📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 ৬১৭ হিজরীতে কী ঘটেছিল?

📄 ৬১৭ হিজরীতে কী ঘটেছিল?


৬১৭ হিজরীতে যা ঘটেছিল তার বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 সমরকন্দ অভিমুখে তাতারী বাহিনী

📄 সমরকন্দ অভিমুখে তাতারী বাহিনী


তাতারী বাহিনী সুবিশাল বিস্তৃত বুখারা শহর ও বুখারার অধিবাসী জনপদ, মসজিদ ও মাদরাসাসমূহ ধ্বংস করার পর পার্শ্ববর্তী শহর সমরকন্দ অভিমুখে রওয়ানা হয়। (সমরকন্দ বর্তমান উজবেকিস্তান রাজ্যের একটি শহর।) তারা বুখারা থেকে বিপুলসংখ্যক মুসলিম বন্দীদের নিয়ে রওয়ানা হয়। ইবনে আছীর রহ. বলেন, অতি নিকৃষ্ট পন্থায় তারা তাদের সঙ্গে নিয়ে চলল। কেউ দুর্বল হয়ে হাঁটতে না পারলে তাকে হত্যা করে ফেলত।

কেন তারা বন্দী মুসলমানদের সঙ্গে নিল? বিভিন্ন কারণে তারা মুসলমান বন্দীদের সঙ্গে নিয়েছিল-
এক. তারা প্রত্যেক দশজনের দলকে তাদের পতাকা প্রদান করেছিল। যাতে তারা তাতারীদের পতাকা উঁচিয়ে চলে। দূর থেকে কেউ তাদের দেখলে যেন মনে করে যে, এরাও তাতারীদের দলভুক্ত। ফলে শত্রুবাহিনী তাদের বিপুলসংখ্যক মনে করে যুদ্ধ করার কল্পনাও না করে। এতে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বেই শত্রুপক্ষ মানসিকভাবে হেরে যেত।

দুই. তারা বন্দীদের শত্রুদের বিপক্ষে যুদ্ধ করতে বাধ্য করত। কেউ যুদ্ধ করতে অস্বীকার করলে কিংবা কারও মাঝে যুদ্ধ করার মতো শক্তি না থাকলে তারা তাকে হত্যা করে ফেলত।

তিন. তাতারীরা তাদের রণক্ষেত্রে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করত। তাদের প্রথম কাতারে দাঁড় করাত। পেছনে তারা আত্মরক্ষা করত। তাদের পেছন থেকে তারা তির-বর্শা নিক্ষেপ করত। মুসলমান বন্দীরা নিজেদের জীবন দিয়ে তাদের জীবন রক্ষা করত।

চার. শহরের প্রধান ফটকগুলোতে তাতারীরা মুসলমান বন্দীদের রক্তবন্যা বইয়ে দিত। যাতে শত্রুদের অন্তরে তাদের ভীতি ছড়িয়ে পড়ে এবং যেন একথা জানতে পারে যে, যে-ই তাতারীদের বিরোধিতা করবে এমন হবে তার শেষ পরিণতি।

পাঁচ. কোথাও তাতারী সৈন্যরা বন্দী হলে মুসলমান বন্দীদের বিনিময়ে তারা নিজেদের বন্দীদের ফিরিয়ে নিত। তবে এমন খুব কমই ঘটেছে। কারণ, তাতারীরা খুব কমই হেরেছে।

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 সমরকন্দ পরাজয়ের বিবরণ

📄 সমরকন্দ পরাজয়ের বিবরণ


সে সময় সমরকন্দ ছিল দুনিয়ার সবচেয়ে সভ্য ও ধনী নগরী। শহরটি ছিল সুউচ্চ প্রাচীর ও মজবুত দুর্গে বেষ্টিত। শহরটি রণকৌশলগত দিক থেকে শক্তিশালী ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার কারণে সম্রাট মুহাম্মদ ইবনে খাওয়ারেষম শাহ তা সংরক্ষণের জন্য পঞ্চাশ হাজার খাওয়ারেষমী সৈন্য নিয়োগ দেন। তা ছিল নাগরিক সংখ্যার প্রায় অর্ধেক। শহরটির জনসংখ্যা ছিল আনুমানিক লক্ষাধিক। এদিকে মুহাম্মদ ইবনে খাওয়ারেষম শাহ তখন উরজিন্দা (তুর্কমেনিস্তান) রাজধানীতে অবস্থান করতেন।

চেঙ্গিজ খান সমরকন্দে পৌঁছে চারপাশ থেকে তা ঘিরে ফেলে। এ অবস্থায় খাওয়ারেষমের সুসংগঠিত সৈন্যবাহিনী মোকাবেলার উদ্দেশ্যে দুর্গ থেকে বেরিয়ে আসাই পরিস্থিতির দাবি ছিল। কিন্তু আফসোস! তারা ভীত-বিহ্বল হয়ে পড়ে। জীবনকে তারা লাঞ্ছনার অতল গহ্বরে নিক্ষেপ করে। তারা শহর রক্ষার স্বার্থে বের হতে অস্বীকৃতি জানায়।

অবশেষে শহরবাসী সৈন্যদলের পক্ষ থেকে কোনোরূপ সহযোগিতার আশ্বাস না পেয়ে একত্রিত হয়ে এ বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে শুরু করে। কতিপয় পাহাড়সম সুদৃঢ় মনোবলচিত্ত সাধারণ লোক তাতারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। যেই সিদ্ধান্ত সেই কাজ! কৃষক-মজুর, ছাত্র-শিক্ষক ও শহরের দৃঢ়সাহসী যুবকদের সত্তর হাজার তাজাপ্রাণ তাতারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। তারা সবাই পদব্রজে বেরিয়ে পড়ে। তাদের সঙ্গে কোনো ঘোড়া কিংবা উট তথা কোনো বাহন ছিল না। তাদের কাছে উল্লেখযোগ্য যুদ্ধসরঞ্জামাদিও ছিল না, যা দিয়ে তারা শত্রুর মোকাবেলা করতে পারে। এত কিছুর পরেও তারা সেই দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়েছে, সেনাবাহিনীর যে দায়িত্ব আঞ্জাম দেওয়ার কথা ছিল। আফসোস! তাদের সেই দায়িত্ববোধ জাগ্রত হলো না, তাদের ভেতরে আত্মমর্যাদাবোধ জাগ্রত হলো না।

তাতারীরা সমরকন্দবাসীকে বের হতে দেখে মারাত্মক ধোঁকার আশ্রয় নিল। তারা প্রথমত পলায়নপরভাব প্রকাশ করলে শহরের চারপাশের প্রাচীর পথে তারা প্রত্যাবর্তন শুরু করে। এদিকে মুসলিম মুজাহিদরা শহর ছেড়ে বেরিয়ে পড়লে তারা শহর দখল করে নেয়। এভাবেই তাতারীদের রণকৌশল সফল হয়। রণকৌশলে অনভিজ্ঞ মুসলিম মুজাহিদরা যখন শহর থেকে বহু দূরে চলে যায়, তখন তাতারী বাহিনী মুসলমানদের বেষ্টন করে ফেলে। শুরু হয় মুসলিম নিধন, নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ!

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 এই অপ্রতিরোধ্য হত্যাযজ্ঞে নিহত মুসলমানদের সংখ্যা

📄 এই অপ্রতিরোধ্য হত্যাযজ্ঞে নিহত মুসলমানদের সংখ্যা


তারা সকলকে হত্যা করেছে...!! মুসলমানদের সর্বশেষ ব্যক্তিও শহীদ হয়েছে ...!!

মুসলমানগণ সমরকন্দ যুদ্ধে তাতারীদের এক অভিযানে সত্তর হাজার মুসলিম সেনা হারিয়েছে। (একটু ভেবে দেখুন, সেদিন মুসলমানগণ কীরূপ বেদনাবিভোর হয়েছিলেন, যেদিন তারা সত্তর হাজার সৈন্য হারিয়েছিলেন!!) এটা কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না; বরং যা হবার ছিল তা-ই হয়েছে। এ যুদ্ধে মুসলমানগণ যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ না করা ও নবপ্রজন্মকে রণকৌশল শিক্ষা না দেওয়ার মূল্য দিয়েছে। মূল্য দিয়েছে শক্তিশালী শত্রুর প্রতি মনোনিবেশ না করার।

ফলে তাতারীরা নব উদ্যমে সমরকন্দ অবরোধ করতে ফিরে এসেছে। আর সুসংহত খাওয়ারেষমী সৈন্যবাহিনী লাঞ্ছনার জীবন বেছে নিয়েছে!!

তারা নিরাপত্তার বিনিময়ে সমরকন্দ শহর তাতারীদের হাতে অর্পণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অথচ তারা খুব ভাল জানত যে, তাতারী জাতি প্রতিশ্রুতি রক্ষায় শ্রদ্ধাশীল নয়, তারা কোনো সন্ধিচুক্তি রক্ষা করে না। বুখারার পবিত্র ভূমিতে মুসলিমনিধনের ঘটনা খুব দূরের নয়! কিন্তু হায়! তারা জীবনের মায়া ত্যাগ করতে পারেনি! সাধারণ জনগণ তাদের বলেছিল, তাদের সঙ্গে তাতারীরা কী আচরণ করেছে, তা তো ইতিহাসের পাতায় সমুজ্জ্বল। তবু তারা তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করার কল্পনাও করতে পারত না। অভ্যাসমতো তাতারীরা সমরকন্দবাসীকে ভুয়া নিরাপত্তা প্রদানে একমত হলো। সৈন্যবাহিনী তাদের জন্য সমরকন্দ শহর উন্মুক্ত করে দিল। সাধারণ জনগণ কিছুতেই তাদেরকে বাধা দিতে পারল না। খাওয়ারেষমের সৈন্যরা নিজ গোত্রে ছিল বাঘ, আর শত্রুবাহিনীর সামনে ছিল বিড়াল!!

তারা তাতারী বাহিনীর সামনে কাতর আত্মসমর্পণ করল। তাতারীরা তাদের বলল, তোমাদের অস্ত্র-শস্ত্র, ধন-সম্পত্তি ও বাহনজন্তুগুলো আমাদের হাতে অর্পণ করো। আমরা তোমাদের নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাব। তারা নতিস্বীকারকরতঃ হুকুম তামিল করল। তাতারীরা তাদের অস্ত্র-শস্ত্র ও বাহন জন্তুগুলো নিয়ে নেওয়ার পর তা-ই করল, যা তাতারী জাতির কাছে আশা করা যায়। তারা তরবারি কোষমুক্ত করে তাদের সবাইকে নির্দয়ভাবে হত্যা করল। মুসলিম সেনারা মনোবলহীনতার প্রতিদান দিল!! লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ!

এরপর তাতার বাহিনী রক্তে ভাসমান সমরকন্দে প্রবেশ করে সেই সব ঘৃণ্য কাজে লিপ্ত হলো, ইতিপূর্বে তারা বুখারায় যেসব কাজে লিপ্ত হয়েছিল। তারা অগণিত নারী-পুরুষ ও শিশু বাচ্চাদের হত্যা করল। শহরের সব সম্পত্তি ছিনিয়ে নিল। নারীদের ইজ্জত-সম্ভ্রম কেড়ে নিল। লোকদের বিভিন্ন ধরনের মর্মান্তিক শাস্তি দিল। অসংখ্য শিশু ও নারী বন্দী করল। বয়সের ভার কিংবা শারীরিক দুর্বলতার কারণে যারা বন্দী উপযুক্ত ছিল না, তাদের অমানবিক হত্যা করল। কেন্দ্রীয় মসজিদ জ্বালিয়ে দিল। সমরকন্দ শহরকে বিরানভূমিতে পরিণত করল।

আহ! পৃথিবীর মুসলমানগণ এই হত্যাযজ্ঞের কথা শুনে কীভাবে আরাম আয়েশে বিভোর ছিল!! গগনবিদারী আহাজারি কি তাদের কানে পৌঁছেনি?! তবু কেন তারা তাতারীদের বিরুদ্ধে সঙ্ঘবদ্ধ হলো না?!

ধন-সম্পত্তি, ইজ্জত-সম্মান, জান-প্রাণ ও দ্বীন-ধর্ম নিশ্চিত ধ্বংস জেনেও তারা কীভাবে বিভাজন-বিভক্তি, আত্মকলহ ও দ্বন্দ্ব-সংঘাতে লিপ্ত থেকেছে?! মুসলিম শাসকবৃন্দ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্য পরিচালনা করত এবং সেখানে স্বাধীন পতাকা উত্তোলন করত। তারা একথা বিশ্বাস করত যে, যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের ক্ষুদ্র রাজ্যে যুদ্ধ বিগ্রহ সৃষ্টি না হয়, ততক্ষণ তারা নিরাপদ জীবনযাপন করবে!! তারা ভুয়া নিরাপত্তার স্বপ্নে বিভোর হয়ে নিজেদের ধোঁকা দিত। এমনকি নিজ রাজ্য থেকে কয়েক মাইল দূরেও যুদ্ধ হলে তাদের টনক নড়ত না! আমার কথা শুনে আপনি বিস্ময়াভিভূত হবেন না! অনুগ্রহপূর্বক আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে বলুন তো, কয়জন মুসলিম সৈন্য ফালুজা বা ফিলিস্তিনের মুসলমানদের বাঁচানোর জন্য গা নড়ে বসেছে? কয়জন মুসলিম সৈন্য ফিলিস্তিনীদের বাঁচাও, বাঁচাও আর্তনাদ শুনে শিহরিত হয়েছে?!

মুসলিম শাসকগণ একথা চিন্তা করেননি যে, তারা এই ভয়ানক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন। বুখারা ও সমরকন্দ এলাকায় যে হত্যাযজ্ঞ ঘটেছে, তা সকল মুসলমানের ভবিষ্যৎ অবশ্যম্ভাবী ভয়ানক পরিস্থিতির ভূমিকামাত্র। কাছের দূরের কেউই তা থেকে রক্ষা পাবে না। ওয়া লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00