📄 তাতারীদের বিশেষ ফোর্স কী পদক্ষেপ গ্রহণ করল?
সম্রাট মুহাম্মদ ইবনে খাওয়ারেষম শাহকে ধরতে না পেরে তাতারী বাহিনী কাযবীন সমুদ্রতীর থেকে প্রত্যাবর্তন করে ইরানের মাঝের প্রদেশটি দখল করে ফেলল। অথচ তৎকালীন মুসলিমবিশ্বের সবচেয়ে সুরক্ষিত অঞ্চল ছিল মাজিন্দারান। তাতে ছিল বহু শক্তিশালী দুর্গ। এটি সে সময় মুসলিম দেশসমূহের মাঝে সবচেয়ে শক্তিধর বিবেচিত হতো। এমনকি খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাব রা. এর যুগে মুসলমানগণ ইরাক থেকে খোরাসান পর্যন্ত সুবিশাল ভূখণ্ড দখল করলেও মাজিন্দারান প্রদেশে প্রবেশ করতে পারেনি। সবশেষে বিখ্যাত উমাইয়া খলিফা সুলাইমান ইবনে আবদুল মালেক রহ. এর যুগে মুসলমানগণ তা জয় করেন। অথচ তাতারী বাহিনী তা খুব সহজে অতিদ্রুত দখল করে ফেলে। তাতারীরা তা শক্তিবলে দখল করেছে, বিষয়টি এমন নয়; বরং মুসলমানদের মনোবলহীনতার সুযোগে তারা তা দখল করেছিল। অঞ্চলটি দখল করার পর ছিনতাই, হত্যা, বন্দী, শাস্তি প্রদান, জনপদ জ্বালিয়ে দেওয়াসহ তারা তা-ই করেছে, যা তারা অন্যান্য অঞ্চলে করেছিল।
এরপর তারা ইরানের বিখ্যাত 'রায়' নগরীর দিকে কুদৃষ্টি নিক্ষেপ করে। সুবহানাল্লাহ! মুহাম্মদ ইবনে খাওয়ারেষম শাহের মৃত্যুর পরও আল্লাহ তা'আলা তাকে লাঞ্ছিত করতে চেয়েছিলেন। মাজিন্দারান থেকে 'রায়' নগরীর দিকে ফেরার পথে পথিমধ্যে তারা সম্রাট মুহাম্মদ ইবনে খাওয়ারেষম শাহের শ্রদ্ধেয় মাতা ও তার স্ত্রীদের দেখতে পায়। তাদের সঙ্গে ছিল বিপুল পরিমাণ মূল্যবান ধন-সম্পত্তি। তারা তাদের সবাইকে বন্দী করে এবং গনিমতস্বরূপ ধন-সম্পত্তি দখল করে। তৎক্ষণাৎ তাদের ক্ষমতাসীন চেঙ্গিজ খানের কাছে পাঠিয়ে দেয়।
এরপর তাতারী বাহিনী রায়নগরীতে পৌঁছে তাও দখল করে নেয়। তাতে তারা ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায়। ছিনতাই করে শহরের সব মূল্যবান সম্পত্তি। শিশু বাচ্চাদের চুরি করে এবং এমনসব হীন কাজ আঞ্জাম দেয়, যা পৃথিবীর ইতিহাস কখনো শোনেনি!! এরপর তারা ইরানের শহর কাযবীনে প্রবেশ করে। যেখানে তারা চল্লিশ হাজার ঊর্ধ্ব মুসলমান হত্যা করে। লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।
টিকাঃ
২৩. আবু দাউদ: ৪২৯৬।
📄 আযারবাইজান আক্রমণ
কাযবিন শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার পর তাতারী বাহিনী কাযবিন সমুদ্রের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত আযারবাইজান অভিমুখে রওনা হয়।
পথিমধ্যে তারা তিবরিয শহর গমন করে। তিবরিয সে সময়ের আযারবাইজান দেশের একটি শহর। বর্তমানে তা ইরানের উত্তরে অবস্থিত। দেশটির প্রধানমন্ত্রী উজবেক ইবনে বাহলাওয়ান (তিনি তিবরিয শহরে অবস্থান করতেন) তাতারী বাহিনীর সঙ্গে ধন-সম্পত্তি, আসবাবপত্র ও বাহন জন্তু সম্পর্কে সন্ধিচুক্তি করতে চাইলেন। মোটেও যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার চিন্তা করলেন না। কারণ, তিনি সর্বদা মদের নেশায় ডুবে থাকতেন। কখনো হুঁশ ফিরে পেতেন না!! তাতারীরা সন্ধিচুক্তি করতে সম্মত হলো। তিবরিয শহরে প্রবেশ করল না। কারণ তিবরিয হলো শীতপ্রধান অঞ্চল। উপরন্তু তখন ছিল হাড় কাঁপানো শীত। ফলে তারা কাযবিন সমুদ্রের পশ্চিম প্রান্ত অভিমুখে রওনা হলো এবং আযারবাইজানের পশ্চিমাঞ্চলসমূহে আক্রমণ শুরু করল।
📄 আর্মেনিয়া ও জুজিয়া আক্রমণ
এ দুটি অঞ্চল আযারবাইজানের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত। আযারবাইজানের অন্য শহরগুলোর ধ্বংসকর্ম শেষ না হতেই তাতারী বাহিনী এ দুটি অঞ্চল ধ্বংস করতে মনোনিবেশ করল। কারণ, ইতিমধ্যে তারা তাদের বিরুদ্ধে জুজিয়া অঞ্চলের অন্যান্য জনপদের সঙ্ঘবদ্ধ হওয়ার কথা শুনেছিল। জুজিয়ার জনপদগুলো হলো মূর্তিপূজারি ও খ্রিস্টানধর্মাবলম্বী। এদের সঙ্গে মুসলমানদের দীর্ঘদিন যাবৎ স্থায়ী যুদ্ধ চলে আসছিল। তারা বিপদ অত্যাসন্ন মনে করে জুজিয়া অঞ্চলাধীন তাফলীস শহরে একত্রিত হয়েছিল। সেখানে মুসলমানদের সঙ্গে তাতারীদের রক্তক্ষয়ী দীর্ঘ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যুদ্ধে তাতারীরা বিজয় লাভ করে। এ যুদ্ধে জুজিয়া অঞ্চলের অসংখ্য লোক নিহত হয়।
📄 ৬১৭ হিজরীতে মুহাম্মদ ইবনে খাওয়ারেষম শাহের পশ্চাদ্ধাবনের পর চেঙ্গিজ খান কী করেছিল
অপ্রতিরোধ্য তাতারী হামলার ভয়ে মুসলিম সম্রাট মুহাম্মদ ইবনে খাওয়ারেযম শাহের এক শহর থেকে অন্য শহরে পলায়নের ব্যাপারে চেঙ্গিজ খান নিশ্চিত হওয়ার পর সমরকন্দের চারপাশের অঞ্চলসমূহের ওপর আক্রমণ শুরু করে। চেঙ্গিজ খান খাওয়ারেযম ও খোরাসান অঞ্চলকে সবচেয়ে মূল্যবান ও শক্তিশালী অঞ্চল হিসেবে পায়।
খোরাসান সাম্রাজ্য বিশাল অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত। যেমন: বলখ, হেরাত, নিশাপুর, গজনীসহ প্রভূত অঞ্চল খোরাসান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। সাম্রাজ্যটি বর্তমানে ইরানের পশ্চিমে ও আফগানিস্তানের উত্তরে অবস্থিত।
আর খাওয়ারেযম অঞ্চল খাওয়ারেযম সাম্রাজ্যের মূল কেন্দ্রভূমি ছিল। অঞ্চলটি সুরক্ষিত দুর্গ, দক্ষ রণকৌশল ও ধন-সম্পত্তির কারণে বিখ্যাত ছিল। তা সমরকন্দের উত্তর-পশ্চিমে জাইহুন নদীর পাশ ঘেঁষে অবস্থিত। বর্তমানে তা উজবেকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তান অঞ্চলে অবস্থিত। চেঙ্গিজ খান এ সমস্ত অঞ্চলে সশস্ত্র আক্রমণ না করে পরোক্ষ যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার সিদ্ধান্ত নিল, যা মুসলমানদের মনোনিবেশকে দুর্বল করে দেবে। অতঃপর চেঙ্গিজ খান তার সৈন্যবাহিনীদের তিন ভাগে বিভক্ত করল-
১. এক উজবেকিস্তানের ফারগানা অঞ্চল ধ্বংসের জন্য। ফারগানা অঞ্চলটি সমরকন্দ থেকে পাঁচশো কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত।
২. দ্বিতীয় দল নিয়োজিত ছিল তুর্কমেনিস্তানের তিরমিয শহর ধ্বংসের জন্য। এই শহরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন সুনানে তিরমিযীর বিখ্যাত সংকলক ইমাম তিরমিযী রহ.। শহরটি সমরকন্দ থেকে একশো কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত।
৩. তৃতীয় দলটি 'কিলাবা' দুর্গ ধ্বংস করার জন্য নিয়োজিত ছিল। সে সময় কিলাবা দুর্গ ছিল জাইহুন নদীর তীরবর্তী সবচেয়ে সুরক্ষিত দুর্গ।
চেঙ্গিজ খানের পরিকল্পনা অনুযায়ী তিন দলই নিজ নিজ দায়িত্ব পুরোপুরি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আত্মনিয়োগ করে। প্রত্যেকে নিজ নিজ এরিয়ায় প্রভাব বিস্তারকরত ব্যাপকভাবে ছিনতাই, রাহাজানি, হত্যাকাণ্ড, ধ্বংসযজ্ঞ, জেল-জুলুম শুরু করে। এমনকি সেসব অঞ্চল আগুনে জ্বালিয়ে দেয়। সর্বত্র তাতারীদের এই অঘোষিত বার্তা পৌঁছে যায় যে, মানবরক্ত ব্যতীত অন্য কোনো কিছু পানে তাতারীদের তৃষ্ণা মেটে না। ধ্বংসযজ্ঞ ব্যতীত তারা সুখী হয় না। তাতারীরা অপরাজেয়! তাদের পরাজিত করা সম্ভব নয়। সর্বত্র তাদের ভীতি ছড়িয়ে পড়েছিল। লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ!
এই তিনটি দলই নিজেদের হীন উদ্দেশ্যসাধন শেষে চেঙ্গিজ খান তদপেক্ষা অধিক নিকৃষ্ট কর্মসাধনের লক্ষ্যে প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু করে। সে খোরাসান ও খাওয়ারেযম সাম্রাজ্যের সকল অঞ্চলে আক্রমণের প্রস্তুতি নেয়।