📄 ৬১৭ হিজরীতে মুহাম্মদ ইবনে খাওয়ারেষম শাহের পশ্চাদ্ধাবনের পর চেঙ্গিজ খান কী করেছিল
অপ্রতিরোধ্য তাতারী হামলার ভয়ে মুসলিম সম্রাট মুহাম্মদ ইবনে খাওয়ারেযম শাহের এক শহর থেকে অন্য শহরে পলায়নের ব্যাপারে চেঙ্গিজ খান নিশ্চিত হওয়ার পর সমরকন্দের চারপাশের অঞ্চলসমূহের ওপর আক্রমণ শুরু করে। চেঙ্গিজ খান খাওয়ারেযম ও খোরাসান অঞ্চলকে সবচেয়ে মূল্যবান ও শক্তিশালী অঞ্চল হিসেবে পায়।
খোরাসান সাম্রাজ্য বিশাল অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত। যেমন: বলখ, হেরাত, নিশাপুর, গজনীসহ প্রভূত অঞ্চল খোরাসান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। সাম্রাজ্যটি বর্তমানে ইরানের পশ্চিমে ও আফগানিস্তানের উত্তরে অবস্থিত।
আর খাওয়ারেযম অঞ্চল খাওয়ারেযম সাম্রাজ্যের মূল কেন্দ্রভূমি ছিল। অঞ্চলটি সুরক্ষিত দুর্গ, দক্ষ রণকৌশল ও ধন-সম্পত্তির কারণে বিখ্যাত ছিল। তা সমরকন্দের উত্তর-পশ্চিমে জাইহুন নদীর পাশ ঘেঁষে অবস্থিত। বর্তমানে তা উজবেকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তান অঞ্চলে অবস্থিত। চেঙ্গিজ খান এ সমস্ত অঞ্চলে সশস্ত্র আক্রমণ না করে পরোক্ষ যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার সিদ্ধান্ত নিল, যা মুসলমানদের মনোনিবেশকে দুর্বল করে দেবে। অতঃপর চেঙ্গিজ খান তার সৈন্যবাহিনীদের তিন ভাগে বিভক্ত করল-
১. এক উজবেকিস্তানের ফারগানা অঞ্চল ধ্বংসের জন্য। ফারগানা অঞ্চলটি সমরকন্দ থেকে পাঁচশো কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত।
২. দ্বিতীয় দল নিয়োজিত ছিল তুর্কমেনিস্তানের তিরমিয শহর ধ্বংসের জন্য। এই শহরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন সুনানে তিরমিযীর বিখ্যাত সংকলক ইমাম তিরমিযী রহ.। শহরটি সমরকন্দ থেকে একশো কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত।
৩. তৃতীয় দলটি 'কিলাবা' দুর্গ ধ্বংস করার জন্য নিয়োজিত ছিল। সে সময় কিলাবা দুর্গ ছিল জাইহুন নদীর তীরবর্তী সবচেয়ে সুরক্ষিত দুর্গ।
চেঙ্গিজ খানের পরিকল্পনা অনুযায়ী তিন দলই নিজ নিজ দায়িত্ব পুরোপুরি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আত্মনিয়োগ করে। প্রত্যেকে নিজ নিজ এরিয়ায় প্রভাব বিস্তারকরত ব্যাপকভাবে ছিনতাই, রাহাজানি, হত্যাকাণ্ড, ধ্বংসযজ্ঞ, জেল-জুলুম শুরু করে। এমনকি সেসব অঞ্চল আগুনে জ্বালিয়ে দেয়। সর্বত্র তাতারীদের এই অঘোষিত বার্তা পৌঁছে যায় যে, মানবরক্ত ব্যতীত অন্য কোনো কিছু পানে তাতারীদের তৃষ্ণা মেটে না। ধ্বংসযজ্ঞ ব্যতীত তারা সুখী হয় না। তাতারীরা অপরাজেয়! তাদের পরাজিত করা সম্ভব নয়। সর্বত্র তাদের ভীতি ছড়িয়ে পড়েছিল। লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ!
এই তিনটি দলই নিজেদের হীন উদ্দেশ্যসাধন শেষে চেঙ্গিজ খান তদপেক্ষা অধিক নিকৃষ্ট কর্মসাধনের লক্ষ্যে প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু করে। সে খোরাসান ও খাওয়ারেযম সাম্রাজ্যের সকল অঞ্চলে আক্রমণের প্রস্তুতি নেয়।
📄 খোরাসান আক্রমণ
এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।
📄 ১. বলখ ও বলখের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহ (বর্তমান আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চল)
বলখ শহর তিরমিয শহরের দক্ষিণে অবস্থিত। যেই তিরমিয শহরকে তাতারী বাহিনী অল্প কয়েকদিনের মাঝে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছিল। তিরমিয শহরের ধ্বংসকাহিনি নিশ্চয়ই আপনি জেনেছেন। বলখের অধিবাসীদের অন্তরে তাতারীভীতি প্রখরভাবে বিরাজমান ছিল। তাতারী বাহিনী তাদের নিকট পৌঁছলে তারা তাতারীদের কাছে নিরাপত্তা ভিক্ষা চায়। তাতারীরা অভ্যাসবিরুদ্ধ তাদের নিরাপত্তা প্রদান করে। তাদের প্রতি কোনোরূপ অত্যাচার করে না। বলখবাসীর সঙ্গে তাতারী বাহিনীর আচরণ দেখে সত্যিই আমি অবাক হয়েছি! আমি অবাক হয়েছি এই দেখে যে, কেন তাতারীরা তাদের হত্যা করল না, যা তাদের চিরায়ত অভ্যাস?! তবে কিছুদিন পরের ইতিহাসে আমি আমার এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেয়েছি, যখন চেঙ্গিজ খান বলখে ফিরে এসে বলখবাসীকে অন্য একটি মুসলিম শহর ধ্বংস করতে তাকে সহযোগিতা করার নির্দেশ প্রদান করেছে। সেই শহরটির নাম হলো 'মারওয়া' [শীঘ্রই এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা আসবে]। আশ্চর্য! বাস্তবেই বলখবাসী মারওয়াবাসীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার জন্য মাঠে নেমে এসেছিল!! অথচ উভয় দলই মুসলমান!! বস্তুত মুসলমানদের হীনম্মন্যতা, মনোবলহীনতা, কাপুরুষতা ও তাতারীদের কালো থাবার ভয়ভীতিতে আচ্ছন্ন অন্তর তাদের নিজেদের ভাইদের বিরুদ্ধে তরবারি উত্তোলনে উদ্বুদ্ধ করেছে। এভাবেই বর্বর চেঙ্গিজ খান সকল যুদ্ধের জন্য শক্তি সঞ্চার করেছে এবং মুসলমানদের মাধ্যমেই মুসলিম নিধন করেছে।
আমি বলি, তাতারীদের ইতিহাস দেখে চক্ষু বিস্ফোরিত করবেন না। বর্তমান মুসলিম বিশ্বের বহু ভূখণ্ডে আমরা এমন ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছি এবং এমন ঘটনা আমরা চিরদিন দেখব। ২০০২ খ্রিস্টাব্দে আমেরিকা আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলীয় মুসলমানদের কাবুলের মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কাজে লাগিয়েছে। আমেরিকা ইরাক-যুদ্ধে ইরাকের উত্তরাঞ্চলীয় মুসলমানদের ব্যবহার করেছে। লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহিল আলিয়্যিল আজীম!!
📄 ২. তালিকান আক্রমণ
তাতারীদের একটি দল সমরকন্দ থেকে তালিকান (তাজিকিস্তানের নিকটবর্তী আফগানিস্তানের উত্তর পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত) অঞ্চলের দিকে রওয়ানা হয়। অঞ্চলটির শক্তিশালী দুর্গের কারণে তা জয় করা তাতারীদের পক্ষে দুরূহ হলে তারা এই মর্মে চেঙ্গিজ খানের নিকট সংবাদ পাঠায়। চেঙ্গিজ খান সংবাদ পেয়ে সশরীরে মাঠে অবতীর্ণ হয় এবং কয়েকমাস ধরে সে অঞ্চলটি অবরোধ করে রাখে। অবশেষে তারা সে অঞ্চলটি জয় লাভ করে। পুরুষদের হত্যা করে, নারী ও শিশুদের বন্দী করে এবং ধন-সম্পত্তি আসবাবপত্র ছিনতাই করে। যেটি তাদের রক্তে মিশ্রিত অভ্যাস!