📄 কী উপায়ে চেঙ্গিজ খান খাওয়ারেষম শাহের ভূখণ্ডে প্রবেশ করল
ঘটনা হলো, একদল মোঘল ব্যবসায়ী খাওয়ারেযমের উতরার নামক শহরে গমন করেছিল। শহরের শাসক তাদের বন্দী করে হত্যা করল। তাদের হত্যার কারণ কী ছিল? এই কারণ উল্লেখ করতে গিয়ে ইতিহাসবিদগণ এই ঘটনার আলোচনায় বিভিন্ন মত পেশ করেন-
১. কেউ কেউ বলেন, বণিকদলটি চেঙ্গিজ খানের গুপ্তচর ছিল। সে তাদের গুপ্তচরবৃত্তি কিংবা মুসলিম সাম্রাজ্যে ফেৎনা সৃষ্টির হীন উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেছিল। এ কারণে উতরার শহরপ্রধান তাদের হত্যা করে।
২. কেউ কেউ বলেন, 'মাওরাউন নাহার' দেশে তাতারীরা মুসলমানদের ওপর আক্রমণ করেছিল এবং মালামাল ছিনতাই করেছিল। সেই আক্রমণের প্রতিশোধস্বরূপ এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল।
৩. কারও কারও অভিমত হলো, এটি ছিল তাতারী বাহিনীকে যুদ্ধের প্রতি উস্কানিমূলক ইচ্ছাকৃত ঘটনা। যাতে তাতারীরা যুদ্ধের প্রতি উদ্যত হলে মুসলিম সম্রাট খাওয়ারেযম শাহ পাল্টা আক্রমণমূলক তুরকিস্তানে প্রবেশের সুযোগ পান।
তবে এই তৃতীয় অভিমতটি অসঙ্গত মনে হয়। কারণ, তাতারী সাম্রাজ্যের প্রতি মুসলিম সম্রাট মুহাম্মদ ইবনে খাওয়ারেযম শাহের কোনোরূপ আকর্ষণ ছিল না। তিনি চাইতেন, প্রত্যেকে নিজ নিজ রাজ্যে নিরাপদে বসবাস করুক। কেউ যেন অন্যের প্রতি জুলুম-অত্যাচার না করে। প্রতিশ্রুতি রক্ষায় সবাই যেন সচেষ্ট থাকে। আর এটি একটি দুর্বোধ্য বিষয় যে, তিনি তাতারীদের সৈন্যসংখ্যা, শৌর্যবীর্য সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও তাদের উস্কিয়ে দেবেন। এটাও দুর্বোধ্য যে, তিনি তাদের শক্তি-সামর্থ্য সম্পর্কে কোনো ধারণা রাখবেন না, অথচ তারা তাঁর আষ্টেপৃষ্ঠে লেগে আছে। সর্বত্র চেঙ্গিজ খান চেঙ্গিজ খান ধ্বনি গুঞ্জরিত হচ্ছে।
৪. কোনো কোনো ইতিহাসবেত্তা বলেন, চেঙ্গিজ খান কতিপয় তাতারী ব্যবসায়ীকে হত্যার উদ্দেশ্যেই কিছু গুপ্তচর মুসলিম ভূখণ্ডে প্রেরণ করেছিল। যাতে কালের দুর্যোগে তা-ই যুদ্ধের কারণে পরিণত হয়। এই অভিমতটিও ভিত্তিহীন।
৫. কেউ কেউ বলেন, সম্রাট খাওয়ারেযম শাহ সম্পত্তির লোভে তাদের হত্যা করে।
মোটকথা, ব্যবসায়ীদের হত্যার কারণ হিসেবে ইতিহাসের কিতাবাদিতে উল্লেখিত কারণগুলো খুঁজে পাওয়া যায়। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সবগুলোর শেষফল হলো ব্যবসায়ী (বা গুপ্তচর)-রা নিহত হয়েছিল।
চেঙ্গিজ খানের নিকট এই হতাহতের সংবাদ পৌঁছলে সে সম্রাট মুহাম্মদ ইবনে খাওয়ারেযম শাহের নিকট এই মর্মে একটি চিঠি প্রেরণ করে যে, তিনি যেন হত্যাকারীদের তার কাছে হস্তান্তর করেন। সে নিজেই তাদের বিচার করবে। কিন্তু মুহাম্মদ ইবনে খাওয়ারেযম শাহ তার এই সিদ্ধান্তকে মুসলিম রাষ্ট্রের প্রতি সীমালঙ্ঘন মনে করেন। তিনি মুসলিম অপরাধীদের বিচার ভিনদেশে ভিন্ন শরীয়ত মোতাবেক হোক, এটা চাইলেন না। তবে তিনি বলেন, আমি নিজে আমার দেশে তাদের শাস্তি প্রদান করব। যদি তারা অপরাধী প্রমাণিত হয় তবে ইসলামী শরীয়ত মোতাবেক আমি তাদের শাস্তি প্রদান করব।
মুসলিম সম্রাটের এই প্রস্তাব যদিও বিশ্বের সকল ভূখণ্ডে গৃহীত হওয়ার মতো, কিন্তু চেঙ্গিজ খান এতে সন্তুষ্ট হলো না। অথবা আপনি বলুন, চেঙ্গিজ খান স্বেচ্ছায় রাজি হয়নি। কাজেই যুক্তি-তর্ক বা দলিল-প্রমাণ উপস্থাপনের কোনো সুযোগই অবশিষ্ট রইল না। বাস্তবতা হলো, চেঙ্গিজ খান পূর্ব থেকেই মুসলিম সাম্রাজ্যে হামলা করার নকশা আঁকছিল। কেউ তা প্রতিহত করতে পারবে না। সে শুধু একটু উপযুক্ত সুযোগ বা কারণ সন্ধানে ব্যতিব্যস্ত ছিল। ফলে সে এই হতাহতের ঘটনাটিকে মোক্ষম সুযোগ মনে করল।
“যখনই তারা কোনো প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সর্বদা তাদের একটি দল তা ভেঙে ছুঁড়ে মেরেছে; বরং তাদের অধিকাংশই ঈমান আনে না।”১৩
টিকাঃ
১৩ সুরা বাকারা: ১০০।
📄 শুরু হলো বর্বর তাতারীদের পৈশাচিক আক্রমণ
শুরু হলো মুসলিমবিশ্বের ওপর বর্বর তাতারী বাহিনীর পৈশাচিক আক্রমণ। বর্বর তাতারীরা সর্বপ্রথম সম্রাট খাওয়ারেযম শাহের সাম্রাজ্যের ওপর আক্রমণ করল।
চেঙ্গিজ খান বিশাল সৈন্যবাহিনীসহ অভিযান শুরু করল। অপর দিকে মুসলিম সম্রাট মুহাম্মদ ইবনে খাওয়ারেযম শাহও দলবল নিয়ে বের হলেন। একটি ভয়ানক জায়গায় তারা মুখোমুখি হলো। টানা চারদিন যুদ্ধ চলল। তা ছিল কাজাকিস্তানের সাইহুন নদীর পূর্ব প্রান্তে। বর্তমানে সেই নদীটিকে 'সারদারিয়া' বলা হয়। যুদ্ধে উভয় দলের বহুসংখ্যক সৈন্য নিহত হয়। বিশ হাজার মুসলিম সৈন্য শাহাদাতবরণ করেন। আর এর চেয়ে কয়েকগুণ বেশি নিহত হয় তাতারী সৈন্য। একপর্যায় উভয় দল যুদ্ধবিরতি করে প্রত্যাবর্তন করে। মুসলিম সম্রাট মুহাম্মদ ইবনে খাওয়ারেযম শাহ সৈন্যদের নিয়ে প্রত্যাবর্তন করেন। কারণ তিনি দেখলেন, তাতারীদের সংখ্যা অগণিত। তাই তিনি নিজ সাম্রাজ্যের বড় বড় শহর, বিশেষত রাজধানী তুর্কমেনিস্তান, রক্ষার উদ্দেশ্যে প্রত্যাবর্তন করেন। ৬১৬ হিজরীতে এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল।
এরপর মুহাম্মদ ইবনে শাহ তাঁর সাম্রাজ্যের চতুর্দিক থেকে সৈন্যবাহিনী একত্রিত করতে শুরু করেন। কিন্তু আক্ষেপের বিষয় হলো, তাঁর সাম্রাজ্যের রাজ্যগুলো ছিল শতধা বিভক্ত। এমনকি পরস্পর শত্রুভাবাপন্ন। তিনি ইরাকের আব্বাসী খেলাফত এবং অন্যান্য মুসলিম দেশগুলো থেকে পৃথক ছিলেন। ফলে বর্বর তাতারীদের বিরুদ্ধে নিরুপায় হয়ে তিনি একাকী যুদ্ধে অবতীর্ণ হন।
আমি মনে করি তাতারীদের শক্তি-সামর্থ্য, শৌর্যবীর্য কিংবা সংখ্যাধিক্যের কারণে এই ট্রাজেডি ঘটেনি; বরং এই করুণ পরাজয় ও ট্রাজেডির প্রধান ও একমাত্র কারণ হলো মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর পরস্পর বিভক্তি ও অনৈক্য। আল্লাহ তা'আলা যথার্থ বলেছেন। তিনি এরশাদ করেন—
“পরস্পরে কলহ করবে না, অন্যথায় তোমরা দুর্বল হয়ে পড়বে এবং তোমাদের হাওয়া (প্রভাব) বিলুপ্ত হবে। বিশ্বাস রাখো আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।”১৪
উক্ত আয়াতে আল্লাহ তা'আলা 'প্রভাব হারিয়ে ফেলা'কে কলহ বিবাদের ফল স্বরূপ দাঁড় করিয়েছেন। অথচ মুসলমানরা সর্বদা কলহে লিপ্ত থাকে, বিরোধিতায় মত্ত থাকে। আপনি একটু তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ইতিহাস পাঠ করলে দেখবেন, সে সময় সামান্য সময়ের জন্য তাতারী বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধবিরতি হলেই মুসলমানগণ পরস্পরে কলহে লিপ্ত হতো। একে অপরকে বন্দী করত, একে অপরকে হত্যা করত!! একথা সুনিশ্চিত যে, যারা এমন গুণের অধিকারী হবে, তারা কখনোই সাহায্যপ্রাপ্ত হয় না।
ইমাম মুসলিম রহ. সহীহ মুসলিমে হযরত ছাওবান রা.-এর সূত্রে বর্ণিত একটি হাদীস উল্লেখ করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন—
"আমি আমার উম্মতের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করেছি, যেন তিনি তাদের মহামারিতে ধ্বংস না করেন, তাদের ওপর শত্রুপক্ষের কাউকে চাপিয়ে না দেন, যে তাদের মূলোৎপাটিত করবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, হে মোহাম্মদ! আমার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হয় না। আমি তোমার উম্মতকে মহামারিতে ধ্বংস করব না। তাদের ওপর শত্রুপক্ষের কাউকে চাপিয়ে দেব না যদিও তারা সকলে একত্রিত হয়। তবে তারা একে অপরকে হত্যা করবে, একে অপরকে বন্দী করবে।”১৫
সে সময় মুসলমানরা নিজেরাই নিজেদের ধ্বংস করত। পরস্পরকে বন্দী করত। কাজেই তাতারী বাহিনী কিংবা অন্য কোনো দল তাদের ওপর বিজয় লাভ করলে আশ্চর্যের কিছু নেই। অনৈক্যের পাশাপাশি মুহাম্মদ ইবনে খাওয়ারেযম শাহের আরেকটি বড় ভুল ছিল। তা হলো, তিনি রাজধানী তুর্কমেনিস্তান হেফাজতের প্রতি পূর্ণ গুরুত্বারোপ করেছিলেন বটে, তবে সাম্রাজ্যের পূর্বাঞ্চলগুলো হেফাজতের প্রতি তিনি যথেষ্ট পরিমাণ গুরুত্বারোপ করেননি। প্রশ্ন হলো, রণকৌশলে পূর্ণ দক্ষ, বিচক্ষণ সম্রাট এমন সুস্পষ্ট ভুলে কীভাবে পতিত হলেন?
বস্তুত কৌশলগত ভুল ছিল না, ভুল ছিল আত্মিক ও চারিত্রিক। মুহাম্মদ ইবনে খাওয়ারেযম শাহ কেবল নিজের, নিজের পরিবারের ও আত্মীয়স্বজনের নিরাপত্তাবিধানের প্রতি গুরুত্বারোপ করেছিলেন। পক্ষান্তরে অন্যান্য গোত্রের নিরাপত্তাবিধানের প্রতি চরম অবহেলা প্রদর্শন করেন। নিজের সহায়-সম্পত্তি ও বাপ-দাদার সহায় সম্পত্তি পূর্ণরূপে হেফাজত করেন। অপর দিকে অন্যান্য গোত্রের ধন-সম্পদের হেফাজতের প্রতি অবহেলা প্রদর্শন করেন। সাধারণত বীরসেনানীরা বিপদসংকুল পরিস্থিতিতে ভেঙে পড়েন না। ভেঙে পড়েন না তার সৈন্যবাহিনী। চলুন দেখি, কালের দুর্বিপাক মুহাম্মদ ইবনে খাওয়ারেযম ও তার সেনাবহিনীর জন্য কী বয়ে এনেছিল?
টিকাঃ
১৪ সুরা আনফাল: ৪৬।
১৫ মুসলিম : ২৮৮৯।
📄 প্রথম অভিযানের পর চেঙ্গিজ খান কী পদক্ষেপ গ্রহণ করল?
চলুন, মুসলিম সাম্রাজ্যের দেশগুলোতে চেঙ্গিজ খানের পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করি—
📄 বুখারা আক্রমণ
চেঙ্গিজ খান তার সেনাদের নতুন আঙ্গিকে নবসাজে সজ্জিত করল এবং কাজাখস্তানের প্রত্যেকটি অঞ্চল জ্বালিয়ে দিতে অগ্রসর হলো। সর্বপ্রথম (বর্তমান উজবেকিস্তানের অঞ্চল) বুখারা অভিমুখে রওয়ানা হয়। এটি বিখ্যাত হাদীস বিশারদ খ্যাতনামা ইমাম বুখারী রহ.-এর আবাসভূমি। চেঙ্গিজ খান ৬১৬ হিজরীতে এই পুণ্যভূমি অবরোধ করে। জনপদবাসীকে আত্মসমর্পণের শর্তে নিরাপত্তা প্রদান করতে চায়। সে সময় মুহাম্মদ ইবনে খাওয়ারেযম শাহ বুখারা অঞ্চল থেকে দূরে অবস্থান করছিলেন। এতে বুখারাবাসী পেরেশান হয়ে পড়ে। কী করবে, বুঝে উঠতে পারে না। তাদের সামনে দুটি অভিমত উত্থাপিত হয়-
প্রথম অভিমত: আমরা তাতারীদের সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হব এবং আমাদের শহরকে রক্ষা করব।
দ্বিতীয় অভিমত: আমরা নিরাপত্তা গ্রহণ করি। তাতারীদের জন্য দ্বার উন্মুক্ত করে দেই। কিন্তু তারা কী জানত যে, তাতারীরা-
"কোনো মুমিনের সঙ্গে আত্মীয়তা কিংবা অঙ্গীকারের মর্যাদা রক্ষা করে না।”১৬
এভাবে বুখারাবাসী দু-দলে বিভক্ত হয়ে পড়ল। একদল মুজাহিদ, যারা যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তারা শহরে বড় দুর্গে অবস্থান করে। তাদের সঙ্গে শহরে ফকিহ ও আলেম-উলামা মিলিত হন। অপর দিকে দ্বিতীয় দল আত্মসমর্পণকারী। এরা সংখ্যায় অনেক বেশি। তারা তাতারীদের জন্য শহরের ফটক খুলে দেওয়ার এবং তাতারীদের নিরাপত্তা প্রদানের ওপর ভরসা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
তাতারীদের জন্য বুখারা শহরের দ্বার খুলে দেওয়া হলো। চেঙ্গিজ খান শহরে প্রবেশ করল। শহরে প্রবেশের প্রথম দিকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য শহরবাসীকে নিরাপত্তা প্রদান করল। এই নিরাপত্তা দুর্গে অবস্থানকারী মুজাহিদ বাহিনীর ওপর প্রভাব বিস্তার পর্যন্ত অবশিষ্ট ছিল।
চেঙ্গিজ খান দুর্গ অবরোধ করল। শহরবাসী মুসলমানদের দুর্গের চারপাশে খন্দক খননে তাদের সহযোগিতা করার নির্দেশ দিল। যাতে তারা অনায়াসে দুর্গে প্রবেশ করতে পারে। শহরবাসী চেঙ্গিজ খানের কথামতো খন্দক খননে সহযোগিতা করল!!
দীর্ঘ দশদিন তারা দুর্গ অবরোধ করে রাখল। অতঃপর বলপূর্বক দুর্গে প্রবেশ করে সকল মুজাহিদকে হত্যা করল!! বুখারা শহরে আর কোনো মুজাহিদ অবশিষ্ট রইল না।
এরপরই চেঙ্গিজ খান প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ শুরু করল। সে শহরবাসীর কাছে তাদের ধন-সম্পত্তি, অর্থ-কড়ি, স্বর্ণ-রূপা চাইল। তাদের সব সম্পত্তি নিজের করে নিল। অতঃপর পুরো মুসলিম শহরকে তার সৈন্যবাহিনী তথা তাতারীদের জন্য অবাধ ঘোষণা করল। এরপর তারা সেখানে এমনসব ঘৃণ্য কাজ করল, যা কেউ কল্পনাও করতে পারে না! আল্লামা ইবনে কাছীর রহ. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থে সেই পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন—
"তারা এত বিপুলসংখ্যক মানুষ হত্যা করেছে, যার সঠিক সংখ্যা আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না। তারা শিশু ও নারীদের বন্দী করেছে। নারীদের সঙ্গে তাদের পরিবার-পরিজনের উপস্থিতিতে অশ্লীল কর্মসাধন করেছে!! (পিতার উপস্থিতিতে মেয়ের সঙ্গে, স্বামীর উপস্থিতিতে স্ত্রীর সঙ্গে অপকর্ম করেছে!!!) যারা নিজেদের আত্মমর্যাদা রক্ষার লড়াই করেছে, তাদের তারা নির্বিচারে হত্যা করেছে। বন্দীদের বিভিন্ন ধরনের শাস্তি প্রদান করেছে। শহরের আকাশ বাতাস নারী-পুরুষ ও শিশু-কিশোরদের আর্তনাদে কেঁপে উঠেছে। এরপর তারা বুখারার মাদরাসা ও মসজিদগুলোতে আগুন লাগিয়ে দেয়। শহর পুড়ে ভস্ম হয়ে বিরানভূমিতে পরিণত হয়।”
এই ছিল ইবনে কাছীর রহ. এর বর্ণনা। আল্লাহই একমাত্র সাহায্যকারী। চিরসত্য। আল্লাহই একমাত্র সাহায্যকারী।
একটি মুসলিম শহর (বুখারা) ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলো!! ধৈর্যশীল মুজাহিদ বাহিনী ধ্বংস হলো। অনুরূপ আত্মসমর্পণকারী লাঞ্ছিত মুসলিমরাও ধ্বংস হলো।
ইমাম বুখারী ও মুসলিম রহ. উম্মুল মুমিনীন যয়নব বিনতে জাহাশ রা. এর সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করেন-
"ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমাদের মাঝে নেককার সৎ লোকেরা উপস্থিত থাকলেও কি আমরা ধ্বংস হব? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হ্যাঁ! যখন মন্দ কাজ বৃদ্ধি পাবে।”১৭
সে দেশে খুব বেশি পরিমাণে মন্দকাজ বৃদ্ধি পেয়েছিল।
একটি মন্দ কাজ হলো, নিজেদের দ্বীন-ধর্ম, ইজ্জত-সম্মান ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য মুসলমানগণ তরবারি উত্তোলন করত না।
আরেকটি মন্দ কাজ হলো, মুসলমানগণ কাফেরদের প্রতিশ্রুতিকে সত্যজ্ঞান করত।
আরেকটি মন্দ কাজ হলো, যারা জিহাদের পতাকা উত্তোলন করত, মুসলমানগণ তাদের শত্রুপক্ষের কাছে অর্পণ করত।
আরেকটি মন্দ কাজ হলো, মুসলমানগণ নিজেরা বহু দলে বিভক্ত হয়েছিল। তারা পরস্পর যুদ্ধ করত।
আরেকটি মন্দত্ব হলো, মুসলমানগণ কিতাবুল্লাহ ও সুন্নতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তথা কুরআন হাদীসের বিচার কামনা করত না।
উল্লিখিত সবকিছুই হলো মন্দত্ব! ঘৃণ্য কাজ! 'যখন মন্দ কাজ বৃদ্ধি পাবে, আবশ্যম্ভাবীভাবে ধ্বংস নেমে আসবে!' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যথার্থ বলেছেন।
এভাবেই বুখারা ৬১৬ হিজরীতে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়!!!
কিন্তু এটিই কি ছিল শেষ ট্রাজেডি? এটিই কি ছিল শেষ বিপর্যয়? না; বরং এটি ছিল বিপর্যয়ের প্রথম পৃষ্ঠা। ঘটনার শুরুভাগ! তুফানের শুরু, ধ্বংসের সূচনা। সামনের ঘটনাগুলো আরও শোকার্ত, অধিক রক্তক্ষয়ী। মুসলমানগণ ৬১৭ হিজরীতে পদার্পণ করছে, যা মুসলমানদের সুদীর্ঘ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ফেতনা ও দুর্যোগের বছর। নিকৃষ্ট ও ঘৃণ্য, অবক্ষয় ও অধঃপতনের বছর।
টিকাঃ
১৬ সুরা তাওবা: ১০১।
১৭ বুখারী: ৩৩৪৬, মুসলিম: ২৮৮০।