📄 ১. বলখ ও বলখের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহ (বর্তমান আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চল)
বলখ শহর তিরমিয শহরের দক্ষিণে অবস্থিত। যেই তিরমিয শহরকে তাতারী বাহিনী অল্প কয়েকদিনের মাঝে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছিল। তিরমিয শহরের ধ্বংসকাহিনি নিশ্চয়ই আপনি জেনেছেন। বলখের অধিবাসীদের অন্তরে তাতারীভীতি প্রখরভাবে বিরাজমান ছিল। তাতারী বাহিনী তাদের নিকট পৌঁছলে তারা তাতারীদের কাছে নিরাপত্তা ভিক্ষা চায়। তাতারীরা অভ্যাসবিরুদ্ধ তাদের নিরাপত্তা প্রদান করে। তাদের প্রতি কোনোরূপ অত্যাচার করে না। বলখবাসীর সঙ্গে তাতারী বাহিনীর আচরণ দেখে সত্যিই আমি অবাক হয়েছি! আমি অবাক হয়েছি এই দেখে যে, কেন তাতারীরা তাদের হত্যা করল না, যা তাদের চিরায়ত অভ্যাস?! তবে কিছুদিন পরের ইতিহাসে আমি আমার এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেয়েছি, যখন চেঙ্গিজ খান বলখে ফিরে এসে বলখবাসীকে অন্য একটি মুসলিম শহর ধ্বংস করতে তাকে সহযোগিতা করার নির্দেশ প্রদান করেছে। সেই শহরটির নাম হলো 'মারওয়া' [শীঘ্রই এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা আসবে]। আশ্চর্য! বাস্তবেই বলখবাসী মারওয়াবাসীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার জন্য মাঠে নেমে এসেছিল!! অথচ উভয় দলই মুসলমান!! বস্তুত মুসলমানদের হীনম্মন্যতা, মনোবলহীনতা, কাপুরুষতা ও তাতারীদের কালো থাবার ভয়ভীতিতে আচ্ছন্ন অন্তর তাদের নিজেদের ভাইদের বিরুদ্ধে তরবারি উত্তোলনে উদ্বুদ্ধ করেছে। এভাবেই বর্বর চেঙ্গিজ খান সকল যুদ্ধের জন্য শক্তি সঞ্চার করেছে এবং মুসলমানদের মাধ্যমেই মুসলিম নিধন করেছে।
আমি বলি, তাতারীদের ইতিহাস দেখে চক্ষু বিস্ফোরিত করবেন না। বর্তমান মুসলিম বিশ্বের বহু ভূখণ্ডে আমরা এমন ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছি এবং এমন ঘটনা আমরা চিরদিন দেখব। ২০০২ খ্রিস্টাব্দে আমেরিকা আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলীয় মুসলমানদের কাবুলের মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কাজে লাগিয়েছে। আমেরিকা ইরাক-যুদ্ধে ইরাকের উত্তরাঞ্চলীয় মুসলমানদের ব্যবহার করেছে। লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহিল আলিয়্যিল আজীম!!
📄 ২. তালিকান আক্রমণ
তাতারীদের একটি দল সমরকন্দ থেকে তালিকান (তাজিকিস্তানের নিকটবর্তী আফগানিস্তানের উত্তর পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত) অঞ্চলের দিকে রওয়ানা হয়। অঞ্চলটির শক্তিশালী দুর্গের কারণে তা জয় করা তাতারীদের পক্ষে দুরূহ হলে তারা এই মর্মে চেঙ্গিজ খানের নিকট সংবাদ পাঠায়। চেঙ্গিজ খান সংবাদ পেয়ে সশরীরে মাঠে অবতীর্ণ হয় এবং কয়েকমাস ধরে সে অঞ্চলটি অবরোধ করে রাখে। অবশেষে তারা সে অঞ্চলটি জয় লাভ করে। পুরুষদের হত্যা করে, নারী ও শিশুদের বন্দী করে এবং ধন-সম্পত্তি আসবাবপত্র ছিনতাই করে। যেটি তাদের রক্তে মিশ্রিত অভ্যাস!
📄 ৩. মারওয়ার বিপর্যয়
মারওয়া সে সময়ের বিশ্ববিখ্যাত শহর। বর্তমানে শহরটি তুর্কমেনিস্তানে অবস্থিত। বলখ থেকে আনুমানিক ৪৫০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত। শহরটি দখলের জন্য বিপুলসংখ্যক তাতারী বাহিনী গমন করে। নেতৃত্ব দেয় চেঙ্গিজ খানের কতিপয় সন্তান। এ আক্রমণেও তাতারীরা বলখবাসী মুসলমানদের কাজে লাগায়। বিপুলসংখ্যক ভয়ংকর তাতারী বাহিনীও যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। তাদের সংখ্যার সঠিক পরিমাণ ইতিহাসে পাওয়া যায় না। তবে একথা অনস্বীকার্য যে, লক্ষ লক্ষ মুসলমানদের বিপরীতে তারা অতি নগণ্যই ছিল। আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলের মুসলমানগণ ব্যতীতই তারা ছিল লক্ষ লক্ষ। তাতারী বাহিনী মারওয়া শহরের প্রধান ফটকে পৌঁছতেই শহরের বাইরে দুই লাখ মুসলিমকে সঙ্ঘবদ্ধ দেখতে পায়। দুই লক্ষ সৈন্য সে যুগ অনুযায়ী ছিল বিশাল সৈন্যবহর। মারওয়ার প্রধান ফটকে দুই পক্ষের মাঝে ভয়ংকর যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মুসলমানদের ওপর আবর্তিত হয় এক মহা বিপর্যয়। তাতারীরা মুসলিম সেনাপতিদের নির্দয়ভাবে জবাই করে এবং অবশিষ্টদের বন্দী করে ফেলে। অতি অল্পসংখ্যক মুসলমান রেহাই পায়। ধন-সম্পত্তি, বাহনজন্তু, অস্ত্র-শস্ত্র; সবকিছুই লুট করে। ঐতিহাসিক ইবনে আছীর রহ. সেই যুদ্ধের বিভীষিকাময় করুণ পরিস্থিতির বিবরণ দিতে গিয়ে বলেন—
"বর্বর তাতারী বাহিনী তাদের নিকট পৌঁছলে মুসলমানগণ মুখোমুখি যুদ্ধে লিপ্ত হন। মুসলমানগণ ধৈর্যধারণ করেন। আর তাতারীরা তো পরাজয় কাকে বলে তা জানে না।"
কোনো সৈন্যদল যদি এই বিশ্বাস রেখে শত্রুপক্ষের মোকাবেলা করে যে, শত্রুবাহিনী অপরাজেয়, তারা পরাজিত হবে না, কেমন হবে তাদের মনোবল? কেমন হবে তাদের দৃঢ়তা?
যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর তিক্ত পরাজয় ঘটে। তাতারী বাহিনীর জন্য মারওয়া শহরের দরজা উন্মুক্ত হয়। সেখানে সাত লক্ষ মুসলমান নারী-পুরুষ ও শিশু বসবাস করত। সুবিশাল শহরটিকে তাতারীরা অবরোধ করে ফেলে। চোখের সামনে সৈন্যবাহিনীর অমানবিক ধ্বংস দেখে মারওয়াবাসীর অন্তরে তাতারীত্রাস ছড়িয়ে পড়ে। তবুও তারা চারদিন পর্যন্ত প্রধান ফটক বন্ধ রেখেছিল। পঞ্চম দিনের মাথায় (চেঙ্গিজ খানের পুত্র) তাতারী বাহিনীর সেনাপতি মারওয়া-প্রধানের কাছে এই মর্মে চিঠি প্রেরণ করে—
"নিজেকে ও শহরবাসীকে ধ্বংস কোরো না। আমাদের সামনে বের হয়ে এসো। আমরা তোমাকে এই শহরের আমীর নিযুক্ত করে চলে যাব।”
মারওয়ার সেনাপতি তাতারী সেনাপতির কথাকে বিশ্বাস করল অথবা বিশ্বাসের নামে নিজেকে ধোঁকা দিল। সে তাতারী সেনাপতির কাছে বের হয়ে আসল। তাতারীরা তাকে উষ্ণ সংবর্ধনা জানাল। সম্মান প্রদর্শনপূর্বক তাকে নৈকট্যশীল বানিয়ে নিল। এরপর এই বলে তাদের দুরভিসন্ধি প্রকাশ করল যে, 'তুমি তোমার সাথী, আত্মীয় ও গোত্রপ্রধানদের বের করে নিয়ে এসো। যাকে আমরা খেদমতের যোগ্য মনে করব, তাকে আমরা আমাদের সঙ্গে রেখে দেব। বিনিময়ে তাকে আকর্ষণীয় উপঢৌকন ও নির্ধারিত ভাতা প্রদান করব।' ধোঁকাগ্রস্ত আমীর তাতারী সেনাপতির কথায় প্রলুব্ধ হয়ে তার সহযোগী, বড় বড় আমীর ও সৈন্যবাহিনীর নিকট এই মর্মে বার্তা পাঠায় যে, তারা যেন চেঙ্গিজ খানের পুত্রের সঙ্গে আয়োজিত একটি গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভায় উপস্থিত হয়। এই সংবাদ পেয়ে একটি বিরাট দল বের হয়ে আসে। তাতারীরা তাদের হাতের মোয়ার মতো কাছে পেয়ে সবাইকে রশি দিয়ে বেঁধে ফেলে।
অতঃপর তাদের দুটি দীর্ঘ তালিকা তৈরি করার নির্দেশ দেয়—
এক. মারওয়া শহরের বড় বড় ব্যবসায়ী ও ধনবানদের তালিকা।
দুই. পেশাজীবী ও ইঞ্জিনিয়ারদের তালিকা।
এরপর চেঙ্গিজ খানের পুত্র তাতারীদের গোটা শহরবাসীকে একত্রিত করার নির্দেশ দেয়। তাদের প্রবলপ্রতাপে শহরের সকলেই বের হয়ে আসে। এমনকি আক্ষরিক অর্থে শহরের কেউই অবশিষ্ট ছিল না। অতঃপর স্বর্ণনির্মিত একটি চেয়ার আনা হয়। চেঙ্গিজ খানের পুত্র সেই চেয়ারে বসে তাতারী বাহিনীকে নিম্নবর্ণিত নির্দেশ প্রদান করে—
এক. শহরের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ সেনাপতি ও আমীর সাহেবকে এনে জনসাধারণের সামনে হত্যা করা হোক!! বাস্তবেই তারা বিশাল বাহিনীকে উপস্থিত করে এক এক করে সবাইকে হত্যা করল! সাধারণ লোকেরা তাকিয়ে তাকিয়ে এই হত্যাযজ্ঞ দেখছিল আর কাঁদছিল।
দুই. প্রকৌশলী ও পেশাজীবীদের বের করে মঙ্গোলিয়ায় প্রেরণ করা হোক। যাতে তারা তাদের মাধ্যমে উপকৃত হতে পারে।
তিন. সম্পদশালীদের বের করে শাস্তি প্রদান করা হোক। যাতে তারা তাদের সব ধন-সম্পত্তির সন্ধান দেয়। তাতারী বাহিনী তা-ই করল। তাদের অনেকেই বেত্রাঘাতে নিহত হলো; কিন্তু মুক্তিপণ দেওয়ার মতো কিছুই পেল না।
চার. শহরে প্রবেশ করে প্রত্যেক বাড়ি থেকে তন্ন তন্ন করে আসবাবপত্র ও মালামাল বের করা হোক। এই হুকুম তামিলে তারা স্বর্ণ-রুপা পাবে, এই আশায় বাদশা সাঞ্জারের কবর পর্যন্ত খনন করেছিল। তিনদিন পর্যন্ত হন্যে হয়ে তারা ধন-সম্পদ খুঁজতে থাকে।
পাঁচ. পঞ্চম বিষয়টি ছিল সবচেয়ে ভয়ংকর। চেঙ্গিজ খানের পুত্র শহরবাসী সবাইকে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিল!! ...!!
এই নির্দেশ পেয়ে বর্বর তাতারী বাহিনী মারওয়ার সকল অধিবাসীকে নির্মমভাবে হত্যা শুরু করে। নারী-পুরুষ, শিশু-বাচ্চা নির্বিশচারে সবাইকে হত্যা করে। তারা বলেছিল, মারওয়া শহরবাসী আমাদের অবাধ্য হয়েছে। আমাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। যারা আমাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় তাদের শেষ পরিণতি এমনই হয়। ইবনে আছীর রহ. বলেন—
"শহরবাসীর সবাইকে হত্যা করার পর চেঙ্গিজ খানের পুত্র তাতারী বাহিনীকে নিহতের সংখ্যা গণনার নির্দেশ দেয়। তাদের গণনার হিসাব দাঁড়িয়েছিল সাত লক্ষ। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন!!
মারওয়া শহরের সাত লাখ মুসলিম নারী-পুরুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। এটি কোনো কল্পনার বিষয় নয়, স্বপ্নলোকের কথা নয়—এটি সত্য! মহা সত্য!! আদম সৃষ্টির পর থেকে আজ অবধি কাছের দূরের কোনো সময়েই মানবজাতির ওপর এমন নির্মম হত্যাকাণ্ড দ্বিতীয় আর ঘটেনি। লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ!
মারওয়া নগরী ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলো। ইতিহাসের পাতা থেকে তার আলোচনা চিরতরে মুছে গেল।
📄 ৪. নিশাপুর আক্রমণ
খোরাসান সাম্রাজ্যের আরেকটি বড় শহর হলো নিশাপুর। (বর্তমানে তা ইরানের উত্তর-পূর্ব কোণে অবস্থিত) মারওয়া শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার পর তাতারী বাহিনী নিশাপুর আক্রমণের জন্য অগ্রসর হয়েছিল। পাঁচদিন পর্যন্ত তারা নিশাপুর শহর অবরোধ করে রেখেছিল। এ সত্ত্বেও শহরবাসী দৃঢ় মনোবলে সঙ্ঘবদ্ধ অবস্থান করেছিল। তবে মারওয়া বিপর্যয়ের সংবাদ নিশাপুরে পৌঁছেছিল বিধায় তাদের অন্তরে তাতারীভীতি বিস্তার লাভ করেছিল। তাতারী বাহিনীর মোকাবেলা করার মতো শক্তি-সামর্থ্য তাদের ছিল না। তারা সকল শহরবাসীকে মরুভূমিতে এনে দাঁড় করায়। এমন সময় জনৈক ব্যক্তি এসে চেঙ্গিজ খানের পুত্রকে সংবাদ প্রদান করে, মারওয়ার কতিপয় অধিবাসীর প্রাণরক্ষা পেয়েছে। অর্থাৎ তারা তাদের তলোয়ারের আঘাত করেছিল বটে তবে নিহত ধারণায় তাদের ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু মূলত তারা নিহত হয়নি। এ সংবাদ পেয়ে চেঙ্গিজ খানের পুত্র নিশাপুরের সকল পুরুষকে হত্যার নির্দেশ প্রদান করে এবং মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার জন্য ধড় থেকে মাথা ছিন্ন করার নির্দেশ দেয়। এরপর অভিশপ্ত চেঙ্গিজ খানের পুত্র মুসলিম নারীদের বন্দী করে। তাতারীরা দীর্ঘ পনেরো দিন নিশাপুরের ধন-সম্পত্তি হন্যে হয়ে খোঁজে। এরপর তারা নিশাপুর ত্যাগ করে। লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।