📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 ৬১৭ হিজরী মুসলিম উম্মাহর রাজনৈতিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের বছর

📄 ৬১৭ হিজরী মুসলিম উম্মাহর রাজনৈতিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের বছর


শুরু হলো ৬১৭ হিজরী।
ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আবির্ভাবের পর থেকে আজ পর্যন্ত ৬১৭ হিজরীর চেয়ে অধিক ভয়াবহ ও মর্মান্তিক কোনো বছর মুসলিম উম্মাহর ওপর অতিক্রম হয়নি। সে বছর তাতারীদের গগন তারকা মধ্যাকাশে জ্বলজ্বল করছিল। মুসলিম সাম্রাজ্য তাতারী আগ্রাসনের থাবায় পরিণত হয়েছিল। যার নজির পৃথিবীর ইতিহাসে নেই। তারা এমন সব অপকর্ম ও ভয়াবহ দুর্টনার অবতারণ করেছে যে, যা কেউ শোনেনি, কেউ কখনো কল্পনাও করেনি।

তাতারী আগ্রাসনের বিবরণ উল্লেখ করার পূর্বে আমি ভূমিকাস্বরূপ ইসলামী ইতিহাসবিদ ইবনে আছীর জাযারী রহ. এর উক্তি উল্লেখ করাকে যথার্থ মনে করছি। এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ। অন্যের তুলনায় এ বিষয়ে তাঁর অভিমত অধিক মূল্যবান। কারণ, তিনি ছিলেন তাতারী আগ্রাসনের সমসাময়িক।

শুনুন! ঐতিহাসিক ইবনে আছীর রহ. কী বলেন? তিনি তাতারী হামলার ইতিহাস লিখতে গিয়ে তার মনোবেদনা ও হৃদয়-যন্ত্রণা চেপে রাখতে পারেননি। তিনি বলেন—

"এ ঘটনা এমনই লোমহর্ষক ও হৃদয়বিদারক যে, কয়েক বছর আমি লিখব কি লিখব না এই দ্বন্দেই ছিলাম। একবার ভাবি লিখব, আরেকবার ভাবি না, লিখব না। আসলে ইসলামের দুর্দশা এবং মুসলিম উম্মাহর সর্বনাশের কাহিনি লিখতে পারে এমন কলিজা কারই বা আছে। হায়! যদি আমার জন্মই না হতো, কিংবা এর আগেই আমি মরে যেতাম এবং আমার অস্তিত্ব বিস্মৃত হয়ে যেত। কিন্তু কিছু বন্ধুর দাবি, এ ঘটনা আমি যেন ইতিহাসের পাতায় সংরক্ষণ করি। তবু দ্বিধাদ্বন্দ্বেই ছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভেবে দেখলাম, না লেখার মধ্যেও কোনো ফায়েদা নেই।

এ ছিল এমন বিপদ ও দুর্যোগ যার দৃষ্টান্ত পৃথিবীর ইতিহাসে আর নেই। যদিও এর প্রধান শিকার ছিল মুসলিম জাতি, তবুও এর বিস্তার ছিল অন্যান্য জাতি পর্যন্ত। কেউ যদি দাবি করে যে, আদম আ. থেকে আজ পর্যন্ত দুনিয়ায় এমন ঘটনা আর ঘটেনি, তাহলে তার দাবি মিথ্যা হবে না। কারণ, এর ধারে-কাছের ঘটনাও ইতিহাসের পাতায় নেই এবং কেয়ামত পর্যন্ত সম্ভবত দুনিয়া এমন ঘটনা আর দেখবে না, ইয়াজুজ- মা'জুজের ঘটনা ছাড়া। নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ কারও প্রতি এই পশুরা কোনো দয়া করেনি। যাকে পেয়েছে তাকেই খুন করেছে, পেট ফেড়ে গর্ভের সন্তান পর্যন্ত। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। লা হাওলা ওয়ালাকুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহিল আলিইয়িল আজীম।

এ ফেতনা ছিল বিশ্বব্যাপী ও সর্বগ্রাসী। যা এক ভয়ংকর তুফানের মতো ধেয়ে এসেছিল এবং সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিল।”১৮

টিকাঃ
১৮ ইবনে আছীর রচিত আল কামিল: ১৩/২০১-২০৩।

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 ৬১৭ হিজরীতে কী ঘটেছিল?

📄 ৬১৭ হিজরীতে কী ঘটেছিল?


৬১৭ হিজরীতে যা ঘটেছিল তার বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 সমরকন্দ অভিমুখে তাতারী বাহিনী

📄 সমরকন্দ অভিমুখে তাতারী বাহিনী


তাতারী বাহিনী সুবিশাল বিস্তৃত বুখারা শহর ও বুখারার অধিবাসী জনপদ, মসজিদ ও মাদরাসাসমূহ ধ্বংস করার পর পার্শ্ববর্তী শহর সমরকন্দ অভিমুখে রওয়ানা হয়। (সমরকন্দ বর্তমান উজবেকিস্তান রাজ্যের একটি শহর।) তারা বুখারা থেকে বিপুলসংখ্যক মুসলিম বন্দীদের নিয়ে রওয়ানা হয়। ইবনে আছীর রহ. বলেন, অতি নিকৃষ্ট পন্থায় তারা তাদের সঙ্গে নিয়ে চলল। কেউ দুর্বল হয়ে হাঁটতে না পারলে তাকে হত্যা করে ফেলত।

কেন তারা বন্দী মুসলমানদের সঙ্গে নিল? বিভিন্ন কারণে তারা মুসলমান বন্দীদের সঙ্গে নিয়েছিল-
এক. তারা প্রত্যেক দশজনের দলকে তাদের পতাকা প্রদান করেছিল। যাতে তারা তাতারীদের পতাকা উঁচিয়ে চলে। দূর থেকে কেউ তাদের দেখলে যেন মনে করে যে, এরাও তাতারীদের দলভুক্ত। ফলে শত্রুবাহিনী তাদের বিপুলসংখ্যক মনে করে যুদ্ধ করার কল্পনাও না করে। এতে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বেই শত্রুপক্ষ মানসিকভাবে হেরে যেত।

দুই. তারা বন্দীদের শত্রুদের বিপক্ষে যুদ্ধ করতে বাধ্য করত। কেউ যুদ্ধ করতে অস্বীকার করলে কিংবা কারও মাঝে যুদ্ধ করার মতো শক্তি না থাকলে তারা তাকে হত্যা করে ফেলত।

তিন. তাতারীরা তাদের রণক্ষেত্রে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করত। তাদের প্রথম কাতারে দাঁড় করাত। পেছনে তারা আত্মরক্ষা করত। তাদের পেছন থেকে তারা তির-বর্শা নিক্ষেপ করত। মুসলমান বন্দীরা নিজেদের জীবন দিয়ে তাদের জীবন রক্ষা করত।

চার. শহরের প্রধান ফটকগুলোতে তাতারীরা মুসলমান বন্দীদের রক্তবন্যা বইয়ে দিত। যাতে শত্রুদের অন্তরে তাদের ভীতি ছড়িয়ে পড়ে এবং যেন একথা জানতে পারে যে, যে-ই তাতারীদের বিরোধিতা করবে এমন হবে তার শেষ পরিণতি।

পাঁচ. কোথাও তাতারী সৈন্যরা বন্দী হলে মুসলমান বন্দীদের বিনিময়ে তারা নিজেদের বন্দীদের ফিরিয়ে নিত। তবে এমন খুব কমই ঘটেছে। কারণ, তাতারীরা খুব কমই হেরেছে।

📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 সমরকন্দ পরাজয়ের বিবরণ

📄 সমরকন্দ পরাজয়ের বিবরণ


সে সময় সমরকন্দ ছিল দুনিয়ার সবচেয়ে সভ্য ও ধনী নগরী। শহরটি ছিল সুউচ্চ প্রাচীর ও মজবুত দুর্গে বেষ্টিত। শহরটি রণকৌশলগত দিক থেকে শক্তিশালী ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার কারণে সম্রাট মুহাম্মদ ইবনে খাওয়ারেষম শাহ তা সংরক্ষণের জন্য পঞ্চাশ হাজার খাওয়ারেষমী সৈন্য নিয়োগ দেন। তা ছিল নাগরিক সংখ্যার প্রায় অর্ধেক। শহরটির জনসংখ্যা ছিল আনুমানিক লক্ষাধিক। এদিকে মুহাম্মদ ইবনে খাওয়ারেষম শাহ তখন উরজিন্দা (তুর্কমেনিস্তান) রাজধানীতে অবস্থান করতেন।

চেঙ্গিজ খান সমরকন্দে পৌঁছে চারপাশ থেকে তা ঘিরে ফেলে। এ অবস্থায় খাওয়ারেষমের সুসংগঠিত সৈন্যবাহিনী মোকাবেলার উদ্দেশ্যে দুর্গ থেকে বেরিয়ে আসাই পরিস্থিতির দাবি ছিল। কিন্তু আফসোস! তারা ভীত-বিহ্বল হয়ে পড়ে। জীবনকে তারা লাঞ্ছনার অতল গহ্বরে নিক্ষেপ করে। তারা শহর রক্ষার স্বার্থে বের হতে অস্বীকৃতি জানায়।

অবশেষে শহরবাসী সৈন্যদলের পক্ষ থেকে কোনোরূপ সহযোগিতার আশ্বাস না পেয়ে একত্রিত হয়ে এ বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে শুরু করে। কতিপয় পাহাড়সম সুদৃঢ় মনোবলচিত্ত সাধারণ লোক তাতারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। যেই সিদ্ধান্ত সেই কাজ! কৃষক-মজুর, ছাত্র-শিক্ষক ও শহরের দৃঢ়সাহসী যুবকদের সত্তর হাজার তাজাপ্রাণ তাতারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। তারা সবাই পদব্রজে বেরিয়ে পড়ে। তাদের সঙ্গে কোনো ঘোড়া কিংবা উট তথা কোনো বাহন ছিল না। তাদের কাছে উল্লেখযোগ্য যুদ্ধসরঞ্জামাদিও ছিল না, যা দিয়ে তারা শত্রুর মোকাবেলা করতে পারে। এত কিছুর পরেও তারা সেই দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়েছে, সেনাবাহিনীর যে দায়িত্ব আঞ্জাম দেওয়ার কথা ছিল। আফসোস! তাদের সেই দায়িত্ববোধ জাগ্রত হলো না, তাদের ভেতরে আত্মমর্যাদাবোধ জাগ্রত হলো না।

তাতারীরা সমরকন্দবাসীকে বের হতে দেখে মারাত্মক ধোঁকার আশ্রয় নিল। তারা প্রথমত পলায়নপরভাব প্রকাশ করলে শহরের চারপাশের প্রাচীর পথে তারা প্রত্যাবর্তন শুরু করে। এদিকে মুসলিম মুজাহিদরা শহর ছেড়ে বেরিয়ে পড়লে তারা শহর দখল করে নেয়। এভাবেই তাতারীদের রণকৌশল সফল হয়। রণকৌশলে অনভিজ্ঞ মুসলিম মুজাহিদরা যখন শহর থেকে বহু দূরে চলে যায়, তখন তাতারী বাহিনী মুসলমানদের বেষ্টন করে ফেলে। শুরু হয় মুসলিম নিধন, নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ!

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00