📄 এই অপ্রতিরোধ্য হত্যাযজ্ঞে নিহত মুসলমানদের সংখ্যা
তারা সকলকে হত্যা করেছে...!! মুসলমানদের সর্বশেষ ব্যক্তিও শহীদ হয়েছে ...!!
মুসলমানগণ সমরকন্দ যুদ্ধে তাতারীদের এক অভিযানে সত্তর হাজার মুসলিম সেনা হারিয়েছে। (একটু ভেবে দেখুন, সেদিন মুসলমানগণ কীরূপ বেদনাবিভোর হয়েছিলেন, যেদিন তারা সত্তর হাজার সৈন্য হারিয়েছিলেন!!) এটা কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না; বরং যা হবার ছিল তা-ই হয়েছে। এ যুদ্ধে মুসলমানগণ যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ না করা ও নবপ্রজন্মকে রণকৌশল শিক্ষা না দেওয়ার মূল্য দিয়েছে। মূল্য দিয়েছে শক্তিশালী শত্রুর প্রতি মনোনিবেশ না করার।
ফলে তাতারীরা নব উদ্যমে সমরকন্দ অবরোধ করতে ফিরে এসেছে। আর সুসংহত খাওয়ারেষমী সৈন্যবাহিনী লাঞ্ছনার জীবন বেছে নিয়েছে!!
তারা নিরাপত্তার বিনিময়ে সমরকন্দ শহর তাতারীদের হাতে অর্পণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অথচ তারা খুব ভাল জানত যে, তাতারী জাতি প্রতিশ্রুতি রক্ষায় শ্রদ্ধাশীল নয়, তারা কোনো সন্ধিচুক্তি রক্ষা করে না। বুখারার পবিত্র ভূমিতে মুসলিমনিধনের ঘটনা খুব দূরের নয়! কিন্তু হায়! তারা জীবনের মায়া ত্যাগ করতে পারেনি! সাধারণ জনগণ তাদের বলেছিল, তাদের সঙ্গে তাতারীরা কী আচরণ করেছে, তা তো ইতিহাসের পাতায় সমুজ্জ্বল। তবু তারা তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করার কল্পনাও করতে পারত না। অভ্যাসমতো তাতারীরা সমরকন্দবাসীকে ভুয়া নিরাপত্তা প্রদানে একমত হলো। সৈন্যবাহিনী তাদের জন্য সমরকন্দ শহর উন্মুক্ত করে দিল। সাধারণ জনগণ কিছুতেই তাদেরকে বাধা দিতে পারল না। খাওয়ারেষমের সৈন্যরা নিজ গোত্রে ছিল বাঘ, আর শত্রুবাহিনীর সামনে ছিল বিড়াল!!
তারা তাতারী বাহিনীর সামনে কাতর আত্মসমর্পণ করল। তাতারীরা তাদের বলল, তোমাদের অস্ত্র-শস্ত্র, ধন-সম্পত্তি ও বাহনজন্তুগুলো আমাদের হাতে অর্পণ করো। আমরা তোমাদের নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাব। তারা নতিস্বীকারকরতঃ হুকুম তামিল করল। তাতারীরা তাদের অস্ত্র-শস্ত্র ও বাহন জন্তুগুলো নিয়ে নেওয়ার পর তা-ই করল, যা তাতারী জাতির কাছে আশা করা যায়। তারা তরবারি কোষমুক্ত করে তাদের সবাইকে নির্দয়ভাবে হত্যা করল। মুসলিম সেনারা মনোবলহীনতার প্রতিদান দিল!! লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ!
এরপর তাতার বাহিনী রক্তে ভাসমান সমরকন্দে প্রবেশ করে সেই সব ঘৃণ্য কাজে লিপ্ত হলো, ইতিপূর্বে তারা বুখারায় যেসব কাজে লিপ্ত হয়েছিল। তারা অগণিত নারী-পুরুষ ও শিশু বাচ্চাদের হত্যা করল। শহরের সব সম্পত্তি ছিনিয়ে নিল। নারীদের ইজ্জত-সম্ভ্রম কেড়ে নিল। লোকদের বিভিন্ন ধরনের মর্মান্তিক শাস্তি দিল। অসংখ্য শিশু ও নারী বন্দী করল। বয়সের ভার কিংবা শারীরিক দুর্বলতার কারণে যারা বন্দী উপযুক্ত ছিল না, তাদের অমানবিক হত্যা করল। কেন্দ্রীয় মসজিদ জ্বালিয়ে দিল। সমরকন্দ শহরকে বিরানভূমিতে পরিণত করল।
আহ! পৃথিবীর মুসলমানগণ এই হত্যাযজ্ঞের কথা শুনে কীভাবে আরাম আয়েশে বিভোর ছিল!! গগনবিদারী আহাজারি কি তাদের কানে পৌঁছেনি?! তবু কেন তারা তাতারীদের বিরুদ্ধে সঙ্ঘবদ্ধ হলো না?!
ধন-সম্পত্তি, ইজ্জত-সম্মান, জান-প্রাণ ও দ্বীন-ধর্ম নিশ্চিত ধ্বংস জেনেও তারা কীভাবে বিভাজন-বিভক্তি, আত্মকলহ ও দ্বন্দ্ব-সংঘাতে লিপ্ত থেকেছে?! মুসলিম শাসকবৃন্দ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্য পরিচালনা করত এবং সেখানে স্বাধীন পতাকা উত্তোলন করত। তারা একথা বিশ্বাস করত যে, যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের ক্ষুদ্র রাজ্যে যুদ্ধ বিগ্রহ সৃষ্টি না হয়, ততক্ষণ তারা নিরাপদ জীবনযাপন করবে!! তারা ভুয়া নিরাপত্তার স্বপ্নে বিভোর হয়ে নিজেদের ধোঁকা দিত। এমনকি নিজ রাজ্য থেকে কয়েক মাইল দূরেও যুদ্ধ হলে তাদের টনক নড়ত না! আমার কথা শুনে আপনি বিস্ময়াভিভূত হবেন না! অনুগ্রহপূর্বক আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে বলুন তো, কয়জন মুসলিম সৈন্য ফালুজা বা ফিলিস্তিনের মুসলমানদের বাঁচানোর জন্য গা নড়ে বসেছে? কয়জন মুসলিম সৈন্য ফিলিস্তিনীদের বাঁচাও, বাঁচাও আর্তনাদ শুনে শিহরিত হয়েছে?!
মুসলিম শাসকগণ একথা চিন্তা করেননি যে, তারা এই ভয়ানক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন। বুখারা ও সমরকন্দ এলাকায় যে হত্যাযজ্ঞ ঘটেছে, তা সকল মুসলমানের ভবিষ্যৎ অবশ্যম্ভাবী ভয়ানক পরিস্থিতির ভূমিকামাত্র। কাছের দূরের কেউই তা থেকে রক্ষা পাবে না। ওয়া লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।
📄 নিকৃষ্ট সমাপ্তি
চেঙ্গিজ খান-তার ওপর আল্লাহর লানত অবতীর্ণ হোক-সমরকন্দ অঞ্চলে অবস্থান শুরু করল। সে সময় আমলাকা শহরের দিকে তার কুদৃষ্টি পড়ল। এর পূর্বে সে এর চেয়ে দৃষ্টিনন্দন কোনো শহর দেখেনি। আমলাকা দখলের জন্য সে যে দুরভিসন্ধি এঁটেছে, তা হলো, সর্বপ্রথম এই সাম্রাজ্যের সম্রাটকে হত্যা করতে হবে। যাতে শহর দখলের পথে সৈন্যবাহিনীর সঙ্ঘবদ্ধ হওয়ার কোনো আশঙ্কা অবশিষ্ট না থাকে। এ লক্ষ্যে সে মুসলিম সম্রাট মুহাম্মদ ইবনে খাওয়ারেষম শাহকে তলব করার জন্য বিশ হাজার সৈন্য প্রেরণ করল।
চেঙ্গিজ খান কর্তৃক মাত্র বিশ হাজার সৈন্য প্রেরণের মাধ্যমে মূলত মোহাম্মদ ইবনে খাওয়ারেষম ও তাঁর প্রজাদের প্রতি নেহায়েত তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য প্রদর্শন করা হয়েছে। কারণ, এই স্বল্পসংখ্যক তাতারী বাহিনীকে বিশাল মুসলিম বাহিনী অনায়াসে ছিন্নভিন্ন করে ফেলতে পারে। এই ক্ষুদ্রসংখ্যক তাতারী বাহিনী কী করল, তা আমরা আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ! চেঙ্গিজ খান তাদের বলল, “খাওয়ারেষম শাহকে ডেকে নিয়ে এসো। সে যেখানেই থাকুক না কেন, আসমানের সঙ্গে ঝুলে থাকলেও।”
চেঙ্গিজ খানের নির্দেশে তাতারী বাহিনী উরজিন্দা (তুর্কমেনিস্তান) অভিমুখে রওয়ানা হলো, যে শহরে সম্রাট মুহাম্মদ ইবনে খাওয়ারেষম শাহ অবস্থান করতেন। শহরটি জাইহুন (আমুদরিয়া) নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত। তাতারী বাহিনী নদীর পূর্ব দিক থেকে আগমন করল। ফলে নদী দুই দলের মাঝে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াল। মুসলমানগণ তাতারীদের প্রতিহত করার জন্য দৃঢ় প্রত্যয়ে এগিয়ে এল। তাদের দৃঢ় প্রত্যয়ের কারণ ছিল, তারা জানত, নদী তাদের মাঝে প্রতিবন্ধক আর তাতারী বাহিনীর সঙ্গে কোনো নৌকা নেই।
📄 তাতারী বাহিনী কী পন্থা অবলম্বন করল
তাতার বাহিনী বাঁশের বড় বড় খাঁচা তৈরি শুরু করল। এরপর খাঁচাগুলোকে গরুর চামড়া দ্বারা আবৃত করল, যাতে খাঁচায় পানি প্রবেশ না করে। সেসব খাঁচায় অস্ত্র, আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রাখল। এরপর ঘোড়াগুলোকে পানিতে নামাল। ঘোড়া তো খুব সাঁতার জানে। এরপর তারা শক্ত করে ঘোড়ার লেজ আঁকড়ে ধরল। অবস্থা এই দাঁড়াল যে, ঘোড়াগুলো সাঁতার কাটছে। সৈন্যরা লেজ আঁকড়ে ঝুলে আছে। আর তাদের পিঠে বাঁশের খাঁচা। যাতে রয়েছে প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র।
এই অভিনব পদ্ধতিতে তাতারী বাহিনী আমুদরিয়া পাড়ি দিল। আমি জানি না, তখন খাওয়ারেষম বাহিনীর গুপ্তচররা কোথায় ছিল? মুসলিম সৈন্যরা হঠাৎ তাতারী বাহিনী নিজেদের কাছাকাছি দেখতে পেয়ে হতভম্ব হলো। বিপুলসংখ্যক মুসলিম বাহিনী সত্ত্বেও তারা তাতারীদের দেখে ভীতসন্ত্রস্ত হলো। একটু পূর্বে তারা লড়াই করার জন্য দৃঢ় প্রত্যয়ী ছিল কেবল এই জন্য যে, তারা জানত তাদের মাঝে নদী রয়েছে। আর এখন...। এখন তাদের সামনে একটাই পথ। আপনি কী মনে করেছেন, তা লড়াইয়ের পথ? না; বরং তা পালাবার পথ!! যেমনটি ইবনে আছীর রহ. বলেন—
"সম্রাট খাওয়ারেষম শাহ তাঁর বিশেষ ফোর্সের সহযোগিতা ছাড়াই তুর্কমেনিস্তান ছেড়ে বেরিয়ে পড়লেন। নিশাপুর অভিমুখে রওয়ানা হলেন (নিশাপুর বর্তমানে ইরানে অবস্থিত)। মুসলিম বাহিনী বিভিন্ন দিকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল। লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ!"
এ যাত্রায় তাতারী বাহিনীর নির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল মুহাম্মদ ইবনে খাওয়ারেষম শাহকে খুঁজে বের করা। তাই তারা তুর্কমেনিস্তান ছেড়ে মুসলিম সাম্রাজ্যের সুবিশাল বিস্তৃত ভূমি পাড়ি দিয়ে নিশাপুর অভিমুখে রওয়ানা হলো।
তারা সংখ্যায় বিশ হাজারের অধিক ছিল না! চেঙ্গিজ খান সমরকন্দেই অবস্থান করছিল। মুসলিম সাম্রাজ্যের যেকোনো ভূখণ্ডে তাতারী বাহিনীর এই ক্ষুদ্র দলকে অবরোধ করা অতি সহজ ছিল। কিন্তু তাতারীদের ভয়ভীতি মুসলমানদের অন্তরে চেপে বসেছিল। তারা সর্বত্রই তাদের দেখলে পলায়নপর হতো। ফলে তারাও সম্রাটের অনুকরণের পালাবার পথ ধরল। সেই সম্রাট নিয়মিত এক শহর থেকে অন্য শহরে পলায়ন করছে, যা আমরা প্রত্যক্ষ করলাম।
এই যাত্রায় তাতারী বাহিনীর লক্ষ্য হত্যা, লুণ্ঠন, কিংবা জনপদ ধ্বংস করা ছিল না। তাদের লক্ষ্য ছিল সুস্পষ্ট। তাদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল মুসলিমপ্রধান সম্রাটকে পাকড়াও করা। তারা গনিমত সঞ্চয় কিংবা হত্যার পেছনে পড়ে সময় বিনষ্ট করতে চায়নি। অন্য দিকে তাদের বাধা দিলে পাল্টা আক্রমণ ও বিপদের শঙ্কায় সাধারণ জনগণও তাদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।
এভাবেই তাতারী বাহিনী অল্প কিছুদিনের ভেতরে নিশাপুর শহরের নিকটে পৌঁছল। সম্রাট মুহাম্মদ ইবনে খাওয়ারেষম শাহ সেনাবাহিনী সুসংহত করার সুযোগ পাননি। সময় ছিল খুবই সংকীর্ণ। আর দুর্বার তাতারী বাহিনী ছিল তাঁর পেছনে। তারা নিশাপুরের কাছাকাছি পৌঁছেছে শুনে সম্রাট নিশাপুর ছেড়ে (ইরানের এক শহর) 'মাজিন্দারান' অভিমুখে রওয়ানা হলেন। তাতারী বাহিনী এ সংবাদ পেয়ে নিশাপুর গমন না করেই তাঁর পিছু ধাওয়া করল। ফলে সম্রাট মাজিন্দারান ছেড়ে রায়নগরী অতঃপর হামাদান নগরীর অভিমুখে রওয়ানা হলেন (রায় ও হামাদান ইরানের দুটি শহরের নাম)। তাতারী বাহিনী তাঁর পিছু পিছুই রয়েছে। এরপর সম্রাট মাজিন্দারান শহরে পালিয়ে এলেন। এ পলায়নপরতা সম্রাটের জন্য ছিল বড়ই লজ্জা ও অপমানকর। তারপর সম্রাট কাযবীন সমুদ্রতীরে অবস্থিত তবারিস্তান অঞ্চলের দিকে রওয়ানা হলেন। তিনি সেখানে একটি জাহাজে আরোহণ করে সমুদ্রের মাঝে চলে গেলেন। তাতারী বাহিনী সমুদ্র পাড়ে দাঁড়িয়ে রইল। সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার মতো তারা কোনো নৌযান পেল না।
এতক্ষণে সফল হলেন মুসলিম সম্রাট খাওয়ারেষম শাহ!! সফল হলো তাঁর পলায়নপরতা।
মুহাম্মদ ইবনে খাওয়ারেষম শাহ কাযবীন সমুদ্রের মধ্যখানে অবস্থিত একটি দ্বীপে আশ্রয় গ্রহণ করলেন। তিনি সেখানকার একটি দুর্গে অবস্থান করলেন। আহ! হতদরিদ্র অবস্থায় দুর্বিষহ জীবনযাপন। তিনি সেই সম্রাট, যিনি সুবিশাল বিস্তৃত সাম্রাজ্য ও অঢেল সম্পত্তির মালিক। কিন্তু মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচার জন্য বিভীষিকাময় জীবনযাপন পেয়েও তিনি সন্তুষ্টচিত্ত।
সুবহানাল্লাহ! মৃত্যুর হাত থেকে তো কেউই বাঁচতে পারবে না। কয়েক দিন অতিবাহিত না হতেই সেই উপত্যকার দুর্গের ভেতরে পলায়নপর ঘরছাড়া হতদরিদ্র অবস্থায় মুসলিম সম্রাট মুহাম্মদ ইবনে খাওয়ারেষম শাহ ইন্তেকাল করেন। এমনকি তারা কাফন দেওয়ার মতো কিছু পায়নি। অবশেষে যে বিছানায় তিনি ঘুমাতেন, সেই বিছানাতেই তাঁকে কাফন দেওয়া হয়!!!
📄 কোন অবস্থার মৃত্যু সম্মানজনক
বন্ধুরা, বলুন তো, কোন অবস্থার মৃত্যু সম্মানজনক? সমুদ্রপৃষ্ঠের উপত্যকায় অপমানিত অবস্থায় মুসলিম সম্রাটের মৃত্যুবরণ, নাকি জিহাদের ময়দানে প্রশান্ত মনে মাথা উঁচিয়ে মৃত্যুবরণ সম্মানজনক?! অগ্রবর্তী অবস্থায় নাকি পশ্চাৎপদ অবস্থায় মৃত্যুবরণ সম্মানজনক? পলায়নপর অবস্থার নাকি শহীদের অমীয় সুধা পান করা অবস্থার মৃত্যুবরণ উত্তম?
মানুষ নিজের মৃত্যুক্ষণ নির্ধারণ করতে পারে না। তবে মৃত্যুপদ্ধতি নির্ধারণ করতে পারে। কোনো বীর বাহাদুর হায়াত হ্রাস করতে পারে না, যেমন কাপুরুষতা ও পলায়নপরতা হায়াত বৃদ্ধি করতে পারে না। যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় মুজাহিদ হয়ে বেঁচে থাকে, সে আল্লাহর রাস্তায় মুজাহিদ অবস্থায় ইন্তেকাল করে। যদিও তার মৃত্যু হয় নিজ বিছানার ওপর।
ইমাম মুসলিম রহ. হযরত সাহল ইবনে হুনাইফ রা. এর সূত্রে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—
"যে ব্যক্তি হৃদয়ের গভীর থেকে শাহাদাত কামনা করে। আল্লাহ তা'আলা তাকে শহীদদের মর্যাদা দান করবেন। যদিও সে নিজ বিছানার শোয়া অবস্থায় ইন্তেকাল করে।”
ইবনে আছীর রহ. মুহাম্মদ ইবনে খাওয়ারেষম শাহের ব্যক্তিগত জীবন আলোচনা করতে গিয়ে কিছু অদ্ভুত বিষয়ের অবতারণা করেছেন। তার গুণাবলি পাঠ করলে আপনার মনে হবে আপনি যেন বিখ্যাত কোনো মুসলিম মনীষীর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। পক্ষান্তরে যখন তাঁর জীবনের শেষ মুহূর্তে তার পলায়নপরতা এবং কাপুরুষতা নিয়ে আলোচনা করবেন, তখন সম্পূর্ণ ভিন্নরূপ ফুটে উঠবে।
ইবনে আছীর রহ. তার জীবনী আলোচনা করতে গিয়ে বলেন—
"তাঁর রাজত্বকাল ছিল প্রায় একুশ বছর কয়েক মাস। তা সুবিশাল বিস্তৃতি লাভ করেছিল। গোটা বিশ্ব তার অনুগত হয়েছিল। ইরাক থেকে তুরকিস্তান, আফগানিস্তান, হিন্দুস্তানের কিছু প্রদেশ, সিজিস্তান, পাকিস্তান, তবারিস্তান, জুরজান, খোরাসান এবং পারস্যের কিছু এলাকা পর্যন্ত তাঁর রাজত্ব বিস্তৃত ছিল।”
ইবনে আছীর রহ. এর উল্লেখিত বক্তব্য থেকে একথা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, তিনি নিজ রাজত্ব ও মহিমায় ছিলেন সুমহান ব্যক্তিত্ব। এখান থেকে তাঁর রাজ্য পরিচালনার দক্ষতা ও বিচক্ষণতার বিষয়টিই প্রতিভাত হয়। এমনকি ইবনে আছীর রহ. বলেন—
"তিনি কষ্ট-ক্লেশে পাহাড়সম ধৈর্যশীল ছিলেন। প্রচুর সফর করতেন। আয়েষী বা বিলাসী ছিলেন না। সর্বদা তিনি রাজ্য পরিচালনা ও রক্ষা এবং প্রজাদের জান-মাল হেফাজতের বিষয়ে ব্যস্ত থাকতেন।" এবং তার ইলমী জীবন পর্যালোচনা করতে গিয়ে তিনি বলেন—
"তিনি ছিলেন মহৎ আলেম। উলামায়ে কেরামকে যথার্থ সম্মান করতেন। তাদের ভালোবাসতেন। তাদের প্রতি সদাচরণ করতেন। তার দরবারে উলামায়ে কেরামের মজলিস ও মুনাজারা (তর্ক-বিতর্ক) অনুষ্ঠান প্রচুর পরিমাণে আয়োজিত হতো। তিনি দ্বীনদার লোকদের খুব সম্মান করতেন। নিজে তাদের কাছে যেতেন এবং তাদের সাহচর্যে বরকত লাভ করতেন।"
মুহাম্মদ ইবনে খাওয়ারেষম শাহের উল্লেখিত গুণাবলি পাঠকমহলকে ধাঁধায় ফেলে দেয় যে, এমন উত্তম গুণাবলির অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও এরূপ নিকৃষ্ট পরাজয়ের শিকার কেন হলেন? কী করে? কেন তিনি তাতারী বাহিনীকে প্রতিহত করার জন্য সুবিশাল বিস্তৃত রাজ্যের প্রদেশগুলোর সহযোগিতা পেলেন না? ফলে এই নিকৃষ্ট সমাপ্তির শিকার হলেন?!
আমিও বিষয়টি নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলাম। এর সঠিক কারণ অনুসন্ধান করছিলাম। বহু খোঁজাখুঁজির পর অন্য এক জায়গায় ইবনে আছীর রহ.-এর লিখিত এক বক্তব্য খুঁজে পেলাম। তার এই বক্তব্যে মুহাম্মদ ইবনে খাওয়ারেষম শাহের পরাজয় ও সহযোগিতা না পাওয়ার কারণ ফুটে উঠেছে। ইবনে আছীর রহ. বলেন—
“মুহাম্মদ ইবনে খাওয়ারেষম শাহ সাম্রাজ্যের প্রত্যেকটি প্রদেশের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। রাজা-বাদশাদের হত্যা করেছিলেন। সাম্রাজ্যের একনায়করূপে তিনিই অবশিষ্ট ছিলেন। ফলে তাতারী হামলার সময় তাঁর পাশে দাঁড়ানোর মতো কিংবা তাঁকে সাহায্য করার মতো কেউই বেঁচে ছিল না।”
উল্লেখিত বক্তব্য তৎকালীন মুসলিম জাতির ব্যাপক অধঃপতনের সুস্পষ্ট বিবরণ তুলে ধরছে। একথা চিরসত্য যে, ব্যক্তিগত জীবন ও রাজ্য পরিচালনায় মুহাম্মদ ইবনে খাওয়ারেষম শাহ ছিলেন দক্ষ ও বিচক্ষণ সম্রাট। তবে তিনি পার্শ্ববর্তী মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে যাবতীয় সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন। তাদের প্রতি কখনোই সহযোগিতার হাত সম্প্রসারিত করেননি; বরং বিপরীতে একের পর এক সবাইকে হত্যা করেছেন। রাজাদের হত্যা করে তিনি সেসব রাজ্য নিজের দখলে নিয়ে নিতেন। নিঃসন্দেহে তাঁর এই কূটকৌশল এসব অঞ্চলের প্রজাদের ভেতরে চাপা ক্ষোভ সৃষ্টি করেছিল। এক্ষেত্রে তিনি প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। পক্ষান্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবনচরিত্রের দিকে দেখুন, তিনি কোনো অঞ্চল নিজের করলে পূর্বেকার রাজাকে সেই রাজ্য পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করতেন। তাদের ঘরবাড়ি অক্ষত রাখতেন। এতে মুসলিম রাজ্যের পরিধি বিস্তৃতি লাভ করার পাশাপাশি মানুষের ভালোবাসা অর্জিত হতো।
এই ছিল সুবিশাল বিস্তৃত রাজ্যের সম্রাট, প্রতাপপ্রবল বিপুল সৈন্যের সেনাপতি মুহাম্মদ ইবনে খাওয়ারেষম শাহের অধঃপতনের মূল রহস্য। যার শেষ পরিণতি হয়েছিল পলায়নপর অবস্থায় সমুদ্রপৃষ্ঠে নির্জন দ্বীপে একাকী অনাহারে মৃত্যু!!
টিকাঃ
১৯. সুরা নিসা: ৭৮।
২০. মুসলিম: ১৯০৯।