাইফ উদ্দীন বাগরাকসহ গনিমতের সম্পত্তি নিয়ে মতবিরোধ করেছিলেন। অথচ দুনিয়া তাকেই কিছুই দেয়নি; বরং দুনিয়া তাকে হত্যা করেছে। তার মৃত্যুক্ষণ এক মুহূর্ত বিলম্বিত হয়নি। যে ব্যক্তি সর্বস্ব ব্যয়ে মুসলমানদের সহযোগিতা করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করে, পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি ফেতনায় নিপতিত হয়ে তিক্ত পরাজয়ে ধ্বংস হয়, এই দুই ব্যক্তির মৃত্যু কি এক পর্যায়ের?!

চতুর্থ দিন মুসলিম বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। প্রত্যেকে নিজ ক্ষতস্থানে পট্টি বাঁধতে থাকে, হিসাবের খাতা গোছাতে থাকে। সৈন্যবাহিনীর এই ছত্রভঙ্গ ক্ষণে জাহাজ নদীর তীরে এসে নোঙর ফেলে। বাদশা জালাল উদ্দীন ভিন্ন চিন্তায় কালক্ষেপণ না করে পূর্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, তা হলো 'পলায়ন'!! মুসলিমপ্রধান লাফ দিয়ে জাহাজে উঠলেন। সাথে তার বিশেষবাহিনী ও সভাসদবৃন্দ। সিন্ধু নদী পাড়ি দিয়ে তারা হিন্দুস্তানে পৌঁছে। কিন্তু জালাল উদ্দীন কি কেবল তাতারীদের এই ভূখণ্ড রেখে গিয়েছিলেন?

না; তাতারীদের সঙ্গে সঙ্গে সে মুসলিম গ্রাম-গঞ্জ, শহর-জনপদ, দেশ-দেশান্তর রেখে গিয়েছিলেন! আর জনপদবাসীর কোনোরূপ সৈন্য-প্রতিরক্ষা ছাড়াই রেখে এসেছিলেন। এ সুযোগে চেঙ্গিজ খান মুসলিম সাম্রাজ্যের ওপর তার ক্রোধের পেয়ালা ঢেলে দেয়। তাতারী বাহিনী যা করার প্রস্তুতি নিয়েছিল, তা-ই করল; বরং আরও বেশি।

মুসলিম শক্তি ঐক্যবদ্ধ থাকাকালীন যেই গজনী শহরে মুসলিম জাতি দীর্ঘদিন যাবৎ বিজয় লাভ করেছিল, চেঙ্গিজ খান সেই শহরে প্রবেশ করে নির্বিচারে সকল পুরুষকে হত্যা করে, সকল নারীদের বন্দী করে, ঘর-বাড়ি সব জ্বালিয়ে দেয়!! গজনী শহর ইবনে আছীর রহ. এর ভাষায়-

যেন তা ছাদ উল্টে (থুবড়ে) পড়েছিল। যেন গতকাল তার অস্তিত্বই ছিল না।

যাদের চেঙ্গিজ খান বন্দী করেছিল তাদের মধ্যে বাদশা জালাল উদ্দীন ইবনে খাওয়ারেযমের সন্তানরাও ছিল। চেঙ্গিজ খান তাদের সবাইকে জবাই করার নির্দেশ দেয়। এভাবেই বাদশা জালাল উদ্দীন তিক্ত জীবনের স্বাদ গ্রহণ করে। হায়! জীবনের মায়া!!

এর মাধ্যমে আরেকবার প্রমাণিত হলো তাতারীরা অপরাজেয়। কিন্তু এত সহজে তা হওয়ার কথা ছিল না। আফগানিস্তান তাতারীদের অধ্যুষিত ভূমিতে পরিণত হলো।

টিকাঃ
২৪. বুখারী: ৩১৫৮, মুসলিম: ২২৯৬।
২৫. মুসলিম: ২৪৭৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00